নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৮
সকালের আলো ঘরের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল। আদবি বিছানায় বসে গতকাল পাওয়া পুরোনো চাবিটির দিকে তাকিয়ে আছে। চাবিটা হাতে নেওয়ার পর থেকেই তার মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে।
এই চাবি কোন দরজার? আর চিঠির ছেঁড়া অংশটাই বা কোথায়?
ঠিক তখনই তার বাবা ঘরে প্রবেশ করলেন।
— আদবি, তোর চাচা বলেছে তুই নাকি পুরোনো বাড়িতে গিয়েছিলি?
আদবি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— জি বাবা। সেখানে এই চাবিটা পেয়েছি। বৃদ্ধ লোকটি আপনাকে দেখাতে বলেছেন।
চাবিটি বাবার হাতে দিতেই সোহেল সাহেবের মুখের ভাব বদলে গেল।
— এই চাবি তুই কোথায় পেলি?
— পুরোনো বাড়ির একটা বাক্সে।
সোহেল সাহেব কিছুক্ষণ চাবিটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— এই চাবির কথা আমি ভেবেছিলাম আর কোনোদিন শুনতে হবে না।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— বাবা, এর মধ্যে কী রহস্য আছে?
— এই চাবি দিয়ে আমাদের পুরোনো বাড়ির নিচতলার একটি ঘর খোলা যায়। বহু বছর ধরে ঘরটি বন্ধ।
— তাহলে চলুন, আজই দেখি।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— ঠিক আছে। তবে সেখানে যা পাবি, তা দেখে অবাক হবি না।
অন্যদিকে রাফা নিজের ঘরে বসে ফোনে আদবির মেসেজ পড়ছিল।
আদবি লিখেছে,
“আজ আমাদের পুরোনো বাড়িতে যেতে হবে। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন।”
রাফা উত্তর দিল,
“কেন? আবার নতুন কোনো রহস্য?”
আদবি লিখল,
“হ্যাঁ। আর রহস্যের একটা অংশ আপনার সামনেই খুলতে চাই।”
রাফা মেসেজ পড়ে মৃদু হাসল।
ঠিক তখনই নুসাইবা ঘরে ঢুকে বলল,
— আপু, কার সঙ্গে এত মেসেজ করছ?
— তোর গোয়েন্দাগিরি আবার শুরু হয়েছে?
— অবশ্যই! আমার ধারণা, আদবি ভাইয়া।
রাফা বালিশ ছুড়ে বলল,
— বের হ এখান থেকে!
নুসাইবা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দুপুরের দিকে আদবি রাফাকে নিয়ে পুরোনো বাড়িতে পৌঁছাল। সোহেল সাহেব এবং রাশেদ সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
রাশেদ সাহেব চাবিটা দেখে বললেন,
— তাহলে অবশেষে এটা পাওয়া গেল!
আদবি জিজ্ঞেস করল,
— চাচা, এই ঘরে কী আছে?
— সেটা জানার জন্যই তো এত বছর অপেক্ষা করেছি।
বাড়ির নিচতলায় একটি সরু করিডর ছিল। করিডরের শেষ মাথায় কাঠের একটি দরজা। দরজাটির গায়ে ধুলো জমে আছে।
সোহেল সাহেব চাবিটি তালায় প্রবেশ করালেন। কয়েকবার চেষ্টা করার পর তালাটি খুলে গেল।
দরজা খুলতেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে পুরোনো আসবাবপত্র, কিছু কাগজপত্র এবং একটি কাঠের টেবিল রাখা ছিল। দেয়ালের পাশে একটি বড় আলমারি।
রাফা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।
— এত বছর ধরে এই ঘর বন্ধ ছিল?
রাশেদ সাহেব বললেন,
— হ্যাঁ। এখানে এমন কিছু জিনিস রাখা আছে, যা আমাদের পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।
আদবি আলমারির কাছে গিয়ে একটি ফাইল বের করল। ফাইলের ভেতরে অনেকগুলো পুরোনো কাগজ।
হঠাৎ একটি কাগজের ওপর তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা—
“তানিয়ার পরিবারকে নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার আসল কারণ সবাইকে জানানো হয়নি।”
আদবি দ্রুত বাবার দিকে তাকাল।
— বাবা, এর মানে কী?
সোহেল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— এই ঘটনার পেছনে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছিল। কিন্তু আমি চাইনি সেই পুরোনো বিষয়গুলো আবার সামনে আসুক।
রাফা এবার বলল,
— কিন্তু সত্যিটা না জানলে তো ভুল বোঝাবুঝি দূর হবে না।
রাশেদ সাহেব মাথা নাড়লেন।
— মেয়েটি ঠিক বলেছে। এবার সবকিছু পরিষ্কার করা দরকার।
ঘরের এক কোণে একটি ছোট ডায়েরি পাওয়া গেল। আদবি ডায়েরিটি খুলে প্রথম পাতায় একটি নাম দেখতে পেল।
মাহিরা।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— মাহিরা কে?
সোহেল সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
— মাহিরা ছিল তানিয়ার পরিবারের একজন খুব কাছের মানুষ। এই ঘটনার অনেক কিছু সে জানত।
রাফা জিজ্ঞেস করল,
— তিনি এখন কোথায়?
রাশেদ সাহেব উত্তর দিলেন,
— জানি না। তবে ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ঠিকানা লেখা আছে।
আদবি ঠিকানাটি পড়ে বলল,
— এই ঠিকানাটা তো আমাদের শহরেই!
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
বাড়ি ফেরার পথে রাফা বেশ চুপচাপ ছিল।
আদবি গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
— কী হয়েছে? এত চুপ কেন?
— ভাবছি, আপনার পরিবারে এত কিছু ঘটেছে অথচ আপনি নিজেও কিছু জানতেন না।
আদবি মৃদু স্বরে বলল,
— সব সত্য জানার পর হয়তো অনেক কিছু বদলে যাবে।
রাফা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আপনার ওপর আমার রাগ এখনো কমেনি। কিন্তু আমি চাই না আপনি কোনো সমস্যায় একা পড়ুন।
আদবি একবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— আপনার এই কথাটুকুই আমার জন্য অনেক।
রাফা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— বেশি খুশি হওয়ার কিছু নেই। এখনো আপনাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি।
আদবি হেসে বলল,
— সেটাও একদিন অর্জন করে নেব।
অন্যদিকে তানিয়া নিজের ঘরে বসে ছিল। তার সামনে একটি পুরোনো ছবি রাখা। ছবিতে মাহিরার সঙ্গে তানিয়ার ছোটবেলার একটি মুহূর্ত।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন বলল,
— আদবি পুরোনো ঘরটি খুলেছে।
তানিয়া চমকে উঠল।
— কী! তাহলে কি ডায়েরিটাও পেয়েছে?
— জি। আর মাহিরার ঠিকানাও খুঁজে পেয়েছে।
তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— না! মাহিরার কাছে যাওয়ার আগেই আমাকে কিছু একটা করতে হবে।
— কিন্তু কেন? মাহিরা তো সত্যিটা জানে।
তানিয়া রাগী কণ্ঠে বলল,
— সেই কারণেই তো তাকে খুঁজে পাওয়া চলবে না!
রাতের দিকে আদবি ডায়েরিটি আবার খুলে পড়ছিল। হঠাৎ শেষ পাতার ভাঁজের মধ্যে ছোট একটি কাগজ দেখতে পেল।
কাগজটি খুলতেই লেখা চোখে পড়ল—
“আদবি, যদি কোনোদিন তুই এই ডায়েরি পড়িস, তাহলে মাহিরার সঙ্গে দেখা করিস। সে জানে, তোর পরিবারের সেই ঘটনার আসল সত্য কী।”
আদবি কাগজটি হাতে নিয়ে বসে রইল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“মাহিরাকে খুঁজে লাভ নেই। সে যা জানে, তা কোনোদিন প্রকাশ পেতে দেওয়া হবে না।”
আদবি এবার নিশ্চিত হলো, কেউ একজন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে।
সে সঙ্গে সঙ্গে রাফাকে ফোন করল।
— রাফা, একটা সমস্যা হয়েছে।
— কী হয়েছে?
— মাহিরাকে খুঁজে বের করার আগেই কেউ আমাদের থামাতে চাইছে।
রাফা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— তাহলে আমাদের আরও সাবধানে এগোতে হবে। সত্যিটা জানার আগে থেমে যাওয়া যাবে না।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আপনি পাশে থাকলে আমার সাহসটা বেড়ে যায়।
রাফা মৃদু স্বরে বলল,
— আগে রহস্যের সমাধান করুন। তারপর এসব কথা বলবেন।
আদবি হেসে ফেলল।
কিন্তু তারা কেউই জানত না, পরদিন সকালে মাহিরার কাছ থেকে এমন একটি ফোন আসবে, যা তাদের জীবনের সব হিসাব বদলে দেবে।
চলবে...