ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

৪১তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(৪১)

“সিরাজ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাতি নাওয়াফ তালুকদারের স্ত্রী অনন্যা রহমান পাখিকে। কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে।”

সংবাদটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে। একে একে বিশ্বের নানা প্রান্তে। শুরু হলো তুমুল আলোড়ন। সমালোচনা। এক তরুণী যে কিনা সাজগোজ করে একজন যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, অথচ হত্যার পর পালিয়ে না গিয়ে নিজেই থানায় উপস্থিত হয়ে নিজের নামে মামলা লিপিবদ্ধ করেছে! এমন বিস্ময়কর ঘটনার নজির খুব কমই আছে। তাই পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবার মনেই জন্ম নিয়েছে অদম্য কৌতূহল। কেন হত্যা করল মেয়েটি? কী এমন ঘটেছিল, যার পরিণতিতে তাকে এই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে হলো? আর কেনই-বা সে নিজ থেকেই আত্মসমর্পণ করল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সবাই। আপাতত পাখিকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। লোহার শিকলে ঘেরা ছোট্ট কারাকক্ষের এক কোণে সে গভীর ঘুমে অচেতন। একই কক্ষে রয়েছে আরেক নারী আসামি রিনা। পারিবারিক কলহের জেরে সে নিজের শাশুড়িকে হত্যা করেছে। রিনা প্রথম থেকেই বিস্মিত চোখে লক্ষ্য করছে মেয়েটিকে। কারাগারে আনার পর থেকে পাখি একটানা ঘুমিয়েই চলেছে। অথচ রিনা নিজে দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। কখনো আল্লাহকে ডেকেছে, কখনো মুক্তির জন্য আকুতি জানিয়েছে। চারদিকে অসহ্য গুমোট পরিবেশ, নিম্নমানের খাবার, ঝাঁকে ঝাঁকে মশার উপদ্রব। রাত নেমে এলে শুরু হয় এক অন্তহীন যন্ত্রণা। মনে হয়, মশাগুলো রক্তের শেষ বিন্দুটুকুও শুষে নিতে চায়। আর সেই একই কারাকক্ষে মেয়েটি কী অদ্ভুত প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে! যেন বহু যুগের নির্ঘুম ক্লান্তি একসঙ্গে এসে ভর করেছে তার চোখে। রিনা অবাক হয়ে ভাবল, মানুষ কি সত্যিই খুন করার পর এতটা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে? তার কি মৃত্যুভয় নেই? পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তাই কি আর তাকে স্পর্শ করে না?

এদিকে সিরাজের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

থানার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নাওয়াফ, নিখিল ও রমিজ। গত দুই ঘণ্টা ধরে শত চেষ্টা করেও তারা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পায়নি। অবশেষে নাওয়াফের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে দায়িত্বে থাকা পাহারত পুলিশ সদস্যকে হালকা ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পায়ে থানার ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার পিছু পিছু এগিয়ে গেল নিখিল।

পেছন থেকে অসহায় কণ্ঠে পুলিশ সদস্য বারবার চিৎকার করে উঠল, “আরে, কী করছেন? প্লিজ, ভেতরে যাবেন না! আমার চাকরিটা চলে যাবে। প্লিজ, স্যার!”

নিখিল থেমে তার দিকে ঘুরে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “এত চিৎকার করবেন না। কিছুই হবে না আপনার। আমরা মন্ত্রীর পরিবার। চাকরি চলে গেলেও আপনাকে সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারব।”

পুলিশ সদস্যটি দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলল,

“কিন্তু আমার পরিবার?”

“তাদের দায়িত্বও আমাদের।”

কথাগুলো শুনে পুলিশ সদস্য আর বাধা দেওয়ার সাহস পেল না। নাওয়াফ ততক্ষণে দ্রুত হেঁটে এগিয়ে গিয়ে অফিসার তানজিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ তাকে সেখানে দেখে অফিসার তানজিলের ভ্রু দুটো অজান্তেই কুঁচকে উঠল।

“আপনি এখানে?”

নাওয়াফের কপালের শিরাগুলো রাগে টান টান হয়ে ওঠল। সে চিবুক শক্ত করে বলল, “আসতে তো আপনিই বাধ্য করলেন।”

“এসেছেন যেহেতু, বসুন। চা খেয়ে বিদায় হন।”

“ও অফিসার চা কি বেশি হয়ে গেছে তোমার? জায়গা মতো দুকাপ ঢেলে দিব?”

অফিসার তানজিল প্রচন্ড রেগে গেলেন। শক্ত অভিব্যক্তিতে নাওয়াফকে শাসিয়ে ওঠলেন।

“সাবধানে কথা বলুন। এটা থানা। বেশি কথা বললে লকাবে ঢুকিয়ে দিব।”

“নিখিল, ও বলে কি? আমারে নাকি লকাবে ঢুকাবে? শালা তোর প্যান্ট খুলে আমি রাস্তায় ছেড়ে দিব।”

নিখিল স্মিত হেসে অফিসার তানজিলকে জিজ্ঞেস করল, “অফিসার এখানে নতুন নাকি? না আমাদের চেনো না?”

“আপনারা যাই হন। এখন আসুন।”

“আমার স্ত্রীকে এখান থেকে না নিয়ে এক পাও আমি নাওয়াফ তালুকদার নড়ব না।”

কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে শুধাল অফিসার তানজিল, “কে আপনার স্ত্রী?”

“যাকে কিছুক্ষণ আগে গ্রেফতার করা হয়েছে।”

“দেখুন ওনি নিজ থেকে এসে আত্মসমর্পণ করেছে। নিজের নামে নিজেই কেস লিখিয়েছে। এখানে আমাদের দোষ কি?”

“যদি বলি সে মিথ্যে বলেছে। খুনটা আমি করেছি, তখন?”

নিখিল অবাক হয়ে নাওয়াফের দিকে চাইল। ফিসফিস করে কানে কানে বলল, “কি বলছিস এসব?”

নাওয়াফ জবাব দিল না। নাওয়াফের কথা শুনে অফিসার তানজিল নিঃশব্দে একটু হাসল।

“বাচ্চাদের খেলনা পেয়েছেন থানা? বলবেন আর বিশ্বাস করে নিব? আইনের লোকের ওত ঠেকা পড়েনি যে পাগল ছাগলের কথা বিশ্বাস কর....”

কথাটি সম্পূর্ণ করার আগেই তার গালে ঠাস করে একটি চড় এসে পড়ল। অফিসার তানজিল স্তব্ধ, বিমুঢ়। অবাক হয়ে নাওয়াফের দিকে চাইল। বিস্মিত তার নয়নজোড়া। তাকে কিনা চড় মারল? সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। পাশ থেকে জুনিয়র অফিসার সুমন ফিসফিসিয়ে বলল, “স্যার ওনি নাওয়াফ তালুকদার। মন্ত্রীর আদুরে নাতি। ভীষণ রাগি। ওনার কথার আগে হাত চলে বেশি। এই তো কয়েকদিন পর নির্বাচন। তখন এমপি পথে দাঁড়াবে। অর্ধেক এমপি হয়েই আছে। কারণ জনগণ সব তার পক্ষে।”

“ওনিই তাইলে নাওয়াফ তালুকদার? যিনি প্রচন্ড রাগি আর বদমেজাজি। ”

“জি।”

ভয় লাগলেও সে মনে মনে রাখল। প্রকাশ করল না। উল্টো রাগ দেখিয়ে বলল, “কাজটা ঠিক করলেন না। এখন যদি একজন অফিসারের গায়ে তোলার জন্য আপনাকে জেলে ভরে দেই?”

“সেই জেলে তোরেই ভরমু অফিসার। তোর প্যান্ট খুলে আন্ডারপ্যান্টের তলায় পিটাব আমি। শালা মাথাটা দিল পুরা নষ্ট করে। ও আমারে জেলের ভয় দেখায়। জিগ্যেস করতো নিখিল, ও কয় সাবজেক্টে ফেল করে ঘুষ খেয়ে চাকরি নিছে? আমারে আইন শিখাতে আসে। ওর মতো কত অফিসার পকেটে থাকে আমার, ও আইতে আমারে বাল শিখাইতে। তোরে ৬ ঘণ্টা টাইম দিলাম। ভোর হওয়ার আগে আমার বউ ঘরে ফিরাইয়া দিবি। সব খবরের চ্যানেলে প্রকাশ করবি খুন আমি করেছি।”

নিখিল নাওয়াফকে বোঝাল, “তুই মাথাটা ঠান্ডা কর ভাই। আমি অফিসারের সঙ্গে কথা বলছি।”

“ওর সঙ্গে আর কোন বাল কমু? এসপিরে কল লাগা। যা বলার এসপির সঙ্গে বলব।”

“আচ্ছা লাগাচ্ছি তুই শান্ত হ। বাহিরে যা। আমি আসতেছি।”

“আমি বাহিরে আছি। এখানে থাকলে আমার চান্দিতে রক্ত উঠে যাবে। জলদি বাহিরে আয়।” কথাগুলো বলেই সে বড়ো বড়ো পা ফেলে বেরিয়ে গেল।

নিখিল অফিসার তানজিলকে চোখ রাঙিয়ে বলল, “মিয়া সময় থাকতে ভালো হয়ে যাও। এই এলাকার অফিসার হয়ে এসেছো। যাদের কথায় উঠতে বসতে হবে। তাদের সঙ্গে তর্ক করো। সবে চড় একটা খাইছো। আরও সামনে বাকি আছে। যারে পাগল কইছো, সে কিন্তু তোমার মতো একশ অফিসাররে বেইচা কিইন্না খাইতে পারে। শুধু চুপ আছে কেন জানো, তার বউ তোমাগো থানায়। আপাতত মুখ বন্ধ রাখো। যা বলার এসপির সঙ্গে বলব।”

বলেই সে থানা থেকে বেরিয়ে গেল। অফিসার তানজিল খানিকটা ঘেমে গেলেন। এসপির কাছে না আবার তার নামে কিছু কুরটনা ছড়ায়। তাহলে চাকরিটা যাবে।

নিখিল দ্রুত এসপি হারুণকে ফোন করল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই সে ফোনটা নাওয়াফের হাতে তুলে দিল। নাওয়াফ সালাম জানিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বলল। এসপি হারুণও ইতোমধ্যে সংবাদটি দেখেছেন। রাত তখন প্রায় এগারোটা। থানার বাইরে দু-একজন সংবাদকর্মী ঘোরাফেরা করছিল। তবে কেউই নাওয়াফের সামনে যাওয়ার সাহস দেখাল না। এর আগে একবার ধমক খেয়ে অপদস্থ হয়েছিল তারা। সেই অভিজ্ঞতাই এবার তাদের দূরে রেখেছে।

সব শুনে এসপি হারুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখো নাওয়াফ, সিরাজ হত্যা মামলার খবর ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক ভাইরাল। অসংখ্য মানুষ নিজের চোখে তোমার স্ত্রীকে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখেছে। রাস্তায় উপস্থিত লোকজন প্রত্যক্ষদর্শী তার সাক্ষী। তার ওপর তোমার স্ত্রী নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে, নিজের নামে মামলা করেছে। আইনগত দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। সে-ই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আপাতত সন্দেহের খুব একটা সুযোগ নেই। যদি এমন হতো, কেউ তাকে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখেনি, কিংবা সে রক্তমাখা রামদা আর বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে থানায় হাজির হতো না, তাহলে হয়তো আমি কোনো না কোনোভাবে তোমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু এখন আমার হাত কার্যত বাঁধা। তুমি একটা কাজ করো। দেশের সেরা কোনো ফৌজদারি আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করো। একজন দক্ষ আইনজীবী অনেক সময় প্রমাণের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন, মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আপাতত এটাই তোমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। নইলে পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে তোমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিও উঠতে পারে। আমাকে ক্ষমা কোরো, বাবা। এই মুহূর্তে আমার আর কিছুই করার নেই।”

কথা শেষ করেই ফোন কেটে দিলেন এসপি হারুণ।

পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিল নিখিল। ফোনটা নামতেই সে গম্ভীর গলায় বলল, “এখন কী করবি?”

নাওয়াফ নির্বাক। জবাব নেই তার মুখে। কিছু মুহূর্তের পর সে বলল, “রমিজ খবর নে নামকরা অ্যাডভোকেট কে? যেভাবে হোক আমি পাখির জামিন চাই।”

“এই শহরের সবচেয়ে নামকরা আইনজীবী অ্যাডভোকেট রূপক। কিন্তু কিছুদিন আগে সে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। আপাতত হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। আগের মতো নিয়মিত কোর্টেও দাঁড়ান না।”

নাওয়াফ দ্রুত জিজ্ঞেস করল, “তার পরে?”

রমিজ নিঃশ্বাস ছাড়ল।

“অ্যাডভোকেট মিলন। তার সঙ্গে আমি ইতোমধ্যেই কথা বলেছি। মোটা অঙ্কের টাকাও অফার দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সরাসরি না করে দিয়েছেন। কেসটা নিতে চাচ্ছেন না। কারণ, সব প্রমাণ ভাবির বিরুদ্ধে। তার ওপর ভাবি নিজেই হত্যার দায় স্বীকার করে থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। এমন অবস্থায় কোনো আইনজীবীই কেসটা নিতে রাজি হচ্ছেন না।”

নাওয়াফ দুহাতে নিজের কপাল চেপে ধরল।

“আমার মাথা কাজ করছে না, নিখিল। পাখি হঠাৎ এমন করল কেন? মানুষ খুন করার মেয়ে তো সে নয়। সামান্য রক্ত দেখলেই যে অজ্ঞান হয়ে যেত, সে কীভাবে এত নৃশংস, বর্বর হতে পারে?”

রমিজ ধীর গলায় বলল, “জানেন ভাই, আমি যখন জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়েছিলাম, তখন যেন অন্য একজন মানুষকে দেখেছিলাম। আমাদের সেই নরম, শান্তপ্রিয় ভাবিটাকে সেখানে খুঁজে পাইনি। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল প্রতিশোধের আগুনে। যেমন দীর্ঘদিন কারোর প্রতি মনে ঘৃণা, রাগ, বিদ্বেষ জমে থাকে, ঠিক তেমন। প্রথমে তিনি দুই হাতে রামদা চালিয়ে সিরাজকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। একসময় সিরাজের বুকের ওপর উঠে বসেন। এবং দিলেন মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। আপনি যদি সেই দৃশ্যটা দেখতেন বিশ্বাস করুন, কোনো থ্রিলার সিনেমাও তার কাছে ম্লান হয়ে যেত। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? সিরাজের দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার মুখে আমি এক ধরনের প্রশান্তি দেখেছিলাম। যেন বহু বছরের এক অসমাপ্ত প্রতিশোধ শেষ হয়েছে। দৃশ্যটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।”

রমিজের কথা শেষ হতেই নিখিল গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে নাওয়াফের দিকে তাকিয়ে বলল,

“একটা বিষয় আমার মাথায় ঢুকছে না। তুই তো বলেছিলি, সিরাজের সঙ্গে পাখির অবৈধ সম্পর্ক ছিল। যদি সত্যিই তাই হতো, তাহলে পাখি তাকে ডেকে এনে সাজগোছ করে নৃশংসভাবে হত্যা করবে কেন? আবার নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করবে? সে তো জানত, এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আমার মনে হচ্ছে, এই ঘটনার ভেতরে এমন কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা এখনো জানি না। এমনও তো হতে পারে, পাখি আসলে নির্দোষ। কিংবা সেদিন তুই যা দেখেছিলি, তার ব্যাখ্যা অন্য কিছু। পুরো ঘটনাটা হয়তো আমাদের চোখে যেমন দেখাচ্ছে, আদতে তেমন নয়।”

নাওয়াফ উন্মাদ হয়ে গেল। সে দুহাতে চুল খামচে ধরে নিচে দপ করে বসে পড়ল।

“আমার মাথা কাজ করছে না। আমি বুঝতে পারছি না কোনটা ভুল কোনটা সঠিক। আমি কিছু জানি না। নিজের চোখের দেখাটাকেও অবিশ্বাস করতে পারছি না। ওইদিকে ওকে জেলখানাতেও দেখতে পারছি না। তুই একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস নিখিল, ও যখন রক্ত মাখা বিচ্ছিন্ন মাথাটা নিয়ে আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। একবারের জন্যও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি। যেন ঘৃণা করে সে আমাকে। এমন ছিল ওর আচরণ।”

“এখন ওসব বাদ ভাই। আমার এক পরিচিত উকিল আছে। ওর সঙ্গে আমি কথা বলব। ও চাইলে কেসটা নিতে পারে।”

নাওয়াফ উঠে দাঁড়াল।

“যা করতে হয় কর। যত টাকা লাগে ঢাল। বাট আমি আমার স্ত্রীকে থানায় দেখতে চাই না। খারাপ হোক আর ভালো হোক সে আমার স্ত্রী। ওর জন্য এখনো আমার মন পোড়ে। অন্তরে মায়া লাগে।”

শেষ করেই সে রমিজের উদ্দেশ্যে বলল, “আচ্ছা রমিজ, জিজ্ঞেস করতো একটু দেখা করা যাবে?”

গলাটা আহত শোনাল। যেন ভেতরটা ভেঙে এসেছে।

রমিজ বুঝতে পারল তার ভাই ভেতর থেকে ভেঙে গেছে। সে ভালো নেই। রমিজ বলল, “আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসি। আপনি আপাতত বসুন ভাই। পানি খাবেন, পানি এনে দেই?”

“শালা ফাতরামি মারাও আমার সঙ্গে? ওখানে আমার বউ জেলে বসে না খেয়ে আছে। আর আমি এখানে বসে বিরিয়ানি চাটব?”

“ওটা পানি হবে।”

নাওয়াফ তেড়ে যাচ্ছিল ওর দিকে।

রমিজ দৌড়ে থানার ভেতরে ঢুকে গেল। বাপরে এবারের মতো সে জানে বেঁচেছে। বুকে থুতু ছিটিয়ে সে থানার ভিতরে ঢুকল৷ অফিসার তানজিলকে গিয়ে বলল, “স্যার, ভাবিজানের সঙ্গে কি দেখা করা যাবে?”

অফিসার তানজিল ধমক দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই পাশ থেকে জুনিয়ার অফিসার সুমন খোঁচা দিয়ে বলল, “স্যার, আর ধমক দিয়েন না। এটা তার লোক, কিছুক্ষণ আগে যার হাতে চড় খেয়েছিলেন। রাজি হয়ে যান। দেখাই তো করব। নিয়ে তো আর যেতে পারবে না।”

বিরক্ত কণ্ঠে তানজিল সুমনকে বলল, “তুমি এইদিকটা সামলাও। আমি বিশ্রাম করতে গেলাম।”

অফিসার তানজিল যেতেই জুনিয়র অফিসার সুমন বলে, “হ্যাঁ দেখা করা যাবে। আগে আমি আসামি থেকে অনুমতি নিয়ে আসি। আপনি বরং আপনার ভাইকে ডেকে আনুন।”

রমিজ সম্মতি জানিয়ে নাওয়াফকে একটি বার্তা পাঠাল।

কিছুক্ষণ পর নাওয়াফ এসে পড়ল। অস্থির লাগছিল তার। সে ঘামছিল। বার বার কপাল মুছছিল। হাত দুটো স্থির রাখতে পারছিল না। আঙুলগুলো বারবার একে অন্যকে চেপে ধরছিল। গত কয়েক মাসে পাখির সঙ্গে তার কতবার কথা হয়েছে! অথচ কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে কথা বলেনি। অভিমানকে আঁকড়ে ধরে থেকেছে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কথা দিয়ে আঘাত করেছে। তখন মনে হয়েছে, এটাই ঠিক। আজ হঠাৎ অনেকদিন পর মনে হল সেদিন পাখিকে ক্ষমা করে দিয়ে বুকের টেনে নিলে বুঝি আজ এদিন দেখতে হতো না। অথচ সে টেনে নেইনি। অভিমানে, কষ্টে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। ওকে ফেলে রেখে এসেছিল। খোঁজও নেয়নি কোন। সেই অভিমানগুলো কোথায় যেন আজ হারিয়ে গেছে। শুধু ইচ্ছে করছে পাখির মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলতে, "সব ভুল মাফ করে দিলাম। শুধু একবার বল, কেন খুন করলি?"

আরেকটা প্রশ্নও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে। সেদিন রাতে সত্যিই কি পাখি সিরাজের সঙ্গে ছিল? নাকি সে যাকে দেখেছিল, সে অন্য কেউ? যে পাখিরূপি ছিল। মনে পড়ে গেল পাখির বলা কথাটি। পাখি একদিন বলতে চেয়েছিল, সিরাজ তাদের সংসার ভাঙতে চাইছে। সে শুনেনি। বিশ্বাস করেনি। উল্টো সন্দেহ করেছে। রাগ করেছে। আঘাত দিয়েছে। দূরে সরিয়ে রেখেছে। পাখির কষ্ট হয়েছিল। তার নিজেরও হয়েছিল। শুধু সে কেউ কাউকে বলেনি। নাওয়াফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ সে কোনো ব্যাখ্যা নয়, সত্যটা জানতে চায়। যে সত্য একদিন পাখি বলতে চেয়েছিল, সেই সত্যের মুখোমুখি হতে চায়। ঠিক তখনই জুনিয়র অফিসার সুমন ফিরে এল। মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, খবরটা ভালো নয়।

সে নিচু স্বরে বলল, "স্যার, অনন্যা রহমান পাখি আপনার সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার জানিয়েছেন। উনি বলেছেন, উনার খুব ঘুম পাচ্ছে। অনেক দিন নাকি ঠিকমতো ঘুমাননি। এখন শুধু ঘুমাতে চান।"

কথাটা শেষ হতেই চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

রমিজ চুপচাপ নাওয়াফের দিকে তাকিয়ে রইল। নাওয়াফ স্থির চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো রাগ নেই। কোনো উত্তেজনাও নেই। শুধু একরাশ অস্থিরতা। মনে হচ্ছিল, আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলে বুকের ভেতরের সব প্রশ্ন তাকে দম বন্ধ করে মেরে ফেলবে। সে ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করল। যেন অদৃশ্য কোনো টান তাকে পাখির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে জুনিয়র অফিসার সুমনও তড়িঘড়ি করে তার পিছু নিল।

“প্লিজ স্যার এমনটা করবেন না। আমাদের চাকরি থাকবে না। এটা থানা। মাথায় রাখেন।”

রমিজ অফিসার সুমনকে পেছন থেকে টেনে ধরে মুখের সামনে আঙুল চেপে ধরল।

“হিস, চিৎকার করবেন না।”

একহাজার টাকার পাঁচটি নোট এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা নিয়ে মুখটা বন্ধ রাখুন। তাতে আপনারও লাভ, আমাদেরও। চলুন আমরা বসে বসে চা খাই।”

“চা খাব?”

“ধুর বিয়া চিন্তা কিসের? আপনার আমার থেকে ওনার বুদ্ধি কম নাকি? তাছাড়া আপনি কি চান আপনার সিনিয়র স্যারের মতো আপনিও সেধে সেধে একটা চড় খেতে। তাহলে খেয়ে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি।”

জুনিয়র অফিসার চুপ হয়ে গেল। রমিজ এবার শান্ত গলায় বলল, ”দেখুন ওনার মাথা এখন প্রচন্ড হট হয়ে আছে। আপাতত ঠান্ডা হতে দিন। ততক্ষণে আমাদের চা খাওয়াও শেষ হয়ে যাবে।”

অফিসার সুমন চুপচাপ রইল। মনে মনে টেনশন হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু উপরে ধরা দিলেন না।

নাওয়াফ পাখির কক্ষের সামনে এসে থামল। লোহার শিকের ওপাশে পাখি কাত হয়ে শুয়ে আছে। মুখটা দেয়ালের দিকে ফিরানো। চোখ দুটি বন্ধ। নিশ্চুপ সে। এতটাই নিশ্চুপ, যেন পৃথিবীর কোনো শব্দই আর তার কানে পৌঁছায় না। নাওয়াফ কিছুক্ষণ নির্বাকে দাঁড়িয়ে রইল। ডাকতে গিয়েও কেমন যেন জড়তা, সংকোচে আটকে গেল তার কণ্ঠ। অথচ তাদের সম্পর্ক তো এমন ছিল না। একসময় এই একটি নাম উচ্চারণ করতেই মেয়েটার মুখে হাসি ফুটে উঠত। কত রঙিন ছিল তাদের ছোট্ট পৃথিবী! তাহলে সেই সুখের সংসারে অশুভ ছায়া নেমে এল কীভাবে? কে তাদের মাঝখানে বিষ ঢেলে দিল? দূরত্ব সৃষ্টি করল? নাওয়াফ ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকের সব দ্বিধা সরিয়ে রেখে শিকের আরও কাছে এগিয়ে এল। খুব আস্তে ফিসফিসিয়ে ডাকল, “পাখি..!”

কোনো সাড়া নেই। নিস্তব্ধ।

সে আবার ডাকল, “এই পাখি, দ্যাখ আমি এসেছি। তোর নাওয়াফ ভাই। একবার আমার দিকে তাকা।”

পাখি নড়ল না। পিছু ঘুরে তাকালও না। যেমন ছিল, তেমনই সে।

নাওয়াফ শিক দুটো আলতো করে আঁকড়ে ধরল।

“তোর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। তোকে আমি এখানে থাকতে দেব না। যেভাবেই হোক, তোকে নিয়ে যাব। শুধু আমার সঙ্গে দু'মিনিট কথা বল। আমি যা জিজ্ঞেস করব, সত্যিটা বলবি। আর আজকের রাতটা কোনোভাবে কাটিয়ে দে, বউ। আমি কথা দিচ্ছি, কাল তোকে জামিনে বের করার জন্য যা করার, সব করব।”

কথাগুলো বলেই থেমে গেল নাওয়াফ।

বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারে চেপে বসেছে। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের জমে থাকা শত কথার ভিড়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথাটাই যেন সে আর খুঁজে পাচ্ছে না। সে আবারও ডাকল ওকে, “পাখি...! এ..এই বউ। রাগ করে না। একটু কথা বল না?”

কার পাখি কে? আজ আর নাওয়াফের কোন ডাক পাখির কর্ণে পৌঁছাল না। সে ঘুমুচ্ছে, মরণ ঘুম। যেন কতকাল ঘুমাইনি। তবে তার পাশে থাকা মহিলাটি জেগে গেল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, “কে গো তুমি? ওই মেয়েটার বর নাকি? রাত দুপুরে ওভাবে চ্যাঁচাচ্ছো কেন?

নাওয়াফ মাথা ঝাঁকাল।

“হ্যাঁ, ওকে একটু ডেকে দেন না।”

“ডাকলেও উঠবে না।” মহিলার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস।

“উঠবে না?”

“না।”

“আসার পর থেকেই মেয়েটা ঘুমুচ্ছে। এইয়া কোন ঘুম ঘুমায়, জানি না বাপু। মুরব্বিগো কাছে শুনছি, মরার আগে মানুষ নাকি এমন ঘুম ঘুমায়। খুনের দায়ে ফাঁসি হবে হয়ত। এজন্য মরণের আগে দুনিয়ার সব ঘুম ঘুমিয়ে রাখছে।”

ফাঁসির কথা শুনে নাওয়াফের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠল। সে মহিলাটিকে শক্ত গলায় একটি ধমক দিয়ে ওঠল, “ফালতু কথা বলবেন না। ওর কিছু হবে না। আমি বাঁচাব ওকে।”

“তুমি বুঝি বউরে ভালোবাসো? আহারে কি সুন্দর চান্দের মতো মুখ। তাহলে তোমার বউয়ের অবস্থা এমন কেন? শুকনা, মরমরা। গলার রগ দেখা যায়। খায় না কয়দিন যাবৎ? আচ্ছা বাদ দেও। তোমার বউয়ের মতো খুনি আমি কমই দেখেছি। আমি যখন খুন করেছি, ও মাগো একমাস ভালো করে চোখ দুইডা বন্ধ করতে পারি নাই। শুধু চোখে চোখে ওসব ভাসতো। আর তোমার বউরে দেখো, আসার পর থেকে ঘুম আর ঘুম। মউয়াতের ঘুম ঘুমাইতেছে বুঝি। আহারে অল্প বয়সে মাইয়াডা মরব।”

মহিলার বকবক শুনে নাওয়াফ প্রচণ্ড বিরক্ত হলো।

“আর একটা অতিরিক্ত কথা বললে আপনার মুখ ভেতরে ঢুকে বন্ধ করে দিব।”

নাওয়াফের ধমক খেয়ে মহিলাটি ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। দেখতে তো আর্মি অফিসারদের মতো। আর্মিতে চাকরি করে নাকি? সে আর ওসব জিজ্ঞেস করল না। তখন যদি আরেকটা ধমক দেয়।

নাওয়াফ মাথা ঠান্ডা করে মহিলাটিকে বলল, “ওকে একটু ডেকে দেন তো। বলেন কথা বলতে কেউ এসেছে।”

“আচ্ছা, দিচ্ছি।”

রিনা বেগম বেশ কয়েকবার পাখিকে ঝাঁকাল।

“এই মাইয়া ওঠো। তোমার সঙ্গে তোমার স্বামী দেখা করতে আইছে।”

পাখি উঠল না। সে ঘুমিয়েই রইল। এ যেন তার মরণ ঘুম। কাল ঘুম। আর কোনদিন ভাঙবে না।

নাওয়াফকে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হলো। পাখি ওঠেনি। তার দিকে ফিরে চায়নি। কথাও বলেনি। বুকে জমা কষ্টগুলো আরও তীব্র হলো। অভিমানের পাল্লাগুলো দুজনের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে। যখন পাখি নরম হয়ে নাওয়াফের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল, তখন নাওয়াফ বলেনি। মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। অথচ আজ সে ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য ছটফট করছে। কিন্তু পাখিও কথা বলছে না। মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

সেই রাতে আর কারও চোখে ঘুম নামেনি। নাওয়াফ, নিখিল আর রমিজ তিনজনই থানার সামনেই বসে ছিল। কেউ বাড়ি ফেরেনি। রাত যত গভীর হয়েছে, ততই যেন তাদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। রমিজ কয়েকবার নাওয়াফকে এক কাপ চা খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। নাওয়াফ শুধু মাথা নেড়ে না বলেছে। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কষ্ট জমে আছে। সে নিশ্চিত, গত রাতে পাখি ঘুমিয়ে ছিল না। সে জেগেই ছিল। ইচ্ছা করেই তার কোনো ডাকে সাড়া দেয়নি। চোখ খোলেনি। একবারের জন্য ফিরেও তাকায়নি। এ অভিমান সাধারণ কোনো অভিমান নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। তবু নাওয়াফেরও তো কত কথা বাকি। কত প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। সত্যটা তাকে জানতেই হবে। ভোর হতেই সে রমিজকে ধর্মপুরে পাঠিয়ে দিল। যে জায়গায় পাখি আর নাওয়াফ আত্মগোপন করে থেকেছিল। ছোট্ট সংসার পেতেছিল। সেখান থেকে কিছু সঠিক তথ্য তার জানা চাই। নাওয়াফ চায়, সেখান থেকে যতটুকু সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করতে। সকাল প্রায় নয়টার দিকে পাখিকে থানা থেকে বের করা হলো।

নিরাপত্তার জন্য তার মাথায় একটি হেলমেট পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাখি সেটি খুলে শান্ত গলায় বলল,

“এটার প্রয়োজন নেই।”

কেউ আর জোর করল না। দুই হাতে হাতকড়া। পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি। এলোমেলো খোলা চুল কাঁধ ছুঁয়ে হাঁটু ছুঁই ছুঁই হয়ে নেমে এসেছে। এক রাতেই যেন মেয়েটা আরও শুকিয়ে গেছে। মুখের সমস্ত রক্তিম আভা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত বিবর্ণতা। তবু মুখের অভিব্যক্তি অটল।

দুই নারী পুলিশ তাকে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই নাওয়াফের চোখ গিয়ে আটকাল পাখির ওপর।

সাদা শাড়িতে পাখিকে দেখে বুকের ভেতরটা অদ্ভুৎভাবে ছ্যাৎ করে উঠল তার। মুখটা মলিন হয়ে গেল তার। অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল সে, “সাদা রংটা তোর জন্য নয়, পাখি। তোর জন্য নয়। এই রংটা তোকে মানাচ্ছে না। বড্ড বাজে দেখাচ্ছে। আমি তোর জন্য এই রংটা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম। তুই আমার বউ। তুই পরবি রঙির শাড়ি। লাল, নীল, সবুজ, গোলাপি, বেগুনি। তোর পরনে কেন বিধবাদের শাড়ি থাকবে? খুলে ফেল পাখি, শাড়িটা খুলে ফেল। আমার চোখ ব্যথা করছে। চোখ জ্বলে যাচ্ছে। আমি তাকাতে পারছি না। আমার হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে। রঙহীনা শাড়িতে আমার পাখিকে মৃত মৃত লাগছে। আমি ওটা নিতে পারছি না। ওই দৃশ্য দেখার আগে আমার মরণ হলো না কেন?”

আফসোস সে কথাগুলো বলতে পারল না। তার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এল ছোট্ট একটি পাথর। সজোরে এসে আঘাত করল পাখির কপালে।

টক করে শব্দ হলো। পরক্ষণেই কপাল বেয়ে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। কয়েক ফোঁটা রক্ত সাদা শাড়ির আঁচলেও ছড়িয়ে গেল। পাখি ধীরে কপালে হাত রাখল। তারপর মাথা তুলে তাকাল। থানার সামনে তখন শত শত মানুষের ভিড়।

চারদিক থেকে ভেসে আসছে একটাই স্লোগান,

“খুনির ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই!”

ভিড়ের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিল এক নারী। পাখি তাকে চিনতে পারল। তাদেরই প্রতিবেশী। নারীটি উত্তেজিত কণ্ঠে আবারও চিৎকার করে উঠল,

“এই খুনির ফাঁসি চাই!”

পাখি স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তুলল ক্ষীণ এক হাসি। হাসিটা ছিল অদ্ভুত। না সেখানে ভয় ছিল, না ক্ষোভ, না প্রতিবাদ। সেই রহস্যময় হাসি দেখে নারীটি নিজেই থমকে গেল। যেন বুঝতেই পারল না এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হাসে কীভাবে! ওদিকে পাখির কপাল থেকে রক্ত ঝরতে দেখে নাওয়াফের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। পুলিশের ওপর একরাশ বিরক্তি জন্ম নিল তার। একটু নিরাপত্তা দিতে পারল না! সে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে পাখির দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার আগেই নারী পুলিশরা পাখিকে দ্রুত গাড়িতে তুলে দরজা বন্ধ করে দিল। গাড়ির ভেতরে একজন নারী পুলিশ ফার্স্ট-এইড বক্স খুলে কপালের ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে এগিয়ে এল। পাখি শান্ত, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “প্রয়োজন নেই।”

“কোন প্রয়োজন নেই?”

“না। যেই রক্তের কদর নেই। সেই রক্ত ঝরতে দিন। মরণ তো হবেই আমার। তার আগেই মৃত্যুর স্বাদ একটু একটু করে গ্রহণ করে নেই। এতে যন্ত্রণা কম হবে।”

নারী পুলিশটি অবাক হয়ে পাখির কথা শুনছিল। তাদের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পেল নাওয়াফ পাখিকে জানলা দিয়ে ডাকছে, “পাখি আমার দিকে তাকা। মাথায় রুমালটা বেধে দেই। দেখ কতখানি কপাল কেটে গেছে। যে কেটেছে তাকে আমি ছাড়ব না। ওরও ওতখানি কপাল কেটে সোধ নিব।”

পাখি ফিরেও নাওয়াফের দিকে চাইল না। নাওয়াফ পেছন থেকে পাখির শরীর ঝাঁকিয়ে এবার ডাকল, “পাখি, আমার দিকে ঘোর। কথাটা শোন আমার। রক্ত ঝরছে।”

নাওয়াফের আকুতি মিনতি দেখে লেডি পুলিশের মায়া হলো। সে ভাবল, আহারে বউরে কত ভালোবাসে! আজকাল দিনে এমন স্বামী পাওয়া যায় না। সে পাখিকে ঝাঁকিয়ে বলল, “আপনাকে ওনি ডাকছে।”

“ওনাকে আমি চিনি না।”

ব্যস, নাওয়াফকে এতটুকুই ছিল পোড়ানোর জন্য যথেষ্ট। তার দমটা আটকে আসছিল। বুকটা চিনচিন করছিল। শ্বাসটা যেন থেমে গেল। তবুও নাওয়াফ সকল অভিমান, কষ্ট ঝেড়ে হাত বাড়িয়ে রুমালটি লেডি অফিসারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওর কপালটি বেঁধে দেন। নতুবা ও অসুস্থ হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, তুই চিন্তা করবি না পাখি। আমি তো আছি। তোর কিছু হবে না। আমার ওপর ভরসা কর। আমি থাকতে তোর গায়ে একটা ফুলের টোকাও পড়বে না।”

নাওয়াফের শেষ কথাটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই পুলিশের গাড়িটি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। গাড়ির ভেতরে বসে থাকা নারী পুলিশটি নাওয়াফের বাড়িয়ে দেওয়া রুমালটি হাতে তুলে পাখির দিকে এগিয়ে দিল।

“কপালের রক্তটা মুছে নিন।”

পাখি একবারও রুমালটির দিকে ভালো করে তাকাল না।

নির্বিকার ভঙ্গিতে সেটি আঙুলের ডগায় তুলে গাড়ির দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। রুমালটি বাতাসে উড়ে এসে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল নাওয়াফের পায়ের কাছে। পাখি ধীরে মুখ ফিরিয়ে এনে আগের মতো বসল। যেন এই পৃথিবীতে নাওয়াফ নামে সে কেউ কখনো ছিলই না। নাওয়াফ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখনো বিস্ময়, অপরাধবোধ আর অসহনীয় শূন্যতা। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। পাখির মনে তার জন্য এতটা ঘৃণা জমে আছে? এতটাই? সে তার দেওয়া রুমালটুকুও স্পর্শ করে রাখল না। একবারের জন্যও তার দিকে ফিরে তাকাল না। এমনকি বিদায়ের শেষ মুহূর্তেও তার মুখটি দেখার প্রয়োজন মনে করল না। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল পুলিশের গাড়ি। আর নাওয়াফ দাঁড়িয়ে রইল ঠিক সেখানে। বুকভরা অনুতাপ নিয়ে চোখের সামনে দেখে গেল ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকা নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক দলা দমকা হাওয়া ছুটে এলো। তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে দিলো। সেই সঙ্গে তার কর্ণে ফিসফিস করে ভেসে এল একটি নারী কণ্ঠস্বর।

“মায়ার পুরুষ গো, মায়া বাড়াইয়া দিয়া দিলটা দিলা নষ্ট কইরা। মৃতের মতো বাঁচার স্বাদ গ্রহণ করাইয়া ছাড়লা। এখন চাও আবার জীবিত করতে? তুমি না মায়ার পুরুষ, বড্ড বোকা। মৃত দেহ আর মৃত মন কি কখনো দেখেছো জীবিত হতে?”

#(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন