বাদল মাস্টার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। উঠানের মাটিতে গেঁথে থাকা কুড়ালের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে। সে বুঝতে পারে—আজ এই ঝগড়া না থামালে, ঘর ভাঙ্গন শুরু হয়ে যাবে।
মাস্টার ধীরে ধীরে উঠে পাশের বাড়িতে যায়, যেখানে আমেনা বেগম আশ্রয় নিয়েছে।
বাদল::::মায়া লন, বাড়িত লন... এমনে পালাইয়া থাকলে কিছু সমাধান হইবো না।”
আমেনা বেগম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে—
আমেনা::::::আমি ওই বাড়িত আর যামু না,তোর পুতে আমারে মাইরা ফেলইবো !
বাদল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে:
বাদল::::::আন্নে না গেলে ঘরটা ভাঙবো… পোলাডা
আগুন হইয়া গেছে। আন্নের কি দরকার আছিলো বৌ এর বাপেরতাইন (বাপের কাছে) বৌ সমন্ধে ঐ কতা কওয়ার! মায়া আন্নের কতায় আমি বেয়াইরে এক মাসের সময় দেওয়াও কতা কইছিলাম না? হুনছিলাম তো আন্নের কতা, কিন্তু আন্নে এইডা কি কাম করলেন? ঐ কথা কি আন্নের কওয়া ঠিক হইছে?
আমেনা:::::: যা কইছি ঠিকই তো কইছি
বাদল::::::আন্নের ঠিক ভুল আন্নের কাছেই রাহুইন, আমি আন্নের কথা হুনছিতো,এহন আন্নেও আমার কতা হুনুইন, লন আমার লগে নাইলে সংসার ভাঙ্গবো।
আমেনা::::::: সংসার ভাঙ্গলে ভাঙ্গবো, নতুন সংসার হইবো ঐ মাইয়া হাছাই(সত্যি)গুড়মা,ওরে দিয়া সংসার হইবো না।
বাদল মাস্টার যানে তার মা ঘাড় তেড়া, কিন্তু তার ছেলেও তো বউ এর জন্য হিংস্র বাঘ হয়ে আছে,তাকে আপাতত ঠান্ডা না করলে সত্যি সত্যি ঝামেলা বড় হয়ে যাবে, মাস্টার এর একটা সম্মান আছে,সে কিছুতেই সম্মান নষ্ট হোক, এমন কিছু করবে না। তাই তার মাকেই বোঝাতে চেষ্টা করে।
অনেক বুঝানো হলো ,গ্রামের দু-একজন মুরুব্বিকে সাথে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত আমেনা বেগমকে রাজি করানো হয়—কিন্তু সে শর্ত দেয়, মিলন যেন তার সামনে না আসে,আর রেবেকা পরিপক্ক না হলে দুজনকে একসাথে থাকতে দেওয়া যাবে না। মাস্টার আপাতত মায়ের কথার তালে তাল মিলালো,নয়তো তাকে সঙ্গে নেওয়া অসম্ভব।
*****************
মিলন বসে আছে বড় কদম গাছের নিচে, সেই কদম গাছ, যার নিচে সে তার বিবিকে কোলে নিয়ে বসে ঈদের চাঁদ দেখেছিলো। কি মন মুগ্ধকর আবেগপ্রবণ ছিল সময়টা।
ভাবেই মিলন একের পর এক বিড়ি টানছে।
মিলনের বুকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে রাগ, অপমান আর অসহায়তার আগুনে পুড়ে এক অস্থির মানুষে পরিণত হয়েছে সে। নিজের প্রিয় মানুষকে নিয়ে অপমানের কথা শুনে তার বিবেক আর সংযম দুটোই যেন ভেঙে পড়েছে।
রেবেকার সেই চিৎকার-কান্নার শব্দ তার কানে এখনো ভেসে আসছে।
অচেনা এক ভয় তাড়া করছে তাকে,যদি সত্যিই তার বিবিকে আর না দেয়, তখন কি করবে সে, মিলন সিদ্ধান্ত নিয়েছে,পরিবার থেকে আলাদা হতে তার কোনো আপত্তি নাই, তবে যাকে নিয়ে আলাদা হতে চায় সেই যদি ফিরে না আসে তখন,!?
তখন কি মিলন সালিশ ডাকবে, দরবার বসাবে। কিন্তু রেবেকা অপরিপক্ক এটা বললেই তো,সে সালিশে হেরে যাবে, তখন আর তার কথা কেউ কান দেবেনা, এ সমাজ অপরিপক্ক একটা মেয়ের সাথে সংসার করতে দেবে না।
//সমাজের এ কেমন নিয়ম অপরিপক্ক একটা মেয়েকে বিয়ে করা যায়, কিন্তু সংসার করা যায় না!!!??
রাগে মিলনের ইচ্ছা করছে, যে এই নিয়মটা বানিয়েছে তার মাথা ফাটিয়ে দিতে।
মিলন কদম গাছের নিচে পায়চারি করতে থাকে আর ভাবতে থাকে কি করবে।ভাবতে ভাবতে আবারো রাগে তার মাথা গরম হয়ে যায়, সে পুনরায় বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে।
**********************
মাগরিবের আজান পড়েছে,মাস্টার তার মাকে নিয়ে বসে আছে, জালাল মিয়ার ঘরে।
মুক্তা বেগম চিৎকার চেঁচামেচি করছে তাদেরকে দেখে। আমেনা বেগম শক্ত মুখে বসে সব শুনছে।
মুক্তা::::: কেলা কেলা(কে) কেল্লাইগা আইছে আমার বাড়িত, আমার নাতনিরে কান্দানে লাইগা, দিনে রাইতে তামাশা চলতাছে, আমার নাতনিরে কি ফালাইন্না(ফেলনা) মনে করছে রে, যায় যেমনে ইচ্ছা হেমনেই কান্দাইবো,অলক্ষীর বিছূইন সব।
জালাল::::: আহ্ আম্মা চুপ থাহুইন
মুক্তা:::::: গোলামের পুত তুই চুপ থাক,এই অলক্ষীর বিছূইন(অলক্ষ্মীর বাচ্চা) এর গুষ্টিরতে নাতনি বিয়া দেয়াই আমাগোর ভুল হইছে। আমার নাতনি রে বাড়িতনে বাইর কইরা দিয়া,এহন আবার দল ধইরা তামশা শুরু করছে!
আমেনা বেগম বুঝতে পারছে অলক্ষীর বিছূইন তাকে বলছে, এর জন্যই সে আসতে চায়নি,আসতোও না, যদি না মিলন পূণরায় বাড়ি ফিরে উঠানে ফেলে যাওয়া কুড়ালটা আবারো হাতে তুলে তার দিকে না ছুটতো।মিলনের ভয়ে তখন আমেনা বেগম দিক দিশা ভুলে ছেলের হাত ধরে ভ্যানে চড়ে বসেছে , আমেনা বেগম ঠিক ধারণা করেছিলো এবাড়িতে আসলে তাকে নানান কথা শোনানো হবে, এবং হচ্ছেও।
অনেক সময় ধরে মুক্তা বেগম যা তা কথা শুনিয়ে যাচ্ছে তাকে, প্রত্যেকটা কথা যে তাকে খোঁচা মেরেই বলা হচ্ছে সেটা সবাই বুঝতে পারছে। কিন্তু এখন আর চুপ থাকতেই পারল না। মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো।
আমেনা::::: তা আন্নের গুষ্টিতো খুব লক্ষ্মীর বিছূইন আছে ,তয় এতদিন হইছে বিয়ার আন্নের নাতনি এখনো জামাইয়ের সুখ পাওয়ার উপযুক্ত হইলো না কে।
মুক্তা:::::: ও মায়া মায়া গো মায়া যারা সুখ পাইবো ,তাগোর তাড়াহুড়া নাই সব তারা তো দেহি আন্নের।শইলে কি বিগার(যৌ ব নে র জ্বালা)বেশি নাহি।
আমেনা:::;: হ অন্নের বিগারের মতোই।
মুক্তা:::::;তয় এতোই যহন বিগাইর্রা মাগি তাইলে আমার নাতনির যায়গায় কয়ডা দিন নিজেই হুইতা(শুয়ে)পরতাইন নাতির লগে।
আমেনা:::::: ও মায়া মায়া গো মায়া ও বাদল রে বাদল রে ,হুনছোস নি রে হুনছোস নি, এই বেডি কি কইলো রে কি কইলো। ও বাপজান রে আইজ নাত বউ থুইয়া ঐ ছিনাল রেই লইয়া লো।
মুক্তা:::::: ও মায়া মায়া গো মায়া ঐ ছিনাল, আমার কি ল্যাং নাই রে, আমি কি খালি কলসি রে।মাগি আমার নাতনি যে গুড়মা কইছোস না, যা দিতাম না আমার নাতনি রে, তোর নাতির লগে তুইইইই হুতিছ।
মিলন::::::: এই সব জংলি ছিনাইল্লা বুড়ি টুড়ির ছায়াও এই মিলন পাড়াইবো না।
হঠাৎ করেই দুই বুড়ির ঝগড়ার মধ্যে এসে হাজির হলো মিলন। সবাই থতমত খেয়ে যায়। তাকে দেখে, গোসল করে পরিপাটি হয়ে,পোশাক পরিবর্তন করে শরীরে এক গাধা সুগন্ধি মেখে এসেছে। নতুন জামাই নতুন জামাই ভাব।
আমেনা বেগমের নাতিকে দেখেই কুড়ালের কথা মনে পড়ে গেল, একদম চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলে বাদলের পাশে, যেন এতক্ষণ ধরে তর্ক করা মহিলাটি সে না। তবে চমকে গিয়ে পর মুহুর্তেই মুখে বলি ফুটল মুক্তা বেগমের।
মুক্তা::;;;; এই এই জংলি বুড়ি ছিনাইল্লা বুড়ি কারে কইছো তুমি, যদি আমারে কইয়া থাকো তাইলে, এই জংলি বুড়ির নাতনিও তো জংলি আছে,তাইলে তারে নিবার আইয়ো কেল্লেগা বারবার।।
মিলন একটু এগিয়ে, একটু ঝুঁকে মুক্তা বেগমের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
মিলন::::::: কারন আমার কচি জংলি পছন্দ
বুড়ি জংলি না।
মুক্তা বেগম মিলনের মতোই কানের কাছে ফিসফিস করে বললো।
মুক্তা::::::: তয় হুনো মিয়া তোমার লগে গোপন কতাডা কইয়া দেই আইজ।
মিলন::::::: কি কতা জংলি বুড়ি।
মুক্তা:::::: তোমার কচি জংলি তিনদিন ধইরা লাল পানিতে ভাসতাছে, বুঝবার পারছোনি মিয়া, তোমার বিবির কি হইছে ,পারলে লগে লইয়া যাও।
কথাটি বলেই মুক্তা বেগম আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে শরীর কাঁপিয়ে হাসে, আমেনা বেগম তা দেখেই চোখমুখ খিচে নিলো।তার নাতির সাথে এতো ফুসুর ফুসুর কেন, হিংসা হলো তার।
মিলন মুক্তা বেগমের কথা মানি বুঝতেই, তাৎক্ষণিক তার বুকটা কাঁপতে শুরু করল, তখন কার বলা রেবেকার কথাগুলো মনে হলো তার, এখন সে বুঝতে পারল মেয়েটা কেন তখন খাবার বেড়ে দিয়ে ওই রকম বড়দের মতো, বউদের মতো আচরণ করেছিলো,আর দেরি করে না মিলন।গলা ছেড়ে ডাকে
মিলন::::: রেবেকা.........অ
প্রথমবারের মতো মিলন নাম ধরে ডাকলো রেবেকার, পেট ব্যথায় রেবেকা বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে সব শুনছিল। তবে সবার চিল্লাচিল্লিতে মিলনের উপস্থিতি বুঝতে পারে নাই, কিন্তু এখন মিলনের কথা শুনেই একপ্রকার লাফিয়ে নামলো বিছানা থেকে, দ্রুত পায়ে পাশের ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
রেবেকা::::: কি ?
মিলন তাকায় রেবেকার মুখের দিকে, মুখটা কেমন মলিন হয়ে আছে, কান্না করে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে, চেহারাটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, মিলন অদ্ভুত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে রেবেকা কে।তার দৃষ্টি রেবেকার কোমর থেকে মুখ অবধি ঘুরেফিরে কোমরে এসে স্থির হচ্ছে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তার, মিলনের বুক কাঁপছে,শুকনো ঢোক গিলে বললো
মিলন::::: যা যাইবার পারবা আমার লগে এহন।
রেবেকা মূহুর্তেই দুহাতের তালু দ্বারা দু চোখের কোনায় জমে থাকা জ্বল ঘষে মুছে, ঝটপট বলে
রেবেকা::::: আমারে কিন্তু নতুন সাজন পাতি কিনা দেওয়োন লাগবো।
মিলন:::::: আর কিছু না?
রেবেকা::::::: চেইচ্চা বিলের শাপলা কলি আইনা দেওয়োন লাগবো।
মিলন:::::: হুম আর ?
রেবেকা:::::: আ.. আর.. আর অন্য বিবি আনা যাইতো না, আমি একলাই থাহুম আর কেউ না।
মিলন:::::: একলাই থাকবা।
রেবেকা:::::আমি আন্নের বুয়ের(দাদীর) ঘরে থাকতাম না আর।
মিলন::::: আমি থাকবার দিতামও না।
কথাটি বলে মিলন রেবেকার হাত ধরে ওই অবস্থাতেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।উপস্থিত কারোরই সাহস হলো না তাকে আটকাবার। জালাল মিয়া কিছুই বললেন না , কোন বাবা মা চায়না তার মেয়ের সংসার ভাঙ্গে যাক,আর বাদল মাস্টার তো লজ্জায় চুপ করে বসে আছেন,সে একজন মাস্টার এবং একজন মেয়ের বাবা হয়ে যা করেছে তাতে সে অনুতপ্ত।
তবে আমেনা বেগম প্রচুর পরিমাণে অপমান বোধ করছিলেন, সে একটু উগ্র স্বভাবের, সব সময় সবার ওপর নিজের আধিপত্য বজায় রেখে চলাটা পছন্দ করেন। অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে এটা তারোও দোষ না। তাদের পরিবেশ থেকে, পারিপার্শ্বিক সমাজ থেকে যেটা শিখেছে সেটাই তো সে করবে। মাত্র সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আমেনা বেগমের, যেই সময়টাতে তার খেলাধুলা করার বয়স ছিল সেই সময়টাতে তার সংসারের হাল ধরতে হয়েছে, মাথার ওপরে ছিল কঠিন শাশুড়ি, দাদি শাশুড়ি তাদের সাথে তাল মিলিয়ে থাকতে হয়েছে, স্বামী নামক লোকটা তো সারাদিন ক্ষেত-খামারে কাজ করে এসে রাতে শুধু সাথে ঘুমাতো, কখনো পাশে বসে জিগ্গেস করেনি কি অবস্থায় চলছে দিন তার।
সেই ছোট বয়সে শাশুড়ি আর দাদি শাশুড়ির কাছে যা শিখেছে সেটুকুই ছিল তার শিক্ষা। এবং সেই শিক্ষা টাই নিজের মধ্যে ধরে রেখেছে। শাশুড়িদের হতে হবে খুব কঠিন,ছেলেদেরকে হাতে রাখতে হবে বৌমাদেরকে মাথায় তোলা যাবে না, যেমনটা তার সাথে তখন হয়েছিল, সে তো এখনো সেখানেই পড়ে আছে, আর এমনটাই ধারাবাহিকভাবে যুগের পর যুগ ধরে চলছে।
বাদল মাস্টার জালাল মিয়ার কাছে ক্ষমা চাইলো। বললো এতদিন ধৈর্য ধরেছে তাদের উচিত ছিল আর কটা দিন সময় দেওয়া। যার বউ তার সমস্যা নেই, সেখানে তাদের আগ বারিয়ে বাড়াবাড়ি করাটা ঠিক হয়নি,,, ওনার মা আমেনা বেগমের আচরণেও সে দুঃখ প্রকাশ করলেন। জালাল মিয়াও আর ঝামেলা চাচ্ছেন না যেখানে তার মেয়ে সংসার করবে।
সে হাসলেন বাদল মাস্টারের কথায়, বললেন অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করতে। সম্পর্ক ঠিক করার জন্য মিলনের কিনে আনা ভ্যান ভর্তি বাজার গ্রহণ করল জালাল মিয়া।
তবে এই রাতে বাদল মাস্টার আর আমেনা বেগমকে বাড়ি ফিরতে দিলো না রাবেয়া বেগম মুক্তা বেগম//মেয়ের শশুর আর দাদী শাশুড়িকে রেখে দিল জোর করে, সম্পর্ক ঠিক করার জন্য তারাও থেকে গেলেন।
******************
মিলন শশুর বাড়ির আঙিনা পার হতে রেবেকা কে পাজা কোলে তুলে নিলো, রেবেকা অবাক হলো,পরে যাওয়ার ভয়ে মিলনের গলা দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাত্রই রাত সাতটা বাজে, তবুও যেন পুরোটা গ্রাম ঘুমিয়ে নাক ডাকছে, মিলনের ঠোঁটে তখন জ্বলন্ত সিগারেট, লুঙ্গির কোছায় ম্যাচ আছে, তারপরও এক হাতে রেবেকা কে কোলে রেখেই অন্য হাতে সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে, একটু থেমে দাঁড়িয়ে আয়তাল কুরসি পরে রেবেকার আর নিজের শরীরের ফু দিয়ে নিলো, সামনে বড় খোলা মাঠ পাশে বাঁশবন ও আছে, তার বিবিজান অসুস্থ যদি খারাপ বাতাস লাগে তাহলে তো সর্বনাশ। দিনের বেলাতেই গ্রামের রাস্তায় কোনো যানবাহন থাকে না আর এখন তো রাত।সেনপুর বাজারে গিয়ে যদি একটা রিকশা অথবা ভ্যান পাওয়া যায়।
এই রাস্তাটুকু মিলনের হেঁটে যেতে হবে,তবে তার বিবি কে হাঁটতে দেবে না সে।
এইটুকু নি একটু শরীর কোলে নিয়ে সারাটা রাতই তো হাঁটতে পারবে সে, তাছাড়া এই কয়দিন তার বুকটা যেই পরিমাণ জ্বলছে রেবেকা কে বুকে রেখে সেই জ্বলনটাও তো কমাতে হবে।
মিলন গ্রামের মাটির মেঠো পথে হেটে যাচ্ছে রেবেকা কে কোলে নিয়েই, হাঁটতে হাঁটতেই রেবেকার গালে গাল ঘষে বলে
মিলন:::::: বিবি শইলডা কি বেশি খারাপ লাগতাছে,পেট কি বেশি বেদনা (ব্যথা) করতোছে ?
রেবেকা:::::হ পেট বেদনা করতাছে,সব ভিজা ভিজা লাগতাছে !
রেবেকার সহজ স্বীকারোক্তিতে নিজের জটিলতা খুলে বলাটি মিলনের কাছে খুব ভালো লাগে, বুকের মধ্যে একটা শান্তি অনুভব হলো, রেবেকা কে তার নিজের, একান্তই নিজের ব্যক্তিগত,নিজের শরীরের অংশ মনে হল, মিলন হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো, বুকের ভিতরের অস্থিরতা কমছে না তার। জোসনা রাত তো না তারপরও রেবেকা মুখ খানা স্পষ্টই দেখতে পেলে, খুব কাতর কন্ঠে আবদার করে বলল:
মিলন:::::: সোনা আমার ঠোডে একটা চুমা খাও তো
রেবেকা:::::: আচ্ছা__ "বিসমিল্লাহ" __উম্মাহ
মিলনের অন্তরে শান্তি লাগল, শান্তিতে শান্তিতে বুকটা ভরে গেল, বুকের মধ্যে সে কি আনন্দ, কি একটা অধিকারবোধ,তার বিবি তার বলা প্রত্যেকটা কথা অক্ষরে অক্ষরে শুনে। ঠোঁটে ঠোঁট রাখা অবস্থাতেই মিলন অস্পষ্ট সুরে "বিসমিল্লাহ" বলে, সে নিজেই রেবেকার ঠোঁট গভীরভাবে আঁকড়ে ধরল, চোখ বন্ধ করে রেবেকাকে নিজের ভেতরে মিশিয়ে নিতে পাগল হলো। তিন মিনিটের গাঢ় চুম্বনের পর, ঠোঁট ছেড়ে মিলন নিঃসংকচে রেবেকা কে বললো:
মিলন::::: শইলেরডা হইয়া গেছে তোমার, তুমি বড় হইছো বিবি,আমার কিন্তু এর চেয়েও বড় বড় অনেক আদর চাই।
রেবেকা প্রতিবারের মতো সহজ স্বীকারোক্তি
রেবেকা::::: আচ্ছা
মিলন::::::হেই আদর কিন্তু অন্যরকম বিবি, যন্ত্রণা হইবো, কষ্ট হইবার পারে দিবা তো করতে ?
রেবেকা::::: আদর করলে কষ্ট হইবো কেন?
মিলন::::: হেডি একটু বিশেষ আদর বিবি, প্রথমে এক-দুই বার কষ্ট হইবো,পরে সহ্য হইয়া যাইবো সব জামাই বউ এর ভিতরেই হয় সইবার পারতা না
রেবেকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে, মিলনের খুব ইচ্ছা হচ্ছে রেবেকার মুখ থেকে শুনতে,কারন রেবেকার মুখে সহজ কথা শুনলে তার অন্তরে খুব শান্তি লাগে, মিলন রেবেকার মুখে তাকিয়েই রইলো,
রেবেকার তখন মনে পরলো কলির আর আমেনা বেগমের স হ বা স সম্পর্কে বলা কথাগুলো,সে চুপচাপ ভাবছিল তা, তাকে চুপ থাকতে দেখে মিলন বলে
মিলন:::::: কি ভাবতাছো বিবি, আদর করবার দিতানা ?
রেবেকা ঝটপট উত্তর
রেবেকা:::::: হ হ দিমু তো ।
মিলনের তো মিলন করার তাড়া আছে,সে বিবাহিত পুরুষ ইচ্ছা তো থাকবেই,তবে সেসবের থেকেও তার খুশির কারণ হচ্ছে,তার বিবি এখন পরিপক্ক।তার বিবি এখন তার সাথে থাকতে পারবে, তাদের মধ্যে আর কেউ থাকবেনা, থাকবে না কোন প্রকার সামাজিক কিংবা পারিবারিক বিধি নিষেধ।
এখন থেকে প্রতিরাতে বিবিকে বুকে জড়িয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে এবং প্রতি সকালে ঘুম থেকে উঠে সে তার বিবির মিষ্টি আদরি মুখখানা দেখতে পারবে। মিলন প্রচুর খুশি হয় রেবেকার কপালে কপাল ঠেকিয়ে, নাকে নাক ঘষে মন ভরে জোরে শ্বাস টানে। রেবেকার মুখ ছোট ছোট চুমু খায় আর বলে:
মিলন::::: আমার লক্ষ্মী বিবি, আমার চান্দের টুকরা বিবি, আমার ছয় বাচ্চার আম্মা বিবি।
রেবেকা অবাক হয়ে বলে
রেবেকা:::::: ছ ছ ছয় বাচ্চা ! ছয় বাচ্চা কই ?
মিলন:::::: তোমার পেডে
রেবেকা দ্রুত তার পেটে হাত দিয়ে বলে
রেবেকা:::::: কই কই নাই তো
মিলন হো হো করে শব্দ তুলে হাসে বলে
মিলন::::: হইবো হইবো সময় হইলেই বাইর হইবো
কথাটি বলেই মিলন দ্রুত রেবেকা কে নিয়ে হাঁটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলে:
মিলন::::: তোমার দাদি কি পড়াইসে তোমারে বিবি সুতির নেকরা ?
রেবেকা:::::: হ হেডিই তো দিছে, ভিইজা গেছে মনে হয়, কেমন লাগতাছে!
মিলন তা শুনে আরো দ্রুত হাঁটে, সেনপুল বাজারের কাছে এসে একটা ভ্যান পায়, তবে ভ্যান চালক এই রাতে বীরপুর যাবেনা, মিলন ভ্যান চালককে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে রাজি করায়, এবং খুব দ্রুত ভ্যান চালাতে বলে।
************
অন্য দিকে রাবেয়া ঝটপট হাতে কিছু সময়ের মধ্যেই তৈরি করে ফেলল অনেক খাবার, রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই
রেবেকার দাদী মুক্ত বেগম পানের খিলি আমেনা বেগম এর হাতে দিয়ে বললো।
মুক্তা:::::;: চিন্তা কইরেন না বু আপনার নাত বৌ আল্লাহ চাইলে খুব শীঘ্রই সুসংবাদ দিব।
এতো সময় মলিন মুখে বসে থাকা আমেনা বেগমের মুখে এই পর্যায়ে হাসি ফুটে। কারণ যত যাই হোক না কেন অপ্রাপ্ত, অপরিপক্ক একটা মেয়েকে স্বামীর কাছে পাঠিয়ে সে গুনাহ করতে চাইছিল না, তাছাড়া মঙ্গল অমঙ্গল এরও ব্যাপার আছে,তবে মুক্তা বেগমের বলা কথা শুনে সে উত্তেজিত হয়ে বলে:
আমেনা:::::: সত্য সত্য কইতাছুই ।
মুক্তা:::::: তয় তাই না হইলে কি আমি নাতনি যাইবার দিতাম জীবনো। আমরাও কিন্তু মঙ্গল অমঙ্গল মানি বুবু, আমগোর কাল থেকেই তো এডি চলতাছে, আমরাও তো মানছি দেইখা বড় হইছি।
কথাটি বলেই মুক্তা বেগম চোখ টিপে হাসে সঙ্গে আমেনা বেগমও হাসে। পুনরায় বলল
মুক্তা::::::: তয় আন্নে কিন্তু একটা বড় মাপের ছিনাল আছুইন,আন্নে কেমনে আমার নাতনিরে গুড়মা (হিজড়া)কইলেন, আবার হুনছি গাছন্ত ওষুধ খাওয়াইয়া মা র বা র চাইছিলেন !
এ কথা শুনে আমেনা বেগম কি বলবে বুঝতে পারছে না, মুক্তি বেগমের হাত ধরে অনুনয় করে ক্ষমা চায়, আর কখনো এমন কিছু হবে না বলে আশ্বস্ত করে।
তারপর দুজনেই একসাথে হাসে, পান চাবায় অবশেষে তাদের দুজনের মনের আশা পূরণ হবে এবার।