ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো মেঘলা আকাশ একলা

পর্ব 10

লেখক: কবিতা রহমান মর্তুজা (পুতুল)

ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা : পুতুল।
(কপি করা নিষিদ্ধ) ❌❌❌
পর্ব,১০
অন্ধকার কুঠুরির স্যাঁতসেঁতে বাতাসে টর্চের আলোটা যখন সেই রহস্যময় অবয়বের ওপর পড়ল, তখন চৌধুরী ম্যানশনের সেই জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ আর হসপিটালের চেনা জগৎটা এক নিমিষেই যেন হারিয়ে গেল। লোকটার পরনে কুচকুচে কালো পোশাক, কিন্তু ফ্ল্যাশলাইটের তীব্র আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট হতেই ডক্টর আকাশ চৌধুরীর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। তার সেই দুর্লভ ও মোহনীয় আকাশী রঙের চোখ দুটো  বিস্ময়ে আর গভীর এক ধাক্কায় ছানাবড়া হয়ে গেল।
আকাশ স্তম্ভিত হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, "চাচ্চু?! আসাদ চাচ্চু... আপনি এখানে কীভাবে?!"
হ্যাঁ, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আর কেউ নয়, আকাশের মেজো চাচ্চু আসাদ চৌধুরী! যাকে তার বাবা আয়ুশ চৌধুরী বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন ১৫ বছর আগে। 
আসাদ চৌধুরীর চোখে কোনো ক্রূরতা বা হিংস্রতা ছিল না, বরং সেখানে ছিল এক বুক হাহাকার আর গভীর ক্লান্তি। তিনি তার মুখের কালো কাপড়টা টেনে নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 
সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দে মাটির নিচের পুরোনো দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম ও অপরাধীর মতো গলায় বললেন, "হ্যাঁ রে আকাশ, আমিই তোদের এই মেসেজটা পাঠিয়ে এখানে ডেকে এনেছি। আমাকে ক্ষমা করিস বাবা, তোদের এভাবে ভয় দেখানোর কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।
 কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে এই ছদ্মবেশ ধারণ করা ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।"
মেঘলা ভয়ে আকাশের পিঠের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আসাদ চৌধুরীকে দেখছিল। এই অন্ধকার আর ছমছমে পরিবেশে নিজের মেজো চাচ্চুকে দেখে মেঘলার বুকের ভেতরের ভয়টা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
 সে আকাশের লেদার জ্যাকেটটা ছেড়ে দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে এসে বড়দের সামনে যেভাবে ডাকে, সেভাবে নিকু স্বরে বলল, "আসাদ চাচ্চু! তুমি এখানে কেন? আর ফুঁপি কেন এই রাজবাড়িতে আসতে চাচ্ছিলেন? প্লিজ আমাদের বলো, আমাদের খুব চিন্তা হচ্ছে।"
আসাদ চৌধুরী মেঘলার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসলেন। তারপর কাউন্টডাউন ঘড়ির দিকে তাকালেন, যেখানে লাল রঙের ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় দ্রুত কমে আসছে—আর মাত্র ৭ মিনিট বাকি!
আসাদ চৌধুরী চটজলদি দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং কাচের পাত্রে রাখা নীল রঙের তরল প্রতিষেধকটি সাবধানে নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি সেটি আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "আকাশ, আগে এই অ্যান্টিডোটটা তুই তোর নিজের জিম্মায় নে। এটা আর কিছু নয়, এটা হলো আমাদের রাজিয়া আপার জীবনের শেষ ভরসা।
 তোরা নিজেরা ঢাকার সিটি হসপিটালের সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হয়েও কেন প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টে এই রোগের কারণ ধরতে পারছিলি না, জানিস? কারণ রাজিয়া আপার শরীরে কোনো সাধারণ রোগ বাসা বাঁধেনি। ওনাকে বহু বছর আগে থেকে একধরণের স্লো পয়জন (ধীরে কাজ করা বিষ) দেওয়া হচ্ছিল, যার ফর্মুলা কেবল এই রাজবাড়ির পুরোনো নথিতেই লুকিয়ে ছিল।"
আকাশের আকাশী রঙের চোখ দুটো এবার আরও গভীর হলো।
 সে প্রতিষেধকের ভায়ালটা সযত্নে নিজের হাতে তুলে নিয়ে পকেটে রাখল।
 একজন ডাক্তার হিসেবে সে বুঝতে পারছিল, সময় হাত থেকে বালির মতো গলে যাচ্ছে। 
আর মাত্র ৬ মিনিট! এখান থেকে সিটি হসপিটালের দূরত্ব জ্যাম ছাড়া পার হতেও অন্তত কিছু সময় লাগবে।
আকাশ অত্যন্ত ব্যাকুল গলায় বলল, "চাচ্চু, আপনি ভালো মানুষ, আমি জানি। কিন্তু আপনি আমাদের এই মেসেজে মেঘলাকে কেন সাথে আনতে বললেন? মেঘলার সাথে এই বিষের কী সম্পর্ক?"
আসাদ চৌধুরী মেঘলার গলার লকেটের দিকে নির্দেশ করে বললেন, "কারণ এই লকেটের ভেতর যে গোপন কোডটা লুকিয়ে আছে, সেটা ছাড়া এই কাচের কুঠুরি খোলা সম্ভব ছিল না আকাশ। রাজিয়া আপা নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে মেঘলাকে। তিনি জানতেন, একদিন যদি ওনার জীবনে এমন কোনো বড় বিপদ আসে, তবে কেবল তোদের দুজনের ভালোবাসাই ওনাকে বাঁচাতে পারবে। আমি যদি সরাসরি তোদের বলতাম, তবে চৌধুরী ম্যানশনের বাকিরা হয়তো আমাকে বিশ্বাস করত না।
এমনিতেই বড় ভাইজান আমাকে অবিশ্বাস করে, উনার বাড়ির দোরগোড়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।  তাই বাধ্য হয়ে এই নাটক করতে হয়েছে।"
ঠিক তখনই মাটির নিচের করিডোরে চটজলদি কিছু পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। অন্ধকার ভেদ করে সেখানে হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির হলো আকাশের  ফ্রেন্ড নিলয় এবং ফুপাতো ভাই আয়ান ! কুমিল্লা থেকে ফিরে আয়ান সোজা এখানে চলে এসেছে।
আয়ান  হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই আসাদ চৌধুরীকে দেখে থমকে গেল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আসাদ মামা! আপনি এখানে? তার মানে আপনিই আম্মুকে বাঁচানোর জন্য এই অ্যান্টিডোটের ব্যবস্থা করেছেন?"
আসাদ চৌধুরী মাথা নাড়লেন। নিলয় আকাশের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "আকাশ, দোস্ত! উপরে আমি আর আবির, নীরব, আরহাম, মাহিন, আর রোদ্দুর—সবাই বাইক আর গাড়ি নিয়ে রেডি আছি। পুরো ফ্রেন্ড সার্কেল রাস্তার জ্যাম ক্লিয়ার করার জন্য ট্রাফিকের মতো পজিশন নিয়ে নিয়েছে। তোরা শুধু এখান থেকে বের হ!"
আকাশের বন্ধুরা যে এই বিপদের সময়ে এভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে আকাশের বুকে এক নতুন বল সঞ্চার হলো। কাউন্টডাউন ঘড়িতে এখন সময় মাত্র ৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ড!
আকাশ আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চাইল না। সে মেঘলার দিকে তাকাল। মেঘলা তখনো নিজের ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু ঝরছে। বন্ধুদের সামনে সে আকাশকে যেভাবে ডাকে, সেভাবেই উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল, "আকাশ! আর সময় নেই! চলো জলদি হসপিটালে যেতে হবে! ফুঁপিকে আমাদের বাঁচাতেই হবে!"
বন্ধুদের সামনে মেঘলার মুখে এই সরাসরি ‘আকাশ’ ডাক শুনে নিলয় আর আয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, তাদের এই মিষ্টি রসায়ন বন্ধুদের নজর এড়ায় না। 
আকাশ অবশ্য বন্ধুদের সেই হাসিকে পাত্তা না দিয়ে মেঘলার হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
তারা যখন রাজবাড়ির অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে আলোর জগতে এসে পৌঁছাল, তখন দুপুরের কড়া রোদ আকাশের আকাশী রঙের চোখে এসে পড়ল। বাইরে তখন আকাশের বাকি বন্ধুরা—আবির, নীরব, আরহাম, মাহিন এবং রোদ্দুর—সবাই নিজেদের বাইক স্টার্ট দিয়ে রেডি হয়ে আছে।
নিলয় চিৎকার করে বলল, "আকাশ, তুই মেঘলাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠ! আমরা সামনে থেকে রাস্তা ক্লিয়ার করে নিয়ে যাচ্ছি!"
আকাশ মেঘলাকে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসল। নীল রঙের ঝকঝকে রোলস রয়্যালস গাড়িটি যখন তীব্র গতিতে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি পেরিয়ে মেইন রোডের দিকে ছুটছে, তখন আকাশের বন্ধুরা বাইক নিয়ে ডানে-বামে ট্রাফিক সামলাচ্ছিল। আকাশ এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত দিয়ে মেঘলার হিম হয়ে যাওয়া হাতটা নিজের ওপরে রাখল।
গাড়ি যখন সিটি হসপিটালের ভিআইপি কেবিনের সামনে এসে এক ঝটকায় ব্রেক করল, তখন চারপাশের আত্মীয়স্বজন আর আকাশের বাবা আয়ুষ চৌধুরী ও মা আয়েশা চৌধুরী করিডোরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। আকাশ গাড়ি থেকে নেমে মেঘলাকে সাথে নিয়ে কেবিনে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখন তার চাচা-চাচিরা তাদের পথ আগলে দাঁড়ালেন।
আত্মীয়স্বজনদের সামনে মেঘলা নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে চাইল। আত্মীয়দের সামনে সামাজিকতা বজায় রেখে সে নিছু স্বরে বলল, "আকাশ ভাই, আপনি ভেতরে যান। ফুঁপিকে এই ওষুধটা জলদি দিন।"
আকাশ আত্মীয়দের সামনে মেঘলার এই মর্যদাপূর্ণ ও লক্ষ্মী মেয়ের মতো আচরণ দেখে মনে মনে ভীষণ গর্ববোধ করল। সে সবার সামনে মেঘলার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসার সুরে তুমি করে বলল, "তুমি একদম চিন্তা কোরো না মেঘলা। আমি ভেতরে যাচ্ছি। তুমি আব্বু আর আম্মুর পাশে গিয়ে দাঁড়াও।"
আকাশ প্রতিষেধকটা নিয়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেল। কেবিনের দরজা বন্ধ হতেই বাইরে অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হতে লাগল। মেঘলা করিডোরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গলার লকেটটা তখনো তার বুকে দুলছে। রাজবাড়ির রহস্যের একটা জট হয়তো খুলেছে, আসাদ চাচ্চু যে একজন ভালো মানুষ তাও জানা গেছে, কিন্তু ফুঁপির শরীরে এই বিষ কে পঁচিশ বছর ধরে দিচ্ছিল? সেই আসল অপরাধী কি তবে এখনো চৌধুরী ম্যানশনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে?
(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন