#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(৪০)
আয়নার সামনে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে আছে পাখি। মনে হচ্ছে, চোখ দুটো গভীর অতলে তলিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালচে দাগ। মুখের সেই চিরচেনা লাবণ্যও আর নেই। আম্যাবসার অন্ধকারে যেন মিলিয়ে গেছে। তবু সে মৃদু করে হাসল। অথচ সেই হাসির আড়ালেই চোখের কোণে চিকচিক করছিল কয়েক দলা অশ্রুরেখা। বিছানার ওপর ভাঁজ করে রাখা একটি লাল শাড়ি। শাড়িটা তাকে দিয়েছিল তার ভাই ফাহাদ। জীবনের প্রথম চাকরির বেতন হাতে পেয়েই কিনে এনেছিল। কতটা উচ্ছ্বাস নিয়েই না বলেছিল, “তুই এটা কোনো বিশেষ দিনে পরিস।”
পাখি যত্ন করে শাড়িটা আলমারিতে তুলে রেখেছিল কোন একসময়ে পরবে বলে। কিন্তু সেই বিশেষ দিন আর আসেনি। সেও আর পরেনি। তার আগেই ফাহাদ চলে গিয়েছিল না-ফেরার দেশে। এরপর আর শাড়িটা পরা হয়নি। আজ বহুদিন পর আবার শাড়িটা হাতে তুলে নিল সে। আঙুলের কোমল স্পর্শে কাপড়ের প্রতিটি ভাঁজ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল। মনে হচ্ছিল, ভাইয়ের আদুরে ভালোবাসাটা এখনও শাড়ির আঁচলে আঁচলে লেগে আছে। ফাহাদের পছন্দ সব সময়ই চমৎকার ছিল। পাখি ধীরে ধীরে শাড়িটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজও তাকে অপূর্ব লাগছে। কোন অংশে কম সুন্দর মনে হয়নি। অথচ সেই সৌন্দর্যের প্রশংসা করার মতো আপন কেউ আর নেই। হঠাৎ বুকের ভেতরটা দলা পাকিয়ে মোচড় দিয়ে উঠল। সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। পরক্ষণেই দুহাতে চুল খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল। এতদিন ধরে বুকের গভীরে জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা যেন আজ অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাবা নেই। মা নেই। ভাইও নেই। পৃথিবীর ভিড়ে সে এক নিঃসঙ্গ এতিম। একবেলা না খেয়ে থাকলেও তাকে কেউ প্রশ্ন করে না, “তুই খেয়েছিস?”
এমন জীবন তো সে কখনো চায়নি। তবু নিয়তি তাকে এই জীবনই উপহার দিয়েছে। বুকের ভেতরটা আবারও হাহাকার করে উঠল। আজ সে কাঁদবে। প্রাণভরে কাঁদবে। যতটুকু কান্না বাকি আছে, সবটুকু আজ শেষ করে দেবে। কারণ আজকের পর আর সে কাঁদবে না। কখনোই কাঁদবে না। আর আপনজনদের মুখ দেখবে না। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। আজ নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে সাজাবে। কারণ আজকের পর আর কখনো তার সাজা হবে না। পায়ে আলতা রাঙাবে না। চোখেও কাজল দিবে না। অত্যন্ত যত্নে নিজেকে সাজিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলে ওঠল,
“পারফেক্ট।”
এবার শুধু অপেক্ষা। সাজগোজ করে নীরবে বসে রইল সে। মনে পড়ল নাওয়াফের সঙ্গে কাটানো কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলোর কথা। কত রাত তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে! কত রাত ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছে! ওনার চওড়া বুকটার মাঝে ঘুমিয়েছে। আজ সেসব যেন দুঃস্বপ্ন। তার মনে পড়ল তার নিষ্পাপ সন্তান দুটোর কথার। কি সুন্দর নিষ্পাপ মুখ ছিল ওদের! মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মনে মনে বিড়বিড় করে চিৎকার দিয়ে ওঠল সে, “আল্লাহ, আল্লাহ কেন তুমি আমার জীবনটা এমন নরক করে দিলা? কেন আমারে একটু বাঁচতে দিলা না? একটু সুখ দিলে তোমার কী ক্ষতি হইতো? একটা মানুষও আমারে বিশ্বাস করল না। কেউ না। কাউরে বোঝাতে পারলাম না আমি নির্দোষ।”
কথাগুলো বিড়বিড় করতে গিয়ে তার চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছিল। হঠাৎ যেন বুকের গভীর থেকে আরেকটি সত্তা নীরবে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “তুমি না বলেছিলে, আর কাঁদবে না?”
পাখি নিঃশব্দে একটুখানি হাসল।
“এই শেষবার। আর কখনো আমি কাঁদব না। আমার চোখও কাঁদবে না। তাকে বলে দিও, এ মন আর কাউকে ভালোবাসবে না।”
বিকেল গড়িয়ে ঠিক চারটার দিকে দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।
শব্দটা কানে আসতেই পাখির ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসির চিলিক ফুটে উঠল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই চোখে পড়ল সিরাজকে। সিরাজ ভেতরে ঢুকে একবার পাখিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে দেখে নিল। লাল শাড়ি, খোলা চুল, পায়ে ভারী নূপুর, চোখজোড়া গাঢ় কাজলে মোড়া। ঠোঁটে কৃত্রিম রঙের আভা। গায়ে মানানসই গয়না। আর এলোমেলো খোলা চুলের মাঝে ছোট্ট টিকলিটা যেন তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতে করতেই সিরাজ চাপা হাসি দিয়ে বলল, “দারুণ তো লাগছে তোমায়।”
পাখি শুধু মৃদু হেসে তাকিয়ে ছিল। তার পরিকল্পনা তার ভেতরেই ছিল। যা সিরাজ নামের ধূর্ত লোকটাকে বুঝতে দিল না।
সিরাজ গিয়ে বিছানার কিনারায় বসল। পাখিও তার পাশে বসতেই সে ঠোঁট কামড়ে এক চিলতে হাসল। ধীরে ধীরে পাখির হাত ছুঁতে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার আগেই পাখি নিঃশব্দে হাতটা সরিয়ে নিয়ে মৃদু হেসে বলল, “এত তাড়া কিসের? পুরো রজনী তো এখনো পড়ে আছে।”
সিরাজ ঠোঁট কামড়ে আবারও হাসে।
“তোমায় দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না।”
“কন্ট্রোল করতে শিখুন। জানেন না আগুনে হাত দিলে হাত পুড়েও যেতে পারে?”
“তুমি যদি আগুন হও, আমিও পানি হয়ে তোমায় নিভিয়ে দিব।”
পাখি মৃদ্যু হাসল। সিরাজের দিকে এক গ্লাস দুধ এগিয়ে দিল। মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “দুধটা খেয়ে নিন। এনার্জি বাড়বে।”
“হাউ সুইট। তুমি কি রোমান্টিক? ইশ, কখন আসবে সেই মুহূর্তটা, যখন তোমায় ছুঁব!”
“আমাকে আপনার ছুঁতে হবে না। আমিই আপনাকে ছুঁবো। এবার দুধটা শেষ করে একটু বিশ্রাম নিন।”
সিরাজ পাখির আচরণে ভীষণ বিস্মিত হলেও আর কিছু বলল না। কারণ তার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য তো অবশেষে সফল হতে চলেছে। দুধটা পান করার পর প্রথম কয়েক মিনিট সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মিনিট দশেক পেরোতেই তার চোখদুটো ভারী হয়ে এল। মাথার ভেতর অদ্ভুত এক ঝিমুনি নেমে এলো। চারপাশের সবকিছু ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন শক্তিহীন হয়ে পড়ছে। আতঙ্কে সে অবিশ্বাসভরা দৃষ্টিতে পাখির দিকে তাকাল। ঠিক তখনই পাখি বিকট শব্দে হেসে উঠল। না, ওটা কোনো স্বাভাবিক হাসি ছিল না। সে হাসিতে ছিল হিমশীতল বিভীষিকা। কোনো ভয়ংকর অশরীরীর অট্টহাসি। সিরাজের শরীর কাঁপতে শুরু করল। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল শীতল এক স্রোত। সে তোতলাতে তোতলাতে কাঁপা কণ্ঠে বলল, “ক... কী মিশিয়েছো... দু... দুধের সা... সঙ্গে?”
পাখি আবারও হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে সিরাজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কয়েক পা পিছু হটল। এই মুহূর্তে মেয়েটিকে তার ভীষণ ভয় করছে।
কিন্তু তার ভয়কে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে পাখি ধীর পায়ে দরজার কাছে গিয়ে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দিল।
সিরাজের ভেতরকার ভয়টা এবার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেল। আজ তার পালানোর কোনো পথ নেই। সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু কেন? ডেকে এনে সে কিসের প্রতিশোধ নিতে চাইছে?
সে কাঁপা কণ্ঠে আবারও প্রশ্ন করল, “কি... কি করতে চাই...ছো তুমি?”
পাখি কোনো উত্তর দিল না। দেওয়ার প্রয়োজনবোধও করল না। নির্বিকার মুখে ধীরে ধীরে নিজের কোমর থেকে শাড়ির কুচিগুলো খুলতে লাগল। সিরাজ বিস্ময় আর আতঙ্কে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, পাখি ঠিক কী করতে চলেছে। পুরো শাড়িটি খুলে সে বটি দিয়ে সমান দুই টুকরো করল। তারপর কাপড়ের খণ্ড দুটি হাতে নিয়ে নিঃশব্দে সিরাজের দিকে এগিয়ে এল। সিরাজ তখন প্রায় শক্তিহীন হয়ে দেয়ালের সঙ্গে হেলে দাঁড়িয়ে। দুধের সঙ্গে কী খাইয়েছে, সে জানে না; তবে তার হাত-পায়ের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে। প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। সেইটুকুই নিঃশেষ। পাখি প্রথমে সিরাজের দুই হাত শক্ত করে বেঁধে দিল। এরপর নিচু হয়ে পা বাঁধতে উদ্যত হতেই সিরাজ আচমকা কাঁপা ক্ষীণ কণ্ঠে ধমকে উঠল, “কি করছো?”
পাখি চোখ দুটো রাঙিয়ে তর্জনী আঙুলের মাথা তুলে শক্ত গলায় ধমক দিয়ে ওঠল, “চুউব! একটা শব্দ মুখ দিয়ে বের করবি না। কি করতে চাইছি শুধু দেখবি আজ।”
পাখির সেই ধমক শুনে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল সিরাজ। বিস্ফারিত চোখে সে তাকিয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। এ কি সেই সরল, শান্ত, নিরীহ পাখি? নাকি তার ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো ভয়ংকর সত্তা আজ জেগে উঠেছে? হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সে অসহায়ের মতো মেঝেতে পড়ে রইল। পাখি ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। তোশকের নিচে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল একটি চকচকে, ধারালো রামদা। ফলাটির ওপর আলো পড়তেই শীতল এক ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে। ধার এতটাই তীক্ষ্ণ যে একবার চোখ বুলিয়েই গা শিউরে ওঠে। অনেক যত্নে নিজ হাতে সেটিতে শান দিয়েছিল সে। কিন্তু কোনোদিন ভাবেনি, সেই ধারালো অস্ত্র এমন এক দিনের সাক্ষী হবে। রামদাটি হাতে নিয়ে পাখি ধীরে ধীরে সিরাজের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার খোলা চুলগুলো ফ্যানের বাতাসে এলোমেলোভাবে উড়ছে। মুখে কোনো রাগ নেই, নেই কোনো উন্মত্ততা। ছিল এক অস্বাভাবিক স্থিরতা। আর সেই নিস্তব্ধ, অভিব্যক্তিহীন মুখটাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর, নৃশংস। সিরাজের মনে হলো, ঘরের বাতাস পর্যন্ত জমে গেছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আজ মৃত্যু যেন নীরবে এসে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। পাখি এসে তার একেবারে পাশে বসল। রামদার ঠান্ডা ফলায় আঙুল বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভয় লাগছে?”
কথাটা শেষ হতেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। এমন হাসি সিরাজ পাখিকে কখনো হাসতে দেখেনি। কি ভয়ংকর হাসি! যেন অশরীরী। সেই হাসির প্রতিটা ধ্বনি পুরো ঘরটাকে গ্রাস করে ফেলল। সিরাজের বুকের ভেতর আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে পাখি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। একটি চেয়ার টেনে এনে সিরাজের ঠিক মুখোমুখি বসল। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে নিল। এক হাতে শক্ত করে ধরা রামদা, অন্য হাতটি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে রাখা উরুর ওপর। শিরদাঁড়া হিম করে দেওয়া দৃষ্টিতে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে শুরু করল সে।
“আমি তোর কোন ক্ষতি করেছিলাম?”
সিরাজ উত্তরে বলল, “না।”
“আমার হাসবেন্ড তোর কোন ক্ষতি করেছিল?”
“না।”
“তাহলে আমার সংসারটা তুই ধ্বংস করলি কেন? আমার হাসবেন্ডের সামনে আমাকে চরিত্রহীন করে উপস্থাপনা করলি কেন?”
সিরাজ উত্তর দিল না। পাখি ওর মুখ নিয়ে একটা লাথি ছুঁড়ে মারল। সিরাজ ব্যথা পেয়েও চুপ করে রইল। সে শুধু অবিশ্বাস্য চোখে এই নারীটির বাহ্যিক রূপটা দেখে গেল। সেই সারল্য নারীটি এতটা ভয়ংকর হয় কি করে?
“বেজন্মার বাচ্চা উত্তর দিচ্ছিস না কেন? বল সেদিন কে ছিল তোর সঙ্গে?”
“অন্য একটা মেয়ে ছিল।”
“অন্য একটা মেয়ে?”
“হ্যাঁ, উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটাকে দিয়ে তোমার হাসবেন্ডকে ভুল বোঝানো। এজন্য তোমার কাপড় নিয়েছিলাম, তোমার সাজটাও কপি করা হয়েছিল।”
“জানোয়ার! ছিঃ! নরকেও তোর ঠাঁই হবে না। ওইদিন রাতে আমাকে তুলে আনতে পাঠালি কেন? তুই জানতিস না আমি গর্ভবতী ছিলাম?”
“জানতাম।”
“তবুও তোর লালসা কমেনি। একজন গর্ভবতী নারীর দিকে কুনজর দিয়েছিলি?”
মুখ নিয়ে আরেকটি লাথি বসাল পাখি। সিরাজ দেওয়ালের সঙ্গে বাড়ি গেল। অপমান আর লজ্জায় মুখটা নিচু করে নিল।
“গর্ভবতী হওয়ার আগ থেকেই আমি তোমায় পছন্দ করতাম।”
“পছন্দ? আরেক পুরুষের বউকে পছন্দ করতে তোর ঘৃণা লাগেনি।”
“না।”
“কু** বাচ্চা আবার মুখে মুখে উত্তর দেয়। আমার এলাকায় এসে বাচ্চাদের মায়েদের কাছে আমার নামে দুর্নাম তুই ছড়িয়েছিলি?”
“হ্যাঁ আমি।”
“উদ্দেশ্য আমাকে ভোগ করা?”
“হ্যাঁ।”
“শালার বাইন** তোর এত কুড়কুড়ানি ছিল? ওয়েট।”
পাখি সিরাজের এক হাত জানলার সঙ্গে বেঁধে আরেক হাত খুলে দিল। এরপরে বলল, “প্যান্ট খোল।”
সিরাজ ভীতসন্ত্রস্ত মুখে জানতে চাইল।
“কে..কেন?”
পাখি ঠাস করে সিরাজের গালে একটি চড় বসিয়ে দিল।
“এই জানো** মরার ভয় নেই তোর? কৈফিয়ত চাস আমার কাছে? খুলতে বলেছি খুলবি।”
সিরাজ ভীত মুখটা নিয়ে প্যান্টের চেইন খুলে নিল।
“তোর পেনি* বের কর।”
“কি?” বিস্ময় তার কণ্ঠে।
“ওরে জা*নো*য়া*রে*র বাচ্চা বাংলা ভাষা বুঝো না? বের করবি না ছুরিটা দিয়ে তোর গলা কেটে দিব?”
সিরাজ ভয় পেয়ে দ্রুত তার পে** বের করল। পাখি মরিচের বয়াম এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে মরিচ মাখা ওখানে।”
সিরাজ আঁতকে ওঠল। সে অনুরোধ করে বলল, “প্লিজ এমনটা করো না। মরে যাব।”
“মরে যাবি আর তুই? তুই মরবি না। পিশাচ কখনো মরে না। দ্রুত কর। ছুরিটা কিন্তু এখনো আমার হাতে।”
সিরাজ হতাশ হলো। তার পাপ আজ তার জীবনে কাল হয়ে সর্বনাশ ঘটাচ্ছে। এমনটা জানলে সে কখনো এখানে আসতো না। অন্য কোন প্লান করতো। সে মরিচ নিয়ে নিজের স্পর্শ কাতর স্থানে লাগাতে লাগল। সেই সঙ্গে চিৎকার করে যাচ্ছিল। ঝালে জায়গাটি জ্বলছিল।
পাখি এবার সিরাজের হাতে ফল কাটার মিনি সাইজের ছুরিটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, “নে এটা দিয়ে তোর ওইটা কেটে ফেল।”
কথাটি কর্ণে পৌঁছাতে সিরাজ বিস্ময়ে চমকে ওঠল। এতটা মানুষ নৃশংস আর সাইকো হয় কি করে? মানছে সে ভুল করেছে। তাই বলে এই শাস্তি? আর কত রকমের শাস্তি ছিল। সেসব দেওয়া যেতো। সে বার বার হাত জোর করে মিনতি করল, “এবারের মতো ক্ষমা করো। আর কখনো তোমার ক্ষতি করব না। প্লিজ যেতে দেও আমায়।”
“ক্ষতি আর নতুন করে করবি কি তুই? স্বামী, সন্তান, সংসার সব হারিয়েছি। আর এসবের জন্য একমাত্র তুই দায়ী। আমার নিষ্পাপ সন্তান দুটো শুধু তোর কারণে মারা গেছে। সেদিন যদি তুই আমাকে তুলে আনতে না পাঠাতিস, তাহলে আজ ওরা বেঁচে থাকত। আমার কোলে খেলা করতো। কিন্তু তুই তা করিসনি। এবার তোর প্রতিও আমি দয়া দেখাব না ইবলিশের বাচ্চা। কাট বলছি, নতুবা তোর গলা কাটব আমি।”
পাখির বজ্রগর্জনে কেঁপে উঠল সিরাজ। কম্পিত হাতটা নিয়ে নিজের পুরুষাঙ্গ নিজেই কেটে ফেলল সে। রক্তে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে তার প্যান্ট। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কাঁদছে, আর মিনতির স্বরে বলছে, “যা যা বলেছ, সব করেছি। এবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দাও। আমার প্রতি একটু দয়া করো।”
পাখির ঠোঁটে ফুটে উঠল নির্মম এক হাসি।
“দয়া? তোর প্রতি? সেদিন তুই আমার প্রতি দয়া করেছিলি? করিসনি। তুই আমার সংসারে আগুন লাগিয়েছিস। তোর কারণেই আমার হাসবেন্ড আমাকে মেরে রক্তাক্ত করেছিল। তোর কারণেই আমাকে জীবন্ত কবর দিতে নিয়ে গিয়েছিল। তোর জন্য আমাকে ঘর-সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সন্তান হারাতে হয়েছে। তারপরও তোকে আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। সব হারিয়ে যখন নতুন করে একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম, তখনও তুই আমার সেই বাঁচাটুকুও কেড়ে নিলি। এতকিছুর পরও তোকে ক্ষমা করব? হাসালি আমায়। আমার নিষ্পাপ সন্তানদের কান্না আজও আমাকে ঘুমাতে দেয় না। সেই কান্না রাতের পর রাত আমার কানে বাজে। আমি নির্ঘুম রাত পার করি শুধু তোর জন্য। সেদিন তুই আমাকে তুলে আনতে না পাঠালে আজ ওরা বেঁচে থাকত। কিন্তু তুই তা করিসনি। লালসা আর লোভ তোর মনুষ্যত্ব গ্রাস করেছিল। আজ আমি নিঃস্ব। স্বামী নেই, সন্তান নেই, সংসার নেই, পরিবার নেই। আজ আমার এই ধ্বংসস্তূপের জন্য একমাত্র তুই দায়ী। একজন সন্তানহারা মা কতটা হিংস্র, কতটা ভয়ংকর হতে পারে, আজ তোকে আমি সেটা বুঝিয়ে দেব।”
কথাগুলো শেষ করেই পাখি দুহাতে রামদাটি শক্ত করে ধরল। চোখে তখন উন্মত্ত প্রতিশোধের আগুন। সমস্ত শক্তি দিয়ে সিরাজের বুকে সজোরে একটি কোপ বসিয়ে দিল। সিরাজের আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠল সমগ্র ঘর। দেওয়ালগুলো যেন থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু আজ পাখির হাত থামার নয়। তার চোখের সামনে একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে তার সন্তানদের নিষ্পাপ মুখ। ভেসে উঠছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত, যখন তার স্বামী তাকে পতিতার চেয়েও নিকৃষ্ট বলে অপমান করেছিল। ভেসে উঠছে নাওয়াফের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারী, যাকে সে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়েছিল। ভেসে উঠছে নিজেরই সংসার থেকে হাত ধরে বের করে দেওয়ার অপমানের সেই নির্মম দৃশ্য। প্রতিটি স্মৃতি যেন তার ভেতরের মানুষটাকে হত্যা করে এক উন্মত্ত প্রতিশোধস্পৃহায় জাগিয়ে তুলছিল। সে যেন ক্ষুধার্ত হায়নায় রূপ নিল। শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দুহাতে রামদাটি তুলে বারবার আঘাত হানতে লাগল সিরাজের শরীরে। প্রতিটি কোপে ছিটকে উঠছিল রক্ত। মুহূর্তের মধ্যেই মেঝে লাল স্রোতে ভেসে গেল। রক্তের ছিটা লেগে গেল পাখির মুখে, চুলে, গায়ে। অথচ তার চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। শুধু দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা প্রতিশোধের দাবানল জ্বলছে। সিরাজের বিকট চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষজন ছুটে এল। মুহূর্তেই দরজার সামনে উপচে পড়ল ভিড়। বাইরে থেকে দরজা ধাক্কানো হচ্ছে, কেউ প্রাণপণে খুলতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ভেতর থেকে আটকানো দরজা আর খুলছে না। জানালাটা খোলা ছিল, যদিও বেশ উঁচুতে। কয়েকজন চেয়ার এনে তাতে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিতেই আতঙ্কে জমে গেল। কারণ তখনও পাখি নির্দয়ভাবে সিরাজকে কোপাচ্ছিল। রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার নিজের শরীরও। দৃশ্যটা এতটাই বিভীষিকাময় ছিল যে, কেউ আতঙ্কে পিছিয়ে গেল, কেউ কাঁপা হাতে মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করল। চারদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি পড়ে গেল। কেউ মানুষ ডাকছে, কেউ চিৎকার করে বলছে, “পুলিশে খবর দাও! তাড়াতাড়ি পুলিশে খবর দাও!”
ঠিক সেই সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল রমিজ। মূলত সে ক্লাবের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। কিন্তু পাখির বাসার সামনে অস্বাভাবিক ভিড় দেখে থেমে গেল। বাড়িটা রাস্তার একেবারে পাশেই হওয়ায় দৃশ্যটা তার চোখ এড়াল না। সে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বাধ্য হয়ে জানালার দিকে এগিয়ে উঁকি দিতেই তার শরীর শীতল হয়ে গেল। রামদা হাতে এক উন্মত্ত নারীর মতো একজন পুরুষকে কুপিয়ে চলেছে তাদের ভাবি। দৃশ্যটা এতটাই ভয়াবহ যে, মুহূর্তের জন্য রমিজের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। লোকটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, তার বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই। এত আঘাতের পরও কেন তাকে থামানো যাচ্ছে না সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগল তার মাথায়। হঠাৎ সে দেখল, পাখি সিরাজের মাথার কাছে গিয়ে বসেছে। ধীরে ধীরে তার বুকের ওপর উঠে বসল। সিরাজের প্রাণ তখন প্রায় নিঃশেষ।
পাখি তার মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক হাসি হেসে বলল, “দেখলি তো? নারীর পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে কতটা নৃশংস হয়ে ওঠে। তোকে মারার কারণে আমার একটুও আফসোস হবে না। হবে না অনুশোচনাবোধও। কারণ আমি কোন মনুষ্যকে খুন করছি না। পৃথিবী থেকে এক জন্তুুকে সরিয়ে দিচ্ছি। বহু বছরের অশান্তির আজ অবসান হবে। তোকে মেরে আজ আমি শান্তিতে ঘুমাব। কত রাত ঘুমাই না! আজ ঘুমাব। বেশ লম্বা ঘুম ঘুমাব।” বলেই সে একটু হাসল। আবারও রামদাটি হাতে তুলে নিল।
চারদিক থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য কণ্ঠস্বর। কেউ দরজা খুলতে বলছে। কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে। কেউ চিৎকার করে আতঙ্ক গলায় বলছে, “পুলিশকে এখনো ফোন দাওনা কেন?”
আবার কেউ আহত গলায় বলছে, “মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে! দেখো, লোকটার বুকের ওপর উঠে বসে আছে!”
কিন্তু বাইরের কোনো শব্দই পাখির কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তার বুকে তখন চিতার আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল। চোখ দুটো প্রতিশোধের উন্মত্ততায় জ্বলজ্বল করছিল। সে সিরাজের গলায় রামদাটি চালিয়ে দিল। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল মাথাটা। গরুর মতো গলার শিরা থেকে রক্ত ঝরছে। দেহটা লাফাচ্ছে। পাখি সেই দৃশ্য খুব কাছ থেকে স্থির চোখে দেখছে। আশপাশের মানুষজন চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলছে, “দিলো শেষ করে। জ*বা*ই করছে, করে দিছে। শেষ পোলাডা। কার বুক যেন খালি করে দিছে বে*শ্যাডায়।”
রমিজ সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে আর এক মুহূর্তও স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। আতঙ্কিত পায়ে ছুটে গেল দ্রুত নাওয়াফকে সবটা জানাতে।
ওইদিকে নাওয়াফ রামদা হাতে দ্রুত পাখির বাসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। নিখিল বারবার তার পথ আটকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, “মাথাটা ঠান্ডা কর। খুন করলে সবকিছু ঠিক হয়ে যায় না। আগে আমরা বিষয়টা নিয়ে ভাবি। পাখির সঙ্গে কথা বলি। পাখি যদি না চায়, তুই ওকে ছেড়ে দিস। তাই বলে খুন করবি, এটা কেমন কথা?”
নাওয়াফের কানে নিখিলের একটি কথাও ঢুকল না। তার মস্তিষ্ক ক্রোধে অবশ হয়ে গেছে। পাখিকে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে একই বিছানায় কল্পনা করতেই বুকের ভেতর হিংস্র আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ শুরু হলো। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কপালের রগগুলো ফুলে উঠেছে। সমগ্র শরীর প্রতিহিংসায় থরথর করে কাঁপছিল। এই মুহূর্তে সামনে পেলে দুজনকেই নৃশংসভাবে হত্যা করতে তার এক মুহূর্তও দ্বিধা হবে না। নিখিল তাকে থামানোর শেষ চেষ্টা করছিল। কিন্তু নাওয়াফ এক ঝটকায় নিখিলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। প্রায় পড়ে যেতে যেতে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল নিখিল। তবুও হার মানল না। আবারও ছুটে গেল তার পিছু পিছু। পিছু থেকে সমানভাবে চ্যাঁচিয়ে যাচ্ছে সে।
“নাওয়াফ! দাঁড়া!”
ঠিক তখনই অপর দিক থেকে প্রাণপণে দৌড়ে আসছিল রমিজ। হাঁপাতে হাঁপাতে তার বুক থড়ফড় করছিল। বুকের ওঠানামা বেড়ে গিয়েছিল। এত দ্রুত ছুটেছে যে ক্লাব পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি পেল না। ভালোই হলো মাঝপথেই নাওয়াফের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে গেল। সৃষ্টিকর্তার কাছে সে হাজার কোটি শুকরিয়া জানাল। তাকে আর ক্লাব পর্যন্ত যেতে হবে না। ঠিক সময়ে লোকটার দেখা পেয়েছে। নাওয়াফের সামনে এসে দাঁড়াতেই সে হাঁপাতে লাগল।
“ভা..ভাই!”
বাকিটুকু আর মুখ দিয়ে বের হলো না। আতঙ্কে তার ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।
নাওয়াফ রমিজের বাহ্যিক অবস্থা দেখে প্রবল অবাক হলো। দুই কাঁধ চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে শুধাল,
“কী হয়েছে তোর? এমন করে হাঁপাচ্ছিস কেন?”
রমিজ কাঁপা ঠোঁটে কোনোমতে উচ্চারণ করল,
“ভাই... ভাবি...”
শব্দ দুটোর পরই তার কণ্ঠ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই নিখিলের বুকচেরা আর্তচিৎকার বাতাস চিরে ভেসে এলো, “নাওয়াফ...!”
চমকে উঠে নাওয়াফ। ঘুরে তাকাল সেদিকে। নিখিলের মুখের সমস্ত রক্ত যেন মুহূর্তে শুকিয়ে গেছে। তার চোখদুটো অস্বাভাবিকভাবে বিস্ফারিত। সে নির্বাক, নিঃশ্বাসহীন দৃষ্টিতে সামনের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে জমাট বেঁধে আছে আতঙ্ক, অবিশ্বাস আর শীতল বিভীষিকা। নাওয়াফের বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা এক অশনি-সংকেত বেজে উঠল। সে ধীরে ধীরে নিখিলের দৃষ্টির রেখা অনুসরণ করে সামনে তাকাল। পরের কয়েক সেকেন্ড যেন সময়ের বুক থেকে মুছে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে রইল। মুখের সমস্ত রক্ত সরে গিয়ে চেহারা বিবর্ণ হয়ে উঠল। আঙুলের মুঠো আলগা হয়ে যেতেই রামদাটি হাত থেকে বিকট শব্দ তুলে মাটিতে আছড়ে পড়ে ঠক্ করে ওঠল! শব্দটা যেন চারপাশের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল। নাওয়াফ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। তার সামনে যে দৃশ্যটি ছিল, তা কোন হলিউড হরর থ্রিলার মুভিকেও হার মানাবে। আর এই সত্যটি মস্তিষ্ক কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, চোখ দুটো তাকে প্রতারণা করছে। সে কোন দুঃস্বপ্নের মধ্যে ডুবে আছে।
গোধূলির শেষ আলো তখন পশ্চিম দিগন্তে রক্তাক্ত এক রেখা টেনে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। সমগ্র আকাশের বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অদ্ভুত এক লালচে রক্তাভ আভা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন আকাশের বুক জুড়ে নিজ হাতে রক্ত মেখে দিয়েছে। আজকের বাতাসটি কেমন যেন এক ভারী। পথঘাটে মানুষের আনাগোনা থাকলেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য নীরবতার চাদর বিছিয়ে আছে। সেই নীরবতার বুক চিরে ধীর, স্থির পদক্ষেপে এগিয়ে আসছিল এক নারী। যার পরনে রক্তে সিক্ত ব্লাউজ আর পেটিকোট। খোলা চুলগুলো দমকা বাতাসে বারবার উড়ে উড়ে মুখ ঢেকে দিচ্ছিল, আবার সরে যাচ্ছিল। চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে বিবর্ণ প্রসাধনের রঙ। অথচ মুখমণ্ডল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য রক্তের ছিটা। যেন সৌন্দর্যের মুখোশ ছিন্নভিন্ন করে সেখানে বিভীষিকা নিজের স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছে। ডান হাতে শক্ত করে ধরা রক্তমাখা রামদা। তখন ফলার ধার বেয়ে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পিচঢালা রাস্তায় লাল বিন্দু এঁকে দিচ্ছিল। বাম হাতে চুলের মুঠি শক্ত করে ধরা একটি বিচ্ছিন্ন পুরুষের মাথা। নৃশংস আর বীভৎস দেখতে তা। যা কোন সুষ্ঠ মানুষের পক্ষে স্বচক্ষে দেখা অসম্ভব প্রায়। হাঁটার কদমে কদমে মাথাটি দুলে উঠছিল, আর নিচ গড়িয়ে পড়ছিল রক্তের শেষ উষ্ণ ফোঁটাগুলো। তার পায়ের পাতাও রক্তে রঞ্জিত। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, আলতা দিয়ে তার চরণযুগল রাঙানো। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার গম্ভীর আদল। সেখানে ছিল না অনুশোচনা, না অনুতাপ। ছিল না ক্রোধের বিস্ফোরণও। বরং এমন এক পাথুরে স্থিরতা। মনে হচ্ছিল, ভেতরকার সমস্ত কান্না, সমস্ত আবেগ, সমস্ত কোমলতা বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। করেছে তোই। তাকে সবকিছু থেকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
রাস্তার মানুষজন এই নৃশংস দৃশ্যটুকু দেখে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে, কেউ কাঁপা হাতে মোবাইল বের করে সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য বন্দি করছে, আবার কেউ অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে যাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। যেন ভয় তাদের কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশটিই রূপ নিল এক দমবন্ধ করা বিভীষিকায়।
নাওয়াফের একেবারে পাশ ঘেঁষে হেঁটে গেল পাখি। দূরত্ব শুধু এক হাতের ছিল। অথচ একবারের জন্যও ওনার দিকে ফিরেও তাকাল না। কোন বিষাক্ত মন ভাঙা অভিমানে যেন মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছিল। যে মানুষটা এক সময়ে তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে উষ্ণ নিঃশ্বাস, উষ্ণ স্পর্শ ছড়িয়ে ছিল। আজ সে কত অচেনা, কত অপরিচিত! মানুষটাকে যেন কোনোদিন সে দেখেইনি। চেনেও না তাকে। কোন পথচারী। এমন করে এড়িয়ে গেল। পাখি তাকে পিছু ফেলে এগিয়ে যেতেই নাওয়াফের বুকে এক দলা দমকা শীতল বাতাস এসে ধাক্কা মেরে দিল। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় ধক করে আঘাতের তীর ছুড়ে দিল। সে নির্বাক, সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ। তার মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে মেনে নিতে অস্বীকার করে দিল। না না, এসব মিথ্যে। বনোয়াট। সে সব ভুল দেখছে। অথচ চোখ তাকে তখনো সেই নির্মম সত্যের সামনেই দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।
ওদিকে নিখিল প্রায় দৌড়ে গিয়ে পাখির পথ আগলে দাঁড়াল। কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল, “কী করেছিস তুই এসব? কেন করেছিস পাখি জবাব দে।”
বলতে বলতে সে পাখিকে ধরে ঝাঁকাল।
আজকেল পাখি ছিল সম্পূর্ণ পাথরে তৈরি কোন এক মূর্তি। কোন যান্ত্রিণ যন্ত্র। যে নিজের নীল নকশা করা পরিকল্পনায় জয়ী হওয়া একজন নারী। যে আজ থেকে স্বাধীন। আজকের পর সে আর কারো ধার ধারবে না। তার কোন পিছুটানও নেই। তাই সে কারোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও মনে করে না। তার রাজ্যের সে একমাত্র রানী। সে কারোর বাধ্য নয় তার হুমুক আদেশ মেনে চলবে। নয় সে কারোর আইন অনুসরণ করবে। তার মনে একমাত্র তার রাজস্ব চলবে। সেখানে অন্য কারোর স্থান নেই।
তার চোখ দুটো তখনও সামনের দিকেই স্থির। সেখানে কোনো ভাষা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো অনুতাপও নেই। ধীরে ধীরে ডান হাতটা সামান্য নাড়িয়ে নিখিলকে পথ থেকে সরিয়ে দিল। এরপরে হেটে গেল সে নির্বাকে। নিখিল তখনো বিমূর্ত। তার মনে হলো এই মুহূর্তে পাখির ভেতরে যে মানুষটা আছে, সে আর তাদের পাখি নয়। এ যেন পাখি রূপে অন্য কেউ। সে পেছনে ফিরে তাকাল। নাওয়াফ এখনও একই জায়গায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টি নিস্তেজ। মুখটা বিবর্ণ। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা। মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটা তার আত্মার ভেতর পর্যন্ত চিরে ফেলেছে। নিখিল আর দেরি করল না। ছুটে গিয়ে নাওয়াফের দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিল।
“তুই ঠিক আছিস? ওমন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছি কেন?”
নাওয়াফ বিস্মত মুখে বলে, “আমি যা দেখেছি, তুইও কি তা দেখেছিস?”
নিখিল মাথাটা ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ, পাখি খুন করেছে। তাও সিরাজকে।”
নাওয়াফ আমচকা চ্যাঁচিয়ে ওঠল, “না, ও এটা করতে পারে না। ওর সঙ্গে তো লোকটার সম্পর্ক ছিল। তাহলে তাকে নিজ হাতে খুন করবে কেন?”
নিখিল দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে বলল, “এটা আমিও বুঝতে পারছি না।”
“ডেকে এনে সোজা মার্ডার? এর ভিতরে মাস্টারপিস কিছু আছে। সেটা আমায় জানতে হবে। তার জন্য পাখিকে প্রয়োজন।”
“পাখি তো সোজা থানার দিকে চলল।”
“ওকে আটকাতে হবে। কোন মতেই থানায় পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। একবার থানায় পৌঁছে গেলেই সবকিছু আমাদের হাতের বাহিরে চলে যাবে।”
কথাগুলো বলে এক প্রকার দৌড়ালো নাওয়াফ। পিছু পিছু রমিজ আর নিখিলও ছুটল।
---------
থানার ভেতর তখন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দিনের শেষ ভাগ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মাগরিবের আজান পড়েছে। অফিসার তানজিল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। মাথার টুপিটা টেনে মুখের ওপর নামিয়ে রেখেছে। ক্লান্ত শরীরটা কখন যে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, সে নিজেও টের পায়নি। ঠিক সেই মুহূর্তে থানার নীরবতা ভেঙে উঠল এক ভারী শব্দে। ধপ করে টেবিলের ওপর এসে পড়ল রক্তমাখা একটি বিচ্ছিন্ন পুরুষের মাথা। তার পাশেই ধাতব শব্দ তুলে রাখা হলো রক্তে ভেজা রামদাটি। টেবিলের কাঁচ বেয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়তে লাগল রক্তের লালচে রেখা। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল কাঁচা রক্তের ধাতব গন্ধ। একটি শান্ত, নিস্পৃহ নারী কণ্ঠ হতে তখন ভেসে এলো, “অফিসার, কেস লিখুন। খুনের কেস। খুনি করেছি আমি।”
কণ্ঠস্বরটি কানে পৌঁছাতেই অফিসার তানজিলের ঘুম ভেঙে গেল। বিরক্ত ভঙ্গিতে টুপিটা সরিয়ে চোখ মেলতেই তার শরীর যেন মুহূর্তের মধ্যে জমে গেল। টেবিলের ওপর একটি বিচ্ছিন্ন মানুষের মাথা। পাশেই রক্তমাখা রামদা। আর ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্তের ছিটায় ভেজা। খোলা চুল এলোমেলো হয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। মুখের প্রসাধন রক্তের দাগে বিকৃত হয়ে এমন এক বিভীষিকাময় চেহারা ধারণ করেছে, যা দেখে প্রথম দর্শনে মানুষ নয়, দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়। তানজিলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠল। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সে শুধু তাকিয়েই রইল। যেন মস্তিষ্ক চোখের দেখা দৃশ্যকে সত্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছে। কাঁপা হাতে টেবিলের পাশে রাখা পানির গ্লাসটা তুলে এক নিঃশ্বাসে খালি করে ফেলল সে। তবু বুকের ধুকপুকানি থামল না। তার বহু বছরের চাকরি জীবনে অসংখ্য খুনের মামলা দেখেছে সে। লাশ দেখেছে। রক্ত দেখেছে। অপরাধীও দেখেছে অগণিত। কিন্তু খুন করে হত্যার আলামত হাতে নিয়ে এসে থানায় আত্মসমর্পণ করতে এই প্রথম দেখেছে। এমন দৃশ্য তার অভিজ্ঞতার পাতায় একেবারে নেই বললেই চলে।
সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে জানতে চাইল, “খুন কি আপনি করেছেন?”
পাখি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাসে।
“ও অফিসার ঘুষ খেয়ে চাকরি নিছো? এক কথা ক’বার বলা লাগে তোমায়? নাকি বাংলা ভাষা বুঝো না। চাকরি নেওয়ার সময় বাংলা শিখো নাই? একবার বলেছি না খুন আমি করেছি? আত্মসমর্পণও করতে চলে এসেছি। এবার কেস লিখো।”
“খুন করেছেন তা না হয় বুঝলাম৷ কিন্তু কাকে করেছেন?”
“একজন পাপিকে। তার কোন নাম নেই। তার নামই সে পাপি, জানোয়ার। আর জানোয়ারদের বেঁচে থাকার কোন মানে নেই। ওরা পৃথিবী নোংরা করে।”
“এজন্য সোজা খুন করে দিবেন?”
“হ্যাঁ দিব। কারণ আমার আদালতে আমিই একমাত্র বিচারক।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম