উপন্যাস : প্রিয় ফুল
লেখিকা : শেখ হালিমা
পর্ব -১
সূচনা,
ফুল গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে গিয়েছে শান্ত এক নদী,সেই নদীর উপর এক সপ্তদশী নৌকায় চোরে অনবরত পানিতে নিজের পা নাড়াচ্ছে এবং শাপলা ফুল তুলছে।
ফুল এই ফুল !
আরে সখী তুই এখানে কখন আসলি
আমি এহনি আইলাম
তরে চাচী আম্মায় এহনি বাসায় যাইতে কইছে
আচ্ছা সখী, তুইও আমার সাথে চল
না আম্মায় মরে যাইতে কইছে, মই যায়
দেখছেন আম্মা দেখছেন আপনি নাতনির কান্ডটা দেখছেন এখনো বাসায় আসলো না আইজ বাইত আইয়া লইক
আহ... এমন কইরো না তো বউ
আমার নাততি অই গাট ছাড়া অন্য কোনো হানে যায় নাকি.... অই তো ফুল আইসা গেছে
তোর এ্যাহনে আসার সময় হয়লো বলেই খুন্তি হাতে তেরে আসলেন আমেনা তালকদার
দিদায়ায়ায়া.. বলেই ফুল দউরে তার দিদার পিছে লোকাল দেখছ দিদা দেখছো তোমার ছেলের বউ আমার সাথে কেমন করে
তোমার আম্মা তো তোমার ভালার লিগাই কই
তুমিও তোমার ছেলের বউয়ের হয়ে কথা বলছো, আব্বাজান আসলে আমি তোমাদের নামে বিচার দিব।
অতীত : ফুল গ্রামের নাম- ডাক ও সম্মানিত বংশই হচ্ছে তালুকদার বংশ ইব্রাহিম তালুকদার আর তার স্ত্রী গোলাপ তালুকদারের একমাত্র ছেলে আলামিন তালকদার
ইব্রাহিম তালুকদারের বাবা ইব্রাহিম তালুকদার কে ১৮ বছর বয়সে রেখে ইন্তিকাল করে
পরিবারের একমাত্র ছেলে ইব্রাহিম তালকদার হওয়ায় তখন পুরো সংসারের ভার তার কাঁধে এসে পড়ে।
ইব্রাহিম তালুকদার কর্মঠা হওয়ার কারণে খুব সহজেই সংসারের হাল ধরতে পারে। তারপর নিজের উপার্জন দিয়ে এই তালুকদার বাড়ি তৈরি করে এবং বিয়ে করে আনোয়ার হোসেনের মেয়ে গোলাপ তালুকদার কে। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জন্ম নেয় আলামিন তালকদার
বাবা মা শিক্ষিত না হলেও আলামিন তালকদারকে উচ্চশিক্ষিত করেছে, লেখাপড়া শেষে আলামিন তালকদার ঢাকায় চাকরি জন্য যায়। কয়েক বছর ঢাকায় চাকরি করে গ্রামে ছুটি কাটাতে আসে
বাবা আলামিন এখন তো তোর বিয়ের বয়স হয়েছে, আমাদের কি নাতি- নাতনি দেখতে ইচ্ছে করে না। এইবার তোকে বিয়ে করিয়ে দেব আমি মেয়ে দেখে রেখেছি।
কার মেয়ে আব্বা জান..?
ওই যে...তারেক নেওয়াজের এক মাত্র মেয়ে আমেনা..।
আমি কথা দিয়ে এসেছি, সামনে শুক্রবার তোমাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে দেব।
আলামিন তালুকদার ও আমেনা বেগমের বিয়ের পরপরই আলামিন তালুকদার ঢাকায় পারি জমায় টানা দুই বছর ঢাকার থাকার পর গ্রামে আবার ছুটি কাটাতে আসে কয়েক সপ্তাহ পরে সে আবারো ঢাকার পাড়ি জমায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের কোল আলো করে আসে ইমন তালুকদার।
যেদিন ইমন তালুকদারের জন্ম হয় পুরো তালুকদার বাড়ি উৎসবে মেতে উঠে।
তারপরের দিনই আলামিন তালুকদার ঢাকায় থেকে ছুটি নিয়ে আসে।
আলামিন তালুকদার তার ছেলেকে কোলে নিয়ে বলে আব্বাজান দেখেন আমিও বাবা হয়ে গেছি।
আমার এই নাতি দেখার জন্য আমি বেঁচে ছিলাম, এখন আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারবো।
আব্বাজান আপনি এগুলা কি বলছেন,
হ্যাঁ বাবা, আল-আমিন আমি বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ..।
আপনি আগে বলেনি... আমি ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করব।
না বাবা আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে আমার সকল সম্পত্তি তোমার ও মার নামে করে রেখেছি..।
আহ আব্বাজান আপনি এগুলা বলবেন না তো এখনো অনেক বাঁচার আছে।
ইব্রাহিম তালকদার সামান্য হাসলে
গোলাপ তালুকদার ঘরের আঙ্গিনা থেকে ডাক দিলেন কই গো আমার পুতে আইছে পুতেরে কি খাইতে দিতাম না... তাড়াতাড়ি লই আহো
ইব্রাহিম তালুকদার আর আলামিন তালুকদার বাড়ির ভেতরে ঢুকলে
কই গো আলামিন বাবা দেখ তোর বাপে কিছু কয় না ক্যা রে.. দেখ নড়ে না.. নিঃশ্বাস লয়না..
আমার চিৎকার শুনে আলামিন তালুকদার তার কক্ষে থেকে তার আম্মা আর আব্বার কক্ষে গেলেন...
আব্বা আব্বা আপনার কি হয়েছে আব্বা.... উঠেন আব্বা উঠেন এই পৃথিবী দেখা বাকি আপনার নাতনি দেখবেন না আমার মেয়েকে দেখা বাকি ছেলেকে বড় হওয়া দেখা বাকি উঠে না আব্বা উঠেন ....
পুরো গ্রামে ইব্রাহিম তালুকদার আর বেঁচে নেই... পুরো তালুকদার বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে গেল... কেউ চিৎকার পেরে কান্না করছে.. তো কেউ মুখে আচল গুজের কান্না করছে.... গোলাপ তালুকদার ইতিমধ্যে কতবার যে জ্ঞান হারিয়েছে তা গুণে শেষ যাবে না।
আলামিন তালুকদার নিশ্চুপ হয়ে আছে পুরুষ মানুষ তার কষ্ট কাউকে বলতে পারে না বা বোঝাতে পারেনা... তাদের বুক ফাটে তো খুলেনা।
জোহরের নামাজের ইব্রাহিম তালুকদার কে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের কাজ শেষ করা হলো।
তারপর দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস গেল, বছর গেল ইব্রাহিম তালুকদারের সুখ গ্রাম সহ পুরো তালুকদার বাড়ি কাটিয়ে উঠলো।
ইব্রাহিম তালুকদারের মৃত্যুর ৬ বছর পর আবারও তালুকদার বাড়িতে খুশির ঝড় আসে।
সেই দিন তালুকদার বাড়িসহ পুরো গ্রামের মানুষ হতভাগ হয়ে ছিল....!
আলামিন তালুকদার আমিনা তালুকদারের আলো করে জন্ম নেয় ফুল তালুকদার।
যার টানা টানা হরিণী চোখ, দুধের চেয়েও যার গায়ের রং সুন্দর..... যার রূপ ফোটা পদ্ম ফুল কেউ হার মানায়..... তাকে দেখে তালুকদার বাড়ি সহ পুরো ফুল গ্রামের মানুষের চোখ ফেরানো দায়ী হয়ে পড়েছিল।
বর্তমান.....
তালকদার বাড়ির চার পাশে ইট দিয়ে উঁচু করে দেওয়াল দেওয়া হয়েছে সামনে ও পিছনে বড় বড় ২ টা গেট দেওয়া হয়েছে সাম্নের গেট দিয়ে ঢুকলেই সামনে বড় আঙ্গিনা তার সামনে বড় এক দালান কোঠা এবং পিছনের গেট দিয়ে বের হলেই গাট পার আর নদী চোখে পরে।
আমার আম্মাজান টার কি হয়েছে...
আব্বা জান বলেই ফুল দৌড়ে সামনের গেটের কাছে চলে আসে....
ফুল আজকে ভুলেই বসেছিল যে তার আব্বা আর তার ভাই ঢাকা থেকে গ্রামে আসবে...
আব্বাজান কেমন আছেন আপনি..?
আলহামদুলিল্লাহ আম্মাজান... আপনি কেমন আছেন..?
আলহামদুলিল্লাহ আম্মাজান।
কিরে, ফুলকলি আমাকে কি তোর চোঁখে পরে না...? আমার কথা তো মনে নেই তোর...
কিযে বল ভাইয়া আমি তোমাকে অনেক মনে করি... আম্মা আমকে কথাও যেতে দেয় না
তারা কথা বলতে বলতে দালানের সামনে চলে আসে।
আম্মাজান আপনি কেমন আছেন..?
আমি ভালাই আছি তোরা কেরাম আছো..?
আমার নাতি টা এত শুখাইছে কেরে..? এই হানে আহ দাদাভাই..
ইমন তার দিদার পাশে গিয়ে বসলো...
কেমন আছ দিদা..?
আমি ভালাই আছি তুমি কেরাম আছো..?
আলহামদুলিল্লাহ দিদা।
তা তুমি এত শুখাইছে কেরে..?
এখন তোমার কাছে এসেছি তুমি আমাকে আদর - সোহাগ দিয়ে মোটা - তাজা করে দিও বলে হেসে উটলো।
আলামিন আর ইমন তালকদার সবার সাথে কুসুল বিনিময় করে বাড়ির বেতরে গেলো। খাওয়া দাওয়া করে আলামিন তালকদার তার নিজ কক্ষে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন.. সাথে সাথে রাজ্যের সকল ঘুম চোখে এসে ভর করল।
আমিনা বেগম.. ইমন তালকদার কেউ ঘুমানোর জন্য বলেন..
না আম্মা আমি আর ফুল গ্রামটা ঘুরে সবার সবার সাথে দেখা করে আসি।
ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেই ফুল লাফিয়ে উঠলো...
তার পর তার ২ ভাই বোন গ্রাম দেখার উদ্দেশ্যে বাহিরে গেল...
কিরে ফুল এই ২-৩ বছরে গ্রামটা তো বেশ পাল্টিয়ে গেছে.....।
ফুল হতাশ শুরে বললো..... আমি ও এই কয়েক বছর গ্রাম টা ভালো করে দেখতে পারিনি.. আম্মা আমাকে কথাও গুরতে দেয়নি... তাও আমি লুকিয়ে গাট পার শাপলা তুলতে গিয়েছি...
মন খারাপ করিস না এখন আমি আছি না আমি তোকে প্রতিদিন ঘুতে নিয়ে আসব..।
সত্যি বলছ ভাইয়া...
হ্যা..