নিশি রাতে আকাশে বাঁকা চাঁদের
নরম আলোয়,ভিজে আছে চারপাশ সব পথঘাট, নীরবতা ভেঙে দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে আসছে,
মনে হয় প্রকৃতি যেন গোপন কিছু বলছে খুব ধীরো।চাঁদের আলো গিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে প্রতিটা ধানের শিষ,
ক্ষেত জুড়ে মৃদু হাওয়ায় দুলছে অর্ধপাকা ধান, বাতাসের দোলায় কদম ফুল গাছটি দুলছে ,তাতে ফুল থেকে পাপড়ি ঝরে পড়ছে।সবটা মিলিয়ে মনে হচ্ছে কেউ হালকা সুর টেনে গান গাইছে _
এমন পরিবেশ মিলনের আদর স্পর্শে রেবেকা দিশেহারা, মিলন আজ ইচ্ছা করেই রেবেকাকে বেশি বেশি জ্বালাচ্ছে,এইতো এখন বাম হাত বাড়িয়ে রেবেকার ডান পায়ের তালুতে একটু একটু সুরসুরি দিচ্ছে আর তাতেই রেবেকা খিলখিল করে হেসে উঠছে,যেই হাসি শুনে মিলনও হো হো করে শব্দ তুলে হেসে বলে
মিলন::::::: বিবি তোমার হাসির শব্দ দেহি মেলা ভয়ংকর, আমার কলিজায় গিয়া বিধতাছে, খবরদার বিবি তোমার হাসি যেন অন্য কেউ না দেহে,এই শব্দ যেন অন্য কারো কানে না যায়।
মিলনের কথার গভীরতা রেবেকা কিছু বুঝতে পারেনি ঠিকঠাক,তবে হাসি থামালো মূহুর্তেই।
রেবেকা::::::: আমি তো ইচ্ছা কইরা হাসি নাই,আন্নে সুরসুরি দেন দেহাই তো হাসছি
মিলন:::::: হ তয় সুরসুরি ছাড়া,তুমি নিজে নিজে একটু হাসবার পারনা আমার লগে
রেবেকা:::::: কি আরচাইর্য ! আমি কি পাগলী যে হুদাই হাসমু।
মিলন::::::: হ হাসবা, এহন থেইকা আমি সামনে আইলেই হাসবা বুঝছোনি বিবি,হাসবা না।
রেবেকা ছোট তবে পাগল না, মিলনের এমন আবদার তাকে ভাবাচ্ছে,কারন ছাড়া মানুষ কি করে হাসতে পারে, হাসি কান্না সবটাই ঘটনা ক্রমে পরিস্থিতি বুঝে নিজে থেকেই আসে,একা একা কি এগুলো আনা যায়। মিলন চুপ করে থেকে রেবেকার মনোভাব বুঝতে পারলো,সে অগোচরে মুখ লুকিয়ে হাসলো, সে ইচ্ছা করেই তার বিবির কাছে এমন আবদার রেখেছে,এটা দেখতে যে, সবসময় তার সব কথায় অবুঝের মতো আচ্ছা আচ্ছা করা রেবেকা এমন অদ্ভুত আবদারে কি বলে, কিন্তু এইবার রেবেকা হুট করে উত্তর না দিয়ে চুপ করে ভাবতে দেখে মিলন সন্তুষ্ট হলো।
মিলন:::::::: কি হইলো বিবি কতা কওনা কেন?
রেবেকা মিলনের কোলেই নড়েচড়ে উঠে, চাঁদের আলোয় ছোট ছোট চোখ করে মিলনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
রেবেকা::::::: সবাই তো খুশি হইলে হাসে
মিলন::::::: আর তুমি
রেবেকা::::::: আমিও
মিলন:::::: ওহো তাইলে বিবি মারাত্মক হাসি দেহার লাইগা তোমারে খুশি করন লাগবো?
রেবেকার ঝটপট উত্তর
রেবেকা::::::: হ লাগবো
মিলন::::::: আইছা তয় তাই করুম
কথাটি বলেই মিলন রেবেকা কে কোল থেকে নামিয়েই পাশে বসালো, তারপর লুঙ্গির কোচ থেকে একটা ছোট কাগজের প্যাকেট বের করে হাতে নিলো, তার ভেতর থেকে রুপার একজোড়া নূপুর বের করে, রেবেকার পা জোড়া নিজের কোলে তুলে নিতেই রেবেকা চমকালো, তবে কিছু বোঝার আগেই,এক এক করে নূপুর তার পায়ে পরিয়ে দিল। রেবেকার আলতা পরা পায়ে নূপুর জোড়া ঝনঝন শব্দ তুলছে। মিলন মোহনীয় দৃষ্টিতে রুপার নুপুর পায়ে আলতা পড়া পা জোড়া ছুঁয়ে দেখছে,তাতেই রেবেকার শরীরটা শিউরে উঠে শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে পরে, সে পা জোড়া মিলনের কোল থেকে নামিয়ে নিতে চাইলোও তবে মিলন বাধা দিল বলল:
মিলন::::::: বিবি তোমার আলতা পড়া পায়ে একখান চুমা খাইতে ইচ্ছা করতাছে,কি করুম?
রেবেকা তা শুনেই দ্রুত মিলনের কোল থেকে পা নামিয়ে নেয়, বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়।তার কাছে আজ এই লোকটার সব আচরণ অদ্ভুত লাগছে। রেবেকার এরূপ আচরণে মিলন আবারও হো হো করে হেসে উঠে।
মিলন কদম গাছের গোড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রেবেকার দিকে এগোতে লাগলেই, রেবেকা বাড়ির দিকে হাটা ধরে আর দ্রুত বলে:
রেবেকা::::::: লন এখন বাড়িত যাই, বু আমারে ডাইকা না পাইলে কাইজ্জা (বকা) করবো।
মিলন রেবেকাকে আরো চমকে দিতে, দ্রুত রেবেকার কাছে গিয়ে আবারো তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো, রেবেকা কিছু বলবে তার আগেই তাকে অবাক করে দিয়ে মিলন গান ধরলো।
~~~~কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে
সিনার লগে বাঁধি রাইক্কুম তোঁয়ারে, ও ন'নাইরে
~~~~কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে
~~~~তুই হইলা আঁর মধুর বাঁশি মনেরই আশা
তোঁয়ারে ছাড়া খোয়ানডে ফাইয়ুম ভালবাসা
.........তুই হইলা আঁর মধুর বাঁশি মনেরই আশা
তোঁয়ারে ছাড়া খোয়ানডে ফাইয়ুম ভালবাসা
~~~~সুন্দর সুন্দর গান শুনাইয়ুম-
সুন্দর সুন্দর গান শুনাইয়ুম নিশিত জাগিয়ারে, ও ন'নাইরে
~~~~~কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে
সিনার লগে বাঁধি রাইক্কুম তোঁয়ারে, ও ন'নাইরে
কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে ।
গানটি গাইতে গাইতেই মিলন রেবেকা কে কোলে নিয়ে বাড়ির পথে হাটে, গান শেষ হতেই মিলন রেবেকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
মিলন::::: আমার চাঁন্দের টুকরা বিবি~কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে, বুঝছো ?
রেবেকা গানের মানি সবটা না বুঝলেও,মিলনকে গাইতে শুনেই অবাক হয়েছে,বিস্মিত মিলনের মুখে তাকিয়েই বলে
রেবেকা::::: হ বুঝছি।
মিলন জানে রেবেকা পুরো মানেই বুঝতে পারেনি,সে রেবেকার কপালে চুমু খায়, হেঁটে এসে রেবেকা কে কোল থেকে নামিয়ে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে, কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে
মিলন::::::: কচু বুঝছো তুমি, বুঝলে আমার কোল থেকে নামতা নি ? আমার কোলেই থাকতা, আমার কইজায়র ভিতরে নিজে নিজেই গাঁথি যাইয়া, একবার খালি পরিপক্ক হয় বিবি আমার কোলের তনে নামার বিচার করমু তোমার।
রেবেকা ভয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দেখে মিলনকে,
কথাটি বলেই মিলন অন্ধকারে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো, পেছনে ফিরে আর তাকায় না,মুখে তার বড় হাসি ঝুলছে, ইদানিং তার মনটা কেমন জানি উরু উরু করে, কেন করে বিবিকে আবেগের জোয়ারে যা ইচ্ছা তাই বলে দিচ্ছে সেই খুশিতে, নাকি বিবি বড় হচ্ছে সেই খুশিতে।
****************
ঈদের আগের রাত থেকেই রেবেকার মনটা কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে আছে। নিজের বাবার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে—মায়ের হাতের সেমাই, ছোট ভাইবোনদের সাথে হাসাহাসি, আর সেই চেনা উঠান। কিন্তু এখন সে অন্য বাড়ির বউ।
ঈদের সকালে ভোরে শাশুড়ির ডাকে ঘুম ভাঙে রেবেকা
খালেদা::::::রেবেকা, ওঠো বৌমা,আইজ অনেক কাজ।
রেবেকা ঘুম ঘুম চোখে উঠেই রান্নাঘরে যায়। শাশুড়ি তাকে সেমাই ভাজা আর খেজুরের গুড়ের ক্ষীর বানানো শেখাবে আজ। রেবেকার খুব ইচ্ছা শেখার, যদিও মাঝে মাঝে রাবেয়া বেগম তাকে শিখিয়েছে তবে তার রান্না করার সেমাইয়ে মিষ্টি কম বেশি হয়ে যায়।এই কথা খালেদা খাতুন কে একদিন বলেছিল তাই সে পাশে বসে বলে বলে আজ রেবেকার হাতেই সেমাইয়ের চিনি দেওয়ালো, নিজের হাতে করতে করতেই না একদিন শিখবে। নাস্তার কাজ শেষ করেই রাবেকা ছুটে নিজের ঘরে যায়, এবং মিলনের কথা মত সকালে একটা শাড়ি পড়ে বের হয়।
নতুন লাল-সবুজ শাড়িটা পরে রেবেকা যখন উঠানে আসে, তখনি গ্রামের অন্য বউদের সাথে তার চোখাচোখি হয়,সকলে অবাক চোখে তার সৌন্দর্য দেখে, আশেপাশার বাড়ির বউরা হঠাৎ হঠাৎ আসে এই বাড়িতে, তাদের সাথে রেবেকার একটু একটু কথা হয়েছে ,তবে আমেনা বেগম এর জন্য বেশি দূর কথা আগায়নি কখনো। গ্রামের মানুষ একেক জন একেক কথা বলবে তাই সবার থেকে রেবেকা কে দূরে রাখেন তিনি।
রেবেকা দেখতে সুন্দরী তার ওপর শাড়িটা ও চমৎকার সুন্দর, অনেকেই মুগ্ধ হচ্ছে অনেকেরই আবার ঈর্ষা জন্ম নিচ্ছে মনে।
ঠিক তখনই মিলনের বাবার চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে গুলনাহার এসে হাজির হয় তাদের উঠোনে,
গুলনাহার আসছে বাপের বাড়ি ঈদ করতে, সম্পর্কে মিলনের চাচাতো বোন একই বংশের, দুইটা বাড়ির পরের বাড়িটা তাদের।
এই গুলনাহারের মিলন হচ্ছে আবার প্রথম ভালোবাসা, মিলনের পেছনে দিনরাত পরে থাকতো, ভালোবাসার কথা বলতো, এমনও হয়েছে গভীর রাতে এসে মিলনের জানালায় টোকাও দিয়েছে, মোট কথায় মিলনকে নিজের করে পাওয়ার জন্য এমন কিছু নাই যে সে করেনি। এতসব ভালোবাসা গুলো খুব কমই পূর্ণতা পায়।আর তাই তো সে আজ অন্য বাড়ির, অন্য কারো বউ।
মিলনে বিয়ে করেছে শুনে অনেক কেঁদেছে সে, এমনি মিলনের বিয়ের পরে বাবার বাড়ি আসা বন্ধ করে দিয়েছিল, তবে ঈদের বাজার নিয়ে তার বাবা আর ছোট বোন যখন তার বাড়িতে যায়, তখন ছোটবোনের কাছে জানতে পারে মিলনের বউ এখনো তার দাদীর সাথেই ঘুমায়। তখন গুলনাহার বুঝতে পারে এর কারণ।সে প্রচুর খুশি হয়ে যায়, মিলন এখনো মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করতে পারেনি তাই ভেবে। কারণ বিবাহিত হলেও তার মনে এখনো মিলনের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা আকর্ষণ আছে,হোক সেটা নি ষি দ্ধ, মিলন তার বয়সন্ধিকালের প্রথম আবেগ, তার উপর থেকে আকর্ষণ কখনোই কমে যাওয়ার নয়। মিলনের বউ অপরিপক্ক এই সুযোগে যদি মিলনকে একটু বোঝানো যায়, কিছু একটা করে যদি ভালোবাসার মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া চায়।
তাই সে বাপ বোনের সাথেই চলে এসেছে ঈদ করার বাহানায়।
এখন তো সতেরো বছরের গুলনাহার টসটসে যুবতী, দেখতেও সুন্দরী আছে। সেই তেরো বছরের গুলনাহারের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে সুন্দরী হয়েছে।
**********************
সেই ছোট থেকেই গুলনাহারকে নাত বউ বানাতে আমেনা বেগমের আপত্তি ছিল না, খালেদা খাতুনের কথা যে এই পরিবারে চলে না তা গুলনাহার জানতো, তাই এটা ওটা করে সব সময় আমেনা বেগমের মন জয় করে রাখতো গুলনাহার,কিন্তু বাদল মাস্টার কখনোই একই বংশে ছেলে বিয়ে করাবে চায় নি। গুলনাহারের মিলনের প্রতি উন্মাদনা দিন দিন বাড়ছিল, সাথে বয়সটাও বেড়ে চোদ্দ পার হয়েছিল,নিজের অনেক বিয়েও ভেঙেছে নানান কাহিনী করে, একপর্যায়ে তার পাগলামি জনসম্মুখে প্রকাশ্যে আসে, এবং কাউকে তোয়াক্কা না করে, সে সবার সামনেই মিলনের জন্য বেহায়াপনা করতো শুরু করে।
তখন গ্রামবাসী গুলনাহার কে পাগলি উপাধি দেয়, তার আচরণ মানসিক ভারসাম্যহীন পাগলের মতোই ছিল, তখন বাধ্য হয়ে পরিবারের লোক তাকে আটনোর জন্য এবং সম্মানের কথা চিন্তা করে,তার পায়ে শিকল পরিয়ে ঘরে আটকে রাখে।
গুলনাহার পাগল হয়নি ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পেরে অল্প বয়সে বিষন্নতায় আক্রান্ত(ডিপ্রেশন)হয়ে পাগলামি শুরু করেছিলো। সেই সময় নানান জায়গা থেকে হুজুর- কবিরাজ এনে তাকে বাড়িতে চিকিৎসা করা হয়, বেশিরভাগ সময় হোমিওপ্যাথি ঘুমের ঔষধি খাইয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, প্রায় এক বছর একটানা তাকে এভাবে রাখা হয়েছিলো।
বাদল মাস্টার সেসব ঘটনাতে আরো নারাজ হয়ে যায়, হাজার হোক বংশের একটা মান সম্মান আছে। তখন মাস্টার বাধ্য হয়ে মিলনকে জিজ্ঞাসা করে সে কি বিয়ে করতে চায় গুলনাহার কে।
বোন আপন হোক আর চাচাতো বোন তো বোনই, এই উক্তিতে মিলন কিছুতেই রাজি হয় নি, উল্টো বাড়ি থাকাই বন্ধ করে দেয়, সে সময়টায় মিলন দোকানেই থেকেছে।
তখন গুলনাহার কে নিয়ে যাওয়া হয় তার নানার বাড়ি,অবশেষে অনেক কষ্টের পর তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গুলনাহার সংসার তো করছে,একটা বাচ্চাও আছে, তবে প্রথম ভালোবাসা, প্রথম আবেগ এত সহজে ভোলা সম্ভব? কখনই না।
তার মনটা এখনো মিলনের দখলে।
*********************
রেবেকা কে দেখেই গুলনাহারের চোখ দুটো জ্বালাপোড়া করে উঠে, চোখে জল জমে।
গুলনাহার::::::নতুন বউ, কেমন লাগতাছে হোরবাড়িত(শশুর বাড়ি)তোমার প্রথম ঈদ?
মিলনের প্রতি অন্যরকম কিছু অনুভব করার পর থেকেই গুলনাহার ভাইসাব না ডেকে মিলনসাব বলে ডেকেছে, তাই রেবেকা কে ভাবি ডাকেনাই সে বউ ডাকলো।ছোট্ট রেবেকা লাজুক হেসে শুধু বলে;
রেবেকা:::::: ভালোই লাগতাছে।
রেবেকার মিষ্টি কন্ঠস্বর শুনেই গুলনাহারের বুক হাহাকার করে উঠে। হঠাৎ তার চোখ মুখ পরিবর্তন হয়ে গেল, চেহারায় কেমন হিংস্রতা ফুটে উঠলো, তার মনে হলো রেবেকা তার হক কেরে নিয়েছে।হুট করেই সে কাঁপা কন্ঠে বলে বসলো;
গুলনাহার:::::: আমার হক ভোগ করতাছোস ভালো তো লাগবেই।
রেবেকা বুঝতে পারলো না কিছুই,আর সময়টাও পেলোনা তার আগেই গুলনাহার চেহারার রং আবারো পরিবর্তন হয়ে গেল, এবার একদম অসহায় দেখাচ্ছে তাকে।রেবেকা হাত ধরে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল আর বলতে লাগলো
গুলনাহার:::::: হন বউ আমার কোনো আপিত্তি (আপত্তি) নাই তোরে লইয়া, আমি তোর হতিন (সতীন) হইয়া থাকুম, মিলনসাবরে কছনা আমারে রাইহা দিবার, আমি বান্দির মতো পইরা থাহুম এক কোনায়, তবুও কছনা হেরে আমারে থাকবার দিতে, আমি জীবনেও এতো কইরা কাউরেই চাইবার পারতাম না যতোডা তারে চাইছি।আমারে দয়া কর, আমি ফহিন্নির মত পইড়া থাহুম আমারে দয়া কর।
গুলনাহারের চিৎকার চেঁচামেচি কান্নাকাটি দেখে রেবেকা প্রচুর ভয় পায়, পুরো বাড়িতে লোক জড়ো হয়ে যায়, কেউ অবাক হয়নি এমন ঘটনায়, তারা তো এইসব আগেও দেখেছে, পার্থক্য তখন রেবেকার যায়গায় মিলনের দাদি,মা আথবা মিলন নিজেই ছিল কিন্তু আজ তার বিবি রেবেকা দাঁড়িয়ে।
গুলনাহারে বাড়ির লোকজন এসেছে তাকে নিতে তবে কেউ পারছে না,ধরতে যেতেই গুলনাহার তাদের এলো পাথরে কামড় বসাচ্ছে, একেবারে সেই আগের পাগল গুলনাহার। এমন দৃশ্যে ছোট রেবেকা কাঁপছে,ভয়ে কান্না করছে।গুলনাহার তার দিকেই ছুটে আসছে বারবার, দুই হাতে তাকে খামচে ধরতে চাইলে, সাথে মিলনকে না পাওয়ার কষ্টে চিৎকার আহাজারি তো আছেই,তাকে দেখতে খুব ভয়ংকর লাগছে এই মুহূর্তে। খালেদা খাতুন এগিয়ে এসে রেবেকাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে,তা দেখেই গুলনাহার আরো পাগলামি শুরু করে, আবারো তার মনে হলো তার জায়গা, তার হক রেবেকা কেড়ে নিচ্ছে।এতো সময় তো মিলনের জন্য চিৎকার করেছে, কিন্তু এখন হিংসায় জ্বলে পুড়ে যাওয়া অন্তর নিয়ে,রেবেকার সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করা শুরু করেছে,
গুলনাহার::::::: ঐ খা ন কি ছেড়ি,বে শ সা,
পে শা গা র একটা তোর বিয়া হয়েছে তিন বছর, এহনো শইলেরডা(মা সি ক) হয় নাই, তুই রুইগা (অসুস্থ) বউ, তোর কহনোই শইলেরডা হইবোও না,তুর কহনোই মিলনরে আবুদুবাই এর সুখ দিবার পাইতি না, আমার মিলনরে কাইরা নিছোস আমার তনে,তোর সংসার হইবোনা, আমি ছাড়া মিলন কাউর লগেই সুখ পাইবো না, তুই মইরা যা, তুই এই বাড়িতনে বাইড়া এহনি বাইড়া।
এসব শুনে রেবেকা শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠলো, ছোট্ট শান্ত রেবেকা হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে যায়,রাগে দিক দিশা হারিয়ে বারান্দায় থাকা কাঠের পিঁড়ি হাতে তুলে নেয় এবং ছুঁড়ে মারে গুলনাহারের দিকে, পিঁড়ি গিয়ে লাগে তার মাথায়, কপালে আঘাত পায়, মাটিতে লুটিয়ে পরে মূহুর্তেই, উপস্থিত সকলে অবাক হয় প্রচুর, রেবেকা তখনো রাগে ফস ফস করছে।গুলনাহারের মা হায় হায় করছে, আমেনা বেগম বিরক্ত গুলনাহারের আচরণে তবে রেবেকা সম্পর্কে বলা কথাগুলো তাকে ভাবাচ্ছে, খালেদা খাতুন খুশি হয়েছে মনে মনে তবে প্রকাশ করছে না।
বাড়ির পুরুষ গুলো ঈদের নামাজ পরে বাড়ি ফিরেছে মাত্র, মিলন উঠেনে পা রেখেই,সম্পন্ন পরিবেশ দেখে পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছে, তবে সে খুব চিন্তিত রেবেকা কে দেখে,তার বিবি যে কি কান্ড ঘটিয়েছে তা বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে উপস্থিত থাকা প্রতিবেশীদের মুখে মুখে শুনে নিয়েছে।
এত আহাজারি এত চিৎকার-চেঁচামেচি এত মানুষের ভিড়ে গুলনাহার মিলনকে দেখেই হঠাৎ পাগলামি একদম থামিয়ে দেয়ে, অত্যন্ত ভদ্রভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ি থেকে ধুলা-বালি মাটি,ঝেড়ে, লাজুক হেসে, মাথায় বৌ দের মত ঘুমটা টেনে, মিলনের দিকে এগিয়ে এসে মিলনের সাথে কথা বলতেই নেয়
গুলনাহার::::: মিলনসা......
আআআআআআআআ
কথাটি শেষও করতে পারেনি তার আগেই রেবেকা বারান্দায় থাকা শলার ঝাড়ু ছুড়ে মারে তার দিকে। পিঁড়ি ছুড়া তো দেখেনি মিলন তবে ঝাড়ু ছুড়া দেখে সে প্রচুর অবাক হয়েছে, রেবেকা তখনো ফস ফস করছে রাগে, রেবেকার চোখ দুটো অসম্ভব লাল, নিরব কান্না করছে গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।হঠাৎ মিলন অনুভব করলো তার বিবি শান্ত কিন্তু রেগে গেলে অনেক ভয়ংকর, মিলনের অন্য কারো অনুভূতির পরোয়া করার সময় নেই, এই মুহূর্তে সে শুধু তার বিবির কথাই ভাবছে এবং রেবেকার এই রূপ দেখে তার বুক কাঁপছে, ভয় লাগছে, মিলন শুকনো ঢোক গিলে দ্রুত রেবেকার হাত ধরে বলে
মিলন:::::: ঘরে লও বিবি,ওয় একটা পাগলী
কিন্তু রেবেকা মিলনের হাত ছাড়িয়ে নিতে চায় তার চোখ এখনো গুলনাহারের দিকে, যেন আরো কিছু ছুড়ে মারা বাকি, ঈদের সকালটা নষ্ট হয়ে গেছে দিনটা নষ্ট করতে চায়না মিলন,তাই সবার সামনেই রেবেকার কোমড় জড়িয়ে উঁচু করেই তাকে ঘর নিয়ে গিয়ে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিলো।
তা দেখে গুলনাহার পাগলের মত ছুটে এসে দরজায় দুহাতে বারি দিতে থাকে,এবং আবারো চিৎকার হাজারি করতে শুরু করে। আবারো সেই একই কথা, রেবেকা সম্পর্কে বাজে কথা, অভিশাপ গালাগালি। প্রথম বারে বলা কথাগুলো মিলন না শুনলেও এখন বলা তার বিবি সম্পর্কের কথাগুলো মিলনের স্পষ্ট শুনলো। যা তা সহ্য হলো না মোটেও। রেবেকার থেকেও মিলন হাজার গুণ রেগে গেলো, পুরুষ মানুষের রাগ, এত বছরেও যেটা করেনি সেটাই করে বসলো মিলন। মাটির ঘরের কাঠের দরজার চিপায় রাখা সাপ মা রা র শক্ত বাস টা হাতে তুলে নিলো। রেবেকা কিছু বোঝার আগেই দরজা খুলে গুনাহারের কোমরে একটা বারি বসালো
মিলন:::::: শু য়ো রে র বাচ্চা মুখ বেশি চলে কারে কি কছ, এক বাচ্চার মা হইছস এখনো ভীমরতি ছুটল না,আইজ তোর ভীমরতি টিমরতি সব ছুডামু।
কথাটি বলেই আরো একটা বাড়ি হাঁটুর ওপরে। মুহূর্তে গুরনাহার ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে মিলনের পা আঁকড়ে ধরে। কান্না করতে করতে আহাজারি করে
গুরনাহার::::: মা রো আরো মা রো তোমার হাতে
ম র লে ও সুখ খুব সুখ অনেক সুখ, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ মা রো না মা রো
কথাগুলো বলেই গুলনাহার কাঁদতে শুরু করে। এ পর্যায়ে মিলনের হাত কেঁপে ওঠে, আর কি করবে সে, কি বা করার আছে তার, গুলনাহার তার ছোট বোন হয়।আর বোনই থাকবে, এই সত্যি তো কখনোই মুছে যাবে না। না এই সম্পর্ক কখনো পরিবর্তন হবে।এত বছর ভালোবাসা জিনিসটা সে অনুভব না করলেও এখন করে, তার বিবি প্রতি যে অনুভূতি সে অনুভব করে, সেটা কখনোই কারো উপর করা সম্ভব না। সেই অনুভূতি থেকেই আজ প্রথমবার গুলনাহারের জন্য কষ্ট হচ্ছে তার।তাই হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল
মিলন:::::: চইলে যা এইন থাইকা, আর কোনো দিন আমার চোহের সামনে আইবি না,নয়তো আমার ম রা মুখ দেখবি।
থেমে গেলো গুলনাহার, একদম পাথর হয়ে গেলো, আর একটা শব্দ করল না, রেবেকা তা দেখে অনেক অবাক হলো ,এতো সময় ধরে চিৎকার করা মেয়েটি একদম শান্ত,শুধু অঝোর ধারায় দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
মিলন দরজা লাগানোর আগে রেবেকা দেখলো গুলনাহারের, অসহায় মুখে মাথা নিচু করে চলে যাওয়া।
হঠাৎ রেবেকার মনে পরলো তার দাদি তাকে কিচ্ছা শুনাতো, সওদাগরের কিচ্ছা, রাজকুমার-রাজকুমারীর কিচ্ছা তাদের প্রেমেরর কাহিনী ত্যাগের কাহিনী, সেসব দাদীর বলা কাহিনীর সাথে আজকের পরিস্থিতি মিল আছে একাংশ।
রেবেকা ভাবে তাহলে কি প্রেম এতো কষ্টের। মিলনের প্রতি গুলনাহার এতো প্রেম, কিন্তু প্রেম তো স্বামী স্ত্রীর মধ্যে হয়, মিলন তো তার স্বামী।গুলনাহারের না। তাহলে গুলনাহার এতো প্রেম
কেন দেখাবে তার স্বামীকে কেন।
উঠনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন সব চলে গেছে, মিলনের ঘরের দরজা বন্ধ আমেনা বেগমের সাহস হচ্ছে না এ দরজায় কড়া নেড়ে বলতে নাত বৌ বাহিরে আসো,তাই বাধ্য হয়ে পিঁড়ি পেতে সে বারান্দায় বসে পরে, তাদের পাহাড়া দিতে।
বাহিরের কোলাহল থেমেছে, মিলন এবার লক্ষ্য করে তার বিবির দিকে।যে এখন খুবই বিচলিত ভঙ্গিতে কিছু একটা ভাবছে, মিলন একটু রেবেকা দিকে এগিয়ে যেতেই রেবেকা প্রশ্ন করে
রেবেকা:::::::ঐ ছেড়ি আন্নের প্রেমে পরছে কেমনে,হেয় তো অন্নের বউ না।
এই প্রশ্নের ভয়টাই পাচ্ছিল মিলন,কি বলবে এখন রেবেকা পিচ্চি বোঝালেই কি বুঝবে সব।নাকি উল্টাপাল্টা ভেবে নিবে সব, চিন্তায় মুহূর্তে মিলনের মাথা ঘামতে শুরু করে।