#তেঁতুলপাতায়_সংসার
#লেখনীতে_সাদিয়া
#পর্ব_২
🚫কপি করা থেকে বিরত থাকুন।🚫
একখণ্ড উল্কা তীব্র বেগে এসে যেন সিকান্দারের বুকের উপর আছড়ে পড়ল। ও কয়েকপল বউ এর নত মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
পালিয়ে এসে করা তাদের বিয়ের তিন বছর হয়। প্রথম এক বছর মেহেরুনের বাবা ভাইরা কেউ খুঁজ নেয় নি রাগে কষ্টে। একমাত্র আদরের মেয়ে ওদের মেহেরুন। তবে এক বছর পর একদিন হুট করে মেহরুনের বাবা মুর্শেদ শিকদার বাড়ি আসেন। মান অভিমান ভুলে মেহরুন আর সিকান্দার কে ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো। সিকান্দারের মা রমিছা বানু ছেলেকে বুদ্ধি দিয়েছিলেন শ্বশুর বাড়ি থেকে যৌতুক নিতে। তাতে সিকান্দার সাফসাফ না করে দিয়েছিলো। তাতেই রমিছা রাগে আগুন। তিন বছরের বিয়ের বয়সে মেহেরুন কেবল চারবার বাপের বাড়ি গিয়েছে। তাও সিকান্দার সাথে নিয়ে গিয়ে দুই তিন দিন থেকে চলে এসেছে। এই নিয়ে মেহেরুন কে খুব কথাও শুনিয়েছেন রমিছা বানু। আরেকদিন মেহেরুনের ছোট ভাই ওকে নিতে এলে রমিছা বানু না করে দেন। বউ কেও কথা শুনান। সেদিন রাতে মেহেরুন মন মরা হয়ে তার পাশে বসে বলেছিলো, "আমার বাপ ভাই এই বাড়ি আয় মা তা ভালা পায় না।"
মায়ের ভুল ছেলে হয়ে স্বীকারও করতে পারে না সিকান্দার। ভুলটা বুঝতে পেরেও রুক্ষ গলায় জবাব দিয়েছিলো সে, "ভালো পাওয়া না পাওয়ার কি আইলো এইহানে? ওগো বাড়ির মাইয়া এই বাড়িত ওরা আইবোই। কারো ভালা না ভালা দেইখা কি দরকার আছে তোর?"
নিরস মুখে সেদিন মেহেরুন জবাব দিয়েছিলো, "আমি ভাইরে না কইরা দিছি আর কোনোদিন যাতে আব্বা ভাইজান এই বাইত না আহে।"
এরপর এক বছর ধরে মেহেরুন বাপের বাড়ি যায় না। আজ হঠাৎ যাওয়ার কতা কইলো ক্যান? সিকান্দার ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো বউএর দিকে। একটা মিহি আতঙ্ক আর রাগ দুটোই মনের ভেতর উঁকি দিলো। ওর কন্ঠটা বোধহয় একটু কাঁপলোও। গমগম করে রাগ দেখিয়ে এগিয়ে গেলো বউ এর দিকে। বাহু ধরে নিজের দিকে মুখ ফিরালো বউ এর। আলতো করে গালে চেঁপে ধরে কটমট করল ও,
"তোর কি মনে হয় আমার ঘরে অমাবস্যা টাইনা তোর বাপের ঘরে গিয়া তোরে আলো ছড়াইতে দিমু আমি? একটা বেলাতেও?"
মেহেরুন করুণ মুখে চায় সিকান্দারের দিকে। সে জানে এই কথার মানে। কাঁদো গলায় বলে তাই, "মেলা দিন আব্বা আম্মা রে দেহি না।"
ঢোক গিলল সিকান্দার। কি উত্তর দিবে বুঝে পেলো না। বউ এর চোখ টলমল করছে। ও মেহেরুন কে ছেড়ে দিয়ে নিজেকে কিছুটা আড়াল করতেই মেহেরুন কে পিঠপিছু করে দাঁড়ায়। কর্কশ গলায় বলে,
"এহন কোনোহানে যাইতে হইবো না। বাপের বাড়ি যাবি না তুই.."
"আমারে একটু যাইতে দেন না আটপাড়া গ্রামে।"
"কোনো দরকার নাই। কানের মাতা খাইস না মেহেরুন। রাইতের বেলা একটু ঘুমাইবার দে।"
হঠাৎ করে পায়ে উষ্ণ ছোঁয়া। তাকিয়ে দেখে বউ তার পায়ে ঝাপটে ধরেছে। কাঁদোকাঁদো স্বরে পা ধরে বলছে,
"দোহাই লাগে আমারে একটু যাইতে দেন। আমি আব্বা আম্মার কাছে যামু। না কইরেন না আমনে। আমারে একটু যাইতে দেন আম্মার কাছে।"
সিকান্দারের কি হইলো বুঝলো না সে। শুধু অনুভাব করতে পারলো ওর শরীর টা বুঝি মৃদু টলছে। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সে মেহেরুনের দিকে। কি ব্যাপার? বউ তার এত অস্থির কেন বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়া? মেহেরুন তো কোনোদিন এমন আনছান করে নাই বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়া। তাইলে আইজা এমন করতাছে ক্যান? মাথা কেমন শূন্য লাগলো সিকান্দারের। ও একটা ঢোক গিলে মেহেরুন কে টেনে দাঁড় করালো।
ভেতরে নিজের অস্বস্তি অনুভব করলেও মুখে রগচটা ভাব টানতে ভুলল না ও। ফ্যাসফ্যাস গলায় বলল, "ক্যান যাইতে চাস তুই বাপের বাড়ি?"
ছলছল চোখ নিয়ে মেহেরুন জবাব দেয়, "আব্বা আম্মারে দেখবার মন চাইছে।".
সিকান্দার ঠোঁটে কেমন করে হাসি তুলল। কন্ঠ একটু খাঁদে নামিয়ে বলল, "রাগ কইরা যাইবার চাস মেহরুন? আইজ মারছি দেইখা?"
এবার মেহেরুন জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ওঠে। তা দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় সিকান্দার। বউ এর কান্না দেখলেই ওর মাথা গরম হয়ে যায়। এই মুহূর্তেও হচ্ছে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলো সে। নরম গলাতেই বলার চেষ্টা করলো,
"তুই ভালা কইরা জানোস মেহেরুন তোরে ছাড়া একটা রাইত আমি থাকবার পারি না। কেমন খাইলা খাইলা লাগে বুকের ভিতরডা।"
মেহেরুন ফুঁপিয়ে ওঠল এবার। খুব করে কান্না পাচ্ছে ওর।
"আ..আমি একটু আ..আব্বা আম্মারে দেখবার চাইতাছি। আমার ম..মন মানতাছে না।"
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। কোনো কথা বলতে পারলো না ও। আচমকা শ্লথ কন্ঠে ও জিজ্ঞাস করে ওঠল,
"আমারে ছাইড়া যাইবার গা চাস?"
মেহরুন এক ঝাটকা খেলো। ও চকিতে মাথা তুলে তাকালো সিকান্দারের মুখের দিকে। শ্যামলা গড়নের মুখটা এখন যেন বড্ড কালো দেখাচ্ছে। ও হতবিহ্বলের মতো চেয়ে রইলো স্বামীর মুখের দিকে।
"উত্তর দে।"
মেহেরুনের গলা কাঁপছে। কাঁপা ঠোঁট নিয়ে ও প্রশ্ন করলো, "ক..কি.. কি কইতাছেন আপনে?"
সিকান্দার জবাব দিলো না। ঘাড়টা একটু ফিরিয়ে নিলো ও।
"আ..আমনে কি কইছেন সিকান্দার ভূঁইয়া?"
বউ তার একটু অভিমান করলে মাঝেমাঝে তাকে নাম ধরে ডাকে। প্রেম করার সময় মেয়েটা বারবার এই নামে ডাকতো ওকে। ওর নাকি নামটা খুব পছন্দের।
সিকান্দারের ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে ওঠল। ও অদ্ভুত ভাবে একটু হাসলো। এরপর বউ এর দিকে ফিরে তাকালো। নরম গালে হাত ছুঁয়ে বউ এর কান্না মুচিয়ে দিয়ে শক্ত চোখমুখে রুক্ষ গলায় বলল, "হাতে এহন টান। কয়দিন পরে যাইস। দিয়া আমুনে আমি। যতদিন মন চায় থাকিস।"
এরপর আর সিকান্দার দাঁড়ালো না। অতিরিক্ত বাক্য বিনিময় না করে ও ঘাটের একপাশে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ডান হাতটা মুখের উপর রেখে চোখ ডেকে চুপচাপ শুয়ে থাকলো। মেহেরুন কিছুসময় স্বামীকে ওভাবেই দেখে গেলো নির্নিমেষ। লোকটার কথা কানে বাজতে লাগলো শুধু। কি বলল এই লোক? তাকে রেখে আসবে? সে যতদিন চায় ততদিন থাকতে পারবে? কেন? এই লোক তো কোনোদিন তাকে ছাড়া একটা রাত একা কাটায়নি। বাপের বাড়ি গেলেও তো সঙ্গে নিয়ে যেতো আর সঙ্গে নিয়ে আসতো। তবে আজ এমন কথা বলল কেন?
মেহেরুন পাথরের মতো নির্জীব দাঁড়িয়ে। ঠিকিই তো আছে ওঠতে বসতে শাশুড়ির কথা শুনতে হয়। পাড়ার লোকের কথা শুনতে হয়। আটখোড়া বাঞ্ছা। সন্তান হয় না। শুধুশুধু তাকে রেখে কোনো লাভ আছে সিকান্দার ভূঁইয়া র? তাই বোধহয় মনস্থির করেছে তার আশায় বসে না থেকে নতুন করে শুরু করবে। বাচ্চার বাপ হবে। সে তো আর বাচ্চা দিতে পারবে না।
বুকের ভেতরটা কচমচ করে ভাঙ্গছিলো মেহেরুনের। ওর বুক ফেটে আসছিলো। গলায় বোধহয় কোনো অদৃশ্য শক্তি চেঁপে ধরেছে। নিশ্বাস নিতেও মেয়েটা কাঁপছে।
কাঁপাকাঁপা শরীর টা নিয়ে মেহেরুন সিকান্দারের দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। বিবশ কান্না মিশ্রিত চোখে ও তাকিয়ে রইলো স্বামীর বাহু দিয়ে ঢেকে রাখা মুখের দিকে। ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে।
মেহেরুন কে পিঠপিছনে রেখে সিকান্দার অন্য দিকে কাত হতেই মেয়েটার কান্না বাড়ে। দাঁতে দাঁত চাঁপে সিকান্দার। বউ এর এই কান্না শুনলে আর মাথায় আগুন জ্বলে যায়। নিজেকে সামলাতে মেহেরুন কে পিছনে ফেলেই শুয়ে পড়েছে ও। ভুলক্রমেও বউ এর কান্না দেখে উল্টো বউ এর উপরই রাগারাগি করবে।
সেই যে সিকান্দার মেহেরুনের উল্টো দিকে কাত করে ফিরেছিলো। এরপর চুল পরিমাণও নড়েনি। বোধহয় মাঝরাত চলছে। পাশে থাকা মেহেরুনের কোনো সাড়াশব্দ আসছে না। এবার সিকান্দার আস্তে করে বউ এর দিকে মুখ করে কাত হলো। এক নজরে দেখতে লাগল বউ এর মলিন মুখটা। মুখটা বড্ডা শুকনো লাগছে। আর লাগছেই বা কি? মেহেরুন এখন অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। বিয়ের আগে শরীর স্বাস্থ্য তাও ভালো ছিলো আর এখন হাড্ডি ছাড়া কিছু দেখা যায় না। সিকান্দার খেয়াল করলো মেহেরুনের চোখের কোণায় এখনো একটু পানি আছে। মনডা বড্ড বেশি করে কেঁপে ওঠে সিকান্দারের। ও আস্তেধীরে হাত বাড়িয়ে মেহেরুনের চোখের পানি মুছে দিলো। মেহেরুনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বিষাদ কন্ঠে বলল,
"তোরে আমি সুখ দিবার পারি না রে মেহেরুন। আমার ঘরে আইছোস পড় থেইকা তোরে খালি যন্ত্রণাই দিতাছি। জালাল ঠিকই কইছে আমি অমানুষ। তোরে খালি কষ্ট দেই। ক্যান সুখের রাজ্য থুইয়া আমার মতো এক গরীবের মাডির ঘরে আইছোস?"
সিকান্দারের মনটা হু হু করে ডেকে ওঠে। নিজের ঘষঘষে হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে দেয় বউ এর মোলায়েম গালে। এরপর আস্তে করে ওঠে যায়। কাঠের টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা ব্যথায় মলম বের করে। সেটা নিয়ে আবার ওঠে আসে ঘাটে।
একটু মলম নিয়ে মেহেরুনের গালে আলতো করে লাগিয়ে দেয়। বউটা তার একটু নড়ে ওঠেছে। স্ত্রীর মুখে তাকিয়ে ফিসফিস করে ও,
"তুই তো রাজপুত্তু আশা করোছ মেহেরুন অথচ তোর কপালে আল্লাহ জুটাইয়া দিছে কাঙ্গাল এক অমানুষ।"
সিকান্দার খেয়াল করে ওর কন্ঠে ভেঙ্গে আসছে। পুরুষ মানুষের আবার কাঁদতে হয় নাকি? নিজেকে মুহূর্তে শক্ত করে নিলো ও। একটু ঝুঁকে মেহেরুনের কামিজটা সরিয়ে দিলো পেট থেকে। ফর্শা পেটটার থেকে নজর সরিয়ে ও পিঠের দিকে দৃষ্টি দিলো। ওখন দুইটা কিল দিয়েছিলো পিঠে। সেখানেই আস্তে করে মলম ঘষে দিয়ে এবার স্ত্রীর উপর ঝুঁকে কপালে আলতো করে চুমু খেলো। বউ কে জেগে থাকতে চুমু দেয় না সে অনেক দিন। মেহেরুনের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে সিকান্দার,
"এই সিকান্দার ভূঁইয়া অমানুষ কাঙ্গাল হইলেও তোরে ছাড়া বাঁচবো না রে মেহেরুন।"
--
খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিছানায় গিয়েছে জালাল। কারেন্ট চলে গিয়েছে। তাই তার স্ত্রী আছিয়া তাল পাতার পাখা দিয়ে বাতাস করছে। জালাল মুখটা মলিন করে বলে,
"একটা কথা আছিলো আছিয়া।"
গাল ভরে হেসে আছিয়া বলল, "কন কি কইবেন?"
জালাল ইতস্তত করেও জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কি আমারে নিয়া সুখে আছো আছিয়া?"
"নাউজুবিল্লা। এইডি কি কন আমনে? আমনের ঘরে কোন দিক দিয়া আমার অশান্তি? এমন কথা আর কোনোদিন কইবেন না আপনি দোহাই লাগে আমার।"
আছিয়া স্বামীর বুকে লুটিয়ে পড়ল। বউ কে আদরের সাথে বুকে জড়িয়ে বলল জালাল, "তাইলে তুমি তোমার আব্বারে কইবা আমার বাড়িত আর কোনোদিন কোনো কিছু জানি না পাঠায়। বাজারের দিন বড় মাছ, তাগারি বইড়া সবজি হাস মুরগি কোনো কিছু জানি না পাঠায়।"
আঁতকে ওঠল আছিয়া। সন্দিহানি হয়ে বুক থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করলো স্বামী কে,
"হঠাৎ এমন কতা কইতাছেন কেন? কি হইছে?"
"আমি চাই আমার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়াই সুখে রাখতে। তোমার যখন যেইডা লাগবো আমারে কইবা। কিন্তু আব্বারে না করবা এই বাড়িত আর কিছু না পাডাইতে।"
"কি হইছে কন আমারে।"
"বউয়ের বাড়ির বাড়িত্তে কোনো কিছু আওয়া ভালা না আছিয়া।"
"ক্যান? মাইয়ার সুখের লাইগাই তো বাপ মারা জিনিস পত্র দেয়। এতে ভালা না ক্যান হইবো?"
"তোমারে তো কইলামই আছিয়া। আমি তোমারে আমার মতো কইরা সুখে রাখবার চাই। তোমার যা লাগবো আমি আইনা দিমু। আমার শ্বশুরঘর থেইকা কেন আইবো? মানুষ তো এইডি ভালা চোহে নেয় না আছিয়া। তোমারে একটা জিনিস না দিবার পারলে তহন আমারে কইবা কিন্তু আব্বারে না কইরা দিও। গেরামের মানুষের সামনে আমার এহন শরম করে। সবাই লোভী ভাবে আমারে। তাছাড়া শ্বশুর বাড়িত্তেন কিছু নেওন নাই। ভালা ঘরের পোলারা নেয় না। সিকান্দারের দেহো। ওর হউর বাড়ি কি আমার শ্বশুর বাড়িত্তেন কম আছে কোও? হের শ্বশুর হেরের কইছে বাজারে বড় কাপড়ের দোকান নিয়া দিবো হেয় রাজি হয় নাই। আমিও চাই না আর এমন ঘটনা ঘটুক।"
ছোট্ট আছিয়া স্বামীর বুকে আবারো লুটিয়ে পড়ে বলে, "আমনে যা কইবেন আমার লাইগা হেইডাই সই। আমনে আমার সব। আমার দুনিয়া আমনে।"
"আর আখিরাত?"
"হেইডাও জানি আমনেই হোন।"
এই বলে আছিয়া স্বামীর বুকে আরো লুটিয়ে যায়। স্ত্রীর ছোট্ট কায়া নিজের সাথে আরো মিশিয়ে নিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, "তাইলে জামাইরে এহন খুশি করেন।"
--
সকাল সকাল মেহেরুন ঘুম থেকে ওঠে ঘর বাড়ি পরিষ্কার করে নিয়েছে আগে। শাশুড়ি ঘুম থেকে ওঠে উঠান ঝাড়ু দেওয়া না দেখলে বাড়ি মাথায় তুলে নিবে। কাল থেকে একটা মুরগি একটু ঝিমাচ্ছে। রাতেই শাশুড়ি বলে রেখেছে মুরগিটা ধরে জ বাই করতে। খোপ থেকে মুরগি ছাড়ার সময় সেটাই ধরে পাশে বাড়ির মতিন কাকা কে দিয়ে জ বাই করিয়েছে। শীলপাটায় মশলা বেটে সকাল সকাল রান্না বসিয়েছে চুলায় আগুন ধরিয়ে।
বাড়ির সবাই ওঠে গিয়েছে। সিকান্দার ঘুম থেকে ওঠেন গোসল করে বাজারে দোকান খুলতে যায়। সকাল বেলায় সে সবসময় পুকুরের পানিতে ডুব দেয়। এতে নাকি গতরে বিষ থাকে না। ডুব দিতে সে পুকুরপারেই গেছে।
মেহেরুন রান্না শেষ করে বারান্দায় পাটি বিছিয়েছে। এখুনি লোকটা চলে আসবে ডুব দিয়ে। খাবার দিতে দেরি হলে আর বাজারে যেতে সময় নষ্ট হলে তার কপালে শনি আছে। তাই মেহেরুন ভাত শাক বেরে এবার গোশতের তরকারি নিতে এসেছে। স্টিলের বাটিতে তরকারি নিতেই গরম হয়ে গিয়েছে সেটা। ফু দিতে দিতে দ্রুত করে মেহেরুন বারান্দার দিকে নিয়ে আসতে লাগল।
তখন সিকান্দারের ছোট বোম হাফসা পাকের ঘরে আসছিলো বেছে বেছে গোশতের টুকরো নিবে বলে। আচমকা দুজনে ধাক্কা খেয়ে সবটুকু তরকারি নিচে পড়ে গেলো। সে তৎক্ষণাৎ সরে আসায় তার কিছু না হলেও ননদ হাফসার ঠিকিই হাতে একটু ছিটা লেগেছে। উঠান থেকে ক্ষিপ্ত ভাবে রমিছা বানু ছুটে এলে,
"হায় হায় রে অলক্ষ্মী অপয়া আমার সায় সব্বনাশ কইরা ফাইছে রে। আমার ঝিরেও মাইয়া ফেলাইছে। ওরে অলক্ষ্মী কাল নাগিনী রে। আমার সংসারডা পুইড়া ছাই কইরা এই কাল সাপ বাহির হইবো।"
শাশুড়ি কথায় কষ্ট পেলেও মেহেরুন জবাব দিলো না। ও দ্রুত করে ননদের দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটা হাত চেঁপে ধরে মাটিতে পড়ে বিলাপ করছে। মেহেরুন ওর হাত দেখতে চাইল,
"দেহি কি হইছে? বেশি পুইড়া গেছে? আমি দেহি নাই। আমারে মাপ কইরা দেও বইন। দেহি হাতটা.."
মেহেরুন হাফসার হাত ধরতে গেলে ও বাঘিনীর মতো নিজের হাত সরিয়ে নিলো,
"সর অলক্ষ্মী আঁটকুড়া বেটি কুনহানের। আমার থেইকা দূরাত যা।"
ননদের দেওয়া আচমকা ধাক্কায় মেহেরুন কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল। ঠিক তখুনি উঠান থেকে বজ্রধর কন্ঠে এক বিবশ চিৎকার ভেসে এলো।
চলমান....
।