👻 বন্ধ দরজার ওপাশে কে?
✍️ লেখিকা: রহস্যকন্যা
পাঠ ২ — দরজার ওপাশে আমার আরেকটি মুখ! 🥀
🌑 জমিদারবাড়ির রহস্যময় ঘর 🌑
রাত তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে।
ঘরের ভেতর চারদিকে ঘন অন্ধকার। মেঘলা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু দূরে কোথাও পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
টুপ... টুপ... টুপ...
মেঘলা কাঁপা গলায় ডাকল,
— রিমি! তুই কোথায়? আমাকে এখান থেকে বের কর!
কিন্তু বাইরে থেকে কোনো উত্তর এল না।
হঠাৎ ঘরের এক কোণে মৃদু আলো জ্বলে উঠল। মেঘলা তাকিয়ে দেখল, সেখানে একটি পুরোনো টেবিল রাখা। টেবিলের ওপর একটি মোমবাতি, কয়েকটি পুরোনো ছবি এবং একটি ডায়েরি।
সে ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—
নীলাঞ্জনা রায়।
মেঘলা অবাক হয়ে ফিসফিস করল,
— নীলাঞ্জনা! তাহলে এই ডায়েরিটা তার?
ঠিক তখনই তার পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
— আমার জিনিসে হাত দিচ্ছ কেন?
মেঘলা দ্রুত পেছনে ঘুরে দাঁড়াল।
সাদা পোশাকের সেই মেয়েটি!
মেঘলা ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
— তুমি কে? আমার মতো দেখতে কেন? আমাকে এখানে কেন এনেছ?
মেয়েটি শান্ত গলায় বলল,
— আমার নাম নীলাঞ্জনা। বিশ বছর আগে এই বাড়িতে আমার সঙ্গে এমন কিছু ঘটেছিল, যার সত্যিটা কেউ জানে না।
মেঘলা অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
— কিন্তু তুমি তো বিশ বছর আগে মারা গেছ! তাহলে এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ কীভাবে?
নীলাঞ্জনা মৃদু হাসল।
— সব মৃত মানুষ হারিয়ে যায় না, মেঘলা। কিছু মানুষ তাদের অসমাপ্ত গল্পের জন্য অপেক্ষা করে।
মেঘলা ডায়েরিটি হাতে তুলে নিল।
— আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি না। আমার জন্মের সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক কী?
নীলাঞ্জনা উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
ঠক! ঠক! ঠক!
বাইরে থেকে রিমির কণ্ঠ শোনা গেল।
— মেঘলা! দরজা খোল! আমি এসেছি!
মেঘলা আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
— রিমি! আমি এখানে! দরজাটা খোল!
কিন্তু নীলাঞ্জনা হঠাৎ মেঘলার মুখ চেপে ধরল।
— চুপ! বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোমার রিমি নয়!
মেঘলার চোখ বড় হয়ে গেল।
— কী বলছ তুমি?
বাইরে থেকে আবার ডাক এল।
— আপু, তাড়াতাড়ি দরজা খোল! আমার খুব ভয় করছে!
এবার কণ্ঠটি একেবারে রিমির মতো। মেঘলা দরজার দিকে এগোতেই নীলাঞ্জনা তার হাত ধরে ফেলল।
— তুমি যদি দরজা খোলো, তাহলে সে তোমার সঙ্গে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে।
মেঘলা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— তাহলে আমার রিমি কোথায়?
নীলাঞ্জনা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সে এখনো বাড়ির বাইরে আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ নিরাপদ থাকবে না।
হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে একটি কাগজ ভেতরে ঢুকে এল। মেঘলা কাগজটি তুলে খুলল।
সেখানে লেখা—
মেঘলা, তোমার মা তোমার আসল মা নয়।
লেখাটি পড়ে মেঘলার হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল।
— না! এটা মিথ্যা! আমার মা আমাকে খুব ভালোবাসে!
নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে বলল,
— তোমার মা তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু তিনি তোমার জন্মের পুরো সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছেন।
মেঘলা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
— আমার আসল মা কে?
নীলাঞ্জনা উত্তর না দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ছবিটি এগিয়ে দিল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি নবজাতক শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন এক মহিলা। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুরুষ। আশ্চর্যের বিষয়, মহিলাটির মুখ মেঘলার মায়ের মতো নয়, বরং নীলাঞ্জনার মতো।
ছবির পেছনে লেখা ছিল—
১৭ নভেম্বর, ২০০৯। আমাদের দুই রাজকন্যা।
মেঘলা অবাক হয়ে বলল,
— দুই রাজকন্যা মানে? আরেকজন কে?
নীলাঞ্জনার চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা ফুটে উঠল।
— সেই প্রশ্নের উত্তরই তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে।
ঠিক তখনই ঘরের আয়নায় একটি ছায়া দেখা গেল। মেঘলা পেছনে ফিরে তাকাল, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। আবার আয়নার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, তার নিজের প্রতিবিম্ব হাসছে।
অথচ মেঘলা হাসছে না!
প্রতিবিম্বটি ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল।
— দিদি... তুমি আমাকে চিনতে পারোনি?
মেঘলা ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
নীলাঞ্জনা তাড়াতাড়ি আয়নাটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল।
— সে জেগে উঠেছে! আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই!
মেঘলা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— কে জেগে উঠেছে?
নীলাঞ্জনা তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— তোমার যমজ বোন।
মেঘলা কিছু বলার আগেই ঘরের সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে এবার দুটি মেয়ের একসঙ্গে হাসির শব্দ ভেসে এল।
একটি কণ্ঠ বলল,
— নীলাঞ্জনা, তুমি আবার আমার বোনকে লুকিয়ে রেখেছ?
অন্য কণ্ঠটি বলল,
— এবার কিন্তু আমি ওকে নিয়ে যাব!
মেঘলা অনুভব করল, কেউ একজন তার হাত ধরেছে।
সে ভেবেছিল নীলাঞ্জনা তাকে বাঁচাতে এসেছে।
কিন্তু সেই হাতটি ছিল বরফের মতো ঠান্ডা।
তারপর কানের কাছে একটি ফিসফিসানি শোনা গেল—
— আপু, এবার বাড়ি চলো। আমি তোমার অপেক্ষায় বিশ বছর ধরে আছি!
— রহস্যের নতুন দরজা!
মেঘলা ভয়ে পেছনে সরে গেল। অন্ধকারের মধ্যে সে বুঝতে পারছিল না, কে তার হাত ধরে আছে।
“তুমি কে? আমার হাত ছাড়ো!”
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা পুরোনো ঘড়িটি বেজে উঠল। বারোটা এক মিনিট। নীলাঞ্জনা দ্রুত মেঘলার সামনে এসে দাঁড়াল।
“মেঘলা, চোখ বন্ধ করো! ওর দিকে তাকিয়ো না!”
কিন্তু ততক্ষণে মেঘলা চোখ খুলে ফেলেছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখ তার নিজের মতোই। শুধু চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।
মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,
“তুমি এতদিন মায়ের কাছে ছিলে, আর আমি একা এই অন্ধকারে! এবার আমাদের দেখা হওয়ার সময় শেষ। এবার তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে।”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি তোমাকে চিনি না!”
মেয়েটি উত্তর দিল,
“কিন্তু আমি তোমাকে জন্মের আগেই চিনতাম, আপু।”
হঠাৎ দরজার বাইরে রিমির চিৎকার শোনা গেল।
“মেঘলা! জানালার দিকে তাকাও! তোমার মা এসেছে!”
মেঘলা জানালার দিকে তাকাতেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
চলবে.