ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো মেঘলা আকাশ একলা

পর্ব 17

লেখক: কবিতা রহমান মর্তুজা (পুতুল)

ওগো মেঘলা আকাশ একলা 

লেখিকা : পুতুল। (কবিতা রহমান মর্তুজা) 

কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। 🚫🚫🚫

পর্ব: ১৭

রাতের কালো চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন এক সকাল। পূর্ব আকাশের দিগন্তে সূর্যের লাল আভা দেখা দিয়েছে। রাতভর শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় ছোট ছোট মুক্তোর মতো জলকণা চিকচিক করছে। বাগানের গোলাপ, বেলি আর রজনীগন্ধার গাছগুলো যেন সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে নিজেদের নতুন করে মেলে ধরেছে। দূরের কোনো গাছের ডালে বসে একজোড়া শালিক কিচিরমিচির করে ডাকছে। পাখিদের সেই মিষ্টি ডাকের সঙ্গে ভেসে আসছে ভোরের আজানের সুমধুর ধ্বনি।

প্রকৃতি যেন নিজের নিয়মে নতুন দিনের সূচনা করেছে। অথচ চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল অন্দরমহলে এখনো জমে আছে একরাশ বিষণ্ণতা।

এই বাড়ির প্রতিটি কোণে একসময় রাজিয়া বেগমের হাসির শব্দ শোনা যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি কখনো রান্নাঘরে গিয়ে সবার খোঁজ নিতেন, কখনো মেঘলাকে নিজের কাছে ডেকে আদর করতেন, আবার কখনো আয়ানের কান টেনে  বকাঝকা করতেন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া না করার জন্য।

আজ সেই মানুষটাই নেই!

বাড়ির সামনের বাগানে ফুল ফুটেছে, পাখিরা গান গাইছে, সূর্যের আলো এসে পড়েছে ঝকঝকে জানালার কাচে। কিন্তু যাঁর জন্য এই বাড়ির এত আয়োজন, এত মায়া, এত ভালোবাসা—সেই মানুষটি আর কোনো দিন এই সকালের আলো দেখতে পারবেন না।

চৌধুরী ম্যানশনের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা।

পরনে সাদা রঙের একটা সাধারণ কামিজ। খোলা চুলগুলো সকালের বাতাসে উড়ছে। চোখের নিচে কালচে দাগ, মুখটা ভীষণ মলিন। কয়েক রাতের অনিদ্রা আর কান্না যেন মেয়েটার চিরচেনা উচ্ছলতাকে কেড়ে নিয়েছে।

মেঘলা রেলিংয়ের ওপর হাত রেখে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার সামনে বিশাল বাগান, বাগানের মাঝখানে ছোট্ট ফোয়ারা, আর তার ওপারে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটা। গাছের ডালে ডালে নতুন পাতা গজিয়েছে। কিছুদিন পরেই হয়তো লাল ফুলে ছেয়ে যাবে পুরো গাছটা।

কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে কি আর কখনো ফুল ফুটবে?

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল রাজিয়া বেগমের কথা।

সেই মানুষটা প্রায়ই তাকে এই বারান্দায় নিয়ে এসে বলতেন, ‘মেঘপাখি, মন খারাপ হলে আকাশের দিকে তাকাবি। আকাশের কোনো সীমা নেই। মানুষের কষ্টও একসময় কেটে যায়। শুধু ধৈর্য ধরতে হয়।’

কথাগুলো মনে পড়তেই মেঘলার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।

“ ফুঁপি, তুমি তো আমাকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছিলে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব বলো? তুমি তো বলেছিলে, আমার বিয়েতে নিজের হাতে লাল শাড়ি পরিয়ে দেবে। আমার মাথায় ওড়না দিয়ে বলবে, ‘আমার মেঘপাখিটা আজ কত সুন্দর লাগছে!”

কথাগুলো বলতে বলতে মেঘলা দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“ কী রে ফুলটুসি, সকাল সকাল আমার অগোচরে এত কান্নাকাটি হচ্ছে কেন?”

মেঘলা চমকে পেছনে তাকাল।

আকাশ!

পরনে কালো পাঞ্জাবি, চুলগুলো এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। কয়েক দিনের মধ্যে ছেলেটাকে যেন অনেকটা বদলে গেছে। তার সেই দুর্লভ আকাশি চোখ দুটোতেও আজ জমে আছে একরাশ বিষণ্ণতা।

মেঘলা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে মুখ ফিরিয়ে নিল।

“আমি কাঁদছি না তো!”

আকাশ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ওর পাশে দাঁড়াল।

“ ওহ্, তাই নাকি? তাহলে তোর চোখ দিয়ে যে বৃষ্টির পানি পড়ছে, সেটা কি আকাশ থেকে সরাসরি তোর চোখে এসে পড়ছে?”

মেঘলা চাইলেও হাসতে পারল না।

“ আকাশ, প্লিজ! আজ আমাকে নিয়ে মজা করো না।”

আকাশের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,

“ আচ্ছা, মজা করব না। কিন্তু একটা কথা বল তো, তুই কি ভাবিস, শুধু তোরই কষ্ট হচ্ছে? আমার কি কষ্ট হয় না? ফুঁপি শুধু তোর ফুঁপি ছিলেন না, আমারও ছিলেন। ছোটবেলায় আমি অসুস্থ হলে আম্মুর আগে যিনি ছুটে আসতেন, তিনি ছিলেন ফুঁপি। আমার পরীক্ষার ফল খারাপ হলে সবাই যখন বকত, তখন তিনিই আমাকে আড়াল করে বলতেন, ‘আমার আকাশ একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে।’

আকাশের গলাটা কেঁপে উঠল।

“আজ আমি সত্যিই বড় ডাক্তার হয়েছি, ফুলটুসি। অথচ নিজের ফুঁপিকে বাঁচাতে পারলাম না!”

কথাটা বলেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

আকাশকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে মেঘলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে আকাশের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিল।

‘ নিজেকে দোষ দিও  না, আকাশ। তুমি তো নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ। আল্লাহ হয়তো ফুঁপির জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন।’

আকাশ মেঘলার দিকে তাকাল।

 ‘জানিস, হাসপাতাল থেকে ফেরার পর থেকে প্রতিদিন সকালে মনে হয়, ফুঁপি বুঝি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ডাকবেন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে, সেই ডাকটা আর কোনো দিন শুনতে পাব না।’

মেঘলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আকাশের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল।

আকাশ ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

‘কাঁদিস না, মেঘলা।একদম  কাঁদবি না। তোর কষ্ট লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, আমরা ফুঁপিকে হারিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তাঁর দেওয়া ভালোবাসা তো হারাইনি।’

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।

সকালের বাতাসে মেঘলার চুল উড়ে এসে আকাশের মুখে পড়ছিল। দূরে সূর্যটা আরও ওপরে উঠেছে। আলো এসে পড়েছে দুজনের মুখে, অথচ তাদের মনের আকাশে এখনো মেঘ জমে আছে।

হঠাৎ মেঘলা খুব নিচু গলায় বলল,

“ আকাশ, তুমি  আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো?”

আকাশ ওর মুখটা দুহাতের মধ্যে তুলে ধরল।

“ তুই কি পাগল হয়েছিস? তোকে ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। তুই আমার জীবনের সেই মানুষ, যাকে হারানোর ভয় আমার নিজের মৃত্যুর ভয় থেকেও বেশি।”

মেঘলার চোখ আবার ভিজে উঠল।

“ সত্যি?”

“ একদম সত্যি। আর শোন, তুই যত দিন আমার পাশে থাকবি, তত দিন তোর সব দুঃখের সঙ্গে লড়াই করার জন্য একজন মানুষকে পেয়ে যাবি।”

“ কে সে?”

আকাশ মৃদু হেসে মেঘলার কপালে আলতো করে চুমু দিল।

“ তোর এই পাগল ডাক্তারটা!”

মেঘলার ঠোঁটের কোণে বহুদিন পর এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

আকাশ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,   এই  হাসিটুকু  রক্ষা করার জন্য  তো এত লড়াই, আমার  ফুলটুসি। 

ঠিক তখনই পেছন থেকে গলা শোনা গেল,

“ বাহ্! ভোরবেলাতেই এত আবেগ! আমাকে না ডেকে এখানে কীসের গোপন সভা চলছে?”

মেঘলা তাড়াতাড়ি আকাশের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল।

“আয়ান ভাইয়া!”

আয়ান দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হালকা নীল শার্ট, চোখেমুখে ক্লান্তি। মায়ের মৃত্যুর পর ছেলেটার হাসিটাও যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। তবু মেঘলাকে একটু হাসতে দেখে তার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।

আয়ান এগিয়ে এসে মেঘলার মাথায় হাত রাখল।

“ কী রে বোন, একটু হাসছিস দেখছি! তা আমার অনুপস্থিতিতে এই ডাক্তার সাহেব কি তোকে সান্ত্বনা দেওয়ার নামে অন্য কোনো কাজ করছিল?”

“ ভাইয়া! তুমি না!”

মেঘলার লজ্জা দেখে আয়ান হেসে উঠল। আকাশও মুচকি হেসে বলল,

“আপনার বোনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, ভাই সাহেব! আর আপনি এসে আমার সুনাম নষ্ট করছেন!”

“তোমার আবার সুনাম আছে নাকি? ছোটবেলা থেকে আমার বোনের পেছনে ঘুরঘুর কর, আর এখন আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ!”

“ ভাইয়া, আমি কিন্তু সব শুনছি!”

তিনজনের হাসিতে বারান্দার নিস্তব্ধতা খানিকটা ভেঙে গেল।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়ানের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল। সে বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে দূরের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

“জানিস, গত রাতে আম্মুর ঘরে গিয়েছিলাম। বিছানার পাশে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছি। মনে হচ্ছিল, আম্মু বুঝি এখনই এসে বলবে, ‘আয়ান, এত রাতে ঘুমাসনি কেন?’

মেঘলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“জীবনে বাবাকে কখনো পাইনি। আম্মুই ছিল আমার সবকিছু। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীতে আমার নিজের বলতে আর কেউ নেই।”

“এই কথা আর একবার বললে কিন্তু তোর খবর আছে!”

আকাশের গম্ভীর কণ্ঠে আয়ান তাকাল।

আকাশ এগিয়ে এসে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।

“ তুই একা না, আয়ান। আমি আছি, আব্বু-আম্মু আছেন। মেঘলা আছে। তোর যখন যা প্রয়োজন হবে, আমাদের বলবি। ফুঁপিকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু তোকে আর কখনো একা অনুভব করতে দেব না।”

আয়ান কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— ধন্যবাদ, ভাই।

আকাশও ভাইকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল।

মেঘলা দুজনকে এভাবে দেখে চোখ মুছল। তার মনে হলো, রাজিয়া ফুঁপি চলে গিয়েও যেন তাদের এক সুতোয় বেঁধে দিয়ে গেছেন।

আয়ান মেঘলার দিকে ফিরে বলল,

— আর তুই, আমার বোন! মনে রাখিস, তোর জীবনে যত ঝড়ই আসুক, তোর এই ভাই সবসময় তোর পাশে থাকবে।

মেঘলা ছুটে গিয়ে আয়ানকে জড়িয়ে ধরল।

“তুমি আমার সবচেয়ে ভালো ভাইয়া!”

আয়ান হেসে বলল,

“আর আকাশ তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তাই না?”

মেঘলা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল।

“ ধুর! তোমার সঙ্গে কথাই বলব না!”

আকাশ হেসে বলল,

“ভাই গো ভাই , আপনার বোন রাগ করলে কিন্তু তাকে মানানোর দায়িত্ব আপনার!”

“কেন? তুমি কী করবে?”

“আমি তো শুধু ওর রাগ ভাঙানোর জন্য একটা গোলাপ নিয়ে আসব।”

“আরে বাবা! তাহলে তো আমার বোনের রাগ করারও একটা লাভ আছে!”

তিনজনের হাসিতে এবার সত্যিকারের উষ্ণতা ফিরে এল।

কয়েক দিনের দুঃখ এক মুহূর্তে মুছে যায়নি। কিন্তু সেই দুঃখের মধ্যেও তারা বুঝতে পারল, একে অপরের হাত ধরে থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বারান্দার বাইরে তখন সূর্যের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতায় বাতাস দোল খাচ্ছে। প্রকৃতি যেন নীরবে তাদের নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।

চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমে সকালের আলো এসে পড়েছে। জানালার পাশে রাখা সাদা পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে। মাঝখানের কাচের টেবিলে সাজানো আছে কয়েকটি চায়ের কাপ, বিস্কুট আর তাজা ফুলের তোড়া।

একসময় এই ঘরটিতে সকাল হলেই রাজিয়া বেগমের হাসির শব্দ শোনা যেত। তিনি কখনো আয়ুশ চৌধুরীর  সঙ্গে তর্ক করতেন, কখনো বড় ভাবি  আয়েশা চৌধুরীর সঙ্গে রান্নার গল্পে মেতে উঠতেন, আবার কখনো আকাশ আর আয়ানকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করতেন।

আজ সেই ঘরেই সবাই একসঙ্গে বসে আছেন, কিন্তু রাজিয়া বেগম নেই।

আয়ুশ চৌধুরী সোফায় বসে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আছেন। অথচ অনেকক্ষণ ধরে একই পাতায় চোখ আটকে আছে। আয়েশা চৌধুরী জানালার পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে রেখেছেন। চা ঠান্ডা হয়ে গেলেও তাঁর খেয়াল নেই।

আসাদ চৌধুরীও উপস্থিত। দীর্ঘ পনেরো বছর পর ভাইয়ের বাড়িতে ফিরে এলেও তাঁর মুখে কোনো আনন্দ নেই। রাজিয়া আপাকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর আকাশ ও আয়ান ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। তাদের পেছনে মেঘলা।

আয়ুশ চৌধুরী  খবরের কাগজটা নামিয়ে ছেলেদের দিকে তাকালেন।

“ এসো, তোমরা সবাই এখানে বসো।”

আকাশ বাবার পাশে বসল। আয়ান বসল আসাদের পাশে। মেঘলা গিয়ে আয়েশা চৌধুরীর  কাছাকাছি বসল।

আয়ুশ চৌধুরী  কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভারী গলায় বললেন,

“তোমাদের ফুঁপি ছোটবেলা থেকেই খুব অভিমানী ছিল। কিন্তু মনটা ছিল একেবারে শিশুর মতো সরল। নিজের কষ্ট কখনো আমাদের বুঝতে দিত না। আজ মনে হচ্ছে, ওর জীবনের কত কথা আমরা জানতেই পারলাম না।”

কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ধরে এল।

“আমি বড় ভাই হয়েও ওকে যথেষ্ট আগলে রাখতে পারিনি। এই আফসোসটা হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে।”

আয়েশা  চৌধুরী চোখের জল মুছে বললেন,

“রাজিয়া আমাকে কতবার বলেছে, ‘ভাবি, মেঘলাটাকে একটু দেখে রেখো। মেয়েটা আমার খুব আদরের।’ অথচ আজ মেঘলাকে দেখলেই আমার বুকটা ফেটে যায়। মেয়েটা ফুঁপিকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসত।”

মেঘলা মাথা নিচু করে বসে রইল। রাজিয়া বেগমের কথা শুনলেই তার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।

আসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“আপা বেঁচে থাকলে আজ আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে কত খুশি হতেন! এত বছরের অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছু হয়তো একদিন ঠিক হয়ে যেত।”

আয়ুশ চৌধুরী  ভাইয়ের দিকে তাকালেন।

দীর্ঘ পনেরো বছরের দূরত্বের পর আসাদকে আবার নিজের পাশে বসে থাকতে দেখে তাঁর বুকেও জমে থাকা কষ্ট জেগে উঠল।

“আসাদ, অতীতের অনেক ভুল হয়েছে আমাদের। আমি তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ঠিক করিনি। তখন রাগের মাথায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার কষ্ট তোকে একা বহন করতে হয়েছে।”

আসাদ মাথা নিচু করে বললেন,

“বড় ভাই, অতীত নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না। শুধু একটা কথাই কষ্ট দেয়—রাজিয়া আপাকে বাঁচাতে পারলাম না।”

আয়ুশ উঠে এসে ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

“তুই চেষ্টা করেছিস, এটাই অনেক। এখন থেকে এই বাড়িতে তোর আর কোনো দূরত্ব থাকবে না। আমরা সবাই মিলে নতুন করে শুরু করব।”

আসাদের চোখ ভিজে উঠল।

আকাশ চুপচাপ সবকিছু শুনছিল। সে বুঝতে পারছিল, ফুঁপির মৃত্যুর পর এই পরিবার শুধু একজন মানুষকে হারায়নি; হারিয়েছে বহু বছরের অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনেক না বলা কথাও।

আয়ুশ চৌধুরী  এবার আকাশের দিকে তাকালেন।

“আকাশ , তুমি যেভাবে সব সত্য সামনে এনেছ, তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। তবে একটা কথা মনে রেখো, প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলো  না। রাজিয়ার জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া আমাদের দায়িত্ব, কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকা মানুষগুলোর প্রতিও দায়িত্ব আছে।”

আকাশ বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

“বুঝেছি, আব্বু। আমি চাই, ফুঁপির সঙ্গে যা হয়েছে তার সঠিক বিচার হোক। কিন্তু আর কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন এই ঘটনার কারণে কষ্ট না পায়”।

আয়ানও বলল,

“আম্মু সবসময় চাইত আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। আমি চাই, তাঁর শেষ ইচ্ছেটা আমরা পূরণ করি।”

আয়েশা চৌধুরী ছেলেদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“তাহলে আজ একটা কাজ করো। সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাবে। কত দিন হলো, এই বাড়িতে সবাই এক টেবিলে বসে মন খুলে খাইনি!”

কথাটা শুনে মেঘলার মনে পড়ল রাজিয়া বেগমের কথা। তিনি প্রায়ই খাবার টেবিলে সবাইকে একসঙ্গে বসাতেন। কেউ না এলে নিজেই ফোন করে ডেকে আনতেন।

মেঘলা মৃদু স্বরে বলল,

“ ফুঁপি থাকলে আজ নিশ্চয়ই সবার আগে খাবার টেবিলে গিয়ে বসতেন।”

আয়েশা চৌধুরী  মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“হ্যাঁ মা। তাই তো আজ আমরা সবাই একসঙ্গে খাব। মনে করব, ফুঁপি আমাদের মাঝেই আছেন। তাঁর ভালোবাসাটুকু যেন এই বাড়ি থেকে কখনো হারিয়ে না যায়।”

ঘরের সবাই নীরবে সম্মতি জানাল।

জানালার বাইরে তখন রোদ ঝলমল করছে। ড্রয়িংরুমের ফুলদানিতে রাখা সাদা লিলিগুলো বাতাসে সামান্য দুলছে। প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে বাড়িটাকে তার বিষণ্ণতা থেকে বের করে আনতে চাইছে।

দুপুরের দিকে আকাশ যখন নিজের ঘরে বসে কিছু হাসপাতালের রিপোর্ট দেখছিল, তখন মেঘলা নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করল।

ঘরটায় ঢুকতেই তার চোখ চলে গেল বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলটার দিকে। সেখানে রাজিয়া বেগমের দেওয়া একটা পুরোনো উপহারের বাক্স রাখা আছে। বাক্সটার ভেতরে ছোট ছোট চুড়ি, কিছু চিঠি আর কয়েকটা ছবি।

মেঘলা ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল।

সবার ওপরে একটা ছবি। ছবিতে রাজিয়া বেগম তাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। তখন মেঘলার বয়স খুব বেশি হলে চার কি পাঁচ বছর হবে। ছোট্ট মেঘলা দুই হাতে ফুঁপির গলা জড়িয়ে ধরে হাসছে, আর রাজিয়া বেগম তার গালে চুমু দিচ্ছেন।

ছবিটা বুকে চেপে ধরতেই মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।

“ ফুঁপি, তুমি আমাকে এত ভালোবাসতে কেন? এখন তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে সব সামলাব?”

সে একে একে ছবিগুলো দেখতে লাগল।

একটা ছবিতে রাজিয়া বেগমের পাশে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। অন্য ছবিতে আকাশ ছোটবেলার কোনো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কেক কাটছে। আরেকটা ছবিতে তিনজন একসঙ্গে বাগানে বসে হাসছে।

মেঘলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

ছোটবেলায় আকাশ সবসময় তাকে জ্বালাতন করত। কখনো তার পুতুল লুকিয়ে রাখত, কখনো চুল টেনে দৌড়ে পালাত। আর মেঘলা রাগ করে ফুঁপির কাছে বিচার দিত।

রাজিয়া বেগম তখন আকাশকে বকতেন, কিন্তু একটু পরেই দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে মিষ্টি খেতে দিতেন।

সেই দিনগুলো যেন কত দূরের!

হঠাৎ অ্যালবামের মাঝখান থেকে একটা ছোট্ট খাম মেঝেতে পড়ে গেল।

মেঘলা অবাক হয়ে খামটা তুলে নিল।

খামের ওপরে লেখা,

“আমার আদরের মেঘ পাখির জন্য চিঠি খানা!”

লেখাটা চিনতে মেঘলার এক মুহূর্তও লাগল না।

এ যে রাজিয়া বেগমের হাতের লেখা!

তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ফুঁপি কখন এই চিঠি লিখেছিলেন? কেনই বা এত দিন এটা অ্যালবামের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন?

কাঁপা হাতে খামটা খুলল সে।

ভেতরে একটা চিঠি আর ছোট্ট একটা পুরোনো ছবি।

মেঘলা চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।

আমার আদরের মেঘপাখি,

তুই যখন এই চিঠিটা পড়বি, তখন হয়তো আমি তোর পাশে থাকবো না।  

মেঘলা, মানুষের জীবনে অনেক সত্য লুকিয়ে থাকে,  যেগুলো সময়ের আগে প্রকাশ করা যায় না। তোকে নিয়েও আমাদের পরিবারের সঙ্গে লুকিয়ে  আছে কিছু না বলা কথা।  আমি সব কথা তোকে বলতে চেয়েছিলাম।, কিন্তু সময় আর  পরিস্থিতি আমাকে সুযোগ দেয়নি। 

আর আকাশকে বলিস, আমার আয়ানকে যেন কখনো এটা না ফেলে। ও মুখ অনেক কথা বলতে পারে না, কিন্তু বুকের  ভেতরে অনেক  কষ্ট লুকিয়ে  রাখে। তোরা দুজন মিলে ওকে আগলে রাখিস। 

আল্লাহ  তোদের ভালো  রাখুক। 

ইতি, 

রাজিয়া ফুঁপি 

চিঠিটা পড়া শেষ হতে না হতেই মেঘলার চোখ থেকে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল।

সে চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।একটা মানুষ কতটা কাঁদতে পারে তা হয়তো মেঘলাকে না দেখলে বোঝা যেত না।

ফুঁপি চলে যাওয়ার আগেও তাঁর চিন্তা ছিল সবার জন্য! নিজের জীবনের শেষ সময়েও তিনি মেঘলা আর আয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছেন।সে জানে, এই বাড়ির কারো সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারপরও এ বাড়ির মানুষগুলো তাকে কখনো বুঝতেই দিত না যে, সে কুড়িয়ে পাওয়া এক পরিচয়হীন  কন্যা।

মেঘলার বুকের ভেতর অজানা ভয় জমতে লাগল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

“ফুলটুসি, ভেতরে আছিস?”

আকাশের কণ্ঠ!

মেঘলা দ্রুত চোখ মুছে বলল,

“আসুন, দরজা খোলা।”

আকাশ ঘরে ঢুকে মেঘলার মুখের দিকে তাকাল।

“কী হয়েছে তোর? চোখ এত লাল কেন?”

মেঘলা কোনো উত্তর না দিয়ে চিঠিটা ওর হাতে দিল।

আকাশ মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা  পড়ল তারপর।চিঠি টা  হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। ছবির  পেছনে লেখা নামটা দেখেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।

আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

আকাশ চিঠিটা  টেবিলের ওপর রেখে মেঘলার সামনে বসে পড়ল।

মেঘলা আকাশের হাত শক্ত করে ধরল।

“ আমার খুব ভয় করছে, আকাশ। মনে হচ্ছে, ফুঁপি আমাদের এমন কিছু বলতে চেয়েছিলেন, যা জানার পর আমাদের জীবনটাই বদলে যাবে।”

আকাশ ওর হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

“ শোন, তুই একা না। যা-ই সামনে আসুক, আমরা একসঙ্গে তার মুখোমুখি হব। 

মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়াল।

কী ঘটেছিল সেদিন?

আর নাসরিন চৌধুরীই বা কেন সেই ঘটনার সাক্ষী?

আকাশ জানত, উত্তরগুলো খুঁজে বের করা সহজ হবে না।

তবু সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এবার আর কোনো সত্য অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকতে দেবে না।

বিকেলের আকাশে তখন হালকা মেঘের আনাগোনা। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের আলো সোনালি হয়ে উঠেছে। বাগানের গাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে সেই আলো এসে পড়ছে পাথরের সরু পথের ওপর। গোলাপের গাছে কয়েকটি নতুন কুঁড়ি ফুটেছে। বাতাসে বেলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।

চৌধুরী ম্যানশনের বাগানে পাশাপাশি হাঁটছে আকাশ আর মেঘলা।

মেঘলার হাতে রাজিয়া বেগমের ছবিটা। আকাশের হাতে দুটো কাগজ—একটা চিঠির অনুলিপি, অন্যটা ছবির পেছনের লেখার ছবি তুলে রাখা কাগজ।

কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর মেঘলা বলল,

“আকাশ, তুমি কি কখনো ভেবেছ, আমাদের জীবনে এত ঘটনা কেন ঘটছে?”

আকাশ মৃদু হেসে বলল,

“জীবনে সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না, ফুলটুসি। কিছু উত্তর সময় দেয়, আর কিছু উত্তর খুঁজে বের করতে হয়।”

“ তুমি সবসময় এমন করে কথা বলো কেন? মনে হয়, কোনো বইয়ের ভেতর থেকে উঠে এসেছি!”

আকাশ হেসে ফেলল।

“আর তুই সবসময় এমন করে প্রশ্ন করিস কেন, যেন আমি তোর পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে বসেছি!’

মেঘলা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“আচ্ছা, আমি আর কোনো প্রশ্ন করব না।”

“এই তো ভালো মেয়ে!”

আকাশ ওর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।

মেঘলা একটু এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ থেমে দাঁড়াল।

“আকাশ?”

“ হুম?”

“তুমি কি সত্যিই মনে কর, আমাদের সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে?”

আকাশ এবার হাসল না। সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“ একদম আগের মতো হয়তো হবে না। কারণ ফুঁপি আর ফিরে আসবেন না। তাঁর জায়গাটা কেউ নিতে পারবে না। কিন্তু আমরা আবার হাসতে শিখব, একসঙ্গে খেতে বসব, ঘুরতে যাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসব। ফুঁপি নিশ্চয়ই চাইতেন না, তাঁর জন্য আমরা সারাজীবন নিজেদের আটকে রাখি।”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

“মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যদি ফুঁপির সঙ্গে আরও কিছু সময় কাটাতে পারতাম!”

“এই আফসোসটা আমারও আছে। কিন্তু আমরা তাঁর সঙ্গে যে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছি, সেগুলো তো আমাদের কাছেই আছে। স্মৃতিগুলো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”

আকাশ নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট সাদা ফুল বের করল। বাগানের গাছ থেকে  নিয়ে তোলা ফুলটা সে মেঘলার হাতে দিল।

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।

“এটা আবার কোথা থেকে পেলে?’

“তোর জন্য।”

“ আমার জন্য ফুল?”

“হ্যাঁ। তুই তো সবসময় বলিস, সাদা ফুল তোর খুব পছন্দ।”

মেঘলা ফুলটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।

‘তোমার এত কিছু মনে থাকে কীভাবে?’

আকাশ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোর ব্যাপারে আমার অনেক কিছুই মনে থাকে, ফুলটুসি। শুধু একটা জিনিস মনে থাকে না।”

“ কী?”

“তুই কখন আমার ওপর রাগ করবি আর কখন আমাকে ক্ষমা করে দিবি!”

মেঘলা হেসে উঠল।

“তুমি  যদি আমাকে এভাবে জ্বালাও, তাহলে তোমাকে কোনো দিন ক্ষমা করব না!”

আকাশ একটু ঝুঁকে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“তা হলে তোকে সারাজীবন মানানোর দায়িত্ব আমারই হয়ে গেল!”

মেঘলা লজ্জায় আকাশের বাহুতে হালকা একটা চিমটি কাটল।

“অসভ্য!”

আকাশ হেসে উঠল।

অনেক দিন পর মেঘলার হাসিটা বাগানের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। পাশের গাছের ডালে বসে থাকা একটা ছোট্ট পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। সূর্যের শেষ আলো এসে পড়ল মেঘলার মুখে।

আকাশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু গলায় বলল,

“ জানিস, তোর হাসিটা দেখলে মনে হয়, পৃথিবী এখনো সুন্দর।”

মেঘলা চুপ করে গেল। সে আকাশের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

“ তুমি পাশে থাকলে আমার পৃথিবীটা সুন্দরই থাকবে।”

আকাশ মেঘলার হাতটা শক্ত করে ধরল।

“কথা দিলাম, তোর পাশে থাকার চেষ্টা কোনো দিন বন্ধ করব না।”

বাগানের পথ ধরে তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।

তবে দুজনেরই অজান্তে, বাড়ির দোতলার একটি জানালা থেকে কেউ একজন তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

লোকটি তার কেউ নয়,স্বয়ং  আয়ুশ  চৌধুরী 

আয়ুশ চৌধুরী একটা  হাসি ফুটিয়ে জানালার পর্দা টেনে দিল।

*************

রাত আটটা।

চৌধুরী ম্যানশনের খাবার ঘরে আজ অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে বসেছে। বড় টেবিলের ওপর সাজানো আছে গরম ভাত, মুরগির রোস্ট, ডাল, সবজি, মাছের ঝোল আর নানা রকম খাবার। টেবিলের মাঝখানে রাখা ফুলদানিতে সাদা বেলি আর গোলাপের ফুল।

রান্নাঘরের জানালা দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। বাইরে বাগানের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

আয়েশা চৌধুরী নিজে দাঁড়িয়ে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

“আয়ান বাবা, তোর প্লেটে মাছটা নে। সারাদিন কিছু খাসনি মনে হচ্ছে।”

আয়ান মৃদু হেসে বলল,

“আম্মু , আমি খাচ্ছি তো!”

কথাটা বলেই সে থেমে গেল।

‘আম্মু’ শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে উঠল। এত দিন এই শব্দটা সে নিজের মাকে ডাকার জন্য ব্যবহার করেছে। আজ আয়েশা চৌধুরীকে স্নেহ করে আম্মু বললেও মনে পড়ে গেল, নিজের মাকে আর কোনো দিন এভাবে ডাকতে পারবে না।

আয়েশা বিষয়টা বুঝতে পেরে আয়ানের মাথায় হাত রাখলেন।

“ আমি জানি বাবা, তোর আম্মুর জায়গা কেউ নিতে পারবে না। তবু তোর যখনই মন খারাপ হবে, আমার কাছে আসবি। তোকে আমি নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসি।”

আয়ান আর কথা বলতে পারল না। সে নিচু হয়ে খাবার খেতে লাগল।

আয়ুশ চৌধুরী পাশে বসা আসাদের দিকে খাবারের বাটি এগিয়ে দিলেন।

“ নে, তোর পছন্দের মাছটা। কত বছর পর তোকে আবার এই টেবিলে পেলাম!”

আসাদ মৃদু হাসলেন।

বড় ভাই, এই টেবিলের অনেক স্মৃতি আছে। রাজিয়া আপা সবসময় চাইতেন, আমরা সবাই একসঙ্গে বসে খাই। আজ তাঁকে ছাড়া বসে থাকতে কেমন যেন লাগছে।”

কথাটা শুনে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মেঘলা নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাজিয়া বেগম প্রায়ই তার প্লেটে নিজের হাতে খাবার তুলে দিতেন। মেঘলা কোনো খাবার না খেলে বকাঝকা করতেন, আবার শেষে নিজের হাতেই খাইয়ে দিতেন।

আজ প্লেটভর্তি খাবার সামনে নিয়েও তার কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল না।

আকাশ বিষয়টা লক্ষ করল।

সে নিজের প্লেট থেকে একটু রোস্ট তুলে মেঘলার প্লেটে দিয়ে নিচু গলায় বলল,

“ ফুলটুসি, একটু খেয়ে নে। সকাল থেকে তেমন কিছু খাসনি।’

মেঘলা মুখ তুলে তাকাল।

“আমার খেতে ইচ্ছা করছে না।”

“ জানি। কিন্তু না খেলে তুই অসুস্থ হয়ে পড়বি। তখন তোকে নিয়ে আমাকে আবার হাসপাতালে দৌড়াতে হবে।”

মেঘলা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

“ তুমি সবকিছুতেই হাসপাতালের কথা বলো কেন?’ওই হাসপাতাল গুলো জেলখানার চেয়ে কম না।”

আকাশ মুচকি হেসে বলল,

“ কারণ আমি ডাক্তার। আর তুই আমার সবচেয়ে কঠিন রোগী!’

কথাটা শুনে আয়ান হেসে ফেলল।

“ একদম ঠিক বলেছ! আমার বোনকে ওষুধ খাওয়ানোও একটা বড় চ্যালেঞ্জ!”

মেঘলা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ তোমরা দুজন মিলে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছ?আম্মু দেখ ওরা আমাকে নিয়ে মজা করছে”

আয়ান হেসে বলল,

“ আরে না, বোন! আমরা তো তোর সুস্থতা নিয়ে গবেষণা করছি!”

অনেক দিন পর খাবার টেবিলে একটু হাসির শব্দ শোনা গেল।

আয়েশা চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি মনে মনে বললেন, ‘রাজিয়া, দেখো, তোমার আদরের মানুষগুলো আবার একটু হাসছে। তুমি যেখানে আছ, ওদের জন্য দোয়া কোরো।’

খাওয়ার একপর্যায়ে আয়ুশ চৌধুরী হঠাৎ বললেন,

“ আগামী শুক্রবার আমরা সবাই মিলে রাজিয়ার জন্য দোয়ার আয়োজন করব। আত্মীয়স্বজন আসবেন। আর ওর পছন্দের খাবারগুলোও রান্না করা হবে। গরিব মানুষদের মধ্যে খাবার বিতরণ করব। ও জীবিত থাকতে সবসময় অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে চাইত।’

আসাদ সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“ বড় ভাই, আমিও এই কাজে থাকব। আপার নামে একটা স্থায়ী দাতব্য তহবিল গড়ে তুলতে চাই। যাতে অসহায় রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।”

আকাশের চোখে একটুখানি আলো ফুটে উঠল।

“ চাচ্চু, এটা খুব ভালো উদ্যোগ। ফুঁপি যেহেতু চিকিৎসার অভাবে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, আমরা চাইলে তাঁর নামে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটা তহবিল করতে পারি।”

আয়ানও বলল,

“ আমিও থাকব। আম্মুর নামে যদি অসহায় মানুষদের উপকার হয়, তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।”

মেঘলা চোখের জল মুছে বলল,

“ আমিও সাহায্য করব। ফুঁপি সবসময় বলতেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে জীবনটা সার্থক হয়।”

আয়েশা মেঘলার হাত ধরে বললেন,

“তুই আমাদের সঙ্গে থাকবি মা। রাজিয়ার ভালো কাজগুলো আমরা সবাই মিলে এগিয়ে নিয়ে যাব।”

সেই রাতে খাবার টেবিলে রাজিয়া বেগম ছিলেন না, কিন্তু তাঁর স্মৃতিই যেন সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে রেখেছিল।

বাইরে রাতের আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে। মেঘের আড়াল থেকে চাঁদের আলো কখনো দেখা যাচ্ছে, কখনো হারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন মানুষের জীবন—কখনো আলো, কখনো অন্ধকার; তবু পথ চলা থেমে থাকে না।

রাত অনেক হয়েছে।

চৌধুরী ম্যানশনের একের পর এক ঘরের আলো নিভে গেছে। করিডোরে শুধু কয়েকটি মৃদু বাতি জ্বলছে। জানালার বাইরে রাতের বাতাসে গাছের পাতাগুলো মর্মর শব্দ করছে। দূরের রাস্তা থেকে মাঝেমধ্যে গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে।

আকাশ নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা পুরোনো পারিবারিক ফাইল। 

সে বারবার ফাইলটার  দিকে তাকাচ্ছে।

ফাইলটা কেমন মলাটে রঙের হয়ে গেছে। 

আকাশের চোখ সরু হয়ে এল।

আকাশ ড্রেসিং টেবিল থেকে  ফোন হাতে নিয়ে কিছু একটা দেখল।

আকাশ ফোনটা নামিয়ে গভীর শ্বাস নিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে মেঘলার কণ্ঠ শোনা গেল।

“ আকাশ?”

আকাশ ফিরে তাকাল।

মেঘলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হালকা গোলাপি রঙের রাতের পোশাক, চুলগুলো খোলা। চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও আগের তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক লাগছে।

আকাশ ফোনটা পকেটে রেখে বলল,

“ তুই এখনো ঘুমাসনি?”

মেঘলা এগিয়ে এসে বারান্দার রেলিংয়ে হাত রাখল।

“ ঘুম আসছে না। তুমি কী করছ?”

“ কিছু না। একটু কাজ করছিলাম।”

মেঘলা আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে কিছু একটা লুকাচ্ছে।

“ আকাশ, তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?”

আকাশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর মেঘলার হাত ধরে বলল,

“কিচ্ছু লুকাচ্ছি না পরী।”

মেঘলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

মেঘলা আকাশের বুকের কাছে এসে দাঁড়াল।

“ আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, আকাশ। কিন্তু আমার আর কোনো আপন মানুষকে হারানোর শক্তি নেই। ফুঁপিকে হারানোর পর থেকে মনে হয়, আমার পৃথিবীটা যেন হঠাৎ ছোট হয়ে গেছে।”

আকাশ ওর কাঁধে হাত রাখল।

“ তুই কাউকে হারানোর ভয় নিয়ে একা থাকবি না। আমি আছি, আয়ান আছে, আমাদের পরিবার আছে। আর একটা কথা মনে রাখিস, সত্য যতই কঠিন হোক, আমরা তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

আকাশ মুচকি হাসল।

আকাশ ওর কপালে আলতো করে চুমু দিল।

“এবার ঘুমাতে যা, ফুলটুসি। কাল সকালে তোর সঙ্গে একটা জায়গায় যাব।”

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।

“ কোথায়?”

“ সেটা কাল সকালেই বলব।”

“আকাশ! তুমি আবার রহস্য করছ  কেন?”

“সব কথা একসঙ্গে বলে দিলে গল্পের মজাটা থাকবে কী করে?”

“আকাশ।”

আকাশ থমকে তাকালো, 

“কী?”

“তোমর ওই আকাশী রঙা গাঢ়  সমুদ্দুর  “ চোখ দুটো” খুব সুন্দর।”

একথা শুনে আকাশ কেমন করে যেন তাকালো মেঘলার দিকে। 

মেঘলা হেসে ফেলল।

“তুমি একদম অসহ্য!”

“তবু তো আমার প্রশংসা করিস!”

মেঘলা লজ্জায় মুখ নামিয়ে বলল,

“বেশি কথা বলো না!”

বলেই মেঘলা এক ভোঁ দৌড় দিয়ে চলে গেল নিজের রুমে।

আকাশ হেসে উঠল।

মেঘলা নিজের ঘরে চলে যাওয়ার পরও আকাশ অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।

রাতের আকাশে তখন মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে রাতের ফুলের মিষ্টি গন্ধ। দূরের গাছের ডালে বসে থাকা পাখিরা নিশ্চুপ। চারপাশে এক গভীর শান্তি।

অপরূপ স্নিগ্ধ ও মায়াবী প্রকৃতির রূপ। 

শহরের অন্য প্রান্তে তখন রাত আরও গভীর হয়েছে। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাসে গাছের ডালপালা দুলছে, আর কিছুক্ষণ পরপর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা জানালার কাচে আছড়ে পড়ছে।

বাইরে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো। ঘরের জানালাটা কেঁপে উঠল। 

বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামতে শুরু করল।

প্রকৃতি যেন তার নিজের ভাষায় পরিবেশে  তার রূপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। 

চলবে…….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন