গরমের দিনের ক্লান্তি মুছে যায় সন্ধ্যার কোমল ছোঁয়ায়,
রোদ্দুরের দহন হারিয়ে গিয়ে আকাশ জুড়ে মেলে নরম রঙের মায়া।
কমলা, সোনালি আর বেগুনির মিশ্রনে আঁকা হয় নীরব এক ছবি,
যেন প্রকৃতি নিজেই থেমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে ধীর লয়ে।
হালকা বাতাস এসে ছুঁয়ে দেয় অবসন্ন পৃথিবী,
গাছের পাতায় পাতায় বাজে নীরবতার মিষ্টি সুর।
দূরের পাখিরা ডানা গুটিয়ে ফিরে যায় আপন ঘরে,
তাদের গুঞ্জনে যেন লুকিয়ে থাকে দিনের শেষ গান।মাটির উষ্ণ গন্ধে মিশে থাকে দিনের হাজারো গল্প,আর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মন খুঁজে পায় অচেনা এক শান্তি।
গরমের এই সন্ধ্যা—নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরে, ক্লান্ত হৃদয়ে বুনে দেয় প্রশান্তির স্বপ্ন।
একটু পরেই মাগরিবের আজান পরবে, ঘসেটি বেগম পিতলের বদনা হাতে পুকুরপাড় থেকে ওযু করে গুজা পিঠ নিয়ে ধীরো পায়ে হেঁটে বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই দেখলো তার নাতনি খালেদার মুখখানি,সে দ্রুত কাঁপা হাতে বদনাটা মাটিতে রেখে এগুলো কয়েক কদম ততক্ষণে খালেদা এগিয়ে এসে দাদিকে জড়িয়ে ধরেছে।
খালেদা::::::: আসাসালামুয়ালাইকুম বু কিরুম আছুইন ?
ঘসেটি::::::: ওয়ালাইকুমুস সালাম ভালাই আছি, সূয দেহি পশ্চিমবা উঠছে! কিভা আইলি তুই ঐ কালিমুহি তোরে আইবার দিলো?
খালেদা:::::::ধীরে কও বু আমার লগে আমার হোওরিও (শাশুড়ি) আইছে
ঘসেটি::::::: হায় হায় ঐ মা গি রে আনছোস কা
তাদের কথার মাঝে মিলন হাজির হয়
মিলন::::::: বড়মা আমিও আইছি লগে আন্নের বৌমাও আছে।
মিলন কথাটি বলে রেবেকা কে ইশারা করে রেবেকা এগিয়ে গিয়ে,ঘসেটি বেগম এর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে,রেবেকা কে দেখে ঘসেটি বেগম অবাক হয়ে বলে
ঘসেটি:::::::: ও মায়া মায়া গো এইডা তো দেহি চান্দের টুকরা, আব্বাজান এই চান কইতনে আনলা
মিলন রেবেকার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে, সত্যিই তার বিবি চান্দের টুকরা।
*****************************
রাতের আকাশটা মেঘলা, যেকোনো সময়ে মুষলধারায় বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব, দূরে আকাশে গুর গুর বজ্রপাতে শব্দ হচ্ছে।
মিলনের নানা বাড়ি বড় মাটির এল(L)আকারের একটাই দালান, সামনে পেছনে বড় বারান্দা দুই পাশে দুটো দুটো চারটা দরজা।
মিলনের চার মামা সবাই আলাদা, নিজেদের আলাদা বাড়িতে থাকে,এই বাড়িতে মিলনের নানা -নানী,বড়মা আর বড়মার সঙ্গী হিসেবে মিলনের মামা তো বোন আসমানী থাকে।
আসমানী বিধবা, তার জামাইয়ের অকাল মৃ ত্যু র পর থেকেই সে দাদীর সাথেই থাকে।
আমেনা বেগম এই বাড়ি আসার পর থেকেই কেমন গাল ফুলিয়ে চুপ হয়ে আছে, খালেদা খাতুন শাশুড়ির ভয়ে, বাপের বাড়িও মন খুলে কথা বলতে পারছে না।
ওদিকে মিলনের নানী খবিরুন নেসা, তাদের গ্রামের প্রথা অনুযায়ী, মিলন-রেবেকা কে বরণ করার জন্য বরণ ডালা সাজাচ্ছে।
তা দেখে আমেনা বেগম তার বেয়ান খবিরুন নেসা কে ঢেকে বলে।
আমেনা::::::: বেয়াইন বরণ করতাছুইন ভালা কথা,তয় ঐ বিধবা মাইয়া যেন আমার নাতি-নাত বৌ এর কাছে না আহে, এডি অমঙ্গল যানুইন তো।
তার ছোঁয়া কোন কিছু যেন আমার নাত বৌ এর আসেপাশে না থাহে।
খবিরুন নেসার খারাপ লাগলো কিন্তু এইসব গ্রামের সবাই মেনে চলছে বহু যুগ ধরে,তাই সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
আসমানীর বিয়ের নয় মাসের মাথায় তার জামাই মাছ ধরতে গিয়ে,নৌকা সহ মধ্য নদীতে তলিয়ে যায়, তার লা শ ও পাওয়া যায় নি। তখন আসমানীর শ্বশুরবাড়ির মানুষরা তাকে অপয়া বলে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তার পরে আসমানী তার বাপের বাড়ি উঠে, কিন্তু সেখানেও তাকে নিয়ে অনেক সমস্যা হয়।আসমানীর বড় ভাইয়ের বৌ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায়,আসমানীকে তার আসে পাশে রাখা অমঙ্গল হবে বলে সবাই, তখন সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই আসমানীকে তার দাদী ঘসেটি বেগম এর কাছে রাখা হয়,আর এখন দুই বছর আসমানী দাদীর সঙ্গী হয়ে আছে।
আমেনা বেগমের কথা শুনে রেবেকা আবাক হয়ে, বিধবারা অমঙ্গল বয়ে আনে,এই কথা তার মনে দাগ কাটে ।
মিলন আর রেবেকাকে বরণডালা সাজিয়ে মোটা রুপার চেইন পরিয়ে নানী খবিরুন নেসি আর বড়মা ঘসেটি বেগম বরণ করে ঘরে তুলে।
আসমানী দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে তা, বিধবা বলে শুধুই যে কাপুড়ের রং পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয়েছে তার গোটা জীবনের রংটাও। অকাল বিধবা বলে ,কারো বিয়ে হলে তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, নতুন বাচ্চা হলে বাচ্চার মুখটাও দেখতে দেওয়া হয় না, এমনকি মৃ ত বাড়িতেও সাত দিন তার পায়ের ধুলা পড়া অমঙ্গল হয়ে গেছে।
আসমানীর মাঝে মাঝে মনে পরে তার নয় মাসের সংসারের কথা, স্বামীর সোহাগ-আদর। কিন্তু ভাগ্য তার থেকে সব কেরে নিয়েছে।
সত্যিই কি শুধু সব ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে, নাকি
সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার?
রেবেকার আলতা পরা পায়ে দিকে তাকিয়ে থাকে আসমানী,কি চমৎকার সুন্দর লাগছে।মাথা নামিয়ে নিজের পা জোড়া দেখে সে কি বিশ্রী দেখতে লাগছে ,জুতা ছাড়া,কাঁদা-মাটি লেগে আছে, অথচ দুইজনের গায়ের রং একই।!
রাতের খাবার খাওয়া শেষ , খালেদা খাতুন আজ তার দাদী ঘসেটি বেগম এর সাথে ঘুমাবে, রেবেকা কে ঘুমাতে দেওয়া হলো আমেনা বেগমের সাথেই। আসমানী পেছনের বারান্দার ছোট ঘরের ছোট চৌকিতে রাতে থাকবে আজ।
মিলন তার নানা হাসমত সওদাগর এর সাথে আড্ডা দিচ্ছে বাহিরে, দুইজন বিড়ি টানছে আর সুখ দুঃখের আলাপে মজেছে, তাকে একা
কোনার ঘরটায় থাকতে দেওয়া হয়েছে।
হাসমত:::::: দিনের ভাব ভালা না ভাই লও ঘরে যাইয়া হুইতা পরি।
মিলন বিড়িতে টান দেয় জোরে,নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে বলে
মিলন::::::: দিনের মতোন আমার মনের ভাবও ভালা না নানা, তোমার ঘরে বৌ আছে তুমি যাইয়া হুতো, আমার ঘর খাইলা(খালি) এতো তাড়া নাই।
হাসমত হো হো করে হাসে বলে
হাসমত:::::::তয় বেয়াইন ঘুমাইলে,ঘরে বউ আইনা দেই।
মিলন হাসে, মজার ছলে বলে
মিলন::::::: আবাত্তি এহনো কাজের না। তুমি যাও হুইতা পরে।
হাসমত::::::তয় আইজ নতুন ডারে লইয়া হুতুম,তোর নানী বুড়া বেডি ঝুনা ঝুনা লাগে,আবাত্তি পাইলে ভালাই হয়
মিলন::::::: ওই শালা বুইড়া ,ঝুনা ,বাত্তি তুমি নিজেই ,আবাত্তি সামালাইবার পারতা না,আর আমার বিবিরে তো নাই।
হাসমত:::::: চেষ্টা করুম নি
মিলন::::::: ঠ্যাং কাইটা হাতে ধারাই নিমু।
কথাটি বলেই দুই জন একসঙ্গে হেসে উঠে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, হাসমত সওদাগর আর দাঁড়ালো না তার আবার যক্ষা রোগ ধরা পরছে, ঠান্ডা লাগলে সমস্যা তাই ঘরে ঢুকে গেল। মিলন বারান্দায় কোনায় দাঁড়িয়ে।
বারান্দার ছোট কামরার দরজা ভিড়ানো, আসমানী দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে, এতো সময় তার দাদা আর মিলনের সব কথা শুনেছে সে। যুবতী আসমানী স্বামীর সঙ্গে কামনা করে প্রতি রাতেই, রেবেকা অপরিপক্ক শুনেছে সে,তারা আলাদা ঘরে থাকে এখনো।এইসব খবিরুন আর আমেনা আলাপ করছিলো যখন খবিরুন নেসা রেবেকে কে মিলনের ঘরে ঘুমাতে যেতে বলে।
তখন থেকেই আসমানীর মাথায় মিলনকে নিয়ে গোপন কামনার ইচ্ছা জেগেছে। তার স্বামী নাই আর মিলনে পুরুষমানুষ স্ত্রী সঙ্গ তো তার কামনা আছেই।
যুবতী আসমানীর হঠাৎ করেই বারান্দায় শেষ কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মিলনের পেছনে এসে দাঁড়ালো, বাহিরে ততক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জোরে বজ্রপাত হতেই আসমানী মিলনকে পেছন থেকে জাপটে ধরে, চমকে যায় মিলন।
আসমানী::::::: মিলন ভাই আন্নে চাইলে আইজ রাইতে আমার লগে হুতবার পারুন আমি কাওরেই কইতাম না।
মিলন কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পায়নি তার আগেই আসমানী মাটিতে পরে যায়, মিলন পেছনে ঘুরে দেখে, হাসমত সওদাগর আসমানীর চুলের গোছা ধরে টেনে দাঁড় করাচ্ছে।
হাসমত::::::: চু ত মা রা নী অলক্ষী মা গী, ভাতার খাইয়া পেট ভরে নাই, এখন বে শ্যা গীরি শুরু করছোস। তুই আমার নাতিরে ছোঁয়র সাহস পাইলি কই?!
কথাটি বলেই হাসমত সওদাগর আসমানী কে মারতে থাকে, মিলনের সব বুঝতে খানিকটা সময় লাগে। যখন সবটা বুঝতে পারে দ্রুত হাসমতের হাত থেকে আসমানী কে বাঁচায়। বৃষ্টির শব্দ ঘরের ভেতরে কেউ টের পায়নি এই সব।
রেবেকা চৌকিতে(চার পায়া খাট) উঠছে না আমেনা বেগম ঘুমিয়ে নাক ঢাকছে, কিন্তু রেবেকা ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। বিধবার সাথে থাকে অমঙ্গল বারবার এই কথাই মাথায় ঘুরছে। আমেনা বেগমও তো বিধবা।তাই সে উঠছে না বিছানায়। কিন্তু তার খুব ঘুম পাচ্ছে,ঘুমে টলছে এক প্রকার।
তখনি মিলন ঘরে ঢোকে হারিকেনের মৃদু আলোতে দেখা যাচ্ছে রেবেকা দাঁড়িয়ে আছে, অস্থির মিলন কোনো দিকে তাকায় না, সোজা গিয়ে রেবেকা কে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। নিজের জন্য বরাদ্দ করা কামরায় না গিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই রেবেকা কে নিয়ে নেমে পরে উঠানে,কোনো দিকে না তাকিয়ে,উঠান পেরিয়ে বাড়ির বাহিরে পুকুর পাড়ে গিয়ে, রেবেকা কে কোলে নিয়েই দাঁড়ায়। একটু আগের অসহ্যকর একটা পরিস্থিতির পর করার পরে,বিবি সঙ্গ ছাড়া এই মুহূর্তে কিছুই মাথায় নাই মিলনের।
রেবেকা::::::: আরে আরে কি করতাছুইন ভিজা যাইতাছি তো।
মিলন::::::: ভিজলে ভিজো, তোমার লাইগা মাইষে আমার ইজ্জতে হামলা দিছে, এইডা তোমার শাস্তি বিবি।
কথাটি বলতে মিলন বিসমিল্লাহ বলে রেবেকার গালে, কামড়ে ধরে জোরে।
রেবেকা:::::: ওহহহহ্ আল্লাগো কি করতাছুইন
মিলন::::::: কি করি
রেবেকা:::::: কামড়ান কেন
মিলন:::::::: আমার ইচ্ছা
রেবেকা::::::: এইডা কিরুম জাতের ইচ্ছা
মিলন রেবেকার অন্য পাশের গালে কামড়ে দিয়ে বলে।
মিলন:::::: এইডা মিলনের ইচ্ছা বিবি পরিপক্ক হও না কেন তুমি,আর কতো দূরে থাহুম
রেবেকা শুকনো ঢোক গিলে এই কথা শুনে, পরিপক্ক হলেই তো এক ঘরে থাকতে হবে তখন কলির বলা বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের মধ্যে স হ বা স হবে, কিন্তু রেবেকা তো ভয় পায়।
রেবেকা::::::: যদি কুনো দিন না হই তহন
মিলন::::::তহন কি আরেকটা বিয়া করুম, নতুন বিবি আইবো তহন তারেই সব দিমু।
মিলন মজা করে কথাটা বলে হাসে,রেবেকা কিছু বলেনা আর, মিলন রেবেকার পুরো মুখে ঠোঁট ছোঁয়ায়, ঠোঁটে গাঢ় চুমু আঁকে। রেবেকার ভেজা ডান হাতটা আপনা আপনি চলে যায় মিলনের গালে,তাতে মিলন আরো শক্ত করে চেপে ধরে রেবেকারে।
মিলন বেশ কিছুক্ষন রেবেকা কে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফিরে , রেবেকার কাপড় পরিবর্তন করার সময়টুকু মিলন বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আবেগের বসে বৃষ্টিতে ভিজে এখন মিলন ভয় পাচ্ছে যদি তার বিবির ঠান্ডা লেগে যায়,তাই নিজেই গামছা দিয়ে রেবেকার চুল ততক্ষণ পর্যন্ত মছতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত সব চুল না শুকিয়ে যায়,রেবেকা পুরোটা সময় চুপ থাকলো তার কেন যানি অসহ্য লাগছে সব। ইদানিং তাকে ঘিরে মজার কথা গুলোতে সে মজা অনুভব করেছে না আগের মতো। মিলন রেবেকার চুলে তেল লাগালো, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে বেনুনি বাঁধতে বাঁধতে বলে
মিলন::::::বিবি ওমনে খাড়াইয়া আছিলা কেন না ঘুমাইয়া ভয় পাইতাছিলা নি?
রেবেকা:::::: না
মিলন::::: তয়
রেবেকা:::::: বিধবার ছোঁয় অমঙ্গল কয় সবাই তয় আমনের দাদীও তো বিধবা, আমি হের লগে আর থাকতাম না।
মিলন::::::: কি !
রেবেকা দ্রুত পেছনে ঘুরে আঁকড়ে ধরে মিলনের বাহু ,বলে, আবদার করে বলে
রেবেকা::::::: হুনুইন না আমি আমার বাহের বাড়িত থাকবার চাই আমি আর বু য়ের গলে থাকতাম না।
সব তো সহ্য করতে পারে মিলন, রেবেকার চলে যাওয়ার কথা ছাড়া।
মিলন::::::: বিবি তুমি বুঝনাই, বিয়ার আঠারো মাসের ভিতরে বিধবা হওইলে অমঙ্গল কয় সবাই,দাদায়তো মরলো বুড়া হইয়া। তোমার বুঝার ভুল হইছে বিবি।
রেবেকা:::::: কিন্তু
মিলন::::::: কি
রেবেকা:::::; আন্নে আরেকটা বিয়া করবেন তয় আমি থাইহা কি কাম।
এইকথা শুনেই মিলন রেবেকার কোমর জড়িয়ে ধরে কোলে বসায়, রেবেকার গালে নাক মুখ ঘষে বলে।
মিলন:::::: হেরুম (তেমন) কিছু হইবো না বিবি, আমি তোমার পরিপক্ক হওয়ার লাইগা প্রয়োজনে আরো তিন বছর অপেক্ষা করুম,খালি তুমি আমার সামনে থাকবা।
রেবেকা :::::: আচ্ছা
মিলন::::: কি আচ্ছা
রেবেকা::::::; সামনে থাহুম
মিলন চুমু বসায় রেবেকার ঠোঁটে, বুকে জড়িয়ে নেয়।
কিছু সময় পর রেবেকা চুপচাপ আমিনা বেগমের পাশে এসে শুয়ে পড়ে।
সকাল থেকে আসমানীর আর দেখা মেলে না,সে ইচ্ছা করেই কারো সামনে আসে না আর, বাড়ীর কেউ তাকে খোঁজও করেনা।
ফিরে আসার সময় মিলন তার নানাকে বলেছিল আসমানীর দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার কথা, হাসমত সওদাগর নাকি পাত্রের খোঁজ করেছে অনেক কিন্তু বিধবাকে কেউ বিয়ে করতে রাজি হয়না।
***********************
***********************
ভাদ্র মাসের শুরুর দিকে, প্রকৃতিতে বর্ষার বিদায় ও শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির। এ সময় সাধারণত ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীতে কাশফুল, কখনো দু-এক পশলা বৃষ্টি, আবার কখনো কড়া রোদের খেলা চলে, মূলত রোদ-বৃষ্টি ও সবুজের সমারোহে মিশ্র এক প্রকৃতি দেখা যায়।ভাদ্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভ্যাপসা বা "তাল পাকা" দিনের বেলা কড়া রোদ থাকলেও, আকাশ নীল ও তাতে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়।
এ সময়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টির দেখা কমে আসে।তবে মাঝেমধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি বা ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যায়। অনেকের কাছে প্রকৃতির এমন রূপ, প্রিয় হলেও আমেনা বেগমের কাছে বিরক্তিকর লাগে, এই বৃষ্টি এই রোদ তার পছন্দ না, তার ভাষ্যমতে হয়তো বৃষ্টি থাক,নয়তো রোদে থাক, এমন অবস্থায় বারান্দায় বসে মনোযোগ দিয়ে তালপাতার পাখা বানাচ্ছে
// ইদানিং আমেনা বেগম প্রচুর চিন্তিত, তার মাথা কাজ করতাছে না, তিন বছর হয়ে গেলো বিয়ের তার নাত বৌ এখন নাবালিকা, তার নাতি বুড়া হয়ে যাচ্ছে এখনো শারীরিক সুখ পেলোনা। এমন ঘটনা তো তাদের চৌদ্দ গোষ্ঠীর মধ্যেও ঘটেনি কোনোদিন।কলিও এখন গর্ভবতী,আর ভালো লাগছেনা এইসব আমেনা বেগমের ,সে ভাবলো এবার আর চুপ বসা যাবেনা, কিছু তো করতেই হবে। সে কলিকে দিয়ে, তিনবাড়ির পরের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা জমেলা খাতুন কে ডেকে পাঠালো, আপাতত এইটাই মোক্ষম সময় বাড়ি খালি, মিলন দোকানে আর মাস্টার স্কুলে।
বৃদ্ধা জমিলা খাতুন গাছন্ত ঔষধ বানায়, নারী ঘটিত সমস্যার জন্য, গ্রামের মহিলারা তাকে খুব বিশ্বাস করে, লতাপাতার গাছের শিকড় নানান ধরনের মসলা দিয়ে তৈরি করা তার ওষুধ খেয়ে অনেক বন্ধ্যা মহিলারা মা হয়েছেন। অনেক নারীকে নাকি ছেলে হওয়ার জন্য আলাদা ওষুধ দিয়েছে, তাদের আবার সত্যিই ছেলে বাচ্চা হয়েছে। গ্রামে বহু বছর ধরে চলছে এমন ঘটনা।
আমেনা বেগম জমিলা খাতুন এর কাছে রেবেকার কথা খুলে বলে গোপনে।
জমিলা:::: ও মায়া মায়া গো কি কও এডি ,এ তো দেহি বরই জটলা বেপার।
আমেনা::: হেইডাই তো বু ওহন কি করতাম,নাতি বিহা করাইছি ওহনো শইলের সুখ পাইলো না। আন্নের কাছে কি কিছু আছে যা খাইলে শইলেরডা হইবো।
জমিলা::::হ আছে তয় তোমাগো বৌ পারবো নি হেইডাই দেহার বিষয়।
আমেনা:::: পারবো পারবো আন্নে দেন দেহি।
জমিলা:::: তাই আমি হাইনঞ্জা বেলা( সন্ধ্যা) টিক মাইরা লোইয়া আহুম,, বিয়াইন্নাকালে (ভোর সকালে) আইনন্দার থাকতে খালি পেঢে কমর হমান পানিত খারোইয়া ঔসুদের ছেইচ্চা রস খাইতে হইবো,হের পরে সারাবেইল(সারাদিন) কিছু খাইবার পারবো না,রাইতে লবন দিয়া ভাত খাইবো। তিনদিন মানুন লাগবো পারবো নি?
আমেনা:::: সারাবেলা না খাইয়া থাহুন লাগবো ?
জমিলা:::: হ এইতা ঔসুদ খাইলে দিনে খালি পেঢে থাহুন লাগবো,রাইত ছাড়া খাওয়া যাইতো না।
আমেনা বেগম চিন্তায় পড়ে যায়, সারাদিন না খেয়ে কিভাবে থাকবে, তাছাড়া ওষুধ সে গোপনে খাওয়াবে, বাড়িতে কেউই জানলে সমস্যা হবে বিশেষ করে তার ছেলে আর নাতি , কিন্তু তারপরও আমেনা বেগম রাজি হলো।
*********************
আমেনা বেগম সত্যিই রেবেকা কে অন্ধকার থাকতেই টেনে ঘুম থেকে ওঠায়, সকালে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে,এই ঠান্ডার মধ্যেই রেবেকা কে পুকুরের কোমর সমান পানিতে দাঁড় করিয়ে, অসম্ভব তিতা ঝাঁঝালো ওষুধের রস খেতে বাধ্য করে।
সেই রস গলাদিয়ে যখন নামছিল রেবেকার মনে হচ্ছিল যেন গলা পুড়ে যাচ্ছে,ছোট রেবেকার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছিল পুরোটা সময়। ঠান্ডা পুরো শরীর থর থর করে কাঁপছিল। রেবেকা তখন পানি খেতে চাইলে আমেনা বেগম নিষেধ করে বলে কিছু খাওয়া যাবেনা সারাদিন,তা শুনে রেবেকা আরো কান্না করে, এই বাড়িতে এতদিন ধরে আছে মাঝে মাঝে মায়ের জন্য খারাপ লাগতো রেবেকার, কিন্তু কখনো কান্না আসেনি, এখানে থাকতে খারাপ লাগেনি, দু-একবার মিলনকে বলেছে বাড়ি যাওয়ার কথা কিন্তু, কলির মত কান্নাকাটি করে ফিরে যেতে চাইনি কখনো, কিন্তু আজ মায়ের কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করছে।
**************************
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে মিলন একবারের জন্যও তার বিবিকে দেখেনি, প্রতিদিন তো রান্না ঘরে দেখতে পায় আজকে কি হলো, কোথাও কোনো শব্দও পাচ্ছে না।
সকালের নাস্তার সময় রেবেকা বেরে খাওয়ায় মিলন কে তবে আজ কলি বেরে দিল তখনো রেবেকা নাই। কলি গর্ভবতী সবে মাত্র দুই মাস, খবরটি জানার পর বাদল মাস্টার গিয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছে।
মিলন কলিকে জিগ্গেস করলো
মিলন:::: তোর ভাউ কই?
কলি:::: হুইত্তা (শুয়ে) রইছে
মিলন:::: এতো বেলা করই, কেন কি হইছে?
কলি:::: কি জানি আমি কইবার পারুম না।
মিলন আর কিছু বলেনা,তবে তার দাদি আমেনা বেগম এর জন্য সে গিয়ে দেখতেও পারলো না কি সমস্যা।
সারাদিন মিলন দোকানে বসে ভাবলো তার বিবির কথা, কি এমন হলো যে সকালে একটা বার তাকে দেখা দেওয়া গেল না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মিলন আজ আর রেবেকা কে উঠনে পায় না, প্রতিদিন তো থাকে ডিম সিদ্ধ খেয়েই ঘরে যায় তবে আজ কই,রাতে খেতে বসেও মিলন দেখা পায়নি রেবেকার, এবার তার বিরক্ত লাগছে খুব, মেজাজ খারাপ হচ্ছে,রাগ লাগছে, ঠিক ভাবে খাতে পারছে না কাউকে কিছু বলতেও পারছে না।তখনি মাস্টার বলে উঠলো
বাদল:::: বৌ কই
আমেনা:::: ও ঘুমায়
বাদল:::: আজ এতো আগেই , ভাত খাইতে।
আমেনা::;; হ হ খাইছে,খাইয়াই হুতলো।
মিলন চুপচাপ শুনলো সব কথা। তার কেমন যানি অস্থির লাগছে সব, খাওয়াটাও হলো না ঠিকঠাক ।
********************
পরদিন একই ঘটনা ঘটে, মিলন দেখা পেলো না রেবেকার, খালেদা খাতুন ইচ্ছা করে ছেলের সামনে আসলো না,এই ঘটনা সে কা বিকালে টের পেয়েছে তবে শাশুড়ির সাথে খালেদা খাতুন কখনোই পারে না কথায়, মূলত প্রচুর সম্মান করে ভয় পায় । মিলন মেজাজ খারাপ সে খাবার খেলো না ওভাবেই চলে যায় দোকানে।
আর রেবেকার শরীর সহ্য করতে পারেনা এই অমানবিক অত্যাচার, দুপুর থেকে একাধারে বমি করেই যাচ্ছে,এই অবস্থায় আর খালেদা খাতুন বসে থাকতে পারলো না, রেবেকা কে ধরে পুকুরে ঘাটে নিয়ে গেলেন উনি সাথে কলি।
পেছন আমেনা খাতুন চিৎকার করে আসছে
আমেনা:::: খবরদার বৌ ওরে পানি দিবা না, ঔসুদের ধাগ যাইবোগা,বমি করতে না করো সব ঔসুদ বাইরাই যাইতাছে।
খালেদা:::: আম্মা আন্নে দেখতাছেন না বৌ এর চোখ উল্ঢাই যাইতাছে।
আমেনা::::যাক তাও খাওন দিবানা, গোসল করাইয়া বিসনাত হুতাইয়া দেও।
খালেদা:::: ছোঢো মানুষ আম্মা ম ই রা যাইবো।
আমেনা::: ম র লে ম রু ক
১৪ বছরের মাইয়া ছোঢো না বৌ,আর আমি কি খারাপ চাই নাকি শইলেরডা হয় না দেহাই তো। ম র লে আমাগো মিলন কে আবার বিয়ে করামু।
তারা কথায় এতটা ডুবে ছিল যে পেছনে মিলন দাঁড়িয়ে আছে কেউ দেখেনি।
মিলন:::: কেডায় ম র বো বুবু !?
আমেনা বেগম চমকে যায়, খালেদা খাতুন ভয় পায় আর কলি রেবেকা কে ফেলে দৌড়।
মিলন দেখে রেবেকা মাটিতে পরে আছে , অর্ধেক শরীর ভেজা, জ্ঞান নেই মিলনের বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো, খুব অস্থিরতায় ভুগছিলো, তাই দোকান কর্মচারীদের কাছে ফেলেই বাড়িতে চলে এসেছে, সকালে দোকানে যাওয়ার সময় দেখেছে রেবেকার জন্য কিনে আনা কলাগুলো পচে আছে, মিলন অবাক হয়েছিল তা দেখে ,যার মানে তার বিবি দুইদিন ধরে একটাও কলা খায়নি, এমন কি সে অনুভব করেছে দুইদিন ধরে তার ঘর অন্য কেউ গোছায়, এইসব ভাবনায় তার ভেতরের অস্থিরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সে এক ছুরি কলা হাতে বাড়ি ফেরে ,আর এসেই শুনতে পারলো তার দাদি বলা প্রত্যেকটা কথা,যা তার হৃদয়ে সুঁচের মতো বিঁধেছে,
মিলনের হাতে বড় কলার ছুরি টা হাত ফুসকা মাটিতে পরে।