ফন্ট সাইজ:
থিম:
ওগো মেঘলা আকাশ একলা

পর্ব 19

লেখক: কবিতা রহমান মর্তুজা (পুতুল)

ওগো মেঘলা আকাশ একলা 

লেখিকা: পুতুল

কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫🚫

পর্ব: ১৯

ভোরের সোনালি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে এসে পড়েছে চৌধুরী ম্যানশনের দোতলার ঘরগুলোতে। বাগানের গোলাপগাছে ফুটে আছে কয়েকটি টকটকে লাল গোলাপ। বেলি ফুলের মিষ্টি সুবাসে চারপাশটা ভরে উঠেছে। দূরে পাখিরা নিজেদের মতো করে গান গাইছে।

রাজিয়া বেগম চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। তাঁর অনুপস্থিতি এখনো বাড়ির প্রতিটি কোণে অনুভব করা যায়। সকালে কেউ চায়ের কাপ হাতে তাঁকে খুঁজে বেড়ায়, কেউ খাবার টেবিলে বসে হঠাৎ তাঁর কথা মনে করে চুপ হয়ে যায়।

তবু জীবন তো থেমে থাকে না!

চৌধুরী পরিবারের মানুষগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। কেউ অফিসের কাজে ব্যস্ত হচ্ছে, কেউ হাসপাতালের দায়িত্ব সামলাচ্ছে, আবার কেউ বাড়ির ছোটখাটো কাজ নিয়ে মেতে থাকছে।

কিন্তু এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট মেয়েটির এখনো সকালে ঘুম থেকে ওঠার বিশেষ কোনো ইচ্ছা নেই!

বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মেঘলা। মাথার কাছে বালিশ, মুখের ওপর একটা ছোট্ট কুশন। অ্যালার্মের শব্দে ঘরের পরিবেশ বারবার কেঁপে উঠছে, অথচ মেয়েটার ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই।

ঠিক তখনই দরজায় কয়েকবার টোকা পড়ল।

“ ফুলঝুরি রাণী! সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে। মহারানির ঘুম কি আজ আর ভাঙবে না?”

কোনো উত্তর নেই।

আবার ডাক এল।

“ মেঘলা চৌধুরী! পাঁচ মিনিটের মধ্যে দরজা না খুললে কিন্তু তোর সকালের নাশতা আমি খেয়ে ফেলব!”

এবার বালিশের নিচ থেকে একটা বিরক্ত কণ্ঠ শোনা গেল।

“খেয়ে ফেলো! আমার কোনো সমস্যা নেই!”

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ  মুচকি হাসল।

“ বাহ্! এমনিতেই খাবার খেতে চাস না, এখন আবার নিজের নাশতা আমাকে দিয়ে দিচ্ছিস! খুব ভালো। এমন বুদ্ধিমতী রোগী আমি জীবনে দেখিনি।”

মেঘলা হঠাৎ উঠে বসে বলল,

“আকাশ! তুমি এখনো যাওনি?”

“ না, ফুলটুসি। তোর ঘুম ভাঙিয়ে তবেই যাব।”

“ কেন?”

“কারণ আমার সকালটা শুরু হয় আমার প্রিয় ঝগড়াটে মেয়েটার মুখ দেখে।”

কথাটা শুনে মেঘলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বালিশটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে এল।

দরজা খুলতেই আকাশকে দেখে সে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।

“ তোমার কি আর কোনো কাজ নেই, ডাক্তার সাহেব?”

আকাশ গম্ভীর মুখে বলল,

“আছে তো! হাসপাতালে যেতে হবে, রোগী দেখতে হবে, রিপোর্ট দেখতে হবে। কিন্তু তার আগে একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে।”

“কী দায়িত্ব?”

“ একজন অলস মেয়েকে বিছানা থেকে নামানো!”

মেঘলা বালিশটা আকাশের দিকে ছুড়ে দিল।

আকাশ হাসতে হাসতে বালিশটা ধরে ফেলল।

“এই যে! রোগীর মধ্যে যথেষ্ট শক্তি আছে। তাহলে আর কোনো অসুবিধা নেই। এবার তৈরি হয়ে নিচে আয়।”

“ আমি যাব না!”

“ঠিক আছে। তাহলে আয়ান  বলি, তোর জন্য একটা সুন্দর পাত্র খুঁজে দিতে!”

মেঘলার চোখ কপালে উঠে গেল।

“ কী বললে? দাঁড়াও, তোমাকে আজ আমি দেখাচ্ছি!”

আকাশ হেসে দৌড়ে করিডোরের দিকে চলে গেল।

পেছন থেকে মেঘলার চিৎকার ভেসে এল,

“ আকাশ চৌধুরী! দাঁড়াও! তোমাকে আজ আমি একদম ছাড়ব না!”

বহুদিন পর করিডোরে মেঘলার এমন চিৎকার শুনে আয়েশা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে তাকালেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

মনে মনে বললেন, ‘রাজিয়া, দেখো তো, তোমার মেঘপাখিটা আবার একটু আগের মতো হচ্ছে।’

সকাল সাড়ে আটটা।

ডাইনিংরুমে সবাই নাশতা করতে বসেছে। আয়ুশ চৌধুরী চায়ের কাপ হাতে খবর পড়ছেন। আয়েশা চৌধুরী টেবিলে পরোটা, ডিম, সবজি আর ফল সাজিয়ে দিচ্ছেন। আসাদ চৌধুরী তাঁর পাশে বসে দিনের কাজের পরিকল্পনা করছেন।

আয়ান  নিজের ফোনে হাসপাতালের একটি বার্তা দেখছিল। আর নীলয়  এসেছে সকাল সকাল, কারণ তার ভাষায়, এই বাড়ির সকালের নাশতা নাকি শহরের সেরা!

আকাশ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে চেয়ারে বসতেই আয়ান তাকাল।

“ কী ব্যাপার, তোমার মুখে এত হাসি কেন?”

আকাশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ কিছু না।”

নীলয় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

“ বুঝেছি! আবার মেঘলাকে জ্বালিয়েছিস!”

আকাশ কফির  কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

“ বন্ধু, তোর পর্যবেক্ষণশক্তি দিন দিন উন্নত হচ্ছে। এবার একটা গোয়েন্দা সংস্থা খুলে ফেল।”

নীলয় গর্বিত ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে বলল,

“ সেটা খুললে তোদের দুজনকে প্রথমেই নিয়োগ দেব। একজন সারাদিন ঝগড়া করবে, আরেকজন সেই ঝগড়ার পরিমাণ লিখে রাখবে!”

আয়ান হেসে টেবিলে হাত চাপড়াল।

“একদম ঠিক! আর মেঘলাকে রাখা হবে প্রধান অভিযোগকারী হিসেবে!”

ঠিক তখনই মেঘলা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল।

“ তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ, তাই না?”

নীলয় মুখ গম্ভীর করে বলল,

“একদম না, ম্যাডাম। আমরা তো আপনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সভা করছিলাম।”

“ কী সভা?”

“আপনাকে কীভাবে সকালবেলা সময়মতো ঘুম থেকে তোলা যায়, সেই বিষয়ে গবেষণা।”

মেঘলা চোখ বড় বড় করে বলল,

“ নীলয় ভাইয়া, আপনিও?”

আয়ান হেসে বলল,

“ বোন, তুই বসে খাওয়া শুরু  কর। ওদের কথা শুনলে তোর সকালের ব্রেকফাস্ট দুপুরে গিয়ে শেষ হবে।”

মেঘলা গিয়ে আয়েশা চৌধুরীর পাশে বসল।

আয়েশা চৌধুরী  তার প্লেটে পরোটা তুলে দিতে দিতে বললেন,

“ মা, আজ কিন্তু ভালো করে খেতে হবে। কয়েক দিন ধরে তোকে ঠিকমতো খেতে দেখছি না।”

মেঘলা মৃদু হেসে বলল,

“ আচ্ছা, আম্মু। আজ সব খাব।”

আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

“ কথাটা লিখিতভাবে নিয়ে রাখা উচিত। পরে আবার অস্বীকার করতে পারে!”

মেঘলা পায়ের নিচ দিয়ে আকাশের পায়ে আলতো করে ঠোকা দিল।

“ অসভ্য ডাক্তার!”

আকাশ ভান করে ব্যথা পাওয়ার অভিনয় করল।

“ আব্বু! দেখো, তোমার বাড়ির ছোট মেয়েটা একজন সম্মানিত ডাক্তারকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে!”

আয়ুশ চৌধুরী  খবরের কাগজ নামিয়ে হেসে ফেললেন।

“তাহলে তুই ওকে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দে। ওষুধের নাম হবে—সকালে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা!”

সবাই হেসে উঠল।

মেঘলাও হাসল। হাসতে হাসতে তার চোখের কোণে জল জমে উঠেছিল। রাজিয়া বেগম থাকলে এমন মুহূর্তে নিশ্চয়ই সবার চেয়ে বেশি হাসতেন।

আয়েশা চৌধুরী  সেটা বুঝতে পেরে মেয়েটার হাতের ওপর হাত রাখলেন।

“ মন খারাপ করিস না, মা। ফুঁপির কথা মনে পড়লে কাঁদবি, আবার তাঁর সুন্দর স্মৃতিগুলো মনে করে হাসবিও। দুটোই স্বাভাবিক।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“ আমি জানি, আম্মু। ফুঁপিকে খুব মনে পড়ে। কিন্তু আমি চেষ্টা করব আর সবার সঙ্গে ভালো থাকতে।”

আয়েশা মেয়েটাকে কাছে টেনে কপালে চুমু দিলেন।

আকাশ দূর থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার মনে হলো, মেঘলা আবার ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো উচ্ছলতাকে ফিরে পাচ্ছে।

আর সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

ব্রেকফাস্ট  শেষ করে মেঘলা বাগানে চলে এল। হাতে তার সেই নীল ডায়েরি।বাগানের এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে সে ডায়েরির পাতা উল্টাচ্ছিল। কিছু পাতায় ছোট ছোট গল্প লেখা, কোথাও কবিতার কয়েকটি লাইন, আবার কোথাও নিজের মনের কথা।

আকাশ হাসপাতালের উদ্দেশে বের হওয়ার আগে বাগানের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। মেঘলাকে বসে থাকতে দেখে সে কাছে এল।

“ কী লিখছিস, লেখিকা মহোদয়া?”

মেঘলা ডায়েরিটা বুকের কাছে ধরে বলল,

“ গোপন কথা।”

“ওহ্! আমার কাছ থেকেও গোপন?”

“ হ্যাঁ।”

আকাশ পাশে বসে পড়ল।

“ ঠিক আছে। তাহলে আমিও একটা গোপন কথা বলি।”

মেঘলা কৌতূহলী হয়ে তাকাল।

‘ কী কথা?’

আকাশ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

“ আমার মনে হয়, এই ডায়েরির মধ্যে আমার নামে অনেক অভিযোগ লেখা আছে।”

মেঘলা ফিক করে  হাসল ।কী অপূর্ব সুন্দর সেই হাসির সুর। 

“ সেটা তো আছেই!”

“ কী! এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা!”

“ তুমি আমাকে সারাদিন জ্বালাও, আর আমি তোমার নামে অভিযোগ লিখব না?”

আকাশ মাথা নাড়ল।

“ বুঝেছি। আমার বিরুদ্ধে একটা পূর্ণাঙ্গ বই লেখা হচ্ছে। নাম হবে—‘একজন নিরীহ ডাক্তারের করুণ জীবন’।

মেঘলা হেসে কুটিকুটি।

“ নিরীহ তুমি? তুমি তো পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্টু ডাক্তার!”

আকাশ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“ আচ্ছা, তুই যখন এত বড় লেখিকা, তখন একটা অনুরোধ করতে পারি?”

“ কী?’

“ আমার জন্য একটা কবিতা লিখবি?”

মেঘলা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তোমার জন্য?”

“ হ্যাঁ।”

“কেন?”

আকাশ একটু কাছে ঝুঁকে বলল,

“কারণ তোর লেখা পড়তে আমার ভালো লাগে। আর তোর মনের কথাগুলো তোর নিজের ভাষায় জানতে ইচ্ছা করে।”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ডায়েরি খুলে নতুন পাতায় লিখতে শুরু করল।

আকাশ উঁকি দিতে চাইতেই সে ডায়েরি বন্ধ করে দিল।” এখন দেখা যাবে না!”

“আচ্ছা বাবা, দেখব না। কিন্তু একটা কথা বল তো, কবিতাটার নায়ক কে?”

মেঘলা মুচকি হেসে বলল,

“ সেটা জানতে হলে কবিতাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”

আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

‘ ঠিক আছে। তবে মনে রাখিস, নায়ক যদি অন্য কেউ হয়, তাহলে কিন্তু আমি প্রতিবাদ করব!”

মেঘলা হাসতে হাসতে বলল,

‘তোমার প্রতিবাদ গ্রহণ করা হলো না!”

আকাশ গ্যারেজের  দিকে হাঁটতে শুরু করল।আজকে বাইক নিয়ে যাবে হসপিটালে।  কয়েক পা যাওয়ার পর আবার ফিরে তাকাল।

“ ফুলটুসি!”

“কী?”

“ দুপুরে ঠিকমতো খাবি। আর বিকেলে তোর সঙ্গে বাইরে যাব।”

মেঘলার চোখ চকচক করে উঠল।

“সত্যি? কোথায়?”

“ সেটা এখন বলব না।”

“ আকাশ!”

“হ্যাঁ, ফুলঝুরি রাণী?”

“তোমাকে আমি একদিন না একদিন ঠিক শিক্ষা দেব!”

আকাশ হেসে গাড়িতে উঠে বাইকের চাবি স্টার্ট করে চলে গেল।মেঘলা তার যাওয়ার পানে এক মনে তাকিয়ে আছে। তারপর মেঘলা আবার ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করল।

তার ঠোঁটের কোণে তখন ছোট্ট একটা হাসি।

________________________

বেলা বাজে এখন ১২ টা। 

চৌধুরী ম্যানশনের ড্রয়িংরুমে আয়ুশ চৌধুরী , আয়েশা চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী , আকাশ ও আয়ান বসে আছে। টেবিলের ওপর কিছু কাগজপত্র ছড়িয়ে রাখা।

আসাদ চৌধুরী একটা কাগজ হাতে নিয়ে বললেন,

“ বড় ভাই, রাজিয়া আপার নামে অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে তহবিল গড়ার কথা বলেছিলাম, তার প্রাথমিক পরিকল্পনাটা তৈরি করেছি।”

আয়ুশ চৌধুরী  মনোযোগ দিয়ে কাগজগুলো দেখতে লাগলেন।

খুব ভালো উদ্যোগ। তবে কাজটা যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। সত্যিকারের প্রয়োজন আছে, এমন মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

আকাশ বলল,

“ আমি হাসপাতালের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা সাহায্য করতে আগ্রহী। আমরা চাইলে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট কিছু রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারি।”

আয়ানও বলল,

“শুধু চিকিৎসার খরচ নয়, ওষুধ আর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা যায়। অনেক সময় মানুষ শুধু টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারে না।”

আয়েশা চৌধুরী নিচু কন্ঠে মৃদু হেসে বললেন,

“ রাজিয়া এসব শুনলে কত খুশি হতো! মানুষের উপকার করার কথা উঠলেই ওর চোখেমুখে আলাদা একটা আনন্দ ফুটে উঠত।”

আসাদ চৌধুরী  আবেগভরা কণ্ঠে বললেন,

“আপা সবসময় বলতেন, মানুষের জীবনে এমন কিছু করে যেতে হয়, যাতে নিজের অনুপস্থিতিতেও মানুষ ভালোবাসার কথা মনে রাখে।”

আয়ুশ চৌধুরী  ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালেন।

“ তাহলে এটাই হোক আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে রাজিয়ার প্রতি ভালোবাসার উপহার।”

কিছুক্ষণ সবাই নীরব রইল।

তারপর আয়ান পরিবেশটা হালকা করতে বলল,

“তবে একটা কথা আছে।”

আকাশ তাকাল।

“কী কথা?’

“ এই তহবিলের কাজের পাশাপাশি আমাদের বাড়ির ছোট মেয়েটার পড়াশোনার দিকেও নজর দিতে হবে। নইলে সে সারাদিন ডায়েরি লিখবে, আর পরীক্ষার সময় আমাদের সবাইকে উদ্ধার করতে হবে!”

আয়েশা চৌধুরী  হেসে ফেললেন।

“ মেঘলা পড়াশোনা করে, আয়ান। তোমরা  অকারণে ওকে নিয়ে চিন্তা করো না আব্বু ।”

আকাশ মুচকি হেসে বলল,

“ চিন্তা করতে দাও, আম্মু। ওর পড়াশোনার দায়িত্ব আমি নিলাম।”

আয়ান চোখ সরু করে বলল,

“তুমি ? তুমি তো ওকে পড়াতে বসলে দশ মিনিট পরেই দুজনের ঝগড়া শুরু হবে!”

আকাশ নির্বিকার মুখে বলল,

“ঝগড়া হলেও পড়াশোনা হবে।”

আসাদ চৌধুরী  হেসে বললেন,

“তাহলে তোদের দুজনের পড়াশোনার ক্লাসের জন্য আলাদা বাজেট রাখতে হবে!”

ঘরে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।

এভাবেই রাজিয়া বেগমের স্মৃতিকে ভালো কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিল চৌধুরী পরিবার। তাঁর চলে যাওয়ার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু তাঁর ভালোবাসার শিক্ষা অন্য মানুষের জীবনে আলো হয়ে থাকতে পারে।

ধরণীর বুক জুড়ে তখন বিকেলের নরম রোদ চিকচিক করছে। 

মেঘলা তৈরি হয়ে নিচে নামল। পরনে হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ, মাথায় সাদা ওড়না। খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে।

গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ ফোনে কথা বলছিল। মেঘলাকে দেখে সে ফোনটা রেখে দিল।

“ বাহ্! আজ তো আমাদের ফুলঝুরি রাণীকে বেশ সুন্দর লাগছে!”

মেঘলা লজ্জা লুকিয়ে বলল,

“ তুমি সবসময় এমন কথা বলো কেন?”

“কারণ সত্যি কথা বলতে আমার কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।”

“হয়েছে। এখন বলো, কোথায় নিয়ে যাবে?”

আকাশ গাড়ির দরজা খুলে দিল।

“আগে গাড়িতে ওঠ, তারপর বলছি।”

মেঘলা গাড়িতে উঠে বসতেই আকাশ গাড়ি চালাতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর মেঘলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল,

“ আকাশ, আমরা কি কাশফুলের মাঠে যাচ্ছি?”

আকাশ অবাক হয়ে তাকাল।

“তুই বুঝলি কীভাবে?”

মেঘলা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,

“আমি মেঘলা চৌধুরী। আমার বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করবেন না মিস্টার চৌধুরী !”

“ ঠিক আছে, ম্যাডাম। আপনার বুদ্ধির কাছে আমি পরাজয় স্বীকার করলাম।”

কাশফুলের মাঠে পৌঁছানোর পর মেঘলা গাড়ি থেকে নেমেই আনন্দে হাততালি দিল।

মাঠজুড়ে সাদা কাশফুল বাতাসে দুলছে। পাশের ছোট দোকানগুলোতে ঝালমুড়ি, ফুচকা, আচার, আইসক্রিম আর হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হচ্ছে। কয়েকটি পরিবার শিশুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছে। কোথাও কেউ ছবি তুলছে, কোথাও বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে।

মেঘলার মুখে সেই পরিচিত উচ্ছ্বাস ফিরে এল।

“আকাশ! দেখো, কাশফুলগুলো কত সুন্দর!”

আকাশ ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“কাশফুল দেখতে এসেছিস, নাকি আমাকে দিয়ে সব খাবার কিনিয়ে নিতে?এই ফুলগুলো দেখতে দেখতে রুচি আর সায় দিচ্ছে না! প্রতি বছরই তোকে চার - পাঁচ বার আনতে হয় এই সাদা কাওয়া মার্কা মাঠে!  ”

মেঘলা মিষ্টি হেসে বলল,

“দুটোই! আর এটা কাওয়া মার্কা মাঠ না, বলো নীল আকাশের নিচে সাদা এক টুকরো মেঘের রাজ্য! ”

“আমি আগেই বুঝেছিলাম!”

প্রথমে তারা ঝালমুড়ি কিনল। তারপর মেঘলার আবদারে হাওয়াই মিঠাই। এরপর আবার আচার।

আকাশ অবশেষে বলল,

“ ফুলটুসি, তুই কি একটা খাবারের দোকান খুলতে চাস? তাহলে সবকিছু এক জায়গায় পাওয়া যাবে!”

মেঘলা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ তোমার টাকা খরচ হচ্ছে বলে এত কষ্ট হচ্ছে?”

“ না, আমার কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে আমার হাসপাতালের রোগীরা অপেক্ষা করছে, আর আমি এখানে হাওয়াই মিঠাই পাহারা দিচ্ছি!”

মেঘলা হেসে তার হাত থেকে হাওয়াই মিঠাইটা নিয়ে নিল।

“ তুমি যেতে পারো, আমি একাই ঘুরব!”

আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“ না, সেটা হবে না। তোকে একা রেখে গেলে আবার বলবি, ডাক্তার সাহেব আমাকে সময় দেন না!”

মেঘলা এবার সত্যিই হেসে উঠল।

দুজন কাশফুলের মাঝের পথ ধরে হাঁটতে লাগল। আকাশ মাঝেমধ্যে মেঘলার ছবি তুলছিল। কখনো সে ফুল হাতে দাঁড়াচ্ছে, কখনো হাসিমুখে দূরের দিকে তাকাচ্ছে।

একসময় মেঘলা বলল,

“ আকাশ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“ কর।”

“ফুঁপি কি আমাদের এভাবে হাসতে দেখলে খুশি হতেন?”

আকাশের মুখটা কোমল হয়ে উঠল।

“ খুব খুশি হতেন। উনি সবসময় চাইতেন, আমরা সবাই ভালো থাকি। তুই মন খুলে হাসলে ফুঁপির স্মৃতিও আমাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবে।”

মেঘলা একটু চুপ করে থেকে বলল,

“ আমি ফুঁপিকে কখনো ভুলব না।”

“আমরাও ভুলব না, ফুলটুসি। কাউকে ভালোবাসলে তাকে ভুলে যেতে হয় না। তার স্মৃতি সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হয়।”

মেঘলা আকাশের হাতটা ধরে ফেলল।

“তোমরা সবাই  আমার পাশে থাকবে তো?”

আকাশ মৃদু হেসে বলল,

“ এই প্রশ্নটা তুই আর কতবার করবি?”

“ যতবার ইচ্ছা!”

“ তাহলে উত্তরটাও বারবার শুনে রাখ। আমরা তোর পাশে থাকার চেষ্টা করব, তোর কথা শুনব, তোর ভুল হলে বুঝিয়ে দেব। আর তুইও আমাকে আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দিবি।”

মেঘলা বলল,

“ তোমার ভুল ধরতে গেলে তো একটা খাতা লাগবে!”

আকাশ চোখ সরু  করে তাকাল।

“ এই মেয়ে! আমার সম্মানটা একটু বাঁচিয়ে রাখ!”

দুজনের হাসি কাশফুলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ল।

সন্ধ্যার আলো নামার আগে তারা বাড়ির পথে রওনা হলো। মেঘলার হাতে কয়েকটি সাদা কাশফুল। আর আকাশের ফোনে জমা হলো মেঘলার হাসিমুখের অসংখ্য ছবি।

***********

চৌধুরী ম্যানশনের খাবার টেবিলে আজ বেশ জমজমাট পরিবেশ। আয়েশা চৌধুরী মেঘলার পছন্দের খাবার রান্না করিয়েছেন। টেবিলে মাছের ঝোল, মুরগির রোস্ট, সবজি, ডাল আর গরম ভাত সাজানো।

নীলয়ও এসেছে। তার দাবি, বিকেলে আকাশ-মেঘলা কাশফুলের মাঠে ঘুরতে গিয়ে নিশ্চয়ই ভালো কিছু খেয়েছে, তাই তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত গল্প শোনা তার নৈতিক দায়িত্ব!

নীলয় চেয়ারে বসে বলল,

“তা মেঘলা পরী, আজকের ভ্রমণের প্রতিবেদন কোথায়?”

মেঘলা ভাত মাখতে মাখতে বলল,

“কোনো প্রতিবেদন নেই।”

“ কেন? ছবি তুলেছিস তো?”

আকাশ ফোন বের করে বলল,

“ছবি আছে। তবে দেখানোর আগে একটা শর্ত।”

নীলয় উৎসাহ নিয়ে বলল,

“কী শর্ত?’

“আমার বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।”

আয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

‘ তাহলে তো ছবি দেখাই হবে না! নীলয়ের মুখ বন্ধ রাখা অসম্ভব।”

সবাই হেসে উঠল।

আকাশ কয়েকটি ছবি দেখাল। একটি ছবিতে মেঘলা কাশফুল হাতে হাসছে। আরেকটি ছবিতে সে হাওয়াই মিঠাই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নীলয় ছবি দেখে বলল,

“বাহ্! মেঘলা তো বেশ ভালো মডেল হয়ে গেছে!”

মেঘলা গর্বিত মুখে বলল,

“অবশ্যই! আমি তো জন্মগতভাবে প্রতিভাবান।”

আকাশ মৃদু হেসে বলল,

“ সেটা ঠিক। শুধু সকালে ঘুম থেকে ওঠার প্রতিভাটা একটু কম।”

আবার হাসির রোল উঠল।

খাবার শেষে আয়ুশ চৌধুরী সবাইকে বললেন,

“ আগামী সপ্তাহ থেকে রাজিয়ার নামে চিকিৎসা সহায়তা তহবিলের কাজ শুরু হবে। আমরা চাই, তাঁর স্মরণে করা এই উদ্যোগটা নিয়মিত চলুক।”

আসাদ চৌধুরী  মাথা নেড়ে বললেন,

“ আমি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করছি।”

আকাশ আর আয়ান চিকিৎসার দিকটা দেখবে।

মেঘলা উৎসাহ নিয়ে বলল,

“ আর আমি কী করব?”

আয়েশা চৌধুরী  মৃদু হেসে বললেন,

“তুই পড়াশোনা করবি, আর সময় পেলে সাহায্য করবি।”

মেঘলা মুখ ভার করে বলল,

“ সবাই আমাকে শুধু পড়াশোনা করতে বলে!”

আকাশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“ কারণ তুই পড়াশোনা না করলে ভবিষ্যতে আমাদের বাড়ির সব দায়িত্ব কে নেবে?”

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ তুমি তো ডাক্তার। তোমার দায়িত্ব তুমি সামলাও!”

আয়ান হেসে বলল,

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। কাল থেকে তোমাদের দুজনকে আলাদা আলাদা পড়ার টেবিলে বসানো হবে।”

নীলয় যোগ করল,

“ আর আমি মাঝখানে বসে পাহারা দেব!”

মেঘলা হাত তুলে বলল,

“ না! তোমাদের কাউকেই আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে হবে না। আমি নিজেই পারব।”

আয়েশা চৌধুরী  মেঘলার গাল টিপে বললেন,

“ আমার সাহসী মেয়ে!’

সেই রাতে খাবার টেবিলে রাজিয়া বেগমের কথা একাধিকবার উঠল। তাঁর প্রিয় খাবার, তাঁর হাসি, তাঁর বকাঝকা , সবকিছু নিয়েই কথা হলো। কখনো কারও চোখ ভিজে উঠল, আবার কখনো পুরোনো কোনো মজার স্মৃতি মনে করে সবাই হেসে উঠল।

শোক তাদের জীবন থেকে চলে যায়নি। কিন্তু তারা বুঝতে শিখছিল, প্রিয় মানুষকে হারানোর পরও একে অপরের সঙ্গে হাসা অপরাধ নয়।

বরং ভালোবাসার মানুষটির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটা উপায়।

রাত সাড়ে দশটা।

মেঘলা নিজের ঘরে এসে বই নিয়ে বসল । জানালার বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে। দূরে বাগানের বাতিগুলো জ্বলছে। ঘরের ভেতর শান্ত পরিবেশ।

ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ  এল।

আকাশের মেসেজ! 

‘ফুলটুসি, ঘুমিয়ে পড়েছিস?’

মেঘলা লিখল,

‘না। পড়তে বসেছি ।’

কিছুক্ষণ পর আকাশের উত্তর এল,

“ভালো! মন দিয়ে পড়াশোনা কর। ডাক্তার হতে হবে তো নাকি!”

ঘেমলাও লিখল, 

বাড়িতে যদি সবাই ডাক্তার হয়ে বসে থাকে, তাহলে আমাদের বাড়ির নাম চৌধুরী ম্যানশন না দিয়ে ডাক্তার বাড়ি নাম দেওয়া উচিত।”

‘তা অবশ্য ঠিক। তাহলে আমাদের বাড়ির নাম ডাক্তার বাড়িই হবে!”

“আচ্ছা ঠিক আছে পরে কথা হবে।”

মেসেজ টা লিখে মেঘলা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল 

তারপর মেঘলা বই টা যত্ন করে বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল।

জানালার বাইরে রাতের আকাশে চাঁদ জ্বলছে। মেঘের আড়াল থেকে তার আলো মাঝে মাঝে ম্লান হয়ে আসছে, আবার উজ্জ্বল হচ্ছে।

মেঘলা জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

‘ফুঁপি, তুমি যেখানেই থাকো, আমাদের জন্য দোয়া কোরো। আমরা সবাই ভালো থাকার চেষ্টা করছি।’

তারপর সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

অন্যদিকে আকাশও নিজের ঘরে বসে দিনের ছবিগুলো দেখছিল। মেঘলার হাসিমুখের একটি ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হাসল।

“ এভাবেই হাসতে থাকিস, ফুলটুসি। তোর হাসিটা যেন কখনো হারিয়ে না যায়।”

চলবে... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 19 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন