#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে
#আয়েশা_রিন
#পর্ব৫৪
[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন]
চৌধুরী ভিলা আবারও উৎসবমুখর চাঞ্চল্যে মুখরিত। দীঘির তৃতীয় দফার এই বিয়ের আয়োজনে চারদিক আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। যদিও এবারের সব আয়োজনই বেশ ঘরোয়া ও সংক্ষিপ্ত পরিসরে, তবুও কাজের কোনো কমতি নেই। সকাল থেকেই কাজের লোকজনের ব্যস্ততা, হাঁকডাক আর থালাবাসনের খটখট শব্দে বাড়িটা মেতে আছে।
কিন্তু এই হট্টগোল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ঘরের ভেতর স্তব্ধ হয়ে বসে আছে ইরান। বিছানার এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে সে। এত কোলাহল সত্ত্বেও ঘর থেকে বাইরে পা ফেলার সাহস হচ্ছে না তার। বুকের ভেতরে কেমন যেন অজানা আতঙ্ক আর চাপা হুল্লোড় থরথর করে কাঁপছে। এ যেন এক নিঝুম আতঙ্ক, যা তাকে ভেতর থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
ঘরের অন্যপ্রান্তে সোফায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মেহরাজ। লোকটা বিন্দুমাত্র তাড়া ছাড়াই একদম আরামে ঘুমিয়ে চলেছে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ইরানের। বিয়ের আগে মেহরাজের সঙ্গে সে যেভাবে মন খুলে কথা বলত, বিনা দ্বিধায় ঝগড়া করত বা হাসাহাসি করত আজ তার লেশমাত্রও অবশিষ্ট নেই। ওই মানুষটার সামনে এখন গেলেই তার সমস্ত স্বাভাবিকতা কেমন যেন কুঁকড়ে যায়। অস্বস্তি, দ্বিধা আর অব্যক্ত ভয় কাজ করে। দুজনে যেন পরস্পরের অচেনা। অপ্রয়োজনে একটি বর্ণও খরচ করে না তারা।
বাইরের লোকজনের আনাগোনা আর হাঁকডাকে বাড়িটা সরগরম থাকলেও, ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে। কাজের মানুষেরা বেশ কয়েকবার এসে ডেকে গেলেও মেহরাজের ওঠার কোনো নামগন্ধ নেই। ইরানও বিছানার এককোণে তখন থেকে চুপচাপ বসে আছে, সেও ডাকেনি। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা গড়িয়ে বেলা এখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। আজ তো বোনের বিয়ে, এভাবে কি আর পড়ে থাকা চলে? বাড়ির লোকজনের চোখে পড়ার আগেই তাকে ডেকে তোলা দরকার।
অগত্যা দ্বিধা ঝেড়ে বিছানা থেকে পা নামাল ইরান। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সোফার দিকে। একটু ঝুঁকে হালকা কাশি এনে সে আলতো সুরে ডাকল,
“এই যে, উঠুন! বাইরে থেকে বারবার লোক ডাকছে। আজ আপনার বোনের বিয়ে, এভাবে কাজ ফেলে আর কতক্ষণ ঘুমাবেন?”
মেহরাজের চোখের পাতা দুটো সামান্য কেঁপে উঠলেও চোখ মেলল না সে। ইরান আরেকটু ঝুঁকে এল। মেহরাজের চওড়া কাঁধের ওপর হাত রেখে সে আবার একটু শক্ত গলায় ডাকল,
“উঠে পড়ুন বলছি! একটু আগেই কয়েকজন এসে ডেকে গেছে। আর একটু দেরি করলে আপনার আম্মা এসে রাগারাগী শুরু করে দেবেন!”
এবারে ক্লান্ত, ভারী চোখের পাতা দুটো ধীরেসুস্থে মেলে মেহরাজ তাকাল ইরানের দিকে। তাকানোর ভঙ্গিটা কেমন যেন শিহরণ জাগাল ইরানের দেহে। সে কিছুটা সরে আসে। পরক্ষণেই কানে ভেসে আসে মেহরাজের ঘুমজড়ানো, ভারী গলা,
“রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি, একটু ঘুমাতে দাও…”
ইরান ভ্রু কুঁচকায়,
“কেন ঘুমাননি?”
“ঘুম আসে না…” নিরাসক্ত গলায় উত্তর দিল মেহরাজ।
“কেন?”
মেহরাজ ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত হাসি ফুটিয়ে নিচু স্বরে জবাব দিল,
“তোমার জন্য।”
ইরান যেন ওই ভারী বাক্যের ওজন জেনেশুনেই এড়িয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা আলোড়নটাকে কোনোমতে চেপে ধরে সে আড়ষ্ট গলায় স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
“কী বললেন?”
মেহরাজের মুখ থেকে কথাটার রেশ মিলিয়ে যেতেই সেও যেন একটা ঝটকা খেল। ঘোর থেকে বের হয়ে সে হড়বড় করে সোফায় সোজা হয়ে বসে দেয়ালের বড় ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার চোখের পলক আটকে যায়। বলল,
“আমাকে এতক্ষণ ডাকোনি কেন? ওহ মাই গড! এগারোটা বেজে গিয়েছে! আজ আর আম্মা আমাকে আস্ত রাখবে না।”
ভ্রুরু কুঁচকে, ঠান্ডা গলায় জবাব দিল ইরান,
“আমি ডাকলাম বলেই তো শেষমেশ আপনার ঘুম ভাঙল, নয়তো দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত।”
মেহরাজ কপালে আঙুল চেপে অধৈর্য গলায় বলে উঠল,
“অন্তত আরও আধ ঘণ্টা আগে ডাকা উচিত ছিল!”
বলেই তোয়ালেটা কাঁধে জড়িয়ে তড়িঘড়ি করে সে একছুটে ওয়াশরুমের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
—
বাসার সকলেই যে যার কাজে ভীষণ ব্যস্ত। আর ঝিলমিল ব্যস্ত নিজের দুই বাচ্চা নিয়ে। বয়সের তুলনায় একটু বেশিই দায়িত্ব চেপে বসেছে তার মাথায়। বারিশও পাশে নেই। নেই অবশ্য ঝিলমিলের কারণেই। ঝিলমিলই লোকটাকে জায়গা দেয়নি। গতকাল রাতে যখন ঝিলমিলের সঙ্গে থাকতে এসেছিল, তখন ঝিলমিল নিজের মায়ের কাছে থাকবে বলে জানিয়ে দেয় সে। নাজমা বেগম সামনে থাকায় বারিশও কিছু বলতে না পেরে চলে যায়। তারপর থেকে এখন অব্দি মানুষটার কোনো খোঁজ নেই।
বাচ্চা দুটো এখনও ঘুমে, কিন্তু কখন যে আবার জেগে ওঠে হট্টগোল পাকিয়ে তুলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুটো বাচ্চা একসঙ্গে কান্না শুরু করলে ঝিলমিলের ইচ্ছে করে, তাদের না থামিয়ে সে নিজেও কেঁদে ভাসিয়ে দিক। এই দুটো মিলে তার বয়সটাকে আঠারো থেকে সোজা আটাশ বছরে নিয়ে ঠেকিয়েছে! যত রাগ হয় এখন ওই লোকটার ওপর, সব দোষ ওই বারিশের!
বাচ্চাদের ঘুমন্ত রেখেই ঝিলমিল এসে দাঁড়াল দীঘির রুমের সামনে। ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল দীঘির ব্যস্ততা। রেহানের বাসা থেকে পাঠানো বিয়ের লেহেঙ্গা, গহনা আর প্রসাধনসামগ্রী চারপাশে বিছানো। দীঘি একটা লাল-সোনালী অভিজাত লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছিল। ঝিলমিলকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীঘির মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। বলল,
“ভালো হয়েছে এসেছিস! নাউ টেল মি, আজ কোন লেহেঙ্গাটা পরা যায়? একটা তো রেহান আগেই পাঠিয়েছিল, আজ সকালে আবার এই নতুনটা পাঠাল।”
ঝিলমিল নির্বাক হয়ে ফুপির দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত লাগছে তার। সে জানে, দীঘির কথাবার্তা ও হাসি সবই কৃত্রিম।
“কাম অন, দেরি করিস না তো, একটু পরেই পার্লার থেকে মেকআপ আর্টিস্ট এসে পড়বে।” দীঘির কন্ঠে তাড়া।
“ফুপি... আমার না তোমার জন্য ভীষণ কষ্ট হয়।” না বলে থাকতে পারল না ঝিলমিল। তার আসলেই অনেক কষ্ট হচ্ছে।
“কেন রে?”
ঝিলমিল এগিয়ে এসে বিছানার কিনারায় বসল, গলায় তার এক অচেনা হাহাকার,
“আমার নাহ্... কেউ ভালোবেসে তাকে না পেলে ভেতরটা মুচড়ে যায়। আমি জানি, তুমিও ভেতরে ভেতরে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছো। তাহসিন আঙ্কেলকে কতটা ভালোবেসেছিলে তুমি! সমাজের পরোয়া না করে সেদিন বিয়ের পিঁড়ি থেকে পালিয়েছিলে। একটা সাধারণ ঘরের সন্তান জেনেও তুমি তাকে ভালোবেসেছিলে। অথচ আজ ভাগ্য দেখো, জীবন তোমাকে কোথায় এনে দাঁড় করাল! যাকে তুমি ভালোবাসো না, যার সঙ্গে তোমার হৃদয়ের কোনো যোগ নেই সেই মানুষটাকে আজ তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছো...”
“ কিন্তু সে তো আমায় ভালোবাসে!” দীঘির কন্ঠ শান্ত।
ঝিলমিল না-বোঝার মতো করে ফুপির দিকে তাকিয়ে রইল। দীঘি পূনরায় বলে,
“জীবনটা তো আর কোনো রূপকথা নয়, ঝিলমিল। ভালো থাকার জন্য নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে হেরে যাওয়ার চেয়ে, কেউ যদি তোকে নিঃশর্ত ভালোবাসার চাদরে মুড়ে রাখে সেটাই তো আলটিমেটলি অনেক বড় পাওয়া, তাই না?”
ঝিলমিল নিচু গলায় বলল,
“কিন্তু মনের গভীরে একটা আফসোস তো থেকেই যায়, ফুপি...”
দীঘি মৃদু হাসল। ধীরস্থির সুরে উত্তর দিল,
“থাকে না। নির্দিষ্ট সময়ের পর আফসোসগুলোও ফুরিয়ে যায়। জীবনে সঠিক মানুষ পাশে থাকলে অতীতের সব না-পাওয়া ঢাকা পড়ে যায়।”
ঝিলমিলের মন তবু মানছে না। সরাসরি দীঘির চোখের দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করে বসল,
“সত্যি বলো তো ফুপি... পারবে তুমি তাহসিন আঙ্কেলকে মন থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে?”
এক মুহূর্তের জন্যও থমকাল দীঘি। ভাবল কত কী! তবু ঝিলমিলে দিকে তাকিয়ে উত্তর করল সোজাসাপ্টা,
“মুছে ফেলার প্রশ্ন আসেই বা কেন? যা আমার জীবন থেকে অনেক আগেই মৃ/ত হয়ে গেছে, তার নতুন করে কোনো অস্তিত্বই নেই। অ্যান্ড সিরিয়াসলি, যার কোনো অস্তিত্বই নেই, তাকে আলাদা করে মুছে ফেলার মতো কোনো ভাবনা বা সময়ই আমার আর নেই।”
—————
সন্ধার স্লান আলোতে চৌধুরী ভিলা জ্বেলে ওঠে রঙিন সব লাইটে। চারপাশটা উৎসবের আলোড়ন তোলা প্রহরে মেতে উঠেছে। রেহানদের পরিবার থেকে সবাই চলে এসেছে ইতিমধ্যে। চারদিকে তখন এক ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। সেই হট্টগোল থেকে খানিক দূরে, ড্রয়িংরুমের এক কোণের বসে আছে ঝিলমিল আর ইরান। তাদের কোলে যমজ দুই সন্তান। সিনান রয়েছে ঝিলমিলের কোলে, আর জিনান জড়িয়ে আছে ইরানের অঙ্গে। বাড়ির বাকি সবাই অতিথিদের আপ্যায়ন আর কাজে ব্যস্ত। এই দুই তরুণী কেবল বাচ্চাদের নিয়ে একরকম কোণঠাসাই হয়ে আছে।
চারপাশের ব্যস্ততার মাঝেও কোনো এক জরুরি প্রয়োজনে এদিকে পা রাখে মেহরাজ। তখুনি, হঠাৎ করেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ইরানের ওপর। এক পলকের জন্য যেন তার হৃৎপিণ্ডের গতি থমকে গেল। কী অদ্ভুত স্নিগ্ধতা, কী অপরূপ লাবণ্য ছড়িয়ে আছে মেয়েটার সারা শরীরে! গায়ে জড়ানো নতুন মেরুণ জমকালো শাড়ি, গলায় ও কানে ঝলমল করা গহনা। সব মিলিয়ে তাকে চেনাই দায়। কালও সেজেছিল সে, কিন্তু আজকের এই রূপ যেন সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
কাজের কথা নিমিষে ভুলে গেল মেহরাজ। অদৃশ্য মোহে আচ্ছন্ন হয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল সেদিকে। ইরানের কোলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা জিনানের নরম গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে সে মায়াবী গলায় বলে উঠল,
“এই যে বোনু, কী খবর তোমার? ভালো আছো?”
মেহরাজের এমন অপ্রত্যাশিত, মাখামাখি আচরণ দেখে ইরান ও ঝিলমিল দুজনেই হতবাক! চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল তারা।
মেহরাজ তাদের অবিশ্বাসের দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে সে জিনানের গালে আরও একবার হালকা চিমটি কেটে হাসিমুখে বলে উঠল,
“এত কিউট! আজ তোমায় এত সুন্দর লাগছে যে, মন চাচ্ছে খেয়ে ফেলি!”
ইরান কপাল কুঁচকে চোখ ছোট করে তাকাল,
“বাচ্চাদের কেউ এভাবে কথা বলে?”
“বাচ্চাদের কখন বললাম?” মেহরাজ নির্লিপ্ত মুখে পাল্টা প্রশ্ন করল।
ইরান শক্ত গলায় বলল,
“তাহলে?”
ঝিলমিল চটজলদি তাদের থামিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“থাক, থামো দুজনে! চাচ্চু, একটু সামনে তাকাও, তোমার মা আছে এখানে। চুপ থাকো।” সে নিজেকেই মেহরাজের মা বলে দাবি করল।
মেহরাজ বাঁকা হাসল,
“আরে, এমন কী ভুল বললাম? যাইহোক, তোর বান্ধবীকে আজ সিনান আর জিনানের নানি-নানি লাগছে!”
ঝিলমিল আর ইরান একসঙ্গে চমকে উঠে সমস্বরে বলে উঠল,
“কীহ! নানি? নানি মানে কী!”
“আমি তোর চাচ্চু হই তো? আর এই দুটো আমার নাতী- নাতনি। আর...” মাঝখানে সে একটু থামল। তারপর ইরানের সেই কৌতূহলী ও থমকে যাওয়া মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রহস্যময় হেসে যোগ করল, “আর ও তো আমার বউ, তাহলে ও ওদের নানি হলো না?”
ঝিলমিল আর ইরান একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। এভাবে তো তারা কখনো অঙ্ক কষে দেখেনি! ইরান তো সর্বক্ষণই বাচ্চাদের মামণি, আব্বু বলে ডেকে এসেছে। নিজের সন্তানের মতো বুকে জড়িয়ে রাখছে। সে তক্ষুনি প্রতিবাদ জানিয়ে বলে উঠল,
“মোটেও না! আমি…আমি নানি হবো না। আমি ওদের খালামণি!”
মেহরাজ তার কথার পিঠে নির্লিপ্ত গলায় খেই ধরল,
“বললেই হলো? তুমি ওদের নানি, আর ভবিষ্যতে আমাদের কিছু হলে ওরা হবে ওদের খালামণি আর মামা।”
ইরান গাল ফুলিয়ে ফুঁসে উঠল,
“কিছু হলে মানে? এসব আজেবাজে কী সব ভাবছেন আপনি?”
মেহরাজ আর উত্তর না দিয়ে সরাসরি ঝিলমিলের দিকে তাকাল। তারপর অভিযোগের সুরে উদাসীনভাবে বলল,
“জাহান! তাকে বুঝিয়ে বল ও যেন এত ঢং না করে। আগে কিন্তু নিজেই আমার পিছু নিতো।”
মেহরাজের এমন প্রকাশ্য খোঁচায় ইরানের কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। সে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল, আর ঝিলমিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ ফিরিয়ে নিল।
তাদের এই কথপোকথনের মাঝেই ড্রয়িংরুমের কোলাহল ভেদ করে এগিয়ে এল রেহানের বাড়ির কিছু আত্মীয়। সঙ্গে রেহানের দুই-তিনজন তরুণী কাজিন। তাদের একজন এসেই হাসিমুখে মেহরাজের হাত ধরে টান দিয়ে বলে উঠল,
“কী ব্যাপার বলুন তো? আমাদের ফেলে এভাবে কোণায় লুকিয়ে আছেন কেন?”
মেহরাজ বিরক্তির রেখা টেনে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“জরুরি কিছু কাজ করছি। আপনারা ওপাশে গিয়ে বসুন।”
কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দা। একটু হেসে সে আবার টান দিয়ে বলে উঠল, “আরে ওদিকে চলুন না, সবাই খুঁজছে আপনাকে...”
ঝিলমিল আর ইরান বাচ্চাদের নিয়ে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পরল। মেয়েগুলোর দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়ল তাদের ওপর। অপরিচিত মুখ দেখে তাদের একজন কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল,
“ওরা কারা?”
ঝিলমিল আর ইরান সারাদিন সবার আড়ালে দূরে দূরেই ছিল, তাই অতিথিদের তাদের চেনার কথা নয়। মেহরাজ ঝিলমিলের পরিচয় দিয়ে ইরানের দিকে তাকাতেই কোত্থেকে যেন এগিয়ে এলেন নূরজাহান চৌধুরী। তাঁর মুখভঙ্গি বেশ গম্ভীর। বলে উঠলেন রুক্ষ গলায়,
“ও এই বাড়ির আশ্রিতা।”
কথাটা শোনার পর মেয়েগুলোর একজন বেশ অবাক হয়ে বলল,
“দেখে তো মনে হয় না...”
নূরজাহান চৌধুরী আরও নির্লিপ্ত কণ্ঠে যোগ করলেন,
“আমরা ওসব আলাদা করে মাপি না। ঝিলমিলের বয়সি তো, তাই ঝিলমিলের সঙ্গেই থাকে।”
‘আশ্রিতা’ শব্দটা যেন একটা ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো গিয়ে বিঁধল ইরানের বুকে। অপমানে তার সমস্ত শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। আশ্রিতা? তার সঙ্গে এই শব্দ মানায়? তার নিজের পরিবার, তার পরিচয়---সবকিছু এক নিমিষে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভেতরে জমা হওয়া অভিমানে তার বুকটা ভেঙে আসতে চাইল। সে অবচেতনভাবেই চারপাশটাতে একবার তাহসিনকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু সকাল থেকে মানুষটার টিকিটিরও দেখা নেই।
মেহরাজের চোয়াল দুটো তখন পাথরের মতো হয়ে গেছে। অতিথিদের সামনে তার স্ত্রীকে এভাবে অপমান করা হবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। মেহরাজ তার দৃষ্টি শক্ত করে সোজা সামনে ফেলল,
“ও আশ্রিতা নয়।”
বলেই তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল নূরজাহান চৌধুরীর দিকে। বলে উঠল পরিষ্কার, অটল কণ্ঠে,
“আমার আম্মা ফাজলামো করছেন আপনাদের সঙ্গে। ও আমার স্ত্রী। টানা চার বছর ধরে আমি তাকে ভালোবেসেছি এবং তাকেই বিয়ে করেছি।”
ব্যস, বলেই গটগট করে এখান থেকে বেরিয়ে গেল সে। পেছনে তখন নেমে এসেছে পিনপতন নীরবতা। নূরজাহান চৌধুরী র/ক্তিম চোখে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। রেহানের কাজিন মেয়েগুলো থমথমে মুখে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইরানের দিকে। আর এদিকে ইরান আর ঝিলমিলের চোখ দুটো তখন ফুটবলের মতো গোল হয়ে গেছে! ঝিলমিলের চেয়েও শতগুণ বেশি হতবাক হয়ে গেছে ইরান। কী বলল লোকটা? চার বছর ধরে ভালোবাসে মানে? এ কীভাবে সম্ভব? লোকটা তো সাত বছর ধরে কানাডায় ছিল! নাকি সবার সামনে ইরানের সম্মান বাঁচাতে, তাকে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করতেই সে এমন একটা মনগড়া কথা বলে গেল? মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঝড়ের বেগে ঘুরপাক খেতে লাগল ইরানের।
————
“বাবা...”
তাহসিনকে ফ্লাটের দরজায় দেখা মাত্রই ছোট্ট দিগন্ত একটা লম্বা ডাক দিয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তিন বছরের ছোট্ট এই শিশুটির গায়ে তখন অপূর্ব সুন্দর ফরমাল পোশাক। সাদা সুতির কলারঅলা শার্টের ওপর ছোট্ট নেভি ব্লু রঙের স্টাইলিশ ওয়েস্টকোট, নিচে মানানসই প্যান্ট আর পায়ে ছোট্ট পুঁচকে ফরমাল জুতো। সব মিলিয়ে তাকে ছোট্ট কোনো রাজকুমারের মতো বেশ জেন্টলম্যান লাগছে।
ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে সবেমাত্র ভেতরে পা রেখেছে তাহসিন। ইরান চলে যাওয়ার পর থেকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যই একজন বিশ্বস্ত বেবিসিটার রেখে দিয়েছে সে। তাহসিনের নির্দেশেই বেবিসিটার বাচ্চাটাকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে তৈরি করে রেখেছিল। তাহসিন ভেতরে প্রবেশ করেই ঝাপটে কোলে তুলে নিল ছেলেকে। দিগন্তকে কোলে নিয়ে সে ঘরের চারপাশটায় একবার চোখ বোলাল। সুলতান সাহেব অর্থাৎ তার চাচা কোথাও নেই। হয়তো সবসময়কার মতো আজও কোনো উদ্দেশ্যহীন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন মানুষটা!
ছেলের তুলতুলে নরম গালের একপাশে মুখ ডুবিয়ে তাহসিন আলতো চুমু খেয়ে বলে উঠল,
“আই অ্যাম সরি, বাবা, লেট হওয়ার জন্য।”
“উমমম...” ছোট্ট দিগন্তও নিজের ছোট ভেজা ঠোঁট দুটো বাবার গালে ছুঁইয়ে স্নেহের একটা চুমু এঁকে দিল।
মৃদু হেসে ছেলের অন্য গালে আরেকটা চুমু খেল তাহসিন। গালে হাত বোলাতে বোলাতে হালকা শীতল গলায় বলে উঠল,
“চলো বাবা, তোমার মাম্মামের বিয়েতে গিয়ে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসি। আই অ্যাম শিওর, ইউ উইল বি হার মোস্ট আনএক্সপেক্টেড গিফট...”
দিগন্ত বাবার বলা কঠিন ইংরেজি কথার মাথা-মুণ্ডু কিচ্ছু বুঝল না। সে কেবল একটা শব্দই স্পষ্ট ধরতে পারল ‘মাম্মাম’! যে মানুষটাকে সে রোজ মোবাইলের স্ক্রিনে দেখে অভ্যস্ত। সে অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আধো আধো গলায় বলে উঠল,
“মাম্মাম?”
তাহসিন ছেলের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে চটজলদি সায় দিল,
“ইয়েস, তোমার মাম্মাম।”
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ছেলেকে কোলে আঁকড়েই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পড়ল তাহসিন।
-------------------
রাইটাপ পেইজ নেইম: Ayesha Rin—রিন
দীঘি ও রেহানের বিয়ে পড়ানোর এখনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন শুরু হয়নি, কেবল কাজি আসার পরের প্রস্তুতি চলছে। ড্রয়িংরুমের এককোণে দাঁড়িয়ে ঝিলমিল বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে তার মহামান্য স্বামীর দিকে। একটু আগেই লোকটা এসে হাজির হয়েছে। গায়ে তার কালো রঙের একটা কাস্টম-মেইড ডিজাইনার ব্যান্ডগলা কোট। কোটের কলার ও বুকের বোতামগুলোতে ছিমছাম মেটালিক কাজের ছোঁয়া। পায়ে লেদারের হাই-পলিশড ব্ল্যাক শু, আর হাতে রোলেক্সের একটা ক্লাসি সিলভার ঘড়ি। চুলগুলো জেল দিয়ে পেছনে ব্যাক-ব্রাশ করা, কেবল একটা-দুটো লক কপালে এসে একটু এলোমেলো হয়ে ঝুলে আছে; যার দরুণ তীক্ষ্ণ চোয়াল আর গম্ভীর মুখের সঙ্গে সাংঘাতিক মানিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে লোকটাকে দেখতে লাগছে হুবহু কোনো সিনেমার রূপালী পর্দার নায়কের মতো। আর সেটাই সহ্য হচ্ছে না রমণীর। মেহরাজ আর নীলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, তাদের কাঁধে দু’হাত রেখে ম্পূর্ণ উদাসীন ভঙ্গিতে চুইংগাম চিবোচ্ছে আর কাজি সাহেবের গম্ভীর কথাগুলো শুনছে।
আসার পর থেকে একবারের জন্যেও ঝিলমিলের দিকে চোখ তুলে তাকাল না। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, সে বুঝি এই বাড়ির কারো স্বামী নয়, সে যেন স্রেফ মেহরাজের বন্ধু বা মেহরাজের বোনের বিয়েতে আসা একজন সাধারণ অতিথি মাত্র। ঝিলমিলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই যেন!
বারিশের এমন ড্যাশিং, মোহময় উপস্থিতি রেহানের কাজিন মেয়েগুলোর নজর এড়াল না। মেয়েগুলো থমকে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে যেভাবে বারিশের দিকে তাকিয়ে আছে, তা দেখে ঝিলমিলের শরীরের র/ক্ত যেন সোজা মাথায় চড়ে বসেছে! রাগ আর ক্ষোভে তার ভেতরটা তখন ফুটছে। নিজের দুইটা নিষ্পাপ বাচ্চা দুটোকে একটাবার একটু কাছে এসে ছুইয়ে দেখার সৌজন্যটুকুও সে দেখাল না!
পরম আরামে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বারিশ মুখের কোণায় খামখেয়ালি হাসি ঝুলিয়ে সে কাজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“কাজি সাহেব, এবার বিয়ে পড়ানো শুরু করুন তো জলদি। আমার চুইংগাম ফুরিয়ে আসছে।” শেষ বাক্যটা বলল বিরক্তি নিয়ে।
তার এমন বেপরোয়া কথায় দীঘি এক পলক মুখ তুলে তাকাল বারিশের দিকে। মেয়েটার দাঁতে দাঁত চেপে বসল। বুকের ভেতরটা তখন কাঁপছে একটা ভীতিগ্রস্ত পাখির মতো; হৃদপিণ্ডটা যেন লাফাচ্ছে আস্ত একটা ব্যাঙের মতো। সামনেই জর্জেট কাপড়ের পর্দার ওপারে বর সেজে বসে আছে রেহান, একটু পরেই জীবনের সবচেয়ে বড় একটা বাঁকবদল ঘটতে চলেছে।
দীঘির আ/গুনঝরা দৃষ্টি দেখে বারিশ বিচলিত না হয়ে উল্টো চোখ টিপে অদ্ভুত ইশারা করল। চুইংগামটা একটু ফুলিয়ে চটপটে গলায় ফের বলে উঠল,
“আরে কাজি সাহেব! মেয়েটা বাড়ি থেকে বিদায় নিলেই আমরা পার্টি করব! জলদি শুরু করুন, দেরি করলে কিন্তু মেজাজ খারাপ হবে।”
কাজি সাহেব বড় বড় চোখ করে বিরক্তিতে মুখ গোমড়া করে বললেন,
“আরে বাপ, তাড়াহুড়ো করলেই তো আর সব হয় না! আগের কাজগুলো তো সেরে নিতে দেবে নাকি?”
বারিশ তাতেও থামল না। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নির্লিপ্ত গলায় প্রস্তাব দিল,
“দ্রুত বিয়ে পড়ান, আপনাকে একশো টাকা বাড়িয়ে দেব।”
কাজি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ওই টাকা দিয়ে তুমি গিয়ে চুইংগাম কিনে খাও।”
একটু দূরে দাঁড়িয়েই আলতাফ সাহেব ছেলেটার এমন বেয়াকুবের মতো কান্ডকারখানা দেখে রাগে প্রায় ফেটে পড়ার উপক্রম। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেকোনো মুহূর্তে একটা বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে। ঝিলমিলের ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তে বারিশের কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসতে। লোকটার মাথায় কী ঘুরছে কে জানে! প্রথম দিকে তো সে তার ফুপিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, আজ কি তবে নিজের এই রূপ দেখিয়ে ফুপিকে কষ্ট দিতে এসেছে?
ঝিলমিল পা বাড়াল লোকটার দিকে। কিন্তু এগোতে পারল না। তার আগেই কাজি সাহেব কাবিননামার খসড়াটা দীঘির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নির্দেশ দিলেন,
“মা, এবার এই কাগজটায় সই করে ফেলুন।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ড্রয়িংরুমের পিনপতন নীরবতা দ্বিগুন গাঢ় হয়ে এল। সমস্ত উপস্থিত মানুষের দৃষ্টি একসঙ্গে গিয়ে আটকে গেল পর দীঘির ওপর।
ঝিলমিলও আর বারিশের দিকে তাকাল না। সেও তার সমস্ত রাগ গিলে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটার দিকে। সে খুব ভালো করেই জানে, তার ফুপির মনের গভীরে এই মুহূর্তে কেমন একটা প্রলয় বইছে।
দীঘি থরথর করে কাঁপা হাতে কাবিননামার কাগজ স্পর্শ করল। তার চোখের চাউনি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। আজকের এই জীবনের সবচেয়ে বড় সন্ধিক্ষণে একটাবারের জন্যেও সে তাহসিনের দেখা পেল না। কোথায় গেল ছেলেটা? কী করছে? অবচেতনেই ভাবল দীঘি। পরক্ষণে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হলো।
দীঘি চোখ ফিরিয়ে তাকাল নূরজাহান চৌধুরীর দিকে। তার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই; তিনি কেবল শীতল চোখে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন। এরপর দীঘি চোখ ফেরাল পর্দার ওপাশের মানুষটার দিকে। রেহান কত না আগ্রহ নিয়ে উদগ্রীব হয়ে বসে আছে নিজের হবু স্ত্রীর একটুখানি আঁচল বা মুখ দেখার জন্য!
অতীতের সমস্ত ছাইচাপা আ/গুন পায়ে পিষে, সমস্ত না-পাওয়া আর দীর্ঘশ্বাসকে পেছনে ফেলে দীঘি অবশেষে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। সে নিজেকে শক্ত করল, সমস্ত আবেগ জমা করে কাঁপতে থাকা আঙুলগুলোতে টেনে নিল একটা সিদ্ধান্ত। কলমের নিবটা সে বাড়িয়ে ধরল সাদা কাগজের সেই সুনির্দিষ্ট দাগটার দিকে।
দীঘির কলমের নিবটা সবেমাত্র যখন কাগজ ছুঁইছুঁই…বারিশ তখন তার মুখের ভেতর থেকে চুইংগামটা দিয়ে বেশ বড় করে একটা বাবেল ফোলাচ্ছিল। ঠিক তখনই গগনবিদারী এক বিকট শব্দে লিভিংরুমের স্তব্ধ বাতাসকে চিড়ে দিল। সেকেন্ডের ভেতর তীক্ষ্ণ আওয়াজে ফেটে গেল বারিশের মুখে ফোলানো প্রকাণ্ড চুইংগামের বাবেলটাও।
ফের বিকট শব্দ হলো। ফের কেঁপে উঠল পুরো বাড়িটা। দীঘির হাত থেকে কলমটা অনেক আগেই ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেছে। কানফাটা আতঙ্কে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই একযোগে চমকে ফিরে তাকাল সদর দরজার দিকে। নূরজাহান চৌধুরী চোখের সামনে তাহসিনকে দেখতে পেয়ে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইলেন। তিনি তেড়ে এগিয়ে যেতে যেতে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
“এই ছেলে, আজ সারাদিন কোথায় ছিলে তুমি? এত বড় একটা...”
কিন্তু কথা শেষ হলো না তার। মাঝপথেই তাঁর গলা আটকে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল তাঁর পা দুটো। এতক্ষণ চারপাশের হট্টগোল আর নাটকীয় পরিস্থিতির ভিড়ে তাঁর খেয়ালই ছিল না! তিনি একবারের জন্যেও লক্ষ করেননি তাহসিনের কোলে জড়িয়ে থাকা ছোট্ট শিশুটাকে, কিংবা তার ডান হাতে শক্ত করে ধরা মারণা/স্ত্র ওই রি/;ভলবারটাকে! তাহসিনের পরনে একটা গাঢ় কালো রঙের ফরমাল কোট। দীর্ঘ দেহটাকে আরও ভয়ংকর ও গম্ভীর করে তুলেছে। পেছনে তার ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র বেশ কয়েকজন বডিগার্ড। কারা এগুলো?
পিনপতন মৃ/ত্যুকূপের মতো নীরবতাকে চিরে দিয়ে তাহসিন সোজা হেঁটে এসে দাঁড়াল নূরজাহান চৌধুরীর মুখোমুখি। রি/ভ/লবারের কালো ঠান্ডা নলটা সোজা তাক করল নূরজাহান চৌধুরীর কপালে!
বাক্য উচ্চারণ করল বরফশীতল, শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে,
“আপনার ফেলে দেওয়া নাতিকে আনতে গিয়েছিলাম, আম্মা!”
বারিশ চুইংগাম ফেলে দিয়ে ঠোঁট ওল্টাল। ঝিলমিল এসে ঝাপটে ধরল বারিশের কাপড়। ভাগ্যিস তার বাচ্চা দুটো নেই এখানে! বারিশ দু'হাতে আগলে নেয় ঝিলমিলকে। ইরান নিশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। এদিকে চারপাশের সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে দীঘির সমস্ত দৃষ্টি তখন আচ্ছন্ন হয়ে গেছে গুটিয়ে থাকা অবয়বে। সে অপলক তাকিয়ে আছে তাহসিনের কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে। ভয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে কুঁকড়ে থাকা ছোট্ট একটা ছেলে। দীঘির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এ কী দেখছে সে! কী অসম্ভব অদ্ভুত এক দৃশ্য! এ তো হুবহু দীঘির নিজের শৈশবের মুখখানা! মনে হচ্ছে ছোটবেলার নিজের ছোট রূপটাকে সৃষ্টিকর্তা তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে এই পৃথিবীতে। ছোট্ট নাক, গালের গড়ন, ঠোঁটের কোণ---সবকিছু নিখুঁতভাবে দীঘির মতো। কেবল একটা জায়গায় আকাশ-পাতাল তফাত---তা হলো বাচ্চাটার চোখের মণি দুটো অবিকল তাহসিনের মতো মোহময় ও গভীর নীলাভ!
তাহসিনের বাচ্চা! কিন্তু... কেন এই শিশুটার চেহারা অবিকল দীঘির মতো? দীঘির সমস্ত হাত-পা বরফের মতো অবশ হয়ে এল। সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সবকিছু। ঠিক তখনই মাথার ভেতরে বিদ্যুতের বেগে আঘাত হানল অতীতের কোনো এক নিষিদ্ধ, চাপা ও অবরুদ্ধ একটি রাতের স্মৃতি…
সকলে রেসপন্স করিয়েন। আগামী পর্ব চলে আসবে শীঘ্রই...
চলবে…