ফন্ট সাইজ:
থিম:
তব_ফিরি_নব_ফাল্লুনে

পর্ব 1

লেখক: মিথিলা_জামান_নিভা

#তব_ফিরি_নব_ফাল্গুনে
#মিথিলা_জামান_নিভা
পর্ব: ১
রেডিওর ভলিউমটা আরেকটু বাড়িয়ে হাঁটুর উপর মাথা ঠেকায় লাবণ্য। রোজ সকালে বাংলাদেশ বেতারের 'প্রভাতের আমন্ত্রণ' অনুষ্ঠানটা তার প্রাতঃরাশের মতো। না শুনতে পারলে দিনটাই যেনো মাটি হয়ে যায়।
এখন গান বাজছে 'একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি। তাই নিয়ে মনে মনে, রচি মম ফাল্গুনী।'
লাবণ্য চোখ বন্ধ করে মাথা মৃদু দোলায়, গুণগুণ করে সুরও মেলায় গানের সাথে। এই সময়টায় সে অন্য জগতে হারিয়ে যায় যেনো।
"ফুপু, এই ফুপু।"
লাবণ্য চোখ খুলে তাকায়। দরজায় তার বড় ভাইয়ের বড় মেয়ে আনা দাঁড়িয়ে। পুরো নাম আনজারা। বাড়ি সহ এলাকাতে আনা বলেই ডাকা হয়।
লাবণ্য হালকা হাসে তার দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা চোখের পলকে বড় হয়ে যাচ্ছে। এইতো সেদিন এতোটুকু ছিলো। সারাদিন লাবণ্যের পিছে ছুটে বেড়াতো। সেই ছোট্ট আনার আজ কলেজে প্রথম দিন। মাধ্যমিকের পর পরই মেয়েগুলো কেমন হুট করে বড় হয়ে যায়। আর সুন্দরও হয়ে যায়।
"আয়।"
লাবণ্য রেডিওর ভলিউম আবার একটু কমিয়ে দেয়। আনা এক রকম উড়তে উড়তে ফুপুর কাছে এসে বসে। এই মেয়েটা এতো ছটফটে। সবসময় উড়ছে যেনো। বাড়ির বড় মেয়েরা সাধারণত শান্ত হয়, আনা উলটো। অবশ্য হবে না-ই বা কেনো? সে যে তার ফুপুর দীক্ষা পেয়েই বড় হয়েছে। লাবণ্য কি দস্যিপনাই না করেছে এক কালে।
"চুল বেঁধে দাও ফুপু। মা সেই এক রকম আদ্যিকালের মতো দুই বেনী করে দিচ্ছে। বলো তো তুমি, আমি কি এখনো স্কুলে পড়ি? বড় হয়েছি না আমি?"
লাবণ্য মুচকি হেসে বললো,"বাবাহ! কলেজে উঠতে না উঠতেই এই ভাবসাব? খুব বড় হয়েছিস বল?"
"তো হইনি? আনা এখন অনেক বড় হয়েছে। তুমি এখন কথা কম বলে আমার চুল বেঁধে দাও। ওইযে তুমি কলেজে থাকতে সবচেয়ে বেশি যেটা করতে ওরকম।"
লাবণ্য আনার হাত থেকে চিরুনি নিয়ে তাকে ঘুরিয়ে বসায়। আনা চুপ করে থাকে। আপাতত সে নিশ্চিন্ত। তার ফুপু এক সময়ে কলেজের সেরা সুন্দরী ছিলো, ডাকসাইটে সুন্দরী যাকে বলে। হালফ্যাশনের মডেল বলা যায়। সে ওই সময় জিন্স প্যান্টের সাথে কুর্তা পরতো, স্কার্ফ ঝুলিয়ে রাখতো গলায়। কলেজ পর্যন্ত চুল রাখতো কাঁধ অবধি। নিত্যনতুন স্টাইল থাকতো চুলে। এলাকায় যখন সে বের হতো ওভাবে সেজে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো। আনা সহ ওই বয়সের যারা যারা ছিলো, সবাই বলতো বড় হয়ে তারা লাবণ্যের মতো স্টাইল করবে।
"ফুপু।"
চুল বাঁধতে বাঁধতেই লাবণ্য অস্ফুটে সাড়া দেয়,"হু।"
"তোমার কলেজ জীবন কেমন ছিলো ফুপু? কেমন উপভোগ করতে?'
"আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়েছি কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা। বন্য পাখির মতো উড়েছি, প্রজাপতির মতো রঙিন ডানা মেলেছি আর বাধাহীন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটেছি। আমি আমৃত্যু ওই স্মৃতি মনে রাখবো।"
ততক্ষণে চুল বাঁধা শেষ। আনা দৌড়ে যায় আয়নার সামনে। মুগ্ধ হয়ে নিজেকে দেখে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। ইশ! আজ তো কলেজে তাকেই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগবে।
"কি রে পছন্দ হলো?"
"খুব।" এই বলে আনা লাবণ্যকে জড়িয়ে তার গালে একটা চুমু খায়।
"নে এবার দ্রুত ভাগ। দেরি হয়ে যাচ্ছে না কলেজের?"
"তুমি কখন যাবে?"
"আজ সকালে আমার ক্লাস নেই, বারোটার দিকে বেরোবো।"
আনা ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে। লাবণ্য ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে।
"কি রে আবার কি বলবি? টাকা লাগবে? ব্যাগে আছে, যতো লাগে নিয়ে যা।"
আনা না-সূচক মাথা নাড়ে।
"তাহলে?"
"একটা প্রশ্ন করতাম।"
"কি?"
"শুনেছি তুমি কলেজে চিরকুমারী সংঘের সদস্য ছিলে। শপথ নিয়েছিলে কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে মন দেওয়া নেওয়া করবে না। হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে কি হলো তোমার? প্রেমে পড়লে কীভাবে?"
লাবণ্য এতোক্ষণ চিরুনি থেকে অন্যমনস্ক হয়ে চুল ছাড়াচ্ছিলো। আনার শেষ কথায় ঈষৎ কেঁপে ওঠে সে। বেশ অবাক হয়ে আনার দিকে তাকায় লাবণ্য। এ বিষয় নিয়ে বাড়িতে কেউ কথা বলেনা, বলা নিষিদ্ধ। অথচ আনা এমনভাবে বলে দিলো যেনো কতোই না স্বাভাবিক একটা কথা।
"নিজের চুলগুলো হঠাৎ বড়ও কর‍তে শুরু করলে তার জন্য, কারণ তার পছন্দ লম্বা চুল। শাড়িও পরতে মাঝেসাঝে। কীভাবে এতো পরিবর্তন হলো তোমার? হু?"
লাবণ্য বার কয়েক দ্রুত শ্বাস ফেলে বললো,"তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে আনা। এক্ষুনি যা।"
"ফুপু....."
লাবণ্য শান্ত চোখে আনার দিকে তাকাতেই আনা থেমে যায়। সে মজা করেই কথাটা বলেছিলো। লাবণ্য হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে যাবে সে বুঝতে পারেনি। আনা আর সাহস করেনা কিছু বলতে। ওভাবেই মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।
লাবণ্য রেডিও বন্ধ করে দেয়। বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে যায় সে মুহুর্তেই। একই সাথে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে যন্ত্রণার স্মৃতি সে মনে করতে চায়না। নিজেকে খুব শক্ত প্রমাণ কর‍তে চায় সে। কিন্তু প্রায় নয়/দশ বছর আগের সেই পুরোনো স্মৃতি মস্তিষ্কে ভর করলে সে এখনো একইভাবেই ভেঙে পড়ে ভিতর ভিতর। দুমড়েমুচড়ে যায় নিজের অজান্তেই।
-----
শরীরের উপর এক বালতি পানি পড়তেই ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে শাওন। চুল থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ছে তার টপটপ করে, পুরো শরীর ভেজা। সে তাড়াতাড়ি ছাদের দিকে তাকায়। ছাদ ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়লো নাকি গায়ে? বৃষ্টির পানি তো ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে। এভাবে পড়ে নাকি?
নাহ ছাদ তো ঠিক আছে। পানি এলো কোথা থেকে এতো?
"ছাদ ঠিকই আছে, ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। পানি আমি মেরেছি।"
শাওন হতভম্ব হয়ে তার বাঁ পাশে তাকায়। বালতি হাতে ফারদিন দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা খুবই স্বাভাবিক। মনেই হচ্ছে না সে কিছু করেছে। এই সাত সকালে তার গোসল হয়ে গেছে। হালকা ভেজা চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। পরনে সবুজ গেঞ্জি আর আর্মি প্যান্ট। পেটানো শরীর দেখে কে বলবে এই লোকের বয়স এখন তেত্রিশ চলে?
"চাচ্চু তুমি পানি দিয়েছো আমার গায়ে? কেনো?"
শাওন ঘোর থেকে বেরোতে পারেনা, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ফারদিনের দিকে।
"কয়টা বাজে?"
শাওন হাই তুলতে তুলতে বললো,"কয়টা বাজে এটা জানার জন্য তুমি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছো? অবসরপ্রাপ্ত মেজর ফারদিন নেওয়াজ কি ঘড়ি দেখতেও ভুলে গেলো? ওইতো ঘড়ি....."
এই বলে সামনের দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাতেই এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করে ওঠে।
"সাড়ে আটটা বেজে গেছে? নয়টায় রহমত স্যারের ক্লাস। দেরি হলে রোদের মধ্যে পশ্চাৎদেশ উন্মুক্ত করে দাঁড়িয়ে দিবে গত ক্লাসে বলেছিলো। আর তুমি আমাকে এখন ডাকলে?"
ফারদিন বালতিটা শাওনের দিকে ছুঁড়ে দেয়। শাওন সাথে সাথে লুফে নেয় ওটা বিরস মুখে।
শাওনের রিডিং টেবিলের চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে ফারদিন। সরু চোখে তাকায় শাওনের দিকে।
"ক্লাসে দেরি করে গেলে রহমত স্যার তোর পশ্চাৎদেশ উন্মুক্ত করে রোদে দাঁড়িয়ে রাখবে কিনা জানিনা। তবে কাল থেকে একবার ডাকার সাথে সাথে ঘুম থেকে না উঠলে আমি তোর পশ্চাৎদেশ সোজা সূর্যের কাছে পাঠিয়ে দিবো। ওহে কুম্ভকর্ণের নাতি, ভাবী তোকে কতোবার ডেকে গেছে জানিস? মরার মতো ঘুমাচ্ছিলি হারামজাদা। আবার বলিস কেনো ডাকিনি।"
শাওন মাথার পানি ঝাড়তে ঝাড়তে অসহায় মুখে তাকায় ফারদিনের দিকে। ফারদিন নির্বিকার বসে থাকে। শাওন আর দাঁড়ায় না। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই আজকে রোদে দাঁড়াতে হবে। তবে সেইটা পশ্চাৎদেশ উন্মুক্ত না করে দাঁড়ালেই হয়।
-----
সাড়ে বারোটার ক্লাস গণিত, আজ ক্লাস নিবে কলেজের সবচেয়ে গম্ভীর ম্যাডাম জর্জিয়া খান লাবণ্য। এই এক ভদ্রমহিলা, যাকে কলেজের কেউ কখনো এলোমেলো অবস্থায় দেখেনি। সবসময় পাট পাট করে শাড়ি পরা, কাঁধ অবধি চুল কখনো ছাড়াই থাকে কখনো পোনিটেল। ফুল হাতার ব্লাউজ থাকে শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা। চোখে একটা লাল ফ্রেমের চশমা। ক্লাসে অতিরিক্ত কথা নেই, ছাত্রছাত্রীদের সাথে হাসিতামাশা নেই, টিচার্স রুমেও নেই অন্য শিক্ষকদের সাথে বাকবিতন্ডা। ক্লাস না থাকলে অবসর সময়ে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পত্রিকা পড়ে। শিক্ষক থেকে শুরু করে কলেজের সবাই তাকে আড়ালে অহংকারীও বলে। তাতে অবশ্য লাবণ্যের কিছু যায় আসে না। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সে অসম্ভব ভালো পড়ায়। বরং মাত্র একত্রিশ বছর বয়সী এই শিক্ষিকা অনেক বড় বড় জাঁদরেল শিক্ষকদের থেকেও ভালো পড়ায়। ছাত্রছাত্রীরা এটা মানতে বাধ্য। কোনোদিন উঁচু গলায় সে ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলেনি, পড়া না পারলে বকাঝকাও করেনি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সবাই তাকে ভয় পায়। সে ক্লাসে প্রবেশ করলেই ক্লাস ঠান্ডা, কোনো আওয়াজ নেই।
শাওন অবশ্য তাকে শুধু শিক্ষিকা হিসেবেই যে চিনে তা নয়। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ার সুবিধার্থে প্রতিবেশী হিসেবে খান বাড়িতে প্রায়ই ওদের যাতায়াত ছিলো শাওনের ছোটবেলায়। ও বাড়ির দুই মেয়ে আনা আর আয়রার সাথেও বেশ ভাব ছিলো তার। আনা তার বছর খানিকের ছোট। তবে সত্য বলতে দোষ নেই শাওন মূলত যেতো লাবণ্যের দেওয়া লজেন্সের লোভে। লাবণ্যের ব্যাগে সবসময় লজেন্স থাকতো। শাওন গেলে লাবণ্য তাকে দিতো। কি যে ভালো লাগতো তখন শাওনের। এরপর অবশ্য ও যখন আরেকটু বড় হলো তখন যেতো অন্য কারণে। একজনের ডাকপিয়ন হিসেবে, চিঠি পৌঁছে দিতে।
তবে বেশ কিছু বছর হয় ওই বাড়ির সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই আর। দুই বাড়ির মধ্যে বিশাল পাঁচিল উঠেছে। মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ দুই বাড়ির লোকের।
লাবণ্য ক্লাসে এলো, বরাবরের মতো ক্লাস ঠান্ডা। চক হাতে লাবণ্য এগিয়ে যায় বোর্ডের দিকে।
"আজ তোমাদের ডিফারেন্সিয়েশনের একটা মজার দিক সম্পর্কে বলবো। ভেরি ইন্টারেস্টিং পার্ট এটা। এইযে আমরা লিমিটের ক্ষেত্রে যে টেন্ডস টু জিরো ব্যবহার করি। আলোচনার স্বার্থে এটাকে জিরো ধরে নিই, আসলেই কি এটা জিরো? যদি তাই হয় আমরা ইকুয়াল চিহ্ন না লিখে টেন্ডস টু কেনো লিখি?"
পুরো ক্লাসের সবাই নড়েচড়ে বসে। আসলেই তো কেনো লিখি? এই প্রশ্ন এতোদিন মাথায় আসেনি কেনো?
"কারণ এটা জিরো না, জিরোর খুব কাছে। এখন কথা হলো কতো কাছে? সংখ্যার কি কোনো শেষ আছে? আমি বললাম জিরো পয়েন্ট জিরো জিরো জিরো। কিন্তু তুমি বললে না, জিরো পয়েন্ট জিরো জিরো জিরো জিরো। সামান্য একটা জিরো বাড়িয়েছো কিন্তু আমার সংখ্যার থেকে তোমারটা আরো অনেকটা পৌঁছে গেলো জিরোর দিকে। তো এভাবেই....."
লাবণ্য বলতে থাকে। শাওনের কানে ঢোকে না। অন্যমনস্ক হয়ে যায় সে হঠাৎ। পুরোনো দিনগুলোর কথা কি ভীষণ মনে পড়ে। কি হওয়ার কথা ছিলো আর কি হলো। লাবণ্য ফুপু, চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতো এলাকার সব ছেলেমেয়েগুলোকে। তার স্টাইল, কথা বলার ধরণ, চলাফেরা সবই যেনো ওদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। এদিকে তার চাচ্চুও ছিলো ওই সময়ে সবার হার্টথ্রব আকর্ষণ। কি যে মানাতো দুইজনকে। এক সময় খুব ঝগড়া হতো দুইজনের। কিন্তু লাবণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর কি যেনো হলো। হঠাৎ তাদের মধ্যকার বিভেদ পালটে প্রেমে রূপ নিলো। ফারদিন তখন সবে থার্ড ইয়ারে উঠেছে, সে সময়কার ছাত্রনেতা সে। আর লাবণ্য ভর্তি হয়েছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করলো তারা।
গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফারদিন সেনাবাহিনীর শর্ট কোর্সের জন্য আবেদন করলো। ভাগ্যক্রমে প্রথমবারেই টিকে গেলো সে, সোজা ক্যাপ্টেন। কিন্তু এরপর....
"ক্লাসে মন আছে?"
শাওন ধাতস্থ হতেই দেখে লাবণ্য তার বেঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে। দুই হাত বুকে বেঁধে শান্ত চোখে তাকিয়ে তার দিকে। কখন সে এসে দাঁড়িয়েছে টেরও পায়নি শাওন।
"ম্যাডাম আমি..."
"স্টান্ড আপ।"
শাওন উঠে দাঁড়ায় মাথা নিচু করে।
"কি পড়িয়েছি এতোক্ষণ? শুনেছো?"
"জি।"
"বলো তো লাস্ট কি বললাম?"
শাওন জানেনা লাবণ্য কি বলেছে। আজ হঠাৎ করেই পুরোনো দিনে হারিয়ে গিয়েছিলো সে। এ কথা কীভাবে বলবে লাবণ্যকে?
"ক্লাস শেষে টিচার্স রুমে দেখা করবে। আর হ্যা, গার্ডিয়ান সহ।"
এই বলে লাবণ্য চলে যায়। শাওন ধপ করে বসে পড়ে। গার্ডিয়ান সহ মানে? লাবণ্য খুব ভালো করে জানে শাওনের বাবা ফরহাদ নেওয়াজ ভয়ংকর রাগী মানুষ। শাওন দুনিয়ায় একজনকে যদি ভয় পেয়ে থাকে তাহলে সে হলো তার বাবা। ইচ্ছা করে লাবণ্য এই কাজ করেছে। ধুর!
------
"কি রে? মুখটা এমন হাড়ির কালির মতো বানিয়ে রেখেছিস কেনো? অবশ্য এমনিও তুই বাঁদরমুখো।"
বাইকের উপর বসে বাইকের লুকিং গ্লাসে চুল ঠিক করছে ফারদিন। শাওনের সাথে তার সম্পর্ক চাচা-ভাতিজার না, অনেকটা বন্ধুর মতো। আজ ফারদিন ঠিক করেছে শাওনের কলেজের পর তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবে একটু। তাই ওর ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই চলে এসেছে কলেজে।
হঠাৎ শাওনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটা বুদ্ধি খেলে যায় মাথায় তৎক্ষনাৎ।
"চাচ্চু তোমাকে একবার আমার সাথে টিচার্স রুমে যেতে হবে।"
ফারদিন সরু চোখে তাকায় শাওনের দিকে।
"কি বললি?"
"হু এক ম্যাডাম ডেকেছে তোমাকে।"
"আমাকে?"
"তোমাকে মানে আমার একজন গার্ডিয়ানকে। তুমি ছাড়া কে-ই বা আছে আমার?"
ফারদিন দুই হাত উঁচু করে বললো,"আমি এসবের মধ্যে নাই। কি কাহিনী ঘটিয়েছিস তার নেই ঠিক। নারী কেলেংকারী কিনা খোদা জানে।"
"ছিহ চাচ্চু, আমাকে এতোটা নীচ মনে হয় তোমার?"
"তোকে আমি নীচ মনে হয় না। নর্দমা মনে হয়। আমি যেতে পারবো না। তোর বাপকে নিয়ে আসবি।"
শাওন অসহায় চোখে তাকায় ফারদিনের দিকে। ফারদিন বিরস মুখে অন্যদিকে চোখ সরায়। এই ছেলে আজীবন তার ইজ্জত নিয়ে খেলে এসেছে। বড় হয়েও শান্তি দিচ্ছে না। কতোদিন যে ওর রেজাল্ট কার্ডে বাবার সইয়ের জায়গায় জাল সই দিয়েছে ফারদিন ঠিক নেই। একবার ফরহাদ ধরে ফেললো। দুইজনকেই আচ্ছামতো ধোলাই দিলো।
"চাচ্চু...."
"ধুর বেটা। খোদা যে কেনো এতো ভালো ভালো পোলা রেখে একটা হাড়বজ্জাতকে আমার ভাতিজা হিসেবে দিলো কে জানে।"
"চলো চলো, এবারই শেষ।"
ফারদিন বাইক থেকে নামে। বিরক্ত মুখে হাঁটতে থাকে। শাওন তো খুশিতে পারলে ডিগবাজি দেয়। জানেনা কি বিস্ফোরণ হতে চলেছে একটু পর। কলেজের মধ্যে থোড়াই না ওরা মারামারি করবে!
"ম্যাডাম আমার গার্ডিয়ানকে আসতে বলেছিলেন।"
ফারদিন অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বুকে দুই হাত বেঁধে। পরীক্ষার খাতা দেখছে লাবণ্য মাথা নিচু করে। সে হাত বাড়িয়ে দুইজনকে বসার ইশারা দেয়। এখনো চোখ তুলে তাকায়নি সে। তবে সে জানে ফরহাদ ভাই এসেছে। ওই পরিবারের মধ্যে ওই মানুষটার সাথেই লাবণ্যের অল্পস্বল্প কথা হয়। তবে তা এলাকার বাইরে। ফরহাদ লাবণ্যকে ছোট থেকেই বোনের মতো স্নেহ করে।
"সালাম নিয়েন ম্যাডাম।"
আচমকাই ঝট করে উপরের দিকে তাকায় লাবণ্য। চেয়ারে বসতে বসতে ফারদিনও তাকায় তার দিকে। চোখাচোখি হয় দুইজনের।
আকাশের চাঁদটা যদি জমিনে নেমে আসতো তাহলেও বোধহয় এতোটা চমকাতো না ওরা। হাঁ হয়ে যায় দুইজনই।
শাওন চোখ বন্ধ করে খোদাকে ডাকে। কুরুক্ষেত্র একটা না বাঁধে। কয়টা তাল যে বাড়িতে যেয়ে তার পিঠে পড়বে তার নেই ঠিক। কিন্তু এখন কি হবে?
(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন