"আসসালামু আলাইকুম"
সবাই কেমন আছেন? আশা করছি, সবাই ভালো আছেন। গল্প দিতে দেরি হচ্ছে, কারণ আমি লেখার সময় পাচ্ছি না। আমার ঘরের বেশিরভাগ মানুষই অসুস্থ, জ্বরে ভুগছেন। তাই অল্প সময়ে আমি যতটা লিখতে পেরেছি, ততটাই আপলোড করলাম।
আর ‘অপরিপক্ক’ নিয়ে একটু কথা বলি। যেহেতু এটা একটা ধারাবাহিক গল্প, তাই আমার সব চরিত্রের ওপরই লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে, লিখতে হচ্ছে। আপনারা অনেকেই ভাবেন, ‘অপরিপক্ক’ বিষয়টা শুধুমাত্র রেবেকার ওপরেই বিদ্যমান। আসলে তেমনটা নয়।
যে সময়কার প্লটের ওপর আমি গল্পটা লিখছি, সেই সময়টাকেই মূলত ‘অপরিপক্ক’ বোঝানো হয়েছে।
আপনারা যদি গল্পের প্রত্যেকটা দৃশ্য, প্রত্যেকটা চরিত্র এবং প্রতিটি ঘটনা লক্ষ্য করেন, তাহলে ধরতে পারবেন-প্রত্যেকটা চরিত্রের মধ্যেই অপরিপক্কতা রয়েছে। আমি আশা করছি, আপনারা গল্পটার মূল বিষয়টা ধরতে পারবেন।
আর আমার একটু লিখতে দেরি হলে বুঝে নিয়েন সমস্যায় আছি। সবার সুস্থতা কামনা করছি।
আল্লাহ হাফেজ।
_____________________________
চারদিকে রোদের তীব্র উত্তাপ, পুকুরপাড়ের গাছগুলোর পাতায় হালকা বাতাসের মৃদু দোলা। দূরের বাঁশঝাড়ে পাখির ডাক, আর মাথার ওপর নীল আকাশজুড়ে অলস সাদা মেঘ-সব মিলিয়ে দুপুরের প্রকৃতি যেন নিজস্ব এক ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে।
মিলন পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে বিড়িতে টান দিচ্ছিল। ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন তার মাথার ভেতরটাও ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল। চারপাশটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠছে। রেবেকার সামনে থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।
সে আর দেরি করল না। হাতের বিড়িটা দ্রুত ছুড়ে ফেলে পুকুরের পানিতে নেমে গেল।
কিছুক্ষণ পরই রেবেকা লুঙ্গি, গামছা আর সাবান হাতে নিয়ে ঘাটে এসে হাজির হলো। মিলন একবার তাকাল তার দিকে। চোখাচোখি হতেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। সে বুঝতে পারল, রেবেকাও তার পিছু পিছু পুকুরঘাটে এসেছে।
রেবেকা সাবানটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
রেবেকা::::: হুনুইন, এই যে সাবান আনছি। মাথাত সাবান মাখুন। মাথা ধুইলে বেদনা কমবো।
মিলন আশা করেনি, রেবেকা এমন কিছু বলবে। সে খানিকটা অবাক হয়ে গেল। তার বিবি এতটা বুঝল কী করে?
সে বিস্মিত গলায় বলল:-
মিলন::::: আমার মাথাবেদনা, তুমি কিবা বুঝলা? আমি তো তোমারে কই নাই।
রেবেকা স্বাভাবিক কণ্ঠেই উত্তর দিল:-
রেবেকা::::: কন লাগতো কেন? আমারে জরে ধরলেও মাথা বিষ করে। তহন মাথা ধুইলে বিষ কমে।
মিলন ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি টেনে বলল,
মিলন::::: আমার কী চাই, হেইডা তো বুঝো না তুমি। কী চাইছিলাম, তাও তো মনে নাই তোমার। আসল জিনিসটাই বুঝো না, বিবি। বুঝলে আইজ আমার মাথাবেদনা করত না।
কথাটা শুনে রেবেকা চুপ হয়ে গেল।মিলন তার কাছে কী চেয়েছিল?কখন চেয়েছিল?সে ভাবতে লাগল। তখনো কতো মেজাজ দেখালো,সে যা বলতে চেয়েছিলে বলতে তো দিলো না উল্টো দূরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।
স্বামীর যত্ন তো সে করে। সংসারের কাজ করে, ঘর পরিষ্কার করে, বিছানা গুছিয়ে রাখে, কাপড় ধোয়, তাকে সময়মতো ভাত বেড়ে দেয়। মিলনের কথা শোনে, বাড়ির সবার কথাই শোনে। তবে মিলন তার কাছে এমন কী চেয়েছিল, যা সে মনে রাখেনি?
তার যতটুকু মনে পড়ে, মিলন তো কখনো তার কাছে কিছু চায়নি। বরং সে না চাইলেও মিলন তার জন্য কত কিছু এনে হাজির করেছে!
কয়েক মিনিট এভাবেই কেটে গেল।
হঠাৎ রেবেকার মনে পড়ল সেই দিনের কথা—যেদিন সন্ধ্যায় মিলন তাকে তার বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল। সেদিন তাকে আদর করতে করতে, আবদারের সুরে এবং স্বামীর সহজ অধিকারে মিলন বলেছিল,
(শইলেরডা হইয়া গেছে তোমার, তুমি বড় হইছো, বিবি। আমার কিন্তু এর চেয়েও বড় বড় অনেক আদর চাই)
সেদিনের কথাগুলো রেবেকা অনেক আগেই ভুলে গিয়েছিল।ভুলে যাওয়ারই কথা!
আমেনা বেগম তার সঙ্গে যা যা করেছিলেন, তারপর তার ছোট্ট মন আর মস্তিষ্কে কি এসব কথা ধরে রাখার মতো জায়গা ছিল? হয়তো আজও মনে পড়ত না, যদি না কিছুক্ষণ আগে মিলনের আচরণ আর তার চোখের ভাষা তাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলত। তবে আদর তো সে করতে দেয় তাকে আর রাতে তো কতো কিছু করলো, স হ বা স করেই তো তষোক টা নষ্ট হলো,এর চেয়ে বেশি কি কিছু হয়, আর যদি হয় তো কি হয় সে কি করবে আর?
রেবেকাকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে মিলন এবার পুকুরঘাটের বসে পড়ল। ধীরে, তবে খানিকটা কর্কশ গলায় ডাকল,
মিলন:::: রেবেকককককা... আমার মাথা চক্কর দিতাছে।
রেবেকা থমকে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।
সে তাকিয়ে দেখল-মিলনের উদোম পিঠ আর ঘাড়, ভেজা মাথা। বিয়ের পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মিলন তাকে নাম ধরে ডাকল।
রেবেকা আর আশপাশে তাকাল না। তাড়াহুড়ো করে ঘাটে নেমে সাবানটা হাতে তুলে নিল। তারপর মিলনকে অবাক করে দিয়ে নিজের হাতেই তার মাথায় সাবান মাখিয়ে আলতো করে চুলে হাত বুলাতে লাগল।
রেবেকার এমন আচরণে মিলন যেন আকাশ থেকে পড়ল।
বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে সে আবার বাস্তবে ফিরল রেবেকার কথায়।
রেবেকা বলল,
রেবেকা::::; আন্নের কিচ্ছু করন লাগত না। আমি আছি তো।
আজ যেন দফায় দফায় অবাক হওয়ার দিন মিলনের।
সে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল।
রেবেকা তার ডান পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় সাবান মাখাচ্ছিল। কাজটা করতে গিয়ে তাকে একটু ঝুঁকে দাঁড়াতে হচ্ছিল। মিলন তা বুঝতে পেরে চোখ ঘুরিয়ে পুকুরের চারপাশটা দেখল।
না, কেউ নেই।
ভরদুপুর। বাড়ির নারীরা যার যার রান্নার কাজে ব্যস্ত, আর পুরুষেরা মাঠে-ঘাটে নিজেদের কাজে চলে গেছে।
মিলন হঠাৎ ডান হাত বাড়িয়ে রেবেকার কোমর জড়িয়ে ধরল। তারপর তাকে পুকুরঘাটের এক ধাপ নিচে মোটা নারিকেল গাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড় করিয়ে দিল- একেবারে নিজের দুপায়ের মাঝখানে।
পুকুরে নামার সুবিধার জন্য বাদল মাস্টার একটি মোটা নারিকেল গাছ কেটে সিঁড়ির মতো করে বসিয়েছিলেন। ঘাট থেকে ধাপে ধাপে চারটি সিঁড়ি নিচে নামলে রেবেকার বুক পর্যন্ত পানি ওঠে, আর মিলনের কোমর পর্যন্ত।
রেবেকা এতে অবাক হলো না। বরং আগের মতোই দাঁড়িয়ে দুহাতে মিলনের মাথার চুলে জমে থাকা সাবানের ফেনা আলতো করে ঘষতে লাগল।
মিলনের মুখ ছিল রেবেকার সামনে। তার দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও গিয়ে থামলো স্ত্রীর শাড়ির আঁচলে ঢাকা বক্ষের দিকে। হৃদয়ে বাসনা জাগলো সেখানে মাথাটা ঠেকানোর, তার বিবির হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনার অনুভব করার।
শরীর দুর্বল, মাথাও ঘুরছে-তবু মনের ভেতর জমে থাকা টানকে সে অস্বীকার করতে পারল না।
মিলন কখনো নিজের মনের ইচ্ছাগুলো খুব সহজে নিজের ভেতর আটকে রাখতে পারেনি। তবে দিনের আলোয়, খোলা পুকুরঘাটে- কতটা শোভনীয় হবে তার করতে চাওয়া মনের বাসনা, সেই ভাবনায় এবার সে নিজেকেই সামলে রাখল।
ঠিক তখনই সে অনুভব করল, রেবেকা তার মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে।
মিলনের কপাল কুঁচকে গেল।
হাত সরাল কেন?তার তো ভালোই লাগছিল।
কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করল সে, কিন্তু বলার আগেই রেবেকা আবার তাকে বিস্মিত করে দিল।
ধুন্দুলের জালিতে কসকো সাবান মেখে সে এবার মনোযোগ দিয়ে মিলনের শরীরে আলতো হাতে ঘষে দিতে লাগল।
আর নিজের অজান্তেই বলতে লাগল,
রেবেকা:::: শইলে সাবান লাগাইন না কতো দিন! খালি পানিত নাইমা ডুব দিলেই হইবো? সাবান লাগাইয়া ধুইয়োন লাগে না?
জ্বরে খিটখিটে মেজাজে থাকা মিলনের মনটা কথাগুলো শুনে অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে গেল।
তাহলে তার বিবি এসব লক্ষ্য করে!
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সে দুষ্টুমির ছলে গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল;
মিলন:::: সাবান মাখি না দেইখা কি আমার শইলে গন্ধ করে, বিবি এইডাই কইবার চাও!
রেবেকা অবাক হলো ,কিছুটা ভয়ও পেল এই পর্যায়ে মিনমিন গলায় বলল:-
রেবেকা:::: কি কইতাছুইন এডি, আমি কি আন্নের গা শুঁকা দেখছি নাহি!
মিলন হেসে বলল:-
মিলন::::: দেহন তো উচিত তোমার।
রেবেকা এবার প্রশ্ন করল:-
রেবেকা::::: কেন?
কথাটা বলতে বলতেই সে মিলনের পিঠে জালি দিয়ে ঘষতে শুরু করল। কাজটা করতে গিয়ে তাকে মিলনের দিকে ঝুঁকে আসতে হলো। স্ত্রীর যেই ঘনিষ্ঠতা সে চাইছিল তাই হয়ে গেলো দুজনের অজান্তেই, তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো ,নাকে-মুখে চেপে বসলো রেবেকার বক্ষের আঁচলটা, একটু সময়ের ,এক মুহূর্তেই মিলন অনুভব করলো তা,যা তার ব্যাকুল হৃদয় করতে চেয়েছিল।
সেই মুহূর্তে মিলনের সমস্ত কথা যেন কোথায় হারিয়ে গেল।
কথার উত্তর দেওয়ার জন্য সে অধর জোড়া ফাঁক করছিল, সেটাও আর দেওয়া হলো না।
সে শুধু স্তব্ধ হয়ে রইল।
আজ এসব কী হচ্ছে তার সাথে, তার বিবিই বা কীভাবে এতটা বদলে যাচ্ছে- কিছুই বুঝতে পারছে না মিলন।
একটু কঠিন করে কথা বলাতেই এত পরিবর্তন!
তবে মিলন খেয়াল করল না, দূরে কোথাও থেকে একজোড়া চোখ তাদের দুজনকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছে।
রেবেকা একে একে মিলনের হাত-পা মেজে দিয়ে বলল,
রেবেকা:::: এহন জলদি তিনখান ডুব দিয়া উডেন। এত সময় ভিজলে জ্বর বাড়বো।
রেবেকার আচরণে বিমোহিত হয়ে সে আর কথাই বলতে পারল না। বাধ্য পুরুষের মতোই তার কথা শুনে গেলো।
তিনবার ডুব দিয়ে উঠে আসতেই রেবেকা তার দিকে লুঙ্গি আর গামছা এগিয়ে দিল।মিলন শরীর মুছে লুঙ্গি পরে নিল।
রেবেকা এরপর দায়িত্বশীল স্ত্রীর মতো তার ভেজা কাপড় ধুতে লাগল।
তার দিকে তাকিয়ে মিলন বলল,
মিলন:::: তুমিও নাইয়া লাও। ভিজা গায়ে থাহন লাগত না।
রেবেকা মাথা নাড়ল।মিলনের কাপড় ধুয়ে নিয়ে এবার সে নিজেও গোসল করতে নামল।
পুরো সময়টুকু মিলন পুকুরঘাটের মাচায় বসে রইল। মাঝে মাঝে বিড়িতে টান দিতে দিতে চুপচাপ তাকিয়ে রইল নিজের বিবির দিকে।
কাপড় বদলানোর জন্য পুকুরঘাটের পাশেই মোটা কাগজের বেড়া দিয়ে ছোট্ট একটি আড়াল করা জায়গা ছিল।
রেবেকা গোসল শেষে পুকুর থেকে উঠে সেই বেড়ার ভেতরে ঢুকে শুকনো কাপড় পরতে লাগল।
মিলন মাচায় বসে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল।
উঁচু থেকে পুরোটা স্পষ্ট দেখা না গেলেও রেবেকার ভেজা চুল আর উন্মুক্ত ঘাড় পরিষ্কার চোখে পড়ছিল।
মিলন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের ভাব বদলে গেল।
মাথার ভেতর শুধু একটি কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল-
এই বেড়াটা আরও উঁচু করতে হবে।
মহিলাদের কাপড় বদলানোর জন্য এতটুকু আড়াল যথেষ্ট নয়।
*************************
"মুক্তাগাছা"
আমেনা বেগম অতিরিক্ত রাগ আর উত্তেজনায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এমনটা হওয়ারই কথা। ছোট ভাই মিজান মোল্লার মুখে মাসুদের কুকীর্তির কথা শুনে বৃদ্ধার যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে।
ঘটনার বর্ণনা সহ্য করতে না পেরে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন।
মিজানের স্ত্রী খাদিজা ব্যস্ত হয়ে আমেনা বেগমের মাথায় পানি ঢালছেন। আর ধীর স্বরে নিজের স্বামীকে সাবধান করে বলছিলেন;
খাদিজা:::: এইতা কথা বুজানরে কওন লাগছিল কে? মাস্টার বা মিলনের কানে গোপনে তুইল্যা দিলেই হইত। বুড়া মানুষডা এডি সইতারবো?
মিজান ভারী কণ্ঠে বলল;
মিজান::::: আমার মাথা কাজ করা বন্ধ কইরা দিছিল। আমি যা দেইখ্যা আইছি, তা দেহাও পাপ।
খাদিজা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল;
খাদিজা::::: আন্নে চিনুইন না আন্নের বুজানরে? হেয় কি গোপন করবো এই কথা? মাসুদ আইলেই তো জিগাইবো, চিল্লাইবো। তহন কেমন হইবো? কেউ হুনলে ইজ্জত বাচবো?
মিজান এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,
মিজান::::: এতোটা ভাইবা দেহিনাই। বুজানের হুঁশ আহুক, আমি বুঝাইয়া কমু সব।
এরপর স্বামী-স্ত্রী দুজনই চুপ হয়ে গেল।
কথা আর বাড়াল না কেউ।
এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মাসুদ ফিরে আসার আগেই আমেনা বেগমের জ্ঞান ফিরিয়ে তাকে কিছুটা সুস্থ করে তোলা। তারপর এই বিষয় নিয়ে গোপনে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে-কী করা যায়।
কোনোভাবেই এমন কিছু করা যাবে না, যাতে পরিবারের সম্মান আরও নষ্ট হয়।
প্রয়োজনে গোপনে মাস্টার কিংবা মিলনকে সবকিছু খুলে বলতে হবে।
কিন্তু তার আগে-
আমেনা বেগমকে সামলাতে হবে।
কারণ তিনি জ্ঞান ফিরেই যে আবার এই ভয়ংকর সত্য কতটা নিয়ে চেঁচামেচি করবেন না তার কোনো গ্যারান্টি নাই । বৃদ্ধ কিছুতেই গ্রহণ করবে না এমন কিছু।
_______________________
প্রতিবারের মতো সকালে মাসুদের চলে যাওয়ার কথা থাকলেও আজ সে যায়নি। চাঁদনী সকাল থেকেই তাকে চলে যেতে বলতে বলতে প্রায় বিরক্ত হয়ে উঠেছে। ভয়ে তার আত্মা যেন গলায় উঠে এসেছে। যদি রাজবাড়ির অন্য কোনো নর্তকী বা দাসী এসে পড়ে তার বাড়িতে, তখন কী হবে-সেটাই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে আছে সে।
এমনিতেই অন্য নর্তকীদের তুলনায় রূপে ও যোগ্যতায় সে অনেক এগিয়ে। তাই তাকে নিয়ে সবারই কমবেশি হিংসা। এখন যদি তারা এসব দেখে ফেলে এবং রাজবাড়িতে গিয়ে সব বলে দেয়, তাহলে কী হবে? রাজবাড়ির শাস্তি যে কত ভয়ংকর, তা চাঁদনী ভালো করেই জানে, গত বছর এক মেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সেই কোন দূরের রাজশাহী অঞ্চলে। রাজবাড়ীর লোকেরা সেখান থেকে তাকে ধরে এনেছে , তারপর তার সাথে কি করেছে সেটা কেউই জানে না, তাকে আর কখনো রাজবাড়িতে দেখা যায়নি। সেও পালিয়ে গেলে তারা খুঁজে বের করে আনবে ,আর যদি তাকে না পাওয়া যায় তাহলে; তার মা আছে, ভাই আছে, তাদেরকে শেষ করা হবে নিঃশব্দে। কিন্তু এসব আর কতো বোঝাবে সে এই ছেলেটাকে! বোঝাতে বোঝাতে তার মুখ ব্যথা হয়ে গেছে।
অথচ মাসুদ ঘাড়ত্যাড়া হয়ে বিছানায় পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে আছে। তার ওপর স্বামীর মতো একের পর এক আদেশ করেই যাচ্ছে।
তার একটাই কথা- চাঁদনীকে তাকে বিয়ে করতে হবে। এই জীবন ছেড়ে তার সঙ্গে চলে যেতে হবে। চাঁদনী রাজি হলেই আজকের মতো চলে যাবে মাসুদ। তারপর খুব দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করে তাকে নিতে আসবে।
তবে ততদিন পর্যন্ত অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে রাত কাটানো যাবে না। এমনকি রাজবাড়িতে নর্তকীর নাচ নাচতেও যাওয়া যাবে না।
চাঁদনীর মন গলাতে মাসুদ কত কী-ই না বুঝিয়ে যাচ্ছে! বলেছে, তাকে বিয়ে করে সোজা বরিশাল চলে যাবে। সেখানে গেলে আর কেউ বুঝতেই পারবে না, এতকাল চাঁদনী কী ছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নানা কথা বুঝিয়ে যাচ্ছে তাকে।
এসব শুনতে শুনতে চাঁদনী বিরক্ত হয়ে উঠেছে। চাঁদনীর খুব বলতে ইচ্ছে হলো-“নাচতাম না তয় খাইবাম কী? মা আর ভাই লইয়া চলবাম কিবা? আর তুই যে এত বড় বড় কতা কইতাছোস, নিজেই তো বাপ-ভাইয়ের পয়সায় চলছ ! এত হাদিসের জ্ঞান দেস, নিজে কেন মানস না? কেন আইছস এইনো? আমারে জ্ঞান দিবার ?” তবে বলার সাহস হলো না
কিন্তু মাসুদের হাদিসের জ্ঞানের বাণী থামছেই না।
মাসুদ বলল-
মাসুদ ::;;:: হুন, চাদ! তওবা পড়, সাধারণ জীবনে ফিরা আয়। এই নাচানাচি বাদ দে। যত নাচবার ইচ্ছা করে আমার সামনে নাচ, আমার লগে লো তওবা পড়লে তরে বিয়া করার অনুমতি আমাগো ধর্মে দিব। অবশ্য তওবা না পড়লেও আমি তরে বিয়া করুম। তয় তওবা পড়লে তুই পাপমুক্ত হবি।
চাঁদনী বিরক্ত হয়ে বলল:-
চাঁদনী::::: ধুর শালা, বা লে র প্যাঁচাল পারতাছোস! যেমনে কইতাছোস, যেন তুই এক্কেরে দুদে ধুয়া তুলসীপাতা! মুনশি মানু হইয়া আকাম করবার তো আইছস, আবার আমারে তওবা করতে কস? আমি তো এইসব করতে বাধ্য হইছি। তুই কেন আইছিলি আমার মতো মা গী র লগে হুতবার, এহন আবার পাপ ধুইবার লাগছোস, আমি এইন থাইকা সরবার পাইতাম না, তুই এইডা কেন বুঝতাছস না?
মুহূর্তেই মাসুদের মেজাজ বিগড়ে গেলো, বিগড়ে গেলো মুখের ভাব।
লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নেমে এসে চাঁদনীর গলা চেপে ধরল সে।
মাসুদ::;;;;; ঐ! তরে না কইলাম, তুই তাই করতে না! মনে থাহে না আমার কথা?এহন তওবা পড়বি তুই পড় পড় তওবা
চাঁদনীর চোখ যেন উল্টে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে তার মনে হতে লাগল, মাসুদ বুঝি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে।
সে শুনেছে, যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, তাদের সঙ্গে নাকি খারাপ জিন থাকে। এমনিতেই মাসুদের শক্ত হাত তার গলায় চেপে বসে আছে। তার ওপর এই নির্জন জঙ্গলের কুঁড়েঘরে হঠাৎ করেই মনে জেগে উঠল সেই জিনের কথা। ভয়ে চাঁদনীর গোটা শরীর একবার তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।
গোসল সেরে গায়ে জড়ানো মাসুদের দেওয়া নতুন লাল শাড়িটা ভয়ে ভিজে গেল নাপাক পানিতে।
চাঁদনীর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। এবার চোখ যেন উল্টে যাবে যাবে ভাব, ছটফট করাও থেমে এল মাসুদের শক্ত হাতের মুঠোর ভেতর। মাসুদ তার গলা ছেড়ে দিল, কিন্তু তাকে ছাড়ল না।
চাঁদনীর পা বেয়ে তরল গড়িয়ে পড়ল মাটির ঘরের মেঝেতে। অথচ সেদিকে তাকিয়েও মাসুদের ভাবমূর্তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হলো না। তার মাথার ভেতর তখনও রাগ দাউদাউ করে জ্বলছে।
এত ভালো একটা জীবন দিতে চাইছে সে। এত করে বুঝিয়ে বলছে। তবু মেয়েটা কিছুতেই তার কথা বুঝতে চাইছে না!
হিতজ্ঞানশূন্য মাসুদের সেই এক অদৃশ্য অধিকারবোধ এবার উন্মত্ততায় রূপ নিল। জোরপূর্বক নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার উন্মাদনায় সে দুই হাতে টেনে খুলে ফেলল চাঁদনীর গায়ের লাল কাপড় , নিজের লুঙ্গিও। তারপর নিজের উদোম দেহের সঙ্গে চাঁদনীকে শক্ত করে চেপে ধরল।
পরমুহূর্তেই পুরোনো কাঠের চৌকিটি তাদের ভারে কেঁপে উঠল।চাঁদনীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল মাসুদ।
জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হলো চাঁদনীর ঘরের বহু বছরের পুরোনো কাঠের চৌকির কড়কড় শব্দের। মাসুদের কথা না মানার শাস্তি যেন চাঁদনীকে নিজের শরীর দিয়েই বহন করতে হলো।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল।
মাসুদ উঠে দাঁড়াল। চাঁদনী তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মাটি থেকে লুঙ্গিটা তুলে কোমরে জড়িয়ে নিল মাসুদ। চাঁদনীর কান্নার শব্দ তার অসহ্য লাগছে।
বিরক্ত গলায় বলল-
মাসুদ ::::: ভালোই ভালো, আমার কথায় রাজি হইয়া যা, চাঁদনী। আমি মানি একদিন আমি শইলের জালা মিঢানের লাইগা এক মা গী র লগে হুতবার আইছিলাম এইনো, তয় এহন তোরে আমার আজীবনের লাইগা লাগবো, তুই মাইনা যা
হেইডাই আমাগোর লাইগা ভালা, তোর লাইগাও ভালা। আমি তরে ভালা রাহুম।।
কথাটা বলেই মাসুদ কাঁথা দিয়ে চাঁদনীর শরীর ঢেকে দিল। তারপর তার ঠোঁ টে জোর করে চুমু দিয়ে শান্ত গলায় বলল-
মাসুদ:::::: আমার কথা না হুনলে রাজবাড়িত গিয়া নাচনের লাইগা তর মাজা আস্থ আমি রাহুম না মনে রাহিছ।
কথাটা বলে মাসুদ চাঁদনীর বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
চাঁদনী নিঃশব্দে পড়ে রইল সেই পুরোনো চৌকিতে।
বাইরে তখনও জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক থামেনি।