#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(১০)
রাতের অন্তিমপ্রহর। হিমশীতল ঝিরিঝিরি বাতাসে গাছের কচি কচি পাতাগুলি নাড়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে ঠান্ডা আর মনোরম একটা আবহাওয়ায় মনটা ঝরঝরে অনুভব হচ্ছিল।
শেষের কাপের চা শেষ করে নাওয়াফ স্বাধীনকে তাড়া দিল, “চল ব্যাটা, সিদ কাটতে যাই।”
নিখিল হতবাক।
“হ্যাঁ রে তুই কি সত্যি সত্যি এখন আমার হবু শশুড় বাড়ির সিদ কাটবি? এতো বড়ো পাপি মন নিয়া তুই রাতে ঘুমাস কেমনে?”
“ঘুমাতে পারি না বলেই পাপ করতে চলে এসেছি। এখন তোর চোপা দুইটা আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধ কর।”
নিখিল আপাতত চুপ করেই রইল। স্বাধীন আর নাওয়াফ হাতে একটা পাত কোদাল তুলে মোল্লা বাড়ি মাটি খুঁড়তে গেল। পিছু পিছু নিখিলও গেল। স্বাধীন মাটি খুঁড়ছে। নিখিল সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বলে, “আরও দুজন এনে নে।”
“কথাটা মন্দ বলিসনি।” বলেই নাওয়াফ রমিজকে ফোন করতে যাচ্ছিল। নিখিলের মাথায় হাত।
“সর্বনাশ! তুই কি এখন সত্যি সত্যি তোর ছেলেদের এই শেষ রাতে সিদ কাটতে ডেকে আনবি?”
“অফকোর্স। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজকে মোটেও অবহেলা করা উচিত না।”
নিখিলের মাথা গোল গোল করে ঘুরতে লাগল।
“ভাই তুই ওদের ডাকিস না। মোজাম্মেল মোল্লা টের পেলে সোজা চোর মনে করে উত্তমমধ্যম দিবে। তারচেয়ে সর আমি করে দিচ্ছি।”
“পরবর্তীতে খোটা দিতে পারবি না কিন্তু। তাহলে ঠোঁট সেলাই করে দিব।”
“কাজও করে দিচ্ছি, আবার ধমকও শুনছি ফাও। এই নে তোর যাওয়ার রাস্তা রেডি।”
নাওয়াফ গোল গর্তটি দিয়ে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিল। পারছিল না। গর্তটি তুলনামূলক ছোট হয়ে গেছে।
“আরেকটু খোঁড়।”
“আল্লাহ দিলে পাঠার মতন একখান শরীরই বানাইছোস। খবরদার ওমন শরীর দিয়া আমার বোনটারে একটাও ঠেলা মারিস না। বেচারি আলু ভর্তা হয়ে যাবে। যে টুনির মতন একটা শরীর। শেষে বাতাসে উড়ে যাবে।”
নাওয়াফ নিখিলের পশ্চাদ্দেশে একটা লাথি বসালো।
“শালা ওটা পাঠা না, সিক্সপ্যাক বডি। পারিস ওমন বডি বানাতে? খেতে খেতে পেটটারে তো গুদাম ঘর বানিয়ে রেখেছিস। বউ যখন স্বামীর বদলে চাচাজান ডাকব তখন টেরডা পাবি। আপাতত ভিতরে যাচ্ছি। দুটোয় বাহিরে থাক। পাহারা দে। শালার খালা শশুড়ের তো আবার ডায়বেটিস। ঘন ঘন হিসুর চাপ ধরে। ওই ব্যাটারে কোন বিশ্বাস নেই।”
“সাবধানে যাস।”
“যুদ্ধ যাচ্ছি না ভাই।”
“মেয়েদের কাছে যাওয়া আর যুদ্ধে যাওয়া সমান কথা।”
নাওয়াফের থেকে আর ফিরতি জবাব এলো না।
নিখিল আর স্বাধীন বসে বসে বাহিরে পাহারা দিচ্ছিল। সঙ্গে সিগারেট টানছিল। নাওয়াফ পাখির রুমে ঢুকে পড়ল। ড্রিম লাইটের আলো রুমে মিটমিট করে জ্বলছিল। পুরো রুমটিতে মেয়েলি একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে পাখির পাশে গিয়ে বসল। হাতে ঝুরা মাটি লেগে আছে। সে হাতটা ঝাড়া দিল না। মাটি মাখা হাত দুটো দিয়ে পাখির আদুরে দুগালে মাটি লাগিয়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণ ওর আদুরে মুখটার দিকে নির্বিঘ্নে চেয়ে রইল। তৈলাক্ত পান পাতার মতন হলদে বরণ মুখটা। তার শান্তি বিনষ্ট করে কি শান্তির ঘুম ঘুমুচ্ছে? সে টেবিল থেকে একটা সাইনপেন হাতে তুলে নিল। পিছু হটে ওর পেট বরাবর থেমে গেল। মসৃণ পেটটার ওপর থেকে ধীরে ধীরে কামিজটা সরিয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হলো কামুকতার ন্যায় দেখতে মেয়েলি মসৃণ আদুরে পেটটি। ফরসা ত্বকটির ওপর কুচকুচে কালো তিলটি চিলিক মারছিল। সেই সঙ্গে পেটটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে একবার নিচে নামছে, আরেকবার উপরে ওঠছে। তার মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেলো। এতো কাছে, এতো! তবুও ওকে ছুঁতে না পাড়ার তার আক্ষেপ হচ্ছে। ইশ, ওই মসৃণ ত্বকে কুচকুচে তিলটার ওপর তার ওষ্ঠজোড়ার যদি আধিপত্য চালানো যেত, দাঁতের ঘর্ষণ চালাতো যেত! মনটা যে এতো নিয়ম বাঁধা মানে না। এক প্রকার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ওই যে নারী! নারী আর বাড়ি দুটো উপেক্ষা করা যায় না। সে সাইন পেনের নিপ খুলে হাতে নিল। সাইন পেনটি খুলে ওর পেটের ওপর কিছু একটা লিখল। নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে আবেগের বশে একটা কাজ করে বসল। ওই স্থানে উষ্ণ ঠোঁটজোড়া রাখল। পাখি ঘুমের মধ্যেই কেঁপে কেঁপে ওঠল। দুহাতে ভিজানার চাদর খামচে ধরল। নাওয়াফ উৎকণ্ঠার মাঝেও হেসে দিল।
“আমি তোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে করব বিচরন। চোখে চোখ, ঠোঁটে ঠোঁটের সন্ধি ঘটাব। আর সেদিন তোর হাত বিছানার চাদরে নয়, আমার চুলে থাকবে হার্টবিট।”
ওর পেটের ওপর হাতের আঙুলের কতক্ষণ নৃত্য চালালো। তর্জনী আঙুলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিঁখুত করে কিছু একটা আঁকলো। অথচ মেয়েটা টেরও পেল না। তার অজান্তে তার ঘরে পুরুষের উপস্থিতিও সে জানে না। এবার কামিজটা পেটের ওপরে নামিয়ে দিয়ে পাখির মাথার কাছে সে এসে বসল। ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে কিছুটা সময় ধরে নিঃশব্দে চেয়ে দেখল। পবিত্র একটা দেখতে ফুটন্ত গোলাপের মতন মুখ। মেয়েরা ঘুমুলে বুঝি ওমন সুন্দর লাগে! দাগহীন গালটা বড্ড তাকে টানল। লালচে ওষ্ঠজোড়া ক্ষণে ক্ষণে নড়ছিল। তাকে শ্বাসকষ্টে ভোগানোর জন্য ওসবই যথেষ্ট ছিল। ওর জামার গলাটা বেশ বড়ো। সেখান দিয়ে বিউটি বোনদের নিঃশব্দে চলাফেরা চোখে পড়ে। বিউটি বোনদের হাড্ডির পাশে আবার লালচে দেখতে একটা তিল। আবছা অন্ধকারের মাঝেও চিলটা যেন ঝলকাচ্ছিলো। সে ভারী ভারী শ্বাস ফেলে। আজ কঠিনভাবে সে ফেঁসে যাচ্ছে। এতো এতো গোপন জিনিস সব একদিনেই চোখে ধরা দিতে হলো! সে ভারী ভারী শ্বাসগুলি ফেলে পাখির কর্ণের কাছে মুখটা নিয়ে বলল, “আমাকে মন্দ বানানোর জন্য তোর ওই তিলগুলোই যথেষ্টরে পাখি। আমি না বড্ড উন্মাদ হচ্ছি। তুই কি শুনতে পাচ্ছিস? পাচ্ছিস না? আমাকে জ্বালাতে তো ভালোই পারিস। আমিও তোকে জ্বালাব। ভীষণ ভীষণ। রাতের পর রাত। বিয়ের পর প্রতিটা রাত তোকে আমার জ্বালানি সহ্য করতে হবেরে পাখি। পারবিনা কলিজাটা? তোকে পারতেই হবে। আমি উন্মাদ। তোর প্রেমে উন্মাদ। এই উন্মাদ তুইয়েই করেছিস। তাই তাকে সামলানোর দায়িত্বও একমাত্র তোর। আমি বেপরোয়া পাখি। অর্ন্তমুখী মানুষ। কিন্তু তুই বললে বেপরোয়া স্বভাব ছেড়ে দিব। এখন শান্তিতে ঘুমা। বিয়ের পর তো আর আমার জ্বালায় তখন ঘুমাতে পারবি না। আর তো মাত্র ক’টা দিন? এরপরে তুই আমার ঘরের চাঁদ হয়ে আলো ছড়াবি। আর আমি হব সেই চাঁদের একমাত্র মালিক।”
একটু থামল সে। জিভ দিয়ে পুরুষ্ঠ নরম ওষ্ঠজোড়া ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলল, “ তুই আমার ঘরের চাঁদ হয়ে আলো ছড়াতে চলে আসিস। আমি বিস্তৃত আসমান হয়ে বুকে তোকে ঠাঁই দিব।”
কথাগুলি দু ঠোঁট ফাঁক করে বিড়বিড় করে বলছিল সে। আবারও একটা গ্যাপ নিয়ে কিছুটা সময় থামল। মেয়েটার ঘুম বেশ গাঢ়। ঘুমালে আর আশপাশ খেয়াল থাকে না। ওর লালচে ওষ্ঠাজোড়া তাকে চুম্বকের মতন টানছিল। তার শ্বাসগুলি আবারও ঘন ঘন ভারী ভারী হয়ে আসছিল। মানতেই হবে, শালার নারী জাতি একটা জিনিসই। যতই এড়িয়ে যেতে চাই, ততই ম্যাগনেটের মতন টানে। সে ঠোঁটজোড়া পাখির ঠোঁটের কাছাকাছি নিয়েও সরে এলো। ওর ঠোঁটের মাঝখানে তর্জনী আঙুল রেখে বলল, “উঁহু না, এখন এসব দুষ্টুমি করব না। যেদিন বিয়ে করব, সেদিনই এখানে আমি প্রথমবার সিল মেরে দিব প্রমিজ। এর আগে কন্ট্রোল হারিয়ে করে দিলে মাফ করে দিস। তোকে বড্ড দেখার জন্য মনটা আমার ছটফট করছিল। আমি সবকিছুর তৃষ্ণা সইতে পারিরে পাখি। কিন্তু তোর তৃষ্ণা আমি সইতে পারি না। এই দেখ না, পানির তৃষ্ণা জিভটা কেমন করছে। কিন্তু খাওয়ার প্রতি আগ্রহ পাচ্ছি না। আর তোর তৃষ্ণায় বাসায় দুদণ্ডও থাকতে পারিনি। উন্মাদের ন্যায় ছুটে এসেছি। সিদ কেটে তোর ঘরে প্রবেশ করেছি। কতটুকু উন্মাদ করেছিস তুই আমায় এবার ভাব! তুই আমাকে পাগল বলতেই পারিস পাখি। আমি মাইন্ড করব না। কিন্তু তোকে স্বীকার যেতে হবে আমার সব পাগলামির অংশিদারী তুই। আপাতত আসি জান।” শেষ করেই সে একটুখানি হাসল।
পাখির দুগালে দুটো গাঢ় করে চুমু এঁকে দিল। শেষ বারের মতন ওকে এক পলক দেখে সামনের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখল মোজাম্মেল মোল্লা নাক টানছেন সুরের মতন করে। ওমন শব্দে আশপাশে চোর ভুলেও আসবে না। নাওয়াফের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি আঁকল। সে গিয়ে খাটের পাশ থেকে সরিষার তেল নিয়ে মোজাম্মেল মোল্লার নাকের ফুটোর ভিতরে তেল ঢেলে দিল। এবার দ্বিগুণ গতিতে কুকারের সিটি বাজানোর মতন শব্দ হচ্ছে। নাওয়াফের ভীষণ হাসি পেল।
“বাহ! তখনকার চেয়ে এবারের শব্দ তো দারুণ হচ্ছে।”
পাশের রুম থেকে তাহিরা চেঁচিয়ে ওঠল, “টাকলা ব্যাটা, নাক টানা বন্ধ কর। নইলে নাকের ফুটোর মধ্যে পানি ঢালমু কিন্তু।”
তাহিরার ডাক মোজাম্মেল মোল্লার কর্ণ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা সে নাক টানতেই ছিল। তাহিরা শেষে বিরক্ত হয়ে উঠে গেল। কি একটা বুড়ো ব্যাটার সঙ্গে বিয়ে হলো তার? দিন নাই, রাত নাই। সারাদিন বাঁশির মতন সুর টানতেই থাকে। সে পাশের রুম থেকে উঠে গিয়ে এক মগ পানি মোজাম্মেল মোল্লার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল।
মোজাম্মেল মোল্লা ধড়ফড় করে ঘুমন্ত অবস্থায় লাফিয়ে ওঠল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে? মুখে পানি মারলা কেন তাহু?”
তাহিরা মুখ খিঁচিয়ে বলল,
“আপনার নাক টানার জ্বালায় ঘুমাতে পারছি না। নাকের মধ্যে দেড় মণ তেল ঢুকিয়ে কেউ ঘুমোয়? বুইড়া একটা খাটাশ জুটছে কপালে। দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা শুধু সুর টানে। নাক না, যেন সুরের একটা বাঁশি।
মোজাম্মেল মোল্লা মনে মনে ভাবছে, সে কখন নাকে তেল ঢালল। ভালো করে নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখল নাক দিয়ে পানির মতন তেল পড়ছে। তার দৃষ্টিজোড়া অবিশ্বাস্য। এ কাজ করলটা কে? সে তো নাকে তেল দেইনি। তাহলে? নিশ্চয়ই এটা তার অবাধ্য সন্তান স্বাধীনের কাজ। ওর মা-টা তো মন মতন হলোই না। ছেলেটাও আরো এক ধাপ এগিয়ে। না এরা কোনদিন মানুষ হবে না।
নাওয়াফ আড়াল থেকে ঠোঁট টিপে হাসল। সে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই বেরিয়ে গেল।
_____
সকাল সকাল মেইন দরজার সামনে পাঁচ পাঁচটা মিষ্টির প্যাকেট দেখে মোজাম্মেল মোল্লার মাথাটা ঘুরে গেল। এমন সর্বনাশি কাণ্ডটা করলটা কে? মিষ্টির বাক্সের পাশে ছোট্ট একটা চিরকুট ছিল। সঙ্গে দুটো লাল টকটকে গোলাপ। চিরকুটটি হাতে নিতেই দেখল সেখানে চিরকুটের ওপরে লিপস্টিক দিয়ে দুটো চুমুর ইমুজি ঠোঁট এঁকে দেওয়া। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “ ছিহ, এসব কি? আসতাগফিরুল্লাহ,আসতাগফিরুল্লাহ। এসব কুকাম কোন লুচ্চাটায় করল?”
বক বক করতে করতে সে চিরকুটটি মেলে ধরল। সেখানে গুটি কয়েক অক্ষরে লেখা..
জনাবে টাকলা শশুর আব্বা,
সকাল সকাল আপনাকে আমার লাল সালাম। কি ভাবছেন চুমু দুটো আপনাকে দিয়েছি? আরে ধুর, ওটা তো আপনার মেয়েকে দিয়েছি। জানেন, আমার একটা অসুখ হয়েছে। মরমরে অসুখ। এই অসুখ ততক্ষণে ভালো হবে না, যতক্ষণ না ঘরে বউ আসবে। বুঝুন ঠেলা। এজন্য ভাবলাম বিয়েটা এবার আল্লাহর নাম নিয়ে করেই ফেলি কি বলুন? আমি আবার শুভ কাজে দেরি করি না। টাকলা শশুর আব্বা, আপনার কন্যাকে আমি বিবাহ করতে চাই। পাত্র হিসেবে আমি মোটেও মন্দ নই। বিশ্বাস করুন আমার দেহ, দিল, মন সব ভালো। কোন নষ্ট নেই। বসন্তের কোন মৌমাছিও সেখানে বসেনি। মধু সংগ্রহ করেনি। চাইলে আপনি চেক দিতে পারেন। আমি মাইন্ড করব না। কিন্তু কন্যা আপনাকে দিতেই হবে। না দিলে সোজা খেল খতম। তুলে নিয়ে যাব।
ইতি
আপনার একমাত্র নাটুস পুটুস জামাই সাহেব।
মোজাম্মেল মোল্লার এতটুকু পড়েই প্রেশার উঠে গেল। গোল গোল করে মাথা ঘুরছে। ছিঃ! ছিঃ! তার অতটুকু দুধের শিশু মেয়েটার ওপর কোন বদজাতের নজর পড়ল? এদের ভিতরে কি মানবিকতা নাই? বিবেকের ওপর কুত্তায় মুতছে? সে মাথায় বরফ ঘষছে আর এসব হাঁটছে। এতো বড়ো দুঃসাহস কার! তার বাড়িতে কিনা বিয়ের প্রস্তাব পাটাচ্ছে। তাও নাম গোপন করে, ছ্যাহ। আবার হুমকিও দিচ্ছে। সে ওসব হুমকিতে ভয় পায় নাকি। সে আজই থানায় ফোন করবে। হাঁটার মাঝে তার চোখজোড়া গিয়ে পড়ল বাড়ির পিছনে। সেখানে বাড়ির পিড়ার মাটি খুঁড়া। সে চিৎকার করে ওঠল, “হায় হায়রে! সর্বনাশ হয়ে গেল। তাহু কই তুমি? দেখে যাও চোরে কি কারবারটা করছে? আমার সর্বনাশ করে দিছে গো। এসব কি ঘটছে আমার সঙ্গে? সকাল সকাল ঘরের সামনে মিষ্টি। ঘরের পেছনে মাটি খোঁড়া।”
মোজাম্মেল মোল্লার চিৎকারে পাখির ঘুমটা ভেঙে গেল। সে একপ্রকার বুকে হাত দিয়ে ধড়ফড় করে লাফিয়ে ওঠল। বুকে কোন রকম ওড়না দিয়ে দ্রুত দরজা খুলে বাহিরে বের হলো। মোজাম্মেল মোল্লাকে চিৎকার চেঁচামেচি করতে দেখে সে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে শুধাল, “কি হয়েছে খালু? আপনি সকাল সকাল চ্যাঁচাচ্ছেন কেন?”
“চ্যাঁচাচ্ছি কারণ আছে। দেখ মা, দেখ। চোর সিদ কেটে ঘরে ঢুকেছে। অথচ আমরা কেউ জানি না।”
পাখি নিজেও অবাক।
“আরে হ্যাঁ, এ তো সত্যি সত্যি ঘরের মাটি খুঁড়া।”
এরমধ্যে তাহিরা বটি হাতে ওখানে এলো। এসেই ঝাঁঝাল গলায় প্রশ্ন করল, “কি হয়েছে এখানে?”
“দেখো, তাহু ঘরের মাটি খুঁড়ে চোর ভিতরে ঢুকে গেছে। আমার সবকিছু চোরে নিয়া গেছে।”
তাহিরার ঠোঁট দুটি বিস্ময়ে ছড়িয়ে যায়।
“চোর ঘরে ঢুকছে? কই টের পেলাম না তো। জিনিসপত্রও উলটপালট দেখলাম না। তাহলে এ কেমন চোর!”
মোজাম্মেল মোল্লা বলল, “তুমি চোরের সাবজেক্ট বাদ দেও। আগে আমার সঙ্গে এসো।” বলেই সে হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
তাহিরা প্রচন্ড রেগে গেল। কাজের নেই অভাব। তার মধ্যে হাত ধরে টানছে। সে বলল, “আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? চুলায় রান্না আছে।”
“আগে আসো না।”
তাহিরাকে টানতে টানতে মোজাম্মেল মোল্লা সামনের ঘরে নিয়ে এলো। পাখিও কৌতূহল বশত পিছু পিছু গেল।
মোজাম্মেল মোল্লা আঙুল তাক করে দেখাল।
“দেখো ওসব কি? কোন বদমাশটা যেন সকাল সকাল দরজার সামনে মিষ্টি আর চিরকুট রেখে গেছে। আবার আমাকে হুমকিও দিচ্ছে। মেয়ে বিয়ে না দিলে, সোজা তুলে নিয়ে যাবে। তুমিই বলো, আমার মেয়েটা ছোট। তাকে কি এই বয়সে বিয়ে দেওয়া যায়? জানি না কোন বদমাশটার আমার অতটুকু মেয়েটার ওপর নজর পড়েছে। সামনে পাইলে ওর চোখ দুটো তুলে আমি ফুটবল খেলতাম।”
তাহিরা মোজাম্মেল মোল্লার কথাগুলি কানে ঢুকাল না। সে ধীরে ধীরে মিষ্টির প্যাকেটের ওপর থেকে চিরকুটটি নিয়ে পড়ল। চিরকুটটি পড়া হয়ে গেলে সে নীরবে মুচকি মুচকি হাসল। মনে মনে বিড় বিড় করে বলল, “ফাজিল একটা!”
সে মিষ্টির প্যাকেট পাঁচটি হাতে করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছিল। মোজাম্মেল মোল্লার চক্ষু দুটো বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে এলো। তার বউয়ের হয়েছেটা কি? পাগল হলো নাকি! সে পিছন থেকে ডেকে বলল, “আরে করছোটা কি? মিষ্টি ঘরে নিচ্ছো কেন? সব ফেলে দেও। ওর সঙ্গে কিছু মিশানো থাকতে পারে। কি না কি উদ্দেশ্য করে দিয়েছে?”
“যেই উদ্দেশ্যে দিয়ে থাক। মিষ্টি আমি খাব। তোমার কোন সমস্যা?”
বউয়ের তর্কের কাছে মোজাম্মেল মোল্লা হার মানলেন। নারী জাতি এই এক বেতালা। তারা যেটা মনে করে সঠিক। ওটাই সঠিক। বাকি সব ভুল।
মিষ্টির প্যাকেট ফ্রিজে রেখে তাহিরা বাটন সেটটি হাতে তুলে নিল। ফোন ঘাটাঘাটি করে একটি নম্বরে কল দিল। ফোন রিসিভ করে অপর প্রান্তে থাকা পুরুষটি কানে চেপে ধরল। ঘুম ঘুম জড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “সকাল সকাল ফোন করেছো কেন?”
তাহিরা খানিকটা রেগে বলল, “সকাল সকাল আমার জামাইটারে জ্বালাতে গেলি কেন? ব্যাটার এমনিতে হার্ট দুর্বল। মরে টরে গেলে হবেটা কি?”
“তোমায় ধরে আরেকটা বিয়ে দিয়ে দিব।”
“চড় খাবি ফাজিল। শাশুড়ির সঙ্গে বাঁধরামি! কাজি নিয়ে আয়। নিজের বউ নিজে বিয়ে করে নিয়ে যা। তবুও রাতে সিদ কেটে ঘরে এসে আমার স্বামীর হার্ট ফুটো করে আমাকে বিধবা করে দিস না।”
“আমার বাবা কিন্তু খুব স্মার্ট। চাইলে আসতে পারো। সিট খালি আছে। আমার মানতে কোন আপত্তি নেই।”
“চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব। ফোন রাখ।”
নাওয়াফ হাসতে হাসতে আবার বলল, “ভেবে দেখো প্রস্তাবটি কিন্তু মন্দ নয়।” তাহিরার থেকে পরবর্তী উত্তর আসার আগেই নাওয়াফ খট করে লাইন কেটে দিল। জানে এখন বোমা ফাটবে। ভেবেই সে মুচকি হাসল। রাতের সিনটা আবারও মনে পড়ে গেল। ওই মসৃণ তুলতুলে পেট। নাভির কাছাকাছি একটা লাল তিল। ওসব দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতেই মাথাটা সকাল সকাল ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠল। ইশ, তাকে মাথা নষ্ট পুরুষ বানিয়ে ছাড়বে এ নারী।
_____
পাখি চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখল তার দুগালে শুকনো মাটি লেগে আছে। সে ভারি আশ্চর্য হলো। তার গালে মাটি এলো কি করে? কই রাতে যখন ঘুমাতে গিয়েছিল, তখন তো ছিল না। ঘটনার সমীকরণ ঠিক মিলছে না। সে কামিজের একাংশ দিয়ে গাল দুটো মুছে নিয়ে কামিজের কোণাটি ছেড়েই দিচ্ছিল। তখনই তার মৃগ চোখজোড়া পড়ল গিয়ে নিজের পেটের দিকে। নাভির নিচে কালো কালি দিয়ে ইংরেজিতে মোটা করে লেখা, “লাভ ইউ, হার্টবিট।”
লাইনটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের সমগ্র কোষগুলি নাড়া দিয়ে গেল। বুকটা আকস্মিক ধক করেও ওঠল। সে সকাল থেকে একের পর একটা ঘটনার সমীকরণ মিলাতে লাগল। সবগুলো এক সঙ্গে চিহ্নিত করার পর তার মাথায় শুধু একটা উত্তরই বের হলো। আর সেটা হলো..
না সে মুখে উচ্চারণ করবে না। তবে লোকটা এমন কেন? মাঝরাতে কেউ সিদ কেটে একজন বিবাহ উপযুক্ত নারীর ঘরে ঢুকে? না জানি তার সঙ্গে আর কি কি করেছে? সে আজই খালামণির কাছে বিচার দিবে। না না থাক। ওনার বোনের কাছে দিবে। খালামনির কাছে দিলে উল্টো সে ধমক খাবে। বিশ্বাসও করবে না। আপাতত হাত মুখ ধুয়ে এসে সে রেডি হয়ে নিল। আজ আর নাস্তা করল না। ইউনিফর্ম পরে নিখিলদের বাড়ি গেল ইচ্ছেকে ডাকতে। তখন লোকটার সঙ্গে দেখা হলো। লোকটাকে দেখা গেল সাদা পাঞ্জাবি পরে নায়ক সেজে কোথাও একটা রেডি টেডি হয়ে যাচ্ছিল। একটা কথা মানতেই হবে, তিনি যা পরেন, তাতেই মাশাআল্লাহ সুন্দর মতন করে মানিয়ে যান। তখন মনে হয় ওই রঙটি, পোশাকটি একমাত্র তার জন্যই যেন তৈরি হয়েছে। এতো ভালো লাগে। লোকটা পাখিকে দেখে মাঝপথে ধুম করে থেমে গেল। পিছু ঘুরে ওর মুখটার দিকে এক পলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “দেখ তো সবকিছু ঠিক ঠাক আছে কিনা?”
পাখি চোখ দুটো কুঁচকে নিল। পরক্ষণে চোরা চালানিতে দৃষ্টিজোড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার বুলিয়ে নিল।
“হ্যাঁ, ঠিকই তো আছে। কিন্তু হাকাইয়া হুকাইয়া একেবারে নায়ক সেজে কই যাচ্ছেন? বিয়ে করতে বুঝি?”
“জি না। ভোট চাইতে যাচ্ছি। আগামীকাল থেকে তুইও ভোট চাইতে নামবি। পারবি না? আচ্ছা একটা ভালো দেখে শ্লোগান দে তো।”
পাখি নরম ঠোঁটজোড়া উল্টে বলল,
“আমি শ্লোগান দিতে পারি না।”
“পারিস না?”
“না।”
“যা পারিস তা দে।”
“আবার মারবেন না তো?”
“শ্লোগান পছন্দ হলে মারব কেন? যা পাঁচশত টাকা তখন অগ্রিম বকশিস দিবনে।”
“পাঁচশত টাকা লাগবে না। বানিজ্য মেলায় ঘুরতে নিয়া যাবেন তাহলেই হবে।”
“আমি কি তোর স্বোয়ামি লাগি? তুই কি আমার বউ লাগিস তোকে নিয়া যে মেলায় ঘুরতে যেতে হবে?”
“বোন তো হই।”
“লাথি দিয়ে দাঁতের বারান্দা ফেলে দিব শয়তাইন্না বদমাশ বেডি। সকাল সকাল আমার সাদা রঙের ধলা মনটাই পুরা নষ্ট করে দিল।” বলেই নাওয়াফ হনহনিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছিল।
পাখির বেশ মজা লাগল। সে ঠোঁট টিপে হাসে। ওনাকে আরেকটু জ্বালাতে পিছু থেকে ডেকে বলল, “আহা! রাগ করেন কেন? শ্লোগান শুনবেন না?”
“তোর শ্লোগান তুই শোন।”
“আরে শুনুন না? সিল মারব ভাই কোনখানে? নাওয়াফ ভাইয়ের মাঝখানে।” বলেই পাখি হি হি করে হেসে দিল।
নাওয়াফ রাস্তারপাড় থেকে একটা ভাঙা ইটের টুকরো হাতে তুলে নিয়ে পাখির দিকে তেড়ে যাচ্ছিল। নাওয়াফকে ইট হাতে তার দিকে তেড়ে আসতে দেখে পাখি দিল দৌড়।
“ওরে মাগোরে।”
দৌড়াতে দৌড়াতে সে মুখ দিয়ে জোরে জোরে উচ্চারণ করতে লাগল, “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ্জালিমীন। পালাও গো, পালাও। সিডর আসতেছে। বিপদজনক দ্রুতগামী সিডর।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম।