ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবরুদ্ধ অভিমান

পর্ব 9

লেখক: নুসরাত জাহানের রাফা

নিষিদ্ধ অনুভূতি

লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা

পর্ব সংখ্যা: ৯

মাহিরার ফোন

সকাল তখন সবে হয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ ঘরে ঢুকছে। রাফা বিছানায় বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত রাতের অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা বারবার মনে পড়ছে।

“মাহিরা যা জানে, তা প্রকাশ পেলে অনেক কিছু বদলে যাবে।”

কথাটা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না সে।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে আদবির নাম দেখে রাফা দ্রুত কলটি রিসিভ করল।

— হ্যালো, আদবি সাহেব?

ওপাশ থেকে আদবির গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।

— আপনি কি ঘুম থেকে উঠেছেন?

— জি, অনেক আগেই। কী হয়েছে?

— মাহিরা ফোন করেছে।

রাফা সোজা হয়ে বসল।

— কী বলেছে?

— আজ বিকেলে দেখা করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু একটা শর্ত দিয়েছে।

— কী শর্ত?

আদবি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

— সে চায়, আমি একা যাই।

রাফার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— একা? কিন্তু কেন?

— সেটাই বুঝতে পারছি না। সে বলেছে, আপনার সামনে কিছু কথা বলতে পারবে না।

রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

— আমার মনে হয়, আপনি একা যাবেন না। অন্তত আপনার চাচাকে সঙ্গে রাখবেন।

— আমি জানতাম আপনি এমনটাই বলবেন।

— তাহলে?

— আমি আপনার কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেব।

রাফা আর কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল, এই রহস্যের শেষ কোথায়?

নাশতার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। সোহেল সাহেব পত্রিকা পড়ছিলেন। রাশেদ সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আদবির দিকে তাকালেন।

— মাহিরার সঙ্গে কথা হয়েছে?

আদবি মাথা নাড়ল।

— হয়েছে। আজ বিকেলে দেখা করতে বলেছে।

সোহেল সাহেব পত্রিকা নামিয়ে রাখলেন।

— কোথায় দেখা করবে?

— পুরোনো শহরের একটা লাইব্রেরির পাশে।

রাশেদ সাহেবের মুখটা হঠাৎ চিন্তিত হয়ে উঠল।

— ওই জায়গায়?

আদবি অবাক হয়ে তাকাল।

— চাচা, আপনি জায়গাটা চেনেন?

রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

— অনেক বছর আগে ওই জায়গাতেই মাহিরার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল।

সবাই অবাক হয়ে গেল।

আদবি দ্রুত প্রশ্ন করল,

— আপনি আগে বলেননি কেন?

— কারণ তখনকার অনেক কথা আমি ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝছি, সত্যিটা আর লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না।

সোহেল সাহেব ধীরে বললেন,

— রাশেদ, তোমার কি মনে হয় মাহিরা সব জানে?

— শুধু জানে না, সোহেল। আমার ধারণা, সেই রাতের ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সে।

আদবির চোখে এবার দৃঢ়তা ফুটে উঠল।

— তাহলে আজ সব জানতে হবে।

অন্যদিকে রাফাদের বাড়িতে শারমিন বেগম মেয়েকে ডাকলেন।

— রাফা, নাশতা করেছিস?

— জি আম্মু, করছি।

নুসাইবা পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,

— আপু, সকাল থেকেই ফোন হাতে নিয়ে বসে আছো কেন?

রাফা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

— তোর এত প্রশ্ন কেন?

— কিছু না। মনে হচ্ছে কারও ফোনের অপেক্ষা করছো!

— নুসাইবা!

নুসাইবা হেসে দৌড়ে অন্য ঘরে চলে গেল।

রাফা ফোনটা হাতে নিয়ে আদবিকে একটা মেসেজ লিখল—

“সাবধানে থাকবেন। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে ভাববেন।”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

“আপনার কথাটা মনে থাকবে। আর আপনি চিন্তা করবেন না।”

রাফার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।

বিকেল চারটা।

পুরোনো শহরের লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদবি ও রাশেদ সাহেব। মাহিরা বলেছিল আদবিকে একা আসতে, কিন্তু রাশেদ সাহেব দূরে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কিছুক্ষণ পর কালো ওড়না পরা এক নারী ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন।

— আদবি?

— জি, আপনি কি মাহিরা?

নারীটি মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। তোমাকে শেষবার দেখেছিলাম অনেক ছোট থাকতে।

আদবি অবাক হয়ে বলল,

— আপনি আমাকে চিনতেন?

— শুধু তোমাকে নয়, তোমার পরিবারকেও চিনতাম।

মাহিরা চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

— এখানে বেশি সময় থাকা যাবে না। কেউ আমাদের দেখছে।

আদবি চমকে উঠল।

— কে দেখছে?

— যে মানুষটা এত বছর ধরে সত্যিটা চাপা দিয়ে রেখেছে।

— সে কে?

মাহিরা উত্তর না দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিটা আদবির হাতে দিয়ে বললেন,

— এই ছবির পেছনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তাকে চিনতে পারছ?

আদবি ছবির দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

ছবিতে তার বাবা সোহেল সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রাশেদ সাহেব। আর তাদের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারীকে দেখে আদবির বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

— এই নারী কে?

মাহিরা ধীরে বললেন,

— তার নাম শারমিন।

আদবি বিস্ময়ে তাকাল।

— শারমিন? কিন্তু তিনি তো রাফার মা!

মাহিরা চোখ নামিয়ে বললেন,

— হ্যাঁ। আর এই কারণেই এত বছর ধরে তোমাদের দুই পরিবারকে আলাদা রাখা হয়েছিল।

আদবি কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই মাহিরার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে অচেনা নম্বর।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কঠিন কণ্ঠ ভেসে এল—

— মাহিরা, তোমাকে আগেই সাবধান করেছিলাম। পুরোনো কথা নিয়ে আর এগোবে না।

মাহিরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— আপনি আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ পাবেন না। এবার সত্যিটা প্রকাশ হবেই।

ওপাশের মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— তাহলে তোমাকে একটা কথা মনে করিয়ে দিই। সত্যিটা প্রকাশ হলে শুধু আদবির পরিবার নয়, রাফার পরিবারও বিপদে পড়বে।

কল কেটে গেল।

আদবি অস্থির হয়ে উঠল।

— আপনি কী বলতে চাইছেন? রাফার পরিবারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

মাহিরা উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাশেদ সাহেব দ্রুত তাদের কাছে এগিয়ে এলেন।

— আদবি, আমাদের এখনই এখান থেকে যেতে হবে!

— কিন্তু চাচা, মাহিরা একটা কথা বলছিলেন—

রাশেদ সাহেব মাহিরার দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন।

— আপনি! এত বছর পর আবার সামনে এলেন?

মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— আর লুকিয়ে থাকার সময় নেই, রাশেদ সাহেব। এবার আপনাকেও সব স্বীকার করতে হবে।

আদবি দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, তার অজানা অতীতের সঙ্গে এই দুই মানুষের সম্পর্ক অনেক গভীর।

সন্ধ্যায় রাফা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আদবির কোনো খবর নেই। কয়েকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ ফোনে একটি মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর থেকে লেখা—

“আপনি যাকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ ভাবছেন, তার কাছেই আপনার পরিবারের সবচেয়ে বড় গোপন রহস্য লুকানো আছে।”

রাফার হাত থমকে গেল।

ঠিক তখনই আদবির ফোন এল।

— রাফা, আপনি কোথায়?

— বাসায়। কী হয়েছে? আপনার ফোন বন্ধ ছিল কেন?

— অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর চাই।

— কী প্রশ্ন?

আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আপনার মা কি কখনো আপনাকে আমাদের পরিবারের পুরোনো কোনো ঘটনার কথা বলেছেন?

রাফা অবাক হয়ে গেল।

— না তো। কেন?

আদবি ধীর কণ্ঠে বলল,

— কারণ আজ মাহিরা এমন একটা ছবি দেখিয়েছে, যেখানে আপনার মাকে আমাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে।

রাফার মুখের রং বদলে গেল।

— কী বলছেন আপনি?

— আমি জানি না এর পেছনে কী সত্যি আছে। তবে একটা কথা বলছি, আপনি আপনার মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন।

রাফা ফোনটা কানে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—

তার মা শারমিন বেগমের সঙ্গে আদবির পরিবারের এমন কী সম্পর্ক, যা এত বছর ধরে সবাই লুকিয়ে রেখেছে?

আর সেই মুহূর্তে রাফার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন শারমিন বেগম।

— রাফা, তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

রাফা ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।

শারমিন বেগমের চোখে স্পষ্ট ভয়।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন