উপন্যাস : প্রিয় ফুল
পর্ব : ১৪
লেখিকা : শেখ হালিমা
- এই সুন্দর ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রয়ে গেল এই নিস্তব্ধ রাত চারপাশের ঝিঝি পোকা আর এই চারপাশের বন্ধু দেওয়াল।
সূর্য পূর্ব আকাশে নিজের উপস্থিত জানান দিচ্ছে।
আজকের সকালটা আর ১০ টা সকালের মতো মন মুগ্ধ করো নই। চার পাশে হাহা কার। ফুল গ্রামে যেন আজ ফুলের সুভাষ নয় বরং আপন জনকে হারানোর হাহা কার। আজকে আকাশটাও যেন কান্না করতে চাইছে।
- তালকদার বাড়ি গ্রামের শেষ প্রান্তে হওয়ায়। গ্রামে কোন কিছু হলে তা সব শেষে পৌঁছায়।
- সূর্য উঠার সাথে সাথে তালকদার বাড়ির সকলে উঠে যায়।
- ফুল নামায শেষ করে উঠানে বসে এই সব কথা ভাবছে। আজকে ফুলের মনটাও কেমন জানি ভারি হয়ে রয়েছে। ফুলের মনে কেমন যেন কু ডাক দিছে। মনে হচ্ছে আপন আর কাছের কিছু হারিয়ে গিয়েছে।
- অওওও ফুল আপায়ায়া.. ফুল আপা.. কই গো তুমিইই..?
- বুলটুর ডাকে ফুলের গা টা জাকুনি দিয়ে উঠে। কোন এক অজানা আশঙ্কায়। ফুল ভেবে পেল না এত সকাল সকাল কেন এত তারা হুরু করে বুলটু ডাকছে..? কী হয়েছে বুলটু..? তুই এত তারা হুরু করে কেন আসলি..? আর এত সকাল সকাল কোন কিছু কী হয়েছে..?
- ফুল আপা আমগো আ..আমগো.. শাপলা আপা আর নাই গো..
- ফুলের কানের এক পাশ - দিয়ে কথা টা ডুকে আরেক পাশ দিয়ে যেন বের হয়ে গেলো। ফুলের মাথাই যেন আকাশ ভেংগে পরলো। ফুলের মাথা ভু ভু করে ঘুরতে থাকলো।
- ফুল আপা কী হয়েছে তুমি কিছু বলছো না কেন..? আপা তুমি যাইবা না..?
- ফুল শাপলা বলে দৌড়ে উঠান পেরিয়ে সতর দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।
- ফুলের চিৎকার শুনে সকলে উঠানে এসে দারায়।
- ফুলকে এই ভাবে দৌড়ে যেতে দেখে সকলেই পিছু পিছু যায়।
- আম্মা ও আম্মা, আম্মা উঠ আম্মা। ও শাপলা, শাপলা ওমা..?
- ফুল কোন মনে দৌড়ে শাপলাদের উঠানে এসে দাঁড়ায়। ফুলের মাথাই থেকে সেই কখন আচল পরে গিয়েছে তার কোন হুস গেন নেই। ফুলকে কোন পাগলের চেয়ে কম মনে হচ্ছে না। মাথা চুল গুলো খুলে মুখের সামনে চলে এসেছে।
- ফুল গাপলার মৃত দেহ সামনে ধপ করে বসে পরে। ফুল শাপলার সারা গায়ে একবার নজর বুলাই। কিন্তু শাপলার গায়ে কাফনের কাপড় থাকার জন্য শুধু মুখ টুকুই দেখা গেল।
- ফুল দেখলো শাপলার মুখে অনেক কালচে দাগ। ফুল বুঝতে পারলো না এগুলো কী ভাবে হয়েছে। শাপলার মুখটি দেখতে এতটাই বিপর্শন লাগছে যে। ফুলের মনে হচ্ছে কোন জংলি জানোয়ার শাপলাকে খুবলে খেয়েছে। ফুল দেখলো খুব ভালো করে নিজের সুখির মুখটা দেখলো শেষ ভারের মতো দেখলো। আর এই মুখটা দেখতে পারবে না । সুখি এই সুখি উঠো দেখ আমি এসেছি তুই উঠবি না..? দেখ আমি জানি তুই মজা করছিস। উঠো না দেখ সকলে কীভাবে কান্না করছে।
- ওফুল ফুল দেখনা আমার মাইয়াডা উঠে না কেরে। আমি কাইলকা কেনে মাইয়াডারে যাওনের লিগা জর করলাম। আমি না কইলে মাইয়াডা যাইতো না। আমার মাইয়াডা জাইতে চাই নাই। আমি জর কইরা পাঠাইছি। আমি আমার মাইয়াডারে মরনের লিগা পাঠাইছি। ওফুল তুই একটু ডাক দিবি আমার মাইয়াডারে। দেখ না তুই ডাকলে আমার মাইয়াডা মনে হয় উঠবো। তুই না ওর সব চাইয়া কাছের সুখি। ওফুল দেখ না আমার মাইয়াডা কেমনে শুইয়া রইছে। আমারে কালকে তোর আহার কথা হুইনা কই যে আইজকা তোর হনে যাইবো। দে না ডাক দে দেখবি তুই ডাক দিলে আমার মাইয়াডা উইডা যাইবো। অই তোর কথা শুনে দে না মা আবার ডাক দে। ওশাপলা শাপলা দেখ কেডাই আইছে.. তোর সুখী আইছে। দেখ তুই কথা কবি না..? - আম্মা উঠ না আর কহন তোরে কোন কাজ করতে দিতাম না উঠা না..? তোরে আর যাইতে কইতাম না।
- ইমন শাপলার এমন রূপ দেখে যেন নিজের মাঝে থেকেও নেই। ছেলে মানুষদের কান্না করতে নেই। কথাটা হইতো সত্যি নইতো এইযে ইমনের এতো কষ্ট হচ্ছে তার পরেও তার চোখ দিয়ে কেন পানি গরাচ্ছে না। আসে পাশের সকলেই তো কান্না করছে কই তাদের চোখ দিয়ে তো দিব্যি পানি গরাচ্ছে। তাহলে ইমন কেন পারছে না। কেন তার ভেতর টা ফেলে জাচ্ছে। কেন সে চিৎকার পেরে কান্না করতে পারছে না।
কেন.. কেন..সে তার মনে কথা বলতে চেয়েও পারিনি..? কেন তার আগেই শাপলা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলো..? ইমন তো এইবার ঢাকা থেকে এসে তার ঘরের বউ করতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই এগুলা কী হয়ে গেলো..?
- সময় তার নিজ গতিতে চলে সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো।
- শাপলাকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন কাফন সম্পন্ন করে সবে মাত্র তালকদার বাড়ির সকলে ফিরলো।
- গ্রামে কোন আইনি ব্যবস্থা নেই বলে। শাপলার বেপারটা তার কবরের সাথে দাফন হয়ে গেল। কেউ যান্তে পারলো না কতটা নৃশংসভাবে মেয়েটিকে হত্যা করা হয়েছে।
- ফুল উঠানেই বসে পরে। ফুলের চোখ দিয়ে এখন আর কোন জল গরাচ্ছে না। কান্না করতে করতে ফুল এখন আর কান্না করতে পারছে না। ফুল শাপলার মৃত্যুতে পুরো পুরি ভাবে ভেংগে দিয়েছে।
- ফুলকুমারি উঠেন আসেন গোসল করে খাওয়া দাওয়া করবেন ।
- ফুল নোরলনা সে ভাবেই বসে রইল।
- ফুলের কোন হেল দল না দেখে রাব্বি ফুলকে পাজা কলে নিয়ে নিজেদের কক্ষে গেলো।
- সুজন উপর থেকে শান্ত দৃষ্টিতে সকল কিছু পরক করলো।
- রাব্বি ফুলকে কোন মনে গোসল করিয়ে খাইয়ে দেয়। ফুল কয়েল লকমা খেয়ে আর গেলো না।
- গোলাপ তালকদার বলে উঠে এই যুবতি মাইয়াডার রাইত কইরা কেন অন্যের বাড়ি যাওন লাগবো। আর বাপ - মা কেমন মাইয়াডারে কেন যাইয়ে দিল। মাইয়াডা না গেলে কী আর এই রকম হইতো।
- দিদা ব্যাস অনেক হয়েছে না যেনে তুমি আর কিছু বলো না।
- যা বাপু আমি আবার কি কইলাম তা তুমিইই কউ এই হানে কেডার দুস আছিল।
- দোস ছিল অই জানোয়ার দের যারা নিষ্পাপ এই মেয়েকে এইভাবে মেরে ফেলেছে।
- শাপলার নানু বাড়ি আর দাদু বাড়ি এক গ্রামে থাকার জন্য যখন খুশি শাপলা তার নানু বাসায় যেতে পারতো। সেই দিন রাতে শাপলাকে দিয়ে তার মা কিছু খাবার পাঠাই শাপলার নানুর জন্য কিন্তু শাপলাদের বাসার থেকে বেশ কিছু টা দূরে তারা নানু বাসা। যাওয়ার সময় ক্ষেতের মাজ দিয়ে সুশান এক রাস্তা পরে। আসে পাশে কোন বাসা নেই। খাবার দিয়ে আশার সময় পিছু থেকে শাপলার মাথাই কেউ আঘাত করে। শাপলার যখন জ্ঞান ফিরে তখন শাপলা নিজেকে কোন এক কঠুরিতে হাত পা বাধা অবস্থায় নিজেকে উপস্থিত করে।
- বলার মাঝে ফুল হঠাৎই কেসে উঠে। ফুলের সামনে পানি ধরে রেশমা। ফুল কন মতে পানি খায়।
- ফুলের পানি খাওয়ার মাঝে রেশমার ফোন বেজে উঠে।
- হ্যালো মেডাম, আমরা গ্রাম থেকে তেমন কিছু জানতে পারিনি। তবে আসে পাশে খোজ নিয়ে জানতে পেরেছি। হঠাৎ একদিন তালকদার বাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জলে উঠে আর সেই দিনের পর থেকে কাউকে খুজে পাওয়া যায়নি। সকলের ধারনা সেই আগুনে সকলে মারা গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাদের আত্মীয় বলতে তেমন কাওকে খুজে পাওয়া যায়নি। যে সকল কিছুর খোজ দিতে পারবে। আর তার চেয়েও বড় কথা সেই বাড়ির পিছে পুকুর ঘাট দিয়ে উপারে একটা জঙ্গল আছে। সেই জঙ্গলের গভীরে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি পাওয়া গেছে। যার পিছে বেশ অনেক গুলো লাশ পাওয়া গিয়েছে। তার মধ্যে কিছু নতুন আর কিছু বেশ অনেক আগের।