ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে

৫৯তম পর্ব

লেখক: আয়েশা শেখ
#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে 
#আয়েশা_রিন 
#পর্ব৫৯

[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন।]

দীঘি ও নূরজাহান চৌধুরীর ওপর পুরো দমে নজর রাখা শুরু করে দেয় সীমান্ত। খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারে, নূরজাহান চৌধুরী দীঘিকে বুঝিয়ে রেখেছেন যে তার শারীরিক এই পরিবর্তন ও লক্ষণগুলো কোনো নতুন জীবনের নয়। পেটে টি”উমার ও পাথর জমার ফল!

এসব জঘন্য কাণ্ড চোখের সামনে জানতে পেরেও সীমান্ত শতক্রোধেও মুখ খুলতে পারেনি। সে জানত, এই মুহূর্তে সামনে চলে এলে বা হুট করে হিরো সাজতে গেলে তার বহুদিনের পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। নূরজাহান চৌধুরীর আসল রূপ সে গোপনীয়তার আড়াল থেকে টেনেহিঁচড়ে সবার সামনে আনতে চায়; গোটা দেশ জানবে এই নারীর সব কুকীর্তি।

কিন্তু নূরজাহান চৌধুরীর নিষ্ঠুরতা যে এতটা পি”শাচের পর্যায়ে নামতে পারে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। এই নজরদারির ফাঁকে তাকে চট্টগ্রাম থেকে মাঝেমধ্যেই ঢাকায় যাতায়াত করতে হতো, রাতে জেগে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অফিশিয়াল কাজের চাপ সামলাতে হতো। দীঘির গর্ভাবস্থার যখন ঠিক সাত মাস চলছে, সেই সময় সুলতান সাহেবের হঠাৎ অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে জরুরি কাজে ঢাকায় আসতে হয়। তবে চট্টগ্রাম ছাড়ার আগে সে নিজের এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে---যার সাথে একসময় ভার্সিটিতে পড়েছে তাকে দীঘির ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দিয়ে আসে।

ঢাকায় থাকা অবস্থাতেই সেই বন্ধুর ফোন এল। সে জানাল, নূরজাহান চৌধুরী দীঘিকে নিয়ে হঠাৎ করেই হসপিটালে গেছেন। শোনার পর থেকেই সীমান্তের বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে; অবিলম্বে সে ঢাকার কাজ ফেলে আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গিয়েছিল। হসপিটালে পৌঁছানোর আগেই নূরজাহান চৌধুরী অত্যন্ত সুকৌশলে নবজাতক বাচ্চাটাকে সরিয়ে ফেলেছেন!

মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয় সীমান্তের; বন্ধুদের সহায়তায় সে হন্যে হয়ে ওই এলাকায় খোঁজ চালাতে শুরু করে। ততক্ষণে প্রায় ছয় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অনুসন্ধান করে পরে সে জানতে পারে, নূরজাহান চৌধুরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সদ্যোজাত শিশুটিকে কর্ণফুলী ( বুড়িগঙ্গা কেটে কর্ণফুলী দেওয়া হয়েছে) ব্রিজের নিচের কোনো এক নোংরা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়ে এসেছে।

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহূর্তে মেঘলা আকাশের নিচে ব্রিজের নিচের সেই আবর্জনার পাহাড় চষে বেড়াচ্ছিল তারা। ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠায় যখন সীমান্তের পা আর চলছিল না, তখনই সে খেয়াল করে পায়ের ঠিক পাশেই একটা ছেঁড়া বস্তা নড়ে উঠে।

মুহূর্তের মধ্যে তার তীক্ষ্ণ মেধাবী মাথা সব সমীকরণ মিলিয়ে ফেলল! বিদ্যুৎ বেগে সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বস্তাটা খুলতেই দেখতে পেল একটি ছোট্ট নবজাতক শিশু ঠান্ডায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। নিজের নবজাতক বাচ্চাকে আ/বর্জনায় পড়ে থাকতে দেখে অবশ হয়ে এল সীমান্তের পুরো শরীর। ভুলবশত এক নারীর সঙ্গে রাত কা/টানোর পরিণামই বোধহয় আজ তার সন্তান এই চরম রূপে তার সামনে এসেছে! নিজের র/ক্তমাংসের অংশ একটা ব্রিজের নিচে, পচাগলা নর্দমার স্তূপে পড়ে আছে---একজন পুরুষের কাছে এর চেয়ে জঘন্য, এর চেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না!

ঠিক তখনই কেঁদে উঠল শিশুটি! সাত মাসের অপরিণত বয়সে পৃথিবীতে আসার কারণে কচি সেই কান্নার আওয়াজে ফুসফুসের পূর্ণ শক্তিও ছিল না, বিড়ালের ছানার মতো ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ সেই কান্নার শব্দে এক পলকের জন্য থমকে গেল সীমান্তের হৃদপিণ্ডটা।
বুক চিরে বেরিয়ে এল অবর্ণনীয় এক আর্তনাদ,

“আমার বাচ্চা!”

তার সেই কাঁপানো ডাক শুনে বন্ধুরা দৌড়ে ছুটে এল চারপাশে। তারাও দেখতে পেল বস্তার ভেতরের সেই করুণ দৃশ্যটি। সাত মাসের অসম্পূর্ণ প্রেগন্যান্সির কারণে নবজাতকটি এতটাই ছোট আর নাজুক ছিল যে দেখতে একটা পুতুলের মতো মনে হচ্ছিল।  হাত-পাগুলো তার অবিশ্বাস্য রকমের চিকন ও সরু, চামড়ার রঙ লালচে ও কুঁচকে যাওয়া, গায়ের ওপর তখনো জ/রায়ুর সাদা মোমের মতো ভার্নিক্স কেসিয়োসার আস্তরণ আর র/ক্তের হালকা দাগ লেগে রয়েছে। সামান্য কঙ্কালসার সেই শরীরটা ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছিল।

সীমান্ত হাটু গেড়ে বসে পড়ল সেখানে। চোখ তার টমমল করছে। কাঁপছে ঠোঁটও। নিজের হাত দুটো কাঠ হয়ে আছে; যে হাত বাড়িয়ে সে নিজের সন্তানকে বুক জড়িয়ে ধরবে, সেই শক্তিটুকুও তার হাতে অবশিষ্ট নেই। তার এক বন্ধু এগিয়ে এসে যখন হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে তুলতে গেল, সীমান্ত কঠোর গলায় তাকে বাধা দিয়ে, নিজেকে সামলে নিল। অতঃপর, সে নিজেই কম্পিত হাতে স্পর্শ করল নিজের অস্তিত্বকে।

অদ্ভুত শীতল স্রোত তার আঙুলের ডগা থেকে সোজা হৃদপিণ্ডে গিয়ে আ/ঘাত করল তার। ছোট্ট প্রাণের চামড়ার নিচে জমে থাকা হাড়গুলো যেন আঙুলে স্পষ্ট ঠেকছিল। কী চরম নিষ্ঠুরতায় একটা তাজা প্রাণকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে! বুকটা কান্নায় ফেটে পড়তে চাইলেও গলার কাছে আটকে থাকা কান্নার দলাটা তাকে নির্বাক করে রাখল।

​এক মুহূর্তও দেরি করল না সীমান্ত। পচাগলা আবর্জনা আর কনকনে ঠান্ডার মাঝে পড়ে থাকা সেই ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল সে। গর্ভে মোটে সাত মাস বয়স অবুঝ প্রাণের শরীরটা একটা মুঠি পরিমাণ জায়গার মধ্যে কুঁকড়ে রইল। নিস্পাপ শিশুটি নিজের জন্মদাতার হাতের ওমে একটু উষ্ণতার ছোঁয়া পেতেই তার ক্ষীণ কান্নার সুরটা সামান্য বদলে গিয়ে কেমন যেন এক শান্ত অথচ হাহাকারভরা ধ্বনিতে রূপ নিল।

​সীমান্ত তার দুই হাতের অঞ্জলিতে শিশুটিকে নিজের হৃৎস্পন্দনের সবচেয়ে কাছাকাছি টেনে নিয়ে এল। গায়ের ওপর লেগে থাকা ময়লা, র/ক্ত বা দুর্গন্ধ তখন তার কাছে তুচ্ছ; সমস্ত পৃথিবী যেন এখন ওই ছোট্ট, নড়াচড়া করতে থাকা পিন্ডটার মাঝে এসে ঠেকেছে। অজান্তেই চোখ বেয়ে নেমে আসা জল সন্তানের মাথায় টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। এক হাত দিয়ে সন্তানকে বুক আগলে আগলে ধরে বলে উঠল শক্ত গলায়,

“আমার রক্ত এতটাও সস্তা নয় যে এভাবে নর্দমায় পড়ে থাকবে। পাপ আমি করেছি, শাস্তি আমার পাওনা। অপবিত্র আমি, তুমি নও। এক ফোটা পবিত্র শিশির তুমি আমার! যারা আমার সব কেড়ে নিয়েছে, তারাই তোমাকে এখানে এনেছে। আমি কথা দিচ্ছি তোমায়, আমার উত্তরাধিকার... তুমি একদিন তার ধ্বংসের একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়াবে।”

​রক্ত মাখা শরীরেই সন্তানের কপালে চুমু খেল সে। এরপর নিজের গায়ে জড়ানো শার্টটা দ্রুত খুলে কাপড়েই মুড়িয়ে নিল বাচ্চাটাকে। দ্রুত চট্টগ্রামেরই অন্য একটি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটল। ​অপরিণত শরীরটাকে বাঁচাতে হসপিটালে পৌঁছেই ইমার্জেন্সির দরজা ঠেলে দিয়ে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার হাতের ওই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা দেখে ডাক্তার-নার্সরাও চমকে উঠেছিল। পরিস্থিতি বুঝে নার্সরা বাচ্চাটাকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ ছুটলেন এনআইসিইউর ভেতর।

​বেশ কিছুক্ষণ পর এনআইসিইউর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে একজন সিনিয়র চিকিৎসক। সীমান্তকে প্রশ্ন করে,
​
“বাচ্চাটা কি আপনার?”

​কঠিন গলায় উত্তর দেয় সীমান্ত,
​
“জি আমার। কেন, ডাক্তার?”

​ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বলেন,
​“বাচ্চাটার এখনো পৃথিবীতে আসার বয়স হয়নি। প্রি-টার্ম ডেলিভারি। ফিটাসের গ্রোথ বা ডেভেলপমেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ল্যাব টেস্টে বাচ্চার রক্তে যে ধরনের কেমিক্যাল ও টক্সিক ড্রা/গসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে---তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, এর মা গর্ভাবস্থায় মারাত্মক কোনো ড্রা/গস বা টক্সিক কেমিক্যালের শিকার হয়েছেন। এই বিষক্রিয়ার কারণে বাচ্চার স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শরীরে খিঁচুনির লক্ষণ রয়েছে এবং অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতাও প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। ফুসফুস এতটা দুর্বল যে নিজে থেকে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটুকুনও তার নেই। মা নিজেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ আনহেলদি একটা কন্ডিশনের মধ্য দিয়ে গেছেন, যেটার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই নবজাতকের ওপর। এমন একটা কন্ডিশনে শিশুটির সারভাইভ করাটা মিরাকল ছাড়া কিছু নয়।”

“ডাক্তার... ওকে বাঁচান। পৃথিবীর যেকোনো মূল্যে, যত টাকা খরচ হোক আমার সন্তানকে বাঁচাতেই হবে।” সীমান্ত বলল।

“বাচ্চাটার কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল। সারভাইব করার চান্স প্রায় নেই।”

​চিৎকার করে উঠল সীমান্ত,

“না না না! বাঁচতেই হবে ওকে, আমার রক্ত এভাবে ধ্বংস হতে পারে না! ওর মায়ের কাছে পৌঁছানোর জন্য হলেও ওকে বাঁচতে হবে!”

“দেখুন, মিস্টার। আবেগ দিয়ে চিকিৎসা চলে না। প্রি-টার্ম বেবি, তার ওপর রক্তে টক্সিক ড্রাগসের বিষক্রিয়া। বিজ্ঞানের খাতায় এই ড্যামেজ থেকে ফিরে আসার কোনো রাস্তা নেই। মিরাকল ছাড়া ওকে বাঁচানো অসম্ভব। কোনো লজিক্যাল রাস্তা আমাদের হাতে খোলা নেই। তবুও... আমরা আমাদের জায়গা থেকে শেষ চেষ্টা করব।”

—— লেখিকার পেইজ: Ayesha Rin—রিন 

ডাক্তারের রূঢ় ভবিষ্যদ্বাণী আর সায়েন্টিফিক নিরাশাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হলো এক অসম্ভব লড়াই। সাত মাসের সেই অপরিণত পুটলির জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সীমান্ত নিজেকে পরিণত করল অতন্দ্র প্রহরীতে।

পরপর পনেরোটি দিন হাসপাতালের ওই কাঁচঘেরা এনআইসিইউর করিডোরই হয়ে উঠল সীমান্তের একমাত্র ঠিকানা। চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও এক হয়নি তার। হাসপাতালের বেঞ্চিতে বসে কেটেছে দিনের পর দিন, আর রাতের পর রাত সে কাটিয়ে দিয়েছে কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ছোট্ট একটা প্রাণের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার নিজের হৃৎস্পন্দন যেন ওঠানামা করছিল। নিজের বাচ্চার জীবন ভিক্ষার জন্য সে দিনের পর দিন নফল রোজা রেখে, গভীর রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেও ভোলেনি সে। কারণ বাঁচানোর মালিক একমাত্রই সৃষ্টিকর্তা।

চিকিৎসা বিজ্ঞান হার মানতে চেয়েছিল বারবার। রক্তে থাকা সেই মারাত্মক টক্সিক ড্রা”গসের বিষক্রিয়া একে একে আক্রমণ করছিল নবজাতকের নরম অঙ্গগুলোকে। কখনো ফুসফুসে টান পড়ে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে আসত শূন্যের কোঠায়, কখনো খিঁচুনিতে কেঁপে উঠত সেই কাচের ইনকিউবেটরে শুইয়ে রাখা এতটুকু শরীরটা। প্রতিটা সেকেন্ড সেখানে ছিল মৃ/ত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার এক একটা যুদ্ধ।

টানা উনিশ দিনের লড়াইয়ের পর অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বিশতম দিনে সেই সিনিয়র চিকিৎসক বললেন, “মিরাকল সত্যিই ঘটেছে! সে নিজেই এখন শ্বাস নিতে পারছে…”

পাহাড়সম একটা পাথর যেন সীমান্তের বুক থেকে নেমে যায়। কিন্তু এই জয় তো কেবল শুরু। কাচের দেয়ালের ওপার থেকে সদ্য সুস্থ হয়ে ওঠা সেই ছোট্ট হাত-পা ছড়ানো সন্তানকে নিজের শক্ত বাহুতে তুলে নেওয়ার সময় সীমান্তের চোখের কোণে কোনো জল এল না একটুও। তার দৃষ্টি হয়ে উঠল আরও ধারালো, আরও অন্ধকার। যে শরীরটাকে তিলে তিলে বি”ষ খাইয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই র”ক্তেরই এই সন্তানকে সে এমন এক অস্ত্রে পরিণত করবে, যা দিয়ে একদিন নূরজাহান চৌধুরীর পুরো সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে।

বাচ্চাটাকে নিজের হাতে সবটা সামলানোর সুযোগ সে পেল মাত্র কয়েকটা মাস। ​ইরান আর একজন বিশ্বস্ত বেবিসিটারের ওপর নবজাতকটার পুরো দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল সে। ইরান প্রথম থেকেই বাচ্চাটাকে মেনে নিতে চায়নি। সীমান্তের ন্যায় বাচ্চাটার চোখের মনি নীলাভ হওয়ার দরুণ ইরানকে মিথ্যেও বলতে পারেনি। তবে এত কিছুর পরও সীমান্ত ইরানের কাছে দায়ীত্ব দিয়ে, নিজের গ্রামের ভিটেমাটিটুকু বাদে বাকি সমস্ত জায়গা-জমি বিক্রি করে পা বাড়ায় কানাডার উদ্দেশ্যে।

​তার দেশত্যাগের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একটাই। কানাডার মাটিতেই আছে চৌধুরী বাড়ির ছোট ছেলে মেহরাজ এবং মেহরাজের ছোটবেলার প্রাণপ্রিয় বন্ধু ও প্রতিবেশী---শেহরিয়ার ফাইজান বারিশ। ফাইজানকেই নিজের সর্বনাশের খেলায় প্রথম চাল হিসেবে ব্যবহার করা ছিল সীমান্তর মাস্টারপ্ল্যান।

​ইরান আর তার বাবা চৌধুরী বাড়ির কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাটেই ছিল। সীমান্তের নির্দেশমতোই সে আরও আগেই তৈরি করে ঝিলমিলের সাথে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

বর্তমান—

তাহসিন থামল। সে বসে আছে নূরজাহান চৌধুরীর নির্ধারিত সোফায়। তার হাঁটুর ওপর বসা দিগন্ত। নিজের পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সবটা বলছিল সে। কীভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে তুলেছিল ওই অপরিণত নবজাতককে, সেই মর্মান্তিক লড়াইয়ের সাক্ষীও হলো সবাই।

দীঘি, নূরজাহান চৌধুরী আর ঝিলমিলসহ প্রত্যেকের মনের ভেতর তখন আবর্ত খাচ্ছে অজস্র প্রশ্ন। সবাই এখন গার্ডদের বন্দুকের ডগায় বন্দি।

এক কোণে ইরান তখন থেকেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। দীঘি হঠাৎ নিজের মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে আগুন তার। গলায় জমাট ঘৃণা আর হাহাকার,

“মা! আমি তোমাকে কয়েকবার প্রশ্ন করেছিলাম, নিজের সন্তান গর্ভধারণের সময় তোমার অনুভূতি কেমন ছিল? প্রতিবার তুমি এড়িয়ে যেতে। তোমার যদি বাচ্চাটাকে মারারই ইচ্ছা ছিল, কেন প্রথমেই তাকে সরিয়ে দাওনি?”

নূরজাহান চৌধুরীর মুখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। যন্ত্রের মতো উত্তর দিলেন,

“তোমার হেলথ কন্ডিশন তখন খারাপ ছিল। না হলে যখন প্রথম জেনেছিলাম, তখনই মিসক্যারেজ করিয়ে ফেলতাম।”

কথাটা বলেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ছোট্ট দিগন্তের দিকে। চোখের সামনে হাসিমুখ, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এই শিশুটিকে দেখে নূরজাহান চৌধুরীর নিজেরই অবিশ্বাস্য লেগেছিল। বাচ্চাটা কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে? এটা কি আদৌ সম্ভব?

স্মৃতির পাতা হাতড়ে পেছনের দিনে ফিরে গেলেন তিনি। নিজের উনিশ বছরের মেয়ের মধ্যে হঠাৎ এমন অদ্ভুত পরিবর্তন---বমি হওয়া, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া---দেখেই তার মনে সন্দেহের কাঁটা বিঁধেছিল। কারণ মেয়ের চলাফেরা সম্পর্কে তার কড়া নজর ছিল। সন্দেহ হওয়া মাত্র তিনি প্রথমে ঢাকাতেই দীঘির আল্ট্রা করান। সেখানে রিপোর্ট হাতে আসার পরই তিনি দ্রুত তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যান। সেই মুহূর্তে এমনিতেই তিনি প্রচণ্ড বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। একদিকে নিজের ভাই হারানোর শোক, অন্যদিকে একের পর এক বিশ্বস্ত কর্মচারীর রহস্যজনক মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া---সব মিলিয়ে তিনি নিজেও ছিলেন অসুস্থ। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পেরেছিলেন, সেই রাতে ইশানের সঙ্গে ছিল দীঘি। অথচ ততদিনে ইশান আর তার পুরো পরিবারই পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। এটাও ছিল তার চিন্তার বিষয়।

সমাজে যদি জানাজানি হয়ে যায় যে তার মেয়ে বিয়ের আগেই সন্তানসম্ভবা, তবে চৌধুরী পরিবারের ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে, মিডিয়ার শিরোনামে নাম উঠবে কুৎসিতভাবে। তাই তিনি চেয়েছিলেন তক্ষুনি গর্ভপাত করাতে। কিন্তু ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, দীঘির শারীরিক কন্ডিশন এতই নাজুক যে এই মুহূর্তে মিসক্যারেজ করালে তার মেয়েটার লাশ ফিরবে।

উপায় না পেয়ে তখন ভিন্ন পথ ধরেন নূরজাহান। ডাক্তারকে মোটা অঙ্কের টাকায় কিনে নিয়ে পুরো বিষয়টি জরায়ুর টিউমার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম কয়েক মাস দীঘিও এ নিয়ে আর ঘাঁটেনি, কারণ টিউমারের শারীরিক লক্ষণগুলো অনেকটাই প্রেগ্নেন্সির মতো হয়ে থাকে। সাথে তার মায়ের দেখানো রিপোর্ট তো আছেই। তবে পাঁচ মাস পেরোতেই দীঘি পেটের ভেতরে অন্য কিছু টের পেতে শুরু করে। কিন্তু ইশানের স্মৃতি আর মায়ের কথার ওপর অন্ধ আস্থার কারণে সে নিজের সন্দেহকে আর সামনে আনতে পারেনি। পুরো সময়টা নূরজাহান চৌধুরী নিজের মেয়েকে এত বেশি সাপোর্ট করেছে যে এক পলকও দূরে সরতে দেয়নি।

তখন দীঘিকে সুস্থ রাখার নাম করে বা অন্য কোনো বাহানায়  ইনজেকশন, ড্রাগস দেওয়া হতো, যাতে ধীরে ধীরে গর্ভের ভেতরেই বাচ্চাটার মৃত্যু ঘটে এবং দীঘির মনেও এ নিয়ে কোনো জোরালো প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকে। অবশেষে ছয় মাস পূর্ণ হতেই সুযোগ বুঝে সেই মৃতপ্রায় বাচ্চাটাকে জোরপূর্বক সরিয়ে ফেলা হয় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু সেই নর্দমায় ফেলে দেওয়া মৃ/তপ্রায় শিশুটিই আজ মৃ/ত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে জীবন্ত এক ঝড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই চৌধুরী বাড়ির অন্দরমহলে। হয়তো বাচ্চাটা দীঘির চেহারা না পেলে নূরজাহান চৌধুরী বিশ্বাসই করত না এটা দীঘির বাচ্চা।

“তুমি এত জঘন্য মা? একটা পরিবার তুমি ধ্বংস করে দিয়েছ! আর আমার বাবা...”

কথাটা বলতে গিয়ে হুট করে থেমে গেল দীঘি। তার গলা কাঁপছে, চোখের চাহনিতে অবিশ্বাস। এটা তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। তার মা কেন মারবে তার বাবাকে? কোন স্বার্থে?

দীঘি ফের পাগলের মতো মায়ের দিকে ছুটে গিয়ে নূরজাহানের বাহু খামচে ধরে সে আর্তনাদ করে উঠল,

“এই মা, বলো! বলো তুমি, তুমি আমার বাবাকে মারোনি, নাহ? তাহসিন মিথ্যে বলছে, তাই না?”

নূরজাহান চৌধুরী নির্বিকার মুখে চুপ করে রইলেন। ঝিলমিল প্রায় কেঁদে বলে উঠল,

“দাদীমা এমন কাজ করতে পারে না, ফুপি। তাহসিন আঙ্কেলের বুঝতে কোথাও ভুল হয়েছে।”

বারিশ চোয়াল শক্ত করে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ তোকে আমি চুপ থাকতে বলেছি না? যা জানিস না, তা নিয়ে ন্যাকামো করবি না!”

“ আমার দাদীমা…” 

“ একদম চুপ! এতকিছুর পরও আর যাইহোক আমার সামনে তার সাফাই গাইবি না।”

ঝিলমিলের কথায় কান দেওয়ার ফুরসত কোথায় দীঘির? সে কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে ভাববে? নিজের সন্তান, তাহসিনের সাথে ঘটে যাওয়া অতীতের সেই কালো অধ্যায়, নাকি নিজের বাবার খু/নি হিসেবে নিজের মায়ের এই বিকৃত রূপ! এতগুলো সত্য কেন একসাথে, মাত্র এক দিনেই তার সামনে এসে আছড়ে পড়তে হলো? মাথার ভেতর সব গোলমাল হয়ে যাওয়ায় সে ছুটে গেল তাহসিনের কাছে। থরথর করে কাঁপা গলায় দুহাতে তাহসিনের জামা খামচে ধরে সে বলে উঠল,

“আমার সন্তানকে আমার কাছে দাও! আমি ওকে প্রতিদিন দেখতাম। ও আমার স্বপ্নে আসত...” দীঘির গলা তখন কান্নায় ভেঙে আসছে।

তাহসিন ছোট্ট দিগন্তকে কোলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দীঘির শূন্য প্রসারিত হাতের দিকে তাকিয়ে সে ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল,

“সত্যি করে বলুন তো ম্যাম, একটুও বোঝেননি? কেমন নারী আপনি?”

দীঘি ফিসফিস করে কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিল,
“আমি গোলকধাঁধায় ছিলাম।”

তাহসিন অবজ্ঞার হাসল,
“আপনি মিথ্যে বলছেন। সব বুঝতে পেরেও আপনি...”

আর সহ্য হলো না দীঘির। তাহসিনকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে সে তেড়ে উঠল

“ইশানের সন্তান আমার পেটে আসবে---এই চিন্তাটা মাথায় এলেও আমার গা ঘিনঘিন করে উঠত!”

তাহসিন বাঁকা হেসে সে জবাব দিল,

“তাহলে ইশানের মতো ছেলের সঙ্গে পার্টিতে গিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে খুব ভালো লাগত বুঝি?”

তার কটাক্ষে দীঘির চোখ দুটো লাল হয়ে গেল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জে উঠল,

“মুখ সামলে কথা বলবে!”

তাহসিন এক পা এগিয়ে এসে চোখে চোখ রাখল,

“পারব না! মুখ সামলে কথা বলতে পারব না আমি। আপনি না একটা ভালো মা, আর না কোনো ভালো নারী!”

নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আর দীঘি। রাগের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সে চড় বসিয়ে দিল তাহসিনের গালে। দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসে উঠল,

“আর তুই? তুই কেমন পুরুষ যে কিনা একটা মেয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিলি? কোন সাহসে সেদিন রাতে তুই আমায় স্পর্শ করেছিলি?”

তাহসিন চড় খাওয়া গালে হাত না দিয়ে ঠান্ডা হাসি হাসল। দীঘির কানের কাছে ঝুঁকে সে ফিসফিসাল,

“সাহস তো আপনিই দিয়েছিলেন। কোন কোন কথায় সেদিন আমায় কাছে ডেকেছিলেন, মনে করিয়ে দেব?”

দীঘি দুই কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,

“শুনতে চাই না আমি কিচ্ছু! আমার ছেলেকে আমার কাছে দাও বলছি!”

“কে আপনার ছেলে?” নির্বিকার গলায় বলল তাহসিন।

দীঘি দৃষ্টি নামাল। কোলে থাকা ছোট্ট দিগন্ত এখন আতঙ্কিত চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দীঘির চোখ বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছে ঝরঝর জল। বুক ফাটা কান্নায় সে বিড়বিড় করল,
“ও... ও আমার ছেলে।”

ফের ব্যঙ্গাত্মক হাসি নিয়ে বলল তাহসিন,

“সাত মাস পেটে ধরলেই কেউ মা হয়ে যায় না।”

কথাটা যেন দীঘির গায়ের সমস্ত আগুন জ্বালিয়ে দিল। অপেক্ষা করল না আর এক মুহূর্তও। এক ঝটকায় তাহসিনের কোল থেকে দিগন্তকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়ে হিংস্র আক্রোশে তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। সন্তানকে জাপটে ধরে বলল,

“সাত মাস রাখি আর এক মাস রাখি, ও আমার গর্ভেই ছিল! তোর কোনো অধিকার নেই আমার সন্তানকে আমার থেকে আলাদা করার। ও আমার সন্তান, শুধু আমার! দীঘির দিগন্ত!”

বলেই ছোট্ট দিগন্তকে নিজের বুকে চেপে ধরে অঝোরে চুমু খেতে লাগল দীঘি। বুকের ভেতর জমে থাকা সব হাহাকার যেন কান্নার জোয়ার হয়ে উপচে পড়ল। দিগন্তের নরম চুলে হাত বুলিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে ফিসফিসাল,
​
“মাফ করে দাও আমায়, বাবা! আমি অনেক বড় অন্যায় করেছি, আমায় ক্ষমা করো...”

​হকচকিয়ে গেল ছোট্ট শিশুটি। দিগন্ত অবুঝ চোখে দীঘির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আধো আধো গলায় বলল,
​
“মাম্মাম! মাম্মাম... বাবাল ফোনে আমি তোমাকে দেকেচি। বাবা বলত, তুমি আমাল মাম্মাম।”

​নিষ্পাপ মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো যেন দীঘির বুকটাকে একেবারে মুচড়ে দিল। তাহসিন সব সময় নিজের বাচ্চার কথা দীঘিকে বলত। হয়তো মনে করাতে চাইত।

চোখের জল থামানোর কোনো শক্তি তখন দীঘির ছিল না। সে কাঁপাকাঁপা গলায় আকুল হয়ে ছেলেকে ডাকল,
​
“আরেকবার... আরেকবার ‘মাম্মাম’ বলে ডাকো, বাবা!”

​দিগন্ত ফের অবিকল সেই আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল,
​“মাম্মাম!”

ইরান তাচ্ছিল্যমাখা হাসি হেসে মাথা নেড়ে উঠল,
“দীঘির দিগন্ত? সত্যি? নাহ, দীঘির দিগন্ত নয়! এটা সীমান্তের দিগন্ত। তুমি কি জানো, এই নামটা আসলে কার দেওয়া?”

দীঘি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে জানতে চাইল,
 “কে দিয়েছে?”

তাহসিন ধমকে ওঠে,
“ইরান! তোকে একটা শব্দও বলতে বলি নি আমি!”

কিন্তু ইরান ঘৃণা নিয়ে বলে উঠল,
 “কেন বলব না? তুমি কেন নিজের বাচ্চার নাম দিগন্ত রাখবে? যাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি, সেই নারীর দেওয়া নাম কেন সে নিজের র/ক্তকে দেবে? আমার বোন তুরানের ইচ্ছে ছিল, তাহসিন আর ওর সন্তান হলে নাম রাখবে ‘দিগন্ত’! সেই তুরানের দেওয়া নাম অন্য এক নারীর পেটের সন্তানের ওপর বসিয়ে দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে?”

ভেতরের পশুটা নড়ে উঠল তাহসিনের। ধেয়ে গিয়ে ইরানের গায়ে হাত তুলতে গেল। মেহরাজ বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে ইরানকে টেনে নিল নিজের বুকের আড়ালে। তাহসিনের কলার খামচে ধরে সে ধারালো গলায় বলল,

“আমার সামনে আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার কথা ভুলেও ভাববে না, তাহসিন!”

“কীসের স্ত্রী? আমার বোন হবে এই চৌধুরী বাড়ির বউ?” তাহসিনের কন্ঠ বিষাক্ত শোনাল।

​মেহরাজ তার জবাবে শক্ত গলায় বলল,

“চৌধুরী বাড়ির মেয়েকে নিজের বাচ্চার মা বানিয়ে বসে আছে যে, তার মুখে এমন কথা মানায় না। যাইহোক, আমার পরিবারের জন্য আমি লজ্জিত। আজ থেকে আমার কোনো পরিবার বা মা কিছুই নেই। তবুও ইরান আমার সঙ্গেই থাকবে।”

বলতে বলতে মেহরাজ আরও শক্ত করে ইরানকে জড়িয়ে ধরল। ​এদিকে চারপাশের এই হট্টগোলের মাঝে দীঘি হতবিহ্বল হয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তার মানে তুমি আমার জন্য ওর নাম দিগন্ত রাখোনি?”

​স্বাভাবিকভাবেই দীঘির এটাই মনে হয়েছিল যে দিগন্ত নামটা হয়তো শুধু দীঘির নামের সঙ্গেই মিলিয়ে রাখা হয়েছে, অথবা সীমান্ত নামের কোনো প্রতিচ্ছবি হিসেবে। কিন্তু না, এটাও তার জন্য নয়! তাহসিনকে চুপ থাকতে দেখে সে ফের বলে উঠল,

“বলো তাহসিন!”

​তাহসিন নির্বিকার। ঠান্ডা গলায় সে বলল,
“যে কারণেই রাখি আপনার তাতে কী?”

​দীঘির গলা তখন কাঁপছে। সে নিস্তেজ কণ্ঠে ফিসফিসাল,

“কিছুই না...”

হঠাৎ ​লিভিং রুমের নীরবতা ভেদ করে এক ভয়ানক হাসি হেসে উঠল নূরজাহান চৌধুরী। তার উচ্চস্বরের হাসিতে গোটা লিভিং রুম যেন কেঁপে উঠল। উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। হাসতে হাসতে নূরজাহানের চোখ দিয়ে পানিও গড়িয়ে পড়ল।
​সে সরাসরি দীঘির দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসিতে বলল,

“জানতে চেয়েছিলে না, তোমার বাবাকে মে/রেছি কিনা? হ্যাঁ, মে/রেছি! আমি মে/রেছি। নিজে হাতে মে/রেছি! কেন মে/রেছিলাম জানো? কারণ তোমার বাবা তোমার নাম 'দীঘি' রেখেছিল তাই।”

​নূরজাহান চৌধুরীর এই কথায় ঘরের সবার র/ক্ত হিম হয়ে এল। কপাল কুঁচকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তাহসিন আর বারিশও।
​দীঘি বিশ্বাস করতে না পেরে ফ্যাকাশে মুখে বলল,

“আমার নাম 'দীঘি' রেখেছিল বলে আমার বাবাকে মে/রেছ?”

​নূরজাহান চৌধুরী খুব সহজ গলায় বললেন,

“হ্যাঁ।”

​দীঘি দিশাহারা।

“কিন্তু কেন?”

নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন ​নূরজাহান চৌধুরী।

“বললামই তো, কারণ সে তোমার নাম ‘দীঘি’ রেখেছিল।”

​এবারও দীঘি তার কথার মানে কিছুতেই মেলাতে পারল না। তখন নূরজাহান চৌধুরী নিজেই তার বিকৃত মানসিকতার ব্যাখ্যাটা খুলে বললেন,

“কারণ তোমার বাবার প্রাক্তন প্রেমিকার নাম ছিল ‘দীঘি’। আমার স্বামী হয়েও, আমার তিনটে সন্তানের বাবা হয়েও সে তার প্রাক্তনকে ভোলেনি। তাই মে/রে দিয়েছি।”

​এতটা সহজভাবে কথাটা তিনি বলে গেলেন, যেন কোনো ডাল-ভাত খাচ্ছেন! উপস্থিত সকলেই একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ​স্তব্ধতার মাঝে ঝিলমিল এক পলক তাকাল বারিশের দিকে। এতদিন তার ধারণা ছিল, পৃথিবীতে বারিশের চেয়ে বড় টক্সিক বা বিকৃত মনের মানুষ আর কেউ নেই। অথচ আজ নিজের দাদীমাকে দেখার পর তার মনে হচ্ছে বারিশ তার ধারে কাছেও নেই।

বারিশ খিলখিল করে হেসে উঠল। নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে সে ক্রুর হাসিতে বলল,

“আপনি একদম ঠিক করেছেন দাদীমা! আপনার জায়গায় আমি হলেও এমনটাই করতাম। টু/করো টু/করো করে নদীতে ভাসিয়ে দিতাম।”

শেষের কথাটা বলার সময় সে আড়চোখে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে দাঁত পিষল, যা দেখে ঝিলমিলের পিছু দিয়ে বরফ ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ​শিউরে উঠে ভয়ে ঢোক গিলল সে।

​নূরজাহান চৌধুরী তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন,

“নদীতে ভাসিয়ে তো আমি দিতে পারিনি রে! বড্ড ভালোবাসতাম তো! বাপ-মা যখন তার সঙ্গে আমার বিয়ে দিল, তখন থেকেই তাকে বড্ড ভালোবাসতাম। সে না বললেও আমি ঠিক জানতাম তার প্রাক্তন আছে। তবে আমি ভেবেছিলাম, আমাকে ভালোবেসে সে প্রাক্তনকে ভুলে গিয়েছে। অথচ... মেয়ে হওয়ার পর যখন দেখলাম সে নিজের মেয়ের নাম ওই একই রেখে দিয়েছে---যে নামটা আমি সবথেকে বেশি ঘৃণা করি! তখন আমার ভেতরের সব সহ্যশক্তি মরে গিয়েছিল। কিন্তু তখন আমি কিচ্ছু বলিনি। দীঘিও বড় হলো, বাপের আদরের দুলালী হলো তার। আর আমি সুযোগ বুঝে ঠিক সময়ে তাকে মেরে দিলাম। আর আজ... যতবার দীঘি বলে আমি আমার মেয়েকে ডাকি, ততবার আমার মনে পড়ে যায় সেই সুন্দর মুহূর্তটার কথা... যেদিন নিজের হাতে নিজ দায়িত্বে আমি ওই বিশ্বাসঘাতককে শেষ করেছিলাম!”

দীঘির কন্ঠে অবিশ্বাস।

“তুমি... তুমি মজা করছো, মা! তাই না?”

​নূরজাহান চৌধুরী চোখের কোণের জল মুছতে মুছতে বললেন,

“হ্যাঁ, মজা করছি!”

​বাক্যটা শেষ হওয়ামাত্র বাতাসের বেগে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ডের হাত থেকে ছোঁ মেরে রিভলবারটা কেড়ে নিলেন তিনি। চোখের পলকে নলটা ঘুরিয়ে সোজা তাক করলেন তাহসিনের দিকে।

সকলে রেসপন্স করিয়েন। পেজের অবস্থা খারাপ। রেসপন্স পূর্ণ করুন, একদিন পরই গল্প চলে আসবে। ৩ হাজারের বেশি শব্দ এখানে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন