ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা: পুতুল
(কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ) 🚫🚫🚫
পর্ব: ১৮
সকালের রোদে নতুন দিনের শুরু।
রাতের বৃষ্টির পর প্রকৃতির বুকজুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। বাগানের ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো সকালের সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। গোলাপের পাপড়িতে আটকে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখে মনে হচ্ছে, প্রকৃতি বুঝি রাতভর কেঁদে ভোরবেলায় চোখের জল মুছে নিয়েছে।
চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল বাড়িটাও আজ যেন একটু অন্য রকম।
গত কয়েক দিনের মতো বাড়ির প্রতিটি কোণে আর সেই ভারী নিস্তব্ধতা নেই। রান্নাঘর থেকে বাসনপত্রের শব্দ ভেসে আসছে। কাজের লোকেরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। বাগানের মালি গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছেন। আর দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে আয়েশা চৌধুরী কাজের মেয়েকে সকালের ব্রেকফাস্টে কী কী তৈরি করবেন তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
রাজিয়া বেগম নেই। তাঁর শূন্যতা অবশ্যই আছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ঠিক সকাল সাড়ে সাতটা।
নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে মেঘলা। পরনে হালকা আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। চুলগুলো কোমর পর্যন্ত খোলা। চোখে আগের মতো পুরোপুরি উচ্ছলতা ফিরে না এলেও মুখে আজ সামান্য প্রাণের ছোঁয়া রয়েছে।
হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,
“এই যে, আমার ফুলঝুরি রাণী! সূর্য মামা তো অর্ধেক আকাশ ঘুরে ফেলল, আর আপনার ঘুম ভাঙল এখন?”
মেঘলা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই বলল,
“ দরজা খোলা, ভেতরে আসতে পারেন ।”
পরমুহূর্তেই আকাশ ঘরে প্রবেশ করল।
পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়ানো, হাতে গাড়ির চাবি। চোখেমুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব থাকলেও মেঘলাকে দেখে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“ ওহ্! আজ তো দেখি আমাদের ফুলটুসি একেবারে আকাশের চাঁদ হয়ে বসে আছে!”
মেঘলা ঘুরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ কী বললে?”
“বললাম, আজ তোকে সুন্দর লাগছে।”
“শুধু আজ?”
আকাশ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর বুকের ওপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“ আল্লাহ! এই মেয়ের প্রশ্নের শেষ নেই কেন? প্রতিদিন সুন্দর বললে একদিন বলবি, মুখস্থ করে বলছিস। আর না বললে বলবি, আমাকে আর ভালো লাগে না!”
মেঘলা হেসে ফেলল।
“ তুমি আসলেই একটা পাগল!”
“ পাগল তো তোর জন্যই হয়েছি, ফুলঝুরি রাণী। এখন এই পাগলের সঙ্গে চলতে হলে ব্রেকফাস্ট করতে হবে।”
মেঘলা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আমার খিদে নেই।”
আকাশের মুখের হাসিটা একটু কমে এল।
“কাল রাতেও ঠিকমতো খাসনি। আজও যদি না খাস, তাহলে কিন্তু আমি সত্যি সত্যি ডাক্তারি শুরু করে দেব।”
“ তুমি তো ডাক্তারই!”
“ হ্যাঁ, কিন্তু তোর ক্ষেত্রে আমার ডিগ্রি কোনো কাজে লাগে না। রোগী যদি ওষুধ খেতেই না চায়, ডাক্তার সাহেব কী করবে বল?”
মেঘলা হেসে আকাশের দিকে একটা বালিশ ছুড়ে দিল।
“যাও তো! অসহ্য!”
আকাশ বালিশটা ধরে হেসে বলল,
“ পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে আসবি। আর শোন, আজ তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“কোথায়?”
“বলব না।”
“আকাশ!”
“ জি, ম্যাডাম?”
“ আমাকে বলতেই হবে!”
আকাশ দরজার কাছে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাল।
“ বেশি কৌতূহল ভালো না, ফুলটুসি। তাড়াতাড়ি আয়। আর হ্যাঁ, সাদা ফুল পছন্দ তো তোর?”
মেঘলা অবাক হয়ে বলল,
“ হ্যাঁ। কেন?”
আকাশ মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেঘলা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
অনেক দিন পর তার মনে হলো, জীবনের সব দরজা হয়তো বন্ধ হয়ে যায়নি। কিছু দরজার ওপাশে এখনো অপেক্ষা করে আছে নতুন সকাল।
ডাইনিং টেবিলে আয়ানের কাণ্ডকারখানা গুলো দেখে সকালে হাসতে হাসতে শেষ।
সকাল আটটা।
ডাইনিংরুমে আয়ান বসে মনোযোগ দিয়ে পরোটা খাচ্ছে। তার সামনে এক গ্লাস দুধ, ডিমভাজি আর এক বাটি সবজি। দেখে মনে হচ্ছে, বহুদিনের ক্ষুধা নিয়ে খাবারের টেবিলে বসেছে।
আয়েশা চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘ আয়ান বাবা, আস্তে খাও। খাবার তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না!’
আয়ান মুখভর্তি খাবার নিয়েই বলল,
“ বড় মামি , আপনি বুঝবেন না। হাসপাতালের ডিউটি, রোগী, রিপোর্ট, সব সামলাতে গিয়ে নিজের খাওয়াটাই ভুলে যাই।”
ঠিক তখনই ডাইনিংরুমে প্রবেশ করল আকাশ।
“ ওহ্! এই যে বিখ্যাত মেডিসিন স্পেশালিস্ট সাহেব! রোগীদের স্বাস্থ্য নিয়ে এত চিন্তা করেন, নিজের স্বাস্থ্যটা নিয়ে কখনো চিন্তা করেছেন?”
আয়ান পরোটার টুকরোটা নামিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
“ তুমি সকালে সকালেই শুরু করেছ?”
আকাশ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
“ আমি তো শুধু সত্য কথা বলছি। তোর প্লেট দেখে মনে হচ্ছে, আজ সকালের নাশতা নয়, দুপুরের খাবারও এখানেই শেষ করবি।”
আয়ান একটা টিস্যু নিয়ে মুখ মুছে বলল,
“ তুমি আগে নিজের বোনকে সামলাও, তারপর আমার স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করো!”
কথাটা শুনে মেঘলা, যে মাত্রই ডাইনিংরুমে প্রবেশ করছিল, দরজার কাছে থমকে গেল।
“ কীইই! আমার স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করতে হবে কেন?”
আয়ান নির্বিকার মুখে বলল,
“ আরে, তোর কথাই বলছি। এই যে আকাশ সাহেব সকাল থেকে তোকে নিয়ে ব্যস্ত, মনে হয় হাসপাতালের সব রোগী ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেছে!”
মেঘলা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
“ আয়ান ভাইয়া! তোমার না একদম বাজে !”
আকাশ মুচকি হেসে বলল
,
“ ভাই, আপনার কথা কিন্তু মন্দ বলেননি!”
মেঘলা এবার আকাশের দিকে তাকাল।
“ তুমি চুপ কর!”
আয়েশা চৌধুরী হেসে উঠলেন।
“ আহা, তোরা দুজন মিলে মেয়েটাকে আর লজ্জা দিস না। আয় মেঘলা, এখানে বস। তোর জন্য গরম পরোটা রেখেছি।”
মেঘলা গিয়ে আয়েশার পাশে বসল।
আয়েশা চৌধুরী নিজের হাতে তার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে আদর করে বললেন,
“ মা, আজ কিন্তু সবটুকু খেতে হবে। শরীরের যত্ন নেওয়াটাও নিজের প্রতি দায়িত্ব।”
মেঘলা মৃদু মাথা নাড়ল।
“ আচ্ছা, আম্মু।”
শব্দটা শুনে আয়েশার চোখে মুহূর্তের জন্য জল চিকচিক করে উঠল। রাজিয়া বেগমও মেঘলাকে এভাবেই আদর করতেন। কতবার যে বলতেন, মেয়েটাকে যেন কেউ অভিমান করে না রাখে!
আয়েশা মনে মনে রাজিয়ার জন্য দোয়া করলেন।
খাবারের টেবিলে আয়ুশ চৌধুরীও এসে বসলেন। ছেলেমেয়েদের হাসি-ঠাট্টা দেখে তাঁর মুখে দীর্ঘদিন পর প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল।তবে উনি একবার আকাশ আর মেঘলার পানে আড়চোখে তাকালেন।
“ কী ব্যাপার? আজ সকাল সকাল এত হাসাহাসি কিসের?”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
‘ বড় মামা, আপনার ছেলে কিন্তু আমাকে অপমান করছে!”
আকাশ প্রতিবাদ করল,
“আব্বু, আমি শুধু ওর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করছিলাম।”
আয়ুশ চৌধুরী হেসে বললেন,
“তোমরা দুজন ডাক্তার হয়েও একজন আরেকজনকে সামলাতে পারো না! তোমাদের রোগীদের অবস্থা কী, আল্লাহই জানেন!”
সবার হাসিতে ডাইনিংরুম মুখর হয়ে উঠল।
মেঘলা খেতে খেতে একবার খালি চেয়ারটার দিকে তাকাল।
রাজিয়া বেগমের চেয়ার।
মুহূর্তের জন্য তার হাসিটা থেমে গেল।
আকাশ বিষয়টা বুঝতে পেরে টেবিলের নিচে আলতো করে তার হাত ছুঁয়ে দিল। কোনো কথা বলল না। শুধু পাশে থাকার আশ্বাসটুকু দিল।
মেঘলা আবার খাবারের দিকে মন দিল।
কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাদের স্মৃতি প্রতিটি সকাল, প্রতিটি খাবারের টেবিল আর প্রতিটি হাসির ভেতর বেঁচে থাকে।
************************
সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে।
চৌধুরী ম্যানশনের সামনের গাড়িবারান্দায় নীল রঙের রুলস রয়েলস গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির পাশে আকাশ দাঁড়িয়ে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা বেরিয়ে এল।
পরনে সাদা সালোয়ার-কামিজ, মাথায় হালকা সাদা ওড়না। চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধেছে। হাতে ছোট্ট একটা সাদা ফুলের তোড়া।
আকাশ ফোন রেখে তার দিকে তাকাল।
কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না।
মেঘলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
আকাশ মৃদু হেসে বলল,
“ ভাবছি, সাদা রঙটা তোর এত পছন্দ কেন।”
“কেন?”
“কারণ সাদা রঙের মধ্যে একটা শান্তি আছে। ঠিক তোমার মতো।তবে আমার কিন্তু নীল রঙের সব ফুল বেশি সুন্দর লাগে। বিশেষ করে নীল কনফ্লাওয়ার ফুল ভীষণ পছন্দ আমার।”
মেঘলা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ আমি শান্ত? তুমি আমাকে চেনো না নাকি? আমি আবার কথা না বলে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না বুঝলে আকাশ ভাই!”
আকাশ হেসে ফেলল।
“সেটা তো বটেই! তুই শান্ত হলে পৃথিবীতে ঝড়ের নাম কেউ জানত না।”
মেঘলা তার বাহুতে হালকা একটা চিমটি কাটল।
“অসভ্য ডাক্তার!”
আকাশ গাড়ির দরজা খুলে দিল।
“আসুন, আমার মাননীয়া রোগী। আজ আপনাকে একটা বিশেষ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে।”
মেঘলা গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলল,
“ জায়গাটা যদি ভালো না হয়, তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে।”
“ জি, ম্যাডাম।”
গাড়ি ধীরে ধীরে চৌধুরী ম্যানশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
রাস্তার দুপাশে দোকানপাট খুলছে। ফুটপাতে মানুষজনের ব্যস্ততা। কোথাও ফুলের দোকান, কোথাও চায়ের স্টল, কোথাও স্কুলের পোশাক পরা বাচ্চাদের ছোটাছুটি।
মেঘলা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ সে খেয়াল করল, গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি একটি পথে ঢুকেছে।
“আকাশ, আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
আকাশ গাড়ি চালাতে চালাতেই বলল,
“আর একটু ধৈর্য ধর, ফুলটুসি।”
কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা পুরোনো গেটের সামনে এসে থামল।
গেটের ওপরে লেখা,
শান্তি নীড় শিশু সদন।
মেঘলা বিস্মিত হয়ে তাকাল।
“ এটা কী জায়গা?”
আকাশ গাড়ি থেকে নেমে তার দরজা খুলে দিল।
“একটা শিশু সদন। এখানে এমন কিছু বাচ্চা থাকে, যাদের দেখাশোনার জন্য পরিবারের কেউ নেই, অথবা যারা কোনো কারণে নিজেদের পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারে না।”
মেঘলা গেটের ভেতরে তাকাল। ছোট্ট একটা বাগান, কয়েকটা দোলনা, দেয়ালে রঙিন ছবি আঁকা। উঠোনে কয়েকজন শিশু খেলছে।
তার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
“তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ কেন?”
আকাশ শান্ত গলায় বলল,
“মনে আছে, ফুঁপি প্রায়ই বলতেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে সেটা হাতছাড়া করতে নেই? আমি ভাবলাম, তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আমরা এখানকার বাচ্চাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে পারি।”
মেঘলা আর কথা বলতে পারল না।
সে আকাশের হাতটা শক্ত করে ধরল।
“ তুই জানো, ফুঁপি থাকলে আজ কত খুশি হতেন!”
আকাশ মৃদু মাথা নাড়ল।
“জানি, ফুলটুসি। তাই তো এসেছি।”
দুজন ভেতরে প্রবেশ করল।
তাদের দেখে সদনের দায়িত্বে থাকা একজন মধ্যবয়স্ক নারী এগিয়ে এলেন।
“ আসসালামু আলাইকুম। আপনারা কি আগে ফোন করেছিলেন?”
আকাশ সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
“ জি, আমি আকাশ চৌধুরী। গতকাল আপনাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। আমরা শিশুদের জন্য কিছু খাবার, বই, পোশাক আর প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে এসেছি।”
নারীটি হাসিমুখে বললেন,
“আল্লাহ আপনাদের ভালো রাখুন বাবা। এই বাচ্চাগুলোর জন্য আপনাদের মতো মানুষের সহযোগিতা অনেক মূল্যবান।”
মেঘলা চারদিকে তাকিয়ে দেখল, ছোট্ট একটা মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। মেয়েটার বয়স ছয় কিংবা সাত বছর হবে। পরনে গোলাপি জামা, চুলে দুটো বেণি।
মেঘলা হাঁটু গেড়ে মেয়েটার সামনে বসল।
“তোমার নাম কী, বাবু ?”
মেয়েটা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“তুলি।”
“বাহ্! খুব সুন্দর নাম তো! তুমি খেলতে যাচ্ছ না কেন?”
তুলি মাথা নিচু করে বলল,
“আমার পুতুলটা ভেঙে গেছে।”
মেঘলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“পুতুল ভেঙে গেছে বলে মন খারাপ?”
তুলি ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।
“আমার পুতুলটা কেউ ঠিক করে দেয় না।”
মেঘলা মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
“ আচ্ছা, তোমার জন্য নতুন একটা পুতুল নিয়ে আসব। কিন্তু তার আগে আমার সঙ্গে একটু হাসতে হবে। পারবে?’
তুলি মৃদু হাসল।
মেঘলা মেয়েটার গালে চুমু দিয়ে বলল,
“ এই তো! আমার ছোট্ট পরি!”
দূরে দাঁড়িয়ে আকাশ সবকিছু দেখছিল।
মেঘলার মুখে এত দিন পর এমন নিখাদ স্নেহের হাসি দেখে তার বুকটা ভরে গেল।
একসময় মেঘলা সব বাচ্চাকে নিয়ে উঠোনে বসে গল্প করতে লাগল। কেউ তার ওড়না ধরে টানছে, কেউ তার কোলে বসতে চাইছে, কেউ আবার নিজের আঁকা ছবি দেখাতে ব্যস্ত।
আকাশও তাদের সঙ্গে যোগ দিল।
একটা ছোট্ট ছেলে এসে তার হাত ধরে বলল,
“ভাইয়া , আপনি কি সত্যি সত্যি ডাক্তার?”
আকাশ হেসে বলল,
“হ্যাঁ তো!’
“ তাহলে আমার পুতুলটার চিকিৎসা করে দেবেন? ওর হাত ভেঙে গেছে!”
আকাশ হো হো করে হেসে উঠল।
“পুতুলের ডাক্তারি তো আমার বিশেষত্ব না! তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
মেঘলা দূর থেকে বলে উঠল,
“ডাক্তার সাহেব, আপনার রোগী কিন্তু খুব ছোট!”
আকাশ পাল্টা বলল,
“ আপনার মতো জেদি না হলেই হলো!”
বাচ্চারা তাদের কথায় হেসে উঠল।
সেদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য চৌধুরী ম্যানশনের দুঃখ যেন অন্য এক আঙিনায় এসে কোমল হয়ে গেল।
বিদায়ের সময় সদনের দায়িত্বে থাকা নারী বললেন,
“ বাবা, আপনারা চাইলে মাঝেমধ্যে আসতে পারেন। বাচ্চাগুলো আপনাদের খুব পছন্দ করেছে।”
মেঘলা তুলিকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘আমি আবার আসব, কথা দিলাম।’
তুলি তার গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আবার আসবে তো, আপু?”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
“ইনশাআল্লাহ। আবার আসব।”
গাড়িতে ওঠার আগে আকাশ মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেমন লাগল জায়গাটা?”
মেঘলা চোখ মুছে মৃদু হাসল।
“ খুব ভালো। আজ বুঝলাম, কারও জীবনে একটু আনন্দ এনে দেওয়ার জন্য অনেক বড় কিছু করতে হয় না।”
আকাশ মাথা নাড়ল।
“ঠিক বলেছিস। ফুঁপি আমাদের এটাই শিখিয়ে গেছেন।”
গাড়ি আবার শহরের পথে চলতে শুরু করল।
মেঘলা জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
‘ফুঁপি, তোমার ভালোবাসাটুকু আমরা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। তুমি আমাদের সঙ্গে না থাকলেও তোমার শেখানো ভালো কাজগুলো থেমে থাকবে না।’
গ্রামের রাস্তা ধরে গাড়ি চলার পথে মেঘলা দেখল, একটা ছোট্ট দোকানে ফুলের মালা বিক্রি করছেন দোকানদার। মেঘলা চেঁচিয়ে বলল,
“আকাশ দেখ, ওখানে কতগুলা বকুল ফুলের মালা! আমাকে একটা মালা কিনে দাও প্লিজ… প্লিজ…!
আকাশ থমকে থাকালো। মেঘলার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আকাশ এমন করে তাকিয়ে আছে দেখে মেঘলা মাথা নিচু করে ফেলল।তারপর আকাশ ডান পাশ দিয়ে জানালার গ্লাস নামিয়ে দিয়ে দেখলে সত্যিই একজন দোকানদার ফুলসহ ফুলের মালা বিক্রি করছেন।
তারপর সে কিছু না বলে নেমে পড়লো গাড়ি থেকে। মেঘলা তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। কিছুতো যাওয়ার পর আকাশ উল্টো ফিরে এলো আবার। হাতের ইশারায় মেঘলাকে নেমে আসতে বলল। মেঘলা গাড়ি থেকে নেমে পরল তারপর আকাশের পিছু পিছু দোকানে সামনে এসে দাঁড়ালো।
আকাশ মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফুল নেবি? নাকি মালা নিবি! কয়টা নিবি !”
মেঘলা হাত বাড়িয়ে ফুলের ঝুড়ি থেকে একটা ফুলের মালা নিয়ে বলল, “এই বকুল ফুলের মালা টা হলে হবে।’
ফুলগুলো থেকে খুব মিষ্টি সুগন্ধ সুবাস ছড়াচ্ছে। মেঘলা ফুলের মালাটা হাতে নেড়ে ছেড়ে দেখছে।
আকাশ ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে পুরো ফুলের মালার ঝুড়িটা কিনে নিল। মেঘলা হতবিহ্বল হয়ে গেছে। এতগুলো মালা দিয়ে কী করবে সে?
“মামা, শুনেন এখানে মোট কতগুলো মালা আছে?”
ফুলওয়ালা বললেন,
“আগগে সাহেব,এখানে ৭৭টা খানিক বকুল ফুলের মালা আছে।”
“আচ্ছা সবগুলো মালা প্যাকিং করে দেন।”আকাশের আদেশ পাওয়া মাত্র ফুলওয়ালা সবগুলো ফুলের মালা প্যাকেট করে দিল। মেঘলা যেন কথা বলার খৈ হারিয়ে ফেলেছে ।
আকাশ ফুলের প্যাকেট টা নিয়ে গাড়ির ডিকিতে রেখে দিল। মেঘলার হাতে প্রথমে নেওয়া ফুলের মালাটা রয়ে গেল।
আকাশ মাঘলার মাথায় একটা আস্তে করে গাট্টি মেরে বললো, “চল।”
“আকাশ, আমি এতগুলো ফুল দিয়ে কী করবো?”
“কী আর করবি! সাজিয়ে রেখে দিবি, তাছাড়া বকুল ফুলের মালা শুকিয়ে গেলেও এর সুবাস বহুদিন থেকে যায়। আবার মন চাইলে নিজের সাজতে পারিস!”
“তাই বলে এতগুলো! একটা দুইটা না একসাথে ৭৭ টা ফুলের মালা। এগুলো দিয়ে তো একটা ফুলের মালার দোকান দিতে পারবো মনে হচ্ছে!”
“চাইলে দিতে পারিস তোর ইচ্ছা।”
আকাশে নিলিপ্ত জবাব শুনে মেঘলা কিছু বললা না
দুপুর প্রায় বারোটা।
চৌধুরী ম্যানশনের দোতলায় পুরোনো লাইব্রেরির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল আকাশ। তার পেছনে আয়ান।
ঘরটায় ঢুকলেই পুরোনো কাগজের গন্ধ পাওয়া যায়। দেয়ালজুড়ে কাঠের বুকশেলফ। একপাশে বড় একটা ডেস্ক, তার ওপর কিছু পুরোনো ফাইল ও নথিপত্র রাখা।
আয়ান দরজা বন্ধ করে বলল,
“ভাই, সকালে কোথায় গিয়েছিলে? ভাবি, মানে, মেঘলা কোথায়?”
আকাশ ভ্রু তুলে তাকাল।
“ভাবি বললি?”
আয়ান নির্বিকার মুখে বলল,
“মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তুমি চাইলে আবার বলতে পারি!”
“খবরদার! ওকে এসব বলে লজ্জা দিবি না।”
আয়ান হেসে উঠল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন কাজের কথা বলো।”
বিকেল চারটা।
চৌধুরী ম্যানশনের বাগানে বসে আছে মেঘলা। সামনে ছোট্ট একটা টেবিল। তার ওপর কালো ডায়েরি, একটা কলম আর রাজিয়া বেগমের সেই পুরোনো ছবি।
মেঘলা ডায়েরির পাতায় লিখছে।
‘প্রিয় ফুঁপি,
আজ অনেক দিন পর মন খুলে হাসলাম। একটা ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ওর নাম তুলি। ও আমাকে আপু বলে ডেকেছে। জানো ফুঁপি, ওর হাসিটা দেখে মনে হচ্ছিল, তোমার ভালোবাসার একটা ছোট্ট অংশ যেন আবার ফিরে পেয়েছি।
তুমি থাকতে আমাকে সবসময় বলতে, অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে নিজের কষ্টও একটু হালকা হয়।
আজ তোমার কথা খুব মনে পড়েছে।’
লেখা শেষ করে মেঘলা কলমটা নামিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে আকাশের কণ্ঠ ভেসে এল,
“ কী লিখছিস, ফুলটুসি? আমার নামে অভিযোগপত্র?”
মেঘলা ঘুরে তাকাল।
“না। তোমার মতো অসভ্য মানুষের নামে অভিযোগ লিখতে গেলে একটা আলাদা খাতা লাগবে!”
আকাশ হেসে তার পাশে বসে পড়ল।
“তা হলে তোকে একটা বড় ডায়েরি কিনে দিতে হবে।
মেঘলা মুখ ফিরিয়ে নিল।”
আকাশ কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কী হয়েছে? মন খারাপ?”
“না।”
“ আচ্ছা, তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেন?”
“ ইচ্ছা করছে না।”
আকাশ এবার একটু গম্ভীর হলো।
“মেঘলা, কী হয়েছে বল তো?”
মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
“ তুমি আমাকে আজ শিশু সদনে নিয়ে গেলে, তারপর সারাদিন কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কয়েকবার ফোন করেছিলাম। তুমি রিসিভ করো নি কেন?”
আকাশ একটু থমকে গেল।
“সত্যিই, হসপিটাল এ ছিলাম তখন পেশেন্ট কে ওষুধ বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম আর ফোনটা সাইলেন্টে ছিল। পরে ব্যস্ততার কারণে ফোনের কথা খেয়াল করিনি।”
আকাশ আবারও নরম গলায় বলল,
“সরি, ফুলটুসি। একটা জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”
মেঘলা নিচু গলায় বলল,
“ আমি খুব বাজে লোক!”
মেঘলার চোখে জল চিকচিক করছে।
আকাশের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে মেঘলার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল,
আমার দিকে তাঁকা।
মেঘলা তাকাল না।
আকাশ আবার বলল,
“ প্লিজ, ফুলটুসি।”
মেঘলা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।
আকাশের আকাশি চোখে আজ কোনো দুষ্টুমি নেই।
“ শোন, আমি তোকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি সবসময় তোর পাশে থাকার চেষ্টা করব। কিন্তু কখনো কখনো কাজের চাপে ভুল হতে পারে। তার মানে এই না যে তোকে ভুলে গেছি।”
মেঘলা মৃদু স্বরে বলল,
“সত্যি?”
“ একদম সত্যি। আর তুইও একটা কথা মনে রাখিস, আমাকে ভয় পেয়ে নয়, বিশ্বাস করে প্রশ্ন করবি। আমি যদি ভুল করি, আমাকে বলবি। আমি ঠিক করার চেষ্টা করব।”
মেঘলার চোখ থেকে একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
আকাশ আলতো করে চোখের জল মুছে দিল।
“ আরে বাবা, আমার ফুলটুসি কাঁদছে কেন? আমি তো ভেবেছিলাম, আজ বাগানে বসে একটু গল্প করবো।”
মেঘলা কান্নার মধ্যেই হেসে ফেলল।
“তুমি কোনো দিন সিরিয়াস থাকতে পারো না?”
“ পারি তো! দেখ, এখন একেবারে সিরিয়াস হয়ে আছি।”
“ মিথ্যাবাদী!”
আকাশ হেসে তার হাতটা নিজের হাতে রাখল।
“আচ্ছা, শোন। আজ রাতে তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“আবার সারপ্রাইজ? এবার কী?”
“ বলব না।”
“আকাশ!”
“ জি, ফুলঝুরি রাণী?”
“ তুমি একদম অসহ্য!”
আকাশ হেসে উঠল।
মেঘলাও আর নিজের হাসি আটকে রাখতে পারল না।
বাগানের ওপর দিয়ে বিকেলের বাতাস বয়ে গেল। গোলাপের গাছের ডালে একটা প্রজাপতি এসে বসল।
রাজিয়া বেগমের শূন্যতা তাদের জীবনে থেকেই যাবে। কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেও ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ছোট ছোট আনন্দের জন্য জায়গা তৈরি হতে লাগল।
এখন বাজে রাত আটটা।
চৌধুরী ম্যানশনের ডাইনিংরুমে আজ বেশ প্রাণচাঞ্চল্য। আয়েশা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে পোলাও আর মুরগির রোস্ট নিয়ে আসছেন। আয়ুশ চৌধুরী টেবিলে বসে আসাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আয়ান নিজের ফোনে হাসপাতালের কয়েকটি বার্তা দেখে উত্তর দিচ্ছে।
মেঘলা এসে আয়ানের পাশের চেয়ারে বসল।
“আয়ান ভাইয়া, তুমি আবার ফোন নিয়ে বসে আছ কেন? খাবার খাও!”
আয়ান মাথা তুলে বলল,
“ জি, ম্যাডাম! আপনি কি আজকাল বড় মামির সহকারী হয়ে গেছেন?”
মেঘলা গম্ভীর মুখে বলল,
“ হ্যাঁ। আর তোমার মতো অবাধ্য রোগীদের ঠিক করার দায়িত্বও আমার!”
আকাশ পাশ থেকে বলে উঠল,
“সাবধান, আয়ান । আমার রোগীকে আমার বিরুদ্ধে লাগাবেন না!”
আয়ান হেসে বলল,
“ তোমার রোগী? মেয়েটা কি হাসপাতালের কোনো সম্পত্তি নাকি?”
আকাশ একটু থেমে বলল,
“না, আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ।
কথাটা শুনে মেঘলা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।”
আয়ান দুহাত তুলে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা! আমি আর কিছু বলছি না। তোমরা দুজন মিলে আমার খাওয়ার শান্তিটুকু নষ্ট করে দিচ্ছ!”
আয়ুশ হেসে উঠলেন।
“ আয়ান, তুই ছোটবেলা থেকেই এমন। আর আকাশ, তুইও কম যাস না!”
সবার হাসির মধ্যে খাবার শুরু হলো।
কিছুক্ষণ পর আয়েশা মেঘলার প্লেটে মাছ তুলে দিতে দিতে বললেন,
“মেঘলা , আগামী শুক্রবার রাজিয়ার জন্য যে দোয়ার আয়োজন করা হবে, সেখানে তুই আমার সঙ্গে থাকবি। আর আয়ান, তুইও সময় বের করিস।”
আয়ান মৃদু মাথা নাড়ল।
“ অবশ্যই, বড় মামি।”
আসাদ চৌধুরী বললেন,
“আপার নামে যে দাতব্য তহবিল করার কথা হয়েছিল, সেটার কাজও শুরু করতে চাই। আগামী সপ্তাহে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলব।”
আকাশ বলল,
“ আমি হাসপাতালের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করতে পারি। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য তহবিলটা কাজে লাগবে।”
আয়ুশ চৌধুরী সন্তুষ্ট হয়ে বললেন,
“ খুব ভালো। রাজিয়া বেঁচে থাকতে মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে চাইত। তোরা যদি ওর সেই ইচ্ছা পূরণ করতে পারিস, তাহলে সেটাই হবে ওর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।”
মেঘলা নরম গলায় বলল,
“ফুঁপি থাকলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে খুব খুশি হতেন।”
কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য টেবিলে নীরবতা নেমে এল।
আয়েশা চৌধুরী মেঘলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“ হ্যাঁ মা। আমরা তাঁকে ভুলে যাব না। তবে তাঁর স্মৃতি বুকে নিয়েই সামনে এগিয়ে যাব।”
আয়ান নিজের প্লেট থেকে একটা মিষ্টি তুলে মেঘলার সামনে রাখল।
“এই যে, আমার বোনের মন খারাপ করা চলবে না। আজ একটা মিষ্টি বেশি খেতে হবে।”
মেঘলা মিষ্টিটা হাতে নিয়ে হেসে বলল,
“ তুমি নিজে খাবে না?”
আয়ান বলল,
“আমি তো বড় ভাই। বোনকে খাওয়ানো আমার দায়িত্ব!”
আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“ আর বোনকে খাওয়ানোর পর দাঁত ব্রাশ করানোও আপনার দায়িত্ব!”
আয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
“ কী বললে?”
আকাশ হেসে ফেলল।
মেঘলা আর আয়েশাও হাসতে লাগলেন।
ডাইনিংরুমে আবার হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
সেই হাসির মধ্যে রাজিয়া বেগমের স্মৃতি মিশে ছিল। তাঁর খালি চেয়ারটা যেন নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল, ভালোবাসার মানুষ চলে গেলেও ভালোবাসার বন্ধনগুলো স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে আর জীবন।”
চলবে.............