ভরদুপুরের কড়া রোদে চারপাশ যেন তেতে উঠেছে। গরম বাতাসে ধুলোমাখা মাটির রাস্তাটা ঝিমিয়ে আছে। রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত আর গাছপালা। কোথাও কোথাও গাছের পাতাগুলোও রোদের তাপে নেতিয়ে পড়েছে। এমন গরম আবহাওয়ার মধ্যেই মাথায় ছাতা ধরে মাটির রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছেন এলাকার চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকার। তাঁর সঙ্গে চার-পাঁচজন লোকও রয়েছে। ছাতার নিচে মুখখানা আড়াল করে ধীর পায়ে গ্রামের ভেতরের দিকে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁদের আসতে দেখে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন গ্রামবাসী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল।
মিলনদের বাড়ির পেছনে, গোয়ালঘরের উত্তরে বিশাল এক আমবাগান। বাগানের পশ্চিম দিকে রয়েছে বড় মাটির রাস্তা। সেখান থেকে রাস্তার প্রায় পুরোটাই স্পষ্ট দেখা যায়। রাস্তার দুপাশে দু-একটি বড় গাছ থাকলেও তার পরেই বিস্তীর্ণ ধানখেত। ফলে এই রাস্তা দিয়ে কে কোথায় যাচ্ছে, তা আমবাগানে দাঁড়িয়েই বেশ ভালোভাবে চোখে পড়ে।
সেই আমবাগানের একটি বড় আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন বাদল মাস্টার। তাঁর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে পশ্চিমের রাস্তার দিকে। মুখজুড়ে বিরক্তির ছাপ, ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রেগে আছেন তিনি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসা চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকারের দিকেই তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ।
আজ এই আমবাগানেই সালিশের আয়োজন করা হয়েছে। আর সেই উদ্দেশ্যেই চেয়ারম্যানকে ডেকে এনেছেন হাসমত সওদাগর। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মেয়ের জামাই বাদল মাস্টার কিংবা নাতি মিলন-কাউকেই কিছু না জানিয়ে তিনি নিজেই চেয়ারম্যানকে খবর দিয়ে এসেছেন।
বাদল মাস্টারের এই ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ হয়নি। তাঁর বাড়িতে আজ পর্যন্ত কোনো সালিশ বসেনি। এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি, যার জন্য এলাকার লোকজনকে ডেকে বিচার-আচার করতে হয়েছে। বাদল মাস্টার আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ। নিজের বাড়িতে এমনভাবে সালিশ বসানোকে তিনি সহজভাবে নিতে পারছেন না।
কিন্তু সমস্যা হলো, হাসমত সওদাগর তাঁর শ্বশুর। বয়সে বড়, পরিবারের মুরুব্বি মানুষ। চাইলেই তাঁকে সরাসরি কিছু বলা যায় না। তাই রাগটা বুকের ভেতর চেপে রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
অন্যদিকে মিলনও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তার নানার হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্য কী? জসিমের ব্যাপারটা কি তাহলে এতটাই গুরুতর যে চেয়ারম্যান ডেকে সালিশ বসাতে হবে? আর যদি বসাতেই হয়, তাহলে বাদল মাস্টারকে না জানিয়ে এমন কাজ করার অর্থ কী?
মিলনের মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
হাসমত সওদাগর আসলে কী চান, তা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে।
___
আসমানী এখনো চোখ খোলেনি। মুখে কোনো কথা নেই। দুর্বল শরীরটা বিছানার সঙ্গে যেন মিশে আছে। ঘষেটি বেগম আর খালেদা মিলে তার পরনের কাপড় পরিবর্তন করে দিয়েছেন। রেবেকা পানি এনে দিয়েছে, যাতে তার শরীর মুছে দেওয়া যায় এবং মাথায় পানি ঢালা যায়।
কিন্তু এত কিছুর পরও আসমানীর কোনো সাড়া নেই।
চোখ খুলে বসতে না পারলে তাকে কিছু খাওয়ানোও সম্ভব হচ্ছে না। সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কখন মেয়েটা চোখ মেলে তাকাবে, কখন মুখে দুটো কথা বলবে-সেই অপেক্ষাতেই যেন কাটছে সবার সময়।
________
আমবাগানে চেয়ারম্যানের বসার জন্য চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। বাদল মাস্টার ছাড়াও আশপাশের কয়েকজন মুরুব্বি সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। মসজিদের ইমাম সাহেবও এসেছেন। সবাইকে ঘিরে একধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
জসিমকে রশি দিয়ে বেঁধে আনার ইচ্ছা ছিল হাসমত সওদাগরের। কিন্তু বাদল মাস্টার তাতে বাধা দিয়েছেন। তাঁর কাছে জসিমকে তেমন খারাপ মানুষ বলে মনে হয়নি। অন্তত এখন পর্যন্ত ছেলেটার কথাবার্তায় তেমন কিছু বুঝতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে মিলনের এ বিষয়ে তেমন কোনো অনুভূতি নেই। সে শুধু পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করছে।
সবাই যখন যার যার জায়গায় বসেছে, তখন চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকার পান চিবোতে চিবোতে জসিমের দিকে তাকালেন।
শরাফত: তা মিয়া, তোমার নামডা কী?
জসিম: জসিম উদ্দিন।
শরাফত: দেহো, আমি চেয়ারম্যান মানুষ। সময়মতো খুব ভালা, আবার সময়মতো খুব পাজিও। যার লগে যেমন করন লাগে, তেমনই করি আরকি। ভালার লাইগা ভালা, খারাপের লাইগা খারাপ। এহন তোমার লাইগা আমি কিরুম হইবাম, হেইডা তোমার উপরেই নির্ভর করে।
জসিম অসহায় চোখে তাকাল বাদল মাস্টারের দিকে। তার চোখেমুখে করুণ আকুতি। কী মুসিবতেই না পড়েছে সে! একজনের উপকার করতে এসে আজ নিজেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাকে।
এমনিতেই তার দুঃখের শেষ নেই। জীবনে আর কত কষ্ট লেখা আছে কে জানে! সব দুঃখ কি তার একার ভাগ্যেই জুটেছে?
তার বাঁ পায়ে বেশ আঘাত লেগেছে। যন্ত্রণায় পা ফেলতেই কষ্ট হচ্ছে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আর পারল না। ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল সে।
জসিম: চে-চেয়ারম্যান চাচা, আমি কিছু করি নাই। ওই মাইয়া...
হাসমত: তুই কিছু করছস না, তাইলে আমার ভাতিজির এরুম অবস্থা কেন?
শরাফত: ওহ্ মুরুব্বি, আন্নে থামুইন। আমি কতা কইতাছি তো!
হাসমত সওদাগর আর শরাফত আলী সরকার পূর্বপরিচিত। মূলত শরাফত আলীর ফুফার বাড়ি মরিচার চরে। সেই সূত্র ধরেই দুজনের পরিচয়। তা ছাড়া মরিচার চরে সওদাগর বংশের বেশ নামডাক রয়েছে।
এখানে উপস্থিত অন্যদের কাছে বিষয়টা অজানা হলেও বাদল মাস্টার আর মিলন জানে, এই পরিচয়ের পেছনে আরও একটি গভীর কারণ রয়েছে।শরাফত আলী সরকারের সঙ্গে হাসমত সওদাগরের সম্পর্কটা নিছক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একসময় সওদাগরের কাছে তিনি ঋণী হয়ে পড়েছিলেন।
তাই সালিশের শুরুতেই বাদল মাস্টার আর মিলনের মনে সন্দেহ জাগল। হাসমত সওদাগরই যখন চেয়ারম্যানকে ডেকে এনেছেন, তখন সালিশের গতিপথও কি তাঁর ইচ্ছামতোই নির্ধারিত হবে?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা কেউই অনুমান করতে পারছে না।
শরাফত: তুমি মিয়া, মাইয়াডারে কী করছো, হেইডা কও।
জসিম বাদল মাস্টারকে আগে যা যা বলেছিল, এবারও সবার সামনে সেসব কথাই পুনরায় বলল। তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলেন চেয়ারম্যান।
শরাফত আলী সরকার এখানে আসার আগেই জসিমের ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিয়ে এসেছেন। জসিমের বউ যে সত্যিই মারা গেছে, সে খবরও তাঁর জানা। চার দিন আগে মারা গেছে মহিলাটি।
তবু হাসমত সওদাগরের ইচ্ছা একেবারে উপেক্ষা করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এই মানুষটির কাছে তিনি একসময় ঋণী হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঋণের কথা তিনি আজও ভোলেননি।
ঘটনাটা বহু বছর আগের।
একবার ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন শরাফত আলী সরকার। সঙ্গে ছিলেন তাঁর সদ্যবিবাহিত স্ত্রী। ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। তখন তাঁদের নৌকা নদীর মাঝখানে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, নদীর বুকে বইছে রাতের বাতাস।
হঠাৎ ডাকাতদের একটি নৌকা এসে তাঁদের নৌকায় আক্রমণ চালায়।
সেই রাতে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। ডাকাতদের হাতে শরাফত আলী সরকার গুরুতর আহত হন। তাঁর স্ত্রীও ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাঁরা।
সেই সময় ভাগ্যক্রমে নদীতে উপস্থিত ছিল হাসমত সওদাগরের নৌকা।
তখন তিনি বড় নৌকা ভর্তি কাঁচামাল নিয়ে সওদাগরি করতে দূর-দূরান্তে যাতায়াত করতেন। দীর্ঘ ছয় মাস পর সেদিন বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। আর সেই ফেরার পথেই ঘটনাক্রমে শরাফত আলী সরকারের নৌকাটির দেখা পেয়ে যান।
দেরি না করে নিজের সহকর্মীদের নিয়ে ডাকাতদের হাত থেকে শরাফত আলী সরকার ও তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার করেন হাসমত সওদাগর। এরপর নিজেদের নৌকায় করে তাঁদের নদীর এপারে এনে শরাফত আলীর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যান।
সেই রাতের কথা আজও ভোলেননি শরাফত আলী সরকার। বিপদের দিনে হাসমত সওদাগরের সেই সাহায্য তাঁর মনে গভীর কৃতজ্ঞতার জন্ম দিয়েছিল। সেই থেকেই দুজনের সম্পর্ক আরও মধুর হয়ে ওঠে।
শরাফত আলী সরকার শুধু হাসমত সওদাগরকেই নয়, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদেরও স্নেহের চোখে দেখেন। বাদল মাস্টার আর মিলনের প্রতিও তাঁর আলাদা একটা টান রয়েছে।
তবে তিনি চেয়ারম্যান। এলাকার মানুষের প্রতি তাঁর একটা দায়িত্বও রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কারও যেন অযথা ক্ষতি না হয়, সেটাও তাঁকে বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে হাসমত সওদাগরের ইচ্ছাটাকেও একেবারে অযৌক্তিক বলা যায় না। কিন্তু সমস্যাটা হলো, সেই ইচ্ছা পূরণের পদ্ধতিটাই বেশ জটিল।
সব দিক ভেবে শরাফত আলী সরকার মনে মনে হিসাব কষছিলেন। কীভাবে কথাটা শুরু করবেন, কীভাবে পরিস্থিতিটা সামলাবেন-সেসব গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
ঠিক তখনই দূর থেকে একজন মহিলাকে দ্রুত ছুটে আসতে দেখা গেল।
জসিমের মা, চম্পা বানু।
ছেলেকে দেখামাত্রই তিনি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। কোলে তাঁর দেড় মাসের ছোট্ট শিশু। শিশুটিকে বুকে আগলে রেখেই ছেলের দিকে ছুটে এলেন তিনি।
চম্পা বানু: ও আমার বাবারে! আমার পোলাডারে তোমরা কী করছো গো!
ছেলের কাছে পৌঁছেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন চম্পা বানু। তাঁর কান্না আর আহাজারিতে আমবাগানের পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
কান্নার শব্দ শুনে গোয়ালঘরের ভেতর-বাইরে থাকা মহিলারাও একে একে সেখানে জড়ো হতে লাগল।
কেউ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল, কেউ আবার চম্পা বানুকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
আর আমগাছের নিচে বসে থাকা চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকার নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
সালিশের আসল কথাবার্তা এবার কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার বিষয়
চম্পা: ও আমার আল্লাহ গো, ও বাজান বাজান গো,আন্নেরা আমার পুতের মারছুইন কেন গো, আমার পুতে কিছু করে নাই ওয় নিরদুষ।
জসিম: আম্মা, আন্নে থামুইন। আমার কিছু হয় নাই।
কথাটা বলতে বলতেই জসিম তার ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোলে তুলে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। বাবার বুকে মুখ গুঁজে থাকা নিষ্পাপ শিশুটার দিকে তাকিয়ে উপস্থিত অনেকের মনেই অনুশোচনা আর মায়ার আবেগ জেগে উঠল। এমন দৃশ্য দেখলে পাষাণ হৃদয়ও বুঝি গলে যায়।
বাদল মাস্টার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জসিমের দিকে তাকিয়ে চম্পা বানুকে প্রশ্ন করলেন-
বাদল: আন্নের বাড়িত আসমানী মানে, জসিম যে মাইয়াডা লইয়া আইছে, ঐ মাইয়াডা আছিলো কাইল রাইতে?
চম্পা বানু আঁচল দিয়ে চোখ মুছে উত্তর দিলেন-
চম্পা বানু: না ভাইসাব। ঐ মাইয়া বেইন্নাবেলা ফজরের ওয়াক্তে আইছে। আমি তহন ওজু করনের লাইগা বাইর হইছিলাম। তহন দেহি, ঐ ছেড়ি আমার ঘরের এক কোণে বইয়া কাঁপতাছে।
উপস্থিত সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে চম্পা বানুর কথা শুনছিল। জসিম নিজেও এতক্ষণে জানতে পারল, আসমানী কখন তাদের বাড়িতে এসেছে। সে তো এসবের কিছুই জানত না। বউ মরার পর থেকে সে প্রতিদিন রাতে, সকলের অগোচরে বউ এর বাড়ি "বাদামীরচর" যায় ছোট্ট নৌকা বেয়ে, রাতটুকু বউয়ের কবরের কাছে বসে কাটিয়ে ফজরের সময় বাড়ি ফিরে। তিন রাত ধরে সে এমনটাই করছে।
এবার মিলন এগিয়ে এসে চম্পা বানুর দিকে তাকিয়ে বলল-
মিলন: চাচি, আন্নে নিজের পুত বাঁচাইতে মিছা কইয়েন না। আন্নে নিজেও একজন বেডি মানুষ।
চম্পা বানু: আল্লাহর কসম, আমি কুনো মিছা কথা কইতাছি না। আমি ঐ ছেড়িরে পানি দিছি, এইডা-ওইডা জিগাইছি। তয় ঐ মাইয়া হুদা একখান কথাই কইছে-হাটের বড় কাপড়ের দোকানদার মিলনের বাড়িত যাইবার। আর একখান কথাও কয় নাই। জসিম বেইন্নাবেলা যহন বাইত আইলো আমি ওরে কইলামা, ছেড়িডা যেইনো যাইবার চায় একটু দিয়া আইবার, খোদার কসম আমার পুতে আর কিছু জানেনা।
চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকার এতক্ষণ চম্পা বানুর সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তাঁর পাশে বসে থাকা হাসমত সওদাগর কখন থেকে তাঁর কোমরে খোঁচা মেরে যাচ্ছিলেন। শরাফত আলী এবার হাসমতের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে তাঁকে থামতে বললেন। তারপর সামনে ফিরে চম্পা বানুর উদ্দেশে নরম স্বরে বললেন-
শরাফত: বুজান, আন্নের কোলের আবুডা তো দেহি মেলা ছুডো। এতো ছুডো মানু লইয়া ভরদুপুরে এইনে আইছুন কেলা? বাইত থুইয়া আইতাইন।
চেয়ারম্যানের নরম কণ্ঠস্বর আর তাঁর নাতির প্রতি চিন্তিত সুর শুনে চম্পা বানু মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন, তাঁদের চেয়ারম্যান সত্যিই খুব ভালো মানুষ। সবার খোঁজখবর রাখেন, সবার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল করেন।
তিনি আবারও চোখের পানি মুছে অসহায় কণ্ঠে বললেন-
চম্পা বানু: কি করতাম চেয়ারম্যান সাব? বউডা মইরা গেছে আইজ চাইরদিন। পরিবারে আমার ছুডো।নাতিডারে রাইখা আইবাম, হেই মানুষডাও তো নাই আমার বাড়িত।
চেয়ারম্যান এবার মসজিদের ইমামের দিকে তাকালেন।
শরাফত: ইমামসাব, সবডাই তো হুনছুইন। জসিমের মা আর জসিম এক কথাই কইলো। তয় এহনো মাইয়াডা অসুস্থ। কি করবার, আন্নে কইন।
কথার মাঝখানেই বাদল মাস্টার বলে উঠলেন-
বাদল: চেয়ারম্যান চাচা, আমি কইতাছি কি, আসমানী সুস্থ হইলে তার মুখ থাইকা হুনবাম আসলে হইছেডা কি। পরে না হয় একখান সিদ্ধান্ত নেওন যাইবো।
বাদল মাস্টারের কথা শেষ হতে না হতেই হাসমত সওদাগর চেঁচিয়ে উঠলেন-
হাসমত: জামাই, আন্নে থামুইন! আমার এতো সময় নাই এইনে বইয়া থাহার। আর এইসব ব্যাপারে অপেক্ষা করলে গুজব আরো ছড়াইবো, মাইয়াডা আরো কলঙ্কিত হইব। তাই যা হইবার, যা সিদ্ধান্ত নেওনের, আইজই হউক!
শ্বশুরের এমন কথা শুনে বাদল মাস্টার চুপ হয়ে গেলেন। তবে ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছিলেন তিনি। অপমানটা তাঁর গায়ে বেশ ভালোভাবেই লেগেছে।
মিলন একবার বাবার দিকে তাকাল। বাদল মাস্টার চোখ দিয়ে যেন ছেলেকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দিচ্ছেন। মিলন বুঝতে পারল, শ্বশুরের এমন আচরণে তার বাবা ভীষণ অপমানিত হয়েছেন। তবু ভদ্রতার খাতিরে এখনো সেখানে বসে আছেন।ব্যাপারটা মিলনেরও ভালো লাগেনি। এতগুলো মানুষের সামনে তার বাবাকে এভাবে ধমক দেওয়া উচিত হয়নি নানার। তবে এখনই কিছু বলার উপায় নেই।
মিলনের মাথায় তখন অন্য চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। তার বাবা নিশ্চয়ই এই রাগের ঝাঁজ বাড়িতে গিয়ে মায়ের ওপর মেটাবেন! এসব ভাবতে ভাবতে নিজেকেই কেমন অস্থির লাগছিল । অন্যের জীবনের সমস্যা আর জটিলতা তাদের সাজানো সংসারের ওপর এসে পড়ুক, মিলন সেটা কখনোই চায় না।এসব চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ বাড়ির দিকে তাকাল সে। আর তখনই তার চোখ আটকে গেল মহিলাদের ভিড়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা রেবেকার ওপর।
বেগুনি রঙের নতুন কাপড় পরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে জসিমের দিকে।
আসলে রেবেকা জসিমের দিকে নয়, তার কোলে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু মিলন সেটা বুঝতে পারল না। উল্টো অন্য পুরুষের দিকে রেবেকার এমন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা দেখে তার বুকের ভেতর হিংসার আগুন জ্বলে উঠল।
মিলনের ভীষণ ইচ্ছা করছিল রেবেকার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে, তারপর তাকে বলে:-বিবি, নিজের সোয়ামি ছাড়া অন্য বেডাইন গোর দিকে তাকাইয়া দেহা হারাম! আর দেখবা না। আমার সহ্য হয় না! আমি খালি আমারেই দেখবা।
কিন্তু মিলনের ভাবনার মাঝেই মসজিদের ইমাম সাহেব কথা বলে উঠলেন।
ইমাম: বিষয়টা খুবই জটিল, আবার খুবই সহজ। যদি আমরা সহজভাবে দেখি তাইলে। মাইয়াডা বিধবা, পোলাডার বউ নাই, একখান বাচ্চা আছে, অনেক ছুডো। সেই ক্ষেত্রে বিষয়টা বেশি জটিল না কইরা পোলাডা আর মাইয়াডারে একসাথে বাইন্দা দিলে ভালো হয়। এই ক্ষেত্রে ছোট বাচ্চাডা একটা মা পাইবো, পোলাডাও একটা বউ পাইবো, মাইয়াডারও নতুন একটা সংসার হইব। আর এইডা করলে হগলের সওয়াব হইব। এখন চেয়ারম্যান সাব, আন্নে যেটা ভালো মনে করেন। তয় আমি এইডাই ভালো দেখতাছি।
চেয়ারম্যান শরাফত আলী সরকার যেভাবে মসজিদের ইমামকে বুঝিয়ে-শিখিয়ে এনেছিলেন, ইমাম সাহেব মূলত সেই কথাগুলোই সবার সামনে তুলে ধরলেন। বিষয়টা ইমাম সাহেবের কাছেও একেবারে অযৌক্তিক মনে হয়নি। তাই তিনি আপত্তি করলেন না।তবে এই প্রস্তাব যে শুধু চেয়ারম্যানের নিজের চিন্তা থেকে আসেনি, বরং এর পেছনে হাসমত সওদাগরের ইচ্ছাও জড়িয়ে আছে, তা বাদল মাস্টার আর মিলনের বুঝতে বাকি রইল না।
হাসমত সওদাগর নিজে সরাসরি কথাটা বলতে চাইছিলেন না, কিংবা কোনো কারণে পারছিলেন না। তাই চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ইমাম সাহেবকে দিয়ে প্রস্তাবটা সবার সামনে উপস্থাপন করিয়েছেন।
ইমাম সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই হাসমত সওদাগর সবার সামনে সিদ্ধান্তটির প্রতি সম্মতি জানিয়ে দিলেন।
চম্পা বানুও প্রস্তাবটিতে আপত্তি অথবা সম্মতি জানানোর সুযোগ পেল না। কিন্তু জসিম যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে নড়েচড়ে বসে সবার উদ্দেশে বলে উঠল-
জসিম: আন্নেরা কি পাগল হইছুইন হগলে!? আমি কুনো বিয়া-সাদির ভিতরে নাই। এইডা ছাড়া অন্য কুনো কিছু থাহলে কইন!
চেয়ারম্যান শান্ত স্বরে জসিমকে বোঝাতে শুরু করলেন-
শরাফত: দেখ বাপ জসিম, তর আবুডা ছুডু। তর ঘরে একখান বউ দরহার (দরকার), এই আবুডার একটা মা দরহার। ধর মানলাম তর বউ দরহার নাই। তয় তর মায়েরও তো বয়স হইছে। হেয় এই আবুডারে কি মায়ের মতো আগলাইয়া রাখবার পারবো আজীবন? আইজ হউক বা কাইল, বিয়া তুই করবিই। তর নিজেরও তো একজন বউ দরহার হইবো। বেডা মানুষ কি বেডি ছাড়া থাহবার পারে? একটু ভাইবা দেহ, মাইয়াডা ভালা বংশের একটু দুঃখী আছে। আর তাছা, এইডা সালিশে উপস্থিত হগলের সিদ্ধান্ত। তুই না করার মত সাহস কই পাস?
চেয়ারম্যানের কথা শুনে চম্পা বানু তাড়াতাড়ি ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
চম্পা বানু: চেয়ারম্যান সাব, আমার পুতের বউ চার দিন হইছে মরছে। আন্নেরা একটু বুইঝা-শুইনা কথা কইন। এই অবস্থায় এইসব কিছু আমার পুতে কিবা মানবো?
হাসমত সওদাগর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন-
হাসমত: তোমার পুত মানা না মানার কেডা? এইডা সালিশের সিদ্ধান্ত ! আর আমার ভাতিজি কি ফেলনা নাহি?
উপস্থিত লোকজনের অধিকাংশই চেয়ারম্যান আর মসজিদের ইমামের কথায় সায় দিল। একপর্যায়ে সবাই সিদ্ধান্তটি মেনে নিল। জসিম বাকরুদ্ধ মূর্তির মত চুপচাপ বসে রইল, তার মুখে আর কোনো কথা নেই, তার ভাগ্যের ওপর আর কোন আশা ভরসা কিচ্ছু নেই , জীবনের স্রোত এখন যেদিকে তাকে নিয়ে যেতে চায়, সেদিকেই গা ভাসিয়ে দেবে, সবকিছুই উপরওয়ালার হাতের ইশারা, উপরওয়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা কি কারো আছে? না নেই । জসিমের ও নেই। তার ভাগ্যে হয়তো এমনটাই লেখা ছিল তাই তো আজ এখানে এসেছে সে। অন্যদিকে চম্পা বানুও ছেলের পক্ষ নিয়ে আর কিছু বলার সাহস পেলেন না।
চেয়ারম্যান এবার ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-
শরাফত: ইমামসাব, বিয়াডা কোন দিন হইলে ভালো হয়?
ইমাম: জসিমের বউ মরার সাত দিনের দিন রাহুইন। বউয়ের লাইগা ছুডো পরিসরে একটা মিলাদ হইব, সঙ্গে দুইজনের বিয়াও করানো হইব।
চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলেন। এরপর চম্পা বানুকে জানিয়ে দিলেন, মিলাদ ও বিয়ের যাবতীয় ব্যবস্থা তিনি নিজে উপস্থিত থেকে করবেন। শুধু নির্ধারিত সময়ে জসিমকে নিয়ে আসতে হবে। মূলত হাসমত সওদাগরের সঙ্গে পরামর্শ করেই চেয়ারম্যান সবাইকে এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
অবশেষে সালিশ শেষ হলো।
চম্পা বানু ছেলেকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলেন। চেয়ারম্যানও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের গন্তব্যে চলে গেলেন।
______________________________________
{{দুই হাজারের উপরে লাইক হলে পরবর্তী পর্ব লিখব}}
______________________________________
অন্যদিকে হাসমত সওদাগরের আনন্দ আর ধরে না। এতদিন ধরে যে বোঝাটা তাঁর মাথায় চেপে বসেছিল, অবশেষে সেটা নামাতে পেরেছেন তিনি।
তবে সবাই চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর টনক নড়ল। মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে সবার সামনে খুব বাজে ব্যবহার করে ফেলেছেন তিনি। এমনটা করা তাঁর মোটেও উচিত হয়নি।নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য অতিরিক্ত উত্তেজনায় কথাটা বলে ফেলেছেন ঠিকই, কিন্তু এখন তাঁর ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। অন্তত নিজের মেয়ের সংসারে অশান্তি তৈরি করার মতো মানুষ তিনি নন।
তাই আর দেরি না করে বাদল মাস্টারের কাছে গেলেন হাসমত সওদাগর। সেখানে গিয়ে দেখলেন, মিলনও উপস্থিত।
নানাকে দেখামাত্রই মিলন বলে উঠল-
মিলন: এডি সব তোমার সাজাইন্না নাটক আছিল, নানা?
হাসমত সওদাগর তাকালেন মেয়ের জামাইয়ের দিকে। বাদল মাস্টারও তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন, সত্যিটা জানার আশায়। হাসমত কোনো ভণিতা না করেই সরাসরি বললেন-
হাসমত: হ, আমার ইচ্ছাই আছিল সব।
বাদল মাস্টার অবাক হলেন না। সেতো আগে থেকেই এমন কিছু একটা অনুমান করেছিলেন। শুধু শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন-
বাদল: এইডা কেন করছুইন, আব্বা? অকারণে একটা অসহায় পোলাডারে এমনে ফাঁসানোর কোন মানে হয়?
হাসমত: হুনো আমার কথা, জামাই। তোমার লগে তহন অরুম কড়া কথা কওয়া আমার উচিত হয় নাই। হের লাইগা আমি দুঃখিত, বহুত দুঃখিত। তয় আমি যা করছি, ভাইবাই করছি।
মিলন: অসহায় কাউরে এমনে ফাঁসাইয়া ভালো কিবা করছো তুমি নানা ?
হাসমত: আরে, চেতছস কেডা? আগে আমার কথা হুন। মনে আছে, ঈদে আমগর বাড়িত যাইয়া তর লগে কি হইছিল?
মিলন চমকে বাবার দিকে তাকাল। তারপর দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে নানার দিকে তাকিয়ে ইশারায় তাঁকে বাবার সামনে এসব কথা বলতে নিষেধ করল।
হাসমত সওদাগর নাতির ইশারা বুঝতে পারলেন। তাই কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন-
হাসমত: তুই তহন যে কইয়া আইলি, আসমানীর লাইগা বিয়ার পাত্র দেখবার, সেই কথা মনে আছে? আমি বহুত পাত্র দেখছি। কিন্তু বিধবা বইলা কেউ রাজি হয় নাই। আইজ যহন হুনলাম, জসিমের বউ নাই, একটা বাচ্চা আছে, তহন আসমানীর লাইগা জসিমরেই আমার পছন্দ হইছে। কিন্তু প্রস্তাব দিলে কি রাজি হইতো? হইতো না! বেডারা বউ মরলেও বিয়ার লাইগা ভালো মাইয়া পায়, কিন্তু মাইয়ারা কি আর তেমন সংসার পায়?
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন-
হাসমত: তাই একটু স্বার্থপর হইলাম। কাঁচা মালের দোকান দেয় জসিম। দরহার হইলে মৌসুমি আনাইস (তরকারি আনাইস), সব মরিচার চরের থেইকা মাগনা দিমু জসিমের দুহানের লাইগা। পয়সা দিয়াও সাহায্য করমু। তাতে জসিমের আর্থিক অবস্থা ভালো হইব, আর আমগর মাইয়াডাও একটা সংসার পাইব।
কথাগুলো বলে হাসমত সওদাগর পুনরায় থামলেন। তারপর বাদল মাস্টারের দিকে তাকিয়ে
নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বললেন-
হাসমত: হইবার পারে, আমার পদ্ধতিটা খারাপ। তয় চিন্তাডা খারাপ না, একটু ভাইবা দেহো।
বাদল মাস্টার আর মিলন দুজনেই মাথা নিচু করে রইল। হাসমত সওদাগরের প্রতিটি কথা তারা বুঝতে পারছিল। বৃদ্ধ লোকটা একেবারে মিথ্যা কিছু বলছেন না। সত্যিই তাঁর উদ্দেশ্য খারাপ নয়। তবে নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে যে পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন, সেটা যে ঠিক হয়নি, তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই।
এই সমাজে একজন পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সে আবার বিয়ে করার সুযোগ পায়। কখনো কখনো অল্পবয়সী মেয়েকেও বিয়ে করে সংসার পাততে পারে। অথচ একজন নারীর স্বামী মারা গেলে তার জন্য নতুন করে সংসার গড়ার পথটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাকে নানা রকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অবহেলা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হয়।
হাসমত সওদাগর অনেক চেষ্টা করেছেন আসমানীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বিধবা হওয়ার কারণে কেউই তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। এমনকি তিন সন্তানের বাবা কিংবা বৃদ্ধ লোকেরাও তাকে বিয়ে করতে আগ্রহ দেখায়নি।
সেই জায়গা থেকেই আসমানীর অভিভাবক হিসেবে হাসমত সওদাগর এবার ছলনার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য, মেয়েটাকে একটা সুন্দর সংসার দেওয়া।
বাদল মাস্টার মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। তবে মনে মনে শ্বশুরের চিন্তাভাবনাকে বাহবা না দিয়ে পারলেন না। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলেন, জসিম অসহায়, তার ছোট্ট বাচ্চাটাও অসহায়। আসমানীও অসহায়। সর্বোপরি, তিনজন মানুষই জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ালে আল্লাহ খুশি হন-এই বিশ্বাস থেকেই বাদল মাস্টারের মনে হলো, আসমানীর সঙ্গে জসিমের বিয়ে হলে হয়তো দুটো অসহায় জীবন নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।
জসিম চাইলে কিছুদিন পর অবিবাহিত কোনো মেয়েকেও বিয়ে করতে পারত। কিন্তু সেই মেয়েটি তার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে আসমানী নিজেও জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। তাই হয়তো সে জসিমের ছোট্ট বাচ্চাটার কষ্টটা অন্যদের তুলনায় বেশি উপলব্ধি করতে পারবে।
মানুষ যখন নিজের জীবনে কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়, তখন অনেক সময় অন্যের কষ্টও গভীরভাবে বুঝতে শেখে। আসমানী যদি শিশুটাকে নিজের বুকের ভেতর আগলে রেখে মানুষ করতে পারে, তাহলে হয়তো এই বিয়ে তিনটি অসহায় জীবনের জন্যই নতুন আশার দরজা খুলে দেবে।
এবং অসহায় মানুষদের সাহায্যের জন্য মাঝে মাঝে একটু ছলনা করা খারাপ না।
সবকিছু ভেবে বাদল মাস্টার মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, বিয়ের আয়োজন ঘরোয়াভাবে সে নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করবেন। আসমানীকে তিনি নিজের দায়িত্বে বিয়ে দেবেন। তাঁর বিশ্বাস, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক সওয়াব অর্জন করা যাবে।
____________
দুপুরে খুব অল্প পরিসরে রান্নাবান্না হলো। বাড়িশুদ্ধ সারাটা দিন ধরে যা যা ঘটে গেছে, তার ধকল সামলে খালেদা খাতুনের পক্ষে বেশি কিছু রান্না করা সম্ভব হয়নি।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হাসমত সওদাগর প্রতিবারের মতোই মিলনের কাছে বিড়ির জন্য আবদার জানালেন।
মিলন গোমড়া মুখে কদমগাছের নিচে গিয়ে বসলো। তার পাশেই হাসমত সওদাগর বিড়ি টানতে লাগলেন।
বিড়িতে কয়েকটা টান দেওয়ার পর নাতির গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-
হাসমত: কিরে বেডা, কিতা হইছে? এহন কি আমার উপরে ক্ষেইপা আছস?
মিলন মূলত রেবেকার ওপরেই রেগে আছে। মেয়েটা আসমানীর কাছে বসে আছে, খাওয়ার পর একবারের জন্যও ঘরে আসেনি। তার ওপর সালিশের সময় যেভাবে ড্যাবড্যাব করে জসিমের দিকে তাকিয়ে ছিল, সেটা মনে পড়তেই মিলনের বুকের ভেতর হিংসায় টইটম্বুর হয়ে উঠছে।
মিলন: কিছু না। ক্ষেপি নাই।
হাসমত: আরে, হুন বেডা। ঐ মাইয়া বাড়ির তনে পলাইয়া তর ঘাড়ে উডবার চাইছিল। আমি তরে বাঁচাইয়া দিছি, বুঝছস? সংসার জীবন যত সহজ, ততই জটিল। বেডি মানুষ হইল মোমের মতো। যদি একবার এই কথা তর বিবি জানতো, তর ঘরে আগুন লাগতো। আমি তর ঘরে জ্বলনের তনে বাঁচায়া দিছি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে রেবেকার কণ্ঠ ভেসে এল-
রেবেকা: কার ঘরে আগুন ধরছে, নানা?
কথাটা শুনেই মিলন আর হাসমত সওদাগর দুজনেই চমকে উঠলেন।
রেবেকা কখন যে এসে তাঁদের পেছনে দাঁড়িয়েছে, কেউ টেরই পাননি।মিলনের পেটের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে শুকনো ঢোক গিলে বিবির দিকে তাকাল।রেবেকা তখনো কপাল কুঁচকে তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে।
হাসমত সওদাগর নাতিকে জ্বালানোর সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। ইচ্ছা করেই মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বললেন-
হাসমত: কার ঘরে আবার? তুংগোর ঘরে, নাতবউ! তোমার সোয়ামী তো একখান বিশ্বপ্রেমিক। তার পিছনে তো বেইডাইন মাইনষের মেলা বড় লাইন আছে, জানো না?
নানার কথা শুনে মিলন দ্বিতীয়বারের মতো চমকে উঠল। এক লাফে কদমগাছের গোড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল-
মিলন: এই, এই বুইড়া! এইডা কি কথা কও তুমি? আল্লাহর দোহাই লাগে উল্ডা-পাল্ডা কথা কইয়ো না! বিবি, এই বুড়া হুদাই এইতা কইতাছে। এডি সব মিছা কথা!
রেবেকা মিলনের কথায় তেমন পাত্তা দিল না। সে বরং নানা শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে আবারও প্রশ্ন করল-
রেবেকা: বি... বিশ্বপ্রেমিক মানে কি?
মিলন: ঐইতা (ঐসব) কিছু না!
হাসমত: অনেক কিছু, বুঝছো? হুনো.....
মিলন: এই নানা, এই বুইড়া হালা চুপ করো! আল্লাহর দোহাই লাগে।
কথাটা বলেই মিলন রেবেকার হাত ধরে টেনে বাড়ির দিকে নিয়ে চলল। কিন্তু রেবেকা পেছনে ফিরে নানা শ্বশুরকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
রেবেকা: নানা, আন্নে কইন! আমি হুনবাম!
হাসমত সওদাগর হাসতে হাসতে চেঁচিয়ে বললেন-
হাসমত: যা গোর পিরিতের মাইনষের অভাব নাই, হেরাই বিশ্বপ্রেমিক! বুঝছো, নাতবউ? তোমার সোয়ামির পিছনে বেডিরা লাইন ধরছে। সময় থাকতে সোয়ামি সামলাও!
এবার রেবেকা বুঝতে পারল, নানা শ্বশুর কী বোঝাতে চাইছেন।এতটা অবুঝ বালিকা সে আর নেই যে এসব কথার অর্থ বুঝবে না। অন্ততপক্ষে এখন আর নয়।
মুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে গেল।মিলন তাকে টেনে ঘরে নিয়ে দরজাটা দ্রুত চাপিয়ে দিল।ঘরে ঢুকেই রেবেকা নাকের পাটা ফুলিয়ে মিলনের দিকে তাকাল।
রেবেকা: বেডিরা আন্নের কাছে কি পাইছে, হুনি মধু?
মিলন: ছিঃ ছিঃ মধু নাই ,কুনো কিছু নাই।
রেবেকা: তাইলে কি আছে হুনি?
মিলন: আরে, এরুম কিছু না। বুইড়া বানাইয়া কইছে !
রেবেকা: আমি কেন মানবাম? আগেও তো গুলনাহারের কথা লুকাইয়া রাখছুইন! আল্লাহই জানে, আর কতো গুলনাহার আছে আন্নের! আমি একলা মাইয়া কয়ডার মাথা ফাডাইবাম, আন্নের লাইগা?
কথাটা বলতে বলতে রেবেকা বিছানায় বসে পড়ল। তার চোখে পানি টলমল করছে।
মিলন এবার অস্থির হয়ে তার সামনে দাঁড়াল। বিবির চোখে পানি দেখে তার বুকের ভেতরটাও কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
মিলন: খুদার কসম, বিবি! আমার কুনো গুলনাহার নাই। আমার একটাই তুমি, রেবেকা। আমার বিবি আমার চান্দের টুকরা বিবি!