ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা :পুতুল
কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫🚫
পর্ব, ৬
স্নিগ্ধ সকালের নরম রোদের আলোয় পরিবেশটা অনন্ত রূপ ধারণ করেছে। সময় সকাল সাড়ে আটটা। ৯:৩০ টায় মেঘলা কলেজে যাবে, তাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে শাওয়ার সে*রে খেতে বসেছে ডাইনিং টেবিলে। আজ রবিবার,
রাজিয়া বেগমের শরীর দিনকে দিন খা*রা*প হচ্ছে। এ নিয়ে খুব চিন্তিত আছেন আয়ুশ চৌধুরী এবং আয়েশা চৌধুরী।
আয়ান ঢাকার বাইরে গেছে সপ্তাহখানেক হলো। কুমিল্লা গেছে সে। টেবিলে বসে ঘরের দিকে তাকাল মেঘলা। কাঁটায় কাঁটায় পৌনে বাজে ৯ টা বাজে। আর মাত্র ৫০ মিনিট সময় আছে তার হাতে। পরোটা ছিড়ে মুখে দিয়ে যেই না পানির গ্লাসটা হাতে নিয়েছে সে,ওমনি দুই তলার ঘর থেকে চিৎকার এর আওয়াজ শোনা গেল। আয়েশা চৌধুরী কাঁ*দ*ছেন। রাজিয়া বেগম উনার ননদ হলেও দুজন বোনের মতো মিলেমিশে থাকত।মেঘলা উড়নচণ্ডী মনটা আজ বিষন্নতায় চেয়ে গেছে।
আকাশের আজকে অফিসে জয়েন করার কথা ছিল, কিন্তু ফুঁফির অসুস্থতা। আর বাড়ির অবস্থা চিন্তা করে আয়ুশ চৌধুরী আগামী সপ্তাহে জয়েন করার জন্য বলেছেন আকাশকে।আকাশ ও তাতে সাই জানালো।
মেঘলাকে কলেজ দিয়ে আসবে আকাশ। তারপর দশটার দিকে হসপিটাল যাবে।
কাজের মেয়ে নুড়ি আকাশকে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে।মেঘলার খাওয়া শেষ।বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের এক কোণে এসে দাঁড়াল সে।আকাশের প্লেটে নুড়ি গরম গরম পরোটার আলু ভাজি তুলে দিচ্ছে। কিন্তু আকাশের সেদিকে মন নেই। তার চোখ জোড়া এখনো কুঁচকে আছে চিন্তায়। মেঘাকে দেখে আলতো করে হাসার চেষ্টা করল আকাশ। সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না।
“মেঘলা তাড়াতাড়ি ব্যগ নিয়ে তৈরি হয়ে নে। খাওয়ার পর আমি এক মিনিটও দেরি করবো না। আজ তাড়াতাড়ি হসপিটালে যেতে হবে। তাছাড়া রাস্তার যে জ্যাম, তোকে ঠিক সময়ে পোঁছে দিতে হবে আবার।”
আকাশ পরোটার বাজে কামড় দিতে দিতে বলল।
মেঘলা একটা মৃদু সূচক মাথা নাড়ানো। তারপর আমতা আমতা করে বলল, “আকাশ ভাই ফুপি সুস্থ হচ্ছে না কেন?”
আকাশ মেঘলার পানে না তাকিয়ে জবাব দিল,” সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ! চিন্তা করিস না ফুলটুসি।”
মেঘলা ব্যাগ গোছানোর বাহানায় নিজের ঘরে চলে এল।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে,মাথার হিজাব টা ঠিক করে নিল। পুরো বাড়িটাই এক ধরনের ভারী নীরবতা কাজ করছে। কেবল মাঝে মাঝে রাজিয়া বেগমের ঘর থেকে ফুপিয়ে কাঁদার শব্দ আসছে। মেঘলা টাকার পার্স মোবাইলটা বের করে সময় দেখলো। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে নিচে আসলো।
নুড়ী আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে উসখুস করছে। আকাশ বুঝলো তা। খাবার খেতে খেতে আকাশ বলল, “ কিছু লাগবে নাকি তোর? যা বলার সরাসরি বল , আমি আবার কারো মনের কথা পড়তে পারি না নানি!”
অন্য সময় হলে নুড়ি ছেতে যেতে। আজ কিছু বলল না, আর না তো মুখ বাঁকাল। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর মিনমিন করে বলল, ইয়ে মানে ভাইজান …
তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল।
“দূর নানি তখন থেকে কি ইয়ে মানে মানে করে যাচ্ছিস মিন মিন করে? যা বলার ফটাফট বলে পেট পরিষ্কার কর।”
“খবরদার ভাইজান আমারে নানি ফানি কইয়া ডাকবেন না। আমার নাম নুড়ি।”
আকাশ খালি গ্লাসটা এগিয়ে নিয়ে জগতে কে পানি ঢালল। ঢক-ঢক করে পানিটুকু খেয়ে নিল। তারও খাওয়া শেষ। তারপর গলা খাঁকেরী করে দিয়ে, গলা ঝেড়ে বলল, “কি লাগবে বল?”
“আসলে ভাইজান আমার পরীক্ষার ফিঃ লাগবে। আমার কাছে টাকা পয়সা নেই?”
“ওহহু উও এই ব্যাপার।”
বলে আকাশ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে চারটা এক হাজার টাকার নোট দিল নুড়ির হাতে। নুড়ির মুখে ফিচেল হাসি ফুটল।
“আর এই নে ৫০০ টাকার নোটটা রাখ তোর কাছে। যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, কে বলতে পারে!”
নুড়ি ও চুপচাপ নিলো টাকাগুলো। নুড়ি এই বাড়িতে কাজের মেয়ে হলেও তাকে কোনদিন কাজের মেয়ের পরিচয় নেই দেয়নি এ বাড়ির সদস্যরা। সবাই খুব ভালো মানুষ। মেঘলা আর তাকে সমান চোখে দেখে সকলে। কত ভালো এই পরিবার। তার তো আর এমন পরিবার নেই, তাই বুড়ির আফসোস হয়, অনেক আফসোস।
আনমনে ভাবতে ভাবতে নুড়ি কিচেন রুমে চলে গেল।ক্লাস টেনে পড়ুয়া নুড়ি আর মাত্র পাঁচ মাস পর এসএসসি দিবে। শ্যামলা গঠনের মেয়েটাকে দেখতে বেশ মিষ্টি লাগে। কথাবার্তার ধরন আঞ্চলিক ভাষা। যদিএ সে গ্রামের মেয়ে তবু বেড়ে ওঠা শহরের পরিবেশে । আট বছর বয়সে মেয়েটা বাবা সামনে সেটা আকাশের পাশে না বসে
ঠিক নয়টা বেজে১০ মিনিটে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করল আকাশ। গাড়ির এসি টা অন করে দিয়ে হর্ন বাজাতেই মেঘলা দ্রুত এসে পেছনের সিটের পাশে বসল।তার মন ভালো নেই বলে আজ সে সামনের সিটে আকাশের পাশে না গিয়ে বসেনি। নীল রঙের ঝকঝকে Rolls Royce Boat Tail কার গাড়ি টা যখন আলতো শব্দে আবাসন এলাকার গেট পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠলো, তখন চারপাশে চিরচেনা ঢাকা শহরটাকে মেঘলার খুব অচেনা লাগলো।
রাস্তার দু'পাশে বড় বড় শপিং মল, নিয়ন সাইন আর বিলাসবহুল গাড়ির মেলা। অথচ মেঘলার চোখের সামনে ভাসছে শুধু রাজিয়া বেগমের ফ্যাকাসে মলিন মুখটা।
কত ডাক্তার, কবিরাজ দেখানো হয়েছে রাজিয়া বেগমকে। তার হিসাব করা বলাবহুল্য। যদিও আকাশ কবিরাজ টবিরাজি বিশ্বাস করে না তারপরও ফুপির কথা ভেবে সবকিছু মেনে নিয়েছে।
আকাশ, আয়ান নিজেরাও বুঝতে পারছে না রাজিয়া বেগমের আসলে কি হয়েছে। হঠাৎ করে উনার শরীর টা কেমন ফোলে যায়, চোখ দুটো তখন অস্বাভাবিক লাল হয়ে যায়। আয়ুশ চৌধুরী ছোট বোনের সামনে দাঁড়াতে পারছেন না।
************
আকাশ লুকিং গ্লাসে একবার দিকে তাকাল। গাড়ির স্টেয়ারিং হুইলে হাত রেখে বলল,”
“মেঘলা, কলেজের কোনো ছেলেদের সাথে কথা বলবি না, কেউ ফোন নাম্বার চাইলে দিবি না,সরাসরি না বলে দিবি।
একটু।বিরতি নিয়ে,
বর্ষা আর কয়েকজন ফ্রেন্ড ছাড়া কারো সাথে বেশি ভাব জমাবি না। কথা মেনে চলবি?”
এতগুলো কথার বিনিময়ে মেঘলা শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো।
মেঘলা :”আকাশ, আয়ান ভাইয়া উনার দাদুকে নিয়ে ঢাকায় কবে ফিরবে?”
আকাশ : “সময় হলে চলে আসবে ওরা। হয়তো আয়ানের দাদু আসতে চাইছে না। কোন একটা কারণ হবে হয়তো!”
“ওহ,! তাছাড়া ওই লোকটাকে ফুপি কেন দেখতে চাইছেন বুঝলাম না আমি। ফুফা মারা যাওয়ার পর নাকি ফুফির শ্বশুর , ফুপিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ছিল। আয়ান ভাইয়ার জন্ম হয়েছে ছিল আমাদের পুরান ঢাকার রাজবাড়িতে।”
আকাশ :”আমি জানি না। শুধু শুনেছি আম্মুর থেকে।”
মেঘলা আর কিছু বলল না। রাস্তায় জ্যাম বেধেছে প্রায় ১০-১২ মিনিট হবে। এখনো জ্যাম ছাড়ার নাম নেই । শহরাঞ্চলে এমন যানজট প্রায় হয়ে থাকে। এ আর নিত্য নতুন কি।
“এই মেঘলা এভাবে মনমরা হয়ে আছিস কেন রে?”যেন এমন ভান করছিস তোর জামাই ম’রে গেছে!”
নীরবতা ডিঙিয়ে আকাশ বলে। তার কথা শুনে ফিরে তাকালো না অবধি রমণী।
“আকাশ আবারও বলে,ওই ফুলটুসি খারাপ লাগছে?”
“না আকাশ, আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না।”
আকাশ :” চল তাহলে একটা গান শুনায় তোকে। শুনবি পাখি?”
মেঘলা :” হুম শুনাও।”
আকাশ যখনই গানের সুর ধরতে যাবে তখন ফোনটা কেঁপে ভাইব্রেশন বেজে উঠলো।
বিরক্ত হলো না আকাশ। বরং স-যত্নে ফোন রিসিভ করল।
ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে,
“কেমন আছে ভাইয়া?”
আকাশ বিনয়ী সুরে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো ! তুই কেমন আছিস?
আয়ান ফোন করেছে। মেঘলা এতক্ষণ কাচের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে সে ফিরে তাকালো।
চলবে……….
________________________**************
(কোন ভুলত্রুটি হলে মাফ করে দিবেন। কয়েকদিন যাবত আমার চোখে সমস্যা হচ্ছে তাই পর্ব গুলো তাড়াতাড়ি দিতে পারছি না। আর সবাই কমেন্ট করে জানাবেন পর্বটা কেমন হয়েছে)