#বুঝে_না_এই মন!
#নুসরাত_জাহান
(০৩)
(০৩)
আইরিন চৌধুরী ইরাকে ডাকছে দেখে ইরা আলিয়াকে ছেড়ে চলে যায়। আলিয়া এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ইরা আসলে ইরাকে নিয়ে একবার ছাদে যাবে। তখন ফাতেমা খান এসে আলিয়াকে বলে,
– আলিয়া, তোমাকে আমার বাড়িতে খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবো। তোমার আর নেওয়াজের কাবিনটা আগেই করে রাখলে ভালো হয় না?
– আসলে, আমি তো এই বিষয় কিছু বলতে পারবো না। সব আমার আব্বু করবে। আপনি বরং আব্বুর সাথে কথা বলুন।
ফাতেমা খান চলে যাওয়ার একটু পর ইরা এসেছে। একটু পর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে, তাই ইরা আর আলিয়া ছাদে যেতে চায়নি।
অনুষ্ঠানের জন্য ফল কেটে সাজানো হচ্ছে। একটা কেকের মধ্যে ছোট করে লেখা, হলুদ সন্ধ্যা ফারা এন্ড মাহাদি। গায়ে হলুদের জন্য জিনিস নিয়ে কয়েক জন ছেলের বাড়ি যাবে। তিনটা প্রাইভেট কার গিয়ে থামে ব্যানার্জি বাড়িতে। এই বাড়িতেই বউ হবে রাফা। ইরা আর আলিয়াও ছেলের বাড়িতে এসেছে।
রাফার শ্বশুর লোকমান ব্যানার্জি আদর আপ্যায়নে কোনো কমতি রাখেননি।
বাড়িতে ফেরার কিছুক্ষণ পর ছেলের বাড়ির লোকজন আসে মেয়ের বাড়িতে। মেয়েকে হলুদ দিয়ে তারাও বাড়িতে ফিরে যান।
রাতে ইরা, আলিয়া, আয়রা, হুমায়রা চারজন একসাথে ঘুমিয়েছে। ইরা এমনিতে প্রতিদিন রাত ১২টা বাজে ঘুমিয়ে পড়ে। নয় সকালে উঠতে পারে না।
সময় সকাল ৮টা বাজে। চারজন ঘুম থেকে উঠে। ফ্রেশ হয়ে আসতেই নিচে খাবার জন্য ডাক পড়ে। তাড়াতাড়ি খেয়ে এসে সবাই রাফার কাঁচা হলুদের জন্য রেডি হয়। সিম্পলের মধ্যে একটা হলুদ থ্রি-পিস পড়ে ইরা আর আলিয়া। ইরা চুল ছেড়ে রেখেছে আর আলিয়া হিজাব পিন করেছে।
আদ্রিয়ান, রাইয়ান আর নেওয়াজ তিনজন মিলে রাফার বিয়ের রান্নাবান্নার দিক সামলাচ্ছে।
রাফা রুমে একা একা বসে আছে। চোখের কোণে পানি। একটু আগে রাফাকে মেকআপ আর্টিস্ট সাজিয়ে দিয়ে গেছে।
রাফার কিছুই ভালো লাগছে না। ফাতেমা খান খাবার নিয়ে এসে রাফাকে খাইয়ে দিচ্ছে। রাফা চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে কান্না করে দেয়। ফাতেমা খান রাফাকে বুকে জড়িয়ে বলে,
– এই পাগল মেয়ে, কাঁদছিস কেন? মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে না?
অনেক কষ্টে কথা বলে ফাতেমা খান কান্না করে দেয়।
খাবার খাওয়ানোর পর ফাতেমা খান চলে যান। রাফা একা বসে আছে। তখন আয়রা আর হুমায়রা এসে রাফাকে বলে,
– আপু, দুলাভাই চলে আসছে। এখনই বিয়ে পড়াতে আসবে।
ওদের কথা শুনে রাফার হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। একটু পরেই হয়তো কাজি বিয়ে পড়াতে আসবে।
ছেলে পক্ষের খাওয়া-দাওয়ার পর কাজি বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু করে। রাফার কবুল বলার পর বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। ছবি তোলা শেষে আসে রাফাকে বিদায় দেওয়ার সময়। সবাই কান্না করছে। রাফা তার মা-বাবাকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। রাফাকে বিদায় দেওয়ার পর পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। একে একে আত্মীয়রা চলে যেতে ধরে।
আইরিন চৌধুরী ইরাদের তাড়া দিচ্ছে রেডি হওয়ার জন্য। রাইয়ান তার সাথে বাকি ছেলেরা বাইরে গাড়ির কাছে চলে গেছে। আদ্রিয়ানের উপর ওদের নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়ে। অনেকক্ষণ ধরে ওদের ডাকার পর দুইজন রেডি হয়ে আসে। আদ্রিয়ান ওদের দেখে একটু বিরক্তি নিয়ে বলে,
– রেডি হতে মানুষের এতো দেরি হয়? গিয়ে দেখ, সবাই চলে গেছে।
আদ্রিয়ানের কথায় বিরক্তি। ইরা আর আলিয়া কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসে। নেওয়াজ অফিসের কাজে আছে। সে অফিস থেকেই অনুষ্ঠানে যাবে। তাই ইরাদের নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ইরফানের উপর পড়ে।
সবাই রাফার শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছাতেই রাফার শাশুড়ি সবাইকে খাবার খাওয়ার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। খাবারের মেনুতেও ছিল বেশ ভালো আয়োজন। খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল।
নিয়ম অনুযায়ী, আজ রাফার বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা। তাই রাফাকে সঙ্গে নিয়ে সবাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো।
অন্যদিকে, ইরাদের পরিবার আর নিজেদের বাড়িতে ফিরল না। আজই তাদের বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আলিয়াও চলে যাবে। তবে ইরা ইতিমধ্যে আলিয়ার কাছ থেকে তার ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছে।
ইরা গোল গলার একটি গাউন পরে ড্রয়িংরুমে এল। আজ বিকেলেই তারা খানবাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। বাড়িতে এসে ইরা রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের পেছন পেছন ঘুরতে লাগল। কী করবে, কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। মায়ের সঙ্গে এদিক-ওদিক ঘুরে অবশেষে হাতে এক কাপ কফি নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
ঘরে এসে কফি হাতে বসে আলিয়াকে ফোন দেওয়ার কথা ভাবছিল ইরা। ঠিক তখনই তার বন্ধুদের গ্রুপ থেকে কল এল।
আজ ইরার মনটা বেশ ভালো। তাই অনেক দিন পর বন্ধুদের গ্রুপ কলে সেও যোগ দিল। আনিশা, নাফিয়া, আনিকা আর পিউ—সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে ইরা ভীষণ খুশি হলো। এত দিন পর বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আনন্দিত কণ্ঠে সে বলল,
— জানিস, আমি আলিয়াকে খুঁজে পেয়েছি!
ইরার কথা শেষ হওয়ার আগেই আনিশা বলে উঠল,
— ইরা, একদম মজা করবি না!
ইরা অবাক হয়ে বলল,
— আরে না! আমি মজা করছি না। সত্যি বলছি!
— আমি বিশ্বাস করি না!
আনিশার কথায় অন্যরাও যেন বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তখন একজন বলে উঠল,
— আলিয়ার তো আয়রাদের মামাতো ভাই নেওয়াজের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে!
ইরার কথা কেউ বিশ্বাস না করায় সে বাধ্য হয়ে বলল,
— দাঁড়া, আমি আলিয়াকে গ্রুপে অ্যাড করছি। তাহলেই তোরা নিজের চোখেই দেখতে পাবি!
কথাটা বলেই ইরা আলিয়াকে তাদের বন্ধুদের গ্রুপ কলে অ্যাড করে দিল।
কিছুক্ষণ পর আলিয়া কলে যোগ দিতেই আনিশা, আনিকা, নাফিয়া আর পিউ অবাক হয়ে গেল। তারা যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না!
আলিয়ার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর সবাই কল কেটে দেয়। কাল রবিবার, কলেজ আছে। আলিয়া বলেছে, ইরার কলেজে সেও কাল ভর্তি হতে যাবে। ইরা মনের আনন্দে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমাতে বেশি দেরি করে না।
সময় তখন সকাল ৯টা। ইরা ডাইনিংরুমে খাবার খাওয়ার জন্য যায়। রাইয়ান ইরাকে কলেজের গেটে নামিয়ে দিয়ে আসবে, তাই ইরা তাড়াতাড়ি করছে। সাড়ে ৯টার দিকে কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা দেয়।
কলেজে গিয়ে সবার আগে ইরা আলিয়াকে জড়িয়ে ধরে। আনিশা, নাফিয়া, আনিকা আর পিউ আলিয়াকে বলে,
– জানিস আলিয়া, তোর জন্য আলিয়া অনেক কান্না করেছে, যা আমরা মুখে বলতে পারবো না।
ইরাকে খোঁজার প্রতিটা দিন আমার কাছে প্রতিটা বছরের মতো কেটেছে। এই বলে আলিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ইরা খানিকটা হেসে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
– সবাই এখন ক্লাসে চল, ক্লাস শুরু হয়ে যাবে নয়।
একটা ক্লাস শেষ হওয়ার পর নোটিশ আসে—
এতদ্বারা অত্র প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে জানানো যাচ্ছে যে, আগামীকাল এই কলেজে একজন নতুন প্রফেসর যোগদান করবেন। এ উপলক্ষে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
উক্ত অনুষ্ঠানে সকল শিক্ষার্থীকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।
নোটিশ দেওয়ার পর ক্লাসে সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।
ইরা আলিয়াকে বলে,
– আলিয়া, আব্বু আমাকে আসতে দিবে না। আমি আসবো না।
– তুই না আসলে আমিও আসবো না।
– আলিয়া, আমি আব্বুকে বলে দেখবো। আসতে দিলে আসবো।
– আচ্ছা, তুই আসলে বলিস। আমিও আসবো।
– ঠিক আছে।
দুইজন যার যার বাড়িতে চলে যায়। রাতের খাবারের পর ইরা তার আব্বুর রুমে যায়।
– আব্বু, কালকে আমাদের স্কুলে অনুষ্ঠান। আমি কি যাবো? আব্বু, তুমি যেতে না দিলে যাবো না।
– কেন যেতে দিবো না? যাস, তবে সাবধানে থাকবি।
আব্বুর কথায় ইরা যেন আকাশ থেকে পড়ে। ইরা খুশিতে খুশিতে আলিয়াকে কল করে সব জানায়। ইরা বলে,
– আলিয়া, কালকে আমি গাউন পরে যাবো। তুই কি পরে যাবি?
– আমিও তো তাই পরে যাবো।
আলিয়ার সাথে টুকটাক কথা বলে রাইয়ান চলে যায়। সবাই অনুষ্ঠানের দিকে যায়। সামনের জায়গাটা ফাঁকা আছে। কলেজের একজন ম্যাডাম আলিয়াদের বলে, তোমরা স্কুলে সব থেকে ভালো ছাত্রী। তোমাদের জন্য সামনের সিট রাখা হয়েছে। সবাই যে যার মতো বসে পড়ে। একটু পর নতুন প্রফেসর আসবেন।
নতুন প্রফেসর স্টেজে যাওয়ার পর ইরা আর আলিয়া নিজেদের মধ্যে একবার তাকাতাকি করে। নতুন প্রফেসর আর কেউ না, ওইটা আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ান চোখ যায় ইরা আর আলিয়ার দিকে। আদ্রিয়ান ওদের দেখে স্টেজ থেকে নেমে যায়। ইরাকে বলে,
– ইরা, রাইয়ান আসে নাই আর ভাবি এখানে কি করে?
আলিয়া নরমাল ভাবে উত্তর দেয়,
– আমি এই স্কুলেই পড়ি।
~চলমান~