ফন্ট সাইজ:
থিম:
তেতুলপাতায় সংসার

পর্ব 1

লেখক: সাদিয়া

আমি বন্ধ্যা। আমনেরে একটা বাচ্চা দিবার পারি না বইলা আমারে আর ভালা পান না। হাছা কইছি না সিকান্দার ভূঁইয়া?
স্বামীর হাতে মার খেয়ে ছলছল চোখ নিয়ে করুন কন্ঠে বলা বউ এর এই কথাটা কানে কাটার মতো বিঁধলো সিকান্দার ভূঁইয়া এর। রাগে হিসহিস করতে করতে সে এগিয়ে এসে আবারও বউ এর গাল চেঁপে ধরল। একটু আগেই জানের শক্তিতে চড় দেওয়ার ফলে বউ এর গালে ওর হাতের ছাপ পড়েছে। তাতে বিশেষ পাত্তা দিলো না। আপাদত রাগ মাথায় টগবগ করছে ওর।

মেহেরুনের গাল চেঁপে ধরে হিসহিস করে বলল সিকান্দার ভূঁইয়া, "চোঁপা বাড়ছে না বেশি? তোর ওই হেডামের চোঁপা কিন্তু আমি ভাইঙ্গা ফালমু মেহরুন।"

স্বামীর দেওয়া আঘাতে পিষ্ট মেহরুনের চোখ দুটি অশ্রুশিক্ত হয়ে আছে। পানিতে টইটুম্বুর করলেও গড়িয়ে পড়ল না। কন্ঠে চাঁপা অভিমান আর করুণ ভাব নিয়ে বলে ওঠে,

"হেইডাই তো পারবেন। মা বইনের কথা হুইনা বউ রে মারতে আর ভাঙ্গতেই পারবেন। এছারা আর কিই বা করার আছে আমনের?"

এমনিতে মাথা টগবগ করছে সিকান্দার ভূঁইয়ার। এরউপর বউ এর এই তর্ক আরো রাগিয়ে দিচ্ছে ওকে। ফলাফল সরূপ দাঁত কটমট করে বউ এর গালে চেঁপে ধরা আঙ্গুলে আরো জোর দেয়। এতে অবশ্য বউ তার টু শব্দও করে না। রাগে গজগজ করতে করতে বলে সিকান্দার ভূঁইয়া,

"খালি আমার মা বইনের দোষ না? আর তুই ধোয়া তুলসি পাতা? তোর কোনো দোষ নাই বান্দির ঝি?"

অশ্রুশিক্ত নয়নে স্বামীর সামনে নিশ্চল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন এবার একটু হেসে ওঠল। ওর এই হাসিতে কোনো আনন্দ বা সুখ ছিলো না। সিকান্দার ভূঁইয়া খুব করে বুঝতে পারছিলো বউ এর হাসিতে রয়েছে এক দলা তাচ্ছিল্য।

"কেডা কইছে দোষ নাই? আমার সবচাইতে বড় দোষ তো হইলো ভালোবাইসা আমনের হাত ধইরা বাপের ঘর থাইকা বের হইয়া আওয়া। দোষ না করলে কি আর এমুন শাস্তি পাই কন?"

সে জানে বউ কখন এভাবে তার সাথে তর্ক করে। এমনিতে মাইয়াডারে হাজারডা কইলেও রা শব্দ করবো না। একমাত্র অভিমান করলেই যা দুই একটা তর্ক করবে। রাগে সাপের মতো ফসফস করে সিকান্দার ভূঁইয়া মেহেরুনের একেবারে কাছে চলে গেলো। এক হাতে শক্ত করে গাল চেঁপে অন্য হাত দিয়ে মেহেরুনের একটা হাত মুচড়ে ধরলো। অথচ তার বউ কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলো।

"বড়লোক বাপের ননির পুতুল। আইছিলি ক্যান? আওয়ার আগে মনে আছিলো না তোর ধনী বাপের মতো আমার পাঁকা বাড়ি নাই। সয়সম্পত্তি নাই। পেরেম তহন উতলাইয়া পরছিলো? এহন মাডির ঘর সয় না তোর?"

মেহেরুন স্বামীর সামনে প্রাণহীন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। গালটা শক্ত করে চেঁপে ধরা থাকলেও ঠোঁটে পরিহাসের হাসি ফুটে ওঠল। চাঁপা যন্ত্রণা মেশানো কাতর কন্ঠে জবাব দিলো মেহেরুন,

"সত্যি সয় না। শুধু স্বামীর মাটির ঘর ক্যান? স্বামীর একটু সোহাগও আমার মতো অভাগীর কপালে সয় না।"

সিকান্দার ভূঁইয়ার রক্ত মাথায় ওঠে গেলো। একে তো মা কানের মাথা খাইয়া বউ এর কথা কইয়া তারে রাগাইয়া দিছে। সেই রাগের রেশ ধরে আবার মেরেছেও কয়েকটা বউ কে। সেই রাগ তাকে আরো উন্মাদ বানিয়ে ফেলছে। তারউপর মেহেরুনের এমন তর্ক শরীরের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে ওর। কখন কি করে ফেলবে ও নিজেও জানে না। বেসামাল রাগে হাপাতে হাপাতে বলল সিকান্দার ভূঁইয়া,

"মা গি, বেশি বাড়িস না কইলাম। এক্কেবারে বাপের বাড়ি পাঠাই দিমু কইলাম আজীবনের লাইগা।"

মেহেরুন থামলো না। তুচ্ছা পরিহাস করে স্লান হাসল,
"এইডাই বাকি আছে। আপনের মা তো ওঠতে বইতে কয় আমারে বাড়ি থেইকা বাহির কইরা নতুন বউ ঘরে তুলেন। আমি তো বাঞ্ছা। সন্তান দিবার পারি না আমনেরে। আমারে হুদাই ক্যান খাওয়াইবেন পড়াইবেন? তারচেয়ে এইডাই করেন। আমনেও এইডাই চাইতাছেন মনে হইতাছে। আমারে বাইর কইরা নতুন বউ দিয়া ঘর সাজাইতে চান আপনে।"

মেহেরুনের চোখ টলমল করছিলো। তারউপর এমন কথা আর সহ্য করতে পারলো না সিকান্দার ভূঁইয়া। অতিরিক্ত রাগে ঘেমে টেমে মুখ লাল হয়ে গিয়েছে ওর। মুখ খুলে রাগে শ্বাস টানতে টানতে ও মেহেরুন কে এক ধাক্কা দিয়ে ঘাটের উপর ফেলে দিলো। পুরনো ঘাটটা আচমকা মেহেরুন পড়ায় মরমর করে শব্দও হলো। সেই সাথে বউ এর মৃদু গোঙ্গানিও শুনতে পেলো। তবে দেখলো না সিকান্দার ভূঁইয়া। রাগ ওঠলে ওর হুশ থাকে না। চিবিয়ে দুইটা গালি দিলো ও,

"বান্দির বাচ্ছা বান্দি, মাতারির বাচ্চা।"

আর একদণ্ড থাকলো না ও মাটির ছোট্ট ঘরটায়। হনহন করে বের হয়ে গেলো ও। ঘাটের উপর উবু হয়ে পড়ে মেহেরুন এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠল।

মাথায় যেন দপদপ করে আগুন জ্বলছে সিকান্দার ভূঁইয়ার। গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে কিচ্ছুটি চোখে দেখতে পাচ্ছে না বোধহয় ও। বুকের ভেতরটা বড্ড জ্বালাপুড়া করছে বউ এর অশ্রুশিক্ত নয়নের কথা চিন্তা করতে করতে। ইশশ সুন্দর মানুষ তার বউ। ফর্সা গালে ওর হাতের ছাপ পড়ে গিয়েছে। পিঠেও দুইটা কিল বসিয়েছে ও। তারউপর মেয়েটার ওমন কথা কিছুতেই মানতে পারছে না ও। সে একবারও বলেছে আবার বিয়ে করতে চায় ও? সিকান্দার আবার বিয়ে করবে? কোনোদিন না।

যেতে যেতে বন্ধুদের আড্ডা খানায় চলে গেলো সিকান্দার শাহ্। মাটির রাস্তার পাশেই গ্রামের ছেলেপেলেরা বাঁশের মাচা বানিয়েছে। ওখানেই বন্ধুদের আড্ডা বসে নির্দিষ্ট সময়ে। সিকান্দার হাটতে হাটতে সেদিকেই চলে গেলো।

জালাল আর হাবিব বসে আছে আগে থেকেই। বাঁশের মাচায় বসেই সিকান্দার হাবিবের থেকে বিড়িটা ছিনিয়ে নিলো। ও খুব ঘামছে। চোখমুখ প্রচন্ড লাল। লম্বা করে বিড়ির ধোয়া টেনে নিলো সিকান্দার ভূঁইয়া। কোনো কথা বলছে না ও। কেমন অস্থির অস্থির করছে। যেন ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছে। সে সহ্য করতে পারছে না।

তার এমন অস্থির আর ছটফট করতে থাকা ভাব দেখে জামাল প্রশ্ন করল, "কিরে তোর হইছে কি? এমন আনচান করতাছোস ক্যান?"

হাবিব আরেকটা বিড়ি দেশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে ধোঁয়া টানতে টানতে বলল, "যৌবনে লাড়া দিছে।"

জামাল কিছুটা বিরক্ত হলো ওর উপর। সবকিছুতে ফাইজালামি করা এর স্বভাব।

"তা যৌবনে লাড়া দিলে ঘরে তো বউ আছে এমন আনচান করার কি হইলো?"

সিকান্দার শাহ্ কোনো জবাব দিলো না। এক পা ভাঁজ করে চুপচাপ এক নজরে শূন্যে তাকিয়ে অনবরত বিড়ি ফুঁকছে।

জালাল এবার হাবিব কে একটু ধমকে বলল, "তুই চুপ করবি? সিকান্দার? কি হইছে তোরে এমন চিন্তিত লাগতাছে ক্যান?"

হাবিব থামলো না। বিড়িতে টান দিয়ে জবাব দিলো আবারও, "দেখ গা গিয়া বেডির সাথে মনে হয় ক্যাঁচাল লাগছে। চু*রানি রা কি আর শান্তিতে থাকবার দেয় বেডা মাইনষে গো রে?"

"তোর পঁচা মুখটা একটু বন্ধ কর। তোর কথা হুনলে শইলে আগুন ধরে। বাল ফালানির কথা কছ খালি। মুখটা বন্ধ রাখ গোলাম।"
জালাল এবার স্থির বসে থাকলেও অস্থির অস্থির করা সিকান্দারের দিকে তাকালো,

"হ্যাঁ রে সিকান্দার হইছে কি? বাইত কি কাইজ্জা কইরা আইছোস?"

বেশ কিছুক্ষণ নীরব রইলো সিকান্দার। এক পা খাড়া ভাবে ভাঁজ করে তাতে হাত ঠেকিয়ে আপন মনে বিড়ি খাচ্ছে ও। অথচও চোখমুখ দেখলে মনে হবে যন্ত্রণায় অন্তর জ্বলে যাচ্ছে ওর। বেশ কিছুক্ষণ পর নাকের পাটা ফুলিয়ে অনুতাপে জ্বলতে থাকা চিত্তে ভারী কন্ঠে জবাব দিলো সে,

"মেহেরুন রে মারছি।"

ব্যস আর কিছু বলল না। না তো কোনো বন্ধুর দিকে তাকালো। এই কথা শুনে হাবিব হাসতে আরম্ত করলো,

"কিরে জালাইল্লা কি হাবিব ঠিক কইছে না? আরে মা* ঝি রা বেশি জ্বালায়। এই গুলান রে সহাল বিহাল উত্তম মধ্যম না দিলে কুড়কুড়ানি বাড়ে। ঘাড়ে উইঠা নাচে।"

"থাম তুই। সহাল বিহাল যে তুই বউ পিডাস তাতে কি ফায়দা হয় তোর? বউ রে কেমন কইরা সামলাস? পাড়োস? কি শান্তি আছে তোর জীবনে? বউরে খালি মারলেই শান্তি পাওয়া যাশ? বোকাচোদার দলেরা। অমানুষেরা। বউ পিডায় অমানুষেরা। যারা বউ পিডায় এরা হইলো গিয়া কাপুরুষ।"

"হইছে থাম থাম বীর পুরুষের মতো কতা কম কো শালা। অভাবের তুই কি বুঝবি? টানাপোড়নের কি বুঝোস তুই? বাপে বিঘাবিঘা সম্পত্তি রাইখা মরছে। কোনো যায় ঝামেলা হইলে হউর বাড়িত্তে পাইয়া ফেলাস। সংসারের অভাব কি বুঝবি তুই? হের উপর শালিরা ঘরে গেলেই চিল্লাইয়া মাথায় খাইয়া ফেলায় এত ঝামেলা কার মজা লাগে? অভাব টের পাও না তো? বউ এর বাপের বাড়িত্তেও ভাগ পাও যহন যা লাগে তাই তোমার সংসারে অশান্তি নাই। যার সংসারে অভাব আছে হের সংসারেই অশান্তি আছে।"

দুই বন্ধুর যুক্তিতর্কে সামিল হলো না সিকান্দার। অস্থির অশান্ত মন নিয়ে বিড়ি টানতে টানতে এক হাতে লুঙ্গি ধরে অজানা পথে হাটতে আরম্ত করলো। পিছন থেকে জামালের ডাক যেন ওর কানেও ঢুকলো না। চোখের সামনে বারবার মেহেরুনের টলমল চোখ দুটি ভাসতেই অশান্তির আগুনে জ্বলতে লাগল।

সিকান্দার যখন বাড়ি ফিরলো তখন অনেক রাত। দরজার সামনে আসতেই ও মেহেরুনের ফুঁপানো শুনতে পায়। সেই শব্দ বুকটা খামছে ধরে ওর। চোয়াল শক্ত করে ঢোক গিলল ও। খুব বেশি পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো ঘরের ভেতর। মেহেরুন ঘাটে শুয়ে আছে। কাঁদছে মেয়েটা পাশেই হারিকেন জ্বলছে। সেই হলদে আলোয় চিকচিক করছে ওর পানিতে ভেজা মুখটা। সিকান্দার এক পলক দেখলো। দরজাটা এবার যত আস্তে ঢুকেছে তারচেয়ে বেশি জোরে আওয়াজ তুলে লাগানো। সেই শব্দেই মেহেরুন জলদি করে ওঠে গেলো। দুই হাত দিয়ে আড়ালে চোখের পানি মুছে নিয়ে নিচু দৃষ্টিতে তাকালো ঘাড় ফিরিয়ে।

আলনার সামনে সিকান্দার তখন শার্টের বোতাম খুলছে। তা দেখে মেহেরুন আর কিছু বলল না। চুপচাপ করে বেড়িয়ে গেলো। খানিক ঘাড় ঘুরিয়ে বউয়ের যাওয়া নিঃশব্দে দেখে শার্ট খুলে আলনায় রেখে দিলো সিকান্দার। কেন যেন এই ঘরের ভেতর আজকে দম বন্ধ লাগছে ওর।

পাক ঘর থেকে ভাত তরকারি এনে মেহেরুন পাটি বিছিয়ে দিলো। চুপচাপ পাটির শেষ মাথায় মাথানিচু করে হাতপাখা নিয়ে বসে আছে। স্বামী খেতে বসলেই বাতাস করতে হবে। নইলে সিকান্দার ভূঁইয়া এর চিল্লাচিল্লিতে এই রাত বিরাতে পাড়া জেগে ওঠবে যে।

সিকান্দার শাহ্ তীক্ষ্ণ চোখে মাথানিচু করে বসে থাকা বউ এর মুখটা দেখলো। অনেক কান্না করেছে বোধহয়। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। মুখটাও ফোলাফোলা লাগছে। কান্না আর তখনের চড়ের কারণেই বোধহয়। সিকান্দার ঢোক গিলল একটা। বাহিরে যেতে যেতে কর্কশ কন্ঠে হুকুম করলো,

"হারিকেন নিয়া বাহিরে আয়।"

মেহেরুন কোনো জবাব দিলো না। স্বামীর কথামতো হারিকেন নিয়ে এগিয়ে গেলো। সিকান্দার কল পাড়ে গিয়েছে বলে সে এক হাতে হারিকেন ধরে অপর হাত এগিয়ে দিলো কলের হাতলে। সিকান্দার একপলক ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল হলদে আলোয় বউ এর মুখখান। বড্ড থমথমে আর পানসে সেই মুখ।

"এত দরদ দেখাইতে হইবো না। সর। পারমু আমি।"

চুপচাপ হারিকেন হাতে মেহেরুন কলপাড় থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। সিকান্দার নিজেই চাপ কল থেকে পানি বের করে হাতমুখ ধুয়ে নিলো। এরপর বউ এর দিকে তাকিয়ে বলল,

"আগে হাট।"
অন্ধকারে বউ তার ভয় পায়। একা বাহিরে বের হয় না। মেহেরুন হারিকেন নিয়ে আগেআগে চলে গেলো। তার পিছু সিকান্দার ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। গামছা দিয়ে মুখ মুছে গিয়ে বসল পাটিতে।

ভাত তরকারি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। কুমড়া ভাজি আর ছোটমাছের চচ্চড়ি। সাথে একটু ডাল দেখতে পেলো সিকান্দার। থালায় কুমড়া ভাজি দিয়ে ভাত মাখিয়ে একবার লোকমা তুলে নিলো। পাশে মেহেরুন কাঠের পুতুলের মতো বসে আছে। না কোনো কথা বলছে না তাকাচ্ছে আর না নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। মরা লাশের মতো বসে থেকে বাতাস করছে ও। বউ এর এমন নীরবতা একটুও সহ্য হয় না সিকান্দারের। ওর মেজাজ চড়ে যায় এমন চুপচাপ মুখ দেখলে। ভাত মুখে নিয়েই অকারণে বলে ওঠল ও,

"কি রান্ধস? ভাজিতে লবণ কম ক্যান? রান্ধার সময় মন কই থাকে তোর? সংসারে মন বয় না?"

মেহেরুন সঙ্গেসঙ্গে জবাব দেয় না। এমন অভিযোগ যে অহেতুক সে জানে। দুপুরবেলা বেশ মজা করে সিকান্দার ভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছে। মেহেরুন একবারও তাকালো না। শূন্যে তাকিয়ে উদাস নিষ্প্রভ কন্ঠে জবাব দিলো সে,

"ভাজি মায় রান্না করছে। আমনে আর হাফসা আফা উনার বানানো কুমড়া ভাজি অনেক পছন্দ করেন হের লাইগা।"

কোনো জবাব দিলো না সিকান্দার। গলা দিয়ে ভাতও নামছে না এমন দম বন্ধ করা নীরবতায় ডুবে থাকা ঘরে বসে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে ওর। ভাত মাখাতে মাখাতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো একবার বউ এর দিকে।

নিস্তেজের মতো বসে থেকে শুধু বাতাস করছে। একবার সিকান্দারের দিকে তাকাচ্ছে না হারামি টা। বউ এর মলিন চুপসে যাওয়া মুখ দেখে আরো রাগে সিকান্দার।
তিন বছর হচ্ছে তাদের বিয়ে হয়েছে। মেহেরুন তারে পছন্দ কইরা বাপের ঘর ছাইড়া পালাইয়া আইসা বিয়া করছে। ধনী বাপের ননীর পুতুল তার মাডির ঘরে আইসা বহুত কষ্টে জীবন পাড় করতাছে। তারউপর বাচ্চা হয় না বইলা তার মা বইনের খোঁটা তেজালো কথা এরউপরে হের নিজেরও মেজাজ আর কটু কথা সব সয়ে থাকছে। আগে মেহেরুন দুধের মতো ফর্শা আছিলো। আর এহন তার মাডির ঘরে আইসা মাইয়াডার চেহারা একটু মলিন হইয়া গেছে।

সিকান্দার মোটা গলায় জানতে চাইল, "ভাত খাইছোস?"

"আমনে খান। আমারে নিয়া আমনের চিন্তা করা লাগবো না।"

এই কথা শুনে আর সহ্য হলো না সিকান্দারের। ও দাঁত কিড়িমিড়ি করে বাম হাত দিয়ে মেহেরুনের খোঁপা বাঁধা চুলের মুঠি ধরে ওর দিকে মুখ ফিরালো। ঘরে আইছে কতক্ষণ ধইরা অতোচ এই বান্দি একবারও তার দিকে চাইয়া দেখলো না। মেলাক্ষণ এমন নমুনা দেখছে সিকান্দার। আর কত সহ্য করবে ও?

খোঁপায় মুঠো চেঁপে ধরায় মেহেরুন এবার ওর দিকে তাকায়। সিকান্দার রাগে কটমট করে বউ এর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ভাব বাড়ছে না তোর? মেলাক্ষণ ধইরা তোর বালের ঢং দেখতাছি। অভিনয় মারাছ আমার লগে? তোরে নিয়া আমি চিন্তা করমু না তো কেডায় করবো?"

চুলের ব্যথায় মুখটা কালো করে নিলো মেহেরুন। সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

"আমনে আমারে নিয়া চিন্তা করেন বুঝি?"

"ক্যান? তোর কি আরো বাতার আছে? যেয় তোরে নিয়া চিন্তা করবো?"

"না। এমনি জিগাইলাম। ওঠতে বইতে লাত্তি উস্ঠা দেওয়া বাড়ির কুত্তারে নিয়া কেউ চিন্তা করে এইডা হুইনাই অবাক হইলাম।"

"মেহেরুন। খোদার কছম লাগে আমারে রাগাইস না। ভালো হইবো না কিন্তু মাতারির বাচ্চা।"

"মারবেন এই তো?"

সিকান্দার চোখমুখ রাগে খিঁচে নেয়। দাঁত কটমট করে শ্বাস টানে। স্বামীর দিকে একবার চেয়ে মেহেরুন শীতল গলায় বলে,

"লাগতাছে আমার।"

সিকান্দার কোনো জবাব দেয় না। চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলো ও। একটু সময় নিয়ে সিকান্দারের মুখাবরণ পর্যবেক্ষণ করে মেহেরুন আবারও বলে ওঠে,

"চু..চুল ছাড়েন।"

লম্বা নিশ্বাস ফেলে সিকান্দার বউ এর দিকে তাকায়। চুলের খোঁপায় মুঠোমেয় হাত না ছেড়ে কিছুটা আলগা করে। ফ্যাসফ্যাস গলায় বলে এবার,

"যা জিগাই হেইডার উত্তর করবি। বাড়তি কথা কইতে আইলে চোঁপা গুড়া কইরা লামু। আর ভাব কম মারাবি সিকান্দার শাহ্ র লগে।"

এবার আর মেহেরুন জবাব দিলো না। চুপচাপ থাকল।

"ভাত খাইছোস?"

"কিরে কি জিগাই মাতারির বাচ্চা? ভাত খাইছোস রাইতের বেলায়?" বউ এর উত্তর না পেয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে বলল সিকান্দার।

"আমনে খান। মা রে ভাত দিয়া আমি খাইছি।"

সিকান্দার এবার চুল থেকে হাত এনে ঘাড়ে রাখলো বউ এর। বউয়ের চিকন নরম ঘাড়টা নিজের দিকে ঘুরিয়ে পাত থেকে এক লোকমা ভাত এনে ধরল মুখের সামনে,

"হা কর।"

"আমি কইলাম তো। ভাত খাইছি।"

"তোরে হা করতে কইছি মাতারির বাচ্চা ভাব মারাইতে কই নাই। হা কর।"

বউ কে নীরব দেখে ঘাড়ের উপর রাখা হাতে জোর প্রয়োগ করল সিকান্দার। জোর করেই বউ কে খায়িয়ে দিলো এক লোকমা। সে জানে মেহেরুন রাতে খায়নি। তারে ছাড়া কোনোদিন রাইতের খাওন খায় না মাইয়াডা।

এরপর যতবার নিজে খেয়েছে ততবার মেহেরুনের সামনে লোকমা ধরেছে। মেহেরুনও চুপচাপ খেয়েছে। খাওয়া শেষে থালাবাসন একটা টেবিলের কোণায় রেখে দিয়ে সিকান্দারের সামনে গেলো। এতক্ষণ লোকটা খাবে বলে কিছু বলে নি। পাছে না আবার রাগারাগি করে। তাই খাওয়া শেষে এগিয়ে গিয়েছে মনের কথাটা বলতে।

সিকান্দার বউ এর নত মুখ দেখে কপাল কুঁচকে শুধায়, "কি হইছে? কিছু কবি? নাকি আরো ভাব মারানি বাকি আছে? ঝগড়া করবার চাস নাকি আরো?"

অথচ মেহেরুন তাকে অবাক করে দিয়ে সবচেয়ে তিক্ত, মেজাজ বিগড়ানো এক ভয়ংকর খেপাটে কথা বলে বসল,

"আমি কাইল কা বাপের বাড়িত যামু।"

#তেঁতুলপাতায়_সংসার
#পর্ব_১
#লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন