#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(১১)
সেই যে পাখি লোকটার হাতে ধাওয়া খেয়েছিল, আর দুটো দিনের মধ্যে ভুলেও সে সামনে পড়েনি। সেচ্ছায় কে বাঘের মুখে পড়তে চায়? লোকটা ইদানীং ভোটের কাজে বিভিন্নভাবে ব্যস্ত থাকে। রাজনৈতিক বিষয় বলে কথা। ব্যস্ত তো থাকবেই। বিকালের দিকে রমিজের কাছে সে এক হাজার পোস্টার ছাপাতে দিয়েছিল। রমিজ ঘণ্টা দুই পরে পোস্টার হাতে ফেরত এলো। নাওয়াফ তখন চেয়ারে বসে সিগারেট টানছিল। এলাকার দুটো বখাটে মেয়েদের বিরক্ত করছিল। তার কাছে সেসব নিয়ে বিচার এসেছে। ছেলে দুটোকে উপরে পা নিচে মাথা দিয়ে টানিয়ে রাখা হয়েছে। আপাতত আগামীকাল কোন কোন গ্রামে ভোট চাইতে যাবে সেসব লিস্ট করছিল। তার ছেলেপেলেদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল। রমিজ সেসময়ে সালাম দিয়ে থাইগ্লাসের দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকল। বলল, “ভাই ব্যানার আর পোস্টার ছাপানোর কাজ শেষ।”
নাওয়াফ তখন কাগজে কিছু একটা লিখছিল। লিখতে লিখতে বলল, “ওইগুলো রাস্তায় রাস্তায় টানিয়ে দে।”
রমিজ মাথা ঝাঁকাল, “আচ্ছা।”
নাওয়াফ লেখার মাঝে হাত থামিয়ে রমিজকে পিছু থেকে ডাকল, “এই দাঁড়া। দেখি তো পোস্টার কেমন এসেছে?”
রমিজ পিছু ঘুরে পোস্টার এগিয়ে দিল।
“নিন।”
নাওয়াফ পোস্টার নিয়ে জোরে জোরে পড়তে লাগল,
“২নং লতা ইউনিয়নে আসন্ন নির্বাচনে যৌননেতা...।”
এতটুকু পড়েই নাওয়াফ থেমে গেল। রাগের আধ্যিক্যে তার রক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠল। রমিজের জিভের মাথায় আপনা-আপনি কামড় বসে গেল।
“খাইছে সর্বনাশ! এসব আকাম কখন ঘটলো? নিশ্চিত সাফিইন্নার কাম এইটা। শালায় উল্টা পাল্টা লিখে তাকে ফাঁসিয়ে দিল।”
সে দ্রুত মাথা ঢেকে পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নাওয়াফের তীক্ষ্ণ গভীর দৃষ্টি হচ্ছে শকুনের দৃষ্টি। সেই সূক্ষ্ম দৃষ্টি থেকে বাঁচা এত সহজ নয়। যেখানে এলাকায় একটা কুকুর প্রবেশ করলেও তার দৃষ্টিগোচর হয় না। কারোর পায়ের নিঃশব্দ শব্দ শুনেও সে বলে দিতে পারবে লোকটা কে? সেই তাকে ফাঁকি দেওয়া এতো সহজ ব্যাপার নয়। সে অতটুকু পড়েই ললাট কুঞ্চিত করে নিল। ললাট ঘষতে ঘষতে পা দুটো নাচাতে নাচাতে পিছু থেকে রমিজকে ডেকে বলল, “পালাস কেন? এইদিকে আয়।”
রমিজ ঠোঁট উল্টে কাচুমাচু করে মলিন মুখে বলল, “না ভাই, আপনি মারবেন।”
“আহা মারব না। আয় না।”
রমিজ ভয়ে ভয়ে পা দুটো চালিয়ে গেল। নাওয়াফ ওকে আদেশ দিল, “নিচে বোস।”
“কেন ভাই?”
“প্রশ্ন করিস আবার? একদম চোখ তুলে ফেলব। নিচে বসতে বলেছি তোকে।”
রমিজ এবার ভীতকরণ অন্তরে খানিকটা কাচুমাচু করে ভয়ে ভয়ে নিচে বসে পড়ল। নাওয়াফ রমিজের চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল। রমিজ তখনো জানতো না তার সঙ্গে কি ঘটতে যাচ্ছে? কিছুক্ষণের মাথায় সে টের পেল তার চুলের গোড়ায় ব্যথাতুর যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে। লোকটার হাতের মুঠোয় তার চুল। লোকটা ওর চুল টানতে টানতে বেশ শান্ত স্বরে বলে, “পোস্টার ছাপানোর আগে বলিনি ভুল যেন না হয়? যুব নেতার জায়গায় যৌন নেতা দিয়েছিস। শালার মানইজ্জত তোরা খাবি। এই পোস্টার জনগণের সামনে পড়লে ভোট পামু ব্যাটা? জনগণ পাশে থাকবে আমাদের? সোজা মুখের ওপর থু থু ছুঁড়ে মারবে।”
রমিজ কোন জবাব দিতে পারল না। মাথাটা নিচু তার। নাওয়াফ ধমক দিয়ে আবারও বলল, “ আমার বাল ছাপাও শালা। দুই টাকার কাজও ভালো করে করতে পারিস না। পাছা পিটাইয়া একেবারে লাল বানাইয়া দিমু। যা দ্রুত চেইঞ্জ করে আন।”
রমিজ নত মুখে বলল, “মাফ করেন ভাই। আমি এখুনি পাল্টাইয়া আনতেছি।”
“তোর ভাবির খবর কি? দুদিন হলো তোতা পাখির মতন মুখটা দেখি না। ভয়ে পড়তেও আসে না।”
“গতকালও স্কুলে দেখলাম।”
“আবার দেখা হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।”
“ঠিকাছে।”
_____
মাথা বরাবর ঠিক সূর্যটা। গরম ভালোই পড়েছে। বাতাসের ছোঁয়াও নেই বললেই চলে। মাথার কাছটাতে শিমুল গাছে বসে কাকটা উতপ্ত দুপুরে কা কা করে ডেকে যাচ্ছিল। নাওয়াফ তখন উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছিলো। গতকাল রাতে ইলেকশনের চক্করে তার ঘুম হয়নি। যার ফলসরূপ দুপুরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল। ফাতিহা নুর বক্স ভর্তি খাবার নিয়ে ট্রি-হোমের ভেতরে ঢুকলেন। গত কয়েকদিন যাবৎ ছেলেটা বাসায় আসে না। আগে তো মাঝে মধ্যে বাসায় এসে খেয়ে যেতো। এখন তাও না। ওমন রাজপ্রসাদের মতন ঘরবাড়ি ছেড়ে বনে জঙ্গলের মধ্যে এসে সন্ন্যাসী সেজে পশুপাখির সঙ্গে থাকছে। কত বুঝিয়েছে! বাড়ি চলে আয়। শোনেনি তার কথা। একদম বাপের মতন ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। জানলাগুলিও এখন অবধি খোলেনি। ফাতিহা নুর ছেলের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। এই ছেলে মানুষ হবে আর কবে? সে জানলার ভারী সফেদ পর্দাগুলি সরিয়ে জানলাগুলি খুলে দিল। পুরো ঘরটা এখন আলোতে ঝলমল করছে। কয়েক মুঠো হিমেল বাতাস এসে নাওয়াফের চুলগুলি নাচিয়ে গেল। ফাতিহা নুর নাওয়াফের পাশে গিয়ে নিঃশব্দে এবার বসলেন। ছেলেটা বাচ্চাদের মতন উপুড় হয়ে ঘুমুচ্ছে। সে ওর চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আস্তে স্বরে ডাকলেন, “নাবু..!”
ঘুমের ভেতরে নাওয়াফ সাড়া দিল, “হুঁ।”
“এই অবেলায় ঘুমোচ্ছিস? খাবার খেতে হবে না বাপজান?”
“খাবার খাব না আম্মি। ক্ষুধা নেই। কিন্তু একটা আবদার আছে।”
ছেলের বাচ্চাটে আচরণে ফাতিহা নুর হেসে দিলেন।
“কি আবদার?”
“একটা বউ লাগবে আম্মি? যে আমায় তোমার মতন করে শাসন করবে। যার নুপূরের ঝুনঝুন শব্দ, চুড়ির রিনরিন আওয়াজে রোজ আমার ঘুম ভাঙবে। এনে দাও না?”
ছেলের বাচ্চামো কাণ্ডে ফাতিহা নুর আবারও হাসেন। তবে এবারের হাসিটা অধর ছেড়ে বাহিরে বেরিয়ে আসে। সে নাওয়াফের চুল টেনে ধরে দুষ্টুমি করে বলেন, “আজই লাগবে, বাপজান? দুটো দিন অপেক্ষা করা যাবে না?”
“অপেক্ষা করা যাবে আম্মি। কিন্তু তোমার পুত্রবধূর অভাবে যে আমি দিন দিন শুকিয়ে রোগা হয়ে যাচ্ছি তার কি হবে?”
“বুঝেছি। আমি বউয়ের ব্যবস্থা করতেছি বাপজান। আপনি দুপুরের লাঞ্চ করে নেন।” বলেই ফাতিহা নুর উঠে গেলেন।
ফাতিহা নুরের সাড়াশব্দ না পেয়ে নাওয়াফ চট করে উঠে বসল। মাথাটা ভারী ভারী ঠেকছে। মনে হচ্ছে মাথার ভেতরে কেউ হাতুরি পেটাচ্ছে। সে ঘুমের চোখে এতক্ষণ কি কি বলেছে সেসব ভাবতে লাগল? বিয়ের কথাও বুঝি বলেছিল?
“ও শিট। আম্মি সত্যি সত্যি এখন মোল্লা বাড়ি যাবে।”
সে দ্রুত গায়ে একটি টিশার্ট জড়িয়ে হাত মুখ ধুয়ে মোল্লা বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। মূলত তার উদ্দেশ্য ফাতিহা নুরকে থামিয়ে দেওয়া। তার আগেই চোখে পড়ল মেইন দরজা খুলে ছাতা হাতে পাখি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে পড়তে এসেছে। বাহিরে বৃষ্টি নামল কখন? সে যখন ঘুমিয়েছিল তখনো চৈত্রের খাঁড়া রোদ ছিল মাঠে। সে বারান্দার দরজা খুলে দিল। দেখল বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছে। চারপাশটা মেঘে সন্ধ্যার মতন অন্ধকার করে রেখেছে।
পাখি বরাবরের মতন টেবিলে গিয়ে পড়তে বসেছে। আজ তার নাকে সর্দি লেগেছে। ঘন ঘন হাঁচি দিচ্ছে। নাকের ডগাটা লাল। হাতে নরম দুটো টিস্যু। সে নাক টানতে টানতে নাওয়াফের কাছে একটা আবদার করল, “নাওয়াফ ভাই, এক কাপ চা খাওয়াবেন? ভীষণ সর্দি লেগেছে।”
ওর শুকনো আর মলিন মুখটা দেখে নাওয়াফ আর না করল না। তার নিজেরও এই মুহূর্তে এক কাপ কফি খাওয়া ভীষণ প্রয়োজন। সে গেল নিজের জন্য কফি বানাতে আর ওর জন্য চা বানাতে। মিনিট চারেক এর মাথায় চা হাতে ফেরত এসে পাখিকে পড়ার টেবিলে পেল না। নাওয়াফ আশ্চর্য হলো। এতটুকু সময়ের মধ্যে মেয়েটা গেল কই? সে বারান্দার দরজা খোলা দেখল। বাহিরে ঝড় হচ্ছে। বাতাস ছেড়েছে। সঙ্গে ধূলো বালি উড়ছে। পাখি নীরবে বারান্দায় দাঁড়ানো। তার জর্জেট ওড়নাটি তিরতির করে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছিল। নাওয়াফ ওর পাশাপাশি গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়াল। পাখি টের পেল বলিষ্ঠ পুরুষটির উপস্থিতি। কিন্তু ঘাড় ঘুরালো না। মনটা বিষণ্ণ তার। নাওয়াফ শীতল গলায় ওকে শুধাল, “কি হয়েছে তোর? মন খারাপ কেন? কেউ কিছু বলেছে?”
পাখি দুদিকে মাথাটা স্বল্প ঘুরিয়ে নীরবে জানাল, “নাহ।”
“তাহলে?”
পাখি জবাব না দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। বলা যায় সম্পূর্ণ লোকটাকে উপেক্ষা করল সে। নাওয়াফ পাখির অদ্ভুটে আচরণে সে আজ ক্ষণে ক্ষণে অবাক। মেয়েটার আজ হয়েছেটা কি? চড়ুই পাখির মতন নেই সেই চঞ্চলতা। মুখে নেই তোতার ন্যায় বুলি। নিশ্চিত কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কি হয়েছে সেটা তাকে জানতেই হবে। পাখি ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে গেল। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। পশ্চিমের জানলাটা হাট করে খোলা। ওখানে জানলার গ্রিলে কুচকুচে একটা কালো বিড়াল বসে থাকতে দেখা গেল। বিড়ালটার চোখ দুটো দানবের ন্যায় জ্বলজ্বল করছিল। ভয়ে পাখির আত্মা বেরিয়ে আসার যোগাড়। সে শুনেছে কালো বিড়ালের বেশ ধরে বেশিরভাগ জ্বিনেরা থাকে। জ্বিনের কথা স্মরণে আসতেই সে সঙ্গে সঙ্গে বুকে থু থু ছুঁড়ে দিল। আচমকা বিড়ালটা লাফিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসতে যাচ্ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সে এক হাত চিৎকার করে ওঠল।
“নাওয়াফ ভা..ই!”
পাখির ভীতসন্তন্ত্র চিৎকার শুনে নাওয়াফ দ্রুত রুমে ছুটে এলো। সে এসে দেখল সমগ্র রুমটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। জেনাটেরটিও বন্ধ। সে দ্রুত পাখির কাছে গেল। পাখির মুখটা দুহাতে ঢাকা। মেয়েটা ভয়ে দরদর করে কাঁপছিল। ওর সামনে উৎকণ্ঠিত মুখজে দাঁড়ালো সে। পাখির কাঁধ ঝাঁকিয়ে শুধাল, “এই পাখি, আমার দিকে তাকা। কি দেখে ভয় পেয়েছিস বল আমায়?”
পাখি উত্তর দিতে পারছিল না। তার সমগ্র শরীর তখনো মৃদু মৃদু কাঁপছিল। নাওয়াফ জোরপূর্বক ওর মুখের সামনে থেকে হাত দুটো সরিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, “কি দেখেছিস তুই?”
এবার নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে নিয়ে পাখি উত্তর দিল, “জানলার কাছে একটা কালো বিড়াল ছিল।”
“গাধি ওটা ম্যাথিওর বফ।”
পাখি কিঞ্চিৎ হেসে ফেলল, “ম্যাথিওর বফ?”
“হ্যাঁ, সবাই কি তোর মতন মিসকিন নাকি? ম্যাথিওরও বফ আছে।”
পাখি মিনমিন করে বলল, “শুধু আমিই সিঙ্গেল থেকে গেলাম।”
“ডাবল হবি?”
পাখি দুদিকে মাথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “না না, কোন দরকার নেই। এখনই শান্তিতে আছি। এখন কিছু একটা জ্বালান। পুরো ঘর কবরের মতন ঘুটেঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে।”
“জেনাটের বন্ধ। মোম রান্না ঘরে। তুই এখানে থাক। আমি মোম নিয়ে আসি।”
পাখি পিছন থেকে নাওয়াফের টিশার্ট খামচে ধরল।
“প্লিজ আমায় একা রেখে যাবেন না। আমার ভীষণ ভয় করছে।”
পাখির ভিতু ছোট মুখটা দেখে নাওয়াফের ভীষণ হাসি পেল।
“ভূতকে ভয় পাচ্ছিস? অথচ আমায় পাচ্ছিস না? যদি আমি ভূতের চেয়েও বেশি কিছু করে ফেলি?”
লোকটার কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে পাখির হাতের মুঠোয় থাকা লোকটার টিশার্টের অংশটুকু ছেড়ে দিল। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সে আমতা আমতা করে দাঁড়ালো। ওর কাণ্ডে নাওয়াফ হো হো করে হেসে দিল।
“ভিতু একটা! আমার হাত ধরে আয়। উস্টা খেয়ে পড়িস না। শেষে কোলে তুলতে পারব না। হাতে ব্যথা।”
“আপনি একটু বেশি বলেন।” বলেই পাখি নাক টানল।
“ঠান্ডা লাগিয়েছিস কিভাবে?”
“আপনার দৌড়ানি খেয়ে।”
“মানে?”
“ইশ, ঢং। কিছুই জানেন না বুঝি? আপনার ধাওয়া খেয়েই তো পচা পুকুরে পড়ে গিয়েছিলাম।”
“ওই গোবর পচা পুকুরটায়?”
“হ্যাঁ।”
“এজন্যই তো বলি তোর গা থেকে পচা পচা গন্ধ আসতেছে কেন? কাহিনি তাহলে এটা? এই তুই আমার হাত। ”
নাওয়াফের আচরণে পাখি পুরাই আহাম্মক হয়ে গেল। হুট করে সে একটা কাজ করে বসল। নাওয়াফের ঠোঁটে হাতটা লাগিয়ে দিল। নাওয়াফ ‘ছিহ’ বলে নাক কুঁচকালো। পাখি হি হি করে হেসে দিল। নাওয়াফ ভীষণ রেগে গেল।
“তবে রে দেখাচ্ছি মজা।”
পাখি দিল দৌড়। অন্ধকারের মাঝে সে পালাতে যাচ্ছিল। তার আগেই নাওয়াফ পেছন থেকে ওর লতানো মসৃণ কোমর আঁকড়ে ধরে ফেলল। পাখি ছাড়াতে যাচ্ছিল। তার ভিতরে ওর মুখের হাসি এখনো চলমান। সে এখনো সমানতালে খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তিও চলছে। ওদের ধস্তাধস্তির মাঝে একসময়ে দুজনে বিছানার মাঝে ধপ করে পড়ে যায়। সেই সঙ্গে সরে যায় পাখির বুক থেকে কালো রঙের ওড়নাটি। ওর বুকের ভাঁজ দেখা যাচ্ছিল। খোলা জানলাটি দিয়ে বৃষ্টির ছিটা এসে বিছানাটি ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তার থেকে কয়েক ফোঁটা পানি পাখির মুখে এসে পড়ল। সে কেঁপে কেঁপে ওঠল। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম নিবিড় বৃষ্টি। তার ভিতরে নিস্তব্ধ কুঠিরে কেবল দুজন মানব। নর আর নারী। দুজনের হৃদপিণ্ড অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে। আবছা আলোকে পাখির শ্যাম বর্ণ মুখটা বলিষ্ঠ পুরুষটির কাছে মারাত্মক মিষ্টি লাগল। পাখি কেমন করে শ্বাস ফেলছে। ঘন ঘন। ভারী ভারী। তাতে নাওয়াফের নেশার মতন লাগল। মেয়েটার গায়ের ওপর ঝুঁকে আছে সে। পাখির হাত দুটো নাওয়াফের আয়ত্তে। ওনার হাতের মুঠোয়। তার চোখ দুটোতে অদ্ভুত অদ্ভুত নেশা দেখা যায়। এ নেশা অপরিচিত। পাখির চিনে না তাদের। লোকটার সুগাঢ় দৃষ্টি দুটো মেয়েলি মৃগনয়নে স্থির, স্থাপিত। পাখির ঠোঁট দুটি কাঁপছিল। তিরতির করে নড়ছিল। নাওয়াফের মাথাটা এলোমেলো হয়ে এলো। বুকের ভেতরে হাতুরি পেটাচ্ছে। বারংবার ঢোক গিলছে সে। নিজেকে সংযত রাখার কোন রাস্তাই পেল না। আফিমের মতন টানছে নারীটির ঠোঁটজোড়া। ধীরে ধীরে ঝুঁকে গেল পাখির অতি নিকটে। ঠিক ঠোঁটজোড়া কাছাকাছি। নাওয়াফের গরম গরম নিঃশ্বাসগুলি পাখির গলদেশে আছড়ে পড়ছিল। তার তলপেটের নিচে চিন চিনে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরে নাওয়াফের অবাধ্য এগিয়ে আসা তাকে আরও সতর্ক করে দিল। পাখির অধরের কাছাকাছি লোকটার অধরখানা। আরেকটু হলেই ছুঁবে। পাখি লোকটাকে বাঁধা দিল, “কি করছেন, নাওয়াফ ভাই? এই অঘটন আমি সামাল দিব কি করে? প্লিজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।”
নাওয়াফ ওর ঠোঁটজোড়ার ওপর তর্জনী আঙুল চেপে ধরে বলল, “হিস, কথা বলে না লক্ষ্মীটি। আমি মরে যাচ্ছি। গলার কাছে নিঃশ্বাসটা এসে আটকে আছে তুই দেখতে পাচ্ছিস না?”
লোকটার কথাগুলিতে পাখির সমগ্র শরীরের লোম আবারও কাঁটা দিল। দাঁড়িয়েও গেল। তার বিউটি বোনদের অবাধ্য চলাফেরা বেড়ে গেল। হার্টবিট সমানআকারে কাঁপছে। লোকটা তার অতি কাছে। যতটা কাছে থাকলে দুটো দেহ এক হয়ে যায়। নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। ঠিক অতখানি। সেই নিঃশ্বাসের শব্দগুলি তার গলায় এসে আছড়ে পড়ছিল। আর এক ইঞ্চি ফারাক। আর একটু এগোলেই তার ঠোঁট স্পর্শ করবে পুরুষালি ওষ্ঠজোড়া। সে আবারও বাঁধা দিতে চাইলো। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই পুরুষালি ওষ্ঠজোড়া এসে আচমকা হিমেল বাতাসের ন্যায় ছুঁইল তার ঠোঁটে। সঙ্গে সঙ্গে তার সমগ্র শরীর ভূমিকম্পের মতন কেঁপে ওঠল। পর্বতের ন্যায় বক্ষের নড়াচড়াও দ্বিগুন গতিতে বাড়ছে। উপরে ওঠছে, নামছে। গলা দিয়ে ঘামের চিকন নোনা স্রোত নামতে দেখা গেল। লোকটা মেয়েলি ওষ্ঠজোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে লোহন করতে থাকে। লম্বাটে হাত দুটো পাখির চুলে। পাখি চওড়া বলিষ্ঠ বুকটা ধাক্কে সরাতে চাইল। পারল না। এমন একটা ভয়ংকর পরিস্থিতি পড়ল সে, না পারছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে, না পারছে লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। সে দেখল লোকটার আক্রমনে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। উদরের নিচে অবাধ্য অনুভূতিতে চিন চিন করছে। পুরুষালি স্পর্শে সমগ্র শরীরে ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন অগ্নিগিরি। লোকটার ঠোঁটজোড়া ভীষণ ভীষণ অবাধ্য হচ্ছে। সমগ্র মুখে চুমুতে ভরিয়ে দিল। নেমে এলো বুকের নরম খাদে। পাখি পাগল হয়ে যাচ্ছিলো। কি করছিল সে নিজেও জানে না? লোকটার হাত চলে যায় তার মসৃণ পেটে। খামছে ধরেছে ওকে। পেটে নখ ডেবে যায়। ওকে নিজের বুকের মাঝে তুলে ধরল। বুকের নরম হাড্ডির ওপর লালচে তিলটার মাঝামাঝিতে লোকটা একটা কামড় বসিয়ে দিল। পাখি সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে ওঠল।
“আহ!”
নাওয়াফ সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। থেমে গেল তার অবাধ্য ওষ্ঠজোড়াও। তার হুশ আসে। সৎবিৎশক্তি ফিরে। সে আরেকটু হলে কি সর্বনাশটা করতে যাচ্ছিল। দ্রুত সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। সেই সঙ্গে তার মাথায় আসে সে কতটা গভীরে চলে যাচ্ছিল? পাখি বিছানার চাদর খামচে ধরে কাঁদছিল। ওর ঠোঁটজোড়া লাল হয়ে আছে। গলার নিচে বিভাজন ওপরে তিলটার ওপরে কামড়ের একটা লালচে দাগ। নাওয়াফের মায়া হলো। ভীষণ ভীষণ। নিজের প্রতি রাগও হচ্ছে। ছিহ, এমন একটা কাজ সে কি করে নিষ্ঠুরের মতন করল। সে পাখিকে টেনে কোলে আনল।
“আই অ্যাম সরি কলিজা। বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে এসব করিনি। কন্ট্রোল হারিয়ে ছিলাম। তুই বললে এখুনি কাজি ডেকে আনি। শুধু তুই একবার বল জান রাজি। বাকিটা সব আমি বুঝে নিব।”
পাখি কোন কথা বলল না। সে মুখ ঢেকে কেঁদে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওকে থামাতে যাচ্ছিল, “প্লিজ পাখি কাঁদিস না। তোর কান্নার সুর আমি সইতে পারি না। ওরা আমাকে বড্ড যন্ত্রণা দেয়।”
পাখি রেগে গেল। সে লাল চোখ জোড়া নিয়ে নাওয়াফের মুখের ওপর কয়েক দলা থু থু ছুঁড়ে মারল।
“ছিহ, আপনাকে আমি কত ভালো ভেবেছিলাম? আর আপনি তার এই প্রতিদান দিলেন? আর কখনো আপনি আমার সামনে আসবেন না। ঘৃণা করি আমি আপনাকে। আপনার মুখও আমি দেখতে চাই না।”
পাখির কথাগুলো নাওয়াফের বক্ষের গভীরে গভীর ক্ষতের খাত সৃষ্টি করল। ঠিক কাঁটার ন্যায় গিয়ে বিঁধল বুকে। অতঃপর তার বুকটাকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিল। প্রেয়সী মিথ্যে ভুল বোঝার কারণে মুখটা দুঃশ্চিতার ছাপে মলিন হয়ে এলো। শুকনো ওষ্ঠজোড়া জিভের তলে কিঞ্চিৎকর চুবিয়ে নিয়ে সে ওকে বোঝাতে চাইল, “তুই আমাকে ভুল বুঝিস না পাখি। তুই ভুল বুঝলে আমার বুক পুড়বে। বুকে বড্ড ব্যথা হবে। মরণ ব্যথা। এই ব্যথার ঔষধ আমি কোথায় পাব? কার কাছে পাব বল? ওই ব্যথা আমি কাকে দেখাব একমাত্র তুই ছাড়া? আমি নষ্ট হলে একমাত্র তোর জন্যই নষ্ট হয়েছি। তোকে ভালোবেসেই নষ্ট হয়েছি। এবার শাস্তিস্বরূপ তুই যা শাস্তি দিবি, আমি মাথা পেতে নিব।”
(চলবে কি?)
#লামইয়া_তাসনিম