#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে
#আয়েশা_রিন
#পর্ব৩৫
[ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।]
ভোরের আবছা আলো তখনো ঘরের ভারী পর্দা টপকে ভেতরে ঢোকার সাহস পায়নি। অন্ধকারের আবছা আমেজ তখনও চার দেয়ালে থমকে আছে, দূর থেকে জানালার ওপাশ ছাপিয়ে ভেসে আসছে পাখির একটানা কিচিরমিচির শব্দ। রুমের ভেতর এলোমেলো, অবিন্যস্ত বিছানায় বারিশের মুখ গভীরভাবে গেঁথে আছে তার ব্যক্তিগত নারীর উন্মুক্ত বক্ষজোড়ার নিবিড় খাঁজে। হাত দুটো তার লোহার শিকলের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে ঝিলমিলের ক্ষীণ কটিদেশ। যেন অবচেতন মনেও মেয়েটাকে নিজের বুকের হাড়ের ভেতর পিষে মারার হিংস্র, অধিকারবোধ কাজ করছে!
হঠাৎই ঝিলমিলের নিবিড় বক্ষখাঁজ থেকে ছড়ানো উত্তপ্ত দাহ অনুভূত হলো বারিশের গাল আর চিবুকে। ত্বকে ফুটন্ত আঁচের মতো তাপ লাগতেই শিথিল হয়ে এল তার ঘুম। চোখ না মেলেই বিভ্রান্তিতে দুই ভ্রু কুঁচকাল যুবক। ঠান্ডা সকাল আর এসির শীতল আবহে এই চড়া উত্তাপ কোত্থেকে আসছে তা অবচেতন মন হিসেব মেলাতে পারছে না তার। ধীরগতিতে চোখ মেলল সে। মুখটা সামান্য উঁচিয়ে তাকাতেই বারিশের চোখে পড়ল ঝিলমিলের শুকিয়ে যাওয়া ঘুমন্ত মুখখানায়। ঠোঁটের কোণে জমাট বেঁধে আছে যন্ত্রণার দাগ।
বারিশ দ্রুত উঠে বসল। নিজের হাতের উল্টো পিঠ ঝিলমিলের গাল, কপাল আর গলায় ছুঁয়ে দিতেই খানিক চমকে উঠল সে। জ্বরে গা একদম পুড়ে যাচ্ছে। চোখমুখ কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে, নিচু গলায় নিজের উদ্দেশ্যে হিসহিসিয়ে উঠল,
— ড্যাম ইট! কাল রাতটা অন্তত নিজেকে একটু সামলানো উচিত ছিল বারিশ! ফা”ক ইয়োর কন্ট্রোললেসনেস!
ঝিলমিলের কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুলল সে। ঝিলমিল অনেক কষ্টে চোখের পাতা দুটো সামান্য মেলতেই মাথার ভেতর রগ ছিঁড়ে যাওয়ার মতো প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভূত হলো। সাথে সাথে চোখ দুটো বুজে ফেলে, ব্য”থায় কুঁকড়ে উঠে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
— আমি এখন কোনো রান্না করতে পারব না... মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে…
বারিশ গম্ভীর গলায় বলল,
— তোমাকে কেউ রান্না করতে বলেনি। গায়ে জ্বর। দ্রুত উঠো, কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।
কথাটা শুনে ঝিলমিল আবার চোখ মেলল। এবার নিজের শরীরের তাপটা সে নিজেই অনুভব করতে পারল। সত্যিই তো, সারা শরীর থেকে কেমন আগুনের হলকা বের হচ্ছে! মাথার ভেতরটা অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় রি রি করছে। কাল রাত থেকেই তো শরীরটা একদম ঠিক ঠেকছিল না। বারিশের দিকে তাকিয়ে অসহায়, অভিযোগী গলায় বলল,
— বলেছিলাম না আপনাকে? কাল কতবার অনুরোধ করেছিলাম... শোনেননি কথা! আপনার জন্যই আজ আমার জ্বর এসেছে।
বারিশ জানত মেয়েটা এখন এসব বলেই তলোয়ার চালাবে। সে কথা না বাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরনের থ্রি-কোয়ার্টার কটন প্যান্টের ফিতাটা টেনে ভালোভাবে বেঁধে নিল। তারপর বিছানা থেকে ঝিলমিলের কুর্তিটা তুলে নিয়ে সাবধানে ঝিলমিলের গায়ে পরিয়ে দেয়।
পরক্ষণেই তাকে জড়িয়ে ধরে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল বারিশ। ঝিলমিলের দুটো পা বারিশ নিজের শক্ত কোমরের দু'পাশে জড়িয়ে আটকে নিয়ে হাঁটা ধরল দরজার বাহিরে। ঝিলমিল বারিশের বুক আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইল। সেই অবস্থাতেই ওকে কোলে চেপে ধরে রেখে রান্নাঘরে গিয়ে এক হাতে ফ্রিজ খুলে রাতের বাকি থাকা খাবার গুলো ওভেনে দিয়ে গরম করে নিল।
ডাইনিং চেয়ারে বসিয়ে একদম জোর করে ঝিলমিলকে কয় লোকমা খাইয়ে দিয়ে, জ্বরের অ্যান্টিবায়োটিক আর পেইনকিলার মুখে পুরে দিয়ে পানি খাইয়ে দিল। গ্লাস টেবিলে রাখতে রাখতে গম্ভীর গলায় বারিশ বলল,
— এতে যদি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জ্বর না কমে, তাহলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
ঝিলমিল পানির গ্লাসটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে কিছুটা খোঁচা মারার ভঙ্গিতে বলল,
— ডাক্তার যদি জিজ্ঞেস করে হুট করে এত জ্বর কেন এল, তখন কী বলবেন?
— যেটা সত্য, সেটাই বলব। বউকে কথা দিয়েছি তো, আর মিথ্যা বলব না।
চোখ দুটো বাঁকা করে, ধারালো দৃষ্টি ছুড়ল ঝিলমিল।
— মুখ খুললেই তো মিথ্যের বস্তা বের হয়। এখন খুব সত্যবাদী হয়ে গেছেন, তাই না?
বারিশ কোনো পাত্তাই দিল না।
— কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি শাওয়ারে চলো।
— এখন না!
ঝিলমিলের আপত্তি বারিশ কানেই তুলল না। এক প্রকার তাকে ধরে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। একটু পর খেয়াল করল ঝিলমিল না ঠিকমতো শরীরে পানি ঢালছে, না ঠিকমতো শাওয়ার জেল মাখছে—যেন অকারণে সময় নষ্ট করছে। বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এজন্যই গায়ে ময়লা লেগে থাকে।
ঝিলমিল চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— আমাকে বললেন?
— না, এখানে থাকা খচ্চরকে বলেছি!
কথাটা বলতে বলতেই বারিশ হাত বাড়িয়ে ঝিলমিলের হাত টেনে ধরে শাওয়ার জেল নিয়ে ঝিলমিলের ফর্সা হাত, গলা আর ঘাড়ে কষে ডলে দিতে লাগল।
কিছু দূর যেতেই বারিশ যখন ঝিলমিলের ভিজে যাওয়া কুর্তি নিচের অংশ ধরে ওপরের দিকে তুলতে যাবে, ঝিলমিল সঙ্গে সঙ্গে কানফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল,
— কী করছেন আপনি?
— ‘কী আবার করছি?’ বারিশ যেন কিছুই বোঝেনি এমন নিষ্পাপ ভঙ্গিতে তাকাল।
— জামা কেন খুলছেন?
— এটা পরেই গোসল করবে নাকি?
— আপনি শাওয়ার নিয়ে বাইরে বের হয়ে যান! আমি একাই পারব,
আমার সাহায্য লাগবে না।
কে শোনে কার কথা? বারিশ উল্টো আরও জেদ ধরে দুই টানে ঝিলমিলের গায়ের জামাটা মাথা গলিয়ে খুলে ছুড়ে ফেলে দিল।
একমুহূর্তের জন্য পুরোপুরি অসাড় হয়ে গেল ঝিলমিল। লজ্জায় শরীর আড়ষ্ট হয়ে এলে সে দু'হাতে টেনে এনে বুকের সামনে ঢেকে রাখার চেষ্টা করল নিজের ঝরঝরে ভিজে যাওয়া চুলগুলো। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— সবসময় এমন নির্লজ্জের মতো আচরণ করেন কেন? আপনার লজ্জা-শরমের বালাই নেই বলে কি আমারও থাকবে না? নিজে তো ঠিকই জামাকাপড় পরে আছেন!
আড়চোখে নিজের দিকে তাকাল বারিশ।
— কোথায়? আমার গায়েও কোনো শার্ট নেই।
— আপনার শার্ট না থাকা আর আমার না থাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য!" ঝিলমিল ঝগরুটে বাঘিনির মতো গর্জে উঠল, "আপনার ওসব অকেজো ছাতি তো সবাই দেখতে পারবে! কিন্তু আমার…
বাকি শব্দগুলো মুখে আটকে গেল ঝিলমিলের। বাক্যের শেষটুকু আর সম্পূর্ণ করল না সে, শুধু স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল রাগী চোখে। বারিশ ওর সেই অবাধ্য রূপ দেখে একপা এগিয়ে একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস বলল,
— প্যান্ট খুলতে বলছো? প্যান্ট খুললে কিন্তু এখানেই…
বারিশের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝিলমিল ক্ষিপ্ত হয়ে পাশে থাকা এক মগ ভর্তি ঠান্ডা পানি এক ঝটকায় বারিশের মাথায় ঢেলে দিল! হুট করে মাথায় ঠান্ডা পানি পড়তেই বারিশের সমস্ত কথা মাঝপথেই থেমে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড নিস্পন্দ হয়ে রইল, কিন্তু আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। কোনো রাগ না দেখিয়ে খুব শান্ত হাতে সে ঝিলমিলের সারা শরীরে ভালোভাবে শাওয়ার জেল মাখিয়ে, পানি ঢেলে পরিষ্কার করে গোসল করিয়ে দিতে লাগল।
ঝিলমিল এবার সুযোগ পেয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্বামীর দিকে।
কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল লোকটার এই সুপুরুষ রূপটা। বারিশের পরিপাটি চুলের ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে ওর চওড়া কপালে আর ধারালো চোয়ালে। ঘন ভ্রুর নিচে আকর্ষণে ভরা এক জোড়া চোখ। সোজা তীক্ষ্ণ নাক, আর চিবুকের নিচে গলার অ্যাডামস অ্যাপলটা পানি লেগে চকচক করছে। খালি গায়ে বারিশের বিস্তৃত, সুঠাম বুক আর হাতের ফোলা শিরাগুলো যেন এক অবাধ্য শক্তির জানান দেয়। লোকটা যতটা বিষাক্ত, যতটা হিংস্র... ততটাই অদ্ভুত এক আকর্ষণে মোড়ানো। ওই চিকনা জারিফ তার স্বামীর ধারে কাছেও তো নেই! মনে মনে বেশ গর্ভ হচ্ছে কিশোরীর।
——
বিকেলের দিকে ঝিলমিলের গায়ের জ্বরটা ধীরে ধীরে নেমে গেছে। শরীর এখনো কিছুটা দুর্বল আর ম্যাথম্যাথে লাগলেও মাথার সেই যন্ত্রণাটা এখন আর নেই। বিছানা ছেড়ে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল ঝিলমিল। বারিশ তখন ঘরের কোণের রিডিং টেবিলে ল্যাপটপ খুলে গভীর মনোযোগে কাজ করছে। চশমার কাঁচের ওপাশ থেকে তার চোখ দুটো ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিবদ্ধ, হাত দ্রুত চলছে কি-বোর্ডে। ঝিলমিল সেদিকে একপলক তাকিয়ে নিশব্দে রুম থেকে বের হয়ে এল।
পা বাড়াল সেই হোম থিয়েটার রুমটার দিকে। সেদিন রাতে আবছা আলো-আঁধারিতে এত বড় রুমটার কিছুই দেখা হয়নি। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেয়ালে হাতড়ে ঝিলমিল মূল সুইচবোর্ডের সবগুলো সুইচ এক এক করে জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে একঝাঁক দুধসাদা আর ওয়ার্ম লাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল পুরো হলঘরটা। আর আলো ফুটতেই, সোজা সামনের দেয়ালটার দিকে চোখ পড়তেই ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চোখের সামনে বিশাল এক হাই-রেজুলেশনের ফ্রেমে বাঁধানো পোস্টার! পুরো দেয়ালজুড়ে যেন সেই মানুষটারই এক একচ্ছত্র রাজত্ব!
পোস্টারে বারিশের বিশাল এক ছবি। আকর্ষণীয় আর ডার্ক প্রফেশনাল মেজাজে। ছবিতে ঝিলমিলের চোখ আটকে গেল ঠিক মাঝখানে বসে থাকা লোকটার ওপর। বারিশ বসে আছে তার স্টুডিওর এক হেলান দেয়া চামড়ার চেয়ারে। গায়ে জড়িয়ে রাখা কুচকুচে কালো শার্টের উপরের কয়েকটা বোতাম আলগা করে খোলা, যার ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার চওড়া বুকের সুগঠিত গঠন আর গলার নিচে ঝুলে থাকা সরু এক ধাতব চেইন। গলার একপাশে স্পষ্ট অক্ষরে আঁকা ট্যাটু "RJ BARISH"।
কানে পেঁচানো প্রফেশনাল হেডফোন, আর এক হাত দিয়ে আলতো করে ধরে রাখা "RJ BARISH" লেখা কাস্টমাইজড ব্রডকাস্ট মাইক্রোফোনটি। বারিশের এলোমেলো, ঘন কালো চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়েছে, চোয়ালের ধারালো খাঁজ কড়া আলো-ছায়ায় একদম স্পষ্ট। ঠোঁটের নিচে আর ডান ভ্রুতে পিয়ার্সিং করা। হাতে দামি মেটালিক ঘড়ি, আঙুলে কালো আংটি।
পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল আর লাল নিয়ন সাইনে জ্বলজ্বল করছে “Midnight with Barish” এবং লাল বোতামে জ্বলে থাকা "ON AIR" চিহ্ন। ডিজিটাল ঘড়িতে রাত ১২:০০ টা বাজার সংকেত।
ছবিটা নিশ্চয়ই রাত বারোটায় তোলা হয়েছিল? কাঁচের জানালার ওপাশে দূরের শহরের আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা তার নিজের নামের কফি মগ, খাতা-কলম, আর পাশে সাজানো কিছু রহস্যের বই। ছবিতে লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে, পুরো অন্ধকার রাতটা যেন শুধু তারই ইশারায় চলে!
লোকটার দিকে ঝিলমিল মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। কত বয়স হবে তখন? ঊনিশ, বিশ, একুশ? ঝিলমিল নিজের অজান্তেই ধীরপায়ে সেই বিশাল পোস্টারটার কাছে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করার আগেই পেছন থেকে খপ করে তার হাত ধরে ফেলল বারিশ।
আঁতকে উঠল কিশোরী। লোকটার দিকে তাকাল। ছবিটার সাথে বর্তমান বর্ননার কোনো মিল নেই। ঘাড়ে কোনো ট্যাটুও নেই।
— আপনি আর জে…
বলতে চাইল কিছু মেয়েটা। বারিশ থামিয়ে দেয়,
— জাস্ট শাটআট! বের হও এখান থেকে। আর কখনো যেন এখানে আসতে না দেখি।
———
মেয়েটার গায়ের টি-শার্টটা কে যেন আলতো করে টেনে একপাশে সরিয়ে দিয়েছে। বুকের ঠিক পাশটায় ভীষণ কোমল, তুলতুলে এক স্পর্শ। আঁধারের ভেতর মুখখানা স্পষ্ট বোঝা যায় না, আবছা একটি অবয়ব। পরম নির্ভরতায় ক্ষুদ্র সেই মুখ লেগে আছে বুকে। পরমুহূর্তেই শিশুটি তৃপ্তির সাথে দুধ পান করতে শুরু করে। মেয়েটা শিশুটির পিঠ শক্ত করে বুকের সঙ্গে আগলে ধরল। পাতলা, রেশমের মতো নরম চুলে আঙুল চালিয়ে সে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
শিশুর প্রতিটি টানে তার শিরা-উপশিরায় এক অপূর্ব, অনাস্বাদিত শিহরণ খেলে যায়। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অজানা স্নেহের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। দুধপানের পাশাপাশি ছোট অস্তিত্বটা নিজের ছোট হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে মেয়েটার গাল। বুকের ভেতরের সেই ব্যাকুল শিহরণ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। হৃদস্পন্দন বড্ড দ্রুত হয়ে ওঠে, থমকে যায় শ্বাসের গতি। ধক করে একটা জোর ধাক্কা লাগে পুরো শরীরে। দীঘি ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকায়।
মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা স্থির হয়ে আছে। এসি অন করা। ঘরের জানালার বাইরে গভীর রাতের নিঝুম অন্ধকার। বুকটা তখনও দ্রুত ওঠানামা করছে। দীঘি হাত বাড়িয়ে বিছানায় স্পর্শ করল। চারপাশে নিস্তব্ধতা ছাড়া আর কেউ নেই। কেন? কেন বারবার একই দৃশ্য তার স্বপ্নে ফিরে আসে? এই অচেনা শিশুর স্পন্দিত ছোঁয়া, এই তীব্র ব্যাকুলতা আর বুকের গহীনে অজানা স্নেহের উথালপাথাল তরঙ্গ এর মানে কী? কোত্থেকে আসে এই অচেনা একফোঁটা প্রাণ! যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, কোনো নাম নেই, সেই অলৌকিক অনুভূতিটাই কেন প্রাতে তাকে এভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে?
— কে তুই? কেন আসিস? কে তুই, যার একটুখানি স্পর্শ আমার পুরো অস্তিত্ব উলটপালট করে দেয়?
—— [ লেখিকার পেজ নেম– Ayesha Rin— রিন ]
দেখতে দেখতে পনেরটা দিন কেটে গেছে ঝিলমিল আর বারিশের একসাথে থাকার। এর মধ্যে চঞ্চল সাহেব দু-দুদিন দেখতে এসেছিলেন তাদের। বারিশকে কয়েকবার ফিরে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু বারিশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে যাবে না। চঞ্চল সাহেবও আর বেশি বাড়াবাড়ি করেননি; ছেলে এখানে শান্তিতে আছে, আর ছেলের জেদ সম্পর্কে তিনি খুব ভালো করেই অবগত। মেহরাজ, নীল ওরাও একদিন এসে ঘুরে গেছে—হৈচৈ করে মাতিয়ে দিয়ে গেছে পুরো বাড়ি।
আজ বিকেলে টুকিটাকি কিছু দরকারি কেনাকাটার জন্য শহরের একটা বড় মার্কেটে গিয়েছে ওরা দুজন। কেনাকাটার প্রায় শেষপর্যায়ে, ভিড় ঠেলে হাঁটার সময় হঠাৎ ঝিলমিলের চোখ আটকে যায় একটা বাচ্চাদের কাপড়ের দোকানের ঝলমলে শো-কেসে। কেমন যেন এক অজানা আবেশে সে পা বাড়ায় সেদিকে। একটা ছোট্ট তুলতুলে লাল জুতো আর মোলায়েম একজোড়া জামা হাতে তুলে নিয়ে বারিশের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলে,
— এই দুটো কিনে দিন না!
বারিশ আড়চোখে জামাটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে,
— এগুলো পরবে তুমি? মাথা ঠিক আছে তোমার?
— আমার জন্য না! আমাদের বাচ্চার জন্য।
বারিশের কপালে এবার ভাঁজ পড়ে গেল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে শুধাল,
— আমাদের বাচ্চা আছে? জানতাম না তো!
— উফ! এমন করছেন কেন? হবে তো একদিন!
বারিশ বিরক্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাচ্ছিল্যের সুর টেনে বলল,
— হলেই নেওয়া যাবে। ছাড়ো ওসব, চলো এখন।
কিন্তু ঝিলমিল নাছোরবান্দা। সে সেখান থেকে এক পা-ও নড়ল না। বারিশের হাজারটা বিরক্তি আর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে জেদ ধরে সেটা কিনে তবেই ছাড়ল। আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর কেনাকাটার ব্যাগ দুটো গাড়ির পেছনের সিটে তুলে ওরা যখন বাসায় ফিরল, তখন বিকেলের আলো প্রায় মরে এসেছে। কিন্তু গেটের সামনে গাড়িটা থামতেই ঝিলমিলের গায়ের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল!
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা সরকারি পুলিশের গাড়ি আর ঠিক তার পাশেই ঝিলমিলের বাবার চকচকে কালো প্রাইভেট কারটা! গাড়ি থেকে নামতেই পুলিশের সাইরেনের লাল-নীল আলো দুটো ঝিলমিলের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখে এসে পড়ল। থমথমে পরিবেশ। তারা গাড়ি থেকে নামতেই একজন পুলিশ এগিয়ে এলেন,
— একজন প্রফেসর হয়ে ১৬ বছরের এক নাবালিকা মেয়েকে কীভাবে বিয়ে করলেন আপনি?
পুলিশ অফিসার ঝিলমিলের জন্ম নিবন্ধন তুলে ধরে বারিশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন। বারিশ শান্ত গলায় জবাব দিল,
— আমি বর্তমানে কোনো প্রফেসর নই।
— যখন বিয়ে করেছেন তখন তো ছিলেন! এমনকি সে আপনার স্টুডেন্ট, সাথে আপনারই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ভাতিজি। সব জেনেও আপনি তাকে কেন বিয়ে করলেন? আপনি কি দেশের আইন-কানুন কিচ্ছু জানেন না?
— ওর পরিবারই নিজ ইচ্ছায় আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে। ধরতে হলে ওর বাবাকে ধরুন।
আলতাফ সাহেব গর্জে উঠলেন,
— মিথ্যে বলছে স্যার! আমি কখনোই এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আর এখন আমি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে চাই। ও আমার মেয়েকে জোর করে আটকে রেখেছে!
ঝিলমিল দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
— আব্বু মিথ্যে বলছে, অফিসার! আমাকে উনি জোর করে আটকে রাখেননি... আমি নিজের ইচ্ছায়…
পুলিশ অফিসার শক্ত গলায় ধমকে উঠলেন,
— তুমি চুপ করো! আঠারো বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তোমার কোনো কথার আইনগত দাম নেই!
— আমার বয়স ষোলো নয়, সতেরো স্যার! নিবন্ধনে এক বছর কম দেওয়া জাস্ট। আর মাত্র দু'মাস গেলেই আঠারো হবে... প্লিজ, বিশ্বাস করুন আমাকে!
পুলিশ কানেই তুলল না মেয়েটার কথা। সে আলতাফ চৌধুরীকে ইশারা দিলেন যেন ঝিলমিলকে নিয়ে গাড়িতে তোলে। তারপর বারিশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। মেয়ের বয়স এখনো আঠারো হয়নি, তাই আইনের চোখে তার সম্মতির কোনো মূল্য নেই। আপনার বিরুদ্ধে বা”ল্যবিবাহ নিরোধ আইনে মা”মলা হচ্ছে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভিকটিমকে তার লিগ্যাল গার্ডিয়ান অর্থাৎ বাবার কাস্টডিতেই হস্তান্তর করা হচ্ছে।
ঝিলমিল দৌড়ে এসে বারিশের বুকে আছড়ে পড়ল।
— আমি কোথাও যাব না, আর ওনাকেও কোথাও যেতে দেব না।
পুলিশ অফিসার একজন মহিলা পুলিশকে ইশারা করলেন যেন ঝিলমিলে সরিয়ে নেয়। আলতাফ চৌধুরীও মেয়েকে টানতে শুরু করল।
— 'যাব না আমি আব্বু!' ঝিলমিল বারিশের বুকের শার্টের কাপড় খা'মচে ধরে বলল,
—' আপনি কিছু বলছেন না কেন? বলুন...আমাকে যেতে দেবেন না, বলুন আমাকে ভালোবাসেন।'
বারিশ নির্বিকার। সে জানে এই মুহূর্তে চিল্লাচিল্লি বা শক্তি দেখিয়ে কিছু লাভ নেই। আলতাফ সাহেব জায়গা মতোই আঘাত করেছেন। আইনের শক্ত দেয়াল তুলে তাকে এক পাসে আটকে দিয়েছেন।
আলতাফ চৌধুরী আবার ঝিলমিলের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন। ঝিলমিল এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে আবারও দু'হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বারিশকে।
— আমি যাব না... কিছু বলুন আপনি! আমাকে নিয়ে গেলে আর কখনো আপনার কাছে আসতে দেবে না! ফাহিম স্যারের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে! আমি পারব না অন্য কাউকে বর মেনে নিতে! প্লিজ কিছু বলুন... প্লিজ!
কিশোরীর ভয় ঠিক এখানেই। সতেরো বছরের কাঁচা বয়স; আবেগ আর ভীতির পারদ একটু বেশিই তীব্র তার। বাবার অন্ধ জেদের কাছে সে আগেও বলির পাঁঠা হয়েছে। বারিশের বিবাহিত স্ত্রী হওয়া সত্ত্বে তাকে জোর করে ফাহিমের পরিবারের সামনে এনে দাঁড় করানো হয়েছিল। এবার তো বারিশকে সোজা জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, এবার যে বাবা আরও বড় কোনো সর্বনাশ করবেন---তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাবতেই আশঙ্কায় শিউরে উঠছে মেয়েটা।
বারিশ এখনো নিশ্চুপ, শরীর কাঁপছে রাগে, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, রগে রগে ক্ষোভের দহন। তার এমন নিরবতা সহ্য করতে না পেরে ঝিলমিল এবার নিজের মুঠো পাকিয়ে বারিশের বুকে আঘাত করতে লাগল,
— এইই, কিছু বলিস না কেন? বলেছি না যাব না? ওদের নিষেধ কর! ভালোবাসিস না আমাকে?
এতক্ষণ স্থির হয়ে থাকার পর, যুবক তার র”ক্তচক্ষু স্থবির করল স্ত্রীর
অশ্রুসজল চোখের ওপর। গলার নালী বেয়ে নেমে গেল কঠিন এক ঢোক। গম্ভীর স্বরে বলল,
— ডোন্ট ক্রাই! শান্ত হও। ফিরে যাও বাবার সঙ্গে। যে আইন আজ তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে এসেছে, সেই আইন কিনে নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। খুব দ্রুত তোমাকে আমার বুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসব, এটা আমার ওয়াদা।
ঝিলমিল কান্না থামিয়ে ভেজা চোখে, উন্মাদের মতো বারিশের চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,
— আমি যাব না! যাব না বলেছি না? যাব না মানে যাব না!
— বললাম তো ফিরিয়ে আনব! আমি যা বলছি শোনো। এখন ফিরে যাও।
— না!
— অবুঝের মতো করো না, জাহান! এমনিতেই রেগে আছি!
বারিশ চোখ পাকিয়ে, থমথমে গলায় কথাটা বলতেই ঝিলমিল তার বুকে আরেকটা ঘুসি মেরে চেঁচিয়ে উঠল,
— সব সময় ভয় দেখাবেন না! ভয় পাই না আপনাকে! আমি কোথাও যাব না!
আলতাফ চৌধুরী এবার এগিয়ে এসে ঝিলমিলের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন। সাথে সাথে দুজন মহিলা পুলিশও এসে অন্য বাহু ধরে টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করল। ঝিলমিল উন্মাদের মতো দু'হাতে বারিশের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল,
— যাব না, যাব না, যাব না! কেউ ধরবে না আমায়! এই, তুই কিছু বল! আমি যাব না!
বারিশ একটা শব্দও বলল না। ক্ষণে ক্ষণে শুধু শক্ত ঢোক গিলে গেল। কিন্তু আলতাফ চৌধুরী আর পুলিশের টানাটানির সামনে ১৭ বছরের মেয়েটার অবুঝ আকুলতা আর টিকতে পারল না। স্বামীর গলা ছেড়ে গেল, আস্তে আস্তে টেনে তাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব বাড়িয়ে দূরে সরিয়ে নেওয়া হলো।
দূরত্ব যত বাড়ছিল, ঝিলমিল ততই নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে শূন্যে একটা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল বারিশের দিকে। ডুকরে কেঁদে বারবার বারিশকে ডাকছিল।
সবকিছু উপেক্ষা করে আলতাফ চৌধুরী মেয়েকে জোর করে টেনে গাড়িতে তুলে দরজা লক করে দিলেন। একই সময়ে পুলিশ অফিসার বারিশের হাত ধরে প্রিজন ভ্যানের দিকে টেনে নিয়ে চললেন। বারিশ এতটুকু বিচলিত হলো না। ধীর পায়ে প্রিজন ভ্যানের দিকে যেতে যেতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে আলতাফ চৌধুরীর দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল উপহাসের হাসি।
— লাভ কী আলতাফ ভাই, উহুম…শ্বশুর আব্বু! আপনার মেয়ে এখন পুরোপুরি আমার বশে। শরীর আটকে রাখতে পারবেন, কিন্তু রক্তে মিশে থাকা আমার প্রতি তার টান আটকাবেন কী করে? ভদ্রতার খাতিরে লাইফস্টাইল বদলেছি, কিন্তু ক্যারেক্টার নয়! আপনি খুব ভালো করেই জানেন বারিশ নামক জঙ্গলটা কতটা ভয়ংকর। আর এটাও জানেন এইসব পুলিশ-থানা আমাকে বেশিক্ষণ আদর-সোহাগ করতে পারবে না।
আলতাফ চৌধুরীও জানেন বারিশ কেমন জিনিস আর পুলিশ যে এক রাতের বেশি সময় আটকে রাখতে পারবে না এটাও জানে। কিন্তু তিনিও এবার শক্ত হাতে মাঠে নেমেছেন। বারিশের জবাবে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে বললেন,
— আগে তো লকআপের ঠাণ্ডা ভাত খা! তারপর দেখা যাবে তোর কত গরম!
আলতাফ চৌধুরীও আর সেখানে দাঁড়ালেন না। গাড়িতে গিয়ে বসলেন। পুলিশ অফিসাররা বারিশকে প্রিজন ভ্যানের দরজার কাছে নিয়ে গেল। গাড়ির পেছনের সিটে বসা ঝিলমিল উন্মাদের মতো জানালার কাঁচে দু'হাত থাপড়ে যাচ্ছে। বন্ধ কাঁচের ওপাশ থেকে তার কান্নার আওয়াজটা অস্পষ্টভাবে বাইরে ভেসে আসছে। সে নামতে চায়।
বারিশ গাড়িতে ওঠার আগে শেষবারের মতো থমকে দাঁড়াল। নিস্পন্দ চোখে দেখল বন্ধ কাঁচের ওপাশে কিশোরী কীভাবে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব উজাড় করে ছটফট করছে! অথচ এই তো ক'দিন আগেও এই মেয়েটা তাকে দু’চোখে সহ্য করতে পারত না! কে বলবে এই মেয়েটা শুধু নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য তাকে বিয়ে করেছিল? আজ সেই মেয়েই বারিশকে ছাড়া এক দণ্ড নিঃশ্বাস নিতে পারছে না! এটা ভালোবাসা, নাকি দু’দিনের আবেগ? নাকি অভ্যাস! অভ্যাস, আবেগ কেটে গেলে এমন করবে এই মেয়ে তার জন্য? জানে না বারিশ।
বারিশকে গাড়ির ভেতরে ঠেলে দেওয়া হলো। ভারী শব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। একই সাথে দুটো গাড়ি দুটো ভিন্ন দিকে যাত্রা শুরু করল। প্রিজন ভ্যানের ছোট জালি দেওয়া জানালা দিয়ে বারিশ এখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আলতাফ চৌধুরীর চলে যাওয়া গাড়ির দিকে। কাঁচের ওপাশে ঝিলমিলের সেই ছটফট করতে থাকা অস্পষ্ট শরীরটা তখনও দেখা যাচ্ছে। এক জোড়া অবুঝ হাত অনবরত আছড়ে পড়ছে কাঁচে। একসময় শহরের মোড় ঘুরে আলতাফ চৌধুরীর গাড়িটা অন্য রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
চলন্ত গাড়ির পেছন সিটে বসে থাকা ঝিলমিলের দু'চোখ বেয়ে তখনও প্লাবণের মতো জল গড়াচ্ছে। আলতাফ চৌধুরী গাম্ভীর্য নিয়ে পাশে বসে আছেন, মুখাবয়বে পাথরের মতো অনমনীয় ভাব। ঝিলমিল তার বাবার দিকে ফিরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে উঠল,
— তুমি কেন এমন করছ আব্বু? কী ক্ষতি করেছে উনি তোমার? কেন আমার সংসার ভাঙছ তুমি?
— বাবা- মা যা করে, তা সন্তানকে বাঁচানোর জন্যই করে। তোমার বয়স অল্প, রঙিন চোখে এখন পৃথিবীর সবই সুন্দর দেখছ। আর সংসার একদিন বা দুই দিনের খেলা নয়, এটা সারা জীবনের ব্যাপার।
— তো আমি উনার সঙ্গেই সারা জীবন থাকব!
— এটা কোনোদিনই সম্ভব নয়। ওর সঙ্গে তুমি সারা জীবন টিকতে পারবে না। ছেলেটা কতটা খারাপ, তা তোমার ধারণার বাইরে।
— কী এমন করেছে বলো! আমি শুনতে চাই! বলো আমাকে!
— ‘তুমি ছোটবেলায় ওকে দেখোনি?’ আলতাফ চৌধুরী এবার মেয়ের দিকে ঘুরে তাকালেন,
— মনে নেই কেমন উগ্র ছিল ছেলেটা?
— হ্যাঁ, দেখেছি! শুধু কারও কথা শুনত না, একটু বেপরোয়া ছিল, জেদি ছিল, এইতো! এখন তো উনি আর তেমন নেই!
— এখন কার কথা শোনে ও? আর তুমি যা দেখেছ, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি জঘন্য ওর ইতিহাস। তুমি জানো ও একটা ভয়ংকর মা"দকাসক্ত ছিল? রিহ্যাবে আটকে রেখে রেখে একে সোজা করতে হতো! ড্রা"গের টাকার জন্য নিজের পরিবারকে তছনছ করত, ঘরে ভাঙচুর চালাত, রাতবিরাতে বাইরে পড়ে থাকত। আর এই জাতের ছেলেরা রাস্তায় কত মেয়েদের সাথে রাত কাটায়, তার কোনো হিসাব আছে? আমি সব জেনেও আমার নিষ্পাপ মেয়েকে এমন একটা নর্দমার ছেলের হাতে তুলে দেব? ও যে আবার ওই রাস্তায় ফিরবে না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে? বিয়ে দুই দিনের মোহের খেলা নয় মা! এটা সারা জীবনের বোঝাপড়া!
— চুপ করো তুমি! চুপ করো! একদম মিথ্যা কথা বলবে না! উনি কখনো এমন ছিলেন না! উনি কোনোদিন অন্য কোনো মেয়েক ছুঁয়েও দেখেননি!
— তুমি কতটুকু চেনো ওকে? তুমি তখন পিচ্চি ছিলে। রিহ্যাব থেকে কোনোমতে একটু স্বাভাবিক হতে না হতেই মেহরাজের সঙ্গে জোর করে ওকে বিদেশে চালান করে দেওয়া হয়। ওখানে গিয়েও ওর ঠিক হতে বছর খানেক সময় লেগেছে। ওর বাবা প্রথম দু’বছর ওখানে মাঝেমধ্যে গিয়ে গিয়ে দেখে আসত। এখন সবাই সব কিছু ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি! আমি ওর স্যার ছিলাম, আমার সাথেও কম বে’য়াদবি করেনি! এসব নিয়ে আমার যায় আসত না, ও খারাপ কী ভালো এসবেও আমার কিচ্ছু হতো না, যদি না আমার মেয়ের জীবন ওর সঙ্গে জড়াত। আমি তোমার বাবা ঝিলমিল! জেনেশুনে ওর হাতে আমি আমার একমাত্র মেয়েকে ছেড়ে দিতে পারি না!
ঝিলমিলের কণ্ঠ বুজে এল
— এখন তো আর উনি তেমন নেই, আব্বু…
— থামো ঝিলমিল! আমি ওর ব্যাপারে আর একটা কথাও শুনতে চাই না!
আলতাফ চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিলেন। বাসায় পৌঁছেই ঝিলমিলের হাত ধরে টেনে সোজা তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন সে। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই কড়া হুকুম ছুড়ে দিলেন,
— নিজের গোছানোর মতো জিনিসপত্র ব্যাগে গুছিয়ে নাও। কাল ভোরের ফ্লাইটেই আমরা লন্ডনে যাচ্ছি।
ঝিলমিলের মাথার ওপর নিমিষে পুরো আকাশটা ভেঙে পড়ল। সে দিশেহারা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— মানে? আমরা যাচ্ছি মানে...?
— আমরা পরিবারের চারজনই যাচ্ছি। তুমি, তোমার আম্মা, জিহান আর আমি।
ঘরের কোণে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমা বেগম। মুখ ফুটে একটা শব্দও বের করার সাধ্য তার নেই। এই তোড়জোড় আর পরিকল্পনা আলতাফ চৌধুরী আজ হঠাৎ শুরু করেননি; ক'দিন ধরে তলে তলে এর সব ব্যবস্থা করছিলেন তিনি। এতদিন শুধু ঝিলমিল আর জিহানের নতুন পাসপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন। এমনকি লন্ডনের ‘কিংস্টন কলেজ’-এ ঝিলমিলের নতুন সেশনের পড়াশোনার ভর্তি পর্যন্ত নিশ্চিত করে ফেলেছেন। বাড়ির একটা পিপড়াও এসবের কিচ্ছু জানে না।
চলবে....