ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা : পুতুল( কবিতা রহমান মর্তুজা)
(কপি করা নিষিদ্ধ) ❌❌❌
পর্ব,১৫
চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমের ঝাড়বাতিটা আজ কেমন যেন ম্লান আলো ছড়াচ্ছে। রাজিয়া বেগমের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো বাড়ির পরিবেশটাই যেন এক অকাল নিস্তব্ধতায় থমকে গেছে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন আয়ুশ চৌধুরী। উনি কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠেছেন ।
উনার পাশে আয়েশা তখনো চোখ মুছছেন। এককোণে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে আছে মেঘলা। তার ডাগর চোখের কোণে জল শুকিয়ে এখন শুধু এক বুক গভীর হাহাকার আর ক্লান্তি।
আকাশ ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সেই চিরচেনা মোহনীয় আকাশী রঙের চোখ দুটো বাইরের অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু তার মনের ভেতর জ্বলছিল প্রতিশোধের এক তীব্র দাবানল।
ফুঁপির অকালমৃত্যু তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, কিন্তু একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সে প্যাথলজিক্যাল প্রমাণগুলো হাতে পেয়ে এখন একদম পাথর হয়ে গেছে।
সে জানে, এই চৌধুরী ম্যানশনেরই কোনো অতি পরিচিত মানুষ এই জঘন্য অপরাধের পেছনে মূল হোতা।
ঠিক রাত নয়টার দিকে চৌধুরী ম্যানশনের সদর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন আসাদ। উনার পরনে তখনো সেই রাজবাড়ির কুঠুরির কালো পোশাক, কিন্তু মুখাবয়ব একদম স্পষ্ট। ওনার পেছনে মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢুকল চৌধুরী
ম্যানশনেরই অত্যন্ত পুরোনো এবং বিশ্বস্ত গৃহকর্মী কাসেম আলী!
কাসেম আলীকে এই অবস্থায় দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত অন্য আত্মীয়দের মধ্যে এক তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। আয়ুশ চৌধুরী বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
"আসাদ! কাসেম আলীর এই অবস্থা কেন? আর তুই এই পোশাকে কোথা থেকে আসছিস? আর কবেই বা তুই দেশে ফিরলি?”
আসাদ চৌধুরী কোনো কথা না বলে সরাসরি সোফার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি আয়ুশের চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
"বড় ভাই, রাজিয়া আপা কোনো সাধারণ রোগে মারা যায়নি। ওনাকে গত পঁচিশ বছর ধরে তিলে তিলে শেষ করা হয়েছে স্লো পয়জন দিয়ে। আর এই বিষ প্রতিদিন ওনার খাবারের সাথে নিখুঁতভাবে মিশিয়ে দিত এই কাসেম আলী!"
আসাদের এই কথাটি ড্রয়িংরুমে যেন একটা শক্তিশালী বোমার মতো আছড়ে পড়ল। আয়েশা আতঙ্কে নিজের মুখে হাত দিলেন। আয়ান এতক্ষণ সোফার এক কোণে চোখ লাল করে বসে ছিল।
সে এক লাফে উঠে এসে কাসেম আলীর কলার চেপে ধরে গর্জে উঠল,
"বল হারামজাদা! তুই আমার আম্মুর এই ক্ষতি কেন করলি? তোকে তো আমরা পরিবারের সদস্যের মতো জানতাম!"
কাসেম আলী মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
"আমারে মাফ কইরা দ্যান ছোট ভাইজান! আমি নিজের ইচ্ছায় কিছু করি নাই। আমারে বাধ্য করা হইছে! আমার পোলাডারে জিম্মি কইরা এই কাজ করানো হইছে!"
আকাশ জানালার পাশ থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ড্রয়িংরুমের সবাই তখন আকাশের দিকে তাকাল। মেঘলাও চোখ তুলে আকাশের সেই সুন্দর আকাশী চোখের দিকে চাইল।
আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের বড়দের সামনে সামাজিকতা আর মর্যদা বজায় রাখতে মেঘলা নিচু ও মলিন সুরে আকাশকে ডাকল, "আকাশ ভাই... কাসেম আলীকে কে বাধ্য করেছে? আসল খুনিটা কে?"
বড়দের সামনে মেঘলার এই ‘আকাশ ভাই’ ডাক আর শালীনতা দেখে আকাশের বুকটা এক পরম মায়ায় ভরে উঠল। সে সবার সামনে মেঘলার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সম্মান,
গভীর মনোযোগ ও ভালোবাসার সুরে তুমি করে বলল,
"তুমি একদম শান্ত হও মেঘলা। কাসেম আলীকে যে নির্দেশ দিত, সেই আসল পাপিষ্ঠ আর কেউ নয়..." আকাশ একটু থামল। তার আকাশী রঙের চোখ দুটো এবার ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝখানে বসা অচেনা একটা লোকের ওপর গিয়ে স্থির হলো।
আকাশ আঙুল নির্দেশ করে সিংহের মতো গর্জে উঠল, "আসল খুনি হলো এই মোতাহের সিকদার!
পঁচিশ বছর আগে পুরান ঢাকার রাজবাড়ির ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব আর সম্পত্তির লোভেই সে ফুঁপিকে চৌধুরী ম্যানশন থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল। শুধু তাই নয় এই জানোয়ার টা আয়ন তোর মাকে সিকদার বাড়ি থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে।
আর ফুঁপি যখন সব সত্য জেনে চৌধুরী ম্যানশনে ফিরে এলেন, তখন নিজের পাপ ঢাকতে সে কাসেম আলীকে ভয় দেখিয়ে ফুঁপিকে এই বিষ দেওয়া শুরু করে!"
মোতাহের চৌধুরী বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
"আকাশ! তুমি মুখে যা আসো তাই বলছো! তোমার কোনো প্রমাণ আছে?"
ঠিক তখনই আয়ান পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর ছুড়ে মারল। আয়ান বলল,
"প্রমাণ এই সিসিটিভি ফুটেজে আছে! আর কুমিল্লা থেকে আমি যে নায়েবের জবানবন্দি এনেছি, সেখানে আপনার সই করা বিষ কেনার রসিদও আছে!"
মোতাহের চৌধুরীর ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই ভয়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। সে ড্রয়িংরুমের পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতেই সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল পুলিশ! নিলয়, আবির, নীরব, আরহাম, মাহিন এবং রোদ্দুর—আকাশের পুরো বন্ধু মহল পুলিশের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিলয় মোতাহের চৌধুরীর পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
"কী রে মোতাহের চাচা? চৌধুরী ম্যানশনের রাজকীয় অন্দরমহল থেকে এবার সোজা হাজতের অন্দরমহলে যাওয়ার জন্য রেডি হন!"
মোতাহের সিকদার বললেন, আরে আগে আমার কথা গুলো তো শুনো।”
কিন্তু কেউ তার কথায় পাত্তা দিল না ক।বরং আয়ুষ চৌধুরী তেড়ে এসে মোতাহের সিকদারকে দু চারঘা বসিয়ে দিলেন। এমন ভাবে থাপ্পড় গুলো মারলেন নাক দিয়ে মুখ দিয়ে গল গুলিয়ে রক্ত বের হলো মোতাহের শিকদারের।
পুলিশ মোতাহের সিকদারকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ দিলে না। সকলে ঘৃণিত চোখে চেয়ে আছে মোতাহের সিকদারের দিকে।
আয়ুষ চৌধুরী গর্জে উঠে বললেন ,
জানোয়ারের বাচ্চা তোকে তোর বাপ বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, তখন তোকে আমি আমার ব্যবসায় কাজের নাম করে ঠাঁই দিয়েছিলাম। কাজ দিয়েছিলাম, তোকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম, খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম আর তুই আমার বোনের এত বড় সর্বনাশ করলি। ছি… ছি.. তোর লজ্জা হওয়া উচিত! আমার খেয়ে আমার, আমার বোনের নামে এত বড় বদনাম রটাতে পারলে তুই?
“তোর মত অমানুষ আমি দুটো দেখিনি।”
পুলিশ মোতাহের চৌধুরীকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে নিয়ে চলে গেল। কাসেম আলীকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ গাড়িতে তোলা হলো।
ড্রয়িংরুমের এই চরম হট্টগোল আর সত্য প্রকাশের পর এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এল। আত্মীয়স্বজনরা একে একে যে যার ঘরের দিকে চলে গেলেন। ড্রয়িংরুমে তখন শুধু আকাশ, মেঘলা, আয়ান আর আসাদ।
আকাশ আসাদ চৌধুরীর কাছাকাছি গিয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরল। আসাদ আকাশের পিঠে হাত রেখে বললেন, "আমি রাজিয়া আপাকে বাঁচাতে পারলাম না রে আকাশ। কিন্তু তোদের এই লকেটের চাবি আর তোদের ভালোবাসা চৌধুরী ম্যানশনকে আজ এক বড় কলঙ্ক থেকে মুক্ত করল।"
আসাদ চৌধুরীর একবার বড় ভাই আয়ুষ চৌধুরীর দিকে তাকালেন।আয়ুশ চৌধুরী মাথা নিচে করে রইলেন। একটা সময় তিনি ব্যবসার কাছ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আসাদ চৌধুরী বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নমনীয় কণ্ঠে বললেন,
“বড় ভাইজান আমাকে কি এখনো আপনি ক্ষমা করেন নি?”
আয়ুশ চৌধুরী মুখ তুলে তাকালেন।
তারপর তিনি বললেন,
“তোরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই, তোদেরকে ছাড়া কিভাবে থাকতে পারি বল।”
বলতে না বলতেই আসাদ চৌধুরী এসে বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন।
আয়ুশ চৌধুরী কথা বাড়ালেন না
আসাদ চৌধুরী নিজের ঘরের দিকে চলে যাওয়ার পর, আকাশ সোফায় এসে মেঘলার পাশে বসল। ড্রয়িংরুমে এখন আর কোনো বড়রা নেই, কেবল আয়ান অন্য পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে। আকাশ মেঘলার খুব কাছাকাছি এসে ওর কাঁধের ওপর নিজের হাতটা রাখল। সে তার সেই মায়াবী আকাশী চোখ দুটো দিয়ে মেঘলার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গভীর ও পজেসিভ সুরে বলল,
"মেঘলা... আমাদের চৌধুরী ম্যানশনের অন্ধকার মেঘ কেটে গেছে রে। ফুঁপির আত্মা আজ শান্তি পাবে। তুই আর কাঁদিস না, ফুলটুসি।"
আকাশের এই খুব কাছ থেকে বলা ‘তুই’ সম্বোধন আর তার বুকের ও ও চোখের উষ্ণতা মেঘলার ভেতরের সমস্ত কষ্টকে এক নিমেষে এক গভীর অনুভুতিতে রূপ দিল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
"আকাশ... ফুঁপি তো চলে গেল। কিন্তু ফুঁপি যাওয়ার আগে আমাদের দুজনকে একসাথে থাকার যে প্রতিজ্ঞা করিয়ে গেছে, কিন্তু কেন?”
মেঘলার মুখে সরাসরি নিজের নাম ‘আকাশ’ শুনে আকাশের ঠোঁটের কোণে এক নিখাদ ও চওড়া ভালোবাসার হাসি ফুটে উঠল। সে মেঘলার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
"এই আকাশী চোখ শুধু তোকে দেখার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে মেঘলা পরী। মরণেও আমি তোকে আমার বুক থেকে আলাদা হতে দেব না।
(চলবে...)