#বুঝে_না_এই_মন!
#নুসরাত_জাহান
(০২)
(০২)
ইরার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যায় রাইয়ান। ইরাকে ঘরের বাহিরে যেতে নিশেধ করে যায়।
ইরা রুমে গিয়ে কাঁদছে। ভাইয়ের উপর খুব অভিমান করেছে সে।
ইরা যে রুমে বসে কান্না করছিল, তখন সেই রুমের পাশ দিয়ে আদ্রিয়ান যাচ্ছিল। আদ্রিয়ান ইরাকে কাঁদতে দেখে বলে,
– ইরা, কান্না করছিস কেন?
– ভাইয়া বকেছে।
– আচ্ছা, এই ব্যাপার! চল, আমি রাইয়ানকে বলে দিবো আর বকবে না। এখন পেন্ডেলে চল।
– না, ভাইয়া রুমের বাহিরে যেতে মানা করছে।
– কেন মানা করছে? আমি রাইয়ানকে বলছি, একটা দিন মেয়েটাকে একটু আনন্দ করতে দিবে না।
আদ্রিয়ান রাইয়ানকে হচ্ছে মতো ঝেড়েছে। ইরা এখন সবার সাথে মজা করছে। সবাই যখন খেতে বসেছে, তখন বাহিরে একটা আওয়াজ। সবাই বলাবলি করছে, কেউ একজন এসেছে।
ইরার চাচি আম্মু কাকে যেন বলছে, নেওয়াজের হবু বউ এসেছে। ইরার মনে একটা কথা আসে,
– কে এই মেয়ে, যার জন্য সবাই এতো ব্যস্ত হয়ে গেছে?
ইরা খাওয়া শেষ করার আগেই মেয়েটা চলে গেছে, তাই ইরার মন খারাপ।
রাতে সব কাজিনরা এক সাথে ঘুমিয়েছে। সকালে মায়ের ডাকে ইরার ঘুম ভাঙে। সবাই ফ্রেশ হয়ে আসতেই নিচে খাবার জন্য ডাক পড়ে।
খাওয়ার পর সবাই এক সাথে গল্প করছে। রাফাকে মেহেদী পরানোর জন্য পার্লার থেকে লোক এসেছে। শুধু রাফা নয়, সবাই মেহেদী পড়বে। ইরা টুকটাক মেহেদী পড়াতে পারে, তাই ছোট বোনদের সেই পড়িয়ে দিচ্ছে।
ছোটদের শেষে বড়রা মেহেদী পড়ছে। রাতে সবাই গানের আড্ডা বসিয়েছে। দুপুরে সবাই বিরিয়ানি খেয়েছে।
সবাই যখন মজা করছে, তখন নেওয়াজের হবু বউ ফোন দেয়। তাই নেওয়াজ চলে যায়। এখন সব মেয়েরাই বসে আছে। পরের দিন আবার গায়ে হলুদ, তাই কালকে কী করবে, না করবে সব বলছে। রাত ১২টায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।
পরের দিন সকাল ৮টা বাজে। রাফা সবাইকে খাবার জন্য ডাকতে আসে। খাওয়া-দাওয়ার পর আবার সবাই পার্লারে যাবে। ফ্রেশ হয়ে সবাই খেতে যায়। খান বাড়ির খাবার টেবিল মানেই আনন্দ।
সবাই খাবার খাচ্ছে আর মজা করছে, কিন্তু ইরা চুপচাপ খাচ্ছে, কোনো কথা নেই। সবার খাওয়া শেষ হলে সবাই পার্লারে যায়। রাফাকে লাল-হলুদ শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগছে। আর সবাই নীল-হলুদ শাড়ি পড়েছে। হালকা সাজ, উফ! সবাই শাড়ি পড়লেও ইরা পড়তে পারে না, লাল রঙের একটা গাউন পড়েছে।
আয়রা, হুমায়রা দুই বোনও শাড়ি পড়েছে। শুধু ইরা পড়লো না, বিষয়টা আর কারও চোখে না পড়লেও আদ্রিয়ানের চোখে পড়ে। আদ্রিয়ান তার খালাতো বোন জান্নাতকে ডেকে বলে,
– কিরে, তোরা সবাই শাড়ি পড়লি, কিন্তু ইরাকে বললি না? ওর জন্য কী শাড়ি আছে?
– হুম ভাইয়া, আছে।
– ওরে পড়তে বল।
আদ্রিয়ানের কথায় জান্নাত ইরাকে জোর করে শাড়ি পড়ায়। জান্নাত ইরফানকে সেই ছোট থেকে পছন্দ করে, কিন্তু আজ পর্যন্ত বলতে পারেনি।
দুপুরে খাওয়ার পর গায়ে হলুদের প্রস্তুতি শুরু হয়। ইরা রুমে বসে আছে। তখন আদ্রিয়ান ইরাকে ডাক দেয়,
– ইরা, একটু পর নেওয়াজের হবু বউ আসবে। তুই ওর সাথে থাকিস।
– তা তো বুঝলাম, কিন্তু আমি তার নামটাই জানি না।
– আলিয়া, ওর নাম আলিয়া। সম্পর্কে তোর ভাবি হয়।
– ভাইয়া, আরেকটা বার নামটা বলবে?
– আলিয়া। ছবি আছে, দেখবি?
– হুম, দেখাও।
আদ্রিয়ান ফোন থেকে ছবিটা বের করে ইরাকে দেখায়। ছবি দেখেই ইরা চিনতে পারে, এটা তার বান্ধবী আলিয়া।
ইরা রুমে বসে অপেক্ষা করছে, কখন আলিয়া আসবে আর তার জমানো সব রাগ ঝাড়বে।
কিছুক্ষণ পর আদ্রিয়ান ইরাকে এসে বলে, আলিয়া এসেছে, সোফায় বসে আছে। ইরা তাড়াতাড়ি করে নিচে যায়। গিয়ে সবার আগে আলিয়ার চোখে পড়ে। আলিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগে ইরা বলে উঠে,
– বলো, কে আমি?
আলিয়া ইরাকে চিনে ফেলে ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
– ইরা, তাই না?
– হুম, আমাকে ভুলে গেছিস পাখি?
– না, আমি তোকে ভুলে যাবো ভাবলি কীভাবে? তুই আমার অন্তরের সেই মানুষ, যাকে ভোলা অসম্ভব।
– তাহলে এতোদিন আমাকে একটা ফোনও দিলি না?
– আমার ফোন চুরি হয়ে গেছিল, তাই যোগাযোগ করতে পারি নাই। আচ্ছা, এই সব এখন বাদ দে। তোর নাম্বার দে, সব দে।
তারপর ইরা আলিয়াকে তার নাম্বার দেয়। এতোক্ষণ দূর থেকে রাফা সব দেখছিল। অনেক সময় চুপ করে থেকে আর থাকতে পারে না, শেষ পর্যন্ত গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
– ইরা, আলিয়াকে কী তুমি আগে থেকে চিনতে?
– আপু, শুধু চিনতাম বললে ভুল হবে। আলিয়া আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর আব্বুর চাকরির জন্য আমরা আলাদা হয়ে যাই। দীর্ঘ ১ বছর পর আমরা আবার এক হলাম।
ইরার কথা শেষ করতে না দিয়ে আলিয়া বলে,
– আপু, ইরাকে আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। কিন্তু আজ আমি ওরে পাইছি আর হারাতে দিবো না।
আচ্ছা, তোমরা থাকো। আমি এখন যাই।
আলিয়াকে পেয়ে আগের সব জমানো কথা বলতে থাকে আর আলিয়া তা মন দিয়ে শুনছে। ইরা আলিয়াকে হঠাৎ বলে,
– কিরে, তুই না সব সময় বলতি, তুই আমার পরে বিয়ে করবি? এখন তো দেখি আমার আগে বিয়ে করে বসে আছিস!
– এখনো বিয়ে হয় নাই, হবে।
– জানি জানি। তা আমার ভুলা-ভালা ভাইটাকে কীভাবে পটালি?
– এই দেখ, তোর ভাইয়াই আমাকে পটিয়েছে। বুঝলি? আর বিয়ে এখন হবে না, তোর বিয়ের পরই করবো।
– আচ্ছা, সেটা দেখা যাবে। কে আগে বিয়ে করে।
দুই বান্ধবীর কথার মাঝে নেওয়াজ এসে হাজির। নেওয়াজকে দেখা মাত্রই ইরা বলে,
– কী গো দুলাভাই, এখানে যে তোমার শালি আর বউ আছে, চোখে পড়ে না?
– দেখ ইরা, মজা করবি না।
– আরে আরে, শুনো! আমার বান্ধবীকে বিয়ে করলে তুমি তো আমার দুলাভাই হবে, নাকি?
ইরার কথায় নেওয়াজ কিছুই বুঝতে পারছে না। সহসা ইরাকে প্রশ্ন করে,
– আলিয়া তোর বান্ধবী হয় কীভাবে? আমার বউটাকে পটিয়ে ফেললি?
– আমি কেন তোমার বউকে পটাতে যাবো? আগে তুমি বল, আমার বান্ধবীকে পটালে কীভাবে?
এর বউ, এর বান্ধবী করতে করতে দুইজন প্রায় ঝগড়া করে শুরু করে দেয়। ওদের ঝগড়া দেখে আলিয়া বলে,
– এইবার থামো। আমি বলছি, নেওয়াজ, তোমার সাথে আমার পরিচয় ১ বছরের আর ইরার সাথে ১১ বছরের। এখন তোমরাই বলো, কে কাকে পটিয়েছে?
আলিয়ার কথা শুনে নেওয়াজ অবাক হয়ে দুইজনের দিকে তাকিয়ে আছে। এতোক্ষণের সব তর্কাতর্কি থেমে যায়।
নেওয়াজ আলিয়ার সাথে কথা বলছে। আলিয়া আর নেওয়াজের কথার মাঝে ইরা থাকতে চায় না, তাই উঠে চলে যেতে ধরে। তখন আলিয়া ইরাকে আটকে দিয়ে বলে,
– এই, কোথায় যাস? আমাকেও নিয়ে যা।
– আলিয়া, তুই ভাইয়ার সাথে কথা বল। আমি না হয় পরে আসবো।
– ঠিক আছে, তুই রুমে গিয়ে বস। আমি আসছি।
আলিয়ার কথা মতো ইরা রুমে গিয়ে বসে। আলিয়া রুমে এসে বসার পর জান্নাত আসে আলিয়াকে শাড়ি দিতে। আলিয়াকে শাড়ি দিয়ে জান্নাত চলে যায়। কিন্তু আলিয়া শাড়ি পড়তে পারে না। তাই বসে আছে।
আলিয়া শাড়ি পড়ছে না দেখে ইরা বলে,
– আলিয়া, তাড়াতাড়ি শাড়ি পড়ে নে। এখন তো পেন্ডেলে যেতে হবে।
– দোস্ত, আমি তো শাড়ি পড়তে পারি না। কী করবো?
আলিয়ার কথা শুনে ইরা খিক করে হেসে উঠে বলে,
– আগে বলবি তো! আমি পারি। আয়, তোকে পড়িয়ে দেই।
তারপর ইরা আলিয়াকে শাড়ি পড়িয়ে দেয়। দুই বান্ধবী সেজেগুজে পেন্ডেলে গিয়ে হাজির হয়। দুইজনকে মাশাআল্লাহ অনেক বেশি সুন্দর লাগছিলো।
আয়রা, হুমায়রা আর তামিম ইরার কাছে গিয়ে বলে,
– আপু, এটা আলিয়া আপু না?
তিন ভাই-বোনের কথায় ইরা একটু হেসে বলে,
– হুম, এটা তোদের আলিয়া আপু।
আয়রা ইরাকে বলে,
– আপু, তোমাদের বন্ধুত্ব যেন সারা জীবন টিকে থাকে।
এই বলে তিনজন চলে যায়।
~চলমান ~