নদীটার বুকজুড়ে তখন দুপুরের উজ্জ্বল রোদ ঝলমল করছে। মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সূর্য তার তীব্র আলো ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে। নদীর স্বচ্ছ জলের ওপর সেই আলো পড়ে চিকচিক করছে, মনে হচ্ছে যেন অসংখ্য ছোট ছোট রুপালি কণা জলের বুকে ছড়িয়ে আছে। মৃদু স্রোতে সেই আলো ভেঙে যাচ্ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে দূরের ঢেউয়ের সঙ্গে।
আকাশটা ছিল পরিষ্কার নীল। মাঝে মাঝে দু-এক টুকরো সাদা মেঘ ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছিল। দুপুরের কারণে চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল।
নদীর পাড় ঘেঁষে চলে যাওয়া সরু মাটির পথ ধরে লোকটা সামনে হাঁটছিল। দুপুরের রোদে পথের শুকনো মাটি কিছুটা শক্ত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আগের দিনের বৃষ্টির কারণে ছোট ছোট ফাটল দেখা যাচ্ছে। পথের দুপাশে ঘন ঘাস আর কাশবন, মাঝে মাঝে ঝোপঝাড় এতটাই ঘন হয়ে উঠেছে যে পথটাকে আরও নির্জন মনে হয়।
লোকটার পেছন পেছন আসমানী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। রোদের তাপ থেকে বাঁচতে সে বারবার চারপাশের গাছগুলোর ছায়ার দিকে তাকাচ্ছিল। তার পরনের কাপড়ের ওপর দুপুরের আলো পড়ে ঝলমল করছিল। চারপাশের প্রকৃতি যতই সুন্দর হোক, তার মনে ততটাই জমে ছিল অজানা এক অনুভূতি-সে কোথায় যাচ্ছে, সামনে তাকে জন্য কী অপেক্ষা করছে, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।
আরও কিছুটা সামনে এগোতেই দেখা গেল লোকটার বাড়ি।
নদীর পাড় থেকে খানিকটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি মাটির ঘর। চারপাশের সবুজের মধ্যে ঘরটাকে দূর থেকে যেন প্রকৃতিরই একটা অংশ মনে হয়। দেয়ালগুলো মাটি দিয়ে তৈরি, কোথাও কোথাও সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গিয়ে রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তবু ঘরটা শক্তপোক্তভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।
ঘরের মাথার ওপর পুরোনো খড়ের ছাউনি। দুপুরের তীব্র রোদ ঠেকিয়ে সেই ছাউনির নিচে এক টুকরো গভীর ছায়া তৈরি হয়েছে। ঘরের সামনের ছোট্ট উঠানটা মাটির, বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট জায়গা, সেখানে হয়তো কিছু শাকসবজি লাগানো। উঠানের অন্য পাশে কয়েকটি কলাগাছ আর একটি বড় পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যার ছায়ায় দুপুরের গরম থেকেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।
উঠানের এক কোণে মাটির চুলা, তার পাশে গুছিয়ে রাখা শুকনো কাঠ। কাঠের পুরোনো দরজাটা বন্ধ। দরজার ওপর রোদের আলো এসে পড়েছে, আর নিচে জমে আছে গাছের পাতার ছায়া।
বাড়িটার সবচেয়ে বিশেষ ব্যাপার ছিল তার অবস্থান। ঘর থেকে সামান্য এগোলেই নদীর পাড়। সেখান থেকে নদীর বিস্তৃত জলরাশি স্পষ্ট দেখা যায়। দুপুরের আলোয় নদীটা যেন শান্ত অথচ জীবন্ত।
আসমানী বাড়িটার সামনে এসে একবার চারপাশে তাকাল। নির্জন নদীর পাড়, চারদিকে সবুজ গাছপালা, দূরে ঝলমলে নদীর জল আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট মাটির ঘর-সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও কোথায় যেন এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল।
লোকটা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আর আসমানী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সেই অচেনা মাটির ঘরটার দিকে তাকিয়ে রইল-যেন তার জীবনের নতুন কোনো অধ্যায়ের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
:ওই যে, আমার বাড়ি।
আসমানি লোকটার পেছন পেছন উঠানে পা রাখতেই ঘর থেকে একজন নারী বেরিয়ে এলেন। অচেনা মেয়েটিকে দেখে তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
লোকটা শুধু বলল,
: গাঙ্গেয় পাড় এলহা খাড়াই আছিল, একটু জিয়াই
নিক।
আসমানি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মহিলাটি চোখমুখে কুঁচকে তাকায় আসমানীর দিকে, পা থেকে মাথা অব্দি পরোক্ষ করে তাকে, পরমুহূর্তেই তার চেহারার ভাব স্বাভাবিক করে কুটিল হাসে।
হাসমত সওদাগর খবিরুন নেসাকে নিয়ে নৌকায় উঠেছেন। লোকটা অতিরিক্ত রেগে গেলে তার সঙ্গে কথা বলা দুষ্কর। তাই খবিরুন নেসা চুপচাপ বসে আছেন। আসমানী এমন কেন করল, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। আর কেনই বা আসমানী বীরপুরে চলে আসায় হাসমত সওদাগর এতটা রেগে গেলেন যে, বাড়িঘর খালি ফেলে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই তাকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন-সেটাও তাঁর মাথায় ঢুকছে না।
তবে খালি হাতে মেয়েরা জামাইবাড়ি যায় কী করে? গ্রামের লোকে মন্দ কথা বলবে যে। অন্য সময় তো নৌকা ভর্তি করে বাজার-সদাই নিয়ে যায় হাসমত সওদাগর,সেসব আয়োজন করতেই কম করে সাত দিন লেগে যায়। অথচ আজ কোনো প্রস্তুতির সময়ই পেলেন না। হাতের কাছে যা পেয়েছেন, আর বাড়িতে যা ছিল, সবই কোনো রকমে গুছিয়ে নৌকায় তুলে নিয়েছেন। তাতেই বড় তিনটে বস্তা হয়েছে।
এক বস্তায় সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, নারিকেল আর পিঠার চাল। আরেকটায় গুড়, হাঁস-মুরগি, জামাইয়ের জন্য কবুতর, নদীর বাতাসি মাছ। সঙ্গে নিয়েছেন চরের টাটকা পুঁইশাক-পাটশাক, পটল, করলা, ঝিঙে, কাঁকরোল, ধুন্দুল, বেগুন, শসা আর কাঁচামরিচ,আরেকটায় শুধু আলু।
এসবের দিকে তাকিয়ে খবিরুন নেসার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। স্বামীর ওপর বেজায় বিরক্ত তিনি। আজই যাওয়ার কী দরকার ছিল? কাল সকালে গেলে কি এমন ক্ষতি হতো?সে না হয় রাতে নাতির পছন্দের পুলিপিঠা আর জামাইয়ের পছন্দের তিল-নাড়িকেল দিয়ে মেড়া পিঠা তৈরি করে নিতো, অন্য সময় যেমন নিয়েছে।
কথাটা মনে মনে যতই বলুন, মুখে বলার সাহস পেলেন না। বৃদ্ধা তাঁর স্বামীকে প্রচণ্ড ভয় পান। হাসমত সওদাগরের মেজাজ এখন যে অবস্থায়, সেখানে সামান্য একটি কথাও যে কখন কী বিপদ ডেকে আনে, তা তিনি ভালো করেই জানেন।
তাই নৌকার পাটাতনে চুপচাপ বসে রইলেন খবিরুন নেসা। নদীর বাতাস এসে তাঁর আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে। আসমানীর কথা বারবার মনে পড়ছে। মেয়েটা এমন কী করল, যার জন্য হাসমত সওদাগর এতটা ক্ষেপে গেলেন-এই প্রশ্নটার কোনো উত্তরই খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।
________________________
"বীরপুর"
খালেদা খাতুন হাঁসের গোশত বাটিতে তুলে নিল। থালায় গরম ভাতের ওপর সরিষার তেল ছিটিয়ে দিল। এক পাশে দিল বেগুনের বড়া। রেবেকা এই পুরো সময় শাশুড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে দেখল।
খালেদা খাতুন খাবার বেড়ে রেবেকার উদ্দেশে বলল-
খালেদা: যাও বৌ, খাউনডি ঘরে লইয়া যাও। মিলনে তো গা ধুইছে?
রেবেকা: হ, আম্মা।
পাশের পিঁড়িতে বসে থাকা ঘষেটি বেগম রেবেকার আগাগোড়া পরখ করে নাতনি খালেদা খাতুনকে বলল-
ঘষেটি: বেশাইয়া(বেশি করে) খাওন দেও । দুইজন একলগে খাইবনে।
এবার খালেদা খাতুন রেবেকার দিকে ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-
খালেদা: তুমি ও নাইয়া আইছো, বৌ?
রেবেকা: জি, আম্মা।
তা শুনে খালেদা পুনরায় খাবারের বাটিগুলোতে বেশি করে খাবার বাড়ল। ঘষেটি বেগম রেবেকাকে বলল-
ঘষেটি: তহন যা যা কইছিলাম, মনে আছে মিলন বৌ? ভুইল্লা গেলে চলতো না। স্বামীর ঘর করন লাগবো তো! জীবন-সংসারে কেউ আপন না, দেখছো তো? তহন পুতের জর আহায় তোমার হউরি কেমনে তোমারে চাইপা ধরবার চাইলো! তাই সবাইরে মানন বাদ দিয়া তোমার ঘরের বেডারে শক্ত কইরা ধরো।
রেবেকা একবার শাশুড়ির দিকে তাকালো, খালেদা খাতুন মাথা নিচু, রেবেকা বড়মা ঘষেটি বেগমের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল, যার মানে সে বুঝতে পেরেছে। তারপর একে একে খাবারের বাটিগুলো ঘরে নিয়ে গেল।
খালেদা খাতুন খানিকটা লজ্জাবোধ করছিল সেই ঘটনার জন্য। তবে রেবেকা চলে যেতেই বলল-
খালেদা: বু, যদিও আমি তহন বৌয়ের উপর রাইগা ছিলাম, কিন্তু আমি কিছু ভুল কইনাই। তহন আন্নে হইলেও একই কথা কইতেন।
ঘষেটি: হ, হইছে। আর রাও করিছ না। তর মায়ে যে একবার শীতে লাউয়ের ঝাড়ায় লাউ পাড়বার লাইগা বড় দা দিয়া কোপ মারছিল, হেই কোপা যাইয়া আমার পুতের পিঠে পরছিল-মনে আছে তর?
এবার খালেদা খাতুন চুপ হয়ে গেল।
তার মনে আছে। সেই ঘটনাটা বেশ বড়ই ছিল। সেই ঘটনার পরের বছরই তার বিয়ে হয়েছিল। তখন তাদের পরিবারের খুব খারাপ সময় চলছিল, পরিবার ভাঙতে বসে ছিল। আশপাশের মানুষ, আত্মীয়-স্বজন,সবার খারাপ কথা শুনতে হয়েছিল খবিরুন নেসাকে।
“অপয়া, অলক্ষী, জামাই খেতে চায়, রাক্ষুসী, আজরাইল”-কত কথাই না শুনতে হয়েছিল তাকে! সম্পর্কে যারা দাদি ছিল, তারা তো কথায় কথায় গালে ঠুয়া দিয়েছে খারাপ ব্যবহার করেছে।
হাসমত সওদাগর তখন ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। দিনের পর দিন তার শরীর ভেঙে পড়ছিল,পিঠের ক্ষত শুকানোর বদলে জায়গাটিতে পচন ধরতে শুরু করেছিলো। সে সময় গ্রামাঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সবার নাগালে ছিল না। তাই পরিবারের লোকজন গাছগাছড়ার ওষুধসহ নানা ধরনের লোকজ চিকিৎসার আশ্রয় নিয়েছিল।
কবিরাজের বাড়িতে আসা-যাওয়াও ছিল প্রায় প্রতিদিন। কখনো সে গাছগাছড়া দিয়ে তৈরি ওষুধ দিত, কখনো ঝাড়ফুঁক করত। অসুস্থ ছেলেকে সুস্থ করে তোলার আশায় আফসার সওদাগর ও পরিবারের মানুষ তখন যে পথের কথাই শুনত, সেই পথেই ভরসা খুঁজত।
হাসমত সওদাগরের সুস্থতার কামনায় পরিবারের লোকজন একটি ওরসের আয়োজনও করেছিল। গ্রামের প্রচলিত রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী এমন আয়োজনকে অনেকেই (ওরস) বরকত ও দোয়া লাভের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখত। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসেছিল সেই ওরসে।
তবে এসব আয়োজনের পাশাপাশি হাসমত সওদাগরের চিকিৎসাও চলছিল। পরিবারের সবাই তখন শুধু একটাই আশায় দিন গুনছিল-কবে তিনি আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।
খবিরুন নেসাকে অজান্তেই হয়ে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা খুব বড় আকার ধারণ করেছিল।
তখন তাদের পরিবারের মাথা ছিল তার দাদা আফসার সওদাগর। তার কথার ওপর হাসমত সওদাগর কথা বলার সাহস পেত না। কী তেজই না ছিল দাদার! খালেদা তা নিজের চোখেই দেখেছে।
খবিরুন নেসাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু তার দাদি ঘষেটির জন্য পারেনি। বুড়ো তখন রাগে তত দিন খবিরুনের হাতের পানিও পান করেনি, যত দিন না তার ছেলে হাসমত সওদাগর একেবারে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
সেই সময়টাতে তার দাদি সঙ্গ না দিলে, তার মায়ের সংসারটা সেখানেই ভেঙে যেত।
খালেদার অতীতের সেই কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা নরম হয়ে এল। সে বলল-
খালেদা: মনে আছে, বু।
ঘষেটি: হুন, ভালা হউরি হইতে খালি পুতের বৌয়ের কাছে প্রিয় হইলেই হয়। বাদবাকি যা করনের, বৌ করবো বুঝছোস মা গি।
খালেদা আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে, এগিয়ে গিয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরে, কান্নারত গলায় বলে-
খালেদা: বুঝছি বুবু বুঝছি, আমি তোমার মতন ভালা হউরি হইমু।
ঘষেটি বেগমের গর্বে বুক ফুলে ওঠে। এই একটি বাক্যের পেছনেই যেন তার সকল প্রাপ্তি, অথচ এটি অর্জন করতে তার লেগেছে বহু বছর।
________________________
রেবেকা ঘরে খাবার নিয়ে বসে আছে অনেক সময়, তবে মিলন নেই ঘরে। রেবেকা প্রথমে ভেবেছিল পায়খানায় গিয়েছে, কিন্তু এত দেরি করায় সে ঘর থেকে বেরিয়ে সেই দিকটায় হাঁটা ধরল। লোকটার এমনিতেই জ্বর, এই অসুস্থ শরীরে কোথাও আবার মাথা ঘুরে পড়ে গেলে তখন রেবেকা কী করবে! এমনিতেই লোকটা রাগ করছে তখন তার সাথে। কী কারণে সেটা ঘষেটি বেগম তাকে বুঝিয়েছেন-অসুস্থ অবস্থায় স্বামীরা বউদের থেকে বেশি যত্ন আশা করে, রেবেকাও যেন তাই করে। শ্বশুরবাড়িতে স্বামী ছাড়া কেউ আপন হয় না, সবাই নাকি স্বার্থে সম্পর্ক ধরে রাখে! কারও স্বার্থে আঘাত লাগলে সম্পর্কে ভাঙন ধরে।
যেতে যেতেই কথাগুলো ভাবছিল রেবেকা। তবে পায়খানার সামনে গিয়ে দেখে তা ফাঁকা। সামনে-পেছনে চোখ ঘুরিয়ে দেখে, লোকটি কোথাও নেই! কই গেল? ভাবতেই শুনতে পেল রোজিনার হাস্যোজ্জ্বল গলা, কদম গাছেই দিকটায় শোনা যাচ্ছে। রেবেকা কাদামাটিতে পা টিপে টিপে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং যেতে যেতে শুনছে মিলনের গলা।
মিলন:কিয়ো ভাউজ, আইজ দেহি লাল কাপড় পিনছেন, তা কি কোনো বিশেষ কিছু নাহি আইজ?
রোজিনা লজ্জা পেয়ে গেল। সে আজ তার স্বামীর পছন্দের খাবার রান্না করেছে, পছন্দের রঙের কাপড় পরেছে, এখন খাবার নিয়ে মাঠে যাচ্ছেন। ইস, কী লজ্জার কথা! সবাই কি বুঝতে পারছে তাকে দেখে? যে সে তার স্বামীকে খুশি করতে এসব করেছে?
রোজিনা:ও, ওই আর কী, তেমন কিছু না। ভাই, জর কমছে নাহি? আহারে, তহন আন্নের বউয়ে যেমনে কানল বহুত ডরাইয়া, আমার যা মায়া লাগছিল।
মিলন বিড়িতে টান দিয়ে বলে।
মিলন:শইলের জর কমছে আগের তনে, তয় মনডার তাপ কমে নাই। বিবি আমার সব কিছুতেই ডরায় বেশি, এইডা কিছু না, ছুডো মানুষ তো।
রোজিনা:ছুডো কই আর! সোয়ামির অসুক দেইহা ডরাইছে মাইয়া, মুহাব্বতেই ওরুম (ওরকম) করছে।
কথাটা বলেই রোজিনা হাঁটা ধরে মাঠের দিকে।
মিলন বিড়িতে পুনরায় জোরে টান দিয়ে ভাবুক মনে নিজে নিজেই বলে,
মিলন:আমার বিবি আর মুহাব্বত, তাও আবার আমার লাইগা!? দিনে-রাইতে চুমাইয়াও তার কাছে থাইকা মুহাব্বতের ম-ডাও পাইলাম না। আমি যা কই, তাই করে, নিজের তনে কিছু না। হেয় আবার আমাবে হারাবার ডরে কান্দে!?
বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে মিলন পুনরায় বিড়ি টানে। তবে স্পষ্টই তার পেছনে দাঁড়িয়ে রেবেকা সমস্তটা শুনল। তা শুনে রেবেকা তাকে ডাক দিতে চেয়েও দিল না। রেবেকার কাছে কেমন অদ্ভুত লাগছিল এসব শুনে। সে মিলনের কাছে আর যেতেই পারলো না, যেভাবে কদম তলায় গিয়েছিল সেভাবেই ঘরে ফিরে এলো শান্ত পায়ে।
পুনরায় খাবার নিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল মিলনের আর ভাবতে লাগল, সে কি সত্যিই মোহাব্বত করে না তার স্বামীকে? কীভাবে ভাবতে পারল ঐ লোক? স্বামী ছাড়া তার এ বাড়িতে কী আছে? কিছুই তো না। সে বোঝে না, কীভাবে মোহাব্বত দেখাতে হয়। তখন যে সে কান্নাকাটি করল, এমন কান্না জীবনে কাঁদেনি সে। এসব কি মোহাব্বত না? তাহলে কী মোহাব্বত?
ভাবনার মাঝেই মিলন ঘরে ঢুকে। রেবেকা তাকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ে। মিলন গিয়ে বিছানায় বসে।
মিলন:মাথা ঘুরায় আমার, ভাত দেও, খাইয়া একটা বড়ি (ঔষধ) খাইয়া ঘুমাই।
রেবেকা কোনো কথা বলে না। তবে তার খুব বলতে ইচ্ছে করল, এতই যখন মাথা ঘুরায়, তখন কদমতলায় বসে বিড়ি টানছিলেন কেন? আরও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করল, মোহাব্বত কীভাবে করে, আমাকে বুঝান?
তবে সব সময় সহজ-সরল প্রশ্ন করা রেবেকা আজকে কিছু বলতে পারল না।
খাবার বেড়ে দিল মিলনকে। মিলনও কিছু বলল না। সবসময়ের মতো রেবেকাকে হাতে তুলে নিজের থালা থেকে দু-এক লোকমা খাওয়ালেও না। যতটুকু খেল, একাই মাথা নিচু করে খেল। খাওয়া শেষে ওষুধ খেয়ে বিছানায় টানটান হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে শুধু বলল,
মিলন:বইয়া না থাইহা তুমিও খাইয়া উঢো।
রেবেকা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল মিলনের হাবভাব। তার খুব কান্না আসছে, কেন তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না। লোকটা কথা বলছে না তার সাথে আগের মতো। অসুস্থ বলে কি? না, অসুস্থ অবস্থায় তো সকালে তার সাথে কত কথা বলেছে। এখন তো আগে থেকে সুস্থ, কেন বলছে না কথা?
রেবেকা দাঁড়িয়ে ছিল অনেক সময়। মিলন পাত্তা দিচ্ছে না তাকে। এই পর্যায়ে রেবেকা ঠোঁট উল্টে কান্না করে দিল। তার নাক টানার শব্দ কানে যেতেই মিলন চোখ খুলে কপাল কুঁচকে তাকাল। রেবেকাও তার দিকে তাকিয়েই ছিল, তার চোখ দুটোতে এক আকাশ পরিমাণ অভিমান, আর কত কত প্রশ্ন। মিলন মনে মনে কটিল হাসে এটাই তো দেখতে চাচ্ছিল সে, তাকে নিয়ে ভাবুক, নিজে থেকে তাকে কিছু বলুক।
চোখ-মুখ লাল করে নিঃশব্দে কান্না করছে মেয়েটা, তবে কিছুই বলছে না। কিন্তু মিলনের বুকে তো ঝড় হয় তার বিবির কান্না দেখলে। তার ভাবনা, বিবি মানুষ কান্না করার জন্য জন্মায়নি, তার কেবল সোয়ামির আদর খাওয়ার জন্য জন্মাইছে।
মিলন আর তাকাল না ঐ মুখের দিকে, উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়ল। উল্টোদিকে ঘুরেই স্পষ্ট বলল,
মিলন:বাপের বাড়িত যাইবার লাইগা কান্দ, বিবি? যাইবার চাইলে বৈকাল্য আব্বা বাড়িত আইলে কইও, হাইন্জা কালে সেনপুর দিয়া আইবো তোমায়।
মিলনের কথায় রেবেকা অবাক হলো প্রচুর। মিলন তো তাকে বাপের বাড়ি যেতে দিতে চায় না। বারবার বলে,
: যা চাইবা দিমু বিবি , কিন্তু বাপের বাড়িত যাওয়া ছাড়া। তাহলে?
রেবেকার মনে পড়ল ঘষেটি বেগম বলেছিল, অসুস্থতায় নাকি মানুষ অনেক উল্টাপাল্টা আচরণ করে। কেউ বাচালের মতো অনেক কথা বলে, কেউ রাগ দেখায়, কেউ আবার একদম চুপ হয়ে থাকে। মিলন তার ব্যতিক্রম না। রেবেকা তখনি ঘষেটি বেগমের কথার সাথে তার আব্বার মিল পেয়েছিল, তার আব্বা জালাল মিয়া ও অসুস্থ শরীরে অনেক বকবক করতো।
তেমনি অসুস্থতায় মিলনের মেজাজ খিটখিটে হয়, রেবেকা তা বুঝেনিয়েছে।
রেবেকা কান্না থামায়। ভাতের থালায় হাত রাখে। চুপচাপ বিছানার কোনায় বসে খাবার খায় মাথা নিচু করে। মিলন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, রেবেকা খেতে বসেছে। তবে বাপের বাড়ি যাওয়ার কথায় কি খুশি হয়ে খাচ্ছে তার বিবি? কিন্তু সে তো মন থেকে বলেনি, কি আশ্চর্য ! সে অসুস্থ বিছানায় শুয়ে,তাকে রেখে চলে যাবে এই মেয়ে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই মিলনের রাগ লাগে। সে দাঁত কটমট করে পুনরায় বলে,
মিলন: যাইবার কালে হাজন-পাতি সব লগে লইয়া যাইও, নতুন নতুন কাপড় ও নিও, সব মুহে মাইখা- হাইজা নতুন কাপড় গায়ে জড়াইয়া গ্রামের হগলরে দেখাইয়া নাচতে নাচতে চেইচ্চা বিলে শাপলা তুলবার যাইবা নে।
রেবেকা ভাত খাওয়া থামিয়ে মিলনের দিকে দেখলো, মিলনও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিল, রেবেকার মাথায় এমনিতেই অনেক বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে , তার উপর এই লোক অসুস্থ হয়ে কেমন করে কথা বলছে।এবার রেবেকা আর চুপ থাকে না, মিলনের মেজাজ দেখার ভয়ে, পেটের কথা গুলো গর গর করে বের করে দিল,
রেবেকা:কেন বাপের বাইত যাইতাম কেন? আমি থাকলে এহন কি বেশি ঝামেলা? নাকি আমারে খেদাইয়া ঐ গুলনাহাররে বিবি বানাইবার সাধ জাগছে অন্তরে?
রেবেকা কথাটা বলতে বলতেই ভাতের থালা নিয়ে দ্রুত বিছানা ছাড়ে মিলনের ভয়ে, যদি মিলন সকালের মতো তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় তাই, আগেই নেমে পড়ল। তবে তার কথা শুনে মিলন এক ছটকায় বিছানায় উঠে বসে আশ্চর্য হয়ে বলে,
মিলন:কী?
রেবেকা দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
রেবেকা:কী? কী আবার আগে তো পিরিত বুঝতাইন না তার, এহন তো বুঝাইলছুইন (বুঝেছেন) ঠিক না?হের সোয়ামির দুই ঠ্যাং ভাঙছে,হেই কি পিরিতের কান্দন আমার হউরির লগে, ছুডু দেইহা বুঝতাম না মনে করছুইন?এহন আমার সোয়ামির কাছে আইবার ইচ্ছা জাগতাছে হের,আইয়ুক না দেহি, চুল ছিইড়া হাক রাইন্ধা খাইবাম।
কথাটি বলতে বলতে রেবেকা ঘর ছাড়ে। মিলন কথাগুলোর মানে বুঝে, বিস্ময় কাটিয়ে বিছানা থেকে নামতে নামতে চিৎকার করে উঠে,
মিলন:কী সর্বনাশা কথা! হায় আল্লাহ, আমার সংসারডায় আগুন লাগাইতে সবাই খাড়া! ওওওও বিবি, হুনো একবার! ওওও রেবেককককককা!
পেছন থেকে মিলন ডাকছে, তবে রেবেকা ডাকে সাড়া দিল না। অতিরিক্ত অভিমানে মুখ ফেটে অনেক কিছু বের হয়ে গেছে তার। তবে সে সবটাই গুলনাহারের প্রতি তার হিংসা থেকেই বের হয়েছে। মিলনের ডাকে সাড়া দেবে কি , তার তো এখন ভয় করছে আরও বেশি।
কিন্তু ওইদিকে মিলন ভয়ে আছে। সে তার বিবির সাথে অভিমান করতেও চায়না, জ্বরে খিটখিটে মেজাজ হয়ে যায় তার।দরকার পড়লে কথা বলা বন্ধ রাখবে, তবে দুজনের সংসারে অন্য নারীকে নিয়ে কোনো সমস্যা হোক, এমন কিছু করবে না।
কোথায় সে ভাবছিল, বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বলায় রেবেকা বলবে, সে যাবে না তাকে রেখে, কাছে ঘেঁষে জড়িয়ে আহ্লাদ করবে-তা তো হলোই না। উল্টো কোথা থেকে গুলনাহার চলে এলো?
কয়েকবার ডাকার পরেও রেবেকা এলো না,বাদল মাস্টার বাড়িতে এসেছে যতো যাই হক বাপের সামনে নির্লজ্জের মত ডাকাডাকি কেমনে করবে, ওদিকে রেবেকা সামনেও আসছে না,যে ইশারা করে আসতে বলবে। বিবির বিরহে মিলন একের পর এক বিড়ি টানছে।
_____________________
বৃদ্ধ লোকটি সত্যিই বলেছিল, তার বাড়িতে তার স্ত্রী-কন্যা আছে। আসমানীর সঙ্গে মহিলা কথা কম বললেও তার বেশ যত্ন করেছে।
দুপুরে খাবারও পাশে বসেই খাইয়েছে, নদীর পাঁচমিশালি গুঁড়া মাছের চচ্চড়ি। মহিলার রান্নার হাত ভালো। আসমানী তৃপ্তি করে খেল। অনেকদিন পর অন্যের হাতের রান্না খেয়ে ভালোই লাগছে তার। নইলে সব সময় হাসমত সওদাগরের বাড়িতে তার নিজেরই রান্না করতে হয়। তার জেঠি খবিরুন নেসা বেশি সময় পিঁড়িতে বসে থাকতে পারে না, কোমরে ব্যথা।
খাবার খাওয়া শেষে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বিকালের দিকে আসমানী অপেক্ষায় ছিল বীরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার। তবে আকাশটা হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে এলো। আবার বৃদ্ধ লোকটাও কোথায় যেন গেছে, এখনো বাড়ি ফিরছে না।
আসমানী মহিলাটাকে বারবার জিজ্ঞেস করল তার স্বামীর কথা। তবে মহিলা বলল,
:আমারে কইয়া গেলো চইলা আইবো, আর একটু দেহো।
আসমানী শুনলো তার কথা,বসে রইলো চুপচাপ কিন্তু এদিকে আবহাওয়ার অবস্থা ভালো নয়। যেকোনো সময় ঝুম বৃষ্টি শুরু হতে পারে। আর যেমনটা ভেবেছিল, তেমনটাই হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হলো।
______________
পুরোদিন কাঠফাটা রোদের পর সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি নামল। মুহূর্তেই কালো মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ, থমকে গেল দিনের চেনা আলো। ঝড়ো হাওয়ার দাপটে গাছের ডালপালা দুলতে লাগল, কিছুক্ষণ আগেও যে প্রকৃতি ছিল রৌদ্রের তাপে পুড়ে খরখরে, সেই প্রকৃতিই যেন হঠাৎ বৃষ্টির জলে শীতল হয়ে উঠল।
এহেন বৃষ্টি মাথায় নিয়েই হাসমত সওদাগর মেয়ের বাড়ির উঠোনে উঠলো।তাকে দেখেই বাড়ির সবাই অবাক।