🌙 রাতের আকাশে চাঁদ তুমি
লেখিকা: লামইয়া আক্তার
দ্বিতীয় পর্ব..
চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল জারা। ছোট্ট সাদা কাগজটিতে কালো কালিতে লেখা মাত্র কয়েকটি শব্দ—
“রেজওয়ান চৌধুরীকে বিশ্বাস করো না!”
কথাগুলো বারবার পড়ছিল জারা। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, কে তাকে এমন চিঠি পাঠিয়েছে। আর কেনই বা রেজওয়ান চৌধুরীকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে?
জারা মনে মনে বলল,
— রেজওয়ান চৌধুরী! মানুষটা এমন কী করেছে যে তাকে বিশ্বাস করা যাবে না?
চিঠিটা ভাঁজ করে নিজের ডায়েরির ভেতরে রেখে দিল সে। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে তখন মেঘ জমেছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই মানুষটার কথা, যাকে সে মনে মনে অনেক ভালোবেসেছিল।
কিন্তু সেই মানুষটাই একদিন তার ভালোবাসাকে অপমান করেছিল।
অন্যদিকে চৌধুরী ম্যানশনে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল রেজওয়ান। তার মুখে বরাবরের মতোই গম্ভীর ভাব। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল তার সহকারী রাফি।
— স্যার, আপনার জন্য একটা খবর আছে।
রেজওয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
— বলো।
— জারা সুলতানা সম্পর্কে কিছু তথ্য পেয়েছি।
নামটা শুনতেই রেজওয়ানের হাত থেমে গেল।
— কী বললে? জারা?
— জি স্যার। জারা সুলতানা।
রেজওয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
— মেয়েটার সম্পর্কে সব তথ্য চাই। কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, তার পরিবারের অতীত—সবকিছু।
রাফি কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
— স্যার, মেয়েটা কি আপনার পরিচিত?
রেজওয়ান ঠান্ডা চোখে তাকাল।
— তোমাকে যা করতে বলেছি, সেটা করো। অতিরিক্ত প্রশ্ন করার অভ্যাসটা বাদ দাও।
রাফি আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
রেজওয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটি ঘটনা। একটি ছোট্ট মেয়ে, যার চোখে ছিল অদ্ভুত মায়া। যে মেয়েটি তাকে দেখলেই হাসত। অথচ আজ সেই মেয়েটির নাম শুনলেই তার ভেতরে অজানা অস্থিরতা তৈরি হয়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে জারা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। আজ তাকে কলেজে যেতে হবে। দরজার কাছে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা হলো।
— মা, আমি বের হচ্ছি।
— সাবধানে যাস। আর শোন, বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস।
— কেন মা?
— তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে।
জারা মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মনে হলো মা যেন কিছু একটা লুকাচ্ছেন।
— আচ্ছা মা।
কথাটা বলে বেরিয়ে গেল সে।
রাস্তার মোড়ে এসে একটি কালো গাড়ির পাশে দাঁড়ানো লোকটিকে দেখতে পেল জারা। লোকটি আর কেউ নয়, রেজওয়ান চৌধুরী।
জারা বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল,
— উফ! এই লোকটার সঙ্গে আবার দেখা হতে হবে?
রেজওয়ানও তাকে দেখতে পেল।
— এই যে মিস সুলতানা!
জারা দাঁড়িয়ে পড়ল।
— জি, বলুন মিস্টার চৌধুরী।
— কোথায় যাচ্ছেন?
— সেটা আপনাকে বলতে হবে কেন?
রেজওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আপনার কথাবার্তা একটু কমানো যায় না?
জারা মুচকি হেসে বলল,
— আপনার রাগ একটু কমানো যায় না?
রেজওয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
— আপনি কি সবসময় এভাবেই কথা বলেন?
— না। শুধু আপনার মতো অহংকারী মানুষের সঙ্গে।
কথাটা বলে জারা চলে গেল।
রেজওয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মেয়েটার সাহস দেখে সে সত্যিই অবাক।
কলেজ থেকে ফিরে জারা দেখল তার মা বসার ঘরে বসে আছেন। পাশে একজন অপরিচিত মহিলা।
— জারা, এদিকে আয় মা।
জারা কাছে গিয়ে বসল।
মহিলাটি মিষ্টি হেসে বললেন,
— তুমি নিশ্চয়ই জারা? তোমাকে অনেক দিন ধরেই দেখার ইচ্ছা ছিল।
— আপনি কে, আন্টি?
মহিলাটি উত্তর দেওয়ার আগেই জারার মা বললেন,
— উনি চৌধুরী পরিবারের একজন পরিচিত মানুষ।
চৌধুরী পরিবারের নাম শুনেই জারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— চৌধুরী পরিবার?
— হ্যাঁ মা। রেজওয়ান চৌধুরীর পরিবার।
জারা আর কিছু বলল না। তার মনে পড়ে গেল সেই চিঠির কথা।
রাতে নিজের ঘরে বসে আবার ডায়েরিটা খুলল জারা। চিঠিটা বের করে ভালো করে দেখতে লাগল। হঠাৎ কাগজের একদম নিচে ছোট্ট একটা লেখা চোখে পড়ল।
আগে খেয়াল করেনি সে।
সেখানে লেখা—
“তোমার অতীতের সত্য জানার আগে কাউকে বিশ্বাস কোরো না। বিশেষ করে যে মানুষটিকে তুমি একসময় নিজের পৃথিবী ভেবেছিলে।”
জারার হাত কেঁপে উঠল।
সে বিড়বিড় করে বলল,
— তাহলে কি এই চিঠির সঙ্গে আমার অতীতের কোনো সম্পর্ক আছে?
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো।
টক! টক! টক!
— জারা, দরজাটা খোল।
মায়ের কণ্ঠ শুনে জারা চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল।
দরজা খুলতেই মা বললেন,
— কাল আমাদের চৌধুরী ম্যানশনে যেতে হবে।
— কেন মা?
— রেজওয়ান চৌধুরী নিজে তোকে যেতে বলেছে।
জারা অবাক হয়ে গেল।
— আমাকে? কেন?
মা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,
— সবকিছু কাল বুঝতে পারবি।
অন্যদিকে রেজওয়ান নিজের ঘরে বসে একটি পুরোনো ছবি দেখছিল। ছবিতে ছোট্ট জারা আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট রেজওয়ান।
ছবির পেছনে লেখা ছিল একটি তারিখ।
রেজওয়ান ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
— জারা, তুমি জানো না তোমার পরিবারের কারণে আমার জীবনে কী হয়েছিল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
বার্তায় লেখা—
“জারাকে তোমার কাছ থেকে দূরে রাখো। নাহলে তোমার অতীতের সব সত্য প্রকাশ হয়ে যাবে।”
রেজওয়ানের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে কল দিল। কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।
রেজওয়ান টেবিলে হাত রেখে বলল,
— কে তুমি? সামনে এসো। দেখি কত সাহস তোমার!
কিন্তু সে জানত না, তার অজান্তেই কেউ একজন তাদের দুজনের জীবন নিয়ে খেলছে।
আর জারা?
সে তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার চোখে হাজারো প্রশ্ন।
হয়তো ভালোবাসার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। হয়তো শুরুই হয়নি আসল গল্পের।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—
রেজওয়ান চৌধুরী কি সত্যিই জারার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ, নাকি তার অতীতের কোনো হারিয়ে যাওয়া সত্যের একমাত্র সাক্ষী?