নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১
নায়ক: আদিব | নায়িকা: রাফা
সকাল ৭টা।
চারদিকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ। জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো এসে পড়েছে বিছানার এক কোণে। অথচ রাফার ঘুম ভাঙার কোনো নামই নেই। মেয়েটার ঘুমের সঙ্গে যেন কারও শত্রুতা নেই!
হঠাৎ দরজায় কয়েকবার শব্দ হলো।
— রাফা! এই রাফা! আর কত ঘুমাবি? ঘড়িতে কয়টা বাজে দেখেছিস?
রাফা বিরক্ত হয়ে বালিশের নিচে মুখ লুকিয়ে বলল,
— আম্মু, আর পাঁচ মিনিট! প্লিজ!
— তোর পাঁচ মিনিট যে এক ঘণ্টায় শেষ হয়, সেটা আমার জানা আছে। তাড়াতাড়ি নিচে আয়।
মায়ের কথায় বাধ্য হয়ে বিছানা ছাড়ল রাফা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে নিজেকেই বলল,
— উফ! সকাল সকাল এত চিৎকার করার কী আছে!
কিছুক্ষণ পর সাদা-কালো রঙের একটি পোশাক পরে নিচে নেমে এল সে।
খাবার টেবিলে বসে আছে তার বাবা-মা। বাবার পাশে অপরিচিত একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। রাফা সালাম দিয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়ল।
তার বাবা মুচকি হেসে বললেন,
— রাফা, এদিকে আয়। উনি আমার অনেক দিনের বন্ধু।
রাফা ভদ্রলোককে সালাম দিল।
ভদ্রলোক বেশ স্নেহের সঙ্গে বললেন,
— মাশাআল্লাহ! মেয়েটা তো বেশ বড় হয়ে গেছে। শেষ কবে দেখেছিলাম, তখন তো একদম ছোট ছিল।
রাফা মিষ্টি করে হাসল।
কথার মাঝেই ভদ্রলোক বললেন,
— আমার ছেলেও এসেছে। একটু পরেই নিচে নামবে।
রাফা মনে মনে ভাবল, আবার নতুন অতিথি! আজকে কি শান্তিতে নাশতাটাও করা যাবে না?
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
একজন যুবক ধীর পায়ে নিচে নেমে এল। পরনে কালো শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, চুলগুলো সুন্দর করে সাজানো। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস।
ছেলেটি নিচে এসে বাবার পাশে দাঁড়াল।
— আসসালামু আলাইকুম।
সবাই উত্তর দিল।
রাফা একবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আবার নিজের খাবারের দিকে মন দিল।
ছেলেটির বাবা বললেন,
— এই হলো আমার ছেলে, আদিব।
আদিব সবার সঙ্গে পরিচিত হলো। এবার তার চোখ পড়ল রাফার দিকে।
— আর উনি কে?
রাফার বাবা হেসে বললেন,
— আমার মেয়ে, রাফা।
আদিব মাথা নেড়ে বলল,
— ওহ! আপনিই তাহলে রাফা?
রাফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন? আমার নাম শুনে রেখেছেন নাকি?
আদিব মুচকি হেসে বলল,
— না, তবে এখন থেকে মনে থাকবে।
রাফা মনে মনে বলল, 'কী অদ্ভুত মানুষ!'
হঠাৎ আদিব বলে উঠল,
— আপনি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?
রাফা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— আপনাকে দেখে কথা বলার ইচ্ছেটা চলে গেছে।
টেবিলের সবাই হেসে উঠল।
আদিব মুচকি হেসে বলল,
— বেশ! কথা বলতে তো জানেন।
রাফা আর কোনো উত্তর দিল না।
নাশতা শেষ করে রাফা ছাদে চলে গেল। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল সে। হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছিল। চারপাশের পরিবেশটা বেশ শান্ত। রাফা এই সময়টুকু খুব পছন্দ করে। এখানে দাঁড়ালে তার মনে হয়, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে চলে এসেছে।
কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
— এখানে একা কী করছেন?
রাফা পেছনে তাকিয়ে দেখল আদিব দাঁড়িয়ে আছে।
— আপনি এখানে কেন?
— ছাদটা কি আপনার নামে লিখে দেওয়া হয়েছে?
— না। তবে আপনার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়নি।
আদিব হেসে ফেলল।
— আপনার সঙ্গে কথা বলা সত্যিই কঠিন।
রাফা চোখ সরিয়ে বলল,
— তাহলে কথা বলবেন না। খুব সহজ সমাধান।
আদিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— একটা কথা বলি?
— না বললেও শুনতে হবে বুঝি?
— আপনি সব কথার উত্তর এভাবে দেন কেন?
রাফা এবার একটু হেসে বলল,
— কারণ সব প্রশ্নের উত্তর সুন্দর করে দিতে হয় না।
আদিব আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর ফোন বেজে উঠতেই সে নিচে চলে গেল।
রাফা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
'অদ্ভুত একটা মানুষ! নিজেকে কী মনে করে কে জানে!'
অন্যদিকে নিচে এসে আদিব দেখল তার বাবা বসার ঘরে বসে কথা বলছেন।
বাবা আদিবকে দেখে বললেন,
— কী রে, কোথায় ছিলি?
— ছাদে গিয়েছিলাম।
— রাফার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
আদিব একটু হেসে বলল,
— হ্যাঁ, হয়েছে। মেয়েটা বেশ মজার।
বাবা হেসে বললেন,
— ছোটবেলা থেকেই এমন। তবে মনটা খুব ভালো।
এদিকে রাফা নিচে নেমে নিজের ঘরে চলে গেল। বিছানায় বসে ফোন হাতে নিতেই বান্ধবী মেহেরের ফোন এল।
— হ্যালো! কী করিস?
— কিছু না। তুই বল।
— তোর গলার আওয়াজ এমন কেন? মন খারাপ?
— ধুর! আমাদের বাসায় একজন নতুন অতিথি এসেছে। মাথা গরম করে দিয়েছে।
— কে সে?
— নাম আদিব। নিজেকে কী ভাবে কে জানে!
মেহের হেসে বলল,
— ওহ! নাম তো সুন্দর!
— তুই আবার শুরু করিস না!
দুজনের কথার মাঝেই নিচ থেকে রাফার মা ডাকলেন,
— রাফা! নিচে আয় মা। অতিথিরা চলে যাবেন।
রাফা ফোন রেখে নিচে নামল।
বিদায়ের সময় আদিব সবার সঙ্গে কথা বললেও রাফার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
— আবার দেখা হবে, মিস রাফা।
রাফা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— দেখা না হলেই ভালো।
আদিব হেসে গাড়িতে উঠে পড়ল।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই আদিব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি।
অন্যদিকে রাফা নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়িটা দূরে চলে যেতে দেখল। তারপর নিজেই অবাক হয়ে ভাবল, 'আমি আবার ওর গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছি কেন?'
সেদিনের পরিচয়টা হয়তো খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু দুজনের কেউই জানত না, এই ছোট্ট পরিচয় একদিন তাদের জীবনের অনেক হিসাব বদলে দেব ❤️
চলবে