ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো মেঘলা আকাশ একলা

পর্ব 12

লেখক: কবিতা রহমান মর্তুজা (পুতুল)

ওগো মেঘলা আকাশ একলা

লেখিকা : পুতুল

(কপি করা নিষিদ্ধ) ❌❌❌

 পর্ব,১২

হাসপাতালের সাদা ঠান্ডা করিডোর পেরিয়ে সবাই যখন লিফটের দিকে এগোচ্ছে, তখনো মেঘলার পায়ের নিচে মাটির স্পর্শ যেন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। চারপাশের মানুষের কোলাহল, বন্ধুদের চটুল আড্ডা—সবকিছুই তার কাছে এক কুয়াশাচ্ছন্ন অবাস্তব জগতের মতো লাগছিল। চৌধুরী ম্যানশনের বড়দের চোখের আড়ালে আসতেই মেঘলা একটা লম্বা শ্বাস নিল। লিফটের স্টিলের দরজায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে আলতো করে তার গলার সেই পুরোনো রুপোর লকেটটা ছুঁয়ে দেখল।

 যে লকেট এত বছর ধরে তার গলায় একটা সাধারণ গয়না হয়ে ছিল, আজ সেটাই একটা বংশের অন্ধকার ইতিহাস আর ফুঁপির জীবনের চাবিকাঠি হয়ে সামনে এসেছে, এটা ভাবলেই তার গা শিউরে উঠছে।

লিফটের ভেতরে ঢোকার পর নিলয় আকাশের কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, "কী রে ডাক্তার সাহেব? মুখটা এমন গম্ভীর করে রেখেছিস কেন? ফুঁপি তো এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত। এবার একটু হাস দেখি!"

নিলয়ের কথায় আবির, নীরব আর আরহামও সায় দিল। আরহাম বলল, "একদম ঠিক! আমরা যেভাবে ঢাকার মেইন রোডের জ্যাম ক্লিয়ার করে তোদের হসপিটালে আসার রাস্তা করে দিয়েছি, ট্রাফিক পুলিশও আমাদের এই স্পিড দেখে থমকে গিয়েছিল। আজ কিন্তু ক্যাফেটেরিয়ায় কোনো সাধারণ চা-বিস্কুট দিয়ে পার পাবি না আকাশ!"

আকাশ তার বন্ধুদের এই ভালোবাসাপূর্ণ বাঁদরামিতে একটু হাসল। তার সেই দুর্লভ ও মোহনীয় আকাশী রঙের চোখ দুটো বন্ধুদের দিকে এক পলক তাকিয়েই আবার চট করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘলার ওপর গিয়ে স্থির হলো। 

লিফটের হালকা আলোয় আকাশের সেই আকাশী চোখ দুটো যেন এক অদ্ভুত মায়াবী আলো ছড়াচ্ছিল। 

সে দেখল মেঘলা তখনো বেশ চুপচাপ, তার ফর্সা মুখটাতে ভয়ের রেশ পুরোপুরি কাটেনি।

আকাশ একটু এগিয়ে এসে মেঘলার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। লিফটের ভেতরে বন্ধুদের ছাড়া আর কোনো বড়রা নেই, তাই আকাশ তার চিরচেনা সেই গভীর ও পজেসিভ কণ্ঠস্বরে মেঘলাকে সরাসরি ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে ফিসফিসিয়ে বলল, "মেঘলা, তুই এখনো কাঁপছিস কেন রে? ফুঁপি তো ভালো আছেন। আর তোকে তো আমি বলেছি, যতক্ষণ আমি আছি, কোনো বিপদ তোকে ছুঁতেও পারবে না। নিজের ওপর একটু ভরসা রাখ, ফুলটুসি।"

আকাশের এই হঠাৎ খুব কাছ থেকে ‘তুই’ বলে শাসন আর ভালোবাসার মিশ্রণ মেঘলার বুকের ভেতরের ধকধকানি আরও বাড়িয়ে দিল। সে চোখ তুলে আকাশের সেই সুন্দর আকাশী চোখের দিকে তাকাল। বন্ধুদের সামনে সে আকাশকে যেভাবে নামে ডাকে, 

সেভাবেই লাজুক কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "আকাশ, আমি ফুঁপিকে নিয়ে আর ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, রাজবাড়ির সেই অন্ধকার কুঠুরির রহস্য এখনো শেষ হয়নি। আসাদ চাচ্চুর ওভাবে ছদ্মবেশ ধরে থাকা... সবকিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে আমার মাথায়।"

মেঘলার মুখে সরাসরি নিজের নাম ‘আকাশ’ শুনে আকাশের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে মেঘলার হাতটা সবার আড়ালে একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "সব জট আমি এক এক করে খুলব, তুই শুধু নিজের শরীরের খেয়াল রাখ।"

লিফটের দরজা খুলে যেতেই সবাই হাসপাতালের দোতলার বড় ক্যাফেটেরিয়ার দিকে পা বাড়াল। দুপুরের এই সময়ে ক্যাফেটেরিয়াটা বেশ ফাঁকা ছিল। 

এককোণের একটা বড় টেবিল ঘিরে সবাই বসল। মাহিন আর রোদ্দুর মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে নিলয়ের সাথে বিশাল এক খাবারের লিস্ট তৈরি করতে বসে গেল।

টেবিলের এক প্রান্তে মেঘলা বসার সাথে সাথেই আকাশ নিজে গিয়ে মেঘলার পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। তার এই পজেসিভনেস বন্ধুদের চোখ এড়াল না। নিলয় চোখ টিপে আবিরকে ইশারা করতেই আবির একটু কেশে বলল, 

"হুম, তা ডক্টর আকাশ চৌধুরী, ফুপাতো ভাই আয়ান সিকদারকে তো দেখছি পুরোই নীরব মোডে চলে যেতে। আয়ান, তুই কুমিল্লা থেকে কী এমন সত্য জেনে এলি রে ভাই, যা শুনে তুই হসপিটালের করিডোর থেকেই কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছিস?"

বন্ধুদের এই প্রশ্নে এতক্ষণ চুপ করে থাকা আয়ান  সবার দিকে তাকাল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু ও কাঁপা গলায় বলল, 

"আকাশ,ভাইয়া  আমি কুমিল্লায় আম্মুর  শ্বশুরের পুরোনো এক বিশ্বস্ত নায়েবের দেখা পেয়েছিলাম। সে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায় আমার হাত ধরে এক ভয়ঙ্কর সত্য প্রকাশ করে গেছে। আম্মুর  এই রোগ কোনো স্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতা নয়। ওনাকে গত পঁচিশ বছর ধরে একধরণের অত্যন্ত ধীরগতির বিষ বা স্লো পয়জন দেওয়া হচ্ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা কী জানো? এই বিষের ডোজটা খুব নিখুঁতভাবে ওনার প্রতিদিনের খাবারের সাথে মেশানো হতো!"

আয়ানের এই কথাটি শোনা মাত্রই পুরো টেবিলজুড়ে এক শিউরে ওঠা নীরবতা নেমে এল। মাহিন আর রোদ্দুরের হাতের মেনু কার্ডটা টেবিলে পড়ে গেল। মেঘলা ভয়ে দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরল।

আকাশের আকাশী রঙের চোখ দুটো রাগে ও তীব্র ক্ষোভে নিমেষেই আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে টেবিলের ওপর হাতটা শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,

 "তার মানে... যে মানুষটা ফুঁপিকে এই বিষ দিচ্ছিল, সে বাইরের কেউ নয়! সে চৌধুরী ম্যানশনেরই কোনো অত্যন্ত চেনা এবং ভেতরের মানুষ! যে প্রতি মুহূর্তে ফুঁপির আশেপাশে থাকত!"

আয়ান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, "হ্যাঁ আকাশ ভাইয়া । আসাদ মামা এই সত্যটা আগেই কোনোভাবে টের পেয়েছিলেন। কিন্তু ওনার কাছে কোনো অকাট্য প্রমাণ ছিল না। তাই উনি চৌধুরী ম্যানশনের সেই আসল অপরাধীকে ফাঁদে ফেলার জন্যই নিজের পরিচয় লুকিয়ে পুরান ঢাকার ওই অভিশপ্ত রাজবাড়ির মাটির নিচের গোপন কুঠুরিতে প্রতিষেধক নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। উনি জানতেন, বিষের শেষ ডোজটা পুশ করার পর অপরাধী যখন ভাববে রাজিয়া আপা শেষ, ঠিক তখনই এই প্রতিষেধক ওনাকে বাঁচিয়ে তুলবে এবং অপরাধীর পায়ের তলার মাটি সরে যাবে।"

নীরব আর আরহাম এবার গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। আরহাম বলল, "কিন্তু আসাদ আঙ্কেল তো এখনো সেই রাজবাড়িতেই আছেন। উনি কি একা সেই অপরাধীর মুখোমুখি হতে পারবেন?"

আকাশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন একজন দক্ষ ডাক্তারের চেয়েও এক পজেসিভ ভাই আর প্রেমিকের রূপ স্পষ্ট। সে মেঘলার দিকে তাকাল। 

এখন ক্যাফেটেরিয়ার অন্যান্য কর্মীরা তাদের দিকে তাকাচ্ছিল, তাই আকাশ বড়দের সামাজিকতা ও মেঘলার মর্যাদা বজায় রেখে অত্যন্ত সম্মান ও গভীর ভালোবাসার সুরে তুমি করে বলল, "মেঘলা, তুমি ভাইয়াদের  সাথে এখানেই বসো। আমি আর আয়ান একবার হসপিটালের সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে যাব। ফুঁপিকে কেবিনে শিফট করার আগে কে কে ওনার কেবিনের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল, আমাদের সেটা দেখতে হবে। তুমি একদম ভয় পাবে না।"

বড়দের সামনে বা প্রফেশনাল জায়গায় আকাশের এই ‘তুমি’ সম্বোধন আর দায়িত্বশীল রূপ দেখে মেঘলা মনে মনে এক পরম তৃপ্তি অনুভব করল। 

সে বড়দের সামনে যেভাবে ডাকে, সেভাবে নিচু ও মিষ্টি স্বরে বলল, "আকাশ ভাই, আপনি সাবধানে যান। আমি বড় ভাইয়াদের সাথেই আছি।"

আকাশ আর আয়ান দ্রুত পায়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে হসপিটালের সিকিউরিটি রুমের দিকে চলে গেল। 

নিলয় মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল, "মেঘলা পরী, তুমি একটুও চিন্তা করো  না। আকাশ আর আয়ান দুজনেই যখন এই রহস্যের পেছনে লেগেছে, তখন চৌধুরী ম্যানশনের সেই ভেতরের শত্রু আর পার পাবে না।"

কিন্তু মেঘলার মনটা কিছুতেই শান্ত হতে পারছিল না। তার বারবার মনে হচ্ছিল, প্রতিষেধক দিয়ে

ফুঁপিকে সাময়িকভাবে বাঁচানো গেলেও,

পঁচিশ বছরের সেই পুরোনো বিষ ওনার শরীরের ভেতরের অংশগুলোকে কতটা নিঃশেষ করে দিয়েছে, তা হয়তো মেডিকেল সায়েন্সের বাইরে চলে গেছে। 

 সেই আসন্ন কালো দিনটি, যা রাজিয়া বেগমের জীবনপ্রদীপকে চিরতরে নিভিয়ে দেবে—তার এক অদৃশ্য ছায়া যেন এখনই এই হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ার দেওয়ালে এসে পড়তে শুরু করেছে। 

চৌধুরী ম্যানশনের সেই রাজকীয় অন্দরমহলে এখন কোন নতুন ঝড় অপেক্ষা করছে, তা ভেবেই মেঘলার বুকটা অজানা আশঙ্কায় দুলতে লাগল।

(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 12 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন