উপন্যাস : প্রিয় ফুল
লেখিকা : শেখ হালিমা
পর্ব : ৮
সকালেই এহসান বাড়ি মানুষ দিয়ে ভরে যাবে ছেলের বউ দেখার জন্য। তাই রুবিয়া বেগম বাড়ি - ঘর গুছাচ্ছে। ছেলের কথা শুনে কোন মনে বাসার সকলে দৌড়ে বাসায় থেকে গিয়েছে কিন্তু কেউ কি জানতো আসার সময় সাথে ছেলের বউ নিয়ে আসবে। এই বিয়ে তে এহসান বাড়ির তেমন কেউ কেউ বেজার না কিন্তু ছেলের জন্য গ্রামের মানুষের কাছে যত টা না মাথা নিচু হয়েছে আলামিন তালকদারের কথাই আর তার মেয়ের সাথে বিয়ে হওয়াই আর কোন কিছু মনে হয় না। এহসান বাড়ি তালকদার বাড়ির মতো সুবিশাল না হলেও বেশ ভালোই ধরতে গেলে গ্রামের ৩য় ধনী পরিবার হলো এই এহসান বাড়ি। বাড়ির মূল ফটক পেরলেই বড় উঠান চোখে পরে দুই পাশে বড় বড় দুই টা ঘর চার পাশে টিনের দেওয়াল টানানো প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সামনে বিশান চৌরি ঘর বাড়ির পিছে বিশাল পুকুর। এহসান বাড়ি থেকে নদী বেশ দূর। বাসায় কলেপার থাকলেও মেয়েরা পুকুরে গোসল করতে পছন্দ করে। রাব্বিদের আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই। রবি এহসানের বিয়ের পরি তার বাবা- মা মারা যায়। নিজের রক্ত পানি করা অর্থ সম্পদ দিয়ে এই এহসান বাড়ি তৈরি করেছে রবি এহসান। ভাবী গিয়া আফনের পোশাক পালটাইয়া লোন। ফুল হঠাৎ রূপার কথাই হুশ ফিরে। ফুল রূপাকে ইতস্তত করে বলে হ্যাঁ আমি কোন ঘরে থাকব দেখিয়ে দেও। ভাবী আফনেত বেশ ভালা কইরা কথা কইবার পারেন। মরেও শিকাইবেন নি? ফুল রূপার কথা শুনে সামান্য হাসে। ফুল বুঝতে পারে রূপা মেয়ে টা বেশ মিসুক।আচ্ছা শিকিয়ে দিব। আচ্ছা ভাবী এহন মর লগে আহেন মই আফনেরে হুয়ার ঘর দেহাই দেই। ফুল আর কিছু না বলে রূপার পিছু পিছু যায়। এই দেহেন ভাবী এইডা হইলো গিয়া আফনের আর ভাইয়ের ঘর। রূপার কথা শুনে ফুলের বুক টা চিন চিনে ব্যাথা করে উঠলো। এই ভেবে যে আজ থেকে সে পরের ঘরের বউ। সুজনের বউ হওয়ার সপ্ন সপ্নই হয়ে রইলো। ফুল নিজেকে সামলিয়ে নিল। আইচ্ছা ভাবী আপনে জামা বদলাইয়া লন মই আপনের লইগা খাউন লইয়া আহি বলেই রূপা বেরিয়ে গেল। ফুল নিঃশব্দে দোরজা লাগিয়ে খাটে উপর বসে হাটু তে মুখ গুজে এতক্ষণে সকল কষ্ট চোখের পানি হিসিবে বের করতে লাগে। ফুলের সকল অভিযোগ রবের কাছে দিতে থাকে। আল্লাহ কেন করলেন আল্লাহ? আমার সাথেই কেন করলেন? আমি তো এই মানুষ টারে নিজের করে পেতে চাইনি তবে কেন এই মানুষ টি আমার ভাগ্যে লিখে দিলেন। আমি তো সুজন ভাই কেই ছোট থেকে নিজের মানুষ হিসেবে চিনে আসছি তাহলে কেন তাকে আমার করে দিলেন না আল্লাহ? ফুল আরও কিছুক্ষণ রবের কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে থাকে। ফুল রবের কাছে যা যা অভিযোগ করেছে সব কিছু রাব্বি দৌড়জার কাছে দারিয়ে শুনে ফেলে। রাব্বি দোজাই করাগাত দেই। ফুলের ততক্ষণে পোশাক পালটানো হয়ে গিয়েছে। দোরজার করাগাতের শব্দে তারা হুরু করে দোরজা খুলে দেই। দোরজা খুলেই ফুল দেখতে পাই রাব্বি হাতে খাবার নিয়ে দারিয়ে আছে। ফুল দোরজার সামনে থেকে সরে দারাই। রাব্বি নিঃশব্দে ঘরে ডুকে। খাবারের থাকা খাটের পাশের টেবিলে রেখে ফুল কে উদ্দেশ্য করে বলে যাও অজু করে আসো দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করব। রাব্বির কথাই ফুলের টনক নরে ফুলকে সব সময় তার দিদা গোলাপ তালকদার বলতেন বিয়ের রাতে স্বামী কে নিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার কথা। বিয়ে টা যেই ভাবেই হক না কেন বিয়ে হয়েছে। এটাই সত্যি রাব্বির ভাগ্যে ফুল ছিল। এখন হাজার কিছু করেও কিছু বদলান যাবে না যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ফুল নামাজের কথা কি ভাবে ভুলতে পারে এটা ভেবেই বেশ বিরক্ত হয়। ফুল আর কিছু না বলে অজু করতে যায়। ফুলের যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে রাব্বি তাকিয়ে থাকে। তার পর সেও পাশা পাশি কিছু টা সামনে পিছু করে দুই টা যাইনামাজ বিছায়। ফুল এসে দেখতে পাই রাব্বি তার জন্য দারিয়ে আছে। ফুল কিছু না বলে নামাজে দারায়। নামাজ শেষ করে রাব্বি কিছু দওয়া পরে ফুলের শারা গায়ে ফু দিয়ে দেয়। তার পর ফুল কে উদ্দেশ্য করে বলে দেখেন ফুলকুমারী আমি আপনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করব না এমন কি কখন স্বামীর অধিকার ও চাইব না। শুধু আপনার কাছে আমার একটাই চাওয়া আপনি এমন কিছু করবেন না যাতে আমাদের এহসান বাড়ির কোন বদনাম হয়। কারণ আমি আপনাকে জর করে বিয়ে করিনি । রাব্বির মুখে ফুলকুমারী ডাক টা শুনে ফুলের শারা গায়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। যা কখন সুজনের মুখে কুলকন্যা ডাক শুনেও হয়নি। কিন্তু রাব্বির পরের কথা গুলো শুনে ফুলের অনুশোচনা হয়। যান গিয়ে আপনি খাবার খান। ফুল কিছু না বলে খাবার খাওয়ার জন্য গেল আর রাব্বি যাইনামাজ গুলো আহের জাগায় গুছিয়ে রাখে। ফুল খাওয়ার মধ্যে মনে পরে লোক টা কি খেয়েছে নাকি? ভাদ্রতার খাতীরে ফুল রাব্বি কে জিজ্ঞেস করে আপনি খেয়েছেন? ফুলের প্রশ্ন করাই রাব্বি বেশ অবাক হয় কিন্তু তা ফুল কে বুঝতে দেই না। ফুলের কথার উত্তর হিসেবে রাব্বি বলে না আমার খিদে নেই আপনিই খান। ফুল আর কিছু বলে না। ফুলের খাওয়া শেষ হলে রাব্বি ঘুমানোর জন্য বিছানা ঠিক করে। ফুলকুমারী আপনি উপরে ঘুমান আমি নিচে শুয়। রাব্বির কথাই ফুল সামান্য ইতস্তত করে বলে না মানে আপনিও আমার পাশে ঘুমাতে পারেন। আপনি কেন আমার জন্য কষ্ট করবেন? আর এমনিতেও আমি একা ঘুমাতে পারি না। আমি ছোট থেকে দিদার সাথে ঘুমিয়েছি দিদা আমাকে গল্প শোনাত আর মাথাই হাত বুলিয়ে দিত। আর আমি দিদা কে জরিয়ে ধরে ঘুমাতাম। এই কথা বলেই ফুল বুঝতে পারে সে ভুল জাগায় ভুল কথা বলে ফেলেছে তাই কিছু না বলে নিজেকে লোকানর জন্য কাথা মুরি দিয়ে ঘুমিয়ে পরে আর রাব্বি কে উদ্দেশ্য করে বলে আপনিও ঘুমিয়ে পরেন। রাব্বি কিছু না বলে ফুলের থেকে দূরত্ব রেখে ঘুমিয়ে পরে। সূর্য পূর্ব আকাশে নিজের উপস্থিত জানান দিচ্ছে। ফুলের শশুর এইটা প্রথম দিন। ফুল ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাই ইতি মধ্যে বেশ কিছু মহিলা চলে এসেছে এহসান বাড়ি। ফুল এর আগে এত মানুষ দেখিনি এতে সামান্য ভরকে যায় ফুল। কি গো তালকদারের মাইয়া তা এত দেরি কইরা ঘুম থেইকা উঠলা ক্যাহ? বাপ মাই কিছু সিহাই পরাই পাঠাই নাই শশুর বাড়ি? এত দেরি কইরা ঘুম থেইকা উঠলে বাড়ির কাম কেডাই করব? রাব্বি ঘরের বারান্দায় থেকে মহিলাদের কথা সব শুনছিল। শেষে কথাই রাব্বি দাত ব্রাশ করা থামিয়ে বলে তা চাচি আম্মা আমরা আমাদের বাড়ির লিগা বউ আনছি কাজের মাসি না। আপনারা আপনাদের বাড়ি বউ না এনে কাজের মাসি আনলে আমরা কি করতে পারি? দেখছনি রুবিয়া তোমার পুতে কই কি আময় গো। তা আমরাও দেইহা লমুনি কয় দিন এই বউরে তুলা বেবি কয়রা রাহ। আমি আমার বউ রে মাটি তেও পা রাখতে দিব না আমার বউ রে আমার মাথাই কইরা ঘুরামু। রাব্বির কথা ফুল বেশ লজ্জা পেল তাই কিছু না বলে সেখান থেকে কলেপার মুখ দোয়ার জন্য গেল।