এসেছি তোর মনেরই দেশে
Kabita Rahman
(কপি করা নিষিদ্ধ)🚫🚫🚫
: পর্ব:২
ভোরের আলো ধীরে ধীরে শিমুলতলী গ্রামের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো সূর্যের প্রথম আলোয় চিকচিক করছে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে কয়েকজন কৃষক লাঙল কাঁধে নিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে খাবারের পুঁটলি। দূরের বাঁশবাগান থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। পুকুরের পানিতে কয়েকটি হাঁস দলবেঁধে সাঁতার কাটছে। বাড়ির উঠোনে গ্রামের নারীরা ঝাড়ু দিয়ে উঠোন পরিষ্কার করছেন। কেউ গরুর জন্য খড় প্রস্তুত করছেন, কেউ আবার মাটির চুলায় সকালের রান্না বসিয়েছেন।গ্রামের সকালটা শহরের সকালের মতো ব্যস্ত হলেও এখানে ব্যস্ততার মধ্যে আলাদা এক প্রশান্তি রয়েছে। পাশের বাড়ির চাচি নিজের বাড়িতে পিঠা তৈরি করলে প্রতিবেশীর বাড়িতেও পাঠিয়ে দেন। কারও বাড়িতে নতুন ধান উঠলে আশপাশের মানুষজন মিলে সেই আনন্দ ভাগ করে নেন। বিকেলে পুকুরপাড়ে বসে গ্রামের বয়স্ক মানুষগুলো গল্প করেন। ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে মাঠে খেলতে যায়। এই গ্রামের মানুষের জীবন খুব সাধারণ, কিন্তু তাদের সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা।
খান বাড়িতেও সকাল শুরু হয়েছে বেশ আগেই।
বাড়ির সামনের বড় উঠোনে রহিমা খালা গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতাগুলো পরিষ্কার করছেন। পাশের বাগানে কয়েকজন কর্মচারী ফুলগাছের পরিচর্যা করছেন। বাড়ির পেছনের পুকুরে কাজের লোকেরা মাছের খাবার দিচ্ছে।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সিমিন সকালের breakfast তৈরিতে সাহায্য করছে। তার মুখে সবসময়কার মতো হাসি। রান্নাঘরের অন্যদের সঙ্গে গল্প করতে করতে সে কাজ করছে।
রহিমা খালা বললেন,
সিমিন, তুই একটু আলুগুলো ধুয়ে দে মা। আমি ডিমগুলো ভেজে নিচ্ছি।
সিমিন হাসিমুখে উত্তর দিল,
আচ্ছা খালা। তবে আজকে আলুর ভর্তাটা আমি বানাব।
তোর হাতের ভর্তা তো সবাই খুব পছন্দ করে। বানাস।
শুধু ভর্তা না খালা, আজকে তোমার জন্য চা-ও বানিয়ে দেব।
আমার জন্য আবার আলাদা চা কেন?
তুমি সারাক্ষণ আমাদের জন্য কাজ করো। তোমাকে একটু চা বানিয়ে খাওয়ালে সমস্যা কী?
রহিমা খালা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
তোর মুখে সবসময় কথার অভাব নেই। আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।
সিমিন হাসতে হাসতে আলু ধুতে লাগল।
এই বাড়ির সবার সঙ্গে সিমিনের বেশ ভালো সম্পর্ক। ছোট-বড় সবাইকে সে সম্মান করে, আবার সবার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেও যায়। বাড়ির বয়স্ক মানুষদের কাজে সাহায্য করে, ছোটদের সঙ্গে গল্প করে। তার নিজের বলতে কেউ না থাকলেও খান বাড়ির মানুষগুলো তাকে কখনো একেবারে পর মনে করেননি।
বিশেষ করে মেহের খান তাকে খুব স্নেহ করেন।
সকাল সাড়ে আটটা।
দোতলার ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নামল অর্ক। পরনে সাদা শার্ট ও কালো ট্রাউজার। ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার মুখ গম্ভীর।
ডাইনিং রুমে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন মেহের খান।
নাতিকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
দাদুভাই, ঘুম ভালো হয়েছে?
অর্ক চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
জি, দাদু।
গ্রামের বাতাসে ঘুম ভালো হওয়ারই কথা। ঢাকার মতো গাড়ির শব্দ নেই, মানুষের চেঁচামেচি নেই।
অর্ক মৃদু হেসে বলল,
সেটা ঠিক।
মেহের খান খবরের কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রাখলেন।
আজকে তোর চাচার বাড়িতে যাবি। তোর চাচাতো ভাইবোনেরা তোকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।
যাব।
আর কয়েকদিন কোনো কাজের কথা বলবি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকিস। এবার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবি।
অর্ক মাথা নাড়ল।
এমন সময় সিমিন হাতে নাশতার ট্রে নিয়ে প্রবেশ করল।
প্রথমে মেহের খানের সামনে খাবার রাখল। তারপর অর্কের সামনে প্লেট রাখতে গিয়ে দেখল, টেবিলের ওপর অর্কের মোবাইল রাখা আছে।
সে বিনয়ের সঙ্গে বলল,
ছোট সাহেব, আপনার মোবাইলটা একটু সরাবেন? প্লেট রাখতে অসুবিধা হচ্ছে।
অর্ক মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সেটি সরিয়ে নিল।
সিমিন প্লেট রেখে চলে যেতে নিলেই অর্ক বলল,
চায়ের কাপ কোথায়?
রান্নাঘরে আছে। নিয়ে আসছি।
খাবার পরিবেশন করার সময় চা সঙ্গে আনতে হয়, এটা জানো না?
সিমিন একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
জানি। কিন্তু চা তখনো তৈরি হয়নি।
অর্ক ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
কথা কম বলে কাজ করতে শেখো।
সিমিন আর কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
মেহের খান নাতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
মেয়েটা খুব ভালো। ওর সঙ্গে একটু ভালোভাবে কথা বলবি।
অর্ক খাবারের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল,
আমি তো খারাপ কিছু বলিনি, দাদু।
ভালো কথা বলারও একটা ধরন আছে। মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়।
অর্ক আর কোনো উত্তর দিল না।
খান বাড়ির সামনের বাগানে বসে ছিলেন নওশীন বেগম। পাশে কয়েকটি ফুলের টব। তিনি বাগানের মালির সঙ্গে নতুন কিছু ফুলগাছ লাগানোর বিষয়ে কথা বলছিলেন।
সিমিন একটি ঝুড়িতে ফুল নিয়ে বাগানে প্রবেশ করল।
বড় আম্মা!
নওশীন বেগম মুখ তুলে তাকালেন।
কী হয়েছে মা?
আপনার জন্য বাগান থেকে ফুল নিয়ে এসেছি। দেখুন, কত সুন্দর জবা ফুটেছে।
নওশীন বেগম ফুলগুলো হাতে নিয়ে বললেন,
খুব সুন্দর হয়েছে। তুই নিজে গাছগুলোতে পানি দিয়েছিলি?
জি। সকালে দিয়েছি। তবে গোলাপগাছগুলোতে আরও কিছু সার দিতে হবে।
তুই তো এখন বাগানেরও অনেক কিছু বুঝিস।
সিমিন হেসে বলল,
এই বাড়িতে থাকতে থাকতে শিখে গেছি।
নওশীন বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
তুইও আমাদের পরিবারের একজনের মতো। নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখবি।
সিমিন মিষ্টি করে হাসল।
ঠিক তখনই বাড়ির সামনের গেট দিয়ে একটি মোটরসাইকেল প্রবেশ করল।
মোটরসাইকেল থেকে নামল পঁচিশ বছর বয়সী এক যুবক। পরনে হালকা নীল শার্ট ও জিনস। চেহারায় হাসি লেগে আছে। সে হলো অর্কের চাচাতো ভাই রায়হান খান।
তার পেছনেই গাড়ি থেকে নামল আঠারো বছর বয়সী একটি মেয়ে। নাম রাইসা খান। রায়হানের ছোট বোন।
রাইসা সিমিনকে দেখেই ডাকল,
সিমিন !
সিমিন ফুলের ঝুড়ি রেখে দৌড়ে এগিয়ে গেল।
রাইসা আপু! তুমি এসেছ!
রাইসা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
তোকে না দেখে আর ভালো লাগছিল না।
রায়হান হেসে বলল,
আর আমাকে দেখেও কোনো আনন্দ নেই?
সিমিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
আছে তো ভাইয়া। আপনি আসলে তো বাড়িতে অনেক মজা হয়।
এই তো, এবার ঠিক কথা বলেছিস।
রাইসা সিমিনের হাত ধরে বলল,
চল, আগে আমার সঙ্গে ঘরে যাবি। অনেক গল্প জমে আছে।
সিমিন হেসে উত্তর দিল,
যাব। আগে বড় আম্মার ফুলগুলো রেখে আসি।
রায়হান নওশীন বেগমের কাছে গিয়ে সালাম করল।
বড় আম্মু, কেমন আছ?
ভালো আছি। তোরা দুজনেই ভালো আছিস?
রাইসা বড় চাচিকে জড়িয়ে ধরল।
ভালো আছি মা।
নওশীন বেগম দুজনকে দেখে খুশি হলেন।
খান বাড়ির এই পরিবারের মানুষগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশে থাকে। অর্ক ছাড়া পরিবারের প্রায় সবাই হাসিখুশি এবং মিশুক স্বভাবের। রায়হান ও রাইসা দুজনেই সিমিনকে ছোট বোনের মতো ভালোবাসে।
দুপুরের আগে।
অর্ক নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে ভার্সিটির কিছু কাজ করছিল। আগামী সপ্তাহে তার কয়েকটি lecture রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে এলেও সে নিজের দায়িত্বগুলো ঠিকমতো পালন করতে চায়।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
আসব?
অর্ক বিরক্ত না হয়ে বলল,
আসুন।
দরজা খুলে রায়হান প্রবেশ করল।
এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত লেকচারার সাহেব!
অর্ক ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
নাটক বন্ধ কর।
রায়হান হেসে তার পাশে বসে পড়ল।
এত বছর পর বাড়িতে এসেছ ভাই । একটু হাসিমুখে কথা বল।
বলছি তো।
তোমার এই মুখ দেখে মনে হচ্ছে তোমাকে জোর করে গ্রামে আটকে রাখা হয়েছে।
অর্ক এবার ল্যাপটপ বন্ধ করল।
তুই কোনো কাজে এসেছিস?
না। তোমাকে নিতে এসেছি।
কোথায়?
আমাদের বাড়িতে। বাবা তোমাকে দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। মা-ও অপেক্ষা করছে।
অর্ক উঠে দাঁড়াল।
চল।
রায়হান হেসে বলল,
এই তো আমার ভাই!
দুজন নিচে নেমে এল।
খান বাড়ির রান্নাঘরের সামনে সিমিন তখন রাইসার সঙ্গে গল্প করছিল।
রাইসা বলল,
সিমিন, তুই এখনো পড়াশোনা করিস না?
সিমিনের মুখের হাসিটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।
না আপু। অনেকদিন হলো পড়াশোনা বন্ধ।
তোর তো পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা ছিল।
ছিল। এখন আর কী হবে?
রাইসা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
এমন কথা বলিস না। আবার পড়াশোনা শুরু করা যায়।
সিমিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
সুযোগ পেলে অবশ্যই পড়ব।
রাইসা তার হাত ধরে বলল,
আমি বড় আব্বুর সঙ্গে কথা বলব।
সিমিন হেসে বলল,
আগে তুমি নিজের পড়াশোনা শেষ করো।
দুজনেই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই অর্ক ও রায়হান সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল।
সিমিন হাসতে হাসতে পেছনে ঘুরতেই তার হাতের ফুলের ঝুড়িটি টেবিলের কিনারায় ধাক্কা খেল। কয়েকটি ফুল নিচে পড়ে গেল।
অর্ক সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে বলল,
এই বাড়িতে কি কোনো কিছু ঠিকঠাক রাখা যায় না?
সিমিন নিচে পড়ে যাওয়া ফুলগুলো তুলতে তুলতে বলল,
ফুলগুলোই তো পড়েছে। তুলে রাখছি।
অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল,
সবকিছুর উত্তর দিতে হবে?
সিমিন এবার মাথা তুলে তাকাল।
আপনি কথা বললে আমি উত্তর দেব না?
রায়হান মুখ চেপে হাসি আটকাল।
অর্ক চোখ সরু করে বলল,
তোমার সঙ্গে তর্ক করার সময় আমার নেই।
সিমিনও চুপ থাকল না।
আমারও আপনার সঙ্গে তর্ক করার শখ নেই।
অর্ক এক পা এগিয়ে এল।
কী বললে?
সিমিন ফুলগুলো ঝুড়িতে রেখে শান্ত গলায় বলল,
যা শুনেছেন।
রায়হান এবার হেসে ফেলল।
অর্ক ভাই , মেয়েটা কিন্তু তোমাকে একদম ভয় পায় না!
অর্ক রায়হানের দিকে তাকাল।
তুই চুপ কর।
সিমিন মনে মনে বিরক্ত হয়ে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
রায়হান এবার অর্কের কাঁধে হাত রেখে বলল,
ভাই, গ্রামের বাড়িতে এসে একটু স্বাভাবিক হও। সবাই তোমার মতো গম্ভীর না।
অর্ক কোনো উত্তর না দিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল।
দুপুরের সময় খান বাড়ির সবাই একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসেছে।
মেহের খান, মাশরুর খান, নওশীন বেগম, অর্ক, রায়হান ও রাইসা। বাড়ির পরিবেশ বেশ আনন্দমুখর।
মেহের খান নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
রায়হান, তোর বাবা কোথায়?
রায়হান উত্তর দিল,
বাবা জমির কাজে মাঠে গেছেন। বিকেলের দিকে ফিরবেন।
আর তোর মা?
মা বাড়িতেই আছেন। আপনাকে সালাম দিতে বলেছেন।
মেহের খান হাসলেন।
আচ্ছা, বিকেলে আমি নিজেই যাব।
রাইসা অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল,
ভাইয়া, আপনি আমাদের বাড়িতে কতদিন থাকবেন?
অর্ক খাবার খেতে খেতে বলল,
কয়েকদিন।
রাইসা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
কয়েকদিন মানে? এতদিন পর এসেছেন। অন্তত এক মাস থাকবেন।
রায়হান বলল,
এক মাস আটকে রাখতে হলে ওর ল্যাপটপ আর ফোন লুকিয়ে রাখতে হবে।
সবাই হেসে উঠল।
অর্ক শুধু পানির গ্লাসটা হাতে নিল।
মেহের খান মৃদু হেসে বললেন,
অর্ক, তোর চাচার বাড়ির সবাই তোকে খুব ভালোবাসে। তাদের সঙ্গে সময় কাটাবি।
অবশ্যই, দাদু।
খাবার শেষে সিমিন পানির গ্লাসগুলো সরিয়ে নিতে এল।
রাইসা তাকে পাশে বসতে বলল।
সিমিন, তুইও একটু খেয়ে নে।
আমি পরে খাব আপু।
মেহের খান বললেন,
আগে নিজের খাবার খেয়ে নিবি। সারাদিন কাজ করিস।
সিমিন মাথা নেড়ে বলল,
জি, দাদু।
অর্ক কথাটা শুনে একবার তাকাল। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
বিকেল।
শিমুলতলী গ্রামের বিকেলটা বেশ মনোরম। মাঠের ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা কাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন। কেউ মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে হাঁটছেন, কেউ গরুর দড়ি ধরে বাড়ির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা পুকুরপাড়ে খেলছে। কয়েকজন কিশোর ফুটবল নিয়ে মাঠের একপাশে দৌড়াদৌড়ি করছে।
মসজিদ থেকে আসরের আজান ভেসে আসতেই গ্রামের পরিবেশ আরও শান্ত হয়ে উঠল।
খান বাড়ির পেছনের বাগানে সিমিন গাছে পানি দিচ্ছিল। তার পাশে রাইসা বসে ছিল।
রাইসা বলল,
সিমিন, তুই সবসময় এত হাসিখুশি থাকিস কীভাবে?
সিমিন পানি দেওয়ার ঝাঁঝরিটা নামিয়ে বলল,
হাসিখুশি থাকলে মনটা ভালো থাকে আপু।
তোর বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে না?
সিমিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীর স্বরে বলল,
পড়ে। খুব মনে পড়ে। ছোটবেলায় আব্বু আমাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন। আম্মু রাতে ঘুম পাড়ানোর সময় গল্প বলতেন। এখন আর কিছুই নেই। তবে তাঁদের কথা মনে করে সারাদিন মন খারাপ করে থাকলে তো জীবন চলবে না।
রাইসা সিমিনের হাতটা নিজের হাতে নিল।
তুই আমাদের কাছে থাকবি। নিজের পড়াশোনাটাও আবার শুরু করবি।
সিমিন মৃদু হাসল।
তোমরা সবাই এত ভালো কেন আপু?
রাইসা হেসে বলল,
কারণ তুইও তো ভালো।
দুজন আবার গল্পে মেতে উঠল।
সন্ধ্যা সাতটা।
অর্ক নিজের ঘরে বসে ভার্সিটির স্টুডেন্টদের কিছু assignment দেখছিল। টেবিলের ওপর কয়েকটি বই, ল্যাপটপ এবং কাগজপত্র ছড়িয়ে রয়েছে।
এমন সময় সিমিন হাতে এক কাপ চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
ছোট সাহেব, আপনার চা।
অর্ক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বলল,
টেবিলের ওপর রাখো।
সিমিন চায়ের কাপ রাখতে গিয়ে দেখল, টেবিলের একপাশে বইয়ের ওপর কয়েকটি কাগজ রাখা। সে কাপ রাখার জায়গা তৈরি করতে কাগজগুলো একটু সরিয়ে দিল।
অর্ক সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল।
কে বলেছে আমার কাগজে হাত দিতে?
সিমিন থমকে গেল।
কাপ রাখার জায়গা ছিল না। তাই একটু সরিয়েছি।
আমার জিনিসপত্রে হাত দেওয়ার আগে অনুমতি নিতে হয়।
সিমিন এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
আমি তো কাগজগুলো ফেলে দিইনি। শুধু একটু সরিয়েছি।
তোমাকে এত কথা বলতে হবে না। যা বলেছি, সেটা বুঝলেই হবে।
সিমিন চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল,
আপনি সবসময় এমন রাগ করে কথা বলেন কেন?
অর্ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
সেটা তোমার জানার প্রয়োজন নেই।
ঠিক আছে। আমারও জানার কোনো আগ্রহ নেই।
অর্ক এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
তোমার কাজ শেষ হয়েছে। এবার যাও।
সিমিন আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজার বাইরে এসে নিজের মনে বিড়বিড় করল,
কী যে রাগী মানুষ! একটু ভালোভাবে কথা বললেই তো হয়। সারাক্ষণ এমন মুখ করে থাকে, যেন পুরো গ্রামের দায়িত্ব একা তার ওপর।
কথাগুলো বলতে বলতে সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।ঘরের ভেতরে অর্ক আবার ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিল। তবে তার মুখের বিরক্তি তখনো কাটেনি।
রাত সাড়ে আটটা।
খান বাড়ির সবাই বসার ঘরে বসে গল্প করছেন। মেহের খান পুরোনো দিনের গ্রামের কথা বলছিলেন। রায়হান ও রাইসা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
মাশরুর খান বললেন,
বাবা, গ্রামের দক্ষিণ পাশের জমিগুলোতে এবার ভালো ধান হয়েছে।
মেহের খান খুশি হয়ে বললেন,
আলহামদুলিল্লাহ। কৃষকেরা ভালো ফসল পেলে আমারও ভালো লাগে। কাল সকালে জমিতে যাব। অর্ককেও সঙ্গে নিয়ে যাব।
অর্ক সোফায় বসে মোবাইল দেখছিল।
যাব, দাদু।
রায়হান বলল,
আমিও যাব। সকালে সবাই মিলে মাঠে ঘুরে আসব।
রাইসা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
আমিও যাব।
মেহের খান হেসে বললেন,
তাহলে সবাই মিলে যাবি। অনেক দিন পর বাড়িতে এত আনন্দ হচ্ছে।
এমন সময় সিমিন হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে বসার ঘরে প্রবেশ করল।
সে একে একে সবার সামনে চা রাখল। রাইসার সামনে কাপ রাখতেই রাইসা তার হাত ধরে পাশে বসাল।
সিমিন, তুইও বস।
না আপু, কাজ আছে।
মেহের খান বললেন,
কাজ তো থাকবেই। আগে একটু বসে চা খেয়ে নে।
সিমিন মৃদু হেসে বলল,
আচ্ছা দাদু।
সে বসার ঘরের একপাশে বসল।
মেহের খান তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
সিমিন, কাল সকালে আমাদের সঙ্গে মাঠে যাবি। অনেক দিন হলো তোকে বাড়ির বাইরে ঘুরতে যেতে দেখিনি।
সিমিন খুশি হয়ে বলল,
সত্যি দাদু?
হ্যাঁ মা। গ্রামের সুন্দর জায়গাগুলো তোকে দেখাব।
রাইসা বলল,
আমি সিমিনকে নিয়ে যাব। আমরা নদীর পাড়েও যাব।
রায়হান হেসে বলল,
তাহলে কাল আমাদের সঙ্গে অনেক মানুষ হবে।
সিমিনও হেসে ফেলল।
অর্ক এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার বলল,
আমি সকালে বের হব। সবাইকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার পক্ষে সম্ভব না।
মেহের খান নাতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
তোকে কেউ দায়িত্ব দিচ্ছে না। তুই নিজের মতো থাক।
রায়হান আবার হেসে উঠল।
সিমিন চুপচাপ চায়ের কাপ হাতে নিল।
রাতের আকাশে তখন অসংখ্য তারা ফুটেছে। খান বাড়ির উঠোনে জোনাকির আলো দেখা যাচ্ছে। দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে গ্রামের মানুষের গল্পের শব্দ।
একই বাড়িতে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা রয়েছে। অর্কের কঠোর স্বভাবের বিপরীতে সিমিনের প্রাণবন্ত উপস্থিতি বাড়ির পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
চলবে...