পর্ব:০৩
পরদিন সকাল।
অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙতেই অ্যাভেলিন বিরক্ত মুখে ফোনের দিকে তাকাল। গতকালের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি এখনো কাটেনি।
হঠাৎ অনিকার ফোন।
— এই অ্যাভেলিন! আজ কলেজে আসবি তো?
— না, আজ বাসায় বসে তোদের কথা মনে করে কান্না করব।
— বেশি নাটক করিস না। আধা ঘণ্টার মধ্যে কলেজে চাই!
— আচ্ছা, আসছি।
ফোন রেখে অ্যাভেলিন তৈরি হতে লাগল।
---
সরকারি সিটি কলেজের ক্যাম্পাসে পৌঁছাতেই দেখল, সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে আদ্রিয়ানের মুখটা অন্য দিনের তুলনায় বেশ গম্ভীর।
অ্যাভেলিন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে? কারও টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিসনি নাকি?
রুদো হেসে উঠল।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— সবকিছুতেই মজা করতে হবে?
— অবশ্যই। বিনা পয়সায় বিনোদন দেওয়াটা আমার দায়িত্ব।
মায়া বলল,
— তোরা একটু থামবি? একটা সমস্যা হয়েছে।
অনিকা এবার জানাল, তাদের কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিটি বন্ধুকে কোনো না কোনো দায়িত্ব নিতে হবে।
আরিয়ান বলল,
— আমি উপস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারি।
রুদো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তাহলে আমি খাবারের দায়িত্ব নিলাম।
মায়া চোখ ঘুরিয়ে বলল,
— তোর দায়িত্ব শুধু খাওয়া!
সবাই হেসে উঠল।
অনিকা অ্যাভেলিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আর তুই?
— আমি দর্শক হয়ে বসে থাকব।
— সেটা হবে না। তোকে কিছু একটা করতেই হবে।
অ্যাভেলিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আচ্ছা, পরে দেখা যাবে।
---
ক্লাস শেষে সবাই লাইব্রেরির সামনে বসেছিল। আদ্রিয়ান একটি কাগজ নিয়ে অ্যাভেলিনের দিকে এগিয়ে দিল।
— এই নে, অনুষ্ঠানের দায়িত্বগুলোর তালিকা।
অ্যাভেলিন কাগজটা হাতে নিয়ে বলল,
— তুমি কি এখন থেকে কলেজের ম্যানেজার হয়েছ?
— না। তবে তোর মতো মানুষদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হয়।
— নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।
দিনের বাকি সময়টা কেটে গেল হাসি আর ব্যস্ততায়।
কিন্তু ইরাবতীর শেষ কথাটা তার মনে থেকে গেল।
কী এমন কথা বলতে চায় মেয়েটি?
সন্ধ্যায় নিজের ঘরে ফিরে অ্যাভেলিন ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসল। সারাদিনের ব্যস্ততায় ইরাবতীকে ফোন করা হয়নি।
ফোনটা হাতে নিয়ে সে ইরাবতীর নম্বরে কল দিল।
দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— এতক্ষণে মনে পড়ল আমার কথা?
অ্যাভেলিন হেসে বলল,
— ব্যস্ত ছিলাম। বল, কী হয়েছে?
— তুই সবসময় ব্যস্ত থাকিস। আমার জন্য একটু সময়ও কি নেই?
— আচ্ছা, সরি। এবার বল।
ইরাবতী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আগামী সপ্তাহে আমাদের বাসায় একটা অনুষ্ঠান আছে। তুই আসবি?
অ্যাভেলিনের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
— জানি না রে। সময় হলে যাব।
— তুই সবসময় এমন করিস কেন? সবাই তোকে দেখতে চায়।
— ইরাবতী, প্লিজ! এই বিষয়টা নিয়ে আর কথা বলিস না।
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— ঠিক আছে। আর জোর করব না।
অ্যাভেলিন নরম গলায় বলল,
— মন খারাপ করিস না। তোর সঙ্গে কথা বলব, ঠিক আছে?
— হুম। নিজের যত্ন নিস।
কল কেটে যাওয়ার পর অ্যাভেলিন ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিল। ঘরের চারপাশে নীরবতা। বাইরে রাস্তার আলো জ্বলছে, দূরে গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর সে উঠে জানালার কাছে গেল। শহরের আলো দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
---
অন্যদিকে, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে বন্ধুরা একটি গ্রুপ চ্যাটে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
Anika: সবাই কাল সময়মতো আসবি।
Rudo: খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত তো?
Maya: তোর মাথায় শুধু খাবার!
Arian: আগে কাজ শেষ কর, তারপর খাবার।
Adrian: অ্যাভেলিন কোথায়? ওর দায়িত্ব এখনো ঠিক হয়নি।
কিছুক্ষণ পর অ্যাভেলিনের উত্তর এল।
Avelin: আমি আছি। আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করার দরকার নেই।
Adrian: চিন্তা করছি না। দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিলাম।
Avelin: ধন্যবাদ, কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা!
গ্রুপে সবাই হাসির ইমোজি পাঠাতে লাগল।
রাত বাড়তে থাকল। একে একে সবাই গ্রুপ থেকে বিদায় নিল।
অ্যাভেলিন ফোনটা বন্ধ করে পড়ার টেবিলে রাখল। আগামীকাল কলেজে অনেক কাজ। তাই সে বই খুলে বসে পড়ল।
কিন্তু পড়ার মাঝেও বারবার ইরাবতীর কথাগুলো মনে পড়ছিল।
মেয়েটা কি সত্যিই এতটা একা হয়ে গেছে?
নাকি কিছু সম্পর্কের দূরত্ব কখনো ইচ্ছা করে ---
রাত তখন প্রায় বারোটা।
চট্টগ্রাম শহরের এক নির্জন গলিতে হঠাৎ একটি গাড়ি এসে থামল। চারপাশে নিস্তব্ধতা। রাস্তার বাতিগুলোর কয়েকটি নিভে আছে। দূরে কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
একটি পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে পড়ে আছে একজন লোক। তার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু কাগজপত্র। টেবিলের ওপর রাখা ঘড়িটি থেমে আছে রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে।
লোকটির হাতে শক্ত করে ধরা একটি কাগজ। সেখানে লাল কালিতে লেখা মাত্র দুটি শব্দ—
শেষ সতর্কবার্তা।
কিছুক্ষণ পর ভবনের ভেতরে একটি শব্দ হলো। তারপর আবার নিস্তব্ধতা।
সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেখতে পেল, ভবনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানালাগুলোও অক্ষত। অথচ লোকটি সেখানে কীভাবে এল, কেউ বলতে পারছে না।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টার কোনো দৃশ্য নেই।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা কাগজটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
— এটা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়।
তার সহকর্মী জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে কে করেছে?
কর্মকর্তা কোনো উত্তর দিলেন না।
কারণ সেখানে কোনো আঙুলের ছাপ নেই, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, এমনকি কোনো পরিচিত চিহ্নও নেই।
শুধু পড়ে আছে সেই লাল কালির সতর্কবার্তা।পুলিশের হাতে তখন শুধু একটি প্রশ্ন—পরবর্তী লক্ষ্য কে? অথচ উত্তর দেওয়ার মতো কোনো সূত্রই তাদের কাছে ছিল না।তৈরি করা হয় না, পরিস্থিতিই তৈরি করে দেয়?
রহস্যের জাল আরও গভীর হতে থাকল নীরবে
সত্যের অপেক্ষায় রইল পুরো শহর।
কিন্তু রহস্যের শেষ তখনো অনেক দূরে।
চলবে.....।