ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে

৩৬তম পর্ব

লেখক: আয়েশা শেখ

#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে

#আয়েশা_রিন

#পর্ব৩৬

[ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]

আলতাফ সাহেব কেবল বারিশের নামে মা”মলা করে ক্ষান্ত হননি; আইনি চাবুক তিনি চালিয়েছেন দু পরিবারের ওপরই। মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক জেনেও বিয়ে দেওয়া এবং সহায়তার অপরাধে আসামির খাতায় নাম দিয়েছে নিজের মা, বোন এবং ছোট ভাইয়েরও। এছাড়াও বারিশের পরিবারের ঝর্ণা শেহরিয়ার, চঞ্চল শেহরিয়ার, ফরহাদ সাহেব এবং তার স্ত্রী শিউলি বেগমের। বিয়ের আয়োজন, সম্মতি আর পরোক্ষ মদদ দেওয়ার অপরাধে দুই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যই এখন 'বা”ল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭'- লঙ্ঘনের অপ”রাধি।

সকলকেই ধরে এনে লকআপে রাখা হয়েছে। একপাশের নারী লকআপে গাদাগাদি করে বসে আছেন নূরজাহান চৌধুরী, দীঘি, ঝর্ণা শেহরিয়ার আর শিউলি বেগম। মাথার ওপরের পুরনো জং ধরা ফ্যানটা কেবল বিকট শব্দে ঘুরছে, কিন্তু বাতাস ছড়ানোর নামগন্ধও নেই। দীঘি অনবরত হাত নাড়িয়ে মশা তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ঝর্ণা বেগম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দীঘির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

“সব নষ্টের মূল এই মেয়েটা! সেদিন বিয়ের আসর থেকে না পালালে আজ এই দিন দেখতে হতো না।”

দীঘি গায়ে এসে বসা মশা মারতে মারতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

“আপনার ছেলে কোনো ইংলিশ নোভেলের হিরো নয় যে তাকে আমার বিয়ে করতে হতো।”

“তুমিও এমন কিছু হয়ে যাওনি যে আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলবে।”

“আমি এমন কিছু না হলে আমাকে নিয়ে এত আফসোস কেন আপনার?" দীঘি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

ঝর্ণা বেগমের কন্ঠ এবার ঝাঁঝালো শোনাল,

“তোমাকে নিয়ে আফসোস না! তোমার জায়গায় তোমার ভাতিজিকে আমার ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়াতে আফসোস!”

দীঘির চোখ জোড়া রাগে ছোট হয়ে এল।

“Shut your mouth! আপনার ছেলে নিজেই ঝিলমিলকে…”

দীঘির বাক্য শেষ হতে পারল না তাহসিনের আকস্মিক আগমনে। তাহসিন নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“আজ রাত এখানেই কাটাতে হবে। উকিলের সাথে কথা হয়েছে, জামিন করাতে হলে আদালত অব্দি যেতে হবে। এর জন্য দু’তিন দিন সময় লাগবে।”

নূরজাহান চৌধুরী কঠোর গলায় নির্দেশ দিলেন,

— আলতাফকে কল দাও।

— উনি কল ধরছেন না। স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ওনার সময় হলে নাকি নিজেই মা”মলা উঠিয়ে নেবেন। ততক্ষণ আমাদের এখানেই থাকতে হবে।

নূরজাহান চৌধুরী আর একটা শব্দও খরচ করলেন না। আলতাফ নিশ্চয়ই কোনো বড় ফাঁদ তৈরি করছে! তাহসিন দীঘির মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু গলায় শুধাল,

— আপনার জন্য কয়েলের ব্যবস্থা করব, ম্যাম?

দীঘি মুখ ফিরিয়ে নিল।

— আমার চোখের সামনে থেকে যাও তুমি।

— খেয়েছেন কিছু? এনে দেব?

দীঘি এবার হিসহিসিয়ে উঠল,

— এখান থেকে যাও, নয়তো তোমাকে খেয়ে ফেলব!

তাহসিনের চোখেমুখে প্রশান্তি ভেসে উঠল, কিন্তু গলার থমথমে ভাব কমাল না। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

— আপনি সেদিন বিয়ের আসর থেকে না পালালে আজ এসব দেখতে হতো না।

— মা! ওকে এখান থেকে যেতে বলো তো!

কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা নূরজাহান চৌধুরী শক্ত চোখে দুজনকে লক্ষ্য করছিলেন। উনার মাথা কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছে না হুটহাট তাদের মধ্যে এমন কেন হয়? সাধারণ এক সামান্য অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে তাহসিন কেন দীঘির সাথে এভাবে কথা বলে? আর দীঘিই বা কেন এতটা ব্যাকুল হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়? ঠিক তখনই থানার করিডোর কাঁপিয়ে ড্রামাটিক কণ্ঠ ভেসে এল,

— বেইবি! কার এত বড় সাহস তোমাকে লকআপে ঢুকিয়েছে? কোথায় সেই পুলিশ অফিসার?

রেহান খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে দৌড়ে আসতে আসতে চিৎকার করছিল। তাহসিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তার পাশ গলে দীঘির লকআপের দিকে যেতে চাইল সে। কিন্তু তাহসিনের কাছাকাছি এসে তাকে ক্রস করার মুহূর্তেই হঠাৎ রেহান সজোরে হোঁচট খায়। সামলাতে না পেরে সোজা গিয়ে আছাড় খেল লকআপের শক্ত লোহার গরাদের গায়ে!

— আ”হহহ! বেইবি, ম”রে গেলাম!

রেহান কপাল চেপে ধরে বিকট শব্দে কোঁকাতে লাগল।

তাহসিন মুহূর্তের মধ্যে অতি-উৎসাহী হয়ে এগিয়ে গিয়ে রেহানকে ধরে দাঁড় করাল, যেন খুব চিন্তিত সে! কপালে হাত দিয়ে বলল,

— আরে! দেখে হাঁটবেন তো! কপালটাই তো পুরো ফুলে গেল…

ওপাশ থেকে দীঘি একজোড়া গোল গোল চোখে স্তব্ধ হয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে খুব স্পষ্ট দেখেছে—রেহান আসার সময় তাহসিন নিজেই নিজের পা-টা সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে রেহানকে ফেলে দিয়েছে, আর এখন কী সুন্দর নির্দোষ সেজে সহানুভূতি দেখাচ্ছে!

এদিকে পুরুষদের লকআপ থেকে মেহরাজ বারবার গরাদে হাত চাপড়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কনস্টেবলকে চিৎকার করে ডাকছে। তার ঠোঁটের কোণে তাজা র ক্ত। আলতাফ সাহেবের উপরের জেদ বারিশ মেহরাজের উপর তুলেছে। চঞ্চল সাহেব র ফরহাদ সাহেব না থাকলে পুরো মেরেই ফেলত ওকে। একচোট দিয়ে চুপচাপ বসে আছে আবার কখন শুরু করবে কে জানে!

— আমাকে কী বের করবেন না? বের করে অন্য লকআপে রাখেন। মা”র খেয়ে ম”রে গেলে কী এর দায় আপনারা নেবেন?

মেহরাজ আবারে চেঁচিয়ে উঠল। বারিশ দেওয়ালে হেলান দিয়ে নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তখন থেকে মেহরাজের চেঁচামেচিতে এবার বলে উঠল,

— বাবা, ও যদি আর একটা শব্দ করে তাহলে কিন্তু তোমার ছেলে খু”নের দায়ে ফাঁ”সিতে ঝুলবে!

মেহরাজ বিস্মিত চোখে বারিশের দিকে তাকাল,

— তুই ইনডিরেক্টলি আমাকে মা”র্ডার করার হু”মকি দিলি?

— আমি সরাসরিই দিয়েছি।

— কেমন বন্ধু তুই আমার?

বারিশ চোয়াল শক্ত করে ধেঁয়ে এসে মেহরাজের চোয়ালে আরেকটা ঘু”সি মেরে বলল,

— তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।

চঞ্চল সাহেব এবং ফরহাদ দুজনেই এগিয়ে এসে বারিশকে দ্বিতীয় বারের মতো থামাল। চঞ্চল শেহরিয়ার বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিচ্ছে, কেননা বারিশের সঙ্গে আলতাফ চৌধুরী সম্পর্ক বারিশ যখন ছোট, তখন থেকেই খারাপ। অসম্মান করার ক্ষেত্রে বারিশের সবথেকে পছন্দের ব্যক্তি ছিলেন আলতাফ সাহেব। এতটাই যে তাকে শিক্ষকতাই ছেড়ে দিতে হয়েছে। সেখানে সেই ছেলেকেই মেয়ের জামাই হিসেবে সারাজীবন সহ্য করবে কীভাবে, যেখানে বারিশ এখনো তাকে অসম্মান করে! ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল চঞ্চল সাহেব। এই ছেলের জন্য তাকে আজ নিয়ে দ্বিতীয়বার লকআপে আসতে হলো।

—— লেখিকার মেইন পেজ-- Ayesha Rin—রিন

— দরজা খোলো, ঝিলমিল! ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে! আমি কিন্তু এবার সত্যিই দরজা ভাঙব!

আলতাফ সাহেব শেষবারের মতো দরজায় চাপড় মেরে হুংকার দিলেন। তাঁর কন্ঠে অধৈর্য আর চরম কঠোরতা। ভিতর থেকে ঝিলমিলের কান্নাজড়ানো গলা ভেসে এল,

— সময় হয়ে গেছে তো একা চলে যাও! আমি যাব না মানে যাব না!

— তুমি যাবে তো যাবেই, তোমার বাপ-মা সবাই যাবে! কথা না বাড়িয়ে দরজা খোলো বলছি!

আলতাফ সাহেবের গলার রগ ফুলে উঠল। ঝিলমিল দরজার ওপাশ থেকে চি”ৎকার করে উঠে বলল,

— আমি যাব না! দরজাও খুলব না! তুমি যদি ধা”ক্কা দিয়ে দরজা ভাঙো, আমি ওয়াশরুমে ঢুকে লক করব। সেটাও যদি ভাঙো, আমি বেলকনি থেকে সোজা নিচে লাফ দেব!

কথাটা বলেই ঝিলমিল একবার থমকে বেলকনির দিকে তাকাল। জানালার ওপাশে পেয়ারা গাছটা কাটিয়ে ফেলেছেন আলতাফ সাহেব। নাহলে এই গাছ বেয়ে কতবার নিচে নেমে গেছে সে!

আলতাফ সাহেবের কণ্ঠ এবার কিছুটা নরম।

— কেন পাগলামি করছ, মামণি? আমি কি তোমার খারাপ চাই? একবার লন্ডনে পা দিয়ে দেখো, নতুন শহরের আলোয় এসব ছাইপাশ সব ভুলে যাবে। একটা নতুন, সুন্দর জীবন শুরু করবে।

বাবার মুখে নতুন জীবন এর কথা শুনে বুকের ভেতরটা য”ন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে গেল কিশোরীর। বারিশকে ছাড়া অন্য কোনো জীবনের অস্তিত্বই তো সে কল্পনা করতে পারে না! চোখের পানি সামলে নিল ঝিলমিল। কন্ঠ এবার খুব ব্য”থিত,

— কেমন বাবা তুমি? নিজের স্বামীকে ভুলে আমাকে নতুন জীবন শুরু করতে বলছ?

আলতাফ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে থমথমে গলায় জবাব দিলেন,

— মা রে, তোর ওই স্বামী ভালো মানুষ হলে আমি কখনোই তোর সাথে এমন কঠোর হতাম না! ও তোর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে দ্বিধা করবে না। আজ আ”ঘাত পাবি, কাঁদবি; কিন্তু কাল বুঝতে পারবি তোর বাবা তোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল।

— ‘আমি ধ্বংস হয়ে গেছি বাবা, তুমি ধরে নাও সে আমাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেছে!’ কান্নার তোড়ে শব্দগুলো আটকে আটকে এলো মেয়েটার। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসল।

— ‘যে ধ্বংসের মাঝে উনি আছে, আমি সেই ধ্বংসের ভেতরেই বাঁচতে চাই। আমায় দয়া করো, প্লিজ ওভাবে আমার থেকে আমার স্বামীকে কেড়ে নিয়ো না। তুমি আমাকে অন্য কোথাও পাঠাতে পারবে না... আমি মরে গেলেও না!’

— ভালোবাসা না মামণি এটা, এটাকে বলে অন্ধ আবেগ! আবেগে পরে বলছো এসব। বারিশ তোকে ভালোবেসে নিজের কাছে রাখেনি, রেখেছে একটা বন্দী পাখির মতো খাঁচায় আটকে রাখতে! তোকে নিয়ে আমার হাজারটা স্বপ্ন ঝিলমিল! তোকে মানুষের মতো মানুষ করব, স্বাধীন একটা জীবন দেব। সেই সব স্বপ্ন আমি ওই বদমাশটার কাছে শেষ হয়ে যেতে দেব না। তোকে আমি টেনেহিঁচড়ে হলেও এই বন্দীদশা থেকে বের করে নিয়ে যাব।

— আমি বন্দী নেই, আব্বু! আমি ভালো আছি তার সাথে!

কিশোরীর গলায় তীব্র জেদ। আলতাফ সাহেব দরজায় হাত রেখে কঠোর গলায় বুঝিয়ে বললেন,

— এসব সাময়িক ভালো লাগা! বয়সের ভুলের কারণে এখন এটাকে ভালোবাসা বা শান্তি মনে হচ্ছে। কিন্তু সারাজীবন কি এই দমবন্ধ করা অনিশ্চয়তা আর সমাজের চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জীবন ভালো লাগবে? আজ তুই ভালোবাসার মোহে অন্ধ হয়ে আছিস, কিন্তু যেদিন এই নেশা কাটবে, সেদিন বুঝবি তোর এই ভালো থাকার চাদর কতটা কাঁচের মতো ভঙ্গুর ছিল। আমি তোকে এই ক্ষণস্থায়ী মোহের খাঁচায় সারাজীবন পচে ম”রতে দিতে পারি না!

— থামো প্লিজ! আমি কোথাও যাব না। দরকার হয় এই রুমে পচে মরব তবু যাব না।

ঝিলমিলের কণ্ঠস্বর এবার একেবারে বুজে এল। কান্নার তোড়ে গলার স্বর বসে গেছে; সারাটা রাত দরজার পাশে মেঝেতে ঠেস দিয়ে একভাবে কেঁদে কেটে পার করেছে সে। ভোরে আলতাফ সাহেব ডাকতে এসে দেখেন ঘর ভেতর থেকে লক করা। বেশ কিছুক্ষণ নরম-কঠিন সুরে বুঝিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে এবার আলতাফ সাহেব সেখান থেকে চলে গেলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অযথা সময় নষ্ট না করে বারিশের এবং নিজের পরিবারকে যেভাবেই হোক থানা থেকে ছাড়া পাওয়া আটকানোই তাঁর এখন এক নম্বর কাজ। লকআপ থেকে ওরা একবার বেরিয়ে আসা মানেই ঝিলমিলকে নিয়ে লন্ডনে ওড়ার সব রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। আলতাফ সাহেবকে উকিল নিয়ে তড়িৎ গতিতে আদালতের দিকে ছুটে গেল।

----------

ইতোমধ্যেই একে একে তিন-তিনটা ফ্লাইট ক্যান্সেল করতে হয়েছে। আইনি ঝামেলার প্যাঁচে পড়ে দু-দুটো দিন এভাবেই পার হয়ে গেল। অবশেষে আজ সন্ধ্যার ফ্লাইটে নতুন করে টিকিট কেটেছেন আলতাফ সাহেব।

আদালতের চত্বরে তুমুল লড়াই। তাহসিনের ভাড়া করা আইনজীবী কিংবা শেহরিয়ার পরিবারের নেওয়া ব্যারিস্টার, কেউই আলতাফ সাহেবের উকিলের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। আলতাফ সাহেবের অভিজ্ঞ উকিল কোর্টে দাঁড়িয়ে একের পর এক যুক্তির প্যাঁচ ছুড়ে দিচ্ছিলেন।

বা”ল্য”বিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ধারায় মামলা হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বাদীপক্ষ অর্থাৎ আলতাফ সাহেবের আইনি দল কঠোরভাবে দাবি করছে যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির সম্মতি ব্যতিরেকে বে”আ”ইনিভাবে এই বিয়ে সম্পন্ন করার পেছনে দুই পরিবারের সরাসরি মদদ ছিল। আইন অনুযায়ী, অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা এবং মেয়েটির নিরাপত্তার বিষয়টি যতক্ষণ না পূর্ণ তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ এমন সংবেদনশীল ধারায় জামিন পাওয়া অতটা সহজ ছিল না। অন্তত একদিনে তো না-ই। আলতাফ সাহেবের উকিল সেই আইনি জটিলতাকেই সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে কাল থেকে সময় গড়াচ্ছিলেন।

কিন্তু আলতাফ সাহেবও খুব ভালো করেই জানেন, বেশি সময় এদেরকে আটকে রাখা যাবে না। টাকার গরম আর শেহরিয়ারদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবে আজ বিকেলের মধ্যেই ওদের জামিন হয়ে যাওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে।

হাতে আর সময় নেই। তাই আজ ঝিলমিলের দরজা ভাঙতে সঙ্গে দুজন বলিষ্ঠ লোক নিয়ে তিনি সোজা ঝিলমিলের বন্ধ দরজার সামনে এসেছে। দরজায় কুড়াল চালিয়ে হলেও ঝিলমিলকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলবে তিনি।

আলতাফ সাহেব সঙ্গের লোক দুটিকে ইশারা করতেই একজন কাঠের দরজায় সজোরে লা”থি বসাল। বিকট শব্দে তিন নম্বর লাথিতে দরজাটা ভেঙে চুরমার হয়ে ভেতরে ছিটকে পড়ল।

দরজা খোলামাত্রই আলতাফ সাহেব হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলেন। ঝিলমিল ঘরের কোণে খাটের একপাশে জড়সড় হয়ে গভীর ঘুমে ছিল তখন। দরজা ভাঙার শব্দে ঝিলমিল ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল সে। চোখ দুটো রক্তজবা ফুলের মতো লাল তার। আলতাফ সাহেব এক পা এগিয়ে ঝিলমিলের চেহারার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। তিনটে দিন ধরে একফোঁটা পানি পর্যন্ত মুখে তোলেনি মেয়েটা। গোলগাল, উজ্জ্বল মুখটা এই কয়েকটা দিনে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, চোখের নিচে গাঢ় কালচে ছোপ, মনে হচ্ছিল কোনো কঠিন অসুখ এসে নিমেষেই তাকে চুষে নিঃশেষ করে ফেলেছে।

কিন্তু আলতাফ সাহেব নিজের এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিলেন না। সময় বড্ড কম। হাত ঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এলেন তিনি।

— ওঠো, ঝিলমিল! সোজা গাড়িতে গিয়ে বসবে!

ঝিলমিল ছটফট করে উঠল। কিন্তু তার গায়ে একফোটা শক্তি নেই।

— না... বাবা, দয়া করো! আমি যাব না... আমি ম”রে যাব তবু আমি যাব না!

ঝিলমিল খাট আঁকড়ে ধরে পেছানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আলতাফ সাহেব কোনো রকম অনুনয় শুনলেন না। নির্দয়ভাবে তিনি মেয়ের শুকনো হাতটা আঁকড়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করালেন।

— আমার সাথে কোনো তর্ক করবে না! অনেক হয়েছে! চলো বলছি।

ঝিলমিল অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ছটফট করতে লাগল, পা দুটো তার অবশ হয়ে আসছে, শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই প্রতিরোধ করার। আলতাফ সাহেব জোর করেই প্রায় টেনে-হিঁচড়ে তাকে ঘর থেকে বের করে বসার ঘরের দিকে নিয়ে এল।

ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ঝিলমিলের মা নাজমা বেগম অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন, জিহান তার কোলে। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল নিঃশব্দে। আলতাফ সাহেব তাঁর দিকে ফিরে কর্কশ গলায় গর্জে উঠলেন,

— কী দেখছ হাঁ করে? ওভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে ওঠো।

— মেয়েটাকে এভাবে কষ্ট না দিলেও পারতে! সুখি বানাতে গিয়ে চিরদুঃখি করে দিচ্ছো! পুরো একটা পরিবার তুমি নষ্ট করে দিচ্ছো!

স্ত্রীর কথায় চরম বিরক্ত হলেন আলতাফ সাহেব।

— থামবে তুমি? গাড়িতে গিয়ে বসো নাহলে গায়ে হাত উঠবে আমার!

স্ত্রীর দিকে আর এক মুহূর্ত না তাকিয়ে, আধমরা ঝিলমিলকে পাঁজাকোলা করে ধরে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন আলতাফ সাহেব।

----

আলতাফ সাহেবের আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে। আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু আইনি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা আর রিলিজ অর্ডার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেল। থানা থেকে এক এক করে ছাড়া পেল বারিশ, তার পরিবার এবং চৌধুরী পরিবারের সবাই। দুদিনের ধকল, ভ্যাপসা গরম আর অবমাননার ছাপ প্রত্যেকের মুখে স্পষ্ট। সবাই যখন থানা চত্বরে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে সেখানে হাজির হলো বারিশদের বাড়ির কাজের মেয়ে টুম্পা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— চৌধুরী ভিলার আলতাফ সাহেব ঝিলমিল ম্যাডামকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন! আমি ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে দেখি, মেয়েটাকে জোর করে গাড়িতে তুলছেন। ম্যাডাম মনে হয় খুব অসুস্থ, বারবার বলছিলেন ‘আমি যাব না’। তারপর ছুটে গিয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ওনারা নাকি এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছেন!

কথাটার প্রথম অর্ধেক দাঁড়িয়ে শুনলেও বাকিটুকু আর দাঁড়িয়ে শোনার ধৈর্য হলো না বারিশের। এয়ারপোর্ট শব্দটা কানে আসামাত্রই আগুন ধরে গেল তার র”ক্তে।

নূরজাহান চৌধুরীর থমকে আছেন। এখন বুঝতে পারলেন, আলতাফ কেন নিজের পরিবারের নামেও আইনি ফাঁ”দ পেতেছিলেন! শুধু বারিশকে নয়, পুরো পরিবারকেই লকআপে বন্দি রেখে সময় কিনে ঝিলমিলকে চিরতরে দেশছাড়া করার নিখুঁত ছক কেটেছিলেন তিনি! তার ছেলে তবে তার চেয়েও চমৎকার খেলোয়ার!

ওদিকে মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল ঝর্ণা বেগমের। মনে মনে আলতাফ সাহেবের জন্য দোয়া পাঠাতে পাঠাতে তিনি তড়িঘড়ি করে ছেলের পেছনে ছুটলেন।

— তরঙ্গ, তুমি কোথাও যাবে না! যেখানে খুশি নিয়ে যাক ওই অলক্ষ্মীকে। ওই মেয়ের জন্যই তো আজ আমাদের দু-দুটা রাত লকআপের পচা ভাত খেতে হয়েছে!

র”ক্তচক্ষু নিয়ে পেছনে ফিরে মায়ের দিকে তাকাল যুবক,

— খবরদার! আমার স্ত্রীকে অলক্ষ্মী বলবে না! অলক্ষ্মী তুমি! তুমি অলক্ষ্মী! কেন অলক্ষ্মী তা তুমি খুব ভালো করেই জানো! যাকে অলক্ষ্মী বলছ, আমার জীবন থেকে সে যদি সত্যিই হারিয়ে যায়, তবে আমার জীবনে শান্তি আনার মতো আর কোনো লক্ষ্মী থাকবে না! গুড়িয়ে দেব সব! হ্যাঁ, ঠিক আগের মতো!

বারিশ মায়ের কোনো কথাই কানে তুলল না। গিয়ে থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়িতে গিয়ে বসল। কারণ থানায় তার কোনো গাড়ি নেই। ড্রাইভারকে নামিয়ে দিয়ে নিজেই স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ফুল এক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে তীব্র গতিতে এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।

-----

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর----

টার্মিনালের কোলাহলের মাঝে ঝিলমিলকে প্রায় শূন্যে ভাসিয়ে টেনে নিয়ে চলছিলেন আলতাফ সাহেব। তিনদিনের অনাহার আর টানা কান্নার ধকলে এয়ারপোর্টে আসতে আসতেই হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। ফ্লাইটের সময় আর মাত্র ২০ মিনিট! তিনি কোনোমতে লোক দুটোকে দিয়ে ঝিলমিলকে টেনে একটা হুইলচেয়ারে বসালেন। ঘাড়টা সোজা করে চোখ দুটোয় চশমা দিয়ে ঢেকে ইমিগ্রেশনের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে গেলেন। কিন্তু আসল বিপত্তি বাঁধল ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং গেটের ঠিক মুখে। কড়া নজর এড়ানো সম্ভব হলো না ইমিগ্রেশন পুলিশ আর এয়ারলাইন্সের অফিসারদের। কিশোরীর নিস্পন্দ দেহ আর পাংশু মুখ দেখে গ্রাউন্ড স্টাফরা হুইলচেয়ার আটকে দিল,

— ওয়েট স্যার! প্যাসেঞ্জার তো সেন্সলেস! ওনাকে এভাবে বোর্ডিং পাস দেওয়া যাবে না। আগে এয়ারপোর্ট মেডিকেল সেন্টারে নিন, ফিজিশিয়ান যদি 'ফিট টু ফ্লাই' সার্টিফিকেট দেন, তবেই বিমানে উঠবেন।

— আরে ভাই, ও আমার মেয়ে! বিমানে চড়তে ভয় পায় বলে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে, তাই ঘুমাচ্ছে! লন্ডন পৌঁছানো আমাদের খুব জরুরি, ক্লিয়ারেন্স লেটার পরে দিচ্ছি, রাস্তা ছাড়ুন!

আলতাফ সাহেব রাগে আর ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

— অসম্ভব স্যার! আনকনশাস প্যাসেঞ্জার বিমানে তোলা আইনি অ”পরাধ। সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটির কড়া নিয়ম আছে।

আলতাফ সাহেব ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, টাকার জোর খাটিয়ে অফিসারদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলেন। অফিসারদের চোখে সন্দেহ স্পষ্ট হলেও, আলতাফ সাহেবের উগ্র রূপ, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, বিজনেস ক্লাসের স্পেশাল প্রটোকলের সামনে কেউ আর বেশি ঘাটাতে সাহস পেল না। এর অন্য একটি কারণ হলো সাথে একজন মহিলা এবং তার কোলে থাকা চার বছরের বাচ্চা।

ঝিলমিলকে পাঁজাকোলা করে বোর্ডের সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে সরাসরি বিমানের ফার্স্ট ক্লাসের সিটে এনে ফেললেন। সিটবেল্ট বেঁধে দেওয়ার সময় ঝিলমিলের অবস্থা দেখে বুকের ভেতর ধক করে উঠলেও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এয়ারহোস্টেসরা সন্দিগ্ধ চোখে এগিয়ে আসতে চাইলে আলতাফ সাহেব চোখ পাকিয়ে কর্কশ গলায় তাদের সরিয়ে দেয়,

— শি ইজ জাস্ট স্লিপিং! ডোন্ট ডিস্টার্ব হার!

কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানের ভারী দরজায় সিল পড়ে গেল। প্রকাণ্ড বোয়িং বিমানটির ইঞ্জিন বিকট শব্দে গর্জে উঠল। রানওয়ে ধরে যখন প্লেনটা গতি নিল, তখন সিটের ওপর ঝিলমিলের অবশ দেহটা জড়পুতুলের মতো ঢলে পড়ে আছে।

সন্ধার ঝাপসা আলোয় ঢাকা-এয়ারপোর্ট হাইওয়েতে পুলিশের গাড়িটা উন্মাদের মতো গতি বাড়িয়ে ছুটছে। স্টিয়ারিং হুইল দুটো হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে বারিশ, হাত দুটো ঠকঠক করে কাঁপছে। বাষ্পীভূত রাগে সামনের রাস্তাটা বারেবারে ঝাপসা হয়ে আসছে। অ্যাক্সিলারেটরে পায়ের চাপ শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বারিশ দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্রোশে একটার পর একটা গালি উগরে দিচ্ছে,

— ইউ ব্ল্যাডি বা”স্টার্ড! ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট আই এম গোয়িং টু ডু টু ইউ! আই উইল ডে”স্ট্রয় ইউ…আই উইল মেক ইউ পে ফর এভরি সিঙ্গল ড্রপ অফ হার টিয়ার্স!

গাড়ির গতি তখন প্রতি ঘণ্টায় একশো কুড়ি কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। ড্যাশবোর্ডের সমস্ত কাচ কাঁপিয়ে দিচ্ছে বাতাসের শনশন শব্দ। এয়ারপোর্টের দিকে ওঠার ফ্লাইওভারের র‍্যাম্পটা আর মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে। বারিশের চোখের ওপর তখন র”ক্তের এক বি”ষাক্ত লাল পর্দা নেমে এসেছে। ধমনীতে মাত্রাতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিনের তোড়ে তার নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দই যেন কানফাটিয়ে দিচ্ছিল। তখনই ঘটে গেল বিপর্যয়টি। ফ্লাইওভারের মুখের সিগন্যালে একটা বিশালাকার লরি হুট করে তার লেন পরিবর্তন করে ডান দিকে চেপে এল। স্বাভাবিক অবস্থায় ব্রেক চেপে বা স্টিয়ারিং সামান্য ঘুরিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত, কিন্তু বারিশের অবশ আর প্রতিক্রিয়াহীন মস্তিষ্ক তখন অনেক দূরে। ঝিলমিলের সেই যন্ত্রণাদগ্ধ মুখটার কাছে। যখন সামনে বিশাল লোহার বডিটা ভেসে উঠল, তখন আর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।

অজান্তেই বড় হয়ে গেল বারিশের চোখদুটো। শেষ মুহূর্তে সর্বশক্তি দিয়ে সে ব্রেকের ওপর পা চেপে ধরে উন্মাদের মতো স্টিয়ারিংটা বাঁ দিকে ঘোরাতে চাইল। কিন্তু অত তীব্র গতির একটা গাড়ির পক্ষে তখন পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মানা অসম্ভব। প্রথমে গাড়ির চাকা দুটো বিকট শব্দে রাস্তায় ঘর্ষণ খেয়ে কালো ধোঁয়া ছাড়ল। পরক্ষণেই গাড়ির সামনের বাম দিকটা লরির পেছনে সজোরে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে উঠে গেল। এক লহমায় কানফাটানো ধাতব ভাঙার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল পুরো হাইওয়েতে। কাচের উইন্ডশিল্ড সহ সামনের সমস্ত গ্লাস মুহূর্তে হাজার হাজার চূর্ণ-বিচূর্ণ টুকরো হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মানুষটার শরীর ও মুখের ওপর। গাড়ির দরজাটা অনিয়ন্ত্রিত ধাক্কায় আলগা হয়ে খুলে গিয়ে, গতি ও ঘূর্ণনের তোড়ে স্টিয়ারিং ছেড়ে বারিশের নিস্পন্দ শরীরটা সোজা উইন্ডশিল্ড ও দরজা ভেদ করে শূন্যে ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল শক্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর! কয়েক মিটার ঘষে গিয়ে বারিশের শরীরটা রাস্তার ওপর নিথর হয়ে স্থির হলো।

ধাক্কার চোটে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুবার শূন্যে উল্টে গিয়ে ডিভাইডারের আইল্যান্ড আর কংক্রিটের ল্যাম্পপোস্টের ওপর আছড়ে পড়ল। সন্ধার আকাশ চিরে ল্যাম্পপোস্টটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল রাস্তায়।

আশেপাশের সব পথচারী আর চলন্ত গাড়ির চালকরা আতঙ্কে কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠছে,

— ইয়া আল্লাহ! কী মারাত্মক এ”ক্সিডেন্ট!

র”ক্তে ভেজা পিচের ওপর পড়ে থাকা বারিশের কপাল আর মাথার গভীর ক্ষত থেকে তাজা লাল র”ক্ত অবিরল ধারায় ঝরে পড়ছে। কানের ভেতর একটা টানা প্রতিধ্বনি তৈরি হলো 'রিনরিন' নিঃশব্দ সুর। পুরো শরীরের স্নায়ুগুলো এক এক করে নিভে আসতে লাগল মানুষটার।

কানের রগ বেয়ে গড়িয়ে পড়া তাজা গরম র”ক্তটা তার ঠোঁটের কোণে এসে জমা হচ্ছিল। সবকিছু যখন গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই অন্তিম মুহূর্তে ক্ষীনভাবে একবার নড়ে উঠল রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বারিশের ডান হাতটা। র”ক্তে ভেজা চোখের পাতা দুটো জীবন আর মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো একটুখানি ফাঁক হলো। তাকাল আকাশের দিকে। ফ্লাইওভারের ঠিক ওপর দিয়ে, সন্ধার ধূসর আকাশ চিরে বিশাল এক লন্ডনগামী বোয়িং বিমান গর্জন তুলে অসীম শূন্যতার দিকে উঁকি দিচ্ছে। ডানা মেলে সেটি অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে তার স্ত্রীকে চিরতরে সীমানার ওপারে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

বিমানটা ততক্ষণে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। কানের পাশে মানুষের চিৎকার আর কোলাহল যেন অনেক দূরের এক অস্পষ্ট ধ্বনি হয়ে ভেসে আসছে। সাথে ভেসে আসছে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ। রাস্তায় পড়ে থাকা হেরে যাওয়া যুবকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের আর আত্মধিক্কারের হাসি। সে যেন নিজেকেই নিজে উপহাস করছে---তার সমস্ত ক্ষমতা, আক্রোশ আর ভালোবাসার ব্যর্থতার ওপর।

চোখের সামনে বিমানের নিওন আলোটা আকাশে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বারিশ ফিসফিস করে শুধু কয়েকটা বাক্যই উচ্চারণ করতে পারল,

— জাহান... তুমি আমার! আমি তোমাকে ওয়াদা করেছিলাম না? ওয়াদা করেছিলাম ফিরিয়ে আনব... আমি আমার ওয়াদা রাখব জাহান! তুমি শুধু আমার জাহান... তুমি আমার!

ওদিকে বিমানের ভেতর অবচেতন ঝিলমিল জানতেই পারল না, যে এয়ারপোর্ট চত্বরের পিচঢালা রাস্তার ওপর তারই অর্ধাঙ্গ, তার সর্বস্ব, তাকে চিরতরে হারানোর যন্ত্রণায় ছটফট করছে। নিজের তাজা রক্তের সাগরে ভেসে গিয়ে জীবনের হয়তো শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করতে চলেছে শুধু তার নাম জপতে জপতে।

কিশোরী ঢাকা শহরটার মেঘলা আকাশ চিরে লন্ডনের উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে গেল। নিচে শুধু ধুলো আর র”ক্তের মধ্যে পড়ে রইল পরাজিত বারিশ। আকাশ জুড়ে রয়ে গেল এক নিস্তব্ধ, হাহাকার ভরা শূন্যতা।

কয়েকদিন ধরে আপনাদের রেসপন্স একদম কম। তাই এবার দেরিতে দিয়েছি। এভাবে চললে দেরিতেই দেব, অযথা নিজের উপর প্রেশার দিয়ে লাভ নেই। আশা করছি সকলে লাইক কমেন্ট করবেন, তাহলে আমিও দ্রুতই পর্ব দেব।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন