দুপুরের ভ্যাপসা গরমে বাতাসও যেন হাঁপিয়ে ওঠেছে,
রোদে ঝলসে যায় পথ, ছায়াটাও লুকিয়ে কোথাও।
ঘামের ভিজে একাকার মাঠের কৃষকের পুরো শরীরে, সময়টাও চলছে ধীরে।
গরমে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বাদল মাস্টারের অবস্থা একেবারে নাজেহাল,
রোদে পুড়ে শরীর ক্লান্ত, ঘামে ভিজে গেছে জামা আর গাল। ঘাম থেকে শরীরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, নিজের শরীরের গন্ধ নিজের কাছেই অসহ্য লাগছে ,বাড়ি ফিরে দ্রুত গোসল নেওয়া দরকার, মাস্টার হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির বারান্দায় এসে একটু ছায়ার খোঁজে দাঁড়ালেন।
কিন্তু বাড়িতে এসে দেখতে পেল,আবহাওয়ার চেয়েও গরম তার বাড়ির পরিবেশ,কি হয়েছে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, খালেদা খাতুন ছেলের ভয়ে আর কথা লুকালো না,যা যা ঘটেছে সব বলে দিলো।
********************
মাস্টার এই ঘটনায় প্রচুর বিরক্ত তার আম্মা আমেনা বেগম এর উপরে, দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়, মাস্টার মা ভক্ত ছেলে, তাই বেশি দূর মায়ের সাথে তর্কে জড়ায় না, ঠান্ডা মাথায় বুঝালো। আমেনা বেগম নিজেও ছেলেকে অনেক কিছু বললো,যা শুনে মাস্টার নিজেই অনেক চিন্তায় পরে গেলো। তার মা যা বলছে ,তা ভুল মনে হচ্ছে না মাস্টারের। সে যাই হোক তবে এমন কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হয়নি আমেনা বেগমের, তবে মাস্টার এটাও মানে তার আম্মার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না।আমেনা বেগম যে রেবেকা কে পছন্দ করে না এমনটা না , সবাই জানে সে নাত বৌ কে আদর করে কিন্তু তার চিন্তা অনেক গভীরে যা সে সরাসরি বলতে পারল না।
মিলন তখন রেবেকা কে কলে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে আসে, সে অসম্ভব রেগে আছে,তবে বরাবরই
মিলনের রাগ শান্ত ধাঁচের, অতিরিক্ত রাগলে মৌনব্রত(কথা বলা বন্ধ )করে সে,তার এমন রাগ ভয়ংকর বাড়ির সবাই ভয় পায়।
খালেদা খাতুন ভয়ে ভয়ে রেবেকার কাপড় বদলে দিয়ে খাবার এনে খায়িয়ে দিয়ে যায়।
মেয়েটি ভরপেট খেয়েই ঘুমিয়ে পরেছে, মিলন পাশেই তার, কাঠের জানালা খুলে বসে বিড়ি টানছে আর দাদির বলা কথা গুলো ভাবছে, তার প্রত্যেকটা কথা মিলনের হৃদয়ে সুচের মতো বিঁধছে,
যতো যাই হক দাদির তার বিবির মৃ ত্যু কামনা করা ,সে কিছুতেই মানতে পারছে না।
বিড়িতে শেষ টান দিয়ে মিলন রেবেকার পাশে শুয়ে পরে,এই প্রথম তার বিবি তার বিছানায় তাও আবার অসুস্থ। মিলন রেবেকার দুই গালে বিসমিল্লাহ বলে চুমু খায় কয়েকটি,সে খুব ক্লান্ত তার ইদানিং শান্তির ঘুম হয়না,আর গত দুইরাত তো দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি বিবির চিন্তায় তাই, রেবেকা কে কাছে পেয়ে মিলন জড়িয়ে ধরে আলতো ভাবে, তারপর চোখ বুজে আর কিছু সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে।
***************
আমেনা বেগম মিলনের বারান্দায় বসে আছেন পুরো দিন,কারন মিলিন এর ঘরে রেবেকা সেই দুপুর ১২ টা থেকে, নাতির রাগি চেহারা দেখে কিছু তো বলতে পারছে না,তাই এভাবেই বসে পাহারা দিচ্ছে,সে এই বাড়ির মুরুব্বী বাড়ির মঙ্গল অমঙ্গল তো তাকেই খেয়াল রাখতে হবে। অপরিপক্ক বৌ এর সাথে শারীরিক সম্পর্ক অমঙ্গল,তা সে হতে দেওয়ার মহিলা না।
আসরের আযান পরেছে রেবেকার ঘুমটা ছুটে গেলো।মিলন দুপুরে খায়নি,সকালেও না,সে এক ভাবেই রেবেকার পাশেই শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। রেবেকা চোখ খুলে দেখলো মিলনকে, যে এখন তার হাতের পাঁচটা আঙ্গুল নিজের হাতের আঙ্গুলের দ্বারা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।
রেবেকা মিলনকে দেখে অবাক হলো না, তার মনে আছে পুকুর পাড়ে মিলন তার মাথায় পানি ঢেলেছিলো আর বারবার জিগ্গেস করছিল,,
:::কি খাওয়াইছে তোমারে বিবি কও
কিন্তু রেবেকা জানেনা কিসের রস খেয়েছে সে,তা তো দাদি যানে।
রেবেকা উঠে বসলো মিলনের হাতে টান পড়তেই মিলন চোখ খোলে তাকায় রেবেকার দিকে,
রেবেকার সহজ সরল ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে বলে।
রেবেকা:::: আমার খুব খিদা লাগছে
মিলনের হৃদয় শীতল হলো,শোয়া থেকে উঠে বসে বললো
মিলন:::: আমারোও বিবি তুমি কি আমায় ভাত বাইড়া দিবার পারবা ?
রেবেকা:::: হ হ পারমু তো
মিলন:::: তয় চলো আইজ একলগে খাই।
রেবেকা দ্রুত বিছানা থেকে নামতে গেলেই, মিলন বাঁধা দিলো, তার শক্ত দুহাতের বাঁধনে জড়িয়ে ধরলো ছোট শরীরটা।
মিলন:::: থাম বিবি একটু আদর করি পরে যাও কেমন।
রেবেকা:::::: আচ্ছা
সম্মতি পেয়ে প্রতিবারের ন্যায় বিসমিল্লাহ বলেই মিলন চুমু আকে কয়েকটা।তবে আজ তার মন অশান্ত। মিলন অশান্ত মনে আবদার করে বসলো
মিলন:::: বিবি আমি যদি আইজ তোমার শরীর ছুঁইয়া দেহি তুমি কি কিছু কইবা?
রেবেকা বুঝতে পারলো না বললো
রেবেকা :::; কেমনে ছুঁইবেন?
মিলন শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে
মিলন:::: দেখবাই তো, দুক্কু দিতাম না,যদি পাও সহ্য কর। চোখ বন্ধ রাহো
রেবেকা সত্যিই চোখে বন্ধ করে নিলো, মিলন ঠোঁট রাখলাম রেবেকা গলায়,হালকা কামড় দিয়ে চুমু খেলো, তার হাত দুটোও ততক্ষণে বেসামাল হয়ে উঠেছে
রেবেকা:::: আহহহহ্ দুক্কু পাই
মিলন::::: অভ্যাস করো সোনা।
****************************
~সেনপুরে~রেবেকার বাপের বাড়িতে ___
নিজের চালে ফুটা রেখে অন্যের চালে কয়টা ফোটা সেটা গুনতে যাওয়া হচ্ছে গ্রামের মানুষের কাজ। নিজেদের এতো এতো সমস্যা রেখে অন্যর ঘরে কি ঘটেছে সেসব নিয়েই যেন তাদের বেশি আগ্রহ ।
সকাল সকাল পাশের বাড়ির নসিমন এলো মুক্তা বেগম এর কাছে,কোলে তার ৭ মাসের নাতি ছেলে,এসেই প্রথম কথা হলো
নসিমন::::: কি গো চাচি রেবেকার কি এহনো আবু দুবাই হয় নাই,দেহুন আমার জরিনার পোলা এইডা আমার নাতি , রেবেকা তনে এক বছরের ছুডো আমার মাইয়া জরিনা, বিয়াও দিলাম পরে,তয় মা হইলো রেবেকার আগে,চাচি রেবেকার কি কুনো রুগ আছিল নাহি।রুগের কতা না কইয়াই কি বিয়া দিছুইন!!!?হায় হায় কি কমডা করছুইন!!!!
এতোটুকুই কথা তাতেই যেন গরম সীসা ঢালার মতো কাজ হলো/ মুক্তা বেগম আগে থেকেই বিচলিত ছিল, আশেপাশের মানুষ এতদিন দূর থেকে এসব কথা বলেছে,তবে আজ প্রকাশ্যে বাড়ি বয়ে এসে বলল, এভাবে চললে পুরা গ্রাম কথা শোনাবে। রেবেকা কে অপয়া অলক্ষী বলবে, শরীরে দোষ আছে বলবে। মুক্তা বেগম অস্থির হল, বউ রাবেয়াকে ডেকে বলল
মুক্তা বেগম:::: কি লো বউ রেবেকা ১৪ বছরের হইতে আর কয় দিন আছে
রাবেয়া:::: আম্মা ৬ দিন আছে
মুক্তা::: শইলেরডা (মা সি ক) হইলো কি না জানো নি কিছু?
রাবেয়া:::: কেমনে জানুম ওয় তো হোর (শশুর) বাইত , এইনো থাকলে বুঝতাম জানতাম।
মুক্তা::: তয় জালাল রে কও ওরে আনবার যাইতে, আহুক কয়ডা দিন থাইহা যাক,বিহা দিছি ১৪ বছর হইবো এখনো শইলেরডা হয় না কে।
রাবেয়া চুপ করে ভাবে সত্যিই তো বিয়া হইছে তিন বছর এখন (মা সি ক) হওয়া উচিত,বেডা মানুষ এমনেই বসাইয়া খাওয়াবো কয়দিন, বেডা মানুষ শরীরেরও চাওয়া পাওয়া আছে। পুরুষেকে খুশি করার তো ঐ একটা জায়গাই।
***********************
খাবার খাওয়ার পর রেবেকা আবার ঘুমিয়ে গেছে মিলনের ঘরেই, তার শরীর দুর্বল খুব ,যা এবার আমেনা বেগমের সহ্য হচ্ছে না, খানিকটা রেগে গেলো উনি, মাগরিবের আজান পড়বে কিছুক্ষণ পর, এবার উনি নিজেকে ঘরের বারান্দায় বসে আছে।
মিলন বিড়ি টানতে টানতে ঘর থেকে বের হয়ে কোনো দিকে না তাকিয়েই পশ্চিমের দিকে হাঁটা ধরলো, আমেনা বেগম ভাবলো পায়খানায় যাচ্ছে এই সুযোগ রবেকাকে ঐ ঘর থেকে বের করে আনার। যেমন ভাবা তেমন কাজ, আমেনা বেগম দ্রুত মিলনের ঘরে ঢুকে,তবে রেবেকাকে ডাকে না, ডাকলে যদি মিলন শুনে ফেলে,তাই কাছে গিয়ে ঘুমন্ত রেবেকার দিকে হাত বাড়ালো, হাত ধরে টেনে তোলার জন্য। ঠিক তখনই পেছন থেকে
মিলন::::: খবরদার বু হাতখান সরাও কইতাছি।
আমেনা বেগম চমকালও একটু ,তবে মুখমন্ডল গম্ভীর করেই পেছনে ফিরে তাকালো।
আমেনা::::::: হাইঞ্জা হইছে ,এহন এই ঘরে ওয় থাকবার পারতো না।
মিলন:::::: আমার বিবি আমার লগেই থাকবো
আমেনা বেগম হঠাৎ আরো রেগে গেল, মেজাজ দেখিয়ে বললো।
আমেনা:::::: এতো বিবি বিবি করছ কা,বিবিই কি মধু খাওয়াইছে,যে বিবি ছাড়া চলে না !
মিলনও আমেনা বেগমের মতো করেই বললো
মিলন:::::: হ খাওয়াইছে তো,মেলা মজার মধু,যেই মধু খাইয়া আমি পাগল হইছি এহন বিবিরে ছাড়া চলতাছেই না।
আমেনা::::::: সাওয়ার পেচাল পারিস না, মধু খাওয়ানের মতো মধু আছেনি এই ছেমড়ির ! বুড়ি দামরি হইতাছে এহনো আবুদুব (বাচ্চা) হওয়ার লায়েক না এই মা গি।
মিলন:::::: ওর মধু নাই , তোমার তো আছে,এতোই যহন তোমার, আমার আবু দুবাই এর শখ,তাইলে আও তোমারে দেই আবুদুব।
আমেনা বেগম বুঝতে পারলো,নাতির রাগ সে তর্ক না করে বোঝানোর সুরে বলল।
আমেনা:::::: বিশ্বাস কর ভাই আমি বুঝবার পাইনাই যে এমন জটিল হইবো ঘটনা, আমি তো চাইছি যেন তোর জীবনের জটিলতা কমে।
মিলন:::::: তা যাই হক বু , আমার বিবি ম ই রা যাইবার পারতো,ওয় ছোডো মানুষ তুমি কেমনে ওরে না খাওয়াইয়া রাখলা পুরা দিন, কেমনেই বা ওর ম র ন কাম্য করলা, যা করছো ভালা করো নাই, মুরুব্বি দেইহা আমি কিছু কইলা না,তয় এমন কিছু যানি আর না হয়।
আমেনা বেগমের সহ্য হলো না, নাতির এমন বউ এর পক্ষপাতিত্ব করা, এই জীবনে কখনো তার ছেলে, ছেলের বউ এর পক্ষপাতিত্ব করে নাই তার উপর দিয়ে, কিন্তু নাতি করছে,যেটা তার কল্পনার বাহিরে।
আমেনা::::::: এতো যে দরদ লাগতাছে,যদি কোনো দিন এই মাইয়া পরিপক্ক না হয় তহন কি করবি তুই?
মিলন::::::: পরের চিন্তা পরে, অগ্রিম চিন্তা করমু কা।
আমেনা::::::: কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিম চিন্তা করা লাগে, জীবন কি তর অপেক্ষায় যাইবো নি, দরকার হইলে আরেকখান বিয়া দিমু,ওরে বিদায় করমু মনে রাহিছ।
মিলন নিজেও খুব চিন্তিত এই বিষয়ে, এতো দিন সব ঠিক থাকলেও এখন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, আশেপাশের মানুষের কানাঘুষা তার কানেও আসে, দোকানে দুইটা কর্মচারী বাচ্চা হয়েছে সেদিন দোকানে মিষ্টি বিতরণ করেছে,তার ইচ্ছা করে। তাদের বিয়েও তার বিয়ের পরে হয়েছে।বাচ্চাটা হওয়া মূল চিন্তার বিষয় না, মূল বিষয় হচ্ছে রেবেকা এখনো অপরিপক্ক, তার বিবি অপরিপক্ক থাকলে পারিবারিকভাবে- সামাজিকভাবে তার ওপর অনেক ধরনের চাপ পরবে,তা সামাল দেওয়াটা খুব সহজ হবে না। এমন অবস্থায় কঠিন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হতে পারে তার উপর। এসব চিন্তায় মিলনের মাথা কাজ করছে না, তার মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করাই ভুল ছিল।না বিয়ে হতো আর না রেবেকার প্রতি সে এমন দুর্বল হতো। মিলন ভেবে নিয়েছে রেবেকা কে নিয়ে সে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার এর কাছে যাবে, এখন আর অপেক্ষা করার সময় নেই।
আমেনা বেগম নিজের মতো করে বকবক করেই যাচ্ছে ততক্ষণে রেবেকার ঘুম ভেঙে গেছে, সে উঠে বসেছে, মিলন দেখেনি রেবেকা উঠে গেছে,দাদীর টক কথা শুনতে ভালো লাগছে না, দাদীর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না, মিলনের তাই দাদীকে থামাতে মুখ ফসকে বলে দেয়।
মিলন::::::: বিয়া করার দরকার পরলে করমু নে,এহন তুমি এহেন তনে যাও।
আমেনা বেগম তো এটাই শুনতে চেয়েছিলো, মূলত উনি সব সময় চায় পরিবারের সবাই তার কথা মেনে চলুক, সে যা বলবে তাই সঠিক ভাবুক।
আমেনা::::::: আচ্ছা আচ্ছা যাইতাছি গা,ওরে উডাইয়া দে আজান পইরা যাইবো।
কথাটি বলেই সে চলে যায়। রেবেকা আগে পরে কিছু না শুনলেও বিয়ের কথাটি শুনেছে। তবে সে এই প্রসঙ্গে কোন কথা বলেনি, চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে হাঁটা ধরলো, কারণ সন্ধার পরে এই ঘরে আশা তার জন্য নিষেধ, এই নিষেধ সে তিন বছর ধরে মানছে, শুধু যে আমিনা বেগম বলেছে এমনটা না, রেবেকার দাদীও এই একই নিষেধ দিয়ে রেখেছে, অপরিপক্ক মেয়ের রাতে স্বামীর সাথে থাকা অমঙ্গল,এমনটাইে সমাজে চলে এসেছে আর এটা সবাই চোখেই সাধারণ।তাই রেবেকাও মানে, রেবেকা দরজা পার হতে নিলেই পেছন থেকে মিলন ডেকে বললো
মিলন::::::: বিবি দাদী উল্টাপাল্টা কিছু খাইবার দিলে খাইয়ো না, আর হনো কাইল সহালে ঘুমতে উইঠাই তৈরি হইবা, তোমারে লইয়া একখানে যামু,ঠিক আছে।
রেবেকা:::::: আচ্ছা।
*********************
পরদিন সকালে মিলন বাড়ির সবাইকে বলে,তার দোকানের কর্মচারীর বাচ্চার আকিকায়,রেবেকা আর তার দাওয়াত আছে, তাই আজ তারা পুরো দিন বাড়িতে থাকবেনা, ফিরতে সন্ধ্যা অথবা রাত হতে পারে। বাদল মাস্টার কিছু বলল না তবে,
আমেনা বেগম তা শুনেই বকবক করেই যাচ্ছে অগোচরে, মিলন তা শুনেও না শোনার ভান করলো, খালেদা খাতুন সুন্দর করে রেবেকা কে সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরিয়ে, সাজিয়ে গুছিয়ে দিলো।
মিলন রওনা হল তার বিবিকে নিয়ে ভ্যানে চড়ে। রেবেকা মহা খুশি মিলন আরে আরে হাসিখুশি রেবেকা কে দেখছে, কি সুন্দর লাগছে তার বিবিকে, চোখ ফেরানো মুশকিল।
মিলন::::::বিবি আইজ তোমারে মেলা সুনদর লাগতাছে, এক্কেরে অন্য ধাঁচের সুনদর।
মিলন পড়েছে কালো শার্ট সাদা লুঙ্গি, এই কালো সাদা মিলে, মিলনকে বরাবরই রাবেকার চোখে চমৎকার সুন্দর লাগে
রেবেকা:::::::: আন্নেরেও বহুত ভালা লাগতাছে,কালা জামায় নায়ক নায়ক দেহায় আন্নেরে।
মিলন তা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো বলল
মিলন:::::: আমি নায়ক আর তুমি আমার নায়িকা!বিবি তুমি কি কোন দিন সিনেমা দেখছো?
রেবেকা:::::: না কইতে দেহুম তয় দাদীর মুহে হুনছি অনেক সওদাগরের কিচ্ছা-কাহিনী
রাজা-বাদশার কিচ্ছা-কাহিনী।
মিলন:::::: ও আচ্ছা।
রেবেকা::::::তয় আমগোর মইধ্যেও কাহিনীর মতো কোনো শ য় তা ন নাই ঠিক না।
মিলন রেবেকার কথা শুনে (মনে মনে)বলে
::::কেডাই কইলো নাই, আমেনা বেগমের মতো ছিনাইল্লা বুড়ি থাকতে শ য় তা ন লাগে নি
মিলন::::: বিবি শ য় তা ন তো আছেই, শয়তানের শয়তানি শুরু হইবার আগে জলদি পরিপক্ক হইয়া যাও।
হঠাৎ রেবেকার মনে পড়ে যায়, আমেনা বেগমের মিলনকে বলা দ্বিতীয় বিয়ের কথা, যা মনে পরতেই রেবেকা একেবারে চুপ হয়ে যায়।
মিলন সত্যিই রেবিকাকে নিয়ে তার কর্মচারীর বাড়িতে যায় বাচ্চাকে দেখতে, তবে বেশি একটা সময় সেখানে থাকে না। কারণ মিলনের আসল গন্তব্য এটা না।
মিলন তার পরিচিত একজন বড় ভাইয়ের মাধ্যমে রেবেকাকে নিয়ে গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যায়। সেখানে গিয়ে মিলন জানতে পারে।
////১৬ বছর বয়সেও মা সি ক _ শুরু না হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রাইমারি অ্যামেনোরিয়া’ বলা হয়। এটি চিন্তার বিষয় হতে পারে, তবে ভয়ের কারণ নেই। এর মূল কারণ হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, পুষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত শারীরিক ব্যায়াম বা যৌ ব নে র লক্ষণ দেরিতে আসা, যদি স্ত নে র বিকাশ বা বয়ঃসন্ধিকালের অন্যান্য লক্ষণ না দেখা দেয়, তবে তা চিন্তার বিষয়।
কিন্তু রেবেকার ক্ষেত্রে শারীরিক গঠন সব ঠিক আছে,আর মিলনের ভাষ্যমতে তার বিবির যৌ ব নে র লক্ষণও ঠিকঠাকই আছে, যেটার প্রমাণ সে গত দুপুরেই পেয়েছে, যখন সে অতিরিক্ত আবেগের বেশে রেবেকা কে গভীরভাবে ছুঁয়ে ছিলো তখন রেবেকার প্রতিক্রিয়া তাকে সন্তুষ্ট করেছে অনেক, যা তার চিন্তার বাইরে ছিল।
সব শুনে ডাক্তার মিলনকে চিন্তা করতে না করে, এবং কিছু সাধারণ,হরমোনাল ঔষধ এবং ভিটামিন দেয়,সাথে অনেক পরামর্শ
এইসময় সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে।অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস থেকে বিরত রাখতে হবে।
ফেরার সময় মিলনকে প্রচুর খুশি দেখা যায়, যতটা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি থেকে রেবেকা সহ বের হয়েছিল, ফেরার সময় তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না তার মধ্যে।
উল্টো বিবিকে নিয়ে, শাপলা বিলে ঘুরতে গেছে নৌকায় চড়েছে, দু টাকা দামের নারিকেলেই আইসক্রিম খাইয়েছে, সঙ্গে কিনে এনেছে চানাচুর,বিস্কিট, কেক, নিমকি, বাতাসা,
নতুন লিপস্টিক, চুরি, আলতা,চুল বাঁধার জন্য নানা রকম ফিতা-ব্যান্ড।
রেবেকার খুশি তখন দেখার মতো, ঈদের চেয়েও বেশি খুশি সে।পুরোটা সময় মিলনের হাত ধরেই ছিলো সে।
মাগরিবের সময় ফিরে আসে দুজন ,বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই আমেনা বেগমকে দেখা যায়, যেন সে তাদের অপেক্ষাতেই ছিল, আমেনা বেগম রেবেকা কিছু বলতে যাবে তার আগেই,মিলন রেবেকাকে বলে
মিলন:::::: বিবি আগে আমার ঘরে আও, তোমার লাইগা যা যা কিনা আনছি, হেডি গুছাই রাহো।
রেবেকা তাই করলো,ঘরে ঢুকে কিনেআনা খাবার সহ প্রত্যেকটা জিনিস জায়গা মত গুছিয়ে রাখল, সব কাজ শেষ করে যখন ঘর থেকে বের হতে যাবে তখন মিলন বাঁধা দেয়।
বিছানায় বসে দুই হাতে রেবেকার কোমর জড়িয়ে ধরে, মুখ গুঁজে দেয় রেবেকার বুকের মধ্যখানে, সেখানে মুখ রেখেই জোরে শ্বাস টানে মিলন।মিলনের এ কাজে কেঁপে উঠে রেবেকা, তবে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে নড়ে না একটুও, মিলন অনুভব করে রেবেকার হৃদয়ের কম্পন।
মিলন মুখ তুলে তাকায় তার মুখের দিকে, মেয়েটা ঘেমে গেছে, কপালে, নাকে ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, হারিকেনের হুলদে আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে।
মিলন তার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের মাধ্যমে রেবেকা নাকের ডগায় ঘাম মুছে দেয় বলে
মিলন:::::: বুক এতো লাফায় কেন বিবি, আমারে মা র বা র চাও হুম
রেবেকা:::::: ছাড়ুইন বু কাইজ্জা করবো
মিলন:::::ছাইড়া দিলে কি খুশি হইবা ?
রেবেকা::::: তা কহন কইছি
মিলন::::: তয় বুর বাহানা দিলা কেন?
রেবেকা::::: আচ্ছা আর দিমুনা,কন কি করুন লাগবো ।
মিলন কিছু সময় তাকিয়ে থাকে রেবেকার মুখের দিকে, হঠাৎই বিসমিল্লাহ বলে রেবেকার ঠোঁটে চুমু খায়,__ উম্মাহ উম্মাহ উম্মাহ
মিলন:::::: কিছু করন লাগতো না,তয় আমার কই কই গেছি তা কাউরেই কইবা না ,হেডি তোমার আমার গোপন কথা।আর এই বরি (ওষুধ)গুলা টিকমাইয়া (লুকিয়ে)এই ঘরে আইয়া খাইবা,মনে থাকবো বিবি
রেবেকা:::::: হ হ মনে রাহুম।
মিলন::::: আচ্ছা যাও এহন
রেবেকা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় ,দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ করে সে দাঁড়িয়ে পড়ে, পেছনে তাকিয়ে মিলনকে উদ্দেশ্য করে বলে
রেবেকা:::::: আমি পরিপক্ক না হইলে কি , সত্যিই আন্নে আর এক খান বিয়া করবেন ?
কথাটি শোনা মাত্রই মিলনের অন্তরে অদ্ভুত রকম এক অনুভূতি হলো,এই ভয়টাই তো কালকে সন্ধ্যা থেকে পাচ্ছিল মিলন, রেবেকা যে এই কথা শুনেছে তার ধারণা একটু একটু ছিল মিলনের।
মিলন আর বিছানায় বসে থাকে না, এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে রেবেকা কে জড়িয়ে ধরে।
মিলন:::::: হেই কতা মনের কতা না সোনা,মুহের কতা। আমার বিবি একটাই থাকবো বুঝছো,আর তুমি পরিপক্ক হইবা, আমার বিশ্বাস আছে। আমার বুকে তুমিই থাকবা।বুঝছো তুমি হুম
মিলন এত জোরে জড়িয়ে ধরেছে রেবেকা নিঃশ্বাস ছাড়তে পারছে না সে হাঁসফাঁস করে বলে
রেবেকা:::::: হ হ বুঝছি।
*********************
জালাল মিয়া এসে হাজির হলো বীরপুরে মিলনের বাড়িতে রেবেকাকে নিতে, রেবেকার এখন ১৪ বছর ৩ দিন, বাড়ি যাবে খুশিতে রেবেকা লাফালাফি শুরু করলো,তবে মিলনের মুখমণ্ডল গম্ভীর। তার ইচ্ছা নাই রেবেকাকে যেতে দেওয়ার, কিন্তু মুখে বলতে পারছে না, বাদল মাস্টার অনুমতি দিলো, মিলন অবাক হলো এবার তার দাদি রেবেকাকে আটকালো না অন্য অন্য বারের মতো!উল্ট বলে দিলো যতোদিন ইচ্ছা থাকুন।
মিলনের খুব রাগ হচ্ছে, আশ্চর্য বউ কি তার বাপ-দাদির, নাকি তাদের কামাই খায়। যার বউ তাকে কেউ জিগ্গেস করছে না কিছু,সব কিছুই তাদের সিদ্ধান্তে হচ্ছে।
যাওয়ার সময় রেবেকা মিলনের ঘরে এলো, সাজগোজের জিনিসগুলো নিতে, মিলন তখন মুখ ভার করে বিছানায় বসে, রেবেকাকে দেখেই দৃষ্টি স্থির হল তার ওপর,তার দেওয়া লাল-কালো সংমিশ্রণের শাড়ি পড়েছে, লম্বা চুলের মাঝখানে লম্বা সিথি তুলে বেনুনি বাঁধা,শহর থেকে যে জুতা জোড়া কিনে এনে দিলো তা পায়ে। দারুন লাগছে তার বিবিকে। আন মনেই মিলনের মুখ থেকে বের হয়ে এলো "মাশাআল্লাহ"।
ততক্ষণে রেবেকা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে
রেবেকা::::একটা কতা আছিল
মিলন:::: কি কতা।
রেবেকা:::: ওই সাজন পাতিগুলা আমি সঙ্গে লইয়া যাই।
মিলন::::কেন ঐইনো কারে সাইজ্জা দেহাইবা।হুনো বিবি তোমার সাজগোজ সব আমার লাইগা হওয়া উচিত।
রেবেকা:::: আন্নেরে তো দেহাইঐ,বাড়িত যাইয়া একটু সাজলাম নেই না।
মিলন:::: না ঐ বাড়ির সাজা যাইবোনা, কোনো জায়গাতেই যাইবো না। সাজা ছাড়া না থাকবার পাইলে যাইয়ো না এনেই থাহো। ইচ্ছামত সাজো আমারে দেখাও, আমি দেহি
আসলে রেবেকা চলে যাচ্ছে মিলনের সহ্য হচ্ছে না,তাই এসব বলছে , তাছাড়া সে চায়না রেবেকা অন্য কারো সামনে পরি পার্টি হয়ে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াক। অবশ্যই সেনপুরে বেডা ছেলেরা আছে। এগুলো ভাবতেই তার রাগ লাগছে।
মিলনের ভাবনা মাঝেই রেবেকার বাবা জালাল মিয়ার ডাক ভেসে আসলো, উনি রেবেকাকে ডাকছে, বাবার ডাকে রেবেকা দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল,একটা বারের জন্যেও পেছনে তাকালো না, মিলন অস্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল দরজা দিয়ে রেবেকার বের হয়ে যাওয়া।
যখন তার ধ্যান ভাঙ্গে,যে তার বিবি চলে যাচ্ছে দ্রুত মিলন ঘর থেকে বের হয়ে আসে, ততক্ষণের জালাল মিয়া রেবেকা সহ ,ভ্যানে চড়ে অনেকটা পথ চলে গেছে, মিলন বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে দেখল তার বিবির চলে যাওয়া, বিষয়টা খুবই অদ্ভুত লাগলে মিলনের,আশ্চর্য হচ্ছে সে, প্রতিবারের মতো এবার আর তার শশুর জালাল মিয়া ফিরে যাওয়ার সময় তাকে কিছু বলে গেলো না, একটাবার ডাকলো পর্যন্ত না। কেন?