#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(০২)
কুয়াশার আস্তরন চিঁড়ে পাখি জারিফাকে নিয়ে মক্তবে এসেছে। মক্তবটি তালুকদারদের। তালুকদাররা এলাকার মধ্যে মস্ত বড়ো প্রভাবশালী। এলাকায় তাদের যথেষ্ট সম্মান আর নামডাক রয়েছে। তাদের বাড়ির সামনে ছোটখাট একটা মক্তব। সেখানে একজন হাফেজ থাকে। যে দশ পনেরজন ছেলেমেয়েকে আরবি পড়ায়। মক্তবের সামনে বিরাট বড়ো মাঠ। মাঠের পাশে শান বাঁধানো একটা বড়ো পুকুর আছে। ওটাও তালুকদারদের। মাঝেমধ্যে সিক্সপ্যাক দেহ বের নাওয়াফ ভাইকে দেখা যায় গোসল করতে। সেই সঙ্গে নিখিল, রমিজ ওরাও থাকে। বিশেষ করে গরমের দিনে এরা গোসল করে বেশি। জারিফা হলো পাখির ছোট খালা তাহিরার মেয়ে। বয়স মাত্র পাঁচ বছর। সবে প্লেতে পড়ছে। বেশ পাকা পাকা কথা বলতে জানে। পাখি ওকে একটা নাম দিয়েছে, ‘পাকা বুড়ি।’
জারিফা নাওয়াফ ভাইকে ডাকে, জানু বলে। নাওয়াফ ভাই ওকে আবার ছোট বউ বলে ডাকে। তাহলে এখানে প্রশ্ন দাঁড়াল কি, ওনার বড়ো বউটা কে? অপেক্ষা করুন সবই জানতে পারবেন। পাখির বাবা মা কেউ নেই। মা মারা গেছে তার জন্মের সময়। বাবা মারা গেছে যখন তার ১৩-১৪ বছর বয়স ঠিক তখন। অদ্ভুত! তার থেকে ঠিক ছমাস পর তার বড়ো ভাই ফাহাদটার রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হলো। অনেকে বলে দুর্ঘটনা, কিংবা আত্মহত্যা। যার সুষ্ঠ তদন্ত না থাকার কারণে ঘটনা ওখানে ধামাচাপা পড়ে থাকে। ফাহাদ, নিখিল, নাওয়াফ, আবুল স্যার এরা ছিল চার বন্ধু। এদের সখ্যতা যে দেখত, তারা বলতো এরা বন্ধু নয়, যেন একই মায়ের পেটের আপন চার ভাই। এমন সুমধুর সম্পর্ক ছিল তাদের। সেই বন্ধুত্বের সুমধুর সম্পর্ক ছিন্ন করে তার ভাইটা অপরিপক্ক বয়সে মারা গেল। দুবোনের মাঝে সে ছিল ভীষণ আদরের। বিশেষ করে ফাহাদ তাকে অনেক আদর করতো। প্রায় বছর এক হতে চলল সে গ্রামে এসেছে। আগে কুমিল্লা জেলা স্কুলে পড়তো। সেখান থেকে বরিশাল শহরে এসেছে। তার বড়ো বোন মুক্তি থাকে বড়ো খালা সুফিয়ার কাছে। মানে নিখিল ভাইদের কাছে। ওখানেই পড়ালেখা করে। এই তো এ বছরে ইন্টার পরীক্ষা দিবে। এরপরে নিখিল ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হবে। ওই কথা আগে থেকেই পাকা করা। নিখিল মুক্তিকে খুব পছন্দ করে। তাছাড়া সুফিয়ারও মুক্তিকে অনেক পছন্দ। নিজের বোনের মেয়েই তো। বাবা নেই, মা নেই। তাই আর দূরে পাঠানোর চিন্তা বাদ দিলেন। নিজের সন্তানের বউ করে বাড়ি রাখার চিন্তা করলেন। স্বাধীন আবার তার ছোট খালার ছেলে। বেশ ধান্দাবাজ সে। পাখির বিপরীত পক্ষ। সারাদিন তাদের মধ্যে একটা নীরব লড়াই চলে। শীতের সিজনে প্রতিদিন খুব ভোরে তালুকদার বাড়ির সামনে বড়ো মাঠটায় গোটা বিশ পঁচিশ জোয়ান ছেলেপেলেরা মিলে ফুটবল খেলে। তার মধ্যে স্বাধীন, নিখিল, আবুল স্যার আর ওই জাঁদরেল লোকটাকেও দেখা যায়। তার ছেলেপেলেরাও আছে। পাখির গায়ে বেগুনি রঙের একটা চাদর। আজ শীতের পোশাক পরেনি সে। আসার সময়ে কোন মতন তার খালা উঠিয়ে দিল। রোজ রোজ তার যেতে ভালো লাগে না। ওতো শীতে কেউ উঠে? তখন কম্বল মুড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকবে। তা না করে রোজ রোজ তাকে জারিফাকে নিয়ে মক্তবে আসতে হয়। আর রোজই ওই জাদরেল লোকটার মুখদর্শন দিতে হয়। তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলবে। খোঁচাটে একটা লোক। আপাতত জারিফা মক্তবের ভিতরে ঢুকে পড়ছে। সে মাঠ থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়ানো। শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। যা শীত পড়েছে, তাতে কুয়াশার কারণে একটা কাকপক্ষীও দেখা যায় না। কিছুক্ষণ পর সে টের পেল তার পাশে একজন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়িয়েছে। হাঁটুর উপরে প্যান্ট, গায়ে জার্সি পরা। ফরসা পায়ের কালো লোমগুলি দেখে পাখি একটা শুকনো ঢোক গিলল। মনে মনে সে একটা গালি দিয়ে বসল, “অশ্লীল একটা!”
পাখি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এমন ভান ধরে থাকে যেন, সে লোকটাকে দেখতেই পাইনি। নাওয়াফ ফোঁস করে দুটো শ্বাস ফেলে ওর উজ্জ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল, “জিমাইন্না মুরগি, এক গ্লাস পানি খাওয়াবি? গলাটা ভারি শুকনো শুকনো ঠেকছে।”
পাখি চরম মাত্রায় অবাক হয়। সে আড়চোখে লোকটার বাহ্যিক ভঙ্গিমা দেখে বলে, “আশ্চর্য! এখানে আমি আপনাকে পানি খাওয়াতে এসেছি? আপনার পানি খেতে ইচ্ছে হলে বাড়ি গিয়ে খান।”
লোকটা কিয়ৎপরিমাণ ওর বিরক্তসূচক মুখটার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে আনে। হুট করে সুঠাম দেহ নাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। ওর গা থেকে চাদরটি চট করে টেনে নিজের গলায় ঝুলিয়ে নিল। লোকটার অপ্রত্যাশিত আচরণে পাখি স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজেকে তার নিদারুণভাবে বোকা বোকা মনে হয়। সে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে নিল। মলিন মুখে বলল, “নাওয়াফ ভাই, রহম করুন। শীতে মরছি।”
লোকটা ঠোঁটজোড়া বাঁকিয়ে হাসে। হাসির ধরণটা দারুণ ছিল। নিঃসন্দেহে চমৎকারও বলা যায়। হাসলে মানুষকে বুঝি ওমন সুন্দর লাগে দেখতে! পাখি দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে নেয়। সুন্দর ছেলেদের দিকে তাকাতে নেই। এরা নাম্বার ওয়ান লম্পট হয়। লোকটা ভ্রুজোড়া স্বল্প কুঁচকে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে যায়। গাঢ় চোখে ওর মুখখানে তীক্ষ্ণ শকুনের মতন দেখতে দৃষ্টিজোড়া স্থাপন করে বলে, “পানি খাওয়ারে পাখি। প্রমিজ তোর গা গরম করার দায়িত্ব আমার।”
পাখি চোখ দুটো অধিক চমকে বড়ো বড়ো করে ফেলল।
“ছিঃ! এসব কি?”
“তুই পানি খাওয়াবি না?” বলেই লোকটা তীক্ষ্ণ চোখজোড়া ছোট ছোট করে ফেলল।
পাখি তার জেদে অটল।
“অসম্ভব! নিজের পানি নিজে এনে খান, নাওয়াফ ভাই। চাদর দেন, শীতে মরছি।”
“তুই কি চাস তোর গালটাকে সকাল সকাল আমি চ্যাপ্টা বানিয়ে দেই?”
পাখি অসহায় চোখে চাইল। মনে মনে কয়েকটা গালি ছুঁড়ে দিতে মন চাইল তার।
“অসভ্য লোক।”
একবার যদি তাকে ট্রাম অনুমতি দিতো, তাহলে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পাওয়ারফুল পারমাণবিক বোমাটি এই লোকটার মুখের ওপর ছুড়ে মারতো।
সে কাঁপতে কাঁপতে গেল পানি আনতে। মিনিট দুয়েক পর পানি হাতে ফেরত এলো। গ্লাস ভর্তি পানি লোকটার দিকে এগিয়ে দিল।
“নিন, আপনার পানি।”
“পানি এভাবে দিতে হয় পাখি?”
“আশ্চর্য! তাহলে পানি কিভাবে দিব আপনাকে? জামাই আদর করে দিব?”
লোকটা গম্ভির চিবুকে বলে, “ জামাই আদর করতে হলে করবি। তাতে আমি মাইন্ড করব না।”
পাখি বিষম খেলো। মাথায় হাত তার। বলে কি? লুচ্চা কোথাকার! সে বলে, “আপনাকে জামাই আদর করতে যাব কোন দুক্ষে? কোন জনমের জামাই হন আপনি আমার?”
লোকটা নীরবে ওর মুখপানে তাকিয়ে থাকে। ফট করে বলে ওঠে, “সব জনমের।”
পাখি নির্বাক। লোকটার চাহনি গাঢ়। পাখি মুখে ঝামা ঘষার মতন বলল, “আমি পারব না।”
লোকটা ভ্রু দুটো নাচাল।
“কি পারবি না?”
“আপনার মতন দামড়া ব্যাটারে পানি খাওয়াতে পারব না। ছোট হলে ভাবা যেত।”
“ওহ, তোর জন্য এখন বুঝি আমাকে ছোট হতে হবে?”
পাখি জবাব দেয় না। এতো কথা বলে মানুষ! এরে ভোট দিবে কারা? সে তো এক নম্বরেই দিবে না। দিবে কোথা থেকে? তার তো এখন পর্যন্ত এনআইডি কার্ডই হয়নি।
নাওয়াফ ওর দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকাল। পাখির একটু ভয় লাগল। সে কি বেশি বলে ফেলেছে? লোকটা আবার গাল ফাটিয়ে চড় বসাবে নাকি। বাপরে, চড়ের যা তেজ! একটা খেলে এক সপ্তাহ ধরে গাল ব্যথা করে।
নাওয়াফ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “তোর মতন ঢংগিরে বিয়ে করবে কে? শেষ পর্যন্ত আমার গলায়ই ঝুলবি।” শেষেরটুকু সে বিড়বিড় করে বলল। যা পাখি শুনেনি। লোকটা আবার বলে, “পানি খাইয়ে দে। তাহলে যা মানবতার খাতিরে এক টাকা দিব।”
পাখি এবার কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “নাওয়াফ ভাই, এবার কিন্তু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমি কিন্তু ওমন লোভি মেয়ে নই। টাকার লোভ আমায় দেখিয়েন না। আচ্ছা এক টাকায় পাওয়া যায়টা কি?”
“ছিহ পাখি, এক টাকা তোর কাছে কোন টাকা মনে হচ্ছে না?”
“আল্লাহ..! তা আমি কখন বললাম?”
“মাত্রই বললি। কথা ঘুরাবি মৃধার মাইয়্যা। তাহলে কান ধরিয়ে ফেলব।”
“আসছে শয়তান একটা!”
“মনে হয় গালি দিলি।”
বেশ করেছে। দরকার পড়লে আরও দুচারটা গালি দিয়ে মনের শখ মিটিয়ে নিব। তাতে তোর কি খবিশ ব্যাটা? মুখে সে অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল, “কখন?”
লোকটা ঠোঁট চেপে দুর্বোধ্য হাসে।
“পাখিরে তুই যে নদীতে রোজ পানি আনতে যাস, সেই নদীর মাঝি আমি। তাই তোর চেয়ে এক আঙুল হলেও বেশি জানি আমি। সেই আমার সঙ্গে পল্টি লস?”
পাখি থতমত খেয়ে বসল।
লোকটা আবার বলে, “এখন পানি খাইয়ে দে। চলে যাই। তোর মতন ফালতু এতো সময় নেই আমার।”
পাখি মুখের ওপর বলে দিল,
“পারব না।”
“পারবি না?”
“নাহ!
“আবার না বলতো।”
পাখি রেগে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “অত্যাচারী একটা!” বলেই সে লোকটার মুখের দিকে পানির গ্লাসটি এগিয়ে নিল। আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে লোকটার গভীর চোখ দুটোর দিকে তার নজর পড়ল। যারা এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তার সমগ্র শরীরে কম্পন ধরে গেল। নাওয়াফ ওকে শুধাল, “ওমন মৃগী রোগির মতন কাঁপছিস কেন?”
পাখি জবাব দিল না। লোকটা ওর মুখের ওপর ঝুঁকে যায়। ঠোঁট কামড়ে ওর মুখের ওপর সুগভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে নিয়ে বলে, “আমি স্পর্শ করার আগেই কাঁপছিস? তাহলে আমার গভীর স্পর্শ পেলে তুই কি করবি? বিশ্ব রেকর্ড করবি?” বলেই লোকটা পানি খেয়ে চলে গেল।
লোকটা যেতেই পাখি ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল। এতোক্ষণ এই শ্বাসটা সে গলার কাছে আটকে রেখেছিল। লোকটার ভয়ে ছাড়তে পারেনি। না জানি কখন আবার খোঁচা দিয়ে বসে। যেই খোঁচাটে লোক! তার হুশ আসে। তার চাদর নিয়ে যাচ্ছে তো লোকটা। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। পিছু থেকে চেঁচিয়ে ডাকে, “আরে এই নাওয়াফ ভাই, আমার চাদর নিয়ে যাচ্ছেন কই? অন্তত চাদরটি দিয়ে যান।”
লোকটা গলায় চাদর পেঁচানো অবস্থাতে মাঠে নেমে গেল। পাখির কথা যেন সে শুনেইনি। পাখি হতবাক।
সে এতো কষ্ট করে কল চেপে গ্লাস জোগাড় করে পানি খাওয়ালো এর বিনিময়ে, ছ্যাহ্। জাদরেল। অথচ তাকে একটা ধন্যবাদটুকু পর্যন্ত দিল না। অকৃতজ্ঞ একটা! কৃপণ একটা! বৃষ্টির দিনে বড়ো বড়ো ঠাডা পড়ে মর তুই। সে কাঁপতে কাঁপতে মাঠে নামল। সেখানে গিয়ে নিখিলকে ডাকল,, “নিখিল ভাই, ও নিখিল ভাই। নাওয়াফ ভাইকে বলুন না আমার চাদরটি দিয়ে দিতে। আমি শীতে মরছি।”
নিখিল এক পলক নাওয়াফের দিকে চাইল। নাওয়াফ আপাতত সিগারেট ফুঁকছে। খাড়া চুলগুলির ওপরে কুয়াশার পানিগুলি ঝরে ঝরে পড়ছে। তাতে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে গুরুতর মনযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেটটি। তা থেকে ছাইগুলো নিচে ঝরে ঝরে যাচ্ছে। গলায় পাখির সেই বেগুনি রঙের চাদরটি। নিখিল ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বলে,
“ওর হাতে যেহেতু চাদরটি একবার চলে গেছে, ওটা পাওয়ার আশা ছেড়ে দে। ও একবার যা নেয়, তা আর ফেরত দেয় না। আবার যা দেয়, তা-ও ফেরত নেয় না।”
“আমি যে শীতে মরছি।” পাখির গলা অসহায় শোনাল।
নিখিল বলে, “তুই আমাদের বাড়িতে যা। ওখান থেকে ইচ্ছে মুসকানের একজনের একটা শীতের পোশাক নিয়ে আয়।”
পাখি ভেবেছিল সেই রকমই কিছু একটা করবে। তার আগেই শুনতে পেল ভারিক্কি গলার পৌরুষ কণ্ঠস্বর।
“ওর কোথাও যেতে হবে না। এটা পরে নে।” বলেই তার হাতে থাকা লেদার জ্যাকেটটি দীর্ঘপেশি দেহের লোকটি পাখির দিকে এগিয়ে দিল। পাখি চিনে এই জ্যাকেটটি কার? সে মুখের ওপর স্রেফ বলে দিল, “আমি আপনার ওটা নিব না। ওখানে আপনার গায়ের গন্ধ লেগে আছে।”
নিখিল নীরব শ্রোতার মতন এদের কথা গিলছে। এমনিতে বাড়তি কিছু বলছে না। নাওয়াফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া গাঢ় করে নিয়ে পাখিকে শুধাল, “আমার শরীরের গন্ধ তোর পছন্দ নয়?”
পাখি মুখের ওপর ঠাস করে বলে দিল, “না, পছন্দ নয়।”
এটা সে সম্পূর্ণ মিথ্যে বলল। লোকটার পারফিউমের ঘ্রাণ বেশ ঝাঁঝাল। এত কড়া পারফিউম ব্যবহার করে যে, যেখান দিয়ে যায়, ঘ্রাণটি ছড়িয়ে যায়। তার তখন নেশা নেশা ধরে যায়। মাথা ঝিম ঝিম করে। নিজেকে দুর্বল দুর্বল মনে হয়।
লোকটা কিয়ৎক্ষণ নৈঃশব্দে সিগারেটটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁকে। ততক্ষণ ওনার গাঢ় দৃষ্টিজোড়া পাখির মুখপানেই নিবিদ্ধ ছিল। পাখি তাকায়নি ওই ধারালো দেখতে ছুরির মতন দৃষ্টিজোড়ার দিকে। লোকটা সিগারেটের বাকি অংশটুকু জুতার তলে পিষে নিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে নিজেই জোরপূর্বক পাখিকে জ্যাকেটটি পরিয়ে দিল। পাখি বাঁধা দিতে চেয়েছিল। বিনিময়ে লোকটা রক্তাক্ত চোখ দুটো দিয়ে এমন করে চাইল, যা পাখি আর কিছুই বলতে পারল না। জ্যাকেট পরানো হলে লোকটা চেইন লাগাতে গিয়ে উষ্ণ ঠোঁটজোড়া বাড়িয়ে পাখির কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সামান্য এই গন্ধ সহ্য করতে পারছিস না। যখন রাতের পর রাত আমার শরীরের নিচে পিষবি, তখন কি করবি?”
লোকটার কথা শুনে পাখির বুকটা অকস্মাৎ ধক করে ওঠল। পশমের গোড়া পর্যন্ত কাঁটা দিল। সে জামার একটু অংশ শক্ত হাতে খামচে ধরল। চোখ দুটো স্থির তার। যেন নিষ্প্রাণ। শিউরে ওঠল তার শরীর। এসব কি বলছে লোকটা? পাখিকে অবাক করে দিয়ে লোকটা আবারও বলল, “এই জ্যাকেট গা থেকে খুললে, তোকে এই শীতের রাতে পুকুরের জলে একশ একটা চুব দিব। দিব আর উঠাব, উঠাব আর দিব বুঝেছিস? সারারাত এমনই চলতে থাকবে। তখন তোর ওই জাদরেল খালু গিয়ে পা ধরে বসে থাকলেও কাজ হবে না। কথাটা মনে রাখিস।” বলে লোকটা লম্বাটে লম্বাটে পা ফেলে হেঁটে খেলার মাঠে নেমে গেল।
পাখি নিখিলের দিকে অসহায় চোখে তাকালো। নিখিল ঠোঁট টিপে হাসে।
“মেনে নে। জানিস তো ও লোকটা ওমনই। ওর কথা না শুনলে ওর প্রচন্ড রাগ হয়। ”
“তাই বলে এমন খান্নাসের মতন জোর করবে?”
নিখিল মৃদু হেসে সেখান থেকে খেলতে নামল। পাখি নীরবে হেঁটে আগের জায়গায় গিয়ে বসল। ওইদিকে নাওয়াফদের খেলা শেষ। সকলে মাঠে বসে গল্প করছে। পাখিকে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। যদিও কুয়াশা, তবুও স্পষ্ট বোঝায়। নিখিল নাওয়াফকে বলল, “তুই ওর সঙ্গে এমন করিস কেন? তোর এসব জোর খাটানো ও পছন্দ করে না।”
নাওয়াফ এই শীতের মধ্যেও মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। মাথার নিচে হাত দুটো রেখে পাখির দিকে তাকিয়েই জবাব দিল, “তাহলে কেমন করব, চুমাচুমি?”
নিখিলের মাথায় হাত। সে হতভম্ব। কির মধ্যে কি?
সে বলে, “আসতাগফিরুল্লাহ্! আসতাগফিরুল্লাহ্! আল্লাহ মাফ চাই। ছোট ভাই হিসেবে মাফ কর। আর জীবনে মুখ দিয়ে এসব বের করব না। তবুও ভাই ভালো, ওই চোপা দুইটা বন্ধ কর।”
নাওয়াফ ওর কথা গায়ে ঝাড়ার মতন ফেলে দিলো। বলল,
“করবি না কেন? তোর করতে হবে। একজন শালা হিসেবে তোর শোনার অধিকার আছে। আমি তো ভাবছি বাসর রাতে চুমু থেকে শুরু করে যা যা করব, সব তোকে ধৈর্য নিয়ে শোনাবো।”
“ভাই আমি তোর শালা না। পাখির বড়ো ভাই হই। শালা হবে স্বাধীন তোর।”
“তোকে সুমুন্দি মানে কে? শালাই ঠিক আছিস।”
নিখিল তর্কে গেল না। প্রসঙ্গ ঘুরাল।
“ওকে বিয়ে করছিস কবে?”
“আমার বাল! সর সামনে থেকে। মেজাজ খারাপ করিস না।”
“কেন কি হইছে?”
“ও কি কচি খোকা? বোঝে না কিছু? ফিডার খায়? ধরিয়ে দিব একটা মুখে? শালার ছোট দেখে কিছু বলতেও পারি না। আচ্ছা এই বয়স কি আমার একা একা থাকার বয়স? শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটে আমার। শরীর শীতের রাতে বউয়ের উম চায়। মনটা খালি বউ বউ করে। বউয়ের উষ্ণ আলিঙ্গন চায়। বালটায় বড়োও হয় না। বোঝেও না বাল। শালার মাথাটা নষ্ট হলে গেলে কবে জানি তুলে নিয়ে সোজা হাঙ্গা করে ফেলি।”
(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম।