নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২
সকাল ১০টা।
রাফা নিজের ঘরে বসে ফোনে ব্যস্ত। গতকালের সেই অদ্ভুত ছেলেটার কথা বারবার মনে পড়ছে। আদিব নামের মানুষটাকে তার একদমই ভালো লাগেনি। কিন্তু কেন জানি লোকটার বলা কথাগুলো মাথা থেকে বের হচ্ছে না।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজটি এসেছে।
'কেমন আছেন, মিস রাফা?'
রাফা মেসেজটি দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর উত্তর দিল,
— কে আপনি?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? গতকাল যার সঙ্গে ছাদে ঝগড়া করেছিলেন।
রাফা বুঝতে বাকি রইল না। এটা আদিব!
রাফা বিরক্ত হয়ে লিখল,
— আপনার নম্বর পেলেন কোথায়?
— সেটা না হয় রহস্যই থাক।
— আমার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই।
— প্রয়োজন আছে কি নেই, সেটা পরে বুঝবেন।
রাফা আর কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা বিছানার ওপর রেখে দিল।
কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে তার মা ডাকলেন,
— রাফা! তাড়াতাড়ি নিচে আয়। তোর জন্য একজন এসেছে।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— আমার জন্য আবার কে আসবে?
সে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। বসার ঘরে গিয়ে দেখল, একটি সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির পরনে গোলাপি রঙের পোশাক।
রাফাকে দেখেই মেয়েটি হাসিমুখে বলল,
— হ্যালো! আমি মেহরিন।
রাফা মুচকি হেসে বলল,
— আমি রাফা। আপনি?
— তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছি। আদিব ভাইয়ের মুখে তোমার কথা শুনেছি।
আদিবের নাম শুনেই রাফা একটু থমকে গেল।
— আদিবের মুখে আমার কথা?
মেহরিন হাসতে হাসতে বলল,
— হ্যাঁ! কাল নাকি তোমাদের বেশ ঝগড়া হয়েছে!
রাফা বিরক্ত হয়ে বলল,
— উনি কথা কম বললে তো ঝগড়াও হতো না।
মেহরিন হেসে উঠল।
— বুঝেছি! তোমার সঙ্গে আদিব ভাইয়ের ভালোই ঝামেলা হবে।
এদিকে আদিব নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ তার ছোট বোন এসে বলল,
— ভাইয়া, মেহরিন আপু ফোন করেছিল।
আদিব কাজ থামিয়ে বলল,
— কী বলেছে?
— বলেছে, সে রাফাদের বাসায় আছে।
আদিব একটু অবাক হলো।
— রাফাদের বাসায়?
— হ্যাঁ। তোমাকে নাকি খুব খুঁজছে!
আদিব মুচকি হেসে বলল,
— আচ্ছা, ঠিক আছে।
কিন্তু তার মনে অন্য একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। মেয়েটা কি সত্যিই তাকে নিয়ে এতটা বিরক্ত, নাকি শুধু বিরক্তির আড়ালে অন্য কিছু লুকিয়ে রাখছে?
বিকেল ৪টা।
রাফা বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ তার মা এসে বললেন,
— মা, আজ সন্ধ্যায় আমরা একটু বাইরে যাব। তুইও তৈরি হয়ে নিস।
— কোথায় যাব আম্মু?
— আদিবদের বাসায়। ওদের পরিবার আমাদের দাওয়াত দিয়েছে।
রাফার মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল।
— আম্মু! আমি যাব না।
— কেন?
— আমার পড়া আছে।
মা হেসে বললেন,
— তোর পড়া তো প্রতিদিনই থাকে। আজ কোনো অজুহাত শুনব না।
রাফা মনে মনে বলল, 'আল্লাহ! আবার সেই বিরক্তিকর মানুষটার সঙ্গে দেখা করতে হবে!'
সন্ধ্যা ৭টা।
খান বাড়ির বসার ঘর আলোয় ঝলমল করছে। অতিথিদের আপ্যায়নের কোনো কমতি নেই। রাফা মায়ের পাশে বসে আছে। তার মুখে একটুও হাসি নেই।
ঠিক তখনই আদিব ঘরে প্রবেশ করল।
পরনে কালো পাঞ্জাবি। হাতে ফোন। ঘরে ঢুকেই তার চোখ পড়ল রাফার দিকে।
আদিব এগিয়ে এসে বলল,
— আরে! মিস রাফা! আপনিও এসেছেন?
রাফা চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,
— না, আমার ছায়া এসেছে।
আদিব হেসে বলল,
— আপনার কথার ঝাঁজ কিন্তু দিন দিন বাড়ছে।
— আপনার বিরক্ত করার অভ্যাসটাও কমছে না।
আদিব কিছু বলার আগেই মেহরিন এসে পাশে দাঁড়াল।
— আদিব ভাই! আপনি এখানে? আমি তো আপনাকেই খুঁজছিলাম।
আদিব স্বাভাবিকভাবে বলল,
— কী হয়েছে?
মেহরিন তার হাতের কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগল। রাফা বিষয়টা দেখে অকারণেই বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল।
আদিব সেটা লক্ষ করল।
সে ইচ্ছা করেই মেহরিনের সঙ্গে গল্প করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর আদিব রাফার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী ব্যাপার? এত চুপচাপ কেন? আজ ঝগড়া করবেন না?
রাফা ঠান্ডা গলায় বলল,
— আপনার সঙ্গে ঝগড়া করার মতো সময় আমার নেই।
আদিব একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— তাহলে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছেন কেন?
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— কী! আমি আপনার দিকে তাকিয়েছি?
— জি, কয়েকবার।
— স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন। আপনার এত গুরুত্ব নেই আমার কাছে।
আদিব মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল।
রাত ৯টা।
সবাই খাবার টেবিলে বসেছে। রাফা এক পাশে বসে খাবার খাচ্ছিল। আদিব তার বিপরীত পাশে বসে আছে।
হঠাৎ আদিব বলল,
— রাফা, আপনার ফোনে কি আমার মেসেজের উত্তর দেওয়া শেষ হয়েছে?
রাফা চমকে তাকাল।
— আপনি এখানে এসব বলছেন কেন?
আদিব হেসে বলল,
— কী হয়েছে? ভয় পেলেন নাকি?
রাফা নিচু গলায় বলল,
— আপনি সত্যিই অসহ্য!
আদিব আর কিছু বলল না। তবে তার ঠোঁটের কোণে হাসি লেগেই রইল।
খাওয়া শেষে রাফা বাইরে বাগানে চলে গেল। চারদিকে রাতের নীরবতা। ফুলের মিষ্টি গন্ধে পরিবেশটা বেশ সুন্দর লাগছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে আদিবের কণ্ঠ শোনা গেল।
— এত রাগ করেন কেন?
রাফা পেছনে ফিরে বলল,
— আপনি কি আমাকে একা থাকতে দিতে পারেন না?
আদিব এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কী?
— আপনি কি সবাইকে এভাবেই এড়িয়ে চলেন, নাকি শুধু আমাকে?
রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— যাদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না, তাদের এড়িয়ে চলি।
আদিব মাথা নিচু করে হালকা হাসল।
— বুঝলাম।
ঠিক তখনই আদিবের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটি নাম ভেসে উঠল— তানিয়া।
ফোনটি দেখে আদিবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে দ্রুত ফোনটি কেটে দিল।
রাফা বিষয়টি লক্ষ করলেও কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিন্তু মনে মনে ভাবল, 'তানিয়া আবার কে?'
আদিব ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
— চলুন, ভেতরে যাই।
রাফা কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে রাফা বিছানায় শুয়ে ছিল। হঠাৎ তার ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর।
'রাফা, একটা কথা বলার ছিল। আদিবকে যতটা সহজ মনে করছেন, সে আসলে ততটা সহজ নয়। তার অতীত সম্পর্কে কিছুই জানেন না আপনি।'
রাফা মেসেজটি পড়ে অবাক হয়ে গেল।
কে পাঠাল মেসেজটা?
আর আদিবের অতীতে এমন কী আছে, যা সবাই তার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে?
রাফা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার অজান্তেই শুরু হয়ে গেছে এক নতুন রহস্যের গল্প।
চলবে...