ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা : পুতুল
পর্ব, ৭
আয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে মেঘলার উদাসীন মনটা মুহূর্তের মধ্যে চনমনে হয়ে উঠল। গত এক সপ্তাহ ধরে আয়ান কুমিল্লায় একটা বিশেষ কাজে আটকে আছে। মেঘলা জানালার কাচ থেকে চোখ সরিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে আকাশের ফোনের দিকে তাকাল। আকাশ স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অন্য হাতে ব্লুটুথ অন করে ফোনটা লাউডস্পিকারে দিল, যাতে মেঘলাও ওপাশের কথা পরিষ্কার শুনতে পায়।
ওপাশ থেকে আয়ান কিছুটা ক্লান্ত অথচ ভীষণ উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "আকাশ ভাই, আম্মু কেমন আছে ? আমার মনটা সকাল থেকেই খুব ছটফট করছে। মনে হচ্ছে বাড়িতে খারাপ কিছু ঘটেছে। হসপিটাল থেকে কোনো আপডেট দিল? আম্মুর শরীর কি আগের চেয়ে একটুও ভালো হয়েছে?"
আকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে স্টিয়ারিংটা শক্ত করে ধরল। দুজনে মিলে কত শত জটিল রোগীকে সুস্থ করে তুলেছে, অথচ আজ নিজের ফুঁপির বেলায় তারা দুজনেই একবুক অসহায়ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আকাশ গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
"শরীর খুব একটা ভালো না রে আয়ান। হসপিটালের বেডেই রাখা হয়েছে। ডাক্তার-কবিরাজ সবই তো চলছে, তুই তো জানিস আব্বু আবার এসব কবিরাজি বিশ্বাস করে। আমরা নিজেরা মেডিসিন স্পেশালিস্ট হয়েও কোনো প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টে ফুঁপির এই হঠাৎ শরীর ফুলে যাওয়া আর চোখ লাল হওয়ার সঠিক কারণ ধরতে পারছি না। তুই নিজের কাজ শেষ করে যত দ্রুত পারিস ঢাকায় চলে আয়।"
"আমি পরশুই চলে আসব ভাই," আয়ান একটু থামল, তারপর চট করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, মেঘলা কেমন আছে? ও কি কলেজে গেছে?"
আয়ানের মুখে নিজের নাম শুনে মেঘলা চটজলদি মাথা তুলে থাকল আকাশের দিকে। আকাশ খেয়াল করল,মেঘলার দু চোখ পানিতে টইটম্বুর করে টলমল করছে । সে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ লুকিং গ্লাসে মেঘলার মুখের এই চঞ্চলতা ভাবটা লক্ষ্য করল। আকাশের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর ভালোবাসার টান কাজ করে উঠল। সে মৃদু হেসে ফোনে বলল, "হ্যাঁ, এই তো ফুলটুসি আমার পাশের সিটেই বসে আছে। একদম চুপচাপ। ওরে কলেজে নামিয়েই আমি সোজা হসপিটালের ডিউটিতে যাব, ফুঁপির কেবিনেই থাকব সারাদিন। তুই চিন্তা করিস না, নিজের খেয়াল রাখিস।"
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর গাড়ির ভেতর আবার সেই ভারী নীরবতা নেমে এল। তবে এবার নীরবতার ধরনটা একটু ভিন্ন। ঢাকার চিরচেনা জ্যাম ঠেলে নীল রঙের ঝকঝকে রোলস রয়্যালস গাড়িটি যখন মেঘলার কলেজের গেটের সামনে এসে থামল, তখন ঘড়িতে পৌনে দশটা বেজে গেছে।
গাড়ি থামতেই মেঘলা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দরজা খুলে নামতে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। আকাশ ড্যাশবোর্ড থেকে সেন্ট্রাল লকটা অন করে দিল। খট করে একটা শব্দ হলো আর দরজার লক আটকে গেল। মেঘলা অবাক হয়ে পেছন ফিরে আকাশের দিকে তাকাল। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে একরাশ বিস্ময়। সে কিছুটা অভিমানী গলায় বলল, "কী হলো আকাশ? লক খুলছ না কেন? আমার ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!"
আকাশ নিজের সিটবেল্টটা খুলে ফেলল। তারপর পেছনের সিটের দিকে ঘুরে মেঘলার খুব কাছাকাছি এসে বসল। আকাশের তীব্র চোখের চাউনি দেখে মেঘলা অস্বস্তিতে পড়ে নিজের হিজাবের কোণায় আঙুল জড়াতে লাগল। আকাশ মেঘলার চিবুকটা আলতো করে নিজের তর্জনী দিয়ে ছুঁয়ে মুখটা ওপরে তুলল। আকাশের চোখে তখন একরাশ মায়া, ভালোবাসা আর তীব্র পজেসিভনেস।
আকাশ নরম অথচ গম্ভীর গলায় বলল, "গাড়িতে ওঠার সময় তো সামনের সিটে এসে বসলি, যেন আমি তোর কেনা ড্রাইভার! খুব তো ভাব দেখাচ্ছিস। রাগ করেছিস আমার ওপর, হুম?"
মেঘলা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "না, রাগ করব কেন? ফুঁপির এই অবস্থা, তার ওপর তুমিও আজ সকাল থেকে মনমরা হয়ে আছ। তাই ভাবলাম ডিস্টার্ব না করি।"
আকাশের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে মেঘলার কপালের ওপর পড়ে থাকা হিজাবের অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল, "তোর এই মেঘলা মুখটা আমার একদম ভালো লাগে না, ফুলটুসি। মন দিয়ে শোন, কলেজে কোনো ছেলের সাথে একদম বাড়তি কথা বলবি না। কেউ যদি তোর ফোন নাম্বার চায়, তবে সরাসরি মুখে না বলে দিবি। আর কোনো ছেলে যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন দিবি। মনে থাকবে তো?"
আকাশের এই আগলে রাখার স্বভাব, এই তীব্র ভালোবাসা মেঘলার বুকের ভেতর এক আলোড়ন সৃষ্টি করল। তার উড়নচণ্ডী মনটা যেন নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল। সে মৃদু মাথা নেড়ে বলল, "আচ্ছা বাবা, মনে থাকবে। এবার লকটা খোলো, সবাই দেখছে।"
আকাশ মুচকি হেসে লকটা খুলে দিল। মেঘলা গাড়ি থেকে নেমে কলেজের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ও তার মন পড়ে রইল গাড়িতে থাকা ওই মানুষটার কাছেই।
বর্ষা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল করিডরের সামনে। মেঘলাকে উদাসীন মন মরা হয়ে আসতে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। মেঘলা টাল সামলাতে না পেরে হকচকিয়ে যায়। বর্ষা মেঘলাকে দুই হাতে ঘুরাতে- ঘুরাতে বলল,
“মেঘলা জানিস,আমার আব্বু আগামী কাল দেশে ফিরছে।”
মেঘলা মলিন হাসি দিয়ে বলে,”ওহ আচ্ছা! ভালো খবর। তুই অনেক খুশি, তাই না?”
বর্ষা দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বুঝাল, অর্থাৎ সে ভীষণ রকমের খুশি।
তারা কথা বলতে বলতে ক্লাস রুমে এসে বসল। বর্ষা একের পর এক প্রশ্ন, উত্তর করেই যাচ্ছে। কেন তার মন খারাপ, কেন কথা বলছে না তেমন সেসব কথা। কিছু না বললে, নতুবা সে মেঘলাকে হাসানোর চেষ্টা করছে।
তবে কলেজের ক্লাসে বসেও মেঘলার মাথায় বারবার ফুঁপির অতীতের কথাগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল। ফুফা মারা যাওয়ার পর কেন ফুঁপির শ্বশুর উনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল? কেন আয়ানের জন্ম পুরান ঢাকার সেই রাজবাড়িতে হয়েছিল? কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে সেই পুরোনো দেওয়ালে?
এদিকে মেঘলাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আকাশ যখন সিটি হসপিটালের ভিআইপি কেবিনের সামনে পৌঁছাল, তখন সেখানকার পরিবেশ একদম থমথমে। কেবিনের বাইরে আকাশের বাবা আয়ুষ চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। উনার পাশে আয়েশা চৌধুরীও চোখ মুছছেন। আকাশ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখল, "আব্বু, কী হয়েছে? ফুঁপি ঠিক আছেন তো? ডাক্তাররা কী বললেন?"
আয়ুষ চৌধুরী আকাশের দিকে তাকালেন। উনার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তিনি কেঁদেছেন। তিনি ভাঙা ও কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, "ডাক্তাররা বলছেন তোর ফুঁপির অবস্থা নাকি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে আকাশ। কোনো ওষুধ কাজ করছে না। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানিস? রাজিয়া একটু আগে যখন জ্ঞান ফিরে পেল, সে শুধু একটা কথাই বারবার জপছে... ও পুরান ঢাকার সেই ফেলে আসা পুরোনো রাজবাড়িতে যেতে চাইছে। কিন্তু আমি কীভাবে ওকে সেখানে নিয়ে যাই? ওই বাড়ির সাথে যে আমাদের পরিবারের একটা পুরোনো অভিশপ্ত অতীত আর শত্রুতা জড়িয়ে আছে!"
আকাশ একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মেডিকেল রিপোর্টগুলো ফাইল থেকে বের করে দেখল, সব নরমাল অথচ রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এটা যেন কোনো চেনা রোগই নয়! সে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা আবার তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। আকাশ পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল কোনো কল নয়, বরং একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা এসেছে। মেসেজটি ইনবক্সে খুলতেই আকাশের পুরো শরীর যেন বরফের মতো হিম হয়ে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হলো। মেসেজে লেখা ছিল—
"যদি রাজিয়া বেগমকে বাঁচাতে চাও ডাক্তার আকাশ চৌধুরী, তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করিয়ে পুরান ঢাকার সেই রাজবাড়িতে চলে এসো। আর হ্যাঁ, একা আসার ভুল কোরো না যেন! মেঘলাকেও সাথে আনতে ভুলো না। নতুবা বড্ড দেরি হয়ে যাবে আর তখন আফসোস করেও লাভ হবে না।"
মেসেজটা পড়ে আকাশের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল, রাগ ও চিন্তায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ফুঁপির এই অদ্ভুত ও রহস্যময় অসুস্থতার সাথে পুরান ঢাকার সেই রাজবাড়ির কী সম্পর্ক? আর সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি মেঘলাকেই বা কেন এই বিপদের মাঝে টেনে আনছে? আকাশ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যাই হয়ে যাক না কেন, সে মেঘলার গায়ে একটা আঁচও লাগতে দেবে না। কিন্তু কীভাবে সে এই রহস্যের জট খুলবে?
(চলবে...)