"মুক্তাগাছা"
চাঁদনী চিড়াটা ভালো করে ভিজিয়ে, পরিষ্কার পানিতে কয়েকবার ধুয়ে নিল। তারপর তাতে লাল চিনির গুঁড়া মিশিয়ে, সঙ্গে বিচি কলা ছিলে একটি বাটিতে সাজিয়ে নিল। বাটিটা হাতে নিয়ে চৌকিতে বসে থাকা মাসুদের সামনে এসে রাখল সে।
মাসুদ মিষ্টি করে হাসল। তার চোখদুটো স্থির হয়ে রইল চাঁদনীর মুখে।চাঁদনী সেই দৃষ্টি টের পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। গালজুড়ে হালকা লজ্জার আভা ফুটে উঠল। অথচ লজ্জা-শরমের সঙ্গে তার সম্পর্ক বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে। যে পেশায় শরীরই পণ্য, সেখানে লজ্জাকে বুকের ভেতর যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখার অবকাশ কোথায়? অন্য পুরুষের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে তার মানুষ বলে মনে হয় না মনে হয়, সে যেন কেবল একটি মাংসপিণ্ডে রূপান্তরিত যন্ত্র। সময়ের বিনিময়ে মানুষের শারীরিক চাহিদা মেটানো এক জীবন্ত মেশিন।কিন্তু মাসুদের সামনে এলেই সব হিসাব যেন গুলিয়ে যায়।
কেন এমন হয়, চাঁদনী নিজেও জানে না। তার বুকের ভেতর অকারণে কেমন একটা জড়তা জমে, চোখে চোখ রাখতে পারে না, সামান্য কথাতেও কেমন যেন লজ্জা এসে গাল ছুঁয়ে যায়। অথচ এই লজ্জা অন্যরকম। এই লজ্জায় অপমান নেই, ভয় নেই; আছে অচেনা এক অনুভূতির কাঁপন। মাসুদের সামনে দাঁড়ালেই কেন যেন নিজেকে আর কেবল শরীর বলে মনে হয় না। মনে হয়, সে একজন নারী একজন পরিণত, আকর্ষণীয়, আবেগ-অনুভূতিসম্পন্ন নারী। নিজের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা সেই নারীসত্তাটাকে যেন মাসুদের চোখই আবার চিনিয়ে দেয় তাকে।আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গায়ে লাল শাড়িটা মাসুদেরই আনা। সকালে গোসল সেরে ফেরার পর মাসুদই শাড়িটা তার হাতে দিয়ে বলেছিল, এটা পরতে। তার সঙ্গে দিয়েছিল কাঁচের চুড়ি। চাঁদনীও কেন যেন আপত্তি করেনি। শাড়ির আঁচলটা গুছিয়ে নেওয়ার পর চোখে মোটা করে কাজল টেনেছে, ঠোঁটে লাগিয়েছে টকটকে লাল লিপস্টিক।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে খানিকক্ষণ অচেনা লাগল তার।গোলগাল ফর্সা মুখটায় কাজলের কালো রেখা আর ঠোঁটে লাল রঙটা তাকে অন্যরকম করে তুলেছে। ভ্রমরের কামড় খাওয়া ঠোঁট দুটো যেন আরও স্পষ্ট, আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে চাঁদনী একটু থমকে গেল।
তারপর হঠাৎ চোখ আটকে গেল ঠোঁটের দিকে। ঠোঁট দুটো আজ অস্বাভাবিক রকম ফুলে আছে। মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এর কারণ যে মাসুদ, সেটা মনে হতেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল সে। কিছুক্ষণ পর আড়চোখে আবার তাকাল মাসুদের দিকে।
চিঁড়ার বাটিটা তার সামনে পড়ে আছে। অথচ ছেলেটা খাচ্ছে না। সে শুধু চাঁদনীর দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে কেমন এক মায়া মেশানো মুগ্ধতা।চাঁদনীর বুকের ভেতর আবারও অচেনা কাঁপন উঠল। লজ্জাটা আড়াল করতে সে অকারণে আঁচলটা ঠিক করল। তারপর মৃদু স্বরে বলল।
চাঁদনী: খাইতাছস না কে?
মাসুদ:খাইতাম না।
চাঁদনী: কেলা (কোনো) খাইতি না কেলা? চিড়া কলা খাইবার পারছ না?না পারলে বাইত যা, আমি বেইন্নাবেলা ভাত রানধি না এইতাই খাই।
মাসুদ এবার বিছানা ছেড়ে উঠে চাঁদনীর কাছে এসে তার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টানলো, বুকের সাথে চেপে ধরে নিজের মধ্যে কোনো গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললো।
মাসুদ: চাঁদনী তুই আর এইতা কাম করবি না, আমি তোরে বিয়া করবাম হুনছোস?
চাঁদনী অপলক তাকিয়ে রইল মাসুদের চোখের দিকে। এই ছেলেটাকে সে আর কত বোঝাবে? কতবার বলবে, তার মতো একটি মেয়ে কারও ঘরের বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তার জীবনটা যে আর দশটা মেয়ের মতো নয়।
যে পেশায় সে আছে, সেখান থেকে চাইলেই কি এত সহজে ছুটে যাওয়া যায়? সে রাজবাড়ির নর্তকী, রাজবাড়ির লোকজন আর তাদের অতিথিদের মনোরঞ্জন করাই তার কাজ। তাদের চোখে সে একজন মানুষ নয়, ভোগের সামগ্রী মাত্র। সেই জগতের আড়ালেই, সবার অগোচরে, সে মাসুদের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছে।
রাজবাড়ির লোকেরা যদি কোনোভাবে তা জানতে পারে, তবে তারা কি তাকে ছেড়ে দেবে? না। তাদের চোখে এ শুধু অপরাধ নয়, বিশ্বাসঘাতকতা। ধরা পড়লে তার প্রাণটাই হয়তো যাবে। সেই রাজবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া তাই চাইলেই সম্ভব নয়; বিষয়টা এতটা সহজ নয়।
তার ওপর আছে অসুস্থ মা। আগের মতো আর মানুষের বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে পারে না তিনি। আছে ছোট দুই ভাই, যাদের মুখের দিকে তাকিয়েই চাঁদনী এতদিন নিজের সব কষ্ট গিলে এসেছে। সে যদি রাজবাড়ির লোকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তার শাস্তি শুধু তাকেই ভোগ করতে হবে না; তার আঁচ গিয়ে পড়বে মা আর ছোট ভাই দুটির ওপরও। তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে যাবে এ কথা চাঁদনী খুব ভালো করেই জানে।
না, তাকে এতটা আবেগপ্রবণ হলে চলবে না।
মাসুদকে ভালো লাগতে পারে, তার চোখে নিজের জন্য মায়া দেখে বুক কেঁপে উঠতে পারে, কিন্তু সেই অনুভূতির কাছে নিজের বাস্তবতাকে বিসর্জন দেওয়ার মতো বিলাসিতা তার নেই। চাঁদনী ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল। মুখে কোনো আবেগের ছাপ রাখল না। কণ্ঠে কঠোরতার আভাস রেখে বলল।
চাঁদনী: কলিজা কত বড় তর? কাইল রাইতের বেলায় এত কিছু কইলাম,এত বুঝ দিলাম, বেইন্নাবেলা ভুইল্লা শেষ!
চাঁদনী কথাটা বলে শেষ করতেই, মাসুদ চাঁদনীর গালে কামড় বসালো।
চাঁদনী: আহ্ ছাড়, ছেঁড়া দাগ করিস না। অন্য বেডাইন দেইখা লাইলে সর্বনাশ হইয়া যাইবো, হাইনজার কালে জলসায় নাচন লাগবো আমার!
মাসুদ চাঁদনীর বারণ শুনল না। জলসায় নাচতে যাবে এই কথাটা শুনেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, চোখেমুখে ফুটে উঠল তীব্র রাগ। তারপর এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল, যা চাঁদনী কল্পনাও করেনি। হঠাৎই মাসুদ চাঁদনীর মুখ দুহাতে চেপে ধরে জোর করে শক্ত চুম্বনের চিহ্ন বসাতে শুরু করল একের পর এক।মুখমণ্ডল-গলা-ঘাড় কোনো অংশই বাদ পড়ল না। মুহূর্তে চাঁদনীর মুখের কোমলতা যেন হারিয়ে গেল সেই উন্মত্ত আচরণের চাপে। সে ধস্তাধস্তি করে মাসুদকে থামাতে চাইল, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করল; কিন্তু মাসুদ তখন তার কোনো আপত্তিই শুনল না।
দীর্ঘ কিছুক্ষণ পর চাঁদনী নিজেকে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হলো। হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েক পা দূরে সরে দাঁড়াল সে। ঠোঁট ফুলে উঠেছে, নিচের ঠোঁটটা ভারী হয়ে ঝুলে আছে; ঠোঁটের এক কোণও সামান্য কেটে গেছে। মাসুদ থামে এই পর্যায়, কপাল কুঁচকে চাঁদনীর দিকে তাকিয়ে বলে:
মাসুদ: আইজ আর এই সুরত লইয়া জলসাত নাচতারতে না (নাচতে পারবি না)
চাঁদনী: এইতা কি করছস? এহন কিন্তু তুই বেশি বাড় বাড়বার লাগছস মাসুদ,এতো বাড়ন ভালা হইবো না ,আমি তো জমিদার বেডাইনগো পেছনে তরে ঘরে ঢুহাই হামলাইয়া (লুকিয়ে) তুই জানছ না জমিদার...
কথাটা শেষ করার আগেই মাসুদ রেগে শক্ত করে চাঁদনীর চোয়াল ধরে থামিয়ে দিয়ে বলে।
মাসুদ: তুই-তাই করছ কেন? আমি তর পাঁচ বছরের বড়, এহন থাইকা আন্নে কইবি।
চাঁদনী: এত দিন যে "তুই" কইলাম?
মাসুদ: আগের দিন বাঘে খাইছে, এহন আর কইবি না বুঝছোস।
গালের ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে চাঁদনী কোনো মতে বলে-
চাঁদনী: আহ্ আচ্ছা কইতাম না, গালডা ছাড় না মানে ছাড়ুইন, দুঃখ লাগতাছে।
মাসুদ ছেড়ে দিল তাকে। চাঁদনী তার কথা শুনেছে, এতেই যেন তার ভেতরটা এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরে উঠল। চাঁদনী তার কথা মানলে তার ভালো লাগে। তার মনে হয়, এভাবেই ধীরে ধীরে একদিন চাঁদনীকে নিজের ইচ্ছেমতো বুঝিয়ে বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারবে। নিজের সেই বিশ্বাসের আড়ালে মাসুদ বুঝতেই পারল না, আজ সে যে সীমাটা অতিক্রম করে ফেলেছে, তার মূল্য চাঁদনীকে কতটা কঠিনভাবে দিতে হতে পারে। সে জানলও না, তার এই মুহূর্তের রাগ, জেদ আর অধিকারবোধ হয়তো চাঁদনীর জীবনে বিপদ ডেকে আনবে, যার ভার একা চাঁদনীকেই বহন করতে হবে।
********************
নৌকাটি ব্রহ্মপুত্রের মাঝনদীতে এসে পৌঁছাতেই আসমানী যেন বুকভরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ বুকের ভেতর যে অস্থিরতা জমে ছিল, ভয়ের যে কাঁপুনি গোটা শরীরকে অবশ করে রেখেছিল, তা যেন ধীরে ধীরে একটু একটু করে কমতে শুরু করল।
দুপুরে টিউবওয়েল থেকে পানি আনবে,এই অজুহাতে খবিরুন নেসার চোখকে ফাঁকি দিয়ে খালি কলসের ভেতর একখানা কাপড় আর ছোট্ট পলিথিনে পেঁচিয়ে কয়েক টুকরো পুরোনো শুকনো কাপড় নিয়ে বেরিয়েছিল সে। পেটিকোট-ব্লাউজের মতো পোশাক তাদের মতো পরিবারের মেয়েদের জন্য এমনিতেই স্বাভাবিক ছিল না; সচ্ছল পরিবারের মেয়েরাই কেবল সেসব পরার সুযোগ পেত। তাই বাড়তি পোশাক নিয়ে বের হওয়ার ঝামেলাটাও তার ছিল না।
মরিচার চর ছাড়ার পর দীর্ঘ চরভূমি পেরিয়ে আসমানী দ্রুত পা চালিয়েছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল, পেছন থেকে কেউ বুঝি তাকে অনুসরণ করছে। বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিল সে। এখন তার একটাই লক্ষ্য,যত দ্রুত সম্ভব নদীর ওপারে পৌঁছানো।
ঘাটে এসে দেখল, একটি নৌকা যাত্রী তুলছে। এই নৌকাই একবার এপার থেকে মানুষ নিয়ে ওপারে যায়, আবার ওপার থেকে যাত্রী নিয়ে ফিরে আসে।
আসমানীর ভাগ্য ভালো ছিল। সে যখন ঘাটে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই মাঝি নৌকায় যাত্রী তুলছিল।
গায়ের একপ্যাঁচের সাদা কাপড়টা দিয়ে কোনোমতে গোটা শরীর ঢেকে নিল আসমানী। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত নৌকায় উঠে পড়ল। নৌকার এক কোণে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকলেও তার বুকের ভেতরটা তখনও ঢিপঢিপ করে কাঁপছিল।নৌকা ছাড়তে যেন আজ অস্বাভাবিক দেরি হচ্ছিল।
আসমানীর চোখ বারবার ঘাটের দিকে চলে যাচ্ছিল। হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে, বুকের ভেতর দম আটকে আসছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ এসে তার হাত ধরে টেনে নামিয়ে নিয়ে যাবে।
অবশেষে মাঝি বৈঠায় জোর দিল। নৌকা ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে স্রোতের বুকে ভেসে চলল।
আসমানী তখনও নিশ্চুপ।
নৌকা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই ঘাটটা দূরে সরে যাচ্ছিল। আর ঘাট যত দূরে যাচ্ছিল, ততই তার বুকের ভেতর থেকে ভয়ের ভারটা একটু একটু করে নেমে যাচ্ছিল।
নৌকা যখন ব্রহ্মপুত্রের ঠিক মাঝনদীতে এসে পৌঁছাল, তখন আসমানী দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলল।
মনে হলো, এই প্রথম সে সত্যিই বেঁচে গেল।
অন্তত এই মুহূর্তে,হাসমত সওদাগর তাকে সহজে ধরে ফিরিয়ে নিতে পারবে না।
নিজের ভাবনার গভীর বিবরে ডুবে ছিল আসমানী। হঠাৎ এক পিচ্চি শিশুর কান্নায় তার ধ্যান ভাঙল। চমকে সামনে তাকিয়ে দেখল, চল্লিশের ঊর্ধ্বে বয়সের এক মহিলা কোলে মাস দেড়েকের একটি শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। শিশুটি একটানা কেঁদেই চলেছে। মহিলাটি বারবার তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন,কখনো বুকে জড়িয়ে ধরছেন, কখনো দুলিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু কোনোভাবেই কান্না থামাতে পারছেন না।
তাদের পাশেই বসে থাকা এক যাত্রী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
:: এইভা কান্দে কেন, গেন্দার মায় কই?”
প্রশ্নটা শুনে মহিলাটির মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা অসহায় কণ্ঠে বললেন,
:: ওয় নাতি আমার। ওর মায় সপতা ধইরা জরে ভুইগা গতকাইল বাপের বাড়িত মা ই রা গেছে। ছেড়ায় আমার বউডারে কাইল মাডি দিয়া,রাইতেই বাড়িত ফিরছে। ছোট আবুরে
লইয়া তখন আর আমার আওয়া হয় নাই। তাই আইজ বাড়িত ফিরতাছি। আমার ৪৭ দিনে নাতিডা মা ছাড়া কিভায় বাঁচবো আর,ও মালিক আন্নে এইডা কেমনে করলেন গো।
কথাগুলো বলতে বলতে মহিলাটির গলা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু আঁচল দিয়ে মুছে নিলেন তিনি। অথচ কোলে থাকা শিশুটি তখনও কাঁদছে মায়ের গন্ধহীন এক পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মতো করে।
দৃশ্যটা দেখে আসমানীর বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল।এতটুকু একটা শিশু!
মায়ের মুখটা ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই মাকে হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীতে আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় তার পৃথিবীটাই যেন শূন্য হয়ে গেছে।
আসমানীর চোখ আটকে রইল শিশুটির মুখে। অদ্ভুত এক মায়া এসে ভর করল তার বুকজুড়ে।মনে হলো, এত ছোট্ট একটা বাচ্চা মাকে ছাড়া কীভাবে থাকবে?মায়ের বুকের গন্ধ ছাড়া, মায়ের স্পর্শ ছাড়া, মায়ের কণ্ঠের ঘুমপাড়ানি ছাড়া,একটি শিশু কি সত্যিই বড় হয়ে উঠতে পারে?
অজান্তেই আসমানীর বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস জমে উঠল। নিজের জীবনের এত কষ্টের মাঝেও এই শিশুটির জন্য তার মনে গভীর দুঃখ অনুভব হলো। যেন অচেনা সেই শিশুটির কান্না কোথাও গিয়ে তার নিজের বুকের ভেতরেও কান্না জাগিয়ে তুলেছে।
************************
ছোট শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আধঘণ্টার বিরতির পর এবার বড়দের পরীক্ষা শুরু হবে। বাদল মাস্টার পরীক্ষার খাতাগুলো ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করছিলেন। ঠিক তখনই রোজিনা ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলো সেখানে।
হাঁপাতে হাঁপাতে সে বাদল মাস্টারকে খুলে বলল মিলনের শারীরিক অবস্থার কথা। সবটা শুনে বাদল মাস্টারের মুখও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি বিষয়টি সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে জানিয়ে আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। ওষুধের দোকানে গিয়ে আন্দাজে ওষুধ কেনার বদলে সরাসরি একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো মনে করলেন তিনি। তাই দ্রুত সরকারি হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটলেন।
আর রোজিনা ফিরতে শুরু করল বাড়ির পথে।
মিলনের বউয়ের কান্নার দৃশ্যটা মাথা থেকে সরাতে পারছিল না সে। ওইটুকু মেয়ের বুকের ভেতর স্বামীর জন্য কতটা ভালোবাসা জমে থাকলে মানুষ এভাবে কাঁদতে পারে! কী অস্থির হয়ে, কী ব্যাকুলতায় সে মিলনের জন্য বিলাপ করছিল!
দৃশ্যটা যেন রোজিনার বহুদিনের ঘুমিয়ে থাকা কোনো অনুভূতিকে আলতো করে নাড়া দিয়ে গেল।
নিজের স্বামীর জন্যও যে তার বুকের কোথাও মায়া আছে, ভালোবাসা আছে,কথাটা যেন এতদিন পর নতুন করে মনে পড়ল তার।
দারিদ্র্য তাদের সংসারের ওপর এমনভাবে চেপে বসে আছে যে ভালোবাসার কথাগুলোও যেন কোথাও চাপা পড়ে গেছে। দুজনেই মানুষের জমিতে দিনমজুরি করে। ভোরে উঠে কাজের তাড়া, পেটে সামান্য পান্তা ভাত, তারপর সারাদিন মাঠে খেটে সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরা এই জীবনযুদ্ধে প্রেম-পিরিতির কথা ভাবার অবসরই বা কোথায়?
কিছুদিন ধরে লোকটা আবদার করছে মুরগির গোশত দিয়ে গরম ভাত খাওয়ার।
রোজিনা প্রতিবারই রাগ দেখিয়ে সেই আবদার উড়িয়ে দিয়েছে। সংসারে অভাব, হাতে টান এসবের মধ্যে মুরগি রান্না করা তার কাছে বিলাসিতা বলেই মনে হয়েছে।
কিন্তু আজ যেন সবকিছু একটু অন্যরকম লাগছে।
ছোট্ট রেবেকার স্বামীর প্রতি সেই অসহায় ভালোবাসা, তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়, আর অস্থির কান্না,সবকিছু রোজিনার শক্ত হয়ে যাওয়া মনটাকে কেমন নরম করে দিয়েছে।
হঠাৎ মনে হলো, তার নিজের লোকটাও তো তাকে ভালোবাসে। মুখে না বললেও তার ছোট ছোট আবদারের ভেতরেও তো সেই ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।
রোজিনা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল।
বাড়িতে তার নিজের গড়ায় পালা মুরগি আছে, যা সে বিক্রি করার জন্যই পালে, সেখান থেকে একটা মুরগি আজ ধরবে । গরম ভাত বসাবে, মুরগির গোশত রান্না করবে। তারপর সব নিয়ে মাঠে যাবে নিজের হাতে স্বামীর সামনে খাবারটা তুলে দেবে।
মনে মনে সে যেন ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছে পছন্দের খাবারটা সামনে পেয়ে লোকটার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে!
সেই দৃশ্যটা ভাবতেই রোজিনার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অস্থিরতা শুরু হলো।
কতদিন পর স্বামীর জন্য নিজের হাতে কিছু করতে যাচ্ছে সে! পা দুটো আপনাআপনিই দ্রুত চলতে লাগল।
_________________
বেশ কিছুক্ষণ ধরে মাথায় পানি ঢালার পর মিলনের মাথাটা কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে। শরীরের উত্তাপ অবশ্য এখনো কমেনি। চোখ দুটো বন্ধই রয়েছে, তবে মাঝেমধ্যে মাথাটা সামান্য নড়ে উঠছে যেন গভীর অচেতনতার ভেতর থেকেও শরীর তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।
মিলনের সেই সামান্য নড়াচড়া চোখ এড়াল না রেবেকার। এতক্ষণ ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া রেবেকা ধীরে ধীরে কান্নার সুর থামিয়ে আহত বৃষ্টিতে স্বামীর অসুস্থ মুখের দিকে তাকাল।
খালেদা খাতুনও ছেলের নড়াচড়া টের পেলেন। তিনি রেবেকাকে আলতো করে পাশে সরিয়ে দিয়ে মিলনের মাথার কাছে এসে বসলেন। উদ্বেগে তাঁর চোখ স্থির হয়ে রইল ছেলের মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ পর মিলনের শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হলো। গলা থেকে বেরিয়ে এল ক্ষীণ, ভাঙাচোরা এক শব্দ যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে তার কণ্ঠস্বর।জ্বরের ঘোরে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল-
মিলন:: "রে... রেবেকা...”
শব্দটা খুব ক্ষীণ, খালেদা খাতুনের সঙ্গে ঘষেটি বেগমও শুনতে পেলেন। ঘষেটি বেগম সঙ্গে সঙ্গে তাকালেন রেবেকার দিকে।
রেবেকা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। মুখ নিচু, চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
ঘষেটি বেগমের মনে হলো রেবেকা শুনতে পাইনি, রেবেকা যদি সত্যিই মিলনের কথা শুনে থাকে, তাহলে কি এভাবে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারত? নিশ্চয়ই কান্নায় ভেঙে পড়ত, ছুটে আসত মিলনের কাছে। মনে হলো, রেবেকা এখনো কিছুই শুনতে পায়নি।
এই ভাবনার মাঝেই মিলন আবার জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠল_
মিলন:: “বিবি... কাইন্দা না...”
ঘষেটি বেগমের বুকটা কেঁপে উঠল। আবারও রেবেকার নাম!
তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। দ্রুত চোখের ইশারায় খালেদা খাতুনকে মিলনের পাশ থেকে সরে যেতে বললেন। কিন্তু মায়ের মন কি আর এত সহজে ছেলের কাছ থেকে সরে আসে? ঘষেটি বেগমের ইশারাকে উপেক্ষা করেই খালেদা খাতুন ছেলের হাতটা আঁকড়ে ধরে আরও কাছে ঝুঁকে পড়লেন।
আদুরে স্বরে কিছু একটা বলতে যাবেন তিনি, ঠিক তখনই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা।
জ্বরের ঘোরে মিলন বাস্তব আর বিভ্রমের পার্থক্য হারিয়ে ফেলেছে। মায়ের হাতটাকেই সে রেবেকার হাত মনে করল। হঠাৎ সেই হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে টেনে নিয়ে আলতো করে চুমু খেয়ে ফেলল।
খালেদা খাতুন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
মিলন কিছুই বুঝল না। সে মায়ের হাতটা ঠোঁটের সঙ্গে চেপে ধরে বিড়বিড় করতে লাগল। কণ্ঠে জ্বরের দুর্বলতা, কথায় অসংলগ্নতা তবু প্রতিটি শব্দের ভেতর যেন রেবেকার জন্য অদ্ভুত এক আকুলতা।
মিলন:: বিবি... আমার সোনা বিবি ,তুমি কাইন্দনা সোনা.. আমার যে সহ্য হইতাছে না.. তুমি ডরাইয়ো না আমি তো আছিতো... তোমারে কইছি না, আমি তোমারে ছাইড়া কনোহানেই যাইতাম না...
মিলনের অস্পষ্ট কথাগুলো ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল।
খালেদা খাতুন নিথর হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক মূহুর্ত।
খালেদা:: "ও মায়া মায়া গো মায়া"
পরমুহূর্তেই একটানে মিলনের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে বিলাপ করতে করতে এক ছুটে ঘরের বাহিরে।ঘষেটি বেগম পেছন থেকেই বলে উঠলো
ঘষেটি:: ঠিক হইছে, একদাম ঠিক হইছে মা গি, ইশারা করছিলাম না উডবার লাইগা,ভাবডা কি ধরছস দামড়া পুতের আল্লাইদ্দা মা সাজছ,পুত বিয়া করাইছস মনে থাহে না ছিনাল।
___________________
খালেদা খাতুন বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন, বাদল মাস্টার সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। ডাক্তারকে দেখেই তিনি তড়িঘড়ি করে লম্বা ঘোমটা টেনে মুখ আড়াল করলেন। মিলনের ঘরের বারান্দা থেকে সরে গিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
শরীরও এখনো কাঁপছে অজানা এক লজ্জা আর অস্বস্তিতে। ভাগ্যিস ছেলে, ছেলের বউ কিংবা মেয়ে কেউ কিছু বুঝতে পারেনি! তারা যদি সামান্যও আঁচ করতে পারত, তাহলে কী ভীষণ লজ্জায় পড়তে হতো তাকে!
এদিকে ডাক্তার মিলনের ঘরে ঢুকতেই ঘষেটি বেগম রেবেকা ও কলিকে সঙ্গে নিয়ে পাশের কক্ষে চলে গেলেন। ঘরে তখন বাদল ,মিলন আর চিকিৎসক।
ডাক্তার বেশ মনোযোগ দিয়ে মিলনকে পরীক্ষা করলেন। শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখলেন, জ্বর একশ চার ডিগ্রি ছুঁয়েছে। তবে মাথায় নিয়মিত পানি দেওয়ার কারণে জ্বরটা মাথায় তেমনভাবে উঠতে পারেনি। মাথায় পানি দেওয়ার সিদ্ধান্তটা যে খুবই ভালো হয়েছে, ডাক্তারও সেটা জানিয়ে দিলেন।
সরকারি হাসপাতাল থেকে আসার সময়ই তিনি সঙ্গে করে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ নিয়ে এসেছিলেন। আগেই বাদল মাস্টারের কাছ থেকে রোগীর জ্বরের কথা শুনেছিলেন বলে চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক ওষুধও সঙ্গে এনেছিলেন। মিলনের অবস্থা দেখে ওষুধ দিলেন এবং কিছুক্ষণ পরপর ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে শরীর মুছে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
ডাক্তার::জ্বরটা বেশিই। ওষুধ সময়মতো খাওয়াইবেন। আর শরীরডা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করবাইন। কিছুক্ষণ পরপর ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে ভালো করে শরীরডা মুইছা দিবাইন। জ্বর কমতে সময় লাগবার পারে।
এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি হাসপাতাল থেকে ডাক্তারকে বাড়িতে নিয়ে আসা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু বাদল মাস্টার শিক্ষক মানুষ। তার প্রতি চিকিৎসকেরও আলাদা সম্মান আছে। তার ওপর ডাক্তারের নিজের সন্তানও বাদল মাস্টারের স্কুলেই পড়াশোনা করে। সেই সম্পর্ক আর সম্মানের কথা বিবেচনা করেই ডাক্তার কোনো দ্বিধা না করে মাস্টারের সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছেন।
অন্য কেউ হলে হয়তো চিরাচরিত নিয়মেই সরকারি হাসপাতালের কয়েকটি ওষুধ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হতো। কিন্তু বাদল মাস্টারের ক্ষেত্রে ঘটনাটা একটু আলাদা।
ডাক্তারকে বিদায় করে বাদল মাস্টার আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
তখন খালেদা খাতুন চুপচাপ মুখে আঁচল গুঁজে তরকারির নিচে আগুন দিচ্ছিলেন।
বাদল:: মিলনের মা যাও জলদি যাও পোলারে কিছু খাওয়াইয়া ওষুধ খাওয়াইয়া দেও
খালেদা:: অসম্ভব আমি পারতাম না
মুখের উপর না করে দিলো খালেদা, অবাক হলো বাদল -
বাদল:: কি ? কি কও
খালেদা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে খুন্তি দিয়ে তরকারি নাড়াচাড়া করতে করতে লজ্জায় চেহারা লাল নীন হলুদ বানিয়ে বলল-
খালেদা:: ও মায়া মায়া গো, আমি মাপ চাই দুয়াও চাই ,ঐ পুতের অসুক ঠিক না হইলে আমি তার ধারে যাইতাম না।আন্নের পুতেরে আন্নে সেবা করুইন।
বাদল মাস্টার বুঝতে পারে না স্ত্রীর কথা,সে তার দাদি শাশুড়ি ঘষেটি বেগমের কাছে ছুটে মিলনের ঘরে, বারান্দায় পা রাখতেই ঘষেটি নিজেই কলিরে নিয়ে ঘরের বাহিরে বের হলো।
বাদল:; দাদি আন্নের নাতনির হইছে কিতা? বেডি এইতা করে কেন?
ঘষেটি:: ভুতে ধরছে মা গি রে
বাদল:: কি ?
বাদল মাস্টার ঘষেটি বেগমের কথার মর্ম বুঝতে পারলেন না। তাই ঘষেটি বেগম বাদল মাস্টারের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে আসল ঘটনাটা ফিসফিসিয়ে বলে দিলেন। কথাটা শুনেই মাস্টার হো হো করে হেসে উঠলেন।
রান্নাঘরের ছোট জানালা দিয়ে দাদি আর স্বামীর কাণ্ড দেখছিলেন খালেদা খাতুন। স্বামীর হাসির কারণ বুঝতে তার আর বাকি রইল না। লজ্জায় তিনি আবারও আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন।
বাদল:: তয় আমি স্কুল বিগাইত দিয়া বাইত কি করাম বুবু , আমি স্কুলে যাইগা আন্নে বউরে কন মিলনের খাতির যত্ন করবার।
ঘষেটি মাথা নাড়লো বাদল মাস্টার যেতে যেতে খালেদার দিয়ে তাকিয়ে বলে।
বাদল:: তোমার লগে রাইতে কতা হইবো ।
খালেদা খাতুন আরেক দফা লজ্জায় লাল নীল হলুদ হয়ে গেল।
______________________
অন্যদিকে রেবেকা মিলনের বুকের উপরে শরীরের সব ভার ছেড়ে দিয়ে একের পর এক তার ব্যাকুলতার বাণী শোনাচ্ছে।
ডাক্তারের সামনেই জ্বরের ঘোরে মিলন আবার রেবেকার নাম ধরে ডেকে উঠল। তবে ঘষেটি বেগম তখন শক্ত করে রেবেকার হাত ধরে রেখেছিলেন। বাদল মাস্টার আর ডাক্তারও সেদিকে তেমন পাত্তা দিলেন না; তাঁরা নিজেদের কথাবার্তা ও মিলনের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
ডাক্তার ও বাদল মাস্টার যখন মিলনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তখনই ঘষেটি বেগম রেবেকার হাত ছেড়ে দিলেন।
আর এক মুহূর্তও দেরি করল না রেবেকা। ছুটে গেল মিলনের কাছে।
ঘষেটি বেগম তখন কলিকে সঙ্গে নিয়ে নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাদের দুজনকে কিছুটা সময় একান্তে দেওয়ার জন্য।
রেবেকার উপস্থিতি টের পেতেই মিলন ধীরে ধীরে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে তাকে কাছে ডাকল। জ্বরের ঘোরে দুর্বল কণ্ঠে উচ্চারণ করল-
মিলন:: "বিবি" কই তুমি
রেবেকা:: এইনোই আমি
বলেই রেবেকা ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিলনের বুকে।মিলনও কাঁপতে থাকা হাত দুটো দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল-
মিলন:: কুনো ?
রেবেকা:: এই যে আন্নের বুহে।
মিলন এবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। আবছা দৃষ্টিতে দেখতে পেল রেবেকার কান্নায় ভেজা মুখখানি। দৃশ্যটা দেখেই মিলনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।তার বিবি এত কেঁদেছে তার জন্য! তাহলে কি এতক্ষণ যা দেখছিল, তা নিছক জ্বরের ঘোরের স্বপ্ন ছিল না? সত্যিই কি তার রেবেকা তার জন্য কেঁদেছে?
ভাবনাটা মিলনের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে দিল। অসুস্থ শরীরের মাঝেও মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল। ইচ্ছে করল, রেবেকার সেই ফোলা গাল দুটোতে আদরে ভরিয়ে দিতে।
মনের ইচ্ছাকে কখনোই খুব বেশি লুকিয়ে রাখতে পারেনি মিলন। তাই অসুস্থ শরীরেও নির্দ্বিধায় বলে উঠল-
মিলন:“বিবি, যাও গিয়া দরজা দিয়া আইয়ো।”
রেবেকা এমনিতেই স্বামীর প্রতি বাধ্য। তার ওপর অসুস্থ মিলনের অনুরোধ এবার যেন সেই বাধ্যতায় আরও একটুখানি মায়া মিশে গেল। বাড়ির মানুষ কী বলবে, কী ভাববে এসব মাথায় আসলো না আপাতত, সে ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে আবার মিলনের কাছে ফিরে এল।
মূহুর্তেই মিলন তার উত্তপ্ত শক্ত হাত দিয়ে রেবেকাকে টেনে বিছানায় শুইয়ে নিজে তার ওপর ঝুঁকে, অস্পষ্ট স্বরে “বিসমিল্লাহ” বলেই একের পর এক চুম্বন আঁকতে লাগল রেবেকার গাল, ঠোঁট, গলায়। রেবেকাও দুই হাতে আঁকড়ে ধরল মিলনকে। মনে মনে “বিসমিল্লাহ” পড়ে কয়েকটি চুমু সেও বসালো স্বামীর মুখমণ্ডলে।
বেশ কিছু সময় ধরে তাদের আদর-আহ্লাদ চলল। রেবেকা হাঁপিয়ে গেছে, কিন্তু মিলন যেন কিছুতেই তাকে ছাড়ছে না।