ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা : পুতুল
(কপি করা নিষিদ্ধ) ❌❌❌
পর্ব , ৯
চলন্ত রোলস রয়্যালস গাড়িটি আচমকা রাস্তার একপাশে ব্রেক করার কারণে টায়ারের একটা তীব্র ঘর্ষণের শব্দ হলো। গাড়িটা থমকে দাঁড়ানোর সাথে সাথে মেঘলা সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপছে। ফোনের ওপাশ থেকে আয়ােনের শেষ কথাগুলো যেন এখনো আকাশের কানের পর্দায় তীরের মতো বিঁধছে। "চাবিটা আমাদের মেঘলার গলার সেই পুরোনো রুপোর লকেটের ভেতর লুকানো আছে... রাজবাড়িতে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ পাতা আছে, তোমরা ভুলেও সেখানে যেও না!"
আকাশের হাত দুটো স্টিয়ারিংয়ের ওপর শক্ত হয়ে জমে রইল। তার চোখ জোড়া অবিশ্বাস্য এক চাউনি নিয়ে মেঘলার গলার দিকে নিবদ্ধ হলো। মেঘলা ভয়ার্ত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ফর্সা ও নরম হাতটা তখনো নিজের অজান্তেই আকাশের ডান হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। পরিবেশটা এতটাই স্তব্ধ যে দুজনের নিঃশ্বাসের ওঠানামার শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
মেঘলা আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আকাশ ... আয়ান ভাইয়া ফোনে কী বলছিল? লকেটের কথা কেন বলল? আর ফুঁপির কী হয়েছে? তুমি এমন থমকে গেলে কেন, প্লিজ আমাকে বলো। আমার খুব ভয় করছে!"
আকাশ কোনো কথা বলল না। সে তার বাম হাতটা বাড়িয়ে মেঘলার গলার সেই পুরোনো, কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়া রুপোর লকেটটা আলতো করে নিজের আঙুলের ডগায় তুলে নিল। এই লকেটটা মেঘলা ছোটবেলা থেকেই পরে থাকে। ফুঁপি রাজিয়া বেগম নিজ হাতে তাকে এটি পরিয়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, "এই লকেট কখনো গলা থেকে খুলবি না মেঘলা, এটা তোর রক্ষাকবচ।" আজ এত বছর পর জানা গেল, এটি কোনো সাধারণ লকেট নয়, বরং পুরান ঢাকার সেই রহস্যময় রাজবাড়ির মাটির নিচের গোপন কুঠুরির একমাত্র চাবি!
আকাশ লকেটটার কারুকাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সে লজিক আর সায়েন্স ছাড়া কিছু বোঝে না। কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছে, তাদের জীবনের চারপাশের অদৃশ্য কোনো শত্রু এক সুনিপুণ চাল চালছে। সে মেঘলার আতঙ্কিত মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে জল টলমল করছে।
আকাশ তার হাত দিয়ে মেঘলার গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই নরম হয়ে এল, "ভয় পাস না ফুলটুসি। যতক্ষণ আমি আছি, এই পৃথিবীর কোনো শক্তি তোর একটা চুলও স্পর্শ করতে পারবে না। এটা আকাশ চৌধুরীর প্রতিজ্ঞা।"
মেঘলা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো, “আকাশ ফুঁফিকে নিয়ে যাবে না আমাদের সাথে?”
আকাশ বলল,
“ না ফুফির অবস্থা ক্রিটিকাল । উনাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার অবস্থা নাই উনি।”
আকাশের এই আশ্বাসে মেঘলার মনের ভেতরের ঝড়টা কিছুটা শান্ত হলো বটে, তবে কৌতূহল আর কাঁপন থামল না। আকাশ গাড়িটা আবার স্টার্ট দিল। এখন আর চৌধুরী ম্যানশনে ফেরার সময় নেই। ২৪ ঘণ্টার ডেডলাইন শুরু হয়ে গেছে। ফুঁপি হসপিটালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, আর তার জীবনের প্রতিষেধক রয়েছে ওই অভিশপ্ত রাজবাড়িতে। আকাশ গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা রওনা হলো পুরান ঢাকার দিকে।
গাড়ি যখন জ্যাম ঠেলে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলিপথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আকাশ পকেট থেকে তার ব্লুটুথ হেডসেটটা কানে গুঁজে নিল। সে হসপিটালের বিশ্বস্ত জুনিয়র ডাক্তার রিয়াদকে ফোন করল।
ফোন রিসিভ হতেই আকাশ গম্ভীর ও আদেশসূচক গলায় বলল, "রিয়াদ, ডক্টর আকাশ বলছি। সিটি হসপিটালের ভিআইপি কেবিনে থাকা রাজিয়া বেগমের কন্ডিশন এখন কেমন? কোনো চেঞ্জ আছে?"
ওপাশ থেকে রিয়াদ কিছুটা আমতা আমতা করে বলল, "স্যার, পেশেন্টের অবস্থা একদম স্ট্যাবল নয়। ওনার পালস রেট ক্রমশ ড্রপ করছে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় কী জানেন স্যার? ওনার বডি কালারটা কেমন যেন নীলাভ হয়ে আসছে। আমরা সব রকমের লাইফ সাপোর্ট রেডি রাখছি, কিন্তু প্যাথলজিক্যাল কোনো সলিউশন পাচ্ছি না। আপনি কোথায় স্যার?"
"আমি একটা বিশেষ কাজে হসপিটালের বাইরে আছি। তোমরা ওনাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখো। কোনো রকম ইমার্জেন্সি হলে আমাকে আর ডক্টর আয়ানকে ইমিডিয়েট ইনফর্ম করবে।" আকাশ ফোনটা কেটে দিল।
পাশে বসে থাকা মেঘলা সব শুনছিল। ফুঁপির শরীর নীলাভ হয়ে যাওয়ার কথা শুনে সে আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রাজিয়া বেগম এই বাড়িতে মেঘলাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছেন। আজ সেই মানুষটা মৃত্যুর মুখে, অথচ তারা কতটা অসহায়!
আকাশ এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত দিয়ে মেঘলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে টেনে নিল। সে মেঘলাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। কারণ সে নিজেও একজন ডাক্তার হয়ে আজ প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় বোধ করছে।
গাড়িটা যখন পুরান ঢাকার সেই পরিচিত ঐতিহ্যবাহী, কিন্তু জরাজীর্ণ আবাসন এলাকার গেট পার হয়ে ভেতরের গলিতে ঢুকল, তখন চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন রহস্যময় ঠেকল। দুপাশে পুরোনো আমলের চুনকাম খসে পড়া বড় বড় দালান, সরু রাস্তা। গাড়ি আর বেশি দূর যাওয়ার উপায় নেই। আকাশ গাড়িটা একটা নিরাপদ জায়গায় পার্ক করল।
সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল, "মেঘলা, গাড়ি থেকে নামো। এখান থেকে আমাদের হেঁটেই যেতে হবে।"
মেঘলা ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছে মাথা নাড়ল। গাড়ি থেকে নেমে তারা দুজনে যখন সেই জরাজীর্ণ সিংহদুয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন মেঘলার গা শিউরে উঠল। এটাই সেই রাজবাড়ি! চারদিকে বড় বড় অশ্বত্থ গাছ দেওয়াল ভেদ করে উঠে গেছে। এককালের জমকালো রাজবাড়ির গৌরব এখন কেবল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দিনের আলোতেও এই বাড়ির ভেতরটা কেমন যেন অন্ধকার আর ছমছমে লাগছে।
আকাশ মেঘলার হাতটা এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ল না। সে তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা অন করল। ঠিক তখনই আকাশের ফোনে আবার সেই অপরিচিত নম্বর থেকে একটা টেক্সট মেসেজ এল। আকাশ স্ক্রিন অন করতেই দেখল লেখা—
স্বাগতম ডাক্তার আকাশ চৌধুরী। সময়মতোই এসেছ দেখছি। বাড়ির পেছনের দিকের বড় হলরুমের নিচে নেমে এসো। চাবিটা তো সাথে এনেছই। মনে রেখো, কোনো চালাকি করার চেষ্টা করলে রাজিয়া বেগমের লাশ হসপিটাল থেকে সোজা শ্মশানে যাবে।"
একটু থেমে আবার কিছুক্ষণের মধ্যে আরেকটা মেসেজ আসলো ,
__ “কিন্তু রাজিয়া বেগমকে কেন আনলে না?”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করল, ফুফির অবস্থা ক্রিটিকাল। আপনাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে এখানে আনো সম্ভব!”
মেসেজটা দেখে আকাশের চোখ মুখ রাগে কুঁচকে গেল। সে চারপাশটা ভালো করে দেখল, কোনো সিসি ক্যামেরা বা কেউ তাদের ওপর নজর রাখছে কি না। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। অথচ নিখুঁতভাবে কেউ তাদের প্রতি মুহূর্তের খবর রাখছে।
আকাশ মেঘলাকে নিয়ে ধীর পায়ে রাজবাড়ির ভাঙা করিডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকল। প্রতিটা পদক্ষেপে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ হচ্ছে। মেঘলা ভয়ে আকাশের একদম গা ঘেঁষে হাঁটছিল। তার গলার লকেটটা তখনো তার বুকের ওপর ওঠানামা করছে।
হলরুমের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই তারা দেখতে পেল মাটির নিচে নেমে যাওয়ার একটা পুরোনো পাথুরে সিঁড়ি। সিঁড়ির মুখটা অন্ধকার কালো গহ্বরের মতো দেখাচ্ছে। আকাশ মেঘলার দিকে তাকিয়ে গভীর চোখে তাকাল এবং বলল, "ভয় পাচ্ছিস, মেঘলা পরী?"
মেঘলা আকাশের চোখের দিকে চেয়ে নিজের সব ভয় ভুলে গেল। সে আকাশের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল, "তুমি সাথে থাকলে আমার কোনো ভয় নেই আকাশ ।"
আকাশ মৃদু হাসল, তবে সেই হাসির আড়ালে ছিল এক কঠিন প্রতিজ্ঞা। সে মেঘলাকে নিয়ে সেই অন্ধকার পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। মাটির নিচে নামার সাথে সাথেই এক স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তাদের নাকে এল। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় তারা দেখতে পেল একটা বিশাল লোহার দরজা, যার ঠিক মাঝখানে মেঘলার গলার লকেটের হুবহু আকৃতির একটি খাঁজ কাটা রয়েছে।
আকাশ মেঘলার দিকে ফিরে বলল, "মেঘলা, লকেটটা খোলো।"
মেঘলা কাঁপাকাঁপা হাতে গলা থেকে রুপোর লকেটটা খুলে আকাশের হাতে দিল। আকাশ লকেটটি সেই লোহার দরজার খাঁজে বসিয়ে দিতেই একটা ভারী যান্ত্রিক শব্দ হলো। খটখট শব্দ করে বিশাল লোহার দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় তারা দেখতে পেল ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি কাচের পাত্রে নীল রঙের একটা তরল রাখা আছে—সেটাই সেই কাঙ্ক্ষিত অ্যান্টিডোট! কিন্তু সেই পাত্রের ঠিক ওপরেই দেওয়াল ঘড়িটায় সময় কাউন্টডাউন হচ্ছে। আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি!
ঠিক তখনই ঘরের কোণ থেকে একটা অট্টহাসির শব্দ ভেসে এল। অন্ধকার ভেদ করে সামনে এগিয়ে এল এক রহস্যময় অবয়ব। সেই লোকটিকে দেখামাত্রই আকাশের চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। লোকটার পরনে কালো পোশাক, কিন্তু মুখটা চেনা।
আকাশ স্তম্ভিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, "তুমি?!৷ ছোট চাচ্ছু তুমি এখানে কীভাবে?!"
(চলবে...)