#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে
#আয়েশা_রিন
#পর্ব৫৫
[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন]
দীঘি চলে গেল চার বছর আগের কিছু স্মৃতিতে। তখন সবেমাত্র উনিশে পা রেখেছে সে। দীঘি মানে শান্ত, স্থির জলের বিশাল জলাশয়; অথচ দীপানূর চৌধুরী দীঘি নামের ঠিক বিপরীত--- স্থিরতার বদলে যার র/ক্তে সবসময় বয়ে চলত প্রমত্ত ঝড় ও ধ্বং/সাত্মক বারুদের উন্মাদনা। যার আ/গুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যেত চারপাশের সমস্ত নিয়ম আর অনুশাসন। পুরো অস্তিত্বজুড়ে কেবলই বয়ে চলত অশান্ত, বুনো, খামখেয়ালিপনা।
তখনকার দীঘি মানেই ছিল চলমান বারুদস্তূপ। সমাজের কোনো আইন, প্রথা বা নিয়মের প্রতি তার তোয়াক্কা ছিল না কখনোই। চত্বরের পর চত্বর ঘুরে বেড়ানো, রাতভর পার্টি, ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেট আর হাতে মদের গ্লাস! এটাই ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। নিয়ম ভাঙার অদ্ভুত নেশা র/ক্তে বইত তার। আর এই পুরো লাইফস্টাইলের পেছনের মূল উসকানিদাতা ছিল আহনাফ ইশান। দীঘির তখনকার এক মাত্র বেস্টফ্রেন্ড আহনাফ ইশান!
ইশানের বয়স তখন বিশ হলেও বিত্তের জোর আর বেপরোয়া স্বভাবের কারণে সে ছিল বেশ পোক্ত। দীঘির বয়স যখন ষোলো, তখন থেকেই ইশানের সাথে তার সখ্য। অন্যান্য বন্ধুরা থাকলেও ইশানের সাথে দীঘির সম্পর্ক আলাদা রকমের গাঢ় ছিল। দীঘির যেকোনো পাগলামি, যেকোনো খামখেয়ালিতে ইশান সবসময় সমর্থন জুগিয়েছে, বরং বলা চলে তাকে আরও উসকে দিয়েছে। সে কখনো ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। ইশানকে বরাবরই নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ও বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবত যাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। আর সব কিছুই ছিল শুধুই বন্ধুত্বের খাতিরে। তবে এই বন্ধুত্বের আড়ালে গিয়ে ইশান দীঘিকে চাইত। শুধু মাত্র দীঘির শরীরকে চাইত।
তাদের নিজেদের পারিবারিক স্ট্যাটাসের কারণে টাকা আর ক্ষমতার জোরে তারা যখন যা চাইত, নিমেষেই তা তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসত। আর সেই অহংকারেই বনানী ও গুলশানের এক্সক্লুসিভ ক্লাবগুলোর ভিআইপি লাউঞ্জগুলোতে ঊনিশ বছরের দীঘি চালাত তার নিজস্ব রাজত্ব। উইকেন্ডের রাত মানেই গুলশানের নামী ক্লাবগুলোয় দীঘির উদ্দাম উপস্থিতি। ক্লাবগুলোর ডিজে ফ্লোরে কিংবা প্রাইভেট বারে সে ছিল অবিসংবাদিত রানি। মুখে জ্বলন্ত সিগারেট, গায়ে লেটেস্ট ফ্যাশনের পোশাক আর হাতে মদের গ্লাস---তার এইসব বেপরোয়া চলাফেরায় বুঁদ হয়ে থাকত গোটা যুবসমাজ।
দীঘির এই বেপরোয়া স্বভাব আর অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগই নিয়েছিল ইশান। গুলশানের ‘ক্লাব ইনফিনিটি’র কথা মনে হলেই দীঘির শরীর আজও শিউরে ওঠে। বিশ্বাসঘাতক ইশান নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন আধা-চেতন দীঘির কেড়ে নিয়েছিল তার সর্বস্ব, তার সতীত্ব।
পরদিন সকালে ঘোর কাটতেই, নিজের শরীরের ভেতরকার অচেনা পরিবর্তন তাকে পাথর বানিয়ে দেয়। ট্রমা ও মানসিক আঘাতে দিনের পর দিন রুমের বাইরে পা রাখত না দীঘি। পরবর্তীতে যখন সে ইশানকে খুঁজে বের করার এবং নিজের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল, তখনই এক আকস্মিক খবর এসে পৌঁছায়। ম”র্মান্তিক সড়ক দু”র্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মা”রা গেছে আহনাফ ইশান!
শোনার পর দীঘি যেন আক্ষরিক অর্থেই হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল। কেউ জানল না, কেউ বুঝল না। যার সঙ্গে তার জীবনের ওই কালো অধ্যায়টি জুড়ে ছিল, সে তো চিরকালের মতো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে! সব দুঃস্বপ্ন ভেবে আবারও নতুন করে নিজের জীবন উপভোগ করতে শুরু করে সে। কিন্তু ইশান ছাড়া তো এমন গোপন ঘটনা অন্য কারও সঙ্গে ঘটার কোনো প্রশ্নই ওঠে না! কক্ষনও না! তবে যদি সেদিন রাতের সবকিছু কেবল ইশানের সঙ্গেই ঘটে থাকে, তবে আজ এই ছোট্ট শিশুটার মুখে হুবহু নিজের অবয়ব আর ঠিক তাহসিনের সেই গভীর নীলাভ চোখ কেন? এ কোন গোলকধাঁধায় আটকে আছে সে!
রাইটার পেইজ নেইম: Ayesha Rin—রিন
দীঘি আর স্থির থাকতে না পেরে উন্মত্ত ঝড়ের বেগে এগিয়ে যায় তাহসিনের সামনে। নূরজাহান চৌধুরীর কপাল থেকে রি”ভলবা”রের নলটা ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে সে খপ করে চেপে ধরল তাহসিনের ভারী ওভারকোটের কলার। রাগে কাঁপতে থাকা গলায় সে ফুসে উঠল,
“কে তুমি? কে পারমিশন দিয়েছে তোমাকে এখানে এসে এই তামাশা করার? What nonsense is this?”
তাহসিনের মুখ থেকে কোনো উত্তর আসার আগেই তার কোল থেকে ভেসে এল নিষ্পাপ, কোমল এক ডাক,
“মাম্মাম!”
শিউরে উঠল দীঘি। বুকের ভেতরটা তীব্র মোচড়ে কেঁপে উঠল; সচকিত হয়ে সে তাকিয়ে দেখল বাচ্চাটার দিকে। ছোট্ট শিশুটার মুখে তখন খেলা করছে মায়াবী হাসি, যেন সে এই অচেনা নারীটিকে কত্ত ভালো ভাবে চেনে। কিন্তু পরক্ষণেই দিগন্তের গোল গোল নীলাভ চোখগুলো দীঘির কাছ থেকে সরে গিয়ে আটকে গেল লিভিং রুমের অন্য কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের ওপর! কত দিন পর নিজের মাকে দেখল শিশুটা! সব ভুলে সে খিলখিলিয়ে হেসে দুই হাত বাড়িয়ে ডেকে উঠল,
“মা!”
যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো ইরান! থরথর করে কেঁপে উঠল তার পুরো শরীর। মেহরাজ, ঝিলমিল, দীঘি এবং নূরজাহান চৌধুরীর সমস্ত বিস্মিত ও হতবাক দৃষ্টি একসঙ্গে গিয়ে আটকে গেল ইরানের ওপর। পাথরের ন্যায় শক্ত একটা ঢোক গিলল ইরান, গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না।
মেহরাজ দিশেহারা হয়ে ইরানের দিকে এগিয়ে গিয়ে শক্ত হাতে তার বাহু খামচে ধরে বলল,
“ইরান, তুমি এই বাচ্চাটাকে চেনো? বলো, এ কী হচ্ছে এসব?”
ইরান সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সে। ব্যাকুল কণ্ঠে আবারও অস্পষ্ট উচ্চারণে ডেকে উঠল দিগন্ত,
“মা, আসচো না কেন...”
তাহসিন বরফশীতল চোখে তাকিয়ে আছে ইরানের দিকে। চাহনিতে তার স্পষ্ট এক সতর্কবার্তা, ‘কোন সাহসে এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছ?’
মেহরাজের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না ইরান। সে ধীর পায়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। তা দেখে মেহরাজ ফের বলে,
“কোথায় যাচ্ছো তুমি? এই বাচ্চাটা কেন তোমায় মা বলে ডাকছে? তাহসিনের সঙ্গে কী সম্পর্ক তোমার?”
বলতে বলতে মেহরাজ মাথা ঘুরিয়ে সরাসরি তাকাল তাহসিনের দিকে,
“আর তাহসিন... তাহসিন, তুমি এসব কী শুরু করেছ? কে এই বাচ্চা? এর মুখের গড়ন হুবহু দীঘির মতো! আর তুমি সাথে করে এসব কাদের নিয়ে এসেছ?”
সমস্ত পরিস্থিতি যখন মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দীঘির। বিকট এক আর্তনাদ করে উঠল সে,
“Dammit! কী হচ্ছে এগুলো? কী হচ্ছেটা কী?!”
কোনো হিসাব মিলছে না তার। কেন একটা বাচ্চার চেহারা হুবহু তার আর তাহসিনের মতো হবে? কেন? আর সেই বাচ্চা কেন ইরানকে মা ডাকবে? সব যেন একটা ঘোরের মতো গুলিয়ে যাচ্ছে। রেহান আতঙ্কে এগিয়ে এসে দীঘির বাহু ধরে ফিসফিস করে বলল,
“দীঘি, শান্ত হও! কিচ্ছু হয়নি, আমি কথা বলছি...”
তখুনি চারপাশ জমিয়ে দিয়ে তাহসিন গম্ভীর ও ভারী গলায় ঘোষণা করল,
“কোনো কথা হবে না! গার্ড, সবগুলোকে একজায়গায় করে বাইরে নিয়ে চলো।”
আদেশ পাওয়া মাত্রই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করল না তাহসিনের কালো কোট পরা বডিগার্ডরা। বারিশের পরিবার, রেহানের পরিবার থেকে শুরু করে চৌধুরী পরিবারের সবাইকে নিমেষে ঘিরে ফেলল তারা।
গার্ডদের একজন যেই হাত বাড়িয়ে দিল ঝিলমিলের দিকে, অমনি হ্যাঁচকা টানে ঝিলমিলের বাহু নিজের কাছে টেনে নিল বারিশ। বরফশীতল গলায় সে বলে উঠল,
“ডোন্ট টাচ হার!”
বারিশের হুকুমের সামনে আপনাআপনি পিছিয়ে গেল গার্ডের হাত।
ভয়ার্ত মুখে বারিশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল ঝিলমিল,
“তাহসিন আঙ্কেল এগুলো কাদের নিয়ে এলো? এমন কালো কালো ড্রেস পরে ভূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন সব?”
“ওরা তোমার ফুপির শ্বশুরবাড়ির লোক।”
ঝিলমিল বিরক্তি ও উৎকণ্ঠা নিয়ে ফুঁসে উঠল,
“আমি বাচ্চাদের কাছে যাব, এতক্ষণে নিশ্চয়ই ঘুম ভেঙে উঠে গেছে। ভয় পাবে তো ওরা!”
বারিশ পকেটে হাত গুঁজে উদাসীন গলায় আশ্বাস দিল,
“ওদের কিচ্ছু হবে না, ওদের কাছে টুম্পা আছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে নাটক দেখে যাও।”
গার্ডরা জোর করে সবাইকে সরিয়ে নিয়ে যেতে উদ্যত হলে দীঘি সমস্ত ভয়, আড়ষ্টতা, বিভ্রান্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে বাঘিনির মতো ছুটে গিয়ে দাঁড়াল তাহসিনের ঠিক সামনে। বলল চোখে আগুন জ্বেলে,
“তাহসিন! তাহসিন, তোমার সন্তানের চেহারা কেন আমার মতো? কেন, কেন? হোয়াই ডাজ ইয়োর বেবি লুক লাইক মি?”
তাহসিন ছোট্ট দিগন্তকে বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল আরও এক ধাপ। ডান হাতের রি/ভল/বারটা সোজা উঁচিয়ে ধরল দীঘির থুতনির নিচে। মুখের প্রতিটি রেখায় তার বরফশীতল গম্ভীরতা।
“কারণ, সৃষ্টিকর্তা আমার ছেলেকে ওর মায়ের মতো বানিয়েছেন।”
কথাটার মানে দীঘির মগজে ঢুকতে কয়েক মুহূর্ত সময় নিল। আর যখন সেই নির্মম সত্যটা তার চেতনায় আঘাত হানল, সে উচ্চস্বরে ছিটকে উঠতে চাইল,
“এটা অসম্ভব! কোনোভাবেই এটা সম্ভব নয়! কী বলছ তুমি এসব আবলতাবল?”
তাহসিন ঠোঁটের কোণায় শান্ত হাসি ফুটিয়ে রিভলবারের নলটা একটু শক্ত করে ধরল। বলল,
“আমার মুখের কথা হয়তো তুমি বিশ্বাস করতে চাইতে না বলেই সৃষ্টিকর্তা তোমার মুখের আদল আমার সন্তানের মুখে ফুটিয়ে দিয়েছেন। নয়তো আজও সেদিনের মতো তোমার মা এই অবুঝ সন্তানকে চিরতরে আড়াল করে ফেলত!”
রি/ভলবা/রটা দীঘির থুতনির নিচ থেকে সরিয়ে নিয়ে তাহসিন এবার পুরো ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবার দিকে এক পলক তাকাল। তারপর গমগমে গলায় ঘোষণা করল,
“লিসেন এভ্রিওয়ান! নিজের মেয়ের অপকর্ম ঢাকতে গর্ভাবস্থার সাত মাসেই এক নবজাতককে একটা বস্তায় পুরে বুড়িগঙ্গা ব্রিজের নিচে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল এই নূরজাহান চৌধুরী! আর সেই হতভাগ্য নবজাতককেই আমি সেদিন কুড়িয়ে বাঁচিয়ে বড় করেছি। আজ সে আমারই কোলে!”
ড্রয়িংরুমের মেঝের ওপর যেন আস্ত একটা বরফের স্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নূরজাহান চৌধুরী। তাহসিনের কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে প্রথমবার চোখ পড়তেই তিনি যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, এই সেই পুরুষ যার সঙ্গে তার মেয়ের জীবনের ওই কালো অধ্যায় জড়িয়ে ছিল। তাহসিনকে মাঝেমধ্যে তার অদ্ভুত মনে হলেও কখনোই তিনি এতটা গভীরে ভাবেননি। এতটা নিখুঁতভাবে কেউ যে কাউকে ম্যানিপুলেট করতে পারে, তা তার কল্পনার বাইরে ছিল! নূরজাহান চৌধুরীর মতো একজন বিচক্ষণ মানুষ হয়েও তিনি কীভাবে তাহসিনের এই মরণফাঁদ চিনতে পারলেন না?
কিন্তু এর মাঝেও একটা অমিল কাঁটার মতো বিঁধছে তার গলায়। ইরানের সঙ্গে তাহসিনের ঠিক কী সম্পর্ক? বাচ্চাটা কেন ইরানকে ‘মা’ বলে ডাকল? ইরানের সঙ্গে তো চার বছর ধরে ঝিলমিলের বন্ধুত্ব, তবে তাদের সঙ্গে তাহসিনের এই ষড়যন্ত্র কোথায়? নূরজাহান চৌধুরীর এই ঘূর্ণায়মান চিন্তার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল দীঘির মুচড়ে পড়া আর্তনাদ,
“মা! ও কী বলছে এসব? কী বলছে এই লোকটা? আমায় বলো! আমি পাগল হয়ে যাবো, মা! সত্যিটা বলো আমাকে!”
“ঝিলমিল! তোমার ফুপিকে ভেতরে নিয়ে যাও। এক্ষুনি!”
মেয়ের আর্তনাদ এড়িয়ে নূরজাহান চৌধুরী নিজেকে কঠোর রাখার চেষ্টা করে নাতনীর উদ্দেশ্যে হুকুম ছাড়লেন। ঝিলমিল কাঁপতে কাঁপতে সামনে পা বাড়াতেই বারিশ এক ঝটকায় তার হাতটা খপ করে নিজের মুঠোয় পুরে নিল। কড়া গলায় বলল,
“এক পা-ও এগোবি না! চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাক!”
বারিশের প্রকাশ্য ধমকে নূরজাহান চৌধুরী বিস্মিত চোখে তাকিয়েও কিছু বলতে পারলেন না। ভয়ে ঝিলমিলও আর সামনে এগোনোর সাহস করল না।
আলতাফ সাহেব বিরক্ত হয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন নূরজাহান চৌধুরীর ঠিক সামনে।
“আম্মা, কী বলছে এই ছেলেটা? কীসের বাচ্চা? দীঘির বাচ্চা আসবে কোত্থেকে? এসব কী শুনছি আমি? কী করেছ তুমি?”
আলতাফ সাহেবের এমন উম্মত্ত প্রশ্ন শুনে বারিশ ঝিলমিলকে ছেড়ে পকেট থেকে আরেকটি চুইংগাম বের করতে করতে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল,
“আপনার মেয়ের মতো আপনার বোনেরও টি/উমার হয়েছিল! আপনি অপারেশন করাতে সক্ষম না হলেও আপনার আম্মা বেশ ভালোভাবেই সক্ষম হয়েছেন!”
বারিশের কথার অর্থ বুঝতে পেরে আলতাফ সাহেব না চাইতেও হা হয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে সুযোগ বুঝে বারিশ তার হাতের নতুন চুইংগামটা আলতাফ সাহেবের হাঁ করা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বখাটে হেসে বলল,
“মুখ বন্ধ করুন আর চাবান!”
রেগেমেগে তাকালেন আলতাফ সাহেব। চুইংগাম ফেলে দিতে চাইতেই বারিশ ইশারায় গার্ডদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় হুমকি দিল,
“চাবান বলছি! নইলে এই গার্ডদের রি/ভলবার কেড়ে নিয়ে আপনার আবর্জনা যুক্ত মাথাটা একদম উড়িয়ে দেব!”
বারিশের কথায় ঝিলমিল খুব মনোযোগ দিয়ে পুরো পরিস্থিতিটা মেলাতে শুরু করল। তার মানে তাহসিনের এই বাচ্চাটা আসলে ফুপিরই! সেই নবজাতককে তার দাদীমা নূরজাহান চৌধুরী টিউমার হয়েছে বলে মিথ্যা অপারেশন করিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল---ঠিক যেমনটা তার নিজের বাবা ঝিলমিলের ক্ষেত্রেও করেছিল! আর ঠিক এই কারণেই কি তাহসিন এতদিন ছদ্মবেশে এই বাড়িতে অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরি করে সব তদারক করছিল? ওহ মাই গড! পুরো রহস্যটা ঝিলমিলের মাথাতেও পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু এতকিছুর পরেও ইরানের সঙ্গে এই ঘটনার কী যোগসূত্র সেটা কিছুতেই মেলাতে পারল না সে। আর বারিশই বা এসব কীভাবে জানে---সেটাও বুঝে এল না।
এদিকে বাড়ির বাকিদের কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেলেও, দীঘির মাথার ভেতর তখন প্রলয় চলছে। তার কাছে এখনো কোনো হিসাব মিলছে না! কীভাবে সম্ভব এটা? তার তো স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাতে ইশান ছাড়া আর কারও সঙ্গেই... না, এমন কিছু তো হওয়ার কথা নয়!
ঠিক তখনই দীঘির মাথার ভেতর বিদ্যুতের বেগে ধাক্কা খেল ইশানের হঠাৎ করে সড়ক দুর্ঘটনায় মা/রা যাওয়ার খবর এবং তার পুরো পরিবারের রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়া! আর আজ বর্তমানের এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাহসিনের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতা, তার এই সুদূরপ্রসারী জাল!
তবে কি... তবে কি সেদিন রাতে ইশান নয়, অন্য কেউ ছিল? দীঘির চোখের চাউনি কেমন যেন পাথর হয়ে গেল। অজানা কোনো আতঙ্কে তার সারা শরীর বরফ হয়ে আসছে। তাহসিন যেন দীঘির চোখের ভাষা পড়তে পারছে। ঠোঁটের কোণায় সে কুৎসিত ও বাঁকা হাসি ফুটিয়ে গলার আওয়াজ নামিয়ে বলল,
“ঠিকই ভেবেছেন ম্যাম! সেদিন রাতে ইশান নয়, আমি ছিলাম।”
বলেই সে হঠাৎ খ্যাপাটে সুরে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
— বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগানে নানান বনের ফুল,
বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগানে, নানান বনের ফুল…
ফুলের গন্ধে মন আনন্দে, ফুলের গন্ধে মন আনন্দে
ভ্রমরা আকুল....
সইগো বসন্ত বাতাসে, সইগো বসন্ত বাতাসে!—
গানটা থামিয়ে তাহসিন দীঘির কানের কাছে মুখটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল
“বিশ্বাস করুন ম্যাম, আমার এসবের কোনো দিনই কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আপনি নিজেই আমাকে বাধ্য করেছিলেন! নিজের বাগানের ফুলের মধু অন্য কোনো পরগাছা ভ্রমর এসে পান করে চলে যাবে, তার চেয়ে নিজের করে নেওয়াটাই কি বেশি ভালো নয়, বলুন?”
ধসে পড়তে চাইল দীঘির পায়ের তলার মাটি। রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল তাহসিনের শান্ত, অভিব্যক্তিহীন অথচ ভয়ংকর নীলাভ চোখের দিকে। গলা কাঁপছে থরথর করে। ফুসফুসের সব অক্সিজেন যেন ফুরিয়ে আসছে এক পলকে। বিবর্ণ ঠোঁটে সে কোনোমতে টেনে টেনে ফুসে উঠল,
“কী বলছ তুমি এসব? কেন করেছিলে এমন? আর... আর এতদিন কেন এগুলো লুকিয়ে রেখেছিলে?”
চোখের পলক ফেলল না তাহসিন। গলার স্বরে উদাসীনতা,
“কাকে বলতাম? যে মেয়ে নিজের বাচ্চা জন্ম দিয়েও বুঝতে পারে না যে সে মা হয়েছে, তাকে গিয়ে বলতাম? আপনার মতো একজন নির্বোধকে?”
দীঘি পাথরের মূর্তির মতো অপলক তাকিয়ে রইল। এমন তো নয় যে সে ভেতরে-ভেতরে কিচ্ছু বোঝেনি; আবার এমনও নয় যে তার কাছে পুরো সত্যটা স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নিয়ে ধরা দিয়েছিল। তার মা তাকে অন্য এক শহরে নিয়ে গিয়েছিলেন জরুরি চিকিৎসার নাম করে। তাকে বলা হয়েছিল, তার পেটে জটিল টি/উমার ধরা পড়েছে এবং পাথর, যার অপারেশন না করালে জীবন সংশয় হতে পারে। শুরুতে দীঘির মনেও খটকা লেগেছিল, একটা টিউমারের অপারেশন আর শরীরে ঘটে যাওয়া এতবড় পরিবর্তনের ধাক্কা কি এক হতে পারে? মাঝে মাঝে মনের গভীরে সন্দেহ দানা বাঁধলেও, চিকিৎসকদের সাজানো রিপোর্ট আর নূরজাহান চৌধুরীর অটুট আস্থার সামনে সেই সন্দেহগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত। তাছাড়া, ইশানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই রাতের অন্ধকার সত্যটা যদি কোনোভাবে প্রকাশ হয়ে যায় সেই অজানা ভয়ে সে নিজেও কখনো মুখ ফুটে নিজের মনের সন্দেহগুলো প্রকাশ করার সাহস পায়নি।
আর অন্যদিকে, নূরজাহান চৌধুরী যে ভেতরে-ভেতরে সমস্ত খবর রাখতেন, তা তিনি এমন কঠোর দক্ষতায় আড়াল করে রেখেছিলেন যে, ঘুণাক্ষরেও কেউ বুঝতে পারেনি তিনি কত বড় একটা রহস্য বুকচাপা দিয়ে চেপে বসে আছেন!
দীঘি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাহসিনের কোলে থাকা ছোট্ট দিগন্তের দিকে। বাচ্চাটা কেমন নিষ্পাপ চোখে চারপাশটা দেখছে! কিন্তু পরক্ষণেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইরানের ওপর। মাথার ভেতরে ধাক্কা দিল কৌতূহল।
“তাহলে ইরান কে? গত চার বছর ধরে ঝিলমিলের বান্ধবী হয়ে দিব্যি আমাদের বাড়িতে যাতায়াত করছে সে! আর তোমার এই বাচ্চাটা কেন তবে ওকে ‘মা’ বলে ডাকছে?”
শান্ত গলায় উত্তর দিল তাহসিন,
“কারণ ইরানই নিজের হাতে ওকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে, ভালোবাসা আর যত্নে বড় করেছে।”
“কিন্তু তোমরা কেন আমাদের সঙ্গে এমনটা করলে? কেন আমার অসহায়তার সুযোগ নিলে আর কেনই বা এতদিন ছদ্মবেশে আমার বাড়িতে লুকিয়ে ছিলে?” উন্মত্ত দীঘি আবারও বিকট চিৎকারে ফেটে পড়ল।
রেহান এসে দীঘিকে দুই কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠল,
“তার মানে সত্যি... সত্যি এই বাচ্চাটা তোমার, দীঘি? তাহলে আমার কী হবে?” রেহানের গলাটা অসহায়তায় ভেঙে আসছে। সে একটু থমকে আবার বলল,
“আচ্ছা, যা হয়েছে হয়েছে, বাচ্চা তো ভুল করে চলে এসেছে। তাই বলে তুমি কি এই লোকটাকে আবার বিয়ে করে নেবে?”
দীঘি সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। তার সমস্ত মনোযোগ তখন কেবল ওই ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে। রেহান আকুল হয়ে দীঘির দুই গাল নিজের হাতের মুঠোয় তুলে ধরে বলল,
“আমার দিকে তাকাও দীঘি! যা হয়েছে সব ভুলে যাও, কিন্তু প্লীজ তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবে না, বলো!”
দীঘি এবারও পাথরের মতো নির্বাক। তার মাথায় এই মুহূর্তে নিজের সন্তান ছাড়া আর কিচ্ছু ঘুরছে না। সে যেকোনো মূল্যে জানতে চায় তাহসিনের আসল উদ্দেশ্য কী, তার মা কেন এমন নির্মম কাজ করেছিলেন, আর কীভাবে তাহসিন এতদিন এই সন্তানকে লুকিয়ে আগলে রেখেছে। সবটা জানবে সে।
রেহানের বাবা-মা ক্ষোভে ফেটে পড়ে রেহানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিতে চাইলেন,
“ও তোকে ছেড়ে চলে যাবে মানেটা কী? এমন একটা ন/ষ্ট মেয়েকে আমরা মেনে নিলে তো! এদের এই পারিবারিক পচা কুয়াশার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই! চল এখান থেকে!”
চেঁচিয়ে উঠল রেহান,
“চুপ করো তোমরা! আমার দীঘি যাই করুক না কেন, সে আমার কাছে সেরা। আমি কোথাও যাচ্ছি না! আজ যখন ওকে বিয়ে করতে এসেছি, আজই ওকে বিয়ে করব!”
বলেই সে দীঘির হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। কাজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে আদেশ করল,
“আপনি জলদি বিয়ে পড়ান! আমাদের এখনি বিয়ে হবে।”
বিকট শব্দে ফেটে পড়ল আবার একটা গু/লির আওয়াজ! তাহসিন র/ক্তহিম করা দৃষ্টিতে রেহানের বাবা-মার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“নিজের ছেলেকে বাঁচাতে চাইলে এক্ষুনি কেটে পড়ুন, নাহলে সবগুলোকে এই মেঝের নিচে পুঁ/তে দেব!”
রেহানের বাবা-মা ভয়ে আঁ/তকে উঠে ছেলেকে জোর করে টেনে সরাতে চাইলেন। কিন্তু রেহান একচুলও নড়ল না। সে দীঘির হাত ছাড়বে তো দূরের কথা, আরও শক্ত করে ধরে রাখল। আচমকাই একটা বু/লেট এসে সজোরে বিঁ/ধল রেহানের ডান বাহুতে!
শব্দ মিলোনোর আগেই র/ক্তে ভেসে যাওয়া হাত নিয়ে রেহান মেঝের ওপর ছিটকে পড়ে গেল। দীঘি আতঙ্কে আঁ/তকে উঠে দ্রুত রেহানের পাশে হাঁটু গেয়ে বসে পড়ে ফিসফিস করে বলল,
“চলে যাও রেহান, প্লীজ চলে যাও! আমি পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব, এখন চলে যাও এখান থেকে…”
যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে ভাঙা গলায় বলল রেহান,
“দীঘি... আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচব না, প্লীজ তুমি...”
কথাগুলো ব্যথায় আর শেষ হলো না, জট পাকিয়ে গেল মুখের ভেতর। ড্রয়িংরুমের অন্য কোণে দাঁড়িয়ে ঝিলমিল বড় বড় চোখ করে এমন পৈশাচিক দৃশ্য দেখছে। বুকটা ধড়ফড় করছে আতঙ্কে।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বারিশের কোট খামচে ধরে বলল,
“তাহসিন আঙ্কেল এসব কী করছে? ওনাকে একটু থামান না!”
“থেমেই তো ছিল এতদিন।” বারিশের কন্ঠ আগের মতোই উদাসীন।
“উনি আসলে কী চান?” ঝিলমিলের গলায় কান্নার সুর।
“তোমাদের সকলের প্রাণ।” বারিশের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
শিউরে উঠল ঝিলমিল,
“কী যা তা বলছেন আপনি এসব!”
বারিশ আর কোনো উত্তর দিল না। তার তীক্ষ্ণ ও গম্ভীর দৃষ্টি তখন কেবল স্থির হয়ে আছে তাহসিনের চেহারার ওপর।
ইতিমধ্যে রেহানের বাবা-মা জোর করে যন্ত্রণাকাতর রেহানকে টেনেহিঁচড়ে চৌধুরী ভিলা থেকে বের করে নিয়ে গেছে। আতঙ্কে রেহানের পরিবারের অন্য আত্মীয়রাও হুরমুড় করে পালিয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে এখন কেবল চৌধুরী পরিবার আর শেহরিয়ার পরিবারের মানুষগুলো দাঁড়িয়ে। দীঘির অতীতের এমন জঘন্য সত্য জেনে ঝর্ণা বেগমের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। এমন একটা চরিত্রের মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দিতে চেয়েছিল সে! ভাবলেই তার ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠছে। তার চেয়ে ঝিলমিল তো হাজার গুণে ভালো ছিল!
আবার তেড়ে গেল দীঘি তাহসিনের সামনে। অধৈর্য গলায় বলল,
“মুখে কুলুপ এঁটেছ কেন? বলছ না কেন তুমি আসলে কী চাও? আর কত ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে তুমি? What the hell are you playing at?!”
তাহসিন নির্বিকার চোখে তাকিয়ে আছে নূরজাহান চৌধুরীর দিকে। দীঘি পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠল,
“ও মা! বলো না, কেন এমন করেছিলে তুমি? কেন সব জেনেও আমাকে একটা দিনও সত্যিটা বলোনি?”
চোয়াল শক্ত করে ঠান্ডা গলায় ধমকে উঠলেন নূরজাহান চৌধুরী,
“থামো দীঘি! একটা জা/র/জ সন্তানকে নিয়ে আর কীই বা করার ছিল আমার...”
নূরজাহান চৌধুরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই পুরো লিভিং রুমের বাতাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠল তাহসিনের বজ্রকঠিন গলা,
“জা/র/জ নয়! আমার ছেলে কোনো জা/র/জ নয়! ও পবিত্র! ওর প্রাণ, ওর শরীর, ওর অস্তিত্ব---সবকিছু পবিত্র! অপবিত্র যদি কেউ হয়ে থাকে সেটা কেবল আপনার মেয়ে!”
বলেই সে দীর্ঘ পদক্ষেপে দীঘির দিকে এগিয়ে গেল। দীঘির বাহুটা নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। দাঁত পিষে বলল,
“আমাকে নিয়ে জানার আগে নিজের মায়ের ব্যাপারে জানুন! আপনার মা... হ্যাঁ, এই নূরজাহান চৌধুরী এবং তাঁর ভাই মিলে আপনার বাবা মাজহার চৌধুরীকে খু/ন করেছিল! আর আপনার মায়ের সেই ভাই-ই আমার পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছিল!”
বিশাল বোমা ফাটিয়ে দিল তাহসিন। শুধু দীঘি নয়; বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো থরথর করে কেঁপে উঠল মেহরাজ, আলতাফ চৌধুরী, ঝিলমিল প্রত্যেকে। অজানা সত্যের আকস্মিক আ/ঘাতে সবার র/ক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সকলে অজানা সত্য জেনে চমকালেও নূরজাহান চৌধুরী চমকালেন তাহসিনের মুখ থেকে নিজের লুকিয়ে রাখা সত্য জেনে।
তাহসিন ফের বলে,
“জিজ্ঞেস করছেন না কে এই ইরান? বোন আমার! আমাদের পরিবার ধ্বংস করেছে আপনার পরিবার! এই সীমান্তের পরিবার ধ্বংস করেছে।”
দীঘি দিশেহারা হয়ে যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে দিতে চাইল নিজের সন্তানের দিকে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে এক পা পিছিয়ে গেল তাহসিন। দিগন্তকে শক্ত করে আড়াল করে সে বলল,
“ওকে স্পর্শ করার অধিকার আপনার নেই!”
থরথর করে কেঁপে ওঠা গলায় দীঘি শুধু অস্পষ্টভাবে জানতে চাইল,
“কেন...?”
তাহসিনের চোখের দৃষ্টি আগুনের চেয়েও তীক্ষ্ণ তখন। জবাব দিল
নিস্পৃহ গলায়,
“যে মা নিজের গর্ভে বেড়ে ওঠা নিজের সন্তানের অস্তিত্ব পর্যন্ত টের পেতে ব্যর্থ হয়েছে, তার কোনো অধিকার নেই সেই সন্তানকে ছোঁয়ার!” বলেই তাহসিন গার্ডদের আদেশ দিল,
“ সবগুলোকে বন্দি করো গার্ড!"
বারিশ বলল,
“ আমাকেও?”
উত্তরে তাহসিন,
“ তোকে আরও আগে...!”
চলবে....