ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের শেষ কিস্তিমাত

১২তম পর্ব

লেখক: Farzana Yesmin

#প্রেমের_শেষ_কিস্তিমাত

#লেখনিতে_ফারজানা_ইয়াসমিন
#পর্ব_১১
❌অনুমতি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ❌
_______________________________________
দেখতে দেখতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এলো।একটার পর একটা ক্লাস, শিক্ষকদের লেকচার, বন্ধুদের সঙ্গে টুকটাক আড্ডা—সব মিলিয়ে সময়টা যেন চোখের পলকেই কেটে গেল।
তবে পুরোটা সময় জুড়েই ইনায়ার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল একটা কথাই।বিকাল চার টা কখন বাজবে।আবার সে নিজের উপরই বিরক্ত হচ্ছে।
ক্লাস শেষ হতেই লামিহা ব্যাগটা কাঁধে তুলে ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল।দুষ্টু হেসে বলল,
— চল, সিনিয়র ভাইয়ার কাছে পড়তে যাই।
ইনায়া বিরক্ত মুখে তাকাল।
— তুই এমনভাবে বলছিস কেন? মনে হচ্ছে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে যাচ্ছি!
লামিহা হেসে ফেলল।
— তা না হলে? সকাল থেকে তোকে দেখছি। কখনও ভ্রু কুঁচকাচ্ছিস, কখনও আবার কী যেন ভাবছিস।
— বেশি বুঝিস।
— হুম, তোর ব্যাপারে একটু বেশিই বুঝি।
আরিয়া আর ফিজাও তখন তাদের সঙ্গে এসে যোগ দিল।ফিজা মজা করে বলল,
— আমরাও যাব। এত নাম শুনলাম, দেখি তো ইয়াশ ভাইয়া আসলে কেমন!
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— না। সবাই গেলে উনি অস্বস্তি বোধ করবেন। আমি আর লামিহা যাচ্ছি।
আরিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— ঠিক আছে, যাও। পরে কিন্তু সব খুলে বলবি।
দু'জনকে বিদায় জানিয়ে ইনায়া আর লামিহা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির দিকে হাঁটতে শুরু করল।বিকেলের নরম আলোয় পুরো ক্যাম্পাসটা অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। কোথাও গিটার বাজছে, কোথাও ছোট ছোট দলে বসে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দু'জনে লাইব্রেরির সামনে এসে পৌঁছাল।
ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের নীরবতা যেন মুহূর্তেই মনকে শান্ত করে দিল।সারি সারি বুকশেলফ।কাঠের বড় বড় টেবিল।প্রতিটি টেবিলে মাথা নিচু করে পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা।ইনায়ার দৃষ্টি পুরো রিডিং রুমে একবার ঘুরে গেল।
কিন্তু ইয়াশকে কোথাও দেখা গেল না।সে ঘড়ির দিকে তাকাল।চারটা পাঁচ।ভ্রু কুঁচকে গেল।
— এখনও আসেনি নাকি?
লামিহা হালকা হেসে বলল,
— আরও একটু অপেক্ষা কর। পাঁচ মিনিটেই মানুষকে দোষ দেওয়া ঠিক না।
ঠিক তখনই লাইব্রেরির কাঁচের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।কালো ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে ভেতরে ঢুকল ইয়াশ।তার সঙ্গে রয়েছে আদি।ভেতরে ঢুকেই ইয়াশ চারপাশে একবার তাকাল।তারপর চোখ গিয়ে থামল ইনায়ার ওপর।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।আদিও সঙ্গে ছিল, তবে কাছে এসেই মুচকি হেসে বলল,
— আমি ক্যান্টিনে থাকছি। তোরা পড়াশোনা কর।
কথাটা বলে আদি আর দাঁড়াল না।সে বুঝে গিয়েছিল, এই মুহূর্তে তার উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়।সে একবার লামিহার দিকে তাকিয়ে বলল, 
— এই মেয়ে!তুমি এখানে থেকে কি করবে?
লামিহা থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল,
— আমি? 
— হুম বাইরে চলো।
লামিহা বিরক্ত হলো।এখানে থাকলে কি সমস্যা।নেহাত সিনিয়র হয় তাই কিছু বলল না। চুপচাপ বের হয়ে গেল। কিন্তু মনে মনে গালি দিতে ভুলল না। 
ইয়াশ টেবিলের অপর পাশে চেয়ার টেনে বসল।শান্ত গলায় বলল,
— কোন বিষয় থেকে শুরু করবে মিস ইনায়া?
আজও কোনো দুষ্টুমি নেই।শুধু একজন সিনিয়র আর একজন জুনিয়রের পড়াশোনার আলোচনা।ইনায়া ব্যাগ থেকে খাতা আর বইগুলো বের করতে বের করতে মনে মনে ভাবল—
"আজকে লোকটাকে একদম অন্যরকম লাগছে..."
লাইব্রেরির রিডিং রুমটা তখন সম্পূর্ণ নীরব।এসি'র মৃদু শব্দ আর বইয়ের পাতা ওল্টানোর আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। জানালার বাইরে বিকেলের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।ইয়াশ টেবিলের ওপর ইনায়ার খাতাগুলো টেনে নিল।একটার পর একটা পাতা উল্টে দেখতে লাগল।
মাঝেমধ্যে কোনো একটা টপিকে দাগ টানছে, কোথাও আবার ছোট করে কিছু লিখে দিচ্ছে।সবকিছু এত মনোযোগ দিয়ে করছিল যে, মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে পৃথিবীতে তার কাছে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো কাজ নেই।
কিছুক্ষণ পর সে মাথা তুলে বলল,
— এক সপ্তাহে মোট সাতটা টপিক মিস করেছেন। এর মধ্যে তিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আগে বুঝে নিতে হবে। বাকিগুলো পরে করলেও সমস্যা হবে না।
ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।সে ভেবেছিল ইয়াশ হয়তো শুধু নোটস দেখেই পড়া শুরু করবে।কিন্তু ছেলেটা আগে পুরো সিলেবাসটা বিশ্লেষণ করে নিল।
ইয়াশ নিজের ব্যাগ থেকে একটি সাদা কাগজ বের করল।তারপর খুব সুন্দর হাতের লেখায় সাতটি টপিক আলাদা করে লিখে পাশে তারকা চিহ্ন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করল।
— দেখো, পড়াশোনা কখনো একসঙ্গে সব করার চেষ্টা করবে না। তাহলে কিছুই মাথায় থাকবে না। আগে বেসিকটা পরিষ্কার করবে। তার পর ধীরে ধীরে বাকি অংশ।
ইনায়া চুপচাপ শুনছিল।কথাগুলো বলার সময় ইয়াশের কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক ধৈর্য।একটুও বিরক্তি নেই।একটুও অহংকার নেই।শুধু একজন ভালো শিক্ষক যেমন করে বোঝায়, ঠিক তেমন।প্রথম টপিকটা বুঝিয়ে শেষ করতেই ইয়াশ খাতা বন্ধ করে বলল,
— এবার তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলো।
ইনায়া থমকে গেল।
— আমি?
— হ্যাঁ। তুমি যদি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারো, তাহলে বুঝব বিষয়টা সত্যিই বুঝেছো। মুখস্থ করলে হবে না, ধারণাটা পরিষ্কার হতে হবে।
ইনায়া ইতস্তত করলেও ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।প্রথমে কয়েক জায়গায় ভুল করল।ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিল না।সে ধৈর্য ধরে পুরোটা শুনল।তারপর ভুলগুলো খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিল।একসময় ইনায়া নিজেই অবাক হয়ে গেল।যে বিষয়টা সকালে তার কাছে ভীষণ কঠিন মনে হচ্ছিল, এখন সেটাই কত সহজ লাগছে!
প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেল।তারা টেরই পেল না সময় কখন সন্ধ্যার দিকে গড়িয়ে গেছে।শেষ নোটটা লিখে দিয়ে ইয়াশ খাতাটা ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিল।
— আজ এতটুকুই। এগুলো ভালো করে পড়বে। কাল যদি কোনো অংশ বুঝতে সমস্যা হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করবে।
ইনায়া খাতাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীর স্বরে বলল,
— ধন্যবাদ,সত্যি বলতে, এত সহজ করে কেউ কোনোদিন আমাকে বুঝিয়ে দেয়নি।
ইয়াশ হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
— ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। সিনিয়র হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব।
কথাটা শুনে ইনায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে হঠাৎ বলেই ফেলল,
— আজ... আমাকে "অচেনা বউ" বললেন না যে?
প্রশ্নটা শুনে ইয়াশের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— আমি তো ভেবেছিলাম, আপনি মনে মনে এই কথাটাই খুঁজছিলেন।
ইনায়া বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।ইয়াশ মুচকি হেসে আবার বলল,
— পড়াশোনার সময় ছাত্র-ছাত্রীর পরিচয়টাই বড়। তাই তখন আপনি শুধু আমার জুনিয়র ছিলেন।
একটু থেমে, চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমির ঝিলিক ফিরিয়ে খুব আস্তে যোগ করল,
— তবে ক্লাসের বাইরে বের হলেই হিসাব আলাদা।তখন তো আপনি আমার সেই চিরচেনা "অচেনা বউ"।
কথাটা শেষ হতেই ইনায়ার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।সে বিরক্তি দেখানোর চেষ্টা করলেও ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল—
"এই মানুষটার ভালো দিকগুলো দেখলেই কেন আবার এই দুষ্টু স্বভাবটা সামনে চলে আসে!"
ইনায়া কিছুক্ষণ খাতার পাতার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর যেন হঠাৎ করেই কিছু মনে পড়ল। ধীরে ধীরে মুখ তুলে ইয়াশের দিকে তাকাল।তার কণ্ঠে এবার আর আগের অস্বস্তিটা নেই। বরং ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক কৌতূহল।
— অবনি, লিহাব আর বাসার সবাই কেমন আছে?
প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ কলমটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল।
সে একবারও ইনায়ার দিকে তাকাল না।শান্ত, সংক্ষিপ্ত স্বরে শুধু বলল,
— ভালো।
ছোট্ট উত্তরটুকু শুনে ইনায়া মাথা নাড়ল।
— ওহ! আর... আপনি?
এই প্রথম ইয়াশ মুখ তুলে তাকাল।দু'জনের চোখ আবারও এক হয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ডের সেই নীরব দৃষ্টিবিনিময়ের পর ইয়াশের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।সে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে এল।দু'জনের মাঝের দূরত্বটা যেন অজান্তেই একটু কমে গেল।
গভীর অথচ মৃদু স্বরে বলল,
— দেখে কি মনে হচ্ছে?
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে ইনায়া একেবারে থমকে গেল।তার বুকের ভেতরটা যেন আচমকাই কেঁপে উঠল।কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা একদম গম্ভীর, পরিণত এক সিনিয়রের মতো পড়াচ্ছিল, মুহূর্তের মধ্যেই সে আবার সেই চিরচেনা দুষ্টু ইয়াশ হয়ে উঠেছে।
ইনায়া তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলল।গাল দুটো অকারণেই হালকা লাল হয়ে উঠেছে।কী উত্তর দেবে, কিছুই মাথায় এলো না।
মিনমিনে গলায় শুধু বলল,
— আমি... আমি যাই। বাসায় তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে।
কথাটা বলেই সে দ্রুত খাতা, বই আর কলমগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নিতে লাগল।তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একটা কলম হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে গেল।ইয়াশ কিছু না বলে নিচু হয়ে কলমটা তুলে নিল।
তারপর ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— এত তাড়া করার দরকার নেই। ক্যাম্পাস তো আর কোথাও চলে যাচ্ছে না।
ইনায়া কলমটা নিয়ে আস্তে করে বলল,
— থ্যাংক ইউ।
এরপর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।প্রায় ছোট ছোট পায়ে লাইব্রেরির দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।দরজার কাছে গিয়ে একবার অজান্তেই পেছন ফিরে তাকাল।ইয়াশ তখনও একই জায়গায় বসে আছে।তবে এবার তার চোখ বইয়ের ওপর নয় স্থির হয়ে আছে ইনায়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে।
দু'জনের চোখ আরেকবার মিলতেই ইনায়া দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।তার চলে যাওয়ার পরও কয়েক মুহূর্ত নীরবে বসে রইল ইয়াশ।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— তুই শেষ পর্যন্ত পড়া বুঝিয়েছিস, নাকি অন্য কিছু?
আদি কখন যে ফিরে এসেছে, ইয়াশ খেয়ালই করেনি।ইয়াশ মুচকি হেসে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
— পড়াই বুঝিয়েছি।
আদি ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— তাই নাকি? তাহলে লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার সময় ইনায়ার গাল এত লাল ছিল কেন?
ইয়াশ এবার হেসে ফেলল।তবে কোনো উত্তর দিল না।তার সেই নীরব হাসিটাই যেন আদির প্রশ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর হয়ে রইল।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসতেই বিকেলের আলো অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে। কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে, আর ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে দিনের শেষ ব্যস্ততা।
ব্যাগের স্ট্র্যাপটা কাঁধে ঠিক করতে করতে ধীর পায়ে হাঁটছিল ইনায়া।তার পা সামনে এগোলেও মনটা যেন বারবার লাইব্রেরির দিকেই ফিরে যাচ্ছে।
"দেখে কি মনে হচ্ছে?"
ইয়াশের বলা কথাটা কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।মেয়েটা বিরক্ত হয়ে নিজের কপালে আলতো চাপ দিল।
— উফ! লোকটার আর কোনো কাজ নেই। দুই মিনিট ভালো হয়ে থাকলেই আবার শুরু করে দেয়।
তবুও নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।ঠিক তখনই পাশে এসে হাঁটতে শুরু করল লামিহা।সে এতক্ষণ লাইব্রেরির বাইরেই অপেক্ষা করছিল।ইনায়ার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই তার ভ্রু দুটো নেচে উঠল।
— কেমন পড়া বুঝলি? 
ইনায়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
— ভালোই বোঝান।
লামিহা আর কিছু বলল না।দু'জন পাশাপাশি হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে চলল।লামিহা আর ইনায়ার গন্তব্য একদিকে না হওয়ায় কিছুক্ষণ পর তাদের আলাদা হয়ে যেতে হলো।
ইনায়া কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের ফোনটা বের করে রাইডের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এলো।অপরিচিত নম্বর নয়।অর্ণবের নাম্বার।সকালেই ইনায়া তার নাম্বার নিয়ে সেভ করে রেখেছিল।
> "আজকের নোটসগুলো পেয়েছ? ইয়াশ ভাইয়া যেগুলো বুঝিয়েছেন, সেগুলো ঠিকমতো পড়ে নিও।"
ইনায়া ছোট্ট করে উত্তর দিল—
> "হ্যাঁ, পেয়েছি।তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।"
মেসেজ পাঠিয়ে ফোনটা ব্যাগে রাখতে গিয়েও থেমে গেল।হঠাৎ মনে হলো, ইয়াশকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ছিল।আজ এতটা সময় দিয়ে পড়িয়েছে। অথচ শেষে সে শুধু তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছে।কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেও কোনো মেসেজ লিখল না।কী লিখবে?
"ধন্যবাদ"?
এতটুকু লিখলে কি অদ্ভুত লাগবে?আবার বেশি কিছু লিখলে যদি ইয়াশ উল্টো তাকে খেপানো শুরু করে?পরক্ষণেই মনে পড়লো তার কাছে তো ইয়াশের নাম্বারই নেই।ভাবতে ভাবতেই ইনায়া বিরক্ত হয়ে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল।
— থাক! কাল দেখা হলে বলব।
________
বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কিং থেকে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেছে ইয়াশ।আদি নিজের বাইকে তার পাশে।কিছুদূর যাওয়ার পর আদি হঠাৎ বলল,
— আজ বাড়ি যাবি তো?
— হুম।
— সরাসরি?
— হ্যাঁ। কেন?
আদি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হাসল।
— কিছু না। ভাবছিলাম, ইনায়ার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার কোনো প্ল্যান আছে কিনা।
ইয়াশ এবার বিরক্ত চোখে তাকাল।
— আদি!
— আচ্ছা আচ্ছা, চুপ।
আদি হেসে সামনে তাকাল।কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর ইয়াশ তাকে বলল,
— আদি?
— বলে ফেল।
— ওর বাড়ির ঠিকানা তো জানি না!
ইয়াশ বাইকের গতি সামান্য কমিয়ে দিল।
— একটা কাজ কর?অবনি কে গিয়ে বল তোমার আপুর সাথে দেখা হয়েছিল।তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছিল।চলো তোমাকে নিয়ে যাই। ব্যস পেয়ে গেলি।
ইয়াশ হঠাৎই গম্ভীর হয়ে বলল, 
— ফালতু মেয়ের জন্য টাইম ওয়েস্ট করে আমার লাভ নেই। 
আদি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।কারণ সে জানে, ইয়াশ মুখে যতই অস্বীকার করুক, তার আচরণ বরাবরই কথার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যে মানুষটা কয়েক মিনিট আগেও ইনায়াকে নিয়ে এত হিসাব করছে, সেই মানুষটাই এখন তাকে ‘ফালতু মেয়ে’ বলে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে।
আদি মৃদু হেসে সামনে তাকিয়ে রইল।কিছুক্ষণ দু'জনের মাঝে নীরবতা নেমে এলো।শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেছনে ফেলে বাইক এগিয়ে চলল। সন্ধ্যার বাতাসে ইয়াশের চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। রাস্তার আলো একটার পর একটা পেছনে ছুটে যাচ্ছে।
হঠাৎ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ইয়াশের গলা ভেসে উঠল।বাইক চালাতে চালাতেই সে গুনগুন করে গান ধরল—
— কোথায় পাবো বল...!
কোন খানে তুই...!
কোথায় তোরই দেশ...!
আজ যাবোই...!
আদি চমকে তার দিকে তাকাল।কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা এত গম্ভীর হয়ে ইনায়ার কথা অস্বীকার করছিল, সেই মানুষটাই এখন নিজের অজান্তে গানের সুরে ডুবে গেছে।ইয়াশ কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর আবার ধীর কণ্ঠে গেয়ে উঠল—
— ভেবেই কেটেছে প্রহর...
আমি তো হয়ে গেছি তোর...
জেগে রয়েছি রাত ভোর...
আমি তো হয়ে গেছি তোর...
আমি তো হয়ে গেছি তোর...
শেষ কথাটা বলার পর তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে থেমে গেল।
আদি আর কিছু বলল না।শুধু মুখে চাপা হাসি নিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল।
কারণ ইয়াশ যতই বলুক—
“ফালতু একটা মেয়ের জন্য টাইম ওয়েস্ট করে আমার কোনো লাভ নেই,”
তার গাওয়া গান যেন তার নিজের কথাকেই মিথ্যে প্রমাণ করে দিচ্ছিল।
,
সন্ধ্যার ব্যস্ততা ধীরে ধীরে রাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।মিরপুরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখনও মানুষের কোলাহলে মুখর। অফিসফেরত মানুষের ভিড়, রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানে জ্বলে ওঠা হলুদ বাতি, খাবারের দোকানগুলো থেকে ভেসে আসা নানা রকম গন্ধ—সব মিলিয়ে শহরটা যেন সারাদিনের ক্লান্তির পরও বিশ্রাম নিতে রাজি নয়।
গাড়ির জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বসে ছিল ইনায়া।কাঁচের ওপাশে ছুটে চলা শহরটাকে সে আনমনে দেখছিল। কোথাও ট্রাফিকের লাল আলোয় সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও আবার রিকশার ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো অন্ধকারের মধ্যে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।সারাদিনের ব্যস্ততায় শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, শরীর ক্লান্ত হলেও মনটা যেন একেবারেই শান্ত হচ্ছে না।বারবার একটা মুখই চোখের সামনে ভেসে উঠছে।তাসফিন খান ইয়াশ।
সকালের সেই অপ্রস্তুত দেখা।ওড়নার একটুখানি অংশ তার শার্টের বোতামে আটকে যাওয়া।তারপর কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অন্যায় করা ছেলেটাকে কঠোরভাবে সতর্ক করা আর বিকেলের লাইব্রেরি।ইয়াশের ধৈর্য ধরে তাকে পড়ানো।সবশেষে সেই দুষ্টু হাসি আর প্রশ্ন—
"দেখে কি মনে হচ্ছে?"
ইনায়া বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।মনে মনে নিজেকেই ধমক দিল।
"কী দরকার ছিল এত কিছু ভাবার?"
সে জানালার বাইরে তাকাল।
"লোকটা তো এমন কিছু করেনি। পড়া বুঝিয়ে দিয়েছে, ব্যস। এর মধ্যে এত ভাবার কী আছে?"
কিন্তু নিজের মনকে বোঝানো যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, বাস্তবে ততটা সহজ হলো না।অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।পরক্ষণেই আবার সেটা মিলিয়েও গেল।
প্রায় কিছুক্ষণ পর গাড়ি তাদের আবাসিক এলাকার সামনে এসে থামল।ইনায়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
মিরপুরের ব্যস্ত রাস্তার তুলনায় এই অংশটা অনেক শান্ত। গেটের সামনে নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে সাজানো ছোট ছোট গাছ, পথের দু'পাশে নরম আলো জ্বলছে। উঁচু ভবনগুলোর জানালায় একে একে আলো জ্বলে উঠেছে।
গাড়ি পার্কিংয়ে ঢুকতেই ইনায়া যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।নিজের বাড়িতে ফিরলে একটা আলাদা শান্তি কাজ করে।যত বড় শহরই হোক, যত ব্যস্ততাই থাকুক, দিনের শেষে নিজের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার অনুভূতিটা অন্যরকম।গাড়ি থেকে নেমে ইনায়া ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
লিফটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার পায়ের গতি ধীরে হয়ে এলো। সারাদিনের ক্লান্তি এবার যেন শরীরের প্রতিটি অঙ্গে টের পাওয়া যাচ্ছে।লিফটে উঠে সে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল।চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো।মুখে ক্লান্তির ছাপ।চোখের নিচে সামান্য ভারীভাব।
ইনায়া নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে মৃদু হেসে ফেলল।
— আজকে সত্যিই অনেক ধকল গেছে।
লিফটের দরজা খুলতেই সে বেরিয়ে এলো।কয়েক পা এগিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে ব্যাগ থেকে চাবি বের করার আগেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল।তার ইরাবতী দাঁড়িয়ে আছেন।মেয়েকে দেখেই মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।
— এসেছিস? এত দেরি হলো কেন?
ইনায়া জুতো খুলতে খুলতে বলল,
— এক সপ্তাহের পড়া জমে গিয়েছিল। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, সে বেশ ক্লান্ত।
— আগে ভেতরে আয়। ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হয়ে নে। খাবার দেওয়া আছে।
ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।ফ্ল্যাটটায় ঢুকতেই পরিচিত ঘরোয়া উষ্ণতা তাকে ঘিরে ধরল।এটা তাদের নিজেদের ফ্ল্যাট—তার বাবা আব্দুল ইসলামের নিজের সম্পত্তি। মিরপুরের ব্যস্ততার মাঝেও ফ্ল্যাটটার ভেতরে একটা শান্ত, পরিপাটি পরিবেশ সবসময় বজায় থাকে।
ড্রয়িংরুমের বড় জানালাগুলো দিয়ে রাতের শহরের আলো দেখা যায়। দেয়ালের একপাশে পরিবারের পুরোনো কিছু ছবি সাজানো। সোফার পাশে রাখা ছোট্ট ইনডোর প্ল্যান্টগুলো ঘরটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।সেন্টার টেবিলের ওপর কয়েকটি বই, একটা ফুলদানি আর আব্দুল ইসলামের পড়া শেষ না হওয়া পত্রিকা রাখা।সবকিছু এত পরিচিত!এত আপন!
ইনায়া কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল।সারাদিনের বাইরে থাকার পর এই ঘরটায় ফিরলেই যেন তার ভেতরের অস্থিরতা একটু একটু করে কমে আসে।ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ছিলেন আব্দুল ইসলাম।মেয়েকে দেখে পত্রিকাটা নামিয়ে রাখলেন।
— কেমন গেল আজকের দিন?
ইনায়া ব্যাগটা সোফার পাশে রেখে বাবার কাছে গিয়ে বসল।
— ভালো। তবে অনেক পড়া জমে গেছে।
— এক সপ্তাহ তো ছিলি না। জমবে না?
ইনায়া হেসে ফেলল।
— সেটাই তো সমস্যা। সব একসঙ্গে ধরতে গিয়ে মাথা ঘুরে যাচ্ছে।
আব্দুল ইসলাম মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— ধীরে ধীরে করবি। সবকিছু একদিনে শেষ করতে হবে এমন তো নয়।
ইনায়া মাথা নাড়ল।বাবার সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত গল্প করার পর সে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই ব্যাগটা বিছানার পাশে রেখে দিল।তার ঘরটাও বাড়ির বাকি অংশের মতোই পরিপাটি। জানালার পাশে পড়ার টেবিল, টেবিলের ওপর সাজানো বই-খাতা, একপাশে ছোট্ট ল্যাম্প। দেয়ালের তাকজুড়ে বিভিন্ন বই। জানালার পর্দা সরিয়ে দিলে দূরের ভবনগুলোর আলো দেখা যায়।
ইনায়া বিছানার উপর উঠে বসলো। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রাখল।আজকের দিনটা যেন একসঙ্গে মাথায় ফিরে এলো।বিশেষ করে বিকেলের লাইব্রেরিটা।ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে ব্যাগ খুলল।সবার আগে বেরিয়ে এলো তার নোটের খাতা।খাতাটা টেবিলের ওপর রাখতেই তার চোখ পড়ল প্রথম পাতায়।পরিপাটি হাতের লেখা।
প্রতিটি বিষয় সুন্দর করে সাজানো।কোথাও গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করা।কোথাও ছোট করে ব্যাখ্যা লেখা।ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।তারপর নিজের অজান্তেই বলল,
— মানুষটা এত সুন্দর করে পড়ায় কীভাবে?
কথাটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার পরই সে থমকে গেল।নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল।
— আমি আবার ওনার প্রশংসা করছি কেন?আজাইরা লোক একটা।
তাড়াতাড়ি খাতাটা বন্ধ করে দিল।কিন্তু মনটা তখনও শান্ত হলো না।হঠাৎ তার মনে পড়ল, আজ ইয়াশ একবারও তাকে অকারণে বিরক্ত করেনি।বরং পুরো সময়টুকু ভীষণ ভদ্র ছিল।শুধু শেষ মুহূর্তে আবার সেই দুষ্টুমি।ইনায়ার মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল।
সে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।মনের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।এটা বন্ধুত্ব নয়।আবার বিরক্তিও নয়।নামটাও সে জানে না।শুধু জানে—আজকের আগে তাসফিন খান ইয়াশ ছিল তার কাছে একজন বিরক্তিকর,অহংকারী মানুষ।আর আজকের পর থেকে মানুষটার আরেকটা পরিচয় সে জেনে গেছে।একজন দায়িত্বশীল সিনিয়র।কিন্তু সেই পরিচয়টাই কেন তার মনে এতটা জায়গা করে নিচ্ছে, তার উত্তর ইনায়া নিজেও জানে না।ঠিক তখনই বাইরে থেকে মায়ের ডাক ভেসে এলো—
— ইনায়া, খাবি না মা?
ইনায়া উঠে দাঁড়াল।আয়নার সামনে গিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করল।তারপর খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। 
ইনায়া ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। সারাদিন বাইরে থাকার পর এবার সত্যিই বেশ ক্ষুধা লাগছিল। ডাইনিং স্পেসে ঢুকতেই তার ছোট বোন ঈশাকে দেখা গেল বাবার পাশের চেয়ারে বসে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত।ইনায়াকে দেখেই ঈশার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— আপু! অবশেষে তোমার আসার সময় হলো?
ইনায়া চেয়ার টেনে বসতে বসতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন? আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি নাকি?
ঈশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— একদম না। আমি তো ভাবছিলাম তুমি আজকে বিশ্ববিদ্যালয়েই রাত কাটাবে।
কথাটা শুনে আব্দুল ইসলাম হেসে ফেললেন।
— তোমার বোনকে দেখছি আজকাল বেশ কথা শিখেছে।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বাবার দিকে তাকাল।
— বাবা, দেখেছ? তোমার মেয়েটা আমাকে একটুও সম্মান করে না।
ঈশা প্রতিবাদ করে উঠল,
— আমি তো সত্যিই বলেছি!
— আচ্ছা? তাহলে আজকে তোর জন্য যে চকলেট এনেছিলাম, সেটা আর দেব না।
চকলেটের কথা শুনতেই ঈশার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
— আপু! সত্যি এনেছ?
ইনায়া ইচ্ছে করেই গম্ভীর মুখ করে বলল,
— না।
— আপু!
ঈশার হতাশ মুখ দেখে ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হেসে ফেলল। ছোট্ট একটা চকলেট এনে ঈশার দিকে বাড়িয়ে দিতেই ঈশা সেটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বোনের গালে চুমু দিয়ে দিল।
— আমার আপু সবচেয়ে ভালো!
আব্দুল ইসলাম হেসে মাথা নাড়লেন।
— চকলেটের বিনিময়ে ভালোবাসা!
ইনায়া বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনিও চাইলে একটা দিতে পারি।
— আমার জন্য কী আছে?
— আপনার জন্য? অনেক আদর আছে।
কথাটা বলে ইনায়া বাবার কাঁধে মাথা রাখতেই আব্দুল ইসলাম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ডাইনিং টেবিলের চারপাশে তখন বেশ আনন্দের পরিবেশ। ইরাবতী একে একে খাবার পরিবেশন করছিলেন। মেয়েদের খুনসুটি আর স্বামীর সঙ্গে তাদের হাসি-ঠাট্টা দেখে তার মুখেও মায়ামাখা হাসি ফুটে উঠেছিল।কিছুক্ষণ পর সবাই খাওয়ায় মন দিল।হঠাৎ ইরাবতী কথার ফাঁকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
— অবনির তো বিয়ে হয়ে গেল। ইনায়ারটাও দিতে হয়, কী বলো?
চামচ হাতে থেমে গেল ইনায়া।ঈশা সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে বোনের দিকে তাকাল।আব্দুল ইসলামও মৃদু হেসে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।আর ইনায়া?তার চোখ দুটো মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল।
— আমার আবার বিয়ে কেন?
ইরাবতী হেসে বললেন,
— কেন, তোর কি বিয়ে হবে না? সারাজীবন বাবার বাড়িতে বসে থাকবি?
ইনায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
— হ্যাঁ! থাকব। বাবার বাড়িতে থাকব, বাবার টাকা খাব, ঈশার সঙ্গে ঝগড়া করব—আমার বেশ ভালোই চলবে।
ঈশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— হুম! আপু আমার সাথেই থাকবে।
আবারও টেবিলজুড়ে হাসির রোল উঠল।ইরাবতী মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— তুই যতই বলিস, একদিন কিন্তু তোকে নিজের ঘর ছেড়ে অন্য একটা বাড়িতে যেতে হবে।
ইনায়া আর কিছু বলল না।কথাটা শুনে অদ্ভুতভাবে তার মনে পড়ে গেল অবনির কথা।তারপর অকারণেই মনে পড়ল ইয়াশের মুখটা।সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাটা সরিয়ে দিল।নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে ভাতের প্লেটে মন দিল ইনায়া।
ইরাবতী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও কথাটা তুললেন। তাঁর গলায় এবার মায়ের স্বাভাবিক চিন্তার ছাপ।
— ইনায়ার আব্বু! তোমাকে বলি, তুমি ছেলে দেখা শুরু করো। মেয়ে আমার কম বড় হয়নি।
কথাটা শুনে ইনায়ার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। বিয়ের কথা সে আগেও শুনেছে। অবনির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে আত্মীয়স্বজনের মুখে কথাটা মাঝেমধ্যেই উঠছে। কিন্তু আজ সারাদিনের ক্লান্তির পর, যখন নিজের ঘরে ফিরে একটু শান্ত হতে চেয়েছিল, তখন আবার একই প্রসঙ্গ শুনে তার আর ভালো লাগল না।
ইরাবতী হয়তো মেয়ের মুখের পরিবর্তনটা খেয়ালই করেননি। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বলে চললেন,
— অবনির বিয়ে হয়ে গেল। এবার ইনায়ার ব্যাপারটাও ভাবতে হবে। মেয়েকে তো আর সারাজীবন ঘরে বসিয়ে রাখা যায় না।
ইনায়া আর খেতে পারল না।সে চেয়ারটা ধীরে ধীরে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।আব্দুল ইসলাম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কথাগুলো তার ভালো লাগছে না।
— ইনু, খাওয়া শেষ করলি না কেন?
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।শুধু খুব শান্ত গলায় বলল,
— আমার আর খেতে ইচ্ছে করছে না, বাবাই।
তারপর আর কারও দিকে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে ডাইনিং থেকে বেরিয়ে গেল।ঈশা বোনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল।ইরাবতীর মুখেও এবার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
— আমি কি বেশি বলে ফেললাম?
আব্দুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
— তুমি জানো তো, ইনু এসব ব্যাপারে এখনই কথা শুনতে চায় না। একটু সময় দাও ওকে।
ইরাবতী আর কিছু বললেন না।
এদিকে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল ইনায়া।ব্যাগটা যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে রইল। সে বিছানার কিনারায় গিয়ে বসে পড়ল।কিছুক্ষণ আগে যে ঘরটাকে এত আপন মনে হচ্ছিল, হঠাৎ করেই সেটাকে অদ্ভুত নির্জন লাগতে শুরু করল।তার বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তিটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।অবনির বিয়ে হয়ে গেছে—এটা সত্যি।কিন্তু তাই বলে তার জীবন নিয়েও সবাইকে এত তাড়াহুড়ো করতে হবে কেন?সে তো এখনও নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা!
হঠাৎ করেই বিয়ে, ছেলে দেখা—এই কথাগুলো যেন তার নিজের জীবনটাকেই অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার মতো মনে হলো।ইনায়া বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
To be continue............ 
(সবাই রেসপন্স করে।মন ভালো থাকলে কালকেও গল্প দিবো।এমনেই গল্প দিতে ইচ্ছা করে না তার মধ্যে তোমরাও কেউ উৎসাহ দেও না।ভালো লাগে না কিছু।ভুল ক্রুটি হলে ক্ষমা করে দিও।কাঁচা হাতের লেখা।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন