ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসেছি তোর মনেরই দেশে

পর্ব 3

লেখক: Alifa Madbar

এসেছি তোর মনেরই দেশে
Writer –Alifa madbar

পর্ব ৩ /

কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে নূর বাড়ির পথে রওনা হলো। মেহরিন, তৃষা আর সামিয়ার সঙ্গে কাটানো সময়টুকু তার মন ভালো করে দিয়েছে। অনেক দিন পর মনে হচ্ছিল, তার জীবনেও হয়তো বন্ধুত্বের ছোট্ট একটা জায়গা তৈরি হতে পারে।

কিন্তু বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকতেই সেই ভালো লাগাটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।

শায়লা সিকদার বসার ঘরে বসে ছিলেন। নূরকে ঢুকতে দেখে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন।

শায়লা সিকদার: এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

নূর: চাচি, কলেজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেছে। আজ ক্লাস শেষ হতে সময় লেগেছে।

শায়লা সিকদার: কলেজে পড়তে যাস, নাকি বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে? বাড়িতে যে কাজ আছে, সেটা কি ভুলে গেছিস?

নূর: না, চাচি। আমি এখনই কাজগুলো করে দিচ্ছি।

শায়লা সিকদার: আগে রান্নাঘরে গিয়ে দেখ, দুপুরের বাসনগুলো পড়ে আছে। তারপর কাপড়গুলো ধুয়ে দিবি। সন্ধ্যার আগেই সব শেষ চাই।

নূর: আচ্ছা, চাচি।

নূর নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগটা রেখে কাপড় বদলে নিল। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। সারাদিন ক্লাস করার পর তার একটু বিশ্রাম নিতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু এই বাড়িতে নিজের ইচ্ছার কথা ভাবার সুযোগ খুব কমই পায় সে।

কাজ করতে করতে বারবার কলেজের বন্ধুদের কথা মনে পড়ছিল। মেহরিনের হাসিখুশি মুখ, তৃষার মজার কথা আর সামিয়ার শান্ত স্বভাব—সব মিলিয়ে তাদের সঙ্গে সময়টা ভালো কেটেছে।

নূর মনে মনে ঠিক করল, পড়াশোনার পাশাপাশি সে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বটাও ধরে রাখবে। জীবনে নিজের মানুষ বলতে তার খুব বেশি কেউ নেই। তাই নতুন এই সম্পর্কগুলোকে সে অবহেলা করতে চায় না।

কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। নূর বই খুলে বসেছিল, এমন সময় তার ফোনে একটি বার্তা এল।

মেহরিন: নূর, কী করছ?

নূর: পড়তে বসেছি। তুমি?

মেহরিন: আমিও একটু আগে পড়তে বসেছি। আচ্ছা, কাল কলেজে তাড়াতাড়ি আসবে?

নূর: কেন?

মেহরিন: একটা কথা আছে। সামিয়া আর তৃষাও থাকবে। কলেজে গিয়ে বলব।

নূর কিছুক্ষণ বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কী কথা হতে পারে, তা বুঝতে পারল না। তবু উত্তর দিল।

নূর: আচ্ছা, চেষ্টা করব।

ফোনটা পাশে রেখে নূর আবার বইয়ের দিকে মন দিল। তার সামনে অনেক পথ। পড়াশোনায় ভালো করতে হবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। এসবের বাইরে অন্য কিছু ভাবার সময় তার নেই—অন্তত সে নিজেকে সেটাই বোঝায়।

পরদিন সকালে নূর কলেজে পৌঁছাতেই মেহরিন তাকে খুঁজে বের করল। তৃষা আর সামিয়া ইতিমধ্যে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

মেহরিন: এই যে, আমাদের নতুন বন্ধু এসে গেছে!

নূর: কী ব্যাপার? কাল থেকে এমন রহস্য করছ কেন?

তৃষা: রহস্যটা মেহরিনের। ওর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কিছু বলার অনুমতি নেই।

সামিয়া: আসলে আগামী সপ্তাহে মেহরিনের জন্মদিন। ও একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান করবে। আমাদের সবাইকে দাওয়াত দিচ্ছে।

নূর অবাক হয়ে মেহরিনের দিকে তাকাল।

নূর: তোমার জন্মদিন? আগে বলোনি তো!

মেহরিন: আরে, পরিচয়ই তো হলো সেদিন। এখন বলছি। আগামী শুক্রবার আমার জন্মদিন। বাসায় না, একটু অন্য রকম জায়গায় অনুষ্ঠান করব।

তৃষা: অন্য রকম মানে বেশ সুন্দর একটা রেস্টুরেন্টে। জায়গাটা নাকি অনেক সুন্দর!

মেহরিন: শুধু রেস্টুরেন্ট না, ওখানে আলাদা একটা পার্টি লাউঞ্জও আছে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান হবে। তোমরা সবাই আসবে কিন্তু।

নূরের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল। সে দাওয়াত পেয়ে খুশি হয়েছে, কিন্তু নিজের পরিস্থিতির কথাও তার মনে পড়ল। বাড়ি থেকে সন্ধ্যায় বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া সহজ হবে না। তাছাড়া উপহার কেনার মতো অতিরিক্ত টাকাও তার কাছে নেই।

মেহরিন নূরের মুখের পরিবর্তন লক্ষ করল।

মেহরিন: কী হলো? তুমি কি আসতে পারবে না?

নূর: তা না। আসলে আমাকে বাড়িতে জিজ্ঞেস করতে হবে।

মেহরিন: অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে। আমাদের বন্ধুত্বের শুরুতেই তুমি না এলে আমার খারাপ লাগবে।

নূর: আমি চেষ্টা করব, মেহরিন।

তৃষা: শুধু চেষ্টা করলে হবে না। আমরা কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

নূর মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

নূর: ঠিক আছে। আমি কথা দিচ্ছি, যাওয়ার চেষ্টা করব।

মেহরিন: এই তো! আর উপহার নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। তোমাদের উপস্থিতিই আমার জন্য যথেষ্ট।

কথাটা শুনে নূরের বুকটা একটু হালকা হলো। তবু মনে মনে সে ভাবল, বন্ধুর জন্মদিনে খালি হাতে যাওয়াটা তার ভালো লাগবে না। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে ছোট্ট কিছু একটা দেওয়ার ইচ্ছা তার রয়ে গেল।

ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ায় তারা আর কথা বাড়াতে পারল না।

সেদিনের বাকি সময়টুকু নূর পড়াশোনায় মন দিলেও জন্মদিনের দাওয়াতের কথাটা মাথায় ঘুরতে থাকল। অনেক দিন পর সে কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ভাবছে। নিজের বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময় কাটানো, হাসাহাসি করা—এমন সাধারণ আনন্দগুলোও তার জীবনে খুব কম এসেছে।

কিন্তু বাড়ির কথা মনে পড়তেই সেই আনন্দের সঙ্গে উদ্বেগও জুড়ে গেল।

বিকেলে বাড়ি ফিরে নূর নিজের কাজগুলো শেষ করে চাচার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল। আরিফুল সিকদার তখন বসার ঘরে বসে কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন।

নূর ধীরে ধীরে তাঁর কাছে গেল।

নূর: চাচা, আপনার সঙ্গে একটা কথা বলব?

আরিফুল সিকদার: বল, মা। কী হয়েছে?

নূর: আমার কলেজের এক বান্ধবীর জন্মদিন আগামী শুক্রবার। ও আমাদের কয়েকজনকে দাওয়াত দিয়েছে। সন্ধ্যায় একটা রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠান হবে। আমি যদি যাই, আপনার কোনো আপত্তি আছে?

আরিফুল সিকদার কাগজপত্র সরিয়ে নূরের দিকে তাকালেন।

আরিফুল সিকদার: তোর বান্ধবীর নাম কী?

নূর: মেহরিন। ও আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। তৃষা আর সামিয়াও যাবে।

আরিফুল সিকদার: তুই যেতে চাস?

নূর একটু ইতস্তত করল।

নূর: হ্যাঁ, চাচা। ওরা সবাই যাবে। আমারও যেতে ইচ্ছা করছে। তবে আপনি অনুমতি না দিলে যাব না।

আরিফুল সিকদার কিছুক্ষণ নীরব থেকে নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু হারিয়েছে। বাবা-মা বেঁচে থাকলে হয়তো তারা নিজেরাই তাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে এমন অনুষ্ঠানে পাঠাতেন। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দ করার সুযোগটুকু তারও প্রাপ্য।

আরিফুল সিকদার: ঠিক আছে, মা। তুই যেতে পারিস। তবে কোথায় যাচ্ছিস, কার সঙ্গে থাকবি—সেগুলো আমাকে জানাবি। অনুষ্ঠান শেষ হলে বেশি রাত করবি না।

নূরের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল।

নূর: সত্যি, চাচা? আপনি আমাকে যেতে দেবেন?

আরিফুল সিকদার: হ্যাঁ, দেব। পড়াশোনার পাশাপাশি একটু আনন্দ করারও দরকার আছে। তবে নিজের খেয়াল রাখবি।

নূর: ধন্যবাদ, চাচা!

আনন্দে নূরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে চাচাকে সালাম করে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, ছোট্ট একটা ইচ্ছা পূরণ হওয়ার আনন্দও কত বড় হতে পারে!

কিন্তু তার এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

রাতের খাবারের সময় শায়লা সিকদার জানতে পারলেন যে নূর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।

শায়লা সিকদার: কী শুনছি? নূর নাকি শুক্রবার সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে যাবে?

আরিফুল সিকদার: হ্যাঁ। ওর কলেজের এক বান্ধবীর জন্মদিন।

শায়লা সিকদার: বাহ! এখন তো দেখছি পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরাঘুরিও শুরু হয়েছে। আমাদের বাড়ির মেয়েরা আবার এসব অনুষ্ঠানে যায় নাকি?

আরিফুল সিকদার: ও তো ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানে যাবে। বন্ধুরা সবাই থাকবে।

শায়লা সিকদার: বন্ধুরা সবাই থাকবে বললেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? মানুষ কী বলবে, একবার ভেবেছেন?

নূর চুপচাপ বসে রইল। সে কোনো ঝগড়ার কারণ হতে চায় না।

আরিফুল সিকদার: নূরকে আমি অনুমতি দিয়েছি। ও পড়াশোনায় অবহেলা করছে না। বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময় কাটালে ক্ষতি কী?

শায়লা সিকদার: আপনি সব সময় ওর পক্ষ নেবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বাড়ির নিয়মকানুন বলে তো একটা কথা আছে!

আরিফুল সিকদার: বাড়ির নিয়ম মানা আর ওর প্রতিটি ইচ্ছা আটকে রাখা এক কথা নয়, শায়লা।

শায়লা সিকদার বিরক্ত হয়ে চুপ করে গেলেন। তবে তাঁর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বিষয়টা তিনি সহজভাবে নেননি।

নূর দ্রুত নিজের খাবার শেষ করল। সে বুঝতে পারছিল, অনুমতি পেলেও শুক্রবারের অনুষ্ঠান নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হতে পারে।

তবু অনেক দিন পর তার মনে ছোট্ট একটা আশার আলো জ্বলেছে। সে সেই আলোটুকু নিভে যেতে দিতে চায় না।

পরের কয়েক দিন নূর নিয়মিত কলেজে গেল, ক্লাস করল, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাল। মেহরিন প্রায় প্রতিদিনই জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা তুলত। কোথায় বসবে, কী খাবে, কীভাবে সবাই একসঙ্গে ছবি তুলবে—এসব নিয়ে তাদের মধ্যে হাসাহাসি চলত।

নূর তাদের কথা শুনে হাসত। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে মাঝেমধ্যে চুপ হয়ে গেলেও বন্ধুদের আনন্দে সে নিজেকে সামিল করার চেষ্টা করত।

জন্মদিনের আগের দিন মেহরিন তার ফোনে অনুষ্ঠানের জায়গার একটি ছবি দেখাল।

মেহরিন: দেখো, নূর! জায়গাটা কেমন সুন্দর! এখানেই অনুষ্ঠান হবে।

নূর ছবিটার দিকে তাকাল। ঝলমলে আলো, সুন্দর সাজসজ্জা, আর বড় বড় কাচের জানালায় ঘেরা বিলাসবহুল পরিবেশ। এমন জায়গায় সে কখনো যায়নি।

নূর: সত্যিই অনেক সুন্দর।

তৃষা: কাল কিন্তু সুন্দর করে সেজে আসবে। আমরা সবাই ছবি তুলব।

নূর: আমার তো তেমন সুন্দর পোশাক নেই।

মেহরিন: আরে, তোমার যেটা আছে সেটাই পরবে। সুন্দর পোশাকের চেয়ে সুন্দর মন বেশি জরুরি।

সামিয়া: একদম। আর তুমি এমনিতেই সুন্দর। এত চিন্তা করো কেন?

নূর লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল।

নূর: আচ্ছা, তোমরা আর আমাকে নিয়ে মজা করো না।

মেহরিন: ঠিক আছে, আর করব না। কাল দেখা হবে। আর হ্যাঁ, দেরি করবে না!

নূর: চেষ্টা করব সময়মতো পৌঁছাতে।

ফোন রাখার পর নূর আলমারি খুলে নিজের পোশাকগুলো দেখতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে একটা সাধারণ, পরিপাটি পোশাক বেছে নিল। পোশাকটা খুব দামি নয়, কিন্তু পরিষ্কার আর সুন্দর। সেটি বিছানার ওপর গুছিয়ে রেখে সে আবার বই নিয়ে বসল।

তার সামনে এখনো অনেক পড়াশোনা। জন্মদিনের আনন্দের মাঝেও সে নিজের দায়িত্ব ভুলে যেতে চায় না।

রাত বাড়ল। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নূরও বই বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করার আগে সে মনে মনে ভাবল, আগামীকাল হয়তো তার জীবনের একটা সুন্দর দিন হবে।

সে জানত না, সেই সন্ধ্যায় তার সামনে এমন এক পরিস্থিতি এসে দাঁড়াবে, যার পরিণতি তার কল্পনারও বাইরে।

চলবে...

🚫⚠️ সতর্কবার্তা ও লেখিকার অনুরোধ ⚠️❌

এই উপন্যাসটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব মৌলিক লেখা। লেখিকার অনুমতি ছাড়া কোনো অংশ কপি, নকল বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। অন্যের লেখা নিজের নামে প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।

লেখার মধ্যে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকবেন। 🙂

✍️ লেখিকা: Alifa Madbar

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন