#প্রেমের_শেষ_কিস্তিমাত
#লেখনিতে_ফারজানা_ইয়াসমিন
#পর্ব_১২
[অনুমতি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ🚫]
────────────────────────────────
পরদিন .........
সকালটা অন্য দিনের তুলনায় একটু ধীরগতিতে শুরু হলো।রাতের শেষ প্রহরে হালকা বৃষ্টি হওয়ায় মিরপুরের আকাশটা সকালেও মেঘলা। জানালার কাঁচে জমে থাকা ছোট ছোট পানির ফোঁটাগুলোয় বাইরের আলো ভেঙে পড়ছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, আর দূরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
ইনায়ার ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে।ঘুম থেকে উঠেই কয়েক মুহূর্ত সে স্থির হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। আগের রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা আবার ভার হয়ে গেল।
"ছেলে দেখা শুরু করো।"
মায়ের কথাটা যেন এখনও কানে বাজছে।ইনায়া চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তারপর নিজেকে জোর করে বিছানা ছাড়ল।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এক সপ্তাহের জমে থাকা পড়ার পর গতকাল মাত্র কিছুটা সামলাতে পেরেছে। আজ আবার ক্লাস আছে।
ফ্রেশ হয়ে আলমারি খুলে অনেকক্ষণ পোশাক বাছাই করল সে। শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ একটা পোশাকই বেছে নিল। চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়ে লম্বা চুলের বেশিরভাগটা পিঠের ওপর ছেড়ে দিল। কাঁধে ওড়না তুলে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই গতকালের একটা দৃশ্য অকারণে মনে পড়ে গেল।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— না। আজ কোনোভাবেই ওইসব ভাবা যাবে না।
নিজেকেই যেন নির্দেশ দিল সে।নিচে এসে দেখল, বাবা নাশতার টেবিলে বসে আছেন। ঈশা ইতিমধ্যে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।ইরাবতী মেয়েকে দেখে বললেন,
— আয় মা, নাশতা করে যা।
ইনায়া চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল।গত রাতের কথার পর মায়ের সঙ্গে তার কোনো রাগ নেই, কিন্তু মনটা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।ইরাবতীও সেটা বুঝতে পারছিলেন। তাই আর বিয়ের প্রসঙ্গ তুললেন না।
আব্দুল ইসলাম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আজ কখন ফিরবি?
— ক্লাস শেষ হলে। হয়তো একটু দেরি হতে পারে।
— ঠিক আছে। সাবধানে আসিস।
ইনায়া মাথা নাড়ল।নাশতা শেষ করে ব্যাগটা কাঁধে তুলল সে।বের হওয়ার আগে ঈশা পেছন থেকে বলে উঠল,
— আপু!
ইনায়া ঘুরে তাকাল।ঈশা হেসে বলল,
— আজ কিন্তু আমার জন্য চকলেট আনতে হবে।
ইনায়ার মুখে অবশেষে হাসি ফুটল।
— কালকেই তো দিলাম!
— ওটা শেষ।
— তোর পেট নাকি চকলেট রাখার গুদাম?
ঈশা হাসতে হাসতে বলল,
— তুমি এনে দিও, তারপর বুঝবে।
ইনায়া মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
__________
সকালের ব্যস্ততা পেরিয়ে ইনায়া যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকল, তখন আকাশের মেঘ অনেকটাই সরে গেছে। রাতের বৃষ্টির কারণে চারপাশটা ধুয়ে-মুছে আরও সতেজ লাগছে। গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো সকালের রোদে চিকচিক করছে। ভেজা পথের ওপর শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত পায়ের শব্দ, দূরে কোথাও ভেসে আসা হাসির আওয়াজ আর ক্যান্টিনের দিক থেকে আসা চায়ের গন্ধ—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসটা আবার তার চেনা প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
ইনায়া ব্যাগটা কাঁধে একটু ঠিক করে নিল।আজ তার মনে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা।গতকাল লাইব্রেরিতে ইয়াশের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে ছেলেটার কথা বারবার মনে পড়ছে। যদিও সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে—সবকিছুই নিছক স্বাভাবিক।
সিনিয়র হিসেবে পড়া বুঝিয়েছে।এর বেশি কিছু নয়।তবুও মন যেন যুক্তির কথা শুনতে রাজি নয়।বিভাগের ভবনের দিকে এগোতে গিয়েই দূর থেকে লামিহাকে দেখতে পেল সে।লামিহা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল। ইনায়াকে দেখেই ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো।
— এই যে ম্যাডাম! গতকাল বাড়ি গিয়ে কিন্তু আমাদের কথা ভুলে যাওনি তো?
ইনায়া হেসে বলল,
— তোকে ভুলে গেলে তো শান্তি পেতাম।
সবাই হেসে উঠল।ঠিক তখনই সামনের দিক থেকে কয়েকজন সিনিয়রকে আসতে দেখা গেল।তাদের মাঝখানে ছিল ইয়াশ।আজ তার পরনে গাঢ় নীল শার্ট। চুলগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় একটু এলোমেলো। ডান হাতের ব্যান্ডেজ এখনও আছে, যদিও আগের চেয়ে অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে।
ইনায়ার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার দিকে চলে গেল।আর ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াশও তাকে দেখতে পেল।দু'জনের চোখাচোখি হলো।মাত্র কয়েক সেকেন্ড।কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই ইনায়ার মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ যেন একটু দূরে সরে গেছে।
ইয়াশের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে সেই পরিচিত দুষ্টু হাসিটা ফুটে উঠল।সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ইনায়ার পাশ দিয়ে এগিয়ে এলো।একেবারে কাছাকাছি এসে থামল না।শুধু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় খুব নিচু স্বরে বলল,
— গুড মর্নিং, অচেনা বউ।
ইনায়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।লামিহা তার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
— অচেনা কী?!ভালো ভাবে শুনতে পারলাম না তো অচেনার পর এমন ভাবে বলল।
ইনায়া দ্রুত লামিহার হাত টেনে ধরল।
— কিছু না!
কিন্তু ততক্ষণে ইয়াশ বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে।আদি পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখে মুচকি হাসল।আর ইনায়া?সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—আজকে সুযোগ পেলে এই মানুষটাকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে, কেন সে তাকে বারবার "অচেনা বউ" বলে!একদিন জাস্ট সামান্য ফান করেছিল তাই নিয়ে যখন তখন "বউ" বলবে?
ইয়াশ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে গেল। ক্যাম্পাসের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরোনো গাছটার নিচে গিয়ে বসল সে। গাছটার ছায়া যেন চারপাশের কোলাহল থেকে আলাদা একটা ছোট্ট জগৎ তৈরি করে রেখেছে।কাঁধের ব্যাগটা পাশে রেখে সে গিটারটা বের করল।আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তারের ওপর ছুঁয়ে গেল।প্রথমে খুব মৃদু একটা সুর ভেসে উঠল।
আশপাশে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও কৌতূহলী হয়ে তাকাল। আদি একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। ইয়াশের এমন হঠাৎ গান ধরার অভ্যাসটা তার অজানা নয়।কিন্তু আজকের ব্যাপারটা যেন একটু অন্যরকম।গিটার হাতে নেওয়ার পর ইয়াশ প্রথমেই একবার চোখ তুলল।তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ইনায়ার ওপর।
ইনায়া তখন লামিহার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। ইয়াশের দৃষ্টি টের পেয়ে সে থেমে গেল।দু'জনের চোখাচোখি হলো।ইয়াশের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল।তারপর সে ইনায়ার থেকে চোখ সরিয়ে গিটারের দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর তার কণ্ঠ ভেসে উঠল—
~ নেমে এলো চাঁদ আকাশ থেকে
ধুলো মাখা গলিতে
রঙচটা দিন করল রঙিন
স্বপ্নের তুলিতে
দেখে ওই হাসি
আমি বানভাসি
মনে ডুবে যেতে চায় ~
মুহূর্তেই আশপাশের কোলাহল যেন একটু থেমে গেল।গানের সুরে ছিল এক ধরনের নরম মায়া। ইয়াশের কণ্ঠ খুব জোরালো নয়, বরং শান্ত—যেন সে কারও উদ্দেশে গানটা গাইছে, অথচ সরাসরি কিছু বলছে না।
ইনায়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল।তার মনে হলো, গানের প্রতিটি শব্দ যেন অদ্ভুতভাবে তার দিকে এগিয়ে আসছে।সে একবার চোখ সরিয়ে নিতে চাইল।কিন্তু না, সে পারল না।
লামিহা পাশ থেকে ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বান্ধবীর চোখের সেই অদ্ভুত স্থিরতা তার নজর এড়াল না।গান শেষ হওয়ার পরও কয়েক মুহূর্ত নীরবতা রয়ে গেল।তারপর আশপাশের কয়েকজন হাততালি দিয়ে উঠল।ইয়াশ গিটারটা নামিয়ে রাখল।কিন্তু এবারও তার চোখ সবার আগে খুঁজে নিল একজনকেই।
ইনায়া তখনও তাকিয়ে আছে।দু'জনের চোখ আবারও মিলল।ইয়াশ এবার কোনো দুষ্টুমি করল না।শুধু খুব সামান্য মাথা কাত করে হাসল।আর সেই একটুকু হাসিই ইনায়ার বুকের ভেতর অকারণে কেমন যেন একটা আলোড়ন তুলে দিল।
গান থেমে যাওয়ার পরও যেন সুরটা কিছুক্ষণ বাতাসে ঝুলে রইল।ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কোলাহল ধীরে ধীরে ফিরে এল। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ ইয়াশের গিটার নিয়ে প্রশংসা করছে, আবার কেউ বন্ধুর কানে কানে কিছু বলছে। কিন্তু ইনায়ার কাছে আশপাশের কোনো কথাই যেন স্পষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছিল না।
তার মনটা আটকে আছে সেই কয়েক মিনিটের মধ্যে।ইয়াশ গিটারটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল। আদি, রাজ আর সামিরও তখন গাছটার কাছে এসে জড়ো হয়েছে।
আদি গিটারটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— আজ তো বেশ জমিয়ে দিলি।কি?ইনায়ার উদ্দেশ্যে গান টা গাইলি তাই না?
ইয়াশ শুধু কাঁধ ঝাঁকাল।
— না! এমনিই।
আদি কিছু বলল না। শুধু বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।কারণ সে জানে, ইয়াশের এই "এমনিই" কথাটার আড়ালে অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে।
এদিকে লামিহা ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ কিছু না বলে বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— কী ভাবছিস?
ইনায়া চমকে উঠল।
— কিছু না।
— কিছু না?
লামিহা চোখ সরু করে তাকাল।
— তাহলে গান চলাকালীন তুই এতক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন?
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম না তো।
— তাহলে?
— গান শুনছিলাম।
লামিহা এবার মুচকি হাসল।
— গান তো সবাই শুনছিল। তুই শুধু একজনকেই দেখছিলি।
ইনায়া এবার আর কোনো উত্তর দিল না।তার গাল হালকা উষ্ণ হয়ে উঠেছে।ঠিক তখনই দূর থেকে একজন ক্লাসমেট এসে তাদের ডাকল। আজকের ক্লাসের একটা জরুরি নোটিশ এসেছে। সবাইকে বিভাগের সামনে যেতে হবে।
ইনায়া স্বস্তি পেল।এই মুহূর্তে লামিহার প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার একটা সুযোগ পাওয়া গেল।দু'জন হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু কয়েক পা যেতেই ইনায়া অজান্তেই একবার পেছনে তাকাল।ইয়াশ তখনও সেই গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে।তার হাতে গিটার।
আর আশ্চর্যজনকভাবে, সে-ও তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকেই।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল।তবুও মুখের কোণে ফুটে ওঠা ক্ষীণ হাসিটা আর লুকাতে পারল না।
______
কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হলো।
শিক্ষকের লেকচার চলতে লাগল। বোর্ডে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লেখা হচ্ছে। সবাই মনোযোগ দিয়ে নোট নিচ্ছে।ইনায়াও খাতা খুলে লিখতে শুরু করল।কিন্তু কয়েক মিনিট পর তার কলম থেমে গেল।খাতার এক কোণে অজান্তেই সে একটা নাম লিখে ফেলেছে—
ইয়াশ।
নিজের লেখা দেখে ইনায়া যেন চমকে উঠল।তাড়াতাড়ি সেটা কেটে দিল।তারপর নিজের কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
— আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? ওই তেজপাতার নাম খাতায় লিখছি কেন? আজব!ধুর!
ইনায়া যতই অস্বীকার করুক, তার মনের কোথাও একজন মানুষ ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে।
ক্লাসরুমের ভেতর তখন দুপুরের নিস্তব্ধতা।জানালার কাঁচ দিয়ে আসা রোদটা ধীরে ধীরে মেঝের ওপর সরে যাচ্ছে। বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝিয়ে যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে চক বোর্ডে ঘষার শব্দ, খাতায় কলম চলার মৃদু আওয়াজ আর বাইরে থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক—সব মিলিয়ে একটা শান্ত পরিবেশ।কিন্তু ইনায়ার মনটা যেন কিছুতেই স্থির হচ্ছে না।সামনে খোলা খাতা।পাতার ওপর গোছানো অক্ষর।কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে সেই এক জায়গায়।খাতার এক কোণে কিছুক্ষণ আগে লেখা একটা নাম কেটে দিলেও তার ছাপ যেন এখনও রয়ে গেছে।
ইনায়া নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে কলমটা আঙুলের মধ্যে ঘুরাতে লাগল।গত কয়েকদিনে মানুষটা কেন এতবার তার সামনে আসছে?কখনো হঠাৎ ধাক্কা লেগে যাওয়া, কখনো ওড়না আটকে যাওয়া, কখনো কৃষ্ণচূড়ার নিচে তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা, আবার কখনো লাইব্রেরির নীরব পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়া বুঝিয়ে দেওয়া।তার ওপর আজ সকালে সেই গান।গানের কথাগুলো কি সত্যিই শুধু একটা গান ছিল?নাকি?
ইনায়া নিজের চিন্তাটাকেই থামিয়ে দিল।
— না। এসব ভাবা একদম ঠিক না।
সে আবার খাতার দিকে মন দিল।কয়েক লাইন লিখল।তারপরও মন বসল না।পাশ থেকে লামিহা আস্তে করে কনুই দিয়ে তাকে ধাক্কা দিল।ইনায়া তাকাতেই লামিহা একটা কাগজ এগিয়ে দিল।কাগজে লেখা—
"কী ভাবছিস?"
ইনায়া নিচে লিখল—
"কিছু না।"
লামিহা সঙ্গে সঙ্গে লিখল—
"মিথ্যে।"
ইনায়া বিরক্ত হয়ে কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল।লামিহা মুচকি হেসে আবার পড়ায় মন দিল।
ক্লাস শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল।শিক্ষক বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো ক্লাসরুমটা যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল। এতক্ষণ যে সবাই চুপচাপ বসেছিল, এখন চারপাশে কথাবার্তা, হাসাহাসি, চেয়ার সরানোর শব্দ।
ইনায়া ধীরে ধীরে নিজের বইগুলো গুছিয়ে ব্যাগে ঢোকাতে লাগল।
লামিহা, আরিয়া আর ফিজাও পাশে এসে দাঁড়াল।আরিয়া বলল,
— চল, ক্যান্টিনে যাই। আজকে আমার চা না খেলে মাথা কাজ করবে না।
ফিজা হেসে বলল,
— তোর মাথা কখন কাজ করে?
তিনজনের হাসির মধ্যে ইনায়ার মুখেও হাসি ফুটল।তারা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এল।করিডোরের শেষ মাথা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা গেল, বিকেলের আলোয় পুরো ক্যাম্পাসটা সোনালি হয়ে আছে। বড় গাছগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে মাটির ওপর পড়েছে। দূরে কয়েকজন শিক্ষার্থী মাঠে বসে গল্প করছে।
হাঁটতে হাঁটতেই ইনায়ার চোখ হঠাৎ আবার সেই বড় গাছটার দিকে চলে গেল।সেখানে ইয়াশ নেই।কিন্তু গাছটার নিচে এখনও পড়ে আছে একটা কালো গিটার কভার।সম্ভবত সে তাড়াহুড়ো করে কোথাও গেছে।ইনায়া এক মুহূর্ত থেমে গেল।লামিহা কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে পেছনে তাকাল।
— কী হলো?
ইনায়া দ্রুত হাঁটা শুরু করল।
— কিছু না।
তবে তার নিজের কাছেই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য লাগল না।ক্যান্টিনে গিয়ে সবাই একটা টেবিলে বসল।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। চারপাশে শিক্ষার্থীদের ভিড়। কেউ নোট নিয়ে আলোচনা করছে, কেউ পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত, আবার কেউ নিছক আড্ডায় মেতে আছে।ইনায়া চুপচাপ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসেছিল।
ফিজা হঠাৎ বলল,
— আজ সকালে ইয়াশ ভাইয়া যে গানটা গাইলেন, সেটা কিন্তু দারুণ ছিল।
ইনায়ার হাত মাঝপথে থেমে গেল।লামিহা সঙ্গে সঙ্গে ফিজার দিকে তাকাল।ইনায়া ভান করল, সে কিছুই শুনছে না।চায়ের কাপে মন দিল।
ফিজা আবার বলল,
— সত্যি বলছি, উনার গলার স্বরটা বেশ সুন্দর।
আরিয়া মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। আর উনি গিটারও বেশ ভালো বাজান।
ইনায়া মুখ গোমড়া করে চায়ে চুমুক দিল।কিন্তু কিছুতেই নিজের মনকে বোঝাতে পারল না যে, ইয়াশের গান নিয়ে অন্য কেউ কথা বললে তার ভেতরটা এভাবে কেমন করে ওঠে কেন।
একটু পর ইনায়া ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে বিভাগের দিকে ফিরছিল।হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— এই যে, অচেনা বউ!
ইনায়ার পা থেমে গেল।সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।ইয়াশ দাঁড়িয়ে আছে।কাঁধে ব্যাগ, হাতে গিটার কভার।তার পাশে আদি।ইয়াশের মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আপনি আমাকে আবার এই নামে ডাকছেন কেন?
ইয়াশ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
— কারণ নামটা তোমার সাথে বেশ মানিয়ে গেছে।
— কোথায় মানিয়েছে?
— সেটা একদিন বুঝিয়ে বলব।
ইনায়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
— আপনাকে আমি একদম বুঝি না ইয়াশ!এক সময় মনে হয় আপনি অনেক অহংকারী আবার মনে হয় আপনি অনেক ভালো।আবার মনে হয় আপনার অন্য কোন রূপ আছে।একদম বুঝি না আপনাকে।আপনি এমন রহস্য ময় কেন?সবার সাথে তো এমন করেন না আপনি!
ইনায়া আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।আদি পাশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে হাসি লুকাচ্ছিল।ইয়াশের চোখ তখনও ইনায়ার ওপর।কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের ব্যস্ততা যেন তাদের দুজনকে ছেড়ে দূরে সরে গেল।
ইনায়া শেষ পর্যন্ত চোখ নামিয়ে মুখে বলল,
— আমার ক্লাস আছে। আমি যাচ্ছি।
সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হল।ইয়াশও আর আটকায়নি।শুধু পেছন থেকে শান্ত গলায় বলল,
— কাল নোটসগুলো নিয়ে আসবে!
ইনায়া থেমে পেছনে তাকাল।
— কেন?
— দেখব কতটুকু পড়েছো।
ইনায়া একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে।
সে চলে গেল।ইয়াশ কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল।আদি এবার পাশে এসে দাঁড়াল।
— তুই কিন্তু ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছিস।
ইয়াশ গিটার কভারটা কাঁধে তুলে নিল।মুখে হাসি রেখেই বলল,
— কী ব্যাপার?
আদি আর কিছু বলল না।শুধু বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।কারণ কিছু অনুভূতি মানুষ মুখে স্বীকার না করলেও তার চোখ ঠিকই বলে দেয়।
ইনায়া চলে যাওয়ার পরও কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল ইয়াশ।
ক্যাম্পাসের বিকেলটা তখন ধীরে ধীরে বিকাল দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশের রোদ নরম হয়ে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দূরের ভবনগুলোর দেয়ালে সেই আলো পড়ে একটা মায়াবী আবহ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
আদি পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।ইয়াশের দৃষ্টি এখনও সেই পথেই, যেদিক দিয়ে ইনায়া চলে গেছে।আদি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
— কী দেখছিস এতক্ষণ?
ইয়াশ চোখ সরিয়ে নিল।
— কিছু না।
— কিছু না হলে মানুষ চলে যাওয়ার পরও তার যাওয়ার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়?
ইয়াশ এবার আদির দিকে তাকাল।চোখে সামান্য বিরক্তি।
— তুই কিন্তু আজকাল বেশি কথা বলিস।
আদি হেসে ফেলল।
— আর তুই কম বলিস। সমস্যা হচ্ছে, তোর মুখ কম বললেও চোখ অনেক বেশি বলে।
ইয়াশ কোনো উত্তর দিল না।সে গিটারটা কাঁধে তুলে নিল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।আদিও তার পাশে হাঁটতে লাগল।কিছুদূর যাওয়ার পর আদি আবার বলল,
— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
— কর।
— কাল আবার পড়াবি?
ইয়াশ হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
— হ্যাঁ।
আদি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
— বুঝেছি।
ইয়াশ এবার থেমে গেল।
— কী বুঝেছিস?
— কিছু না।
আদি ইচ্ছে করেই কথাটা ফিরিয়ে দিল।ইয়াশ বুঝতে পারল, বন্ধু তাকে নিয়ে মজা করছে। তাই আর কথা বাড়াল না।তবে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে থাকা অতি ক্ষীণ হাসিটা আদি ঠিকই দেখে ফেলল।
______
আজ বাড়ি ফেরার সময় ইনায়ার মনটা আগের দিনের তুলনায় অনেক হালকা ছিল।কিন্তু মায়ের বলা কথাগুলো এখনও মনে আছে।কিন্তু আজ সেই কথাগুলো তাকে ততটা বিরক্ত করল না।বরং তার মাথায় অন্য একটা চিন্তা ঘুরছিল।কাল ইয়াশের কাছে নোটস নিয়ে যেতে হবে।
সে নিজেই অবাক হয়ে বুঝতে পারল, আগামীকাল নিয়ে তার মধ্যে অদ্ভুত এক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।এটা কি শুধু পড়াশোনার জন্য?নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?ইনায়া জানে না।
জানতে চায়ও না।অন্তত এখনই না।
___________
দুই দিন কেটে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা, ক্লাস, পড়াশোনা আর নোটসের ঝামেলায় ইনায়ার দিনগুলোও কেমন যেন দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। ইয়াশের সঙ্গে গত দুদিনে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। কখনো করিডোরে দূর থেকে, কখনো বন্ধুদের ভিড়ে। প্রতিবারই ইয়াশের সেই চেনা দুষ্টু হাসি আর দু-একটা কথায় ইনায়ার বিরক্ত হওয়া—তারপরও অজান্তে মুখে হাসি ফুটে ওঠা—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল।
এর মধ্যেই চলে এলো শুক্রবার।ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই বাড়িটা ছিল বেশ শান্ত। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর মতো কারও তাড়াহুড়ো নেই। জানালার পর্দা দিয়ে সকালের রোদ ঘরের মেঝেতে লম্বা হয়ে পড়ে আছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নাশতার গন্ধ। ঈশা নিজের ঘরে বসে ফোন নিয়ে ব্যস্ত, আর ইনায়া নিজের ঘর গুছিয়ে নিচ্ছিল।
আজ তারও কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।সপ্তাহের ব্যস্ততার পর একটা অলস দিন কাটানোর ইচ্ছাই ছিল।হঠাৎ—ড্রয়িংরুম থেকে কলিং বেলের শব্দ ভেসে এলো।
ইনায়া প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কোনো ডেলিভারি এসেছে।কেউ যাওয়ার আগেই সে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।দরজার কাছে গিয়ে চুলগুলো একবার ঠিক করে নিল। তারপর দরজা খুলে দিল।
দরজা খোলার পর ওপাশের মানুষটাকে দেখেই ইনায়া কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।সামনে দাঁড়িয়ে আছে—ফাহিম।
হাতে একটা ছোট ব্যাগ। মুখে স্বাভাবিক হাসি। যেন হঠাৎ করে কারও বাড়িতে হাজির হওয়াটা তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার।ইনায়া বিস্ময় সামলে উঠতে না পেরে বলে উঠল,
— ফাহিম ভাইয়া, তুমি?
ফাহিম হেসে বলল,
— কী হলো? আমাকে দেখে এমন ভূত দেখার মতো তাকিয়ে আছিস কেন?
ইনায়া এখনও অবাক।
— তুমি আসবে, এটা তো কেউ বলেনি!
— বললে কি আর সারপ্রাইজ থাকত?
ইনায়া এবার একটু হেসে ফেলল।
— তা ঠিক। কিন্তু হঠাৎ? আজ তো শুক্রবার।
ফাহিম জুতো খুলতে খুলতে ভেতরে ঢুকল।
— শুক্রবার বলেই তো এলাম। ভাবলাম, কয়েকদিন ধরে সবার সঙ্গে দেখা নেই। তাই হঠাৎ চলে আসি।
ইনায়া দরজাটা বন্ধ করে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।ফাহিম ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই ঈশা নিজের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো।ফাহিমকে দেখেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— ভাইয়া!
ফাহিম হেসে হাত বাড়িয়ে দিল।
— কেমন আছিস?
ঈশা তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বলল,
— ভালো। কিন্তু তুমি আমাদের না জানিয়ে এসেছ কেন?
— তোমাদের চমকে দেওয়ার জন্য।
ইনায়া সোফার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।তারপর মজা করে বলল,
— বাহ! আমাকে না জানিয়ে এসে আবার সবাইকে চমকে দেওয়া হচ্ছে।
ফাহিম ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
— তুই তো দরজা খুলেই আমাকে দেখে চমকে গেছিস। আমার সারপ্রাইজ সফল।
ইনায়া মাথা নেড়ে হাসল।কিন্তু তার অজান্তেই ফাহিমের হঠাৎ আসাটা বাড়ির পরিবেশটাকে যেন এক মুহূর্তেই আরও প্রাণবন্ত করে তুলল। ছুটির দিনের অলস পরিবেশটা মুহূর্তেই যেন বদলে গেল। এতক্ষণ যে বাড়িটা শান্ত ছিল, সেখানে হঠাৎ করে পরিচিত একজনের আগমনে হাসি-ঠাট্টার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
ইনায়া সোফায় বসার জন্য ফাহিমকে জায়গা করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশের ঘরের দরজা খুলে আব্দুল ইসলাম বেরিয়ে এলেন।হঠাৎ ফাহিমকে দেখে তাঁর মুখেও বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দ ফুটে উঠল।
— আরে ফাহিম! তুমি কখন এলে?
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করল।
— এই তো ফুপা, একটু আগেই এলাম। কাউকে জানাইনি। ভাবলাম হঠাৎ এসে সবাইকে চমকে দিই।
আব্দুল ইসলাম হেসে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
— ভালো করেছো। অনেকদিন পর এলে। কেমন আছো?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনারা সবাই কেমন আছেন?
— আমরা ভালো আছি।
দু'জনের কথাবার্তা চলতে লাগল। ফাহিমও বেশ স্বাভাবিকভাবেই মামার সঙ্গে গল্প করতে শুরু করল। তার আসার কারণ, কাজকর্ম, বাড়ির সবার খবর—টুকটাক নানা প্রসঙ্গ উঠে এলো।ইনায়া কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল।
ফাহিম তার মামাতো ভাই হলেও ছোটবেলা থেকেই তাদের সম্পর্কটা বেশ কাছের। পরিবারের বড়দের সঙ্গে তার যে স্বচ্ছন্দ ব্যবহার, সেটাও ইনায়ার পরিচিত।এর মধ্যেই রান্নাঘর থেকে ইরাবতী বেরিয়ে এলেন।ফাহিমকে দেখে তাঁর মুখে সঙ্গে সঙ্গে মায়ামাখা হাসি ফুটে উঠল।
— ফাহিম বাবা, তুই এসেছিস আর আমাকে বলিসনি!
ফাহিম হেসে বলল,
— ফুপ্পি, তোমাকে বললে তো সারপ্রাইজ থাকত না।
— সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে এখন না খেয়ে থাকতে হবে! দাঁড়া, তোর জন্য কিছু বানাচ্ছি।
ফাহিম তাড়াতাড়ি বলল,
— আরে না না, এত কিছু করতে হবে না। আমি এমনিতেই এসেছি।
ইরাবতী ভ্রু কুঁচকে মায়ের মতো বকা দিলেন,
— চুপ কর। কতদিন পর ভাগ্নে বাড়িতে এসেছে, আর আমি কিছু রান্না করব না?
কথাটা বলে তিনি আবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বাসনের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। ঈশাও মায়ের পেছন পেছন ছুটে গেল।ড্রয়িংরুমে তখন আব্দুল ইসলাম আর ফাহিমের কথাবার্তা চলছিল।ইনায়া সোফার একপাশে বসে চুপচাপ তাদের কথা শুনছিল।
কিছুক্ষণ পর ইরাবতী আবার এসে বসতেই কথার প্রসঙ্গ ঘুরে গেল অবনির বিয়ের দিকে।ইরাবতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— অবনির বিয়েটা হয়ে গেল। এখন ইনায়াকেও তো নিয়ে ভাবতে হবে।
ইনায়ার মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।সে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।ইরাবতী এবার ফাহিমের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
— তুই তো বাইরে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশিস। ইনায়ার জন্য ভালো কোনো ছেলে চোখে পড়লে আমাদের জানাস। তোর ফুপা কে বলেছি, ছেলে দেখা শুরু করতে।
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের পরিবেশটা বদলে গেল।ফাহিম এতক্ষণ যে হাসিমুখে বসে ছিল, তার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে গেল।
ইনায়া বিস্মিত চোখে ফাহিমের দিকে তাকাল।
— ফাহিম ভাইয়া?
ফাহিম যেন নিজের ভেতরের রাগটা সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কণ্ঠে ইতিমধ্যেই কঠোরতা চলে এসেছে।
— ইনায়ার জন্য ছেলে দেখছো?
ইরাবতী বিষয়টার অস্বাভাবিকতা বুঝতে না পেরে মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। মেয়েটা তো আর ছোট নেই। ভালো ছেলে পাওয়া গেলে তো ভাবতে হবে।
ফাহিম এবার আর হাসল না।তার চোখে এমন এক অস্বস্তি ফুটে উঠল, যা ইনায়া আগে কখনো দেখেনি।সে ধীরে ধীরে বলল,
— এত তাড়াহুড়ো করার কী আছে?
ইরাবতী এবার ছেলের মুখের দিকে তাকালেন।
— তাড়াহুড়ো করছি না। শুধু ভাবছি।
ফাহিম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— ইনায়া এখনও পড়াশোনা করছে। ওর নিজেরও তো কিছু ইচ্ছা থাকতে পারে।
ইরাবতী এবার একটু অবাক হলেন।
— অবশ্যই থাকবে। ওর মতামত না নিয়ে তো কিছুই হবে না।
কথাটা শুনেও ফাহিমের অস্বস্তি কমল না।বরং তার চোখ একবার গিয়ে থামল ইনায়ার মুখে।ইনায়া তখন সম্পূর্ণ চুপ।সে বুঝতে পারছিল না, ফাহিমের আচরণটা এতটা বদলে গেল কেন।কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা হাসতে হাসতে বাড়িতে ঢুকেছিল, এখন তার মুখে অদ্ভুত কঠোরতা।
ফাহিম দৃষ্টি সরিয়ে নিল।কিন্তু নিজের ভেতরে জমে থাকা একটা সত্যকে আর অস্বীকার করতে পারল না—ইনায়ার বিয়ের কথা শুনলেই কেন তার বুকের ভেতরটা এতটা অস্থির হয়ে ওঠে?আর এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও খুব ভালোভাবেই জানে।
ফাহিমের ভেতরটা তখন যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে উঠেছিল।ইরাবতীর কথাগুলো বারবার কানে বাজছিল—
"ইনায়ার জন্য ভালো কোনো ছেলে চোখে পড়লে আমাদের জানাস।"
কথাটা যতবার মনে পড়ছিল, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠছিল।যদি সত্যিই ছেলে দেখা শুরু করে?যদি এমন কোনো পরিবার থেকে প্রস্তাব আসে, যেখানে ইনায়া রাজি হয়ে যায়?যদি একদিন হঠাৎ জানতে পারে, ইনায়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?
ভাবনাগুলো একটার পর একটা এসে তার মাথার ভেতর ঝড় তুলতে লাগল।ফাহিম জানত, এই মুহূর্তে চুপ করে থাকলে হয়তো পরে আর কিছু বলার সুযোগ থাকবে না।কিন্তু কী বলা উচিত, সেটাও সে জানত না।কয়েক মুহূর্ত সে মাথা নিচু করে বসে রইল।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশ তখন বেশ শান্ত। আব্দুল ইসলাম আর ইরাবতী দুজনেই ফাহিমের মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন। ইনায়াও বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।হঠাৎ ফাহিম মাথা তুলল।তার চোখেমুখে তখন দ্বিধা নেই।কণ্ঠটা কিছুটা কাঁপলেও কথাগুলো ছিল একেবারে স্পষ্ট।
— ফুপ্পি, ফুপা!আমি ইনায়াকে বিয়ে করতে চাই।
কথাটা যেন ঘরের মাঝখানে এসে থেমে গেল।এক মুহূর্তে সবকিছু নিস্তব্ধ।ইরাবতীর হাতে থাকা কাপটা মাঝপথে থেমে গেল।আব্দুল ইসলাম বিস্ময়ে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে রইলেন।ঈশা, যে এতক্ষণ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, সেও চোখ বড় বড় করে তাকাল।
আর ইনায়া?সে যেন কথাটার অর্থই বুঝে উঠতে পারল না।কয়েক সেকেন্ড পর তার মুখ থেকে খুব আস্তে বের হলো—
— ফাহিম ভাইয়া...!
ফাহিম এবার ইনায়ার দিকে তাকাল।তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। তবে সেই দৃঢ়তার নিচে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের অপ্রকাশিত অনুভূতি আর হারিয়ে ফেলার ভয়।ইরাবতী প্রথমে কোনো কথা বলতে পারলেন না।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— তুই কী বললি, ফাহিম?
ফাহিম এবার একটু সামলে নিয়ে বলল,
— আমি জানি, কথাটা হঠাৎ শুনে তোমাদের অবাক লাগছে। কিন্তু আমি হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত নিইনি।আমি অনেক আগে থেকেই ইনায়া কে ভালো বাসি!
আব্দুল ইসলাম গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন।
— তুই কি ভেবে-চিন্তেই বলছিস?
ফাহিম মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ, ফুপা।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
— আমি চাই না ইনায়ার জন্য অন্য কোথাও কথা এগিয়ে যাক। যদি আপনারা রাজি থাকেন, তাহলে আমি নিজেই ওকে বিয়ে করতে চাই।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।সে এতক্ষণ একেবারে নিশ্চুপ ছিল।তার মাথায় যেন একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরছে।ফাহিম তাকে বিয়ে করতে চায়?কখন থেকে?কেন?আর সবচেয়ে বড় কথা—তার নিজের মতামতটা কোথায়?
ইরাবতী ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে তাকালেন।মেয়ের মুখে বিস্ময়, অস্বস্তি আর দ্বিধা স্পষ্ট।তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় ইনায়া নেই।আব্দুল ইসলামও দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললেন,
— ফাহিম, বিয়ে জীবনের খুব বড় সিদ্ধান্ত। শুধু তুই চাইলেই তো হবে না। ইনায়ার মতামতও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফাহিম মাথা নিচু করল।
— আমি জানি, ফুপা।
তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি কিছুই চাই না।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।আর ইনায়া বসে রইল নির্বাক।কিছুক্ষণ আগেও যে শুক্রবারটাকে সে একেবারে সাধারণ একটা ছুটির দিন ভেবেছিল, সেই দিনটাই হঠাৎ তার জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—ফাহিম ভাইয়া আমাকে বিয়ে করতে চায়!
কিন্তু তার নিজের মন সেটা যেন অন্য কোথাও, অন্য কারও নামের কাছে গিয়ে থেমে আছে।
To be continue...........