ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো মেঘলা আকাশ একলা

পর্ব 16

লেখক: কবিতা রহমান মর্তুজা (পুতুল)

ওগো মেঘলা আকাশ একলা

লেখিকা: পুতুল? (কবিতা রহমান মর্তুজা) 

কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫🚫🚫

পর্ব: ১৬

চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল বারান্দায় তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের অন্ধকার কেটে গেলেও বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে যেন রাজিয়া বেগমের স্মৃতিগুলো ছড়িয়ে আছে। গত কয়েক দিনের ঘটনায় কেউই স্বাভাবিক হতে পারছে না। একদিকে প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক, অন্যদিকে পরিবারের এত বছরের বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা।

মেঘলা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে সাদা রঙের একটা সাধারণ কামিজ, খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, যেন কয়েক রাতের কান্না তার মুখের সমস্ত হাসি কেড়ে নিয়েছে।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“কী রে ফুলটুসি, এত সকালে এখানে একা একা কী করছিস?”

মেঘলা পেছনে ফিরে তাকাল। আকাশ!

পরনে কালো পাঞ্জাবি, এলোমেলো চুল আর সেই মায়াবী আকাশি চোখ। কিন্তু আজ তার চোখের গভীরেও একটা চাপা ক্লান্তি।

মেঘলা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

“ কিছু না।”

আকাশ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ওর পাশে দাঁড়াল।

“আমার দিকে তাকিয়ে কথাটা বল।”

কেন?

“ কারণ তোর এই ‘কিছু না’-এর আড়ালে যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।”

মেঘলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ল।

“ আকাশ, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!  ফুঁপিকে ছাড়া এই বাড়িটা কেমন জানি লাগে। মনে হয়, এই বুঝি ফুঁপি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘আমার মেঘপাখিটা কাঁদছে কেন?’

আকাশের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মেঘলাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

“কাঁদিস না মেঘলা। একদম কাঁদবি না। তোকে শক্ত হতে হবে  সবসময়। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, ফুঁপি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর ভালোবাসা আমাদের সঙ্গে আছে।”

মেঘলা আকাশের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”

আকাশ ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“ তুই কি পাগল? তোকে ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। তুই আমার জীবনের সেই মানুষ, যাকে হারানোর ভয় আমার নিজের মৃত্যুর ভয় থেকেও বেশি।”

মেঘলা চোখ তুলে তাকাতেই আকাশ ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিল।

“ এবার একটু হাস তো, আমার ফুলটুসি। তোর হাসিটা দেখার জন্য এই আকাশটা কতটা অপেক্ষা করে, তা তুই জানিস না।”

মেঘলা চোখের জল মুছে সামান্য হাসল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে আয়ানের গলা শোনা গেল।

“ বাহ! ভোরবেলাতেই এসব কী শুরু হয়ে গেছে দেখছি!”

মেঘলা লজ্জায় আকাশের কাছ থেকে সরে গেল।

“আয়ান ভাইয়া!”

আয়ান দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল।

“ আরে আরে, আমি তো কিছুই বলিনি! তবে একটা কথা বলি, আকাশ—আমার বোনটার চোখে আর কখনো পানি দেখলে কিন্তু তোর খবর আছে!”

আকাশ মুচকি হেসে বলল

,

“আপনার বোনের চোখে পানি আসার আগেই আমি সেটা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করব,।”

আয়ান এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সে মেঘলার মাথায় হাত রেখে বলল,

— মা তো আমার , কিন্তু আমাকে দেখ আমি একদম,ঠিক আছি। তোর মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ  করে কাঁদছি না। আর কাঁদিস না বোন আমার!  আমরা যদি কাঁদি আমার আম্মু টা মৃত্যুর বড় ভালো থাকবে না আমাদের ছাড়া । 

 

আম্মু ছোটবেলায় বলতো কেউ মারা গেলে তার জন্য না কেঁদে, আল্লাহর নিকট তাকে জান্নাতি বাসী দান করার জন্য  দোয়া চাইতে। তাই আমরা আর কাঁদবো না, সবাই মিলে আম্মুর জন্য দোয়া করব।”

মেঘলা ছুটে গিয়ে আয়ানকে জড়িয়ে ধরল।

“ তুমি আমার সবচেয়ে ভালো ভাইয়া!”

আয়ান হেসে বলল,

“আর আকাশ তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তাই না?

”

“ ভাইয়া! তুমি না!”

তিনজনের মুখেই বহুদিন পর একটু হাসি ফুটল।

________________

সকাল দশটা।

চৌধুরী ম্যানশনের ড্রয়িংরুমে সবাইকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আয়ুশ চৌধুরী সোফায় বসে আছেন। পাশে আয়েশা চৌধুরীও । আসাদ চৌধুরী  সেখানে উপস্থিত।

আকাশ ঘরে ঢুকতেই আয়ুশ  চৌধুরী তাকে কাছে ডাকলেন।

—

“ আকাশ, এখানে এসো।”

আকাশ এগিয়ে গিয়ে সামনে বসল।

আয়ুশ চৌধুরী  কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“ রাজিয়া আমার ছোট বোন ছিল। ওর জীবনের শেষ দিনগুলোতে কত কিছু যে সহ্য করতে হয়েছে, তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। তুই যেভাবে সত্যিটা সামনে এনেছ, তার জন্য তোমাকে  ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না।”

আকাশ মাথা নিচু করে বলল,

“ আব্বু, আমি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেছি। ফুঁপি আমার কাছে শুধু আত্মীয় ছিলেন না, তিনি আমার মায়ের মতো ছিলেন।”

আসাদ চৌধুরী  দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো আমরা পাইনি।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

“ মোতাহের এত বছর ধরে এই অপরাধ করল, ঠিক আছে। কিন্তু রাজিয়া আপা ফিরে আসার পরও এত বছর ধরে সে কীভাবে নিশ্চিন্তে ছিল? আর কাসেমকে যে ভয় দেখানো হয়েছিল, সেই ভয় দেখানোর পেছনে কি শুধু মোতাহেরই ছিল?”

আকাশের চোখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল।

“ ছোট চাচ্চু, আমিও ঠিক এই কথাটাই ভাবছি। কাসেম আলী সব সত্যি বলেছে বলে দাবি করলেও, তার জবানবন্দির কিছু অংশ এখনো যাচাই করা বাকি।”

আয়ান বলল,

“ তাহলে কি এই ঘটনার পেছনে আরও কেউ আছে?”

আকাশ উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

আকাশ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা ভারী কণ্ঠ শোনা গেল।

“ সত্যিটা জেনে খুব খুশি হচ্ছ, তাই না, ডাক্তার সাহেব?”

আকাশের চোখ সরু হয়ে এল।

“কে আপনি?”

লোকটা অট্টহাসি দিয়ে বলল,

“মোতাহেরকে জেলে পাঠিয়ে ভেবেছ সব শেষ? ভুল ভাবছ। চৌধুরী পরিবারের অতীতের এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো খুললে তোমাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে!”

আকাশ উঠে দাঁড়াল।

“সাহস থাকলে সামনে এসে কথা বলুন!”

“সময় হলে নিজেই সামনে আসব। তবে তার আগে একটা কথা মনে রেখো, মেঘলাকে সব সত্যি জানানো তোমার জন্য ভালো হবে না।”

কথাটা বলেই ফোন কেটে গেল।

আকাশের হাত শক্ত হয়ে এল।

মেঘলার নাম!

এই লোকটা মেঘলাকে চেনে?

আর মেঘলার সঙ্গে চৌধুরী পরিবারের অতীতের এমন কী সম্পর্ক থাকতে পারে, যা এখনো অজানা?

আয়ান আকাশের মুখের পরিবর্তন লক্ষ করে জিজ্ঞেস করল,

“ কে ফোন করেছিল?”

আকাশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

“কেউ একজন, যে চায় না চৌধুরী পরিবারের অতীতের সব সত্যি প্রকাশ পাক।”

****************************

দুপুর।

নিজের ঘরে বসে মেঘলা পুরোনো একটা অ্যালবাম দেখছিল। রাজিয়া বেগমের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বারবার চোখ ভিজে উঠছিল তার।

হঠাৎ অ্যালবামের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট খাম মেঝেতে পড়ে গেল।

মেঘলা অবাক হয়ে খামটা তুলে নিল।

খামের ওপরে তার নাম লেখা।

‘আমার আদরের মেঘলার জন্য।’

লেখাটা দেখেই মেঘলার বুক কেঁপে উঠল।

এ যে রাজিয়া বেগমের হাতের লেখা!

কাঁপা হাতে খামটা খুলল সে। ভেতরে একটা চিঠি আর ছোট্ট একটা পুরোনো ছবি।

চিঠিতে লেখা,

আমার মেঘপাখি,

যদি কখনো এই চিঠিটা তোর হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবি, আমি তোকে কিছু কথা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। তোকে আমি নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসেছি। তোর আসল বাবা মা, কে বা কারা সেটা কিন্তু কেউ জানত না।কিন্তু আমি জানতাম। 

তবে সেই সত্য জানার আগে একটা কথা মনে রাখিস—ভালোবাসা কখনো রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ছোট নয়। আর মানুষকে বিচার করার আগে তার অতীতটা জানার চেষ্টা করবি।

ছবিটার পেছনে যে নাম লেখা আছে, তার সঙ্গে আমাদের পরিবারের অনেক পুরোনো একটা সম্পর্ক রয়েছে। সময় হলে সব বুঝতে পারবি।

ইতি,

তোর রাজিয়া ফুঁপি।

চিঠিটা পড়া শেষ হতেই মেঘলার হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

ছবিতে দুজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। একজন রাজিয়া বেগম। অন্যজনকে মেঘলা চেনে না।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা নামটা দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

নামটা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ এটা কোন বিদেশী ভাষায় লেখা একটা নাম। 

তার পাশেই বাংলা অক্ষরে লেখা আছে,

 “নাসরিন।”

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় একবার আয়েশা চৌধুরীর   মুখে এই নামটা শুনেছিল। তারপর থেকে এই নাম নিয়ে বাড়িতে আর কখনো কেউ কথা বলেনি।

মেঘলা চিঠি আর ছবিটা বুকে চেপে ধরল।

“ ফুঁপি, তুমি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলে?”

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

আকাশ ঘরে ঢুকে বলল,

“ ফুলটুসি, কী হয়েছে? তোর মুখ এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেন?”

মেঘলা কোনো কথা না বলে চিঠিটা আকাশের হাতে দিল।

আকাশ মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়ল। তারপর ছবিটার দিকে তাকিয়ে তার মুখের ভাব বদলে গেল।

“ নাসরিন “

মেঘলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এই নাম চেনো?”

আকাশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

“নামটা আমাদের পুরোনো পারিবারিক নথিতে দেখেছি। কিন্তু উনি কে, সেটা আমি জানি না।”

মেঘলা আকাশের হাতটা শক্ত করে ধরল।

“আকাশ, আমার খুব ভয় করছে। আমাদের জীবনে আবার নতুন কোনো বিপদ আসবে না তো?”

আকাশ ছবিটা টেবিলে রেখে মেঘলার দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল।

“যত বড় বিপদই আসুক, আমরা একসঙ্গে মোকাবিলা করব। তুই শুধু আমার ওপর বিশ্বাস রাখিস।”

মেঘলা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

কিন্তু আকাশের চোখে তখন অন্য চিন্তা।

কারণ ছবির পেছনে নামের নিচে ছোট্ট করে আরও একটা কথা লেখা ছিল, যা মেঘলার চোখ এড়িয়ে গেছে।

____________________,,,,

অন্যদিকে, শহরের এক নির্জন বাড়ি।

অন্ধকার ঘরের মধ্যে বসে থাকা লোকটা ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল।

তার সামনে একটা পুরোনো ফাইল খোলা।

ফাইলের প্রথম পাতায় আকাশ ও মেঘলার ছবি।

লোকটা ছবির ওপর আঙুল বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“ এত বছর ধরে যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেটা এবার আর বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যাবে না।

তারপর সে ফাইলের ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।”

কাগজটায় কয়েকটা নাম লেখা।

“আকাশ চৌধুরী।”

“মেঘলা।”

লোকটা জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“এবার দেখা যাক, ভালোবাসা জেতে, নাকি অতীতের পাপ!”

চলবে........... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 16 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন