নিষিদ্ধ সাম্রাজ্য
লেখিকা: তাসফিয়া হোসাইন
পর্ব – ০২
বন্ধুত্বের রঙ
সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোয় ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তার পাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন আর চায়ের দোকানের আড্ডায় মুখর চারপাশ।
অ্যাভেলিন কলেজের গেটের সামনে এসে দেখল, অনিকা আর মায়া দাঁড়িয়ে আছে।
অনিকা দূর থেকেই চিৎকার করে বলল,
— এই যে মহারানি! আজ এত দেরি কেন?
অ্যাভেলিন ব্যাগটা কাঁধ থেকে ঠিক করতে করতে বলল,
— ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে। এখন কি আমাকে জেরা করা হবে?
মায়া হেসে বলল,
— না, আগে জরিমানা দিতে হবে।
— কীসের জরিমানা?
— আমাদের অপেক্ষা করানোর জরিমানা!
অ্যাভেলিন চোখ বড় করে বলল,
— তোদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!
তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর রুদো আর আরিয়ানও এসে যোগ দিল তাদের সঙ্গে।
রুদো বলল,
— আজকের পরিকল্পনা সবাই জানিস তো?
অ্যাভেলিন অবাক হয়ে তাকাল।
— আবার কী পরিকল্পনা?
আরিয়ান বলল,
— গতকাল তো ঠিক হলো, ক্লাস শেষে পতেঙ্গা যাব।
অ্যাভেলিন মাথায় হাত দিয়ে বলল,
— ওহ! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।
অনিকা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তুই কিছুই মনে রাখিস না। শুধু খাওয়া আর ঘুম!
— বাহ! নিজের গুণগুলো আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছিস?
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।
ঠিক তখনই আদ্রিয়ান এসে দাঁড়াল তাদের পাশে।
— তোমাদের আড্ডা কি শেষ হবে, নাকি আজও ক্লাস বাদ?
অ্যাভেলিন তাকিয়ে বলল,
— তোমার কি আমাদের পেছনে লাগা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই?
— আছে। কিন্তু তোমাদের মতো কিছু মানুষকে সঠিক পথে রাখাও একটা সামাজিক দায়িত্ব।
রুদো হেসে বলল,
— ভাই, তুই আগে নিজের পথ ঠিক কর!
আদ্রিয়ান কিছু বলার আগেই কলেজের ঘণ্টা বেজে উঠল। সবাই দ্রুত ক্লাসের দিকে চলে গেল।
---
ক্লাসে স্যার আজ নতুন একটি অ্যাসাইনমেন্টের কথা জানালেন। সবাই যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন অনিকা কাগজে কিছু লিখে অ্যাভেলিনের দিকে এগিয়ে দিল।
কাগজে লেখা—
'আজ পতেঙ্গায় গিয়ে ফুচকা খাবি, নাকি শুধু ছবি তুলবি?'
অ্যাভেলিন নিচে লিখল,
'আগে ফুচকা, তারপর ছবি।'
কাগজটা আবার অনিকার হাতে পৌঁছাতেই সে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল।
স্যার হঠাৎ বলে উঠলেন,
— পেছনে এত হাসাহাসি হচ্ছে কেন?
সবাই চুপ হয়ে গেল।
অ্যাভেলিন সোজা হয়ে বসে বলল,
— স্যার, আমরা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েই আলোচনা করছিলাম।
স্যার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— তাহলে আলোচনাটা ক্লাসের পর করো।
বন্ধুরা মুখ নিচু করে হাসতে লাগল।
---
দুপুরে ক্লাস শেষ হতেই সবাই কলেজের গেটের সামনে জড়ো হলো।
আদ্রিয়ান বলল,
— সবাই এসেছে তো? তাহলে রওনা দেওয়া যাক।
মায়া বলল,
— দাঁড়া, আগে কিছু খেয়ে নিই। খালি পেটে ঘুরতে পারব না।
রুদো বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোদের খাওয়ার চিন্তা কখনো শেষ হবে না?
অনিকা উত্তর দিল,
— খাবারের ব্যাপারে কোনো আপস নেই!
অবশেষে সবাই কাছের একটি দোকানে গিয়ে কিছু খাবার খেল। তারপর গাড়ি নিয়ে পতেঙ্গার উদ্দেশে রওনা হলো।
গাড়ির ভেতর চলছিল হাসি, গান আর একে অপরকে নিয়ে মজার সব কথা।
অ্যাভেলিন জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। শহরের পরিচিত রাস্তাগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। বন্ধুরা নিজেদের মতো আনন্দে মেতে ছিল।
কিছুক্ষণ পর রুদো চিৎকার করে বলল,
— এই যে সবাই! আজ কিন্তু কেউ আগে চলে যেতে পারবি না।
অ্যাভেলিন হেসে বলল,
— আগে পৌঁছাই, তারপর দেখা যাবে।
গাড়ির ভেতর আবারও হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
সেদিনের বিকেলটা তাদের জন্য হয়ে উঠল আনন্দে ভরা এক সুন্দর স্মৃতি।পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছাতেই সবার মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। বিকেলের মৃদু বাতাসে চুল উড়ছে, দূরে সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তীরে।
অনিকা গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার করে বলল,
— অবশেষে! কত দিন পর এখানে এলাম!
মায়া তার হাত ধরে বলল,
— চল, আগে কয়েকটা সুন্দর ছবি তুলি।
রুদো পেছন থেকে বলে উঠল,
— তোরা ছবি তুল, আমি খাবারের দোকান খুঁজে দেখি।
আরিয়ান হেসে বলল,
— তোর জীবনে খাবার ছাড়া আর কিছু নেই?
— অবশ্যই আছে! খাবারের বিল দেওয়ার জন্য বন্ধু আছে।
সবাই হেসে উঠল।
অ্যাভেলিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। আদ্রিয়ান পাশে এসে বলল,
— কী ব্যাপার? এত চুপচাপ কেন?
অ্যাভেলিন চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল,
— সবসময় কথা বলতে হবে এমন কোনো নিয়ম আছে?
— না, তবে তোর মুখে কথা না থাকলে আশপাশটা অস্বাভাবিক লাগে।
— তাহলে অভ্যাস বদলে ফেলো।
আদ্রিয়ান হেসে মাথা নাড়ল।
এদিকে অনিকা সবাইকে ডাকতে শুরু করেছে। সবাই মিলে কয়েকটি ছবি তুলল। কেউ হাসছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ আবার ঢেউয়ের পানিতে পা ভেজাচ্ছে।
মায়া হঠাৎ অ্যাভেলিনের হাত ধরে বলল,
— এই যে, তুই শুধু দাঁড়িয়ে থাকবি? আয় না!
অ্যাভেলিন হেসে তাদের সঙ্গে এগিয়ে গেল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। সমুদ্রের ওপরে সূর্যের শেষ আভা ছড়িয়ে পড়েছে। বন্ধুরা বালুর ওপর বসে গল্প করছিল।
আরিয়ান বলল,
— আমাদের বন্ধুত্বটা যেন এমনই থাকে সবসময়।
অনিকা মুচকি হেসে বলল,
— আমিও চাই, কেউ যেন কাউকে ভুলে না যাই।
অ্যাভেলিন সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— কথা দেওয়া সহজ, কিন্তু কথা রাখা কঠিন। তবু চেষ্টা করিস সবাই।
কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ হয়ে গেল। তারপর রুদো পরিবেশ হালকা করতে বলে উঠল,
— এত আবেগ দিয়ে লাভ নেই। এবার ফুচকা খাওয়ানোর পালা কার?
আবারও হাসিতে ভরে উঠল সন্ধ্যাটা।ফেরার পথে সবাই একে অপরের সঙ্গে দিনের স্মৃতিগুলো ভাগ করে নিল। অ্যাভেলিন জানালার পাশে বসে হাসিমুখে বাইরে তাকালো। অনিকা দিনের তোলা ছবিগুলো একে একে দেখাচ্ছিল। মায়া নিজের পছন্দের ছবিটা দেখে বলল,
চলবে....