### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ১২
### ভালোবাসার নতুন ঠিকানা
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে রাফার ঘরে এসে পড়েছে। বিছানায় বসে ফোন দেখছিল রাফা। গতকাল আদবির পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসার পর থেকেই তার মনটা অন্যরকম হয়ে আছে।
বারবার মনে পড়ছে আদবির কথা। ছেলেটা কীভাবে সবার সামনে তার প্রতি নিজের সম্মান ও ভালো লাগার কথা প্রকাশ করেছিল!
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— আপু, ঘুম থেকে উঠেছ?
রাফা ফোনটা পাশে রেখে বলল,
— হ্যাঁ, আয়।
ছোট বোন ঘরে ঢুকেই দুষ্টুমি করে বলল,
— ভাবি, কী করছ?
রাফা অবাক হয়ে তাকাল।
— কী বললি?
— ভাবি বললাম! নাকি এখনো বলা যাবে না?
রাফা বালিশ হাতে নিয়ে বলল,
— দাঁড়া, তোকে আজ মজা দেখাচ্ছি!
ছোট বোন হেসে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাফা নিজেও হেসে ফেলল।
অন্যদিকে আদবি নিজের ঘরে বসে ছিল। হাতে ফোন, কিন্তু কাউকে কল করার সাহস পাচ্ছে না। গতকাল রাফার সঙ্গে কথা বলার পর থেকে তার মনটা বেশ ভালো।
ঠিক তখনই মাহিরা ঘরে ঢুকল।
— ভাইয়া!
— কী হয়েছে?
— একটা খবর আছে।
— কী খবর?
মাহিরা হাসতে হাসতে বলল,
— মা বলেছে, আজ বিকেলে রাফা আপুদের বাসায় যাব।
আদবির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ। কিন্তু তোমার মুখে এত হাসি কেন?
— এমনিই।
— আমি সব বুঝি ভাইয়া!
আদবি বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
— বেশি বুঝতে হবে না। পড়তে বস।
মাহিরা মুখ বাঁকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দুপুরে রাফা মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে ছিল। শারমিন বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বলো।
— আদবিকে তোর কেমন লাগে?
রাফা লজ্জায় মাথা নিচু করল।
— ভালো।
— শুধু ভালো?
রাফা মুচকি হেসে বলল,
— মা, তুমি না!
শারমিন বেগম মেয়েকে কাছে টেনে নিলেন।
— দেখ মা, বিয়ে জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত। শুধু ভালো লাগা দিয়ে সংসার হয় না। সেখানে সম্মান, বিশ্বাস আর বোঝাপড়া প্রয়োজন।
রাফা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— আমি জানি মা। আদবি আমাকে সম্মান করে। আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোনে।
মা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— আল্লাহ যেন তোর জীবনে সুখ রাখেন।
রাফা আস্তে করে বলল,
— আমিন।
বিকেল পাঁচটার দিকে আদবি তার বাবা-মা ও মাহিরাকে নিয়ে রাফাদের বাসায় এল।
সবাই বসার ঘরে বসে গল্প করছিল। রাফা চা নিয়ে এসে সবার সামনে রাখল।
আদবির মা রাফার হাত ধরে বললেন,
— মা, তুমি বসো। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব।
রাফা লজ্জা পেয়ে মায়ের পাশে বসল।
আমিরুল সাহেব সোহাগের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ভাই, আমরা চাই দুই পরিবারের সম্মতিতে আদবি আর রাফার সম্পর্কটা সামনে এগিয়ে নিতে।
সোহাগ সাহেব হাসিমুখে বললেন,
— আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই। তবে ছেলে-মেয়ের মতামতটাই আগে জানতে চাই।
আদবির মা বললেন,
— একদম ঠিক বলেছেন। আমরা চাই ওরা দুজনেই খুশি থাকুক।
সোহাগ সাহেব এবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
— মা রাফা, তোর কী মত?
রাফা লজ্জায় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
— তোমরা যেটা ভালো মনে করো, বাবা।
শারমিন বেগম মুচকি হেসে বললেন,
— শুধু আমাদের মতামত নয় মা, তোর নিজের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।
রাফা এবার একটু সাহস করে বলল,
— আদবিকে আমার ভালো লাগে। উনি আমাকে সম্মান করেন। আমিও উনাকে সম্মান করি।
কথাটা শুনে আদবির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মাহিরা পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
— ভাইয়া, এবার তো মিষ্টি খাওয়াতেই হবে!
আদবি বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
সন্ধ্যায় সবাই মিলে বিয়ের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করল। দুই পরিবার ঠিক করল, আগে ছোট পরিসরে আংটি পরানোর আয়োজন হবে। এরপর সবার সুবিধামতো বিয়ের দিন ঠিক করা হবে।
রাফা নিজের ঘরে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর ফোনে আদবির কল এল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
— কী করছেন?
— কিছু না।
— আজকের দিনটা কেমন লাগল?
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— অনেক সুন্দর।
আদবি বলল,
— জানেন, আজ আপনার মুখে সম্মতির কথা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে।
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন?
— কারণ আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার মনের কথাগুলো লুকাতে ইচ্ছে করে না।
রাফা একটু চুপ থেকে বলল,
— আদবি?
— জি, বলুন।
— একটা কথা বলব?
— বলুন।
— কখনো আমার ওপর রাগ করে দূরে চলে যাবেন না।
আদবি শান্ত গলায় বলল,
— মানুষের মধ্যে অভিমান হতে পারে, রাগ হতে পারে। কিন্তু কথা না বলে দূরে সরে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। আমি চাই, আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে আমরা দুজনেই কথা বলে সমাধান করব।
রাফার চোখেমুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
— আমিও তাই চাই।
আদবি বলল,
— তাহলে আজ থেকে একটা প্রতিজ্ঞা করি। কোনো অভিমান জমিয়ে রাখব না।
— ঠিক আছে।
রাতের খাবারের পর রাফা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদ দেখছিল। তার মনে আজ হাজারো স্বপ্ন।
একটা নতুন জীবন, নতুন পরিবার আর এমন একজন মানুষ, যে তার ছোট ছোট অভিমানও বুঝতে চেষ্টা করে।
হঠাৎ ফোনে আদবির মেসেজ এল।
'শুভরাত্রি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমাদের সামনের দিনগুলো সুন্দর হোক।'
রাফা উত্তর দিল,
'আমিন। আপনিও ভালো থাকবেন।'
ফোনটা রেখে রাফা আকাশের দিকে তাকাল।
তার অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু এই সুখের দিনের মাঝেই আদবির জীবনে আসতে চলেছে একটি নতুন দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্বের কথা জানতে পেরে রাফা অবাক হয়ে যাবে।
আমার গল্প
চলবে...