খেতা ভিজলে যেমন তেমন
বালিশ ভিজলে শুকায় না
শীতের দিনে একটা—
বউ পাইলাম না!!
গানটি গাইছিল আর ক্লাব ঝাড়ু দিতে দিতে ঝাড়ু হাতে রমিজ কোমর দুলাচ্ছিল। এটা তার রোজগার দিনের একটি বেশ পুরনো অভ্যেস। গান ছাড়া সে কোন কাজই করতে পারে না। মূলত সে সকাল সকাল ক্লাব ঝাড়ু দিচ্ছিল আর গান গাইছিল। তার মধ্যে ভারিক্কি গলার একটি ডাক শুনতে পেল, “এই রমিজ..!”
রমিজ তাৎক্ষণিক ত্বরিত হকচকিয়ে ওঠল। শ্লথ হলো তার নাচানো পা জোড়া। এরে ভাই ডাকছে তাকে। সে বলল,
“জি ভাই, আসতেছি।”
“আসতে হবে না তোকে। ওখানেই দাঁড়িয়ে বল, দরজার সামনে ঝাড়ু দিয়েছিস?”
“দিচ্ছি ভাই।”
“নাস্তা করেছিস?”
“হ্যাঁ করেছি ভাই।”
“তাইলে থাক তুই। আমি গিয়ে আব্বাসের হোটেল থেকে নাস্তা করে আসি।” বলতে বলতে দীর্ঘপেশি দেহের লম্বাটে পুরুষটি শার্ট টেনেটুনে ঠিক করে লম্বাটে লম্বাটে কদম ফেলে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ হাঁটার গতি কমিয়ে পথিমধ্যে ধুম করে থেমে পড়ল। পিছু ঘুরে রমিজকে ইশারায় কাছে ডাকল।
“এইদিকে আয়।”
রমিজ ভয়ে ভয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো। সকাল সকাল উল্টা পাল্টা গান শোনানোর জন্য যদি চড় মেরে বসে, তখন? এমনিতে লোকটার কথার আগে হাত চলে। তার ভাবনা মাঝে শুনতে পেল।
“কিরে আয়?”
রমিজ শুকনো মুখ নিয়ে লম্বাটে পুরুষটির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। হাইটে তার চেয়ে পুরুষটি লম্বা। সে কাচুমাচু করে নত চিবুকে বলে, “জি, বলেন ভাই।”
“তখন কি গান গাইছিলি যেন?”
রমিজ ঠোঁট উল্টে মাথা চুলকে আমতা আমতা করে না জানার ভান ধরে বলে, “কোন গান ভাই?”
“চড় খাস না কতদিন হয়েছে?”
রমিজ শুকনো ঢোক গিলল। বলল,
“থাক ভাই। ওসব শোনার দরকার কি?”
“দরকার আছে বলেই জিজ্ঞেস করেছি ব্যাটা। বল তুই।”
“ওই বউ নিয়ে আরকি একটা গান গাইছিলাম।”
“বউ লাগবে তোর?” প্রশ্ন করেই লোকটা পকেটে হাত দুটো ঢুকিয়ে ললাট স্বল্প কুঁচকে নিল।
রমিজ লজ্জায় মুখটা নিচু করে নিল। মিহি স্বরে বলে,
“না ভাই। আপনিই এখন পর্যন্ত বিয়ে করেন নাই। আমি করলে বিষয়টি খারাপ দেখায় না?”
“বিয়ে আমি না করতেই পারি। সেটা তো কোন বিষয় না। বউ আমার ঠিক করাই আছে। শুধু টুপ করে কবুল বলে ঘরে তুলে আনার পালা। তুই এক কাজ কর। একটা ঘর তোল। আমি তোর শরীর গরম করার ব্যবস্থা করতেছি।”
রমিজের চোখ দুটো খুশিতে নেচে ঝলমল করে ওঠল। সে শশব্যস্ত হাস্যকর মুখজে শুধাল, “বিয়া করাবেন?”
ওর ভাবনাতে এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে লম্বাটে পুরুষটি বলল, “জি না, লেপ তোষক কিনে দিব। যাতে তোর শীত কম লাগে।”
রমিজের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ভেটকি মাছের মতো গোল হয়ে এল। সে ক্ষণিকের মধ্যে মুখটা মলিন করে নিল। মানুষ এভাবে লোভ দেখিয়ে স্বপ্ন ভেঙে দেয়? হায় আল্লাহ! বউয়ের মুখ দেখা বুঝি এ জীবনে আর হবে না। ওটা স্বপ্নই রয়ে যাবে।
লোকটা ওর মলিন মুখটা এক ঝলক দেখে আবার হাঁটা ধরল। পিচঢালা রাস্তার দুপাশে সবুজ ছোট খাট অনেক প্রকৃতির বৃক্ষ। সেই রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছে বলবান লোকটি। চওড়া কাঁধ, দীর্ঘদেহী একটা শরীর। হাঁটার গতির সঙ্গে ফুটে ওঠে আভিজাত্য আর আত্মাভিমানীতা। লোকটা একটা গান ধরল..!
সোনা পাখি গো..।
আমার লক্ষ্মী পাখি গো
আমি দেশে দেশে ঘুরি
আমার ময়নার লাগি গো!
“ও দুদু, যাও কই?”
রহমান ভুঁইয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পিছু থেকে ডাক শুনে হঠাৎ থেমে পড়লেন। বললেন, “যাই তোমার বাজারে। তা তুমি যাও কই বাজান?”
“বাজারে নাস্তা করতে। আপনার ঘরে তো বউ আছে মিয়া। সকাল সকাল নাস্তা পানি খাইয়ে শরীর গরম গরম করে বাজারে পাঠায়। কিন্তু আমাদের ঘরে তো ওমন বউ নাই যে, শরীর গরমের পাশাপাশি চা গরম করে খাওয়াবে।” বলেই সে হাসে।
রহমান ভুঁইয়া গাল ছড়িয়ে হাসেন। বলেন,
“বউ তো ঠিক করাই। বিয়াটা তারে করে নেও। তাইলে তো গরম গরম চা খেতে পারো।”
তার বিপরীত পক্ষে বলিষ্ঠ পুরুষটি বলল,
“বিয়া করতে তো অসুবিধা নাই। কিন্তু মাইয়া তো ছোট। বিয়ার পরদিনই পালাইবে।”
রহমান ভুঁইয়া আবারও হাসতে হাসতে বলেন, “তোমার চাচিরে বিয়ে করে আনার পরদিনই বুঝলা বাবা, তোমার চাচি ভয়ে পালাইছে। সাতদিনের মধ্যে সে ভয়ে আমার দ্বারে কাছেও আসে নাই। এখন দেখো, সে কিন্তু আমার তিন বাচ্চার মা। বুঝলা?”
“তাইলে বলছেন বিয়েটা করেই ফেলি?” বলেই সে চোখ দুটো ছোট ছোট করে নিল।
“আহা! বসে আছো কেন? করো করো বিয়া। বউ ছাড়া কি কাঁথা গরম হয়, ঘুম আসে? শীতের দিনে শরীর গরম হতেও একজন বউ লাগে। আর তোমরা তো শরীরের রক্ত টগবগিয়ে ফুটে ওঠা জোয়ান তরতাজা পুরুষ মানুষ। রাত হলেই মনটা বউ বউ করে। ওসব বুঝি আমরা। বাতাস খেয়ে তো বড়ো হইনি। বিয়া করার পর দেখবা সংসারে আয় বরকত ফিইরা আইছে।” কথাগুলি বলেই রহমান ভুঁইয়া চলে গেলেন।
মনে মনে ঠোঁট কামড়ে হাসে লম্বাটে পুরুষটি। নাম তার নাওয়াফ তালুকদার। বাবার একমাত্র ছেলে সে। ডাক নাম নাওয়াফ। তার মা শখ করে নাবু বলে ডাকে৷ সাতাশ বছরের এই যুবকটি যেমন লম্বা তেমনই সুদর্শন পুরুষও। তরুণদের জন্য সে এক দারুণ নিদর্শন। রাজনীতির সাথেও গভীরভাবে জড়িত। তার এক চোখে নমনীয়তা, আরেক চোখে হিংস্রতা। কাটাকাটি, মারামারি, মানুষ খুন করা ওসবে ছোট থেকে অভ্যস্ত। দাদার হাত ধরেই রাজনীতে পা রাখা। আর এখন তো নেতা হয়ে ওঠছে। সামনে যে নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে ১০০% এমপি সে হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। চায়ের দোকান থেকে এলাকার প্রতিটা লোকের কাছে সে অতি সম্মানীয় ব্যক্তি।
“বউ?” শব্দটি আওড়াতেই তার পুরো শরীর জুড়ে অদ্ভুতভাবে শিহরন জেগে ওঠল। বুকে দমকা হাওয়ার এক মুঠো হাওয়া নীরবে এসে ছুঁয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে ওঠল গোলগাল পানপাতার মতো উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মুখটি। সে ঠোঁট টিপে হাসে।
“আমার মায়াবীনি!”
______
ক্লাবের পিছনে খোলা মাঠ। আর তার পাশে ঘন ঘন ছোট বড়ো অসংখ্য সুপারি গাছ। তার থেকে আরেকটু পিছনে গেলে ছোট আকারে একটি নদী। বড়ো খালও বলা যায়। সেখানে কচু পাতার ওপর বসেছে গুটিকয়েক স্কুল পড়ুয়া মেয়েরা। তাদের মধ্যে ইচ্ছে, তরু ছিল। আর সবচেয়ে দুরন্ত আর দুষ্টুমির দিক দিয়ে যদি বলা চলে তাহলে সে ব্যক্তি আর কেউ নয়। সে হলো পাখি। পুরো নাম অনন্যা রহমান পাখি। ডাক নাম পাখি। বয়স ১৬। নিউ টেনে পড়ছে। সকাল বাজে ন'টা বিশ। এখন স্কুলে পিটি (P.T) চলছে। রোজ আধঘণ্টা ধরে পিটি করা হয়। জাতীয় সংগীত ঢুলে ঢুলে গাওয়া হয়। এটা এক ধরনের জল্লাদের মতো স্বৈরাচারী অত্যাচার। সেই অত্যাচার থেকে বাঁচতে রোজই তারা পালায়। আজও যখন স্যারেরা পিটির জন্য বাঁশি ফুঁক দিয়ে ডাকছিল। সেই ফাঁকে তারা পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। স্কুলের পিছনে হিন্দু বাড়ি আছে। ওখানে বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ করা হয়েছে। তার মধ্যে টমেটো, শসা, গাজরও ছিল। পাখি, ইচ্ছে, তরু মিলে সেখান থেকে বেশ কিছু টমেটো চুরি করে নিল। এরপরে তারা ক্লাবের পিছনের দিকে যাচ্ছিল। ক্লাবের পিছনে যাওয়ার আগে পাখি একটা কাজ করতে ভুলল না। ক্লাবের কাঁচের দরজাটি টেনে ভিতরে বিড়াল ছানার মতো একটুখানি উঁকি দিয়ে দেখলো, বদজাত খচ্চোর লোকটা ক্লাবের ভিতরে আছে কিনা না। সেই মহাব্যক্তিত্বমান পুরুষটি নেই। সে ফোঁস করে স্বস্তির শ্বাস নিল। লোকটা থাকলে কথার সাগরে তাকে আটকিয়ে রাখতো। এ হল আরেক জ্বালা। ওপেন রেডিও। অতিরিক্ত কথা বলে। টমেটো চুরি করে তারা ব্যাগের ভিতরে মরিচ আর লবন এনেছিল। লবন আর মরিচ মিশিয়ে টমেটো কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল। এখান থেকে বাঁশির ফুঁকের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে ইচ্ছে টমেটোতে কামড় বসাতে বসাতে পাখিকে দৃষ্টিজোড়া নাড়িয়ে শুধাল, “পাখি, তুই সিউর তো নাওয়াফ ভাই ক্লাবে ছিল না?”
পাখি টমেটোতে মরিচ লবন লাগাতে লাগাতে বলল,
“ছিল না তো।”
“তুই হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিউর?”
পাখি এবার মাছি তাড়ানোর মতো করে বলল, “আরে ধুর! বাদ দে তো। সে কোন দেশের মহামন্ত্রী নয় যে, তার ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটবো।”
তরু এবার বলে, "তবুও, তিনি ক্লাবে রোজ বিচারসালিশ করেন। সামনে নির্বাচন করবেন, এমপি নির্বাচন। এলাকার সকলের কাছে তিনি মানবতার ফেরিওয়ালা নামে পরিচিত। ফেসবুকে তার একটা বড়ো ফ্যানফলোয়ার আছে। বেশ জনপ্রিয় লোক। তাকে তো এমনিতে মুখের কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না পাখি। তার ওপর শিক্ষা মন্ত্রীর নাতি বলে কথা।”
পাখি টমেটোর বাকি অংশটুকু মুখে ভরে নিল। চিপাতে চিপাতে বলে, “তাই বলে আমরা রোজ তিন ঘণ্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিটি করব? এটা ভাই আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রীতিমতো অজ্ঞান হয়ে পড়ব। আর তাছাড়া মন্ত্রীর নাতিকে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে বুঝি না। আছেটা কি উনার? চওড়া একটা মোটাতাজা, লম্বা শরীর ছাড়া। চাইলে আমি তুইও ওমন একটা শরীর বানাতে পারি। শুধু একটু জিম করার প্রয়োজন।”
ইচ্ছেরা ভয়ে ভয়ে চোখ দুটি বড়ো বড়ো করে ফেলল। পাখির পিছনে আতঙ্কে তলানো চোখ দুটি নিয়ে তাকাল। পাখির পিছনে তাৎক্ষণিক লম্বাটে একটি ছায়া নৈঃশব্দ্যে এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। বুকে আড়াআড়ি হাত বাঁধা তার। গম্ভীর ও দাম্ভিক চোয়াল। তীক্ষ্ণ দুটো চোখ। চওড়া কাঁধ। ইচ্ছে ইশারায় পাখিকে পিছু তাকাতে বলল। পাখি ওর ইশারা কিছুই বুঝল না। সে কথা বলতেই রইল।
আশ্চর্য হয়ে বলে, “আরে ভাই তোরা ওভাবে আমায় দেখছিস কি? হ্যাঁ মানছি আমার মাথায় বুদ্ধির অভাব নেই। তাতে দেখার কি আছে?”
ইচ্ছের মাথায় হাত।
“গাধা কোথাকার!”
পাখি চোখ পাকাল।
“কিরে ইচ্ছে বানু, তোর সমস্যাটা কি? আমাকে গাধা বললি কেন? তুই একেবারে ওই খাটাশ লোকটার মতো বদজাত হয়ে গেছিস। মানুষ বলে না, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। ঠিক তুই তাই। শোন ভাই, ওই লোকটাকে তোরা ভয় পেতে পারিস। কিন্তু আমি পাখি অতো ভয় পাই না। তাকে এত ভয় পাওয়ার আছেটা কি? কেবল একটা তালগাছের মতো শরীর ছাড়া।”
ইচ্ছের মুখটা এবার করুন হয়ে এলো। এটা কি রে ভাই? গাধা কি শখে বলে? এতো করে বোঝাতে চাইছে, পিছু ঘুর, পিছু ঘুর। উল্টো এ গাধা বকবক করেই যাচ্ছে। বেচারি প্রচন্ড কথা বলে। একবার ওই তোতাপাখির মতো মুখটা ওপেন হলে সহজে বন্ধ হয় না। পাখির মাথায় ইচ্ছের কোন ইশারাই কাজ করল না। সে তার মতো কথা বলতে ব্যস্ত। ইচ্ছে তরু ওর দিকে চেয়ে হতাশ হল। ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে বসে বলছে, আয় মাংস খা, মাংস খা। গাধা একটা!
তরু ফিস ফিস করে ইচ্ছেকে বলে, “তুই আপাতত থাম। ব্যাপারটা আমরা দেখি কি থেকে কি ঘটে?”
ইচ্ছে নীরবে মাথা ঝাঁকাল।
পাখি তরুর হাত থেকে একটা টমেটো নিয়ে নুন মরিচ মাখিয়ে খেতে খেতে বলল, “তোরা ওমন স্ট্যাচুর মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? যেভাবে আমায় দেখছিস, মনে হয় আমার পেছনে ওই জাউরা খচ্চোর ব্যাটা স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে।”
ইচ্ছে কপাল চাপড়ালো। হায় আল্লাহ! পাখিরে আজ তুই শেষ। জাউরা ব্যাটা কাকে বললি? সব নাওয়াফ ভাই শুনতেছে।
ইচ্ছে মুখে বলল, “গাধি দেখ তোর পেছনে কে আছে?”
"কে আছেরে, নাওয়াফ তালুকদার?" বলেই উপহাস করে হাসতে হাসতে পাখি পিছু ঘুরল। ওমনি দেখল তার পেছনে লম্বাটে পুরুষটি দাঁড়ানো। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো রসগোল্লার মতো গোল গোল হয়ে গেল। প্রাবল্য আশ্চর্যান্বিতে মুখটা দুই ইঞ্চি হা হয়ে এলো। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এলাকার অতি সুদর্শন পুরুষটি। আর সে কিনা এতক্ষণ তারই কুকর্মের গুণগান গাইছিল, ছ্যাহ্। এবার আর কি? হয়ত চড়, নতুবা ধমক খেতে হবে। হায় আল্লাহ! এমন কেন হতে হলো? ওসব ভেবেই তার হাত থেকে অসাবধানতায় টমেটোটি মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। লোকটার তীক্ষ্ণ ধারালো চোখ দুটো ওর মুখটার ওপরই স্থির। বুকে আড়াআড়ি হাত বাঁধা তার। সুন্দর মুখটা আজ আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। ছেলেদের এতো সুন্দর হতে নেই। তাহলে লুচু লুচু দেখায়। লোকটা পাখির সামনে পড়ে থাকা টমেটোটি মাটি থেকে তুলে হাতে নিল। হাতে তুলে পাখির ওড়না দিয়েই মুছে নিল। পাখি একেবারে চুপচাপ। যাকে বলে নিশ্চুপ। নীরবে লোকটার কাণ্ডকারখানা দেখছে। সে যে এতক্ষণ খুব সাহস দেখিয়ে বড়ো গলায় পটপট করে কথা বলছিল, সেসব আর নেই। ফুড়ুৎ করে সব পালিয়েছে। আপাতত এখন মুখটা বন্ধ করে নিল। ইচ্ছে তরুর দৃষ্টিও আপাতত নিচু। ইচ্ছে মনে মনে হাসে। নীরবে দেখে তাদের নাওয়াফ ভাইয়ের কার্যক্রম। লোকটা আসলেই জিনিয়াস, অসাধারণ! যেখানে তার পায়ের স্পর্শ পড়ে, সব ঠান্ডা। লোকটা পাখির কামড়ানোর জায়গাটির ওপর কামড় বসিয়ে দিল। কামড়ে কামড়ে টমেটোটি খেতে খেতে বলে, “কে যেন বলেছিল আমাকে ভয় পায় না? আমি খাটাশ লোক, খচ্চোর লোক, বদজাত লোক, জাউরা লোকও বলেছিল। তার সুন্দর মুখখানা একটুখানি দর্শন করতে চাই।”
ইচ্ছে আর তরু দুজন একসঙ্গে পাখির দিকে হাতের আঙুল তাক করে দেখাল। বলল,
"পাখি বলেছে, নাওয়াফ ভাই।"
পাখি মুখটা স্বল্পকালীন সময়ের মধ্যে মলিন করে নিল। চোখের পলক ঘন ঘন ঝাপটে ইচ্ছের দিকে নামিয়ে আনে। ইচ্ছে আর তরুর দিকে অসহায় চোখে তাকায়।
ইচ্ছে ফিক করে হেসে দিল। নাওয়াফ ইচ্ছের দিকে তাকাতেই ইচ্ছের হাসি হাসি মুখটা তন্মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল। লম্বাটে লোকটা পাখির মুখের সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো। পাখির ভয়ার্ত মুখটা এক পলক দেখে শুধাল,
“কিরে মৃধার মাইয়্যা, আমারে ভয় পাস না। আমার মারকে তো অন্তত ভয় পাস?”
পাখি জবাব দিতে পারল না। গলাটা তার আটকে আটকে এলো। সে কিয়দংশের মধ্যে মাথাটা নত করে নেয়। ওড়নার একাংশ ধরে উসখুস করে। টমেটোটি পুরোটা খাওয়া শেষ হয়ে গেলে লোকটা পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “সকাল বাজে ন'টা পয়ত্রিশ। তোরা স্কুলে না গিয়ে টমেটো খাচ্ছিস? আচ্ছা এই টমেটো পেলি কই?”
টমেটোর প্রসঙ্গ আসতেই ইচ্ছেসহ পাখির মুখ পাংশুটে বর্ণ হয়ে গেল। সর্বনাশ! এখন নাওয়াফ ভাই যদি জানে তারা যে টমেটো চুরি করে খেয়েছে। তাহলে মার একটাও আর নিচে পড়বে না। নিশ্চিত ক্লাবে নিয়ে দুটো দিন উল্টো ঝুলিয়ে রাখবে।
কথার মাঝে কোথা থেকে জানি স্বাধীন বেরিয়ে এলো। হাতে তার টসটসে পেয়ারা। পেয়ারায় কামড় বসাতে বসাতে সে বলে, “টমেটো পাবে কই? এরা রোজই টমেটো চুরি করে, নাওয়াফ ভাই। একদিনও পিটি করে না। স্যারের চোখে ধূলো দিয়ে কই আছে টমেটো, কই আছে পেয়ারা, কই আছে শসা? এসব চুড়ি করে তিন চারটায় মিলে বসে বসে খায়। নাইনের ক্লাসের টিনের বেড়াটা তো ভাঙা। ওই ভাঙা বেড়া দিয়ে পালিয়ে হিন্দু বাড়ির উপর দিয়ে যায়। হিন্দু বাড়ির জমিন থেকে এসব চুরি করে আনে। এই দেখেন, এখনো এদের হাতে টমেটো, শসা। গুড়া মরিচ আর লবনও আছে। এরা এসব সব সময় ব্যাগে রাখে।” কথাগুলি বলে আবারও স্বাধীন পেয়ারার ওপর কামড় বসাল।
পাখি আড়চোখে স্বাধীনের মুখটার দিকে কটমট করে চাইল। স্বাধীন পাখির কটমট করে তাকানো তোয়াক্কাই করল না। বরঞ্চ তাকে উল্টো ইশারায় চোখ মেরে বোঝাল,
“কেমন দিলাম?”
পাখি চোখের ইশারায় বলল,
“দেখে নিব তোকে।”
স্বাধীন কথার পরিপার্শ্ব দাঁত বের করে হাসে।
নাওয়াফ হাত ঘড়িটা এক পলক সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণে দেখে বলল, “তার মানি তোরা আমায় চুরি করে আনা টমেটো খাইয়েছিস?”
পাখি চট করে নাওয়াফের মুখটার দিকে চাইল। ঠোঁট উল্টে মিন মিন করে বলল, “আমরা তো আপনাকে আর আমাদের চুরি করে আনা টমেটো খেতে বলিনি নাওয়াফ ভাই। আপনি সেচ্ছায় খেয়েছেন। তা-ও আমার মুখের এটোটা। আবার আমাদেরই দোষ দিচ্ছেন? আমরা দোষি হলে আপনিও তদপেক্ষায় দোষি। কারণ চুরির ফল আপনিও খেয়েছেন।”
নাওয়াফ চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফেলল। ললাট মাঝে দুটো সরু ভাঁজ এঁকে ধূর্তমান চোখজোড়া নাড়িয়ে শুধাল, “তারমানি বলতে চাইছিস চুরির ফল খেয়ে আমিও
অপরাধী?”
পাখি নীরবে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল,
"হ্যাঁ।"
নাওয়াফ ওর সামনের দিকে একটুখানি অগ্রসর হলো। পাখির স্মিত ভয় জাগল পরাণে। সে ভীতসন্ত্রস্ত মনে ত্বরিত একটু পিছু হটে গেল। যে লম্বা পুরুষ, কথায় কথায় হাত চলে। তারও ওতো মার খাওয়ার শখ নেই৷
স্বাধীন পাখির ভিতু মুখটা এক চিলিক দেখে মুখ বাঁকিয়ে হাসে।
“খা এবার মার। নাওয়াফ ভাইয়ের মুখে মুখে তর্ক? বেদ্দব মাতারি।”
লোকটা পাখির পিছু হটা দেখে আর সামনে আগালো না। একটু ভাঁজ দিয়ে দাঁড়াল। পকেট হাতিয়ে সিগারেট বের করে দুই ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরল। লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে টান দিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে স্বাধীনকে আদেশ দিয়ে বলল, “যা ক্লাব থেকে দড়ি নিয়ে আয়। বাঁধবো আজ সব ক'টাকে।”
বাঁধার কথা শুনে পাখি বেশ ঘাবড়ে গেল। সে টের পেল তার হাত পা ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে।
স্বাধীন পাখির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটি হাসি দিল।
“গোল আলু, তুই আজ শেষ।”
ইচ্ছে আর তরু ইতিমধ্যে ঘামছে। পাখি পায়ের নখ দিয়ে মাথা নিচু করে মাটি খুঁড়ছে। এটা তার একটি বদ অভ্যেস। বেশি টেনশন হলে সে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে।
ইচ্ছে আর তরু নাওয়াফের কাছে ছুটে যায়। তারা অনুরোধ করে বলে, “নাওয়াফ ভাই, এবারের মতো মাফ করে দেন। আর কোনদিন চুরি করমু না। কানে ধরছি।”
সত্যি সত্যি তারা কানে ধরল। চোখে মুখে প্রায়শ্চিত্তবোধের সুগভীর গ্লানি।
নাওয়াফ আপাতত সিগারেট ফুঁকার পাশাপাশি মোবাইল টিপছে। ওদের কথা যেন কর্ণে ঢোকায়নি। তার থেকে বাড়তি কোন উত্তরও ফেরত এলো না। তাহলে কি লোকটা তাদের কথা শোনেনি? ইচ্ছেরা এখনো নিশ্চুপে লোকটার থেকে ভালো মন্দ উত্তরের আশায় বসে রইল। এরমধ্যে রমিজ এলো। সঙ্গে স্বাধীন আছে। রমিজের হাতে মোটা দড়ি। নাওয়াফ দড়ি দিয়ে কি করবে সে জানে না? কেবল আদেশ পেয়েছে। আর নিয়ে এসেছে।
রমিজকে দড়িসহ এগিয়ে আসতে দেখে ইচ্ছে আর তরু নাওয়াফের পা জড়িয়ে ধরল। প্রায় কাঁদো কাঁদো ভাব তাদের। কাঁদলও। বলল,
“নাওয়াফ ভাই, মাফ কইরা দেন। তবুও দড়ি দিয়া বাইন্ধেন না। মানুষজন দেখলে হাসবে। মানসম্মান থাকবে না। রাস্তা দিয়ে লজ্জায় হাঁটতে পারব না।”
লোকটার নিকোটিনে ঝলসে যাওয়া ঠোঁট দুটো ফুঁড়ে তাৎক্ষণিক কাঁটা ফোঁড়ার মতো বেরিয়ে এল, "মানসম্মানের ভয় করলে তোরা অন্তত চুরি করতিস না।"
ইচ্ছেরা জবাব দেয় না। মাথা নত তাদের। কেবল ফুঁপানোর শব্দ পাওয়া যায়। নাওয়াফ পাখির দিকে এক পলক তাকায়। পাখির থুতনি গলার সঙ্গে মিহিয়ে রাখা। সেদিকে এক পলক তাকিয়ে সে বলে, “পা ছাড়।”
ইচ্ছেরা আপত্তি জানায়।
“না, আগে বলেন মাফ করছেন। বাঁধবেন না। তাহলে ছেড়ে দিব।”
“অপরাধ তো তোরা একা করিস নি। মাফ তাহলে দুজন চাইছিস কেন? ওটার মুখে কি হয়েছে? হুলো ব্যাঙ ঢুকেছে নাকি?”
ইচ্ছে বুঝল নাওয়াফ ভাই পাখিকে ইঙ্গিত করে কথাটি বলেছে।
নাওয়াফ ওদের আবার বলে, “যা সবাইকে মাফ করব। তবে এক শর্তে। তোদের আরেক বান্ধবী আছে না, যে পটপট করে এক আঙুল বেশি কথা বলে। কাউকে ভয় পায় না। নিজেকে নিজে প্রধানমন্ত্রী মনে করে। তাকে নিজের দোষ স্বীকার করতে বলবি। আর কানে ধরে দশবার উঠবস করতে বলবি। তাহলে কাউকে বাঁধব না। ছেড়ে দিব।”
ইচ্ছে আর তরু করুন চোখে পাখির দিকে চাইল। পাখি ওদের মুখের ওপর সোজাসাপটা ঠাস করে বলে দিল, “আমি পারব না। আমরা তো আর উনার ক্ষেত থেকে চুরি করিনি। তাহলে উনার এতো গায়ে লাগছে কেন?”
নাওয়াফ পাখির ওপর দৃষ্টিজোড়া স্থাপন করেই চিবিয়ে চিবিয়ে রমিজকে ডাকল, “এই রমিজ।”
রমিজ পিছু থেকে বলে ওঠল,
“জি ভাই। আদেশ করুন।”
“সব কয়টাকে বাঁধ। লাইভ করে ভিডিওটা অনলাইনে ছড়িয়ে দে। ক্যাপশনে লিখে দে, চুরির দায়ে চুন্নিগুলা ধরা পড়ছে।”
পাখির মেজাজ বিগড়ে গেল। তার বড্ড ইচ্ছে জাগল এই লোকটাকে ফুটন্ত তেলের মধ্যে দুটো চুপ দিয়ে উঠাতে, আর ডুবাতে। কিন্তু এ অসাধ্য সাধন করতে না পেরে তার ভারি দুক্ষু লাগল। ইশ! যদি কোন সুযোগ থাকতো, এই দুনিয়া থেকে যে কোন একজনকে উধাও করে দেওয়ার। তাহলে সে সবার আগে এই ব্যাটাকে উধাও করে দিতো। আপাতত সে ইচ্ছে আর তরুর মুখটা এক পলক দেখল। বিড়ালের মতো ভয়ে নিচু তারা। ওদের অসহায় মুখটা দেখে পাখি আর না করল না। সে রাজি হলো। নতুবা সে এই বদমেজাজি লোকটাকে হারে হারে একটা শিক্ষা দিয়ে দিতো। বেদ্দব ব্যাটা। পুরো দুনিয়াটা যেন উনার বাবার টাকায় কেনা। অত্যন্ত ফাজিল! এমন একজন লোক নিখিল ভাইয়ের মতো ভোলাভালা মাটির মানুষের কাজিন হয় কি করে? সে বলল,
“আমি রাজি।”
নাওয়াফ চলেই যাচ্ছিল। ওর কথা শুনে থেমে গেল। উল্টো ঘুরে থাকা অবস্থাতে ঠোঁট টিপে আড়ালে বাঁকা হাসে। মুখটাকে পুনরায় গম্ভীর করে নিয়ে পিছু ঘুরিয়ে বলল, “নাউ স্টার্ট।” শেষ করেই হাত ঘড়িটা এক ঝলক দেখে রমিজকে আদেশ দিল, “একটা চেয়ার নিয়ে আয়তো।”
রমিজ আদেশ পাওয়া মাত্রই চেয়ার আনতে ছুটে গেল।
পাখি দু'হাত কানে তুলে নিল। চোখ মুখ মলিন তার। মনে অনিচ্ছুকতা। সে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বলে,
“নাওয়াফ ভাই, ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেন।”
লোকটা হাত পা নাড়িয়ে লম্বা আলসেমি ছাড়তে ছাড়তে বলে, “হয়নি। আবার কর। বল, নাওয়াফ ভাই আমরা ভুল করে ফেলেছি। আমাদের ক্ষমা করে দিন। এই ভুল যদি দ্বিতীয়বার করি, তাহলে আপনি আমাদেরকে ক্লাবে দুটো দিন নিয়ে ঝুলিয়ে রাখবেন।”
পাখির ইচ্ছে করল পৃথিবীর সবচেয়ে আতঙ্কবাজ বোমা ওই লোকটার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারতে। এতে যদি তার শরীরে একটু শান্তি লাগতো। নতুবা এমন বদজাত, ইতর কোন লোক হয়! পুরা এলাকাটা যেন তার সম্পত্তি। খাটাশ কোথাকার! তুই মরবি। আমার অভিশাপে একদিন ঠিকই ঠাডা পড়ে মরবি শয়তান লোক কোথাকার। তখন পাখির কথাটা ঠিকই মনে রাখিস। ওর ভাবুকের মধ্যে আবার শুনতে পেল,
“কিরে মৃধার মাইয়্যা, কথা কি কানে ঢোকেনি? উঁহু এটা তো খুব খারাপ কথা। বড়োদের কথা কানে ঢোকাস না। এটার জন্য আরেকটা পানিশমেন্ট পাবি।”
পাখি চট করে বলল, “আপনি কথায় কথায় এত পানিশমেন্টের কথা বলেন কেন? পানিশমেন্ট কি আপনার শশুরের সম্পত্তি?”
লোকটা ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে ফেলল। বলল,
“উঁহু না, এটা আমার নিজের সম্পত্তি। তোর মতো ভয়ংকর মহিলা মানুষের জন্য এটা ঠিক আছে। এখন জলদি কাজ শেষ কর। তোর মতো আমার এতো আজাইরা সময় নেই। কত কাজ আমার!”
পাখি আশ্চর্য হয়, গভীর আশ্চর্য! এমন লোকের সঙ্গে আজ দেখা হওয়াটা কি খুব বেশি জরুরি ছিল? কত সুন্দর একটা ঝকঝকে পরিবেশ ছিল! ছিল সুন্দর একটা মুহূর্ত! সব মাটি করে দিল।
সে ব্যর্থতা স্বীকার করে নেয়। মুখে বলে, “নাওয়াফ ভাই, আমরা ভুল করে ফেলেছি। আমাদের ক্ষমা করে দিন। এই ভুল যদি দ্বিতীয়বার করি, আপনি আমাদেরকে ক্লাবে দুটো দিন ঝুলিয়ে রাখবেন।”
“গুড।” বলেই লোকটা উঠে দাঁড়াল। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পাখির হাতটা ছো মেরে ধরে ফেলল। বলল,
"চল, আমার সঙ্গে।"
পাখি প্রাবল্যে চমকপ্রদ হয়। সে হকচকিয়েও যায়। চোখে মুখে তার অসংখ্য প্রশ্নের ছড়াছড়ি। অধর ফুঁড়ে বের হয়ে আসে, “যাব মানে? কোথায় যাব?”
“নিশ্চয়ই তোকে তোর শশুরবাড়ি যেতে ডাকিনি। আমার এত ফালতু সময়ও নেই যে, তোর শশুর বাড়ি খুঁজে খুঁজে তোকে দিয়ে আসতে যাব। নিজের শশুর বাড়ি নিজ দায়িত্বে নিজেই খুঁজে নে।”
পাখির মুখটা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। আল্লাহ..! আমারে বাঁচাও। নতুবা এই ভয়ংকর লোকটার ওপর ঠাডা ফালাও। যবে থেকে সে কাজিরহাট এসেছে। তার জীবনটা যন্ত্রণাময় করে তুলছে। তার মধ্যে গাল দুটোকে চড় মেরে মেরে চ্যাপ্টা বানিয়ে দিয়েছে। তার ভবিষ্যৎ বর গাল দুটো দেখে যখন প্রশ্ন করবে, ‘বউ এইটা গাল, নাকি পাটিসাপটা পিঠা?’ তখন সে কি জবাব দিবে? বলবে যে, ‘স্বামী গো আপনার বউয়ের গাল এক শয়তান ব্যাটা থাপ্পিড়ে থাপ্পিড়ে চ্যাপ্টা বানিয়ে দিয়েছে, ছ্যাহ্।’ এসব ভাবতেই তার বুক চিঁড়ে হতাশার বড়ো বড়ো সব শ্বাস বেরিয়ে আসে।
তরু পথিমধ্যে নাওয়াফকে বাঁধা দিয়ে বলে, “নাওয়াফ ভাই, পাখি তো ক্ষমা চাইছে। এবার অন্তত আমাদের যেতে দিন। আমাদের ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে।”
নাওয়াফ একটু দাঁড়াল। ঠোঁট কামড়ে বলে,
“আস্তে! তোদের এতো তাড়া কিসের? পিটি না করে প্রতিদিন পালাস তোরা। সেই বিচারও তো এখন বাকি।”
পাখির মাথায় হাত। চোখে মুখে তার গাঢ় তিমির নেমে এসেছে। ইচ্ছে আর তরুকে নাওয়াফ ইশারা করল।
“দুটোয় আমার পিছু পিছু আয়। আর এই যে মৃধার মাইয়্যা, আপনিও আসুন।” কথাটি শেষ করেই লোকটা হাঁটতে থাকে। পাখির হাত আর ছাড়েনি। ওকে হাত ধরে টেনে নিতে নিতেই পিটির শিক্ষর নাসির স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ক্লাব থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব বেশি একটা নয়। প্রায় দুই মিনিটের মতো।
পাখি, ইচ্ছে, তরু স্যারের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নাওয়াফ নাসির স্যারের উদ্দেশ্যে বলে, "এই যে স্যার, আপনার ছাত্রীরা যে রোজ পিটি না করে ক্ষেতে ক্ষেতে চুরি করে বেড়ায়, আপনি সে খবর রাখেন কিছু? এরা একদিনও পিটি করে না। পিটি না করে একজন এক একজনের ক্ষেতে হানা দেয়। আজ নিজ হাতে নাতে ধরেছি। বিচারটি চাইছিলাম আমি নিজেই করে দিতে। কিন্তু এদের এমন অবুঝ ভোলাভালা সুন্দর মুখখানা দেখে প্রচন্ড মায়া মায়া হলো। আমি আবার ভীষণ দয়ালু মায়ালু লোক। দয়ার শরীর আমার। দয়ার মন আমার। সহজে নারীদের প্রতি কঠোর হতে পারি না। আমি চেয়েও ওদের কঠোর শাস্তি দিতে পারি নাই। তাই আপনার ছাত্রীদের আপনার হাতে তুলে দিতে এলাম। এবার যা শাস্তি দেওয়ার, আপনি দেন।”
পাখি যেন আকাশ থেকে পড়ল। এর নাকি দয়ার মন, হ্যাঁহ্! এটা বুঝি এ বছরের তার শোনা সেরা জোকস ছিল। সবচেয়ে পাথরের মন এর। কি পরিমাণ মিথ্যুক! কানে ধরিয়েও সাধ মেটেনি। এখন আবার স্যারের কাছে শাস্তি দিতে নিয়ে এসেছে। আল্লাহ তোর মতো বেদ্দব ব্যাটার বিচার করুক, বিচার করুক, বিচার করুক।
“কিরে তুই কি আমাকে গালাগালি দিচ্ছিস?” বলেই নাওয়াফ পাখির দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে চাইল।
নাওয়াফের কথায় পাখির ভাবুক ভাঙে। পাখি সঙ্গে সঙ্গে অমত জানাল।
“না, না। আপনার মতো জনদরদি, দয়ালু, মায়ালু মনের একজন লোককে কি গালি দেওয়া যায়? তাহাদের হৃদয় তো অতি সুবিশাল। তাহাদেরকে তো মাথার ওপরে ছাদে তুলে রাখতে হয়।”
এটা প্রশংসা, না খোঁচা ছিল? লোকটার বুঝতে আর বাকি রইল না। সে ভ্রু ভাঁজ করে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফেলল। পাখির পাশ ঘেঁষে গিয়ে নীরবে দাঁড়ালো। ওর কানের কাছে দাম্ভিক মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল, “এটা একটু বেশি হয়ে গেল না? বাংলাদেশে কিন্তু তেলের দাম বেশি। তাই এতো বেশি তেল মারিস না। শেষে পা পিছলে পড়ে যাবি। আমি ছাড়া তোলার মতো কেউ থাকবে না। এমনিতে তোর শেষ ঠিকানা আমি। আর আমার কাছেই তোকে আসতে হবে। তাই যা করিস, বুঝে শুনে করিস। বুঝেছো আমার ময়না পাখি?”
(চলমান~)
#সে_আমার_সর্বনাশ! ২
#লামইয়া_তাসনিম।
(০১)